[গুরুজীর জন্মদিনে কিছু লেখা দরকার ছিল,কিন্তু দৌড়ের উপর আছি,আর মেগাসিরিয়াল কায়দায় সেটে বসে স্ক্রিপ্ট নামিয়ে দিতে ইচ্ছা করলো না এক্ষেত্রে,তাই অনেক আগের একটা লেখা দিয়ে দিলাম। উৎসর্গঃ সকল রবীন্দ্রপ্রেমী বা অপ্রেমীদের,যারা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় বুড়োর বলয় থেকে বের হতে পারেননি]
খুব ক্ষুদ্র হাতে মাঝে মাঝে খুব বড় দুঃসাহস করে ফেলি,দুর্যোধনের মতই। করেই ভাবি,কাজটা কি ঠিক হলো? তারপর বলি,ঠিকই আছে,বেঁচে থাকাটাই একটা দুঃসাহসিক ব্যাপার। সেরকম ১টা দুঃসাহস করে ফেললাম এবারো,হাতমুখ ধুতে গিয়ে গুনগুন করে ফেললাম রবীন্দ্রসঙ্গীতের দু'টো কলি,আর ভেবে বসলাম,এবার এই বুড়োকে নিয়েই লিখে ফেলবো দু'কলম। বুড়ো জানলে নিশ্চিতই খুশি হতেন না,তবে কিনা,তার "ওরে নবীন,ওরে আমার কাঁচা" রা ডাণ্ডা হাতে সবসময়ই ঘুরঘুর করছে,আধমরাদের ঘা মেরে বাঁচাতে না পারুক,অন্তত ঘা দু'একটা মারতেই হবে কারো না কারো মাথায়, দরকারে বুড়ো ঠাকুরের মাথায়
হলেও। কাজেই,গুরুদেবের সাহস,শুরু করেই দিই বরং। তবে,তার আগেই,"মিঞা কি তোড়ী" গাইবার আগে ছোটখাট গাইয়েরা যেমন কান মুলে নেন,আমিও নিজের নাক কান মুলে নিলাম,গুরুদেবের তরী বাইবার অপরাধে তিনি বা তাঁর চ্যালারা যেন আমার নাকটা কেটে না নেন।
গুরুদেবের সাথে আমার প্রথম পরিচয়টা যে খুব আনন্দদায়ক, সেটা বলা যাবে না। বাবার ছিল বুড়োর গানের দিকে নেশা, নিজে বসে দোকান থেকে রেকর্ড করিয়ে আনত গাদা গাদা গান, আর সেই ঘ্যানঘ্যানে গানে আমার ধরত মাথা,এ জিনিস মানুষ শোনে কিভাবে? চিন্ময়ের গলা শুনলে তখন আমার কানে ঝিঁঝিঁ করে আর সাগর সেনের কণ্ঠ শুনলে মনে হয় পুকুরে ঝাঁপ দিই। কিন্তু কোথাও যেন একটা সর্বগ্রাসী টান আছে,আস্তে আস্তে মাথার ভেতর বাজতে থাকে,"তোমার হল শুরু, আমার হল সারা।" বাস্তবিকও সেরকমই,সাধের একমাত্র ক্যাসেট প্লেয়ারটা চুরি হয়ে যাওয়াতে বাবার মাঝ থেকে বুড়ো শখ থাকলেও সাধ্যের অভাবে একটু একটু করে সারা হলেন,কিন্তু কোথা থেকে যেন শিশুর মাঝে উঁকি দিতে শুরু করে দিলেন। নইলে স্কুলের কবিতা মুখস্থ আর তার টীকা-টীপ্পনির
পোস্টমর্টেমের মাঝেও ক্লাসের বাইরে বৃষ্টি দেখে কেনই বা তার মনে পড়বে--"কালিমাখা মেঘে ওপারে আঁধার ঘনিয়েছে দেখ চাহিরে,
ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।"
তা ইস্কুলের স্যাররা বেরসিক বটে,আমার রবীন্দ্রনাথগিরি ছুটিয়ে দিতেন কানে দু"টো মোক্ষম টান দিয়েই। তখন মনে হত,বীরপুরুষ হলে মন্দ হত
না,ডাকাতদল ঠেঙাতে না পারি,স্যারগুলোকে তো তাড়া করা যাবে। অবশ্য,তখনো যে গুরুভক্ত তেমন নয়,ঐটুকু ছেলের হবার কথাও না,কিন্তু পদে পদেই তিনি এসে বাগড়া বাঁধান যে! তাঁকে বাদ দিয়ে কি-ই বা পড়ি,কি-ই বা ভাবি? বছরের বারো মাসই যে বুড়ো ঘাড়ে চেপে আছেন! বৈশাখে চলে এলেন এসো হে বৈশাখ গলায় নিয়ে,আর বর্ষামঙ্গলে শুধুই কেন যে মনে বাজে আজি ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে,জানি নে,জানি নে,কিছুতে কেন যে মন লাগেনা! অবশ্য একটু বড় হয়েই বুঝেছি, এমনো দিনে তারে বলা যায়,এমনো ঘনঘোর বরিষায়,এমন দিনে মন খোলা যায়। যদিও মন খোলার আর সুযোগ হয়নি,আমার মত বাধ্য হয়ে একাদের জন্যই বুঝি গুরু তার চিরকুমার সভাও খোলা রেখে গেছেন শরতের মেঘে যেমন তাঁর গান,শীতের হাওয়ায় আমলকির ঐ ডালে ডালেও তাঁরই সুর,বসন্তেও শুধু তাঁর রঙেই মন রাঙিয়ে বলতে হয়,আহা আজি এ বসন্তে,কত ফুল ফোটে,কত বাঁশি বাজে।
যাকগে যাক,রবিবাবুর ঋতুপ্রেম কি গানের ফিরিস্তি দিতে বসিনি, বরং ভাবছিলাম বুড়োকে ফাঁকি দিয়ে কোথাও সরে পড়া যায় কিনা। সে গুড়ে বালি,পছন্দ কর আর না-ই কর,যে পথে তিনি গেছেন সে পথ একেবারে বাদ দিয়ে যাওয়া বড় কঠিন,অন্তত এই স্বল্পজ্ঞানী বালকের জন্য তো অসম্ভবই হয়ে দাঁড়ায়। কি করেই বা পালাই? সকাল থেকে দুপুর,সন্ধ্যা থেকে রাত,কোথাও না কোথাও ছায়াটা দেখাই যায়। সক্কালবেলা ঘরের পুবমুখী জানালা দিয়ে ভোরের কিরণে দেখি নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, তো রাতের জোছনায় চাঁদের হাসির বাঁধ ভাঙতে দেখি কংক্রিটের এই জঞ্জালের শহরে বসেও।পাশের বাসার বকবকবকবক করা দুরন্ত শিশুটাকে দেখে কেন
জানি শুধু কাবুলিওয়ালা আর মিনির কথাই মনে পড়ে,অথবা বিষন্ন কোন তরুনী মায়াবী মুখে পড়ে হৈমন্তীর শিশির। কর্পোরেট বাজারেও গুরুদেব আজকাল বেশ জাঁকিয়ে বসেছেন,গ্রামীনের বিজ্ঞাপনের ভেলকিতে চোখ না ধাঁধালেও একবারটি হলেও বলতে তো ইচ্ছে করেই--
"আয় আরেকটিবার আয়রে সখা,প্রাণের মাঝে আয়,
মোরা সুখের দুখের কথা কবো,প্রাণ জুড়াবে তায়।"
আজকাল আবার চলে এসেছে রিমিক্সের যুগ,পুরানো গানে ধুম তা না মিউজিক আর লিরিক লাগিয়ে চলছে বাজার পাবার ধুম। এত বড় যজ্ঞে তিনি রেহাই পাবেন,সে আশা করা যায়না,সবকিছু নিয়েই যিনি লিখে গেছেন,তাঁকে একদম উপেক্ষা করা যায়ও না,কাজেই অন্য অনুষঙ্গে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথকেও। পাঁড় রবীন্দ্রগোঁড়ারা অবশ্য দাবী তুলেছেন যে তিনি বেঁচে থাকলে ব্যাপারটা কখনোই পছন্দ করতেন না আর এ বাবদে বেশ কিছু উক্তি-প্রমাণও হাজির করে ফেলেছেন,মাকসুদ তো সেই এক "না চাহিলে যারে পাওয়া যায়" টান দিয়ে না চাইতেই নিষিদ্ধ হয়ে গেছিলেন অনেকখানে,কিন্তু গুরু যখন সবখানেই হেঁটেছেন,সাধারণে তাঁকে ছুঁতে চাইবেই,ভাগ্য যে,সেগুলো নিয়ে খুব বেশি তেলেসমাতি হয়নি,বরং এই নাদানের অনভিজ্ঞ কানে মূল সুরে একটু নতুন যন্ত্রানুষঙ্গে সেগুলো খারাপ লাগেনি,শুদ্ধবাদীদের কথা জানিনা।
কই থেকে আবার কই চলে গেলাম! অবশ্য,কতদিকেই যাবো? তাবড় তাবড় বিশেষজ্ঞ যেখানে বছর বছর ধরে মোটা মোটা থিসিস করেই বুড়োর নারীনক্ষত্র ঘেঁটে শেষ করতে পারলেন না, আমি তো কোন ছার! তবে এটুকু তো জানি,ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যাওয়া লাগেনা,মনের ভেতরে গহীনে কোথাও থানা গেড়ে বসেছে কবির গান,কবির কাব্য,কবির গপ্পো। লোডশেডিংয়ের মাঝে ঘামতে ঘামতেও তাই কখনো বারান্দায় বসে যখন গেয়ে উঠি--"যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে,জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরে",তখন কি না দেখা কোন যুবকের বিরহ কি একটু হলেও ছুঁয়ে যায়না আমাকেও? খুব আনমনে যখন বসে থাকি চুপচাপ গালে হাত,তখনো কি বিড়বিড় করে উঠি না একবারো--গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা,কুলে একা বসে আছি নাহি ভরসা? আপন হৃদয় গহন দ্বারে তো আমিও কান পেতে রই কারো ডাক শোনার জন্য,ডাক না পেলে অভিমান করে বলিও তো, ডাকবো না ডাকবোনা,এমন করে বাইরে থেকে ডাকবো না, পারি যদি,অন্তরে তার ডাক পাঠাবো আনবো ডেকে,না না না! আচ্ছা,এখনো কি কেউ তাঁর প্রেয়সীকে লেখে না, ভালবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি রেখো তোমার মনের মন্দিরে? আমি কিন্তু এখনো মাঝে মাঝে ধিতাং ধিতাং বোলে খুশিতে নেচে উঠি,ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির গান গাই গুনগুনিয়ে,আর গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথে হেঁটে যেতে গিয়ে দেশের মাটিতে মাথা ঠেকাই। এই তো,লেখাটা যখন লিখছি,বাইরে বিদ্যুৎ চমক,একটু যেন বৃষ্টির আভাস,এসো তবে সবাই নীপবনে,ছায়াবীথি তলে এসো কর স্নান,নবধারা জলে।
লিখতে লিখতে লম্বা করে ফেলছি,হয়তো বিরক্তিরও কারণ হচ্ছি,কেউ হয়তো ভুরু কুঁচকে বলছেন,ডেঁপো ছোকড়াটা শুরু করলো কি,রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এসবই তো আমরা জানি,সেই কবে থেকেই তো শুনে আসছি,দেখে আসছি,বলেও আসছি। ঠিক তাই,একদম তাই,একদম ভেতরে চলে গেছেন যে দাড়িওয়ালা বুড়োটা। কাকে যেন একবার বলতে শুনেছিলাম,খুব ভাল লেখকরা এমনভাবেই লিখবেন যে আপনি একবার পড়েই বুঝে যাবেন,এ নকল করা আমার সাধ্য নয়,আর শ্রেষ্ঠ লেখক এমনভাবেই লিখবেন,পড়লে মনে হবে,এ আর এমন কি,আমিও দু'কলম পারবো চাইলেই,কিন্তু সমস্যাটা দাঁড়ায়,এক কলম লিখেই বোঝা
যায়,নাহ্,একদম ভেতরে চলে গেছে,অথচ কিছুতেই অমন লেখা হচ্ছে না, কিছুতেই হবেও না। আমার ভেতরে ঢুকে আমারি কথা বলে দিলেন
কেউ,অথচ,আমিই কিন্তু জানি না। এই তো গুরুদেব, অন্তর্যামী হয়তো নয়,কিন্তু অন্তরের পাঠক তো বটেই। গুরুদেবের খাস শিষ্য মুজতবা আলীর একটা লেখা মনে পড়ছে. বনেবাদারে ঘুরে নিজের কোমড়ে ঝোলানো বাঁশির ভুতুড়ে আওয়াজে যখন মূর্ছাপ্রায় অবস্থা,এসময় শান্তিনিকেতনের বারান্দায় বসা সৌম্যকান্তি রবিগুরুর অবয়ব দেখে মহা স্বস্তিতে বলে উঠেছিলেন--"ওয়া গুরুজী কি ফতে"। হুম,নিজের লেখার কাষ্ঠল গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে অর্বাচীন এই বালক যখন দিশেহারা,তখন মাঝে মাঝেই গুরুদেবের সৌম্যকান্তি কাব্য দেখে সেই বালকও বলে ওঠে--"ওয়াহ,ওয়া গুরুজী কি ফতে"।
[পুনশ্চঃ কোন এক শাখামৃগ আমার অতি প্রিয় "গল্পগুচ্ছ" টা ধার নিয়ে স্থায়ীভাবে হাতসাফাই করে ফেলেছে,কারো কাছে "গল্পগুচ্ছ" থাকলে আওয়াজ দেবেন দয়া করে, আমিও সেটা হাতসাফাই করে দেবার ইচ্ছা রাখি]
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০০৯ ভোর ৫:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


