somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এলোমেলো বদ্ধতা

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যে কোন পরীক্ষার আগে আমি "তোশক" নিয়ে ফেলি। যারা 'গডফাদার' পড়েছেন তাদের কাছে কথাটার অর্থ ব্যাখ্যা করতে হবেনা, যারা পড়েননি তাদের জন্য বলি,"তোশক নেয়া" বলতে মাফিয়ারা বোঝায় গ্যাংওয়ার এর সময় দীর্ঘদিনের জন্য কোন সেফহাউস বা হাইডআউটে দল বেঁধে ঘাপটি মারা। এসময় মাফিয়া তরুণরা অস্ত্রশস্ত্র, খাবারদাবার,প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে কোন সেফহাউসে চলে যায়,খুব বেশি দরকার হলেও বের হয়না নিরাপত্তার খাতিরে,শখ করে কেই বা গুলি খেয়ে মরতে চায়? তাদের থাকার ব্যবস্থা হয় মেঝেতে তোশক পেতে,যতদিন যুদ্ধরত পক্ষগুলো একটা সমঝোতায় না আসে,ততদিন এভাবেই থাকা লাগে,এজন্যই এর নাম "তোশক নেয়া"।

তো,আমিও তোশক নেই পরীক্ষার সময়। যদিও আমার ১৪ পুরুষে কেউ মাফিয়া ছিলনা,কিন্তু দুনিয়ার তাবৎ পরীক্ষাগ্রহণকারীকেই আমার গডফাদার মনে হয় আর পরীক্ষার প্রশ্ন দেখলে মনে হয় একঝাঁক কামানের গোলা। কাজেই আত্মরক্ষার তাগিদে আমাকেও ঘাপটি মারতে হয়। সারাবছর পড়াশোনা করিনা, ওটা অবসর সময়ের কাজ,কাজেই পরীক্ষার আগে বরাবরই পাশ নিয়ে টানাটানি থাকে। ভার্সিটিতে থাকতে তাও বন্ধুরা ছিল,এখন একা,কাজেই যুদ্ধে মারা পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। তারপরেও বাঁচার চেষ্টা করা লাগে, করি সবসময়, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কিভাবে যেন পারও হয়ে আসি প্রায়ই।

এবারেও পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে মাথায় ঢুকলো যে, সামনে পরীক্ষা,এবং বরাবরের মতই আমার প্রস্তুতি শূন্যের কোঠায়। তবে এই পরীক্ষায় পাশ করলেই চলবে এই যা ভরসা,কাজেই মাফিয়া স্টাইলে শুরু করে দিলাম। ৬ মাস আগে কেনা বই আর সদ্য যোগার করা পত্রপত্রিকা ধুলো ঝেড়ে বের করলাম টেবিলের
বইখাতার জন্ঞ্জাল থেকে,সাথে ৩ মাস আগে কেনা ২টা কলম আর ১টা পেন্সিল। ইরেজার আর শার্পনার নেই,একটা হাতসাফাই করা ক্যালকুলেটর আছে,চলবে।

পরের কাজকর্ম অবশ্য ভার্সিটি জীবনের মত হুবহু হবে না,এখন টানা ৭ দিন গুহায় বসে থাকা কঠিন,অফিসে যেতে হয়,তবে বাসায় যুদ্ধাবস্থা। জানালা বন্ধ,পর্দা টানা,সূর্যের ফাজলামি একদম নিষেধ। মশারি একটা টানানো হয়েছে,খুবই খ্যাত ব্যাপারস্যাপার যে সেটাও ৩-৪ দিনে খোলা হবেনা,প্রায় সারারাত জাগা,ভোরের একটু আগে ঘুম,অফিস থেকে এসেই আবার ঘুম,এর মাঝে মশারি টানানোর আর খোলার জায়গা কোথায়? ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন এটা দুনিয়ার সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজ।

মশার কামড়,লাল চোখ,বাসে আর অফিসে ঝিম,সব মিলে বিরক্তিকর ৫টা দিন। শেষ ২ দিন অফিসে জানিয়ে দিলাম,আসবো না। এমন কিছু কাজও নেই,নিশ্চিন্তে ২ দিন আগে ঘুমাই,পরে পরীক্ষা কি হবে ভাবা যাবে। ভোর ৬টায় ঘুম,৭টায় বিকট শব্দ করে মোবাইলের রিং। ধরেই গালি দিয়ে বসিনি এটাই ভাগ্য,হেড অফিস থেকে ফোন, ইয়ে, তোমাকে কালকে সকালে কুমিল্লা যেতে হবে। পরশু পরীক্ষা, যাবো না। দেখো আর লোক নেই,না গেলে হবে না। বুঝলাম,এই লাইনে হবে না। আচ্ছা যাবো,বলে রেখে দিয়েই বসকে ফোন।
-ভাইয়া পরশু পরীক্ষা,আমারে কালকে কুমিল্লা পাঠাবে।
-আর তো লোক নাই,তুমি না গেলে আমারে যাওয়া লাগবে।
-জ্বি কিন্তু,আচ্ছা আপনে বললে--
-সমস্যা হইলো তুমি নরমাল টাইমে ফাঁকি মারো,কাজের টাইমে আবার তোমারে পাওয়া যায় না,ডেইলি সকাল সকাল অফিস আসলে কি হয়?
-জ্বি আচ্ছা।
-শোন,অফিসের নিয়মকানুন তো শিখতে হবে,নাইলে কেমনে কি? পরীক্ষার সময় তোমারে তো পাঠানো ঠিক না,কিন্তু তুমি ঠিকমত অফিস করলে এইরকম সময়ে তোমার জন্য বলা যায়--
-জ্বি আচ্ছা।
-আচ্ছা যাওয়া লাগবে না,দেখি কি করা যায়।
-জ্বি আচ্ছা।
ফোন রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি,বলেছে যখন যাওয়া লাগবে না, ঘুম দেই। আবার লাল চোখ নিয়ে ওঠা,পড়া,মশার কামড় আর আবোলতাবোল চিন্তা,ধুত্তোর এই দৌড় ভাল্লাগেনা।হবেনা তো জানা কথা,খামোকা সময় নষ্ট।

পরীক্ষার সকালে অনেকদিন পরে পুরনো টেনশন, ফাঁকা খাতা দিয়ে এলে তো ঝামেলা,যদিও দিলেই বা দেখছে কে? সেন্টারে গিয়ে মোটামুটি হতভম্ব,সব দামড়া দামড়া লোকজন,মামা-খালা টাইপ,নিজেরই সন্দেহ হতে থাকে আমি পরীক্ষার্থী কিনা। এক বড় ভাইয়ের সাথে দেখা,পরদিন রাতে জাপান চলে যাবেন। আপনি কেন দিচ্ছেন? আরে দিয়া যাই,পয়সা দিয়া ফর্ম কিনলাম, আর যাই তো বউয়ের ভিসায়,অ্যাডমিশন না হলে চলেও আসতে পারি। দীর্ঘশ্বাস ফেলি,শালার এর নাম কপাল, একটা স্কলারশিপওয়ালা বউও জুটলো না।

হলে ঢুকে বুক দুরুদুরু,এইসব গোল্লা ভরাট কত বছর আগে যে করেছি, কোনটা দিতে গিয়ে কোনটা দিই কে জানে! এর মাঝে ম্যাজিস্ট্রেটের আগমন,বিপুল ভাবের সাথে আমার সহ আরো কয়েকজনের ক্যালকুলেটর নিয়ে গেল,সায়েন্টিফিক অনুমোদিত না। আরে ব্যাটা দিস তো যোগ বিয়োগের অংক,এখানে সায়েন্টিফিক থাকলেই কি আর না থাকলেই কি? এখন ফেরত দিলে হয়! ঘন্টা পড়ে,অভ্যাস নেই অনেকদিনের,ঘড়িও নেই,উপরওয়ালার নাম করে গোল্লা পূরণ করি। ফলের আশা করিও না বাপু,আপন কর্ম করিয়া যাও,এই ক'মাসে পুরো সন্ন্যাসী হয়ে গেছি রে!

শেষ হবার ঘণ্টা বাজে,খাতা দিয়ে আগে ক্যালকুলেটর খুঁজে বের করি। আস্তে আস্তে বের হই,ইস্কুলের মত সবাই উত্তর মিলানোতে ব্যস্ত। মিলাক,উৎসাহ পাই না। বের হতে বাবার প্রশ্ন,কয়টা হইলো? দিলাম আরকি,জানি না,বিরস বদনে উত্তর দেই। হবে? মনে হয়, তবে দিল্লী ম্যালা দূর। একুশে বাসের ঠাসাঠাসি ভিড়,হৈচৈ। সামনে ৩ মহিলা দাঁড়ানো,অন্য সময় হলে সিট ছাড়তাম,আজকে ইচ্ছা নেই,গ্যাঁট হয়ে বসলাম,সমানাধিকারের যন্ত্রণাও বঙ্গললনাদের বোঝার সময় হয়েছে,সেই সাথে সিট ছেড়ে দিলে শুকনো হলেও একটা ধন্যবাদ দেয়ার আদব শেখার।

বাসের ঝাঁকুনিতে ঝিমুনি আসে,ভাবার চেষ্টা করি এরপর কি। অনেকদিন আর কোন পরীক্ষা নেই,কাজেই অফিসে মন দিতে হবে একটু। আবার ৯টা ৫টা দৌড়,আবার সেই বেতন পাওয়া না পাওয়ার ভাবনা।একই চিন্তা,একটু উপরে উঠবো কবে,কি করে,একই বিষয়ভাবনা দৈনিক রুটিরুজির। একঘেয়ে সকাল আর ক্লান্তিকর দুপুর আর উড়ন্ত বিকাল আর বিষণ্ন সন্ধ্যা,সব মিলে সেই রোজকার জাউভাত। ক্যানভাসার উঠেছে একটা,মনে হচ্ছে কিছু একটা ইংরেজি শেখার বই
বিক্রির ব্যাপার,হঠাৎ কান খাড়া করি,খট করে ক'টা লাইন বাজে--
"রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে,
প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে
কিন্তু বই অনন্তযৌবনা।"
বাপস,ক্যানভাসারের মুখে ওমর খৈয়াম। মন্দ না,অন্তত সারাদিনে ক'টা ভাল কথা শোনা গেল। আসলেই ঠিক কিসের জন্য জান নিয়ে দৌড়াচ্ছি কে জানে,সবকিছুর শেষ তো সেই ডাস্ট দাউ আর্ট,টু ডাস্ট রিটার্নেস্ট,ছাই থেকে ছাই,ধুলো থেকে ধুলো। খৈয়ামের আমলে কিসে বই লেখা হতো কে জানে,তবে পিডিএফ তো ছিল না,কাগজের বই তো সেই পোকাতেই কাটবে,ফাইলগুলোও কোনদইন হার্ডড্রাইভ ক্র্যাশ করে হাওয়া হবে,কে আর চিরযৌবনা?

মাথা মনে হয় একটু গরমই আছে,অনেকদিন বাসার বইগুলো নাড়াচাড়া করা হয়না,ফিরে গিয়ে ভাবের যত লেখা বাদ দিয়ে একটা থ্রিলার নিয়ে বসতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১:৪৭
৪৩টি মন্তব্য ৪৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×