[উৎসর্গ: তানভীর ইকবাল আর তার বন্ধুদের, পাথর সময়ের মাঝে যারা আমাদের আবেগকে খুঁজেছে]
তানভীরের সাথে আমার পরিচয় ২০০৬ সালের কোন এক সময়ে। তখন ইন্টারনেট জিনিসটা পুরানো হলেও নেশা কাটেনি,সারারাত এমআইআরসি তে বসে থাকি আর বুয়েট রুমে বসে রাজা-উজির মারি।
তো সেই চ্যাট রুমে তার সাথে কথা। জানলাম,২০০৫ ব্যাচ,আমার ৩ বছরের জুনিয়র।এসে সালাম দেয়,ভাব নিয়ে সালামের উত্তর দিই,টুকটাক কথা বলি। কিছুদিন গেলে জানা গেল, এই ছেলে আদর্শ ভাল ছেলে,প্রথম টার্মেই ব্যাপক ভাল জিপিএ পেয়ে
ভয় ধরিয়ে দিল। সে তুলনায় ভাব কম,যেখানে জুনিয়র সিনিয়র কেন,ব্যাচমেটরাও পারতে আমাকে পাত্তা দিতে চায় না,সেখানে সামনে দেখলেই এগিয়ে এসে সালাম দেয়,এটা-ওটা জিজ্ঞেস
করে,আমি মহাখুশি,পাত্তা পেলে কে না খুশি হয়? মুরুব্বিয়ানা দেখিয়ে পড়াশোনা নিয়ে উপদেশ দেয়ার চেষ্টা করি( যদিও প্রশ্ন না করাই ভাল এমন আদর্শ ছাত্রকে আমার মত ফেল্টুস কি উপদেশ
দেয়),সে-ও বেশ ভদ্রভাবে শুনে যায় সব,মনে মনে কি ভাবে,জানি না,আর যা-ই ভাবুক,মুখে সেটা প্রকাশ করার বান্দা সে নয়।
সময় গড়ানোর সাথে সাথে সবাই বড় হয়ে যাই,বুয়েট থেকে চলেও আসি একদিন। বের হবার পরে বুঝতে পারি দুনিয়াটা কত কঠিন,কাজেই জুনিয়রদের সাথে দেখা হলেই বাইরের দুনিয়া নিয়ে উপদেশের
মাত্রাও বেড়ে চলে,তানভীরের ব্যাপারেও সেটা ব্যতিক্রম না। তার ভাল সিজিপিএকে সে কতভাবে কাজে লাগাতে পারে তা নিয়ে লম্বা লম্বা উপদেশ দিই দেখা হলেই,এবং বরাবরের মতই ভদ্র ছেলে হয়ে অসীম ধৈর্য্যের সাথে সেটা শুনে যায়।
এহেন আদর্শ ছাত্র একদিন আমাকে জানালো,সিভিল এন্ঞ্জিনিয়ারিং পড়তে তার আর ভালো লাগছে না, পড়াশোনা কমিয়ে সে এখন অন্যান্য কাজে মন দেবে। এমবিএ করবে,পেশাও বদলে ফেলবে। নমুনা হিসেবে হাতে কৃত্রিম উল্কি এঁকে ফেললো,দেখে মনে হয় গায়ে শুঁয়োপোকা বসে আছে,আর তার সাথে মানানসই ভূতুড়ে কন্টাক্ট লেন্স,ধূসর রঙের সেই লেন্স দেখলে গা কেমন শিরশির করে। গত টার্মে সিজিপিএ কমিয়ে জানান দিলো যে সে কথা রাখছে। তারপর একদিন দেখা হতে জানালো,সে এবার সিভিল ফেস্টিভ্যালে প্রচুর কাজকর্ম করছে,সাথে একটা ফিল্মও বানাবে। মোটামুটি ১৮০ ডিগ্রি উল্টো কাজকর্ম,যথেষ্টই বিরক্ত হলাম, এবং এভাবে নিজের পড়াশোনা নষ্ট করে এসব করার কি মানে,আমার মোটা মাথায় ঢুকলো না। ব্যক্তি অধিকারের সীমালংঘন করে বেশ কিছু উপদেশও বিনা পয়সায় দান করলাম,এবং করতেই থাকলাম। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে,দেখা হলে আগের মতই এগিয়ে এসে সালাম-আদাব দিলেও পড়াশোনার কথা তুললেই সে ভেগে যেত।
তো,সেদিন হঠাৎ করে তানভীরের ফোন। ব্যাপার কি? না,তাদের ফিল্মের কাজ শুরু হয়েছে,শ্যুটিং হচ্ছে,একদিন গিয়ে দেখে আসবো নাকি। এইবেলা ফিল্মের ব্যাপারটা বলে রাখি,গত ৭-৮ বছর ধরে বুয়েটে একটা ব্যাপার চালু হয়েছে,লেভেল কম্প্লিশান,র্যাগ বা কোন উৎসবে সিনিয়র ধরনের ব্যাচগুলো একটা করে ফিল্ম বানানোর চেষ্টা করে। সেগুলো ফিল্ম হয় কিনা বলা মুশকিল,কিন্তু আনন্দ ফূর্তিই যেখানে মূল উদ্দেশ্য সেখানে সেটা নিয়ে কে মাথা ঘামায়? টিপিক্যাল বুয়েট জীবন নিয়ে বানানো গতানুগতিক কাহিনীর ৪০-৪৫ মিনিটের না নাটক না টেলিফিল্ম গোছের কিছু,কাহিনী অভিনয় যা খুশি হোক, আমরা মজা পাই,কাজেই উদ্দেশ্য সফল বলা চলে। ফিল্ম মেকার বা অভিনেতা হওয়া কারো উদ্দেশ্য না,ছেলেমেয়েরাও মজা করার জন্যই বানায়,আগে হ্যান্ডিক্যাম দিয়েই কাজ চলতো,এখন স্পন্সর পেলে ম্যুভি ক্যামেরাও ভাড়া করে কাজ করা হয়।
তানভীরের ফোন পেয়ে জানলাম,তারাও ভাল স্পন্সর পেয়েছে,কাজেই ভাল ক্যামেরা আর যন্ত্রপাতি ভাড়া করে ২ দিনে শ্যুটিংয়ের কাজ শেষ করবে। আমার পরীক্ষা চলে,একবার ভাবলাম,মানা করে দিই,কিন্তু আগেই বলেছি,পাত্তা পেলে কার না ভালো লাগে,কাজেই বলে দিলাম, যাবো শ্যুটিং দেখতে,ঘোরাও হবে,পরীক্ষার চাপটাও একটু কমবে।
সময়মত চলে গেলাম যে বাসায় শ্যুটিং হচ্ছে সেখানে,বেশ উৎসাহ নিয়ে কাজ করছে ছেলেমেয়েরা। সেখানেই জানলাম,এবারের কাহিনী অন্যদের চেয়ে আলাদা,বিষয় মুক্তিযু্দ্ধ নিয়ে আজকালকার কিছু
ছেলেমেয়ের কাজকর্ম। বাসায় বেশি কিছু হচ্ছে না,টুকটাক কাজ,দেখে,আড্ডা দিয়ে এবং আবারো যথেষ্ট পরিমাণ পড়াশোনা বিষয়ক উপদেশ দিয়ে,এবং এসব ফিল্ম নিয়ে বেশি সময় নষ্ট না করার পরামর্শ দিয়ে(বেচারা তানভীর!) ফুরফুরে মেজাজে বাসায় ফিরলাম,এবং তারপর পরীক্ষার দৌড়ে যথারীতি সেটার কথা ভুলেও গেলাম।
গতকাল পরীক্ষা শেষ হলো,শেষ পরীক্ষায় বাঁশ খেয়ে মেজাজ চরম খারাপ,এমন সময় আবারো তানভীরের ফোন। এবারের বিষয়,আজকে ফিল্মের প্রিমিয়ার,বুয়েট অডিটরিয়ামে, বেলা ১২টায়, দেখতে কি যাবো? আবারো ছোকরার ভ্দ্রতায় আমি মুগ্ধ,বলে দিলাম, অবশ্যই যাবো,এই ফাঁকে পুরানো জায়গাটাও ঘোরা হবে।
তানভীর মনে হয় আমার স্বভাব জানে সবখানে দেরি করে যাওয়ার, গিয়ে শুনি,ফিল্ম আসলে ১টায়। এসি'র বাতাস খাওয়া তো যাবে,ফিল্ম যাই হোক,ভেবে বসলাম দেখতে।ফিল্মের নাম "স্ম্মৃতিফলক"।শুরুটা টিপিক্যাল,এক দঙ্গল নতুন বুয়েটে আসা ছেলেমেয়ের কাজকর্ম,দেখে অন্যবারের মতই মজা পাচ্ছিলাম,হালকা চালে। তানভীর নিজে অভিনয় করেছে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী হবু প্রকৌশলীর চরিত্রে,দেশ নিয়ে যার ধারণা হলো এখানে কিছুই হবে না এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে ভেগে যেতে হবে(আমিও সেই উপদেশই তাকে দিয়ে এসেছি সর্বদা)। যে বালিকাকে সে পছন্দ করে (ফিল্মে,বাস্তবে জানি না),সে আবার উল্টো,যথেষ্টই দেশজাতি সচেতন,আর বাকি বন্ধুদের মাঝে কেউ আঁতেল,কেউ টিউশনিবাজ,একজনের ছবি আঁকার শখ,আরেকজনের গেম খেলার, চারপাশের চরিত্র,সব মিলে ৬ জন।
এ পর্যন্ত ফিল্মটা হালকাই ছিল,কাহিনী ঘুরতে শুরু করলো যখন তানভীর নামের ছেলেটি একটা আপেল খেয়ে সেটা ছুঁড়ে ফেলে ক্যাফেটেরিয়ার সামনে শহীদদের স্মৃতি ফলকের উপর,এবং তার ক্লাসমেট দৃশার তীব্র আপত্তির মুখে সেটা কুড়িয়ে আনতে বাধ্য হয়। তখনি সে, এবং বাকি বন্ধুরাও,প্রথমবারের মত দৃশার মাধ্যমে জানতে পারে এখানে যে ফলকটা রয়েছে সেটা একটা স্মৃতিফলক, এবং সেখানে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুয়েটের ছাত্রদের নাম খোদাই করা রয়েছে। ব্যাপারটা জেনেও তানভীরের ভাবান্তর হয় না তেমন,কত মানুষই মারা যায়,সেই ৩৮ বছর আগে কে মারা গেল তা নিয়ে কি
যায়-আসে? শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক,বিভক্তি আর দ্বিধা বাড়ে,এবং এমন ধারণাও কেউ কেউ পোষণ করে যে রাজাকাররাই বেশ ভাল আছে,কবরের ফলকে নাম লেখানোর বদলে গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে দেশ-জাতির কাছে তারা বেশ মাথা উঁচু করেই আছে।
কিন্তু তর্কের ফলাফল হিসেবেই যা দাঁড়ায়,তারা সিদ্ধান্ত নেয় ১৯৭১ নিয়ে কিছু কাজ করার। দলে পড়ে তানভীরও কিছুটা দোনোমনো করে রাজি হয়,তবে বিশেষ একটা গা লাগায় না। এ পর্যায়ে তারা শুরু করে গবেষণা,বুয়েটের শহীদদের একটা তালিকা খুঁজে বের করার। সম্ভবত,ফিল্মের এ অংশটাই সবচেয়ে বেশি কঠিন,এবং আবেগাক্রান্ত করে ফেলে,যখন দেখি,আমাদের চোখের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিটি হলের সামনের স্মৃতিফলকে লেখা নামগুলো কি অবহেলাভরেই না আমরা বুয়েটে থাকার ৫টা বছর এড়িয়ে গেছি। অনেকটা সেই ৩৮-বছর-আগে-মৃত-ব্যক্তি-নিয়ে-মাথা-ঘামানোর-সময়-কোথায় ভেবেই হয়তো। যথেষ্ট পরিশ্রম করে এই ছেলেমেয়েরা তুলে এনেছে বুয়েটের প্রতিটি হলের এবং অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে থাকা প্রত্যকটি নাম,যাদের আমরা ভুলে গিয়েছি, এবং ভুলে থেকেছি অনেকগুলো বছর। প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত পড়ুয়া একেকজন স্বপ্নবান হবু প্রকৌশলী,দেশের স্বপ্নে যারা বিসর্জন দিয়েছিল তাদের নিজেদের স্বপ্ন। বাদ যায়নি বুয়েটের শহীদ শিক্ষক আর কর্মচারীদের নামও। কেউ কি জানতাম,শহীদ স্মৃতি পাঠাগার আসলে বুয়েটের ছাত্র শহীদুজ্জামানের নামে? মুফতি মুহাম্মদ কাসেদের নামও দেখেছি কোন একটা ফলকে,কিন্তু জানা ছিল না এই শহীদ ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দাবা চ্যাম্পিয়ন। ভুলে গিয়েছিলাম আনোয়ারুল আজিমের নাম,খেয়াল করেও দেখিনি রশীদ হলের পাশ ঘেঁষে যাওয়া শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর। পরম মমতায় তুলে আনা নামগুলো যখন কালো পর্দায় ফুটে উঠেছিল,২ বছর পরে প্রথম চোখের পানি মুছেছি,আর মাথা উঁচু করে ভেবেছি,কত বড় গৌরবের উত্তরাধিকার ধারণ করে আছি আমরা।
আর বেশি টানার কিছু নেই,এসব নাম আর স্মৃতিফলকের ভিরে ঘুরতে ঘুরতেই বিবর্তন ঘটতে থাকে ছেলেমেয়েগুলোর,বিবর্তন ঘটে তানভীরেরও। চেয়ে আনে সে মুলধারা '৭১,আঁতেলের পড়ার টেবিলে
মেকানিক্সের বইয়ের পাশে স্থান পায় একাত্তরের দিনগুলি আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস,চিত্রকরের পেন্সিলে উঠে আসে স্বাধীন বাংলার পতাকা,গেমপাগলের ঘরে মাসলম্যান হিরোর বদলে ওঠে বাংলাদেশে
মানচিত্র। সব মিলে,নতুন যাত্রা,হ্যাপি এন্ডিংও বলা চলে,অন্তত তানভীর আর দৃশার জুটির মাধ্যমে সেটা বোঝানোরও একটা চেষ্টা দেখা যায়।
এত লম্বাচওড়া কথাবার্তায় ম্যুভিটা আসলেই ম্যুভি বা নাটক হয়ে উঠলো কিনা সেটা একবারও বলিনি,ভাবিওনি,কারণ আসলে সেটার কোন গুরুত্ব নেই। টেকনিক্যালি ভাল,তবে সেটা নাটক বা ম্যুভির ভাষা মেনে চলেছে কিনা সেটা দেখার মত বোদ্ধা হবার মানসিকতা হয়নি। অভিনয় যারা করেছে,তাদের কারোরই অভিনয় করে নাম করার খায়েশ সম্ভবত নেই,এ জিনিস বাইরে কোথাও দেখানো হবে
কিনা তাও জানি না,হলেও,বুয়েটভিত্তিক জিনিসপত্র বেশি বলে সবাই সেটা উপভোগ করবে কিনা,তাও জানি না। কিন্তু আমি নিশ্চিতভাবেই জানি,আমাকে খুব বেশি স্পর্শ করে গেছে পাথর হৃদয় বলে
পরিচিত বুয়েটের একদল ছেলেমেয়ের উদ্যোগ,আর উপলব্ধি। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো খুব একটা সোজা কাজ না,তারপর আবার প্রচলিত বিনোদনের ধারা বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের
অবহেলায় পড়ে থাকা নামগুলো জড়ো করে আমাদের অন্ধ চোখ আর মনের সামনে তুলে ধরার যে কঠিন কাজ,সেটার জন্য ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা জানালে তানভীর আর তার বন্ধু রাকিব,অনন্যা,দৃশা,শাহেদ আর দাড়িওয়ালা একটু আঁতেল ছেলেটা যার নামটা ভুলে গেছি,তাদের ছোট-ই করা হবে। একটা ছোট্ট ইতিহাস হয়ে যে কাজটা আমাদের প্রকৌশলীদের একটা "ইতিহাস ভুলে যাওয়ার" কলংক থেকে মুক্তি দিলো,সেটার বাদবাকি আর কোন দিক নিয়ে মাথা নাইবা ঘামালাম। অন্তত,আমরা যারা কথা বেশি বলি আর দেশোদ্ধার করি,তাদের জন্য ভাল একটা উদাহরণ সৃষ্টি করে দিলো এই ছেলেমেয়েরা,চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো,আমরা যেটাকে সময় নষ্ট বলি,সেরকম সময় আরো কিছু লোকজন আরো বেশি করে নষ্ট করলে খারাপ হতো না,জেগে থেকে ঘুমিয়ে থাকা লোকজনের ঘুম অল্প হলেও ভাঙতো। অভিবাদন তানভীর,অভিবাদন তোমার বন্ধুদের,এক বাকসর্বস্ব অক্ষম প্রজন্মের একজনের কাছ থেকে সামান্য কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

