somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দিনলিপি ১০: এক ঘণ্টার গল্প

০৩ রা জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ২:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"শালার বাঙ্গালির অনুষ্ঠানে যে সময়মত আসে সে একটা আস্ত আবাল।"
কান থেকে ফোন নামিয়ে বিড়বিড় করে যে গালিটা দিলাম,বলাই বাহুল্য,সেটা নিজেকেই। দাঁড়িয়ে আছি রাজারবাগে,হোটেল হোয়াইট হাউসের গেটের ঠিক বাইরে। শহীদী দরজার খোঁজ পাওয়া বন্ধুদের তালিকায় আরেকজন যোগ হচ্ছে,তার এনগেজমেন্টেই হুলস্থুল কারবার,একেবারে বিয়ের মত ধুমধাম,দাওয়াত পেয়ে খেতে চলে এসেছি। ফোন করে বলেছিল সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠান,আরো আধাঘণ্টা দেরি ধরে সাড়ে ৭টায় এসেছি। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে একটু ঘাবড়ে গেছি,লোকজন কম,কয়েকজন রাশভারি লোক আর আমার বয়সী কয়েকটা ছোকরা,সবাই স্যুটেড-বুটেড,মাঝ থেকে আমি একা সোয়েটার পরে বাচ্চা ছেলের মত দাঁড়িয়ে আছি,বেশ বেমানান। আজকাল মনে হয় বিয়ে হলেই স্যুট-ব্লেজার লাগানোর চল,আগের এক বন্ধুর বিয়েতেও সেরকমই দেখেছি,কিন্তু কেন যেন এই জিনিসটা আমার হজমই হয়না।

বাইরে থেকেই ফোন দিলাম--"দোস্ত তুমি কই?"
--"বাসায়"।
--"আমি তো বাইরে দাঁড়ায়া হোটেলের,তুই আসবি কখন?"
--"এই ধর সাড়ে আটটায়।"
--"খাইসে! আমি তাইলে এতক্ষণ কি করমু? চেনা কেউ আছে?"
--"নাই। আরে ভিতরে যা, মাইয়া-টাইয়া দেখ, টাইম যাইবগা।"
বউ-পোলাপান তুলে একটা গালি দিতে গিয়ে মুখ সামলে নিলাম, আজকে যার বিয়ে আর যাই হোক তাকে বউ তুলে গালি দেয়া যায় না। কিন্তু এখানে সং সেজে দাঁড়াবোই বা কতক্ষণ? বিরক্ত মুখে হাঁটা শুরু করি। আশপাশে কারো বাসা আছে? মাথার ভিতর খুঁজে সবচেয়ে কাছের বাসাটা পাই পল্টনে,নাহ,একঘণ্টায় ঘুরে আসা সম্ভব না। তারচেয়ে হাঁটি,আশপাশে চক্কর দিলেই একঘণ্টা চলে যাবে।

হাঁটা শুরু করে বুঝলাম একঘণ্টা পার করা অত সোজা না,বিশেষ করে হাতে যখন কাজ থাকে না। গদাইলস্করি চালে হাঁটা ধরেও দেখি ৭ মিনিটে শান্তিনগর মোড়ে পৌঁছে গেছি,৯ মিনিটের মাথায় কনকর্ড টুইন টাওয়ার। মার্কেট আমার দুই চোখের বিষ,গত ১২ বছরে ৬ বারও গেছি কিনা সন্দেহ,তাও ঢুকলাম,দেখা যাক ১০০ টাকা পকেটে নিয়ে উইন্ডো শপিং কেমন করি। ৫ মিনিটের মাথায় বুঝে গেলাম যার ধাতে যেটা সয়না সেটা করা ঠিকনা,মানুষ কেমনে যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শপিং করে! আজকে আবার মার্কেটও ফাঁকা,যে গলি ধরেই যাই চারপাশ থেকে মনে হয় দোকানদার আর দোকানের ডামিগুলো একসাথে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে,এই ডামিগুলোর সাথে কেন যেন কখনোই ঠিক অভ্যস্ত হতে পারিনি,সবসময় মনে হয় জীবন্ত কিছু।

এর মাঝেই ফোনটা টংটং করে বেজে ওঠে,কানে ঠেকাই।
--"কিরে বাসায়?"
--"না,মার্কেটে।"
--"করস কি?"
--"বাল ছিঁড়ি।"
--"ইস,তাইলে তো মিস করলি,আমরা তো বেইলি রোডে।"
--"আমিও কাছেই,দাঁড়া আসি।"
--"আইসা লাভ নাই এখন,আমরা নাটক দেখি, মহিলা সমিতিতে, ভিতরে আছি।"
--"সম্বুন্ধীর পোলা আগে ফোন দিলি না ক্যান?"
--"দিলে কি,তুই তো দিলেই কস বাসায় ঝিমাই।"
--"দাঁড়া আসি,তোরা নাটক শেষ কইরা বাইর হ,কতক্ষণ লাগবো?"
--"লাগবো আধাঘণ্টার বেশি।"

আরো আধাঘণ্টা? দমে যাই,তারপরেও মার্কেটের চেয়ে বেইলি রোড ভালো,সিদ্ধান্ত নিয়ে বের হয়ে আসি। আবারো অলস পায়ে হাঁটা,৩০ মিনিট কাটাতে হবে। আজকে ঘড়ি আস্তে চলে নাকি আমার হাঁটার গতি বেড়ে গেছে কে জানে,এত তাড়াতাড়ি চলে এলাম কিভাবে? সামনের দিকে হাঁটা ধরি,সারি সারি রঙিন দোকান,পালে পালে রঙচঙে মানুষ। উজ্ঝ্বল তরুণ,উচ্ছল তরুণী,অহেতুক মেকআপের মাঝবয়সী আন্টি আর সাথে কাঁচুমাচু মুখের টাকলু আংকেল,খামোকাই অ্যাঙরি ইয়াংম্যানের ভাব ধরতে চাওয়া মোটরসাইকেল আরোহীরা,কুটকুট পায়ে হেঁটে যাওয়া বাচ্চাগুলো,উদ্ভট স্টাইলিশ ডিজুস কিশোর আর তারচেয়েও আজব গেটআপের হাইহিল মেয়েগুলো,সব ছুটে চলেছে গাড়ির প্যাঁপোঁ,মোটরসাইকেলের হর্ণ আর আলোর বন্যার সাথে পাল্লা দিয়ে। সুইস আর পিঠাঘর আর গোল্ডেন ফুড আর সাব-জিরোতে জীবনের রঙ জিভে চেখে নেয়ার জন্য জড়ো হয়েছে আনন্দপিয়াসী ঢাকাবাসী।

হাঁটতে হাঁটতে আড্ডা দেখি,রাস্তার ওপারে বেশি,ফুটপাথে দাঁড়িয়ে-বসে ২ জন ৪ জন ৮ জনের একেকটা দল। আহা,আমাদেরো সময় ছিল,সবাই এখন কোথায়? মহিলা সমিতির সামনে ভিড় কম,আড্ডা রাস্তার উল্টোদিকে,ফুচকা আর চায়ের জন্য। এক কাপ খাবো নাকি ভাবি,কিন্তু একা দাঁড়িয়ে ভাল লাগে না,পোলাপান বের হোক,সিদ্ধান্ত নিয়ে উল্টো ঘুরি। সী মোরগের প্রদর্শনী হচ্ছে,এই ফাঁকে পোস্টারটা দেখে নিই,বাইরে রিসেপশনে কড়া মেকআপ মেরে খুব সম্ভব নাট্যদলেরই কোন মহিলা বসে আছেন,মন্ঞ্চনাটকের প্রদর্শনীতে এমন সং সেজে বাইরে বসার কি দরকার কে জানে, ক'টা আড্ডায় মশগুল পোলাপান ছাড়া দেখার তো কেউ নেই!

আবার হেঁটে ভিড় ঠেলে মোড়ে যাবার চেষ্টা করি,ভিড় আরো বেড়েছে খাবারের দোকানগুলোতে,মানুষের খিদে কি পয়সার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে নাকি? বাঙ্গালির নাকি পয়সা নেই,এত দাম এসব দোকানে,কোনটাতেই তো ভিড়ের জন্য পা ফেলা যায় না,টাকা ঝাড়ার জন্য লাইন দিয়ে সব দোকানের বাইরে অপেক্ষা করছে। যাকগে,জাতির চিন্তা করে লাভ নেই,মাত্র ৮টা ১০ বাজে,এখনো ১৫ মিনিট কাটাতে হবে। খানিক দাঁড়িয়ে থাকি,কিন্তু দোকানের বাইরে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন হ্যাংলা টাইপ লাগে,সরে পড়ি। মোড় পর্যন্ত গিয়ে মর্নিং ওয়াক স্টাইলে আবারো ফিরে আসি মহিলা সমিতির সামনে,দাঁড়িয়ে থাকি বাকি সময়। পোস্টারটা আবার মনোযোগ দিয়ে দেখি,লেখাগুলো মুখস্ত করি,উল্টোদিকের আড্ডা দেখি,এদিকের জুটিটাকেও দেখি,এমনকি রং করা মহিলাটাকেও দেখি। সময় কাটে না,কাটেই না। আরো দু'বার রাস্তা এপার-ওপার করতে করতে হঠাৎ ঘণ্টা বাজে। শিল্পপ্রেমীরা বেজার হতে পারেন কিন্তু নাটক শেষ হবার ঘণ্টা শুনে খুবই আনন্দিত হয়ে উঠি,শিল্পটা ব্যাটারা আরেকটু কম সময় ধরে করলেও তো পারতো।

বন্ধুরা বের হয়ে এলে পুরনো মুখগুলো দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠি,খামোকাই অর্থহীন পিঠ থাবড়াই,গালি দেই,কোলাকুলি করি। পিঁয়াজু সিঙ্গারা সমুচা আর সাথে রাসেল মনির রুকন, কুয়াশা ধোঁয়াশা বেইলি রোডের ধোঁয়া ওঠা চায়ে আমাদের ভেতরের উষ্ণতা মিশে যায় গল্পের স্রোতে। ফুটপাথ ধরে হাঁটি,দাঁড়াই,আবার হাঁটি। সেই পুরানো আলাপ,চাকরি পড়াশোনা প্রেম রাজনীতি,অথচ প্রতিদিন নতুন। ব্যবসায় নাকি মন্দা রুকনের,চাকরি আরেকটা খুঁজছে রাসেল,মনির সারাদেশে ট্যুর দিয়ে বেড়াচ্ছে কোম্পানির খরচে,আমি ৩ নম্বর চাকরি ছাড়ার ধান্দায়। ২ দিনের ছুটিতে বিরিশিরি গেলে কেমন হয়? কেডা কেডা বিয়া করলো রে? গবুর নাকি আজকে ১২টায় ফ্লাইট? মতি তো কানাডা গেলোগা। টুকটাক হইচই,সময় গড়িয়ে যায়। বিয়াতে যাবি না? পরে কিন্তু মুরগীর হাড্ডি কামড়ানি লাগবো। আরে যামুনে,ঐখানে তো খালি স্যুট আর গয়না,তারচেয়ে খানিক হাওয়া খায়া যাই। তাতে কি? সুন্দরী আছে না কত? দূর,বয়স নাই ঐসবের,জান বাঁচায়া কুল পাই না,হাহ! তবুও যাবার সময় হয়,বিদায় নিয়ে হাঁটা ধরি। সাব-জিরোর সামনে চোখ আটকে যায় ধুলোমাখা কতগুলো অপূর্ব মুখে,নাকি তাদের বড় বড় চোখে,অথবা হাতের রঙিন বেলুন গুলোতে? কাচের দেয়ালের এপাশ-ওপাশ,যে দেয়ালের ওপাশের জগতে কোনদিন হয়তো ঢোকা হবেনা তাদের,শুধু ওপাশ থেকে বেরিয়ে আসা ছোট্ট পায়ে হাঁটা বার্গার আর কোকের বায়না করা কারো হাতে বেলুন তুলে দিয়ে আজ রাতের ফেনাভাত জুটবে তাদের। অদ্ভুত সুন্দর মুখটা,একটু ধুয়ে নিলেই হতো,আর চুলগুলো একটু আঁচড়ে দিলে,জামাটা ছেঁড়া হলেই বা কি? হাসছে,ছুটছে,গাড়ি থেকে গাড়িতে,কিভাবে আসে এত হাসি? জীবনের দিকে আমাদের এত অভিযোগ না পাওয়ার,কিসের জোরে ওরা এত হাসে?কি বড় বড় চোখ,যেখানে অভিযোগ থাকতেই পারতো আমাদের দিকে বা বিধাতার দিকে,কিন্তু সামান্য বিস্ময় ছাড়া কিছু আছে বলে মনে হয়না। আমাদের আনন্দের হাটে একদল স্বর্গচ্যূত দেবদূত,কুয়াশাঘেরা কাচের দেয়ালের বাইরে বসেও রঙিন হাসি তাদেরি মানায়।

ক্যামেরাটা পকেট থেকে বের করতে গিয়েও থেমে যাই,আমার মত যেসব স্বার্থপর ওদের নিয়ে দু'কলম লিখে বাহবা কুড়াতে চায়,দেবশিশুর বিস্মিত মুখ ফ্রেমবন্দী করার অধিকার তাদের নেই।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১:৪৪
৫১টি মন্তব্য ৫২টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×