somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাত্র/পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন আর আমাদের মানসিক দীনতা

২৮ শে জুন, ২০০৯ রাত ১২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার মায়ের একটা অভ্যাস আছে, পত্রিকার আগাগোড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া, বিশেষত যখন হাতে কোন বই না থাকে পড়ার মত। প্রথম আলোর শপথীয় অত্যাচারে অবশ্য সে অভ্যাসে খানিক ভাটা পড়েছে। এমনিতেই ২৪ পৃষ্ঠার মাঝে ১১ পৃষ্ঠা বিজ্ঞাপন, তার উপর আরো ৩-৪ পৃষ্ঠা শপথ নিয়ে ভণ্ডামির বিজ্ঞাপন, ধৈর্য্য রাখা মুশকিল বৈকি। তবে সব খবর পড়া শেষ হলে পাত্র/পাত্রী চাই
বিজ্ঞাপনগুলো তার দেখা চাই-ই। না, ভুল বুঝবেন না, নিজের পুত্রকে তিনি এখনো বিবাহযোগ্য মনে করেন না, এই বিজ্ঞাপনগুলো মাতৃদেবীর কাছে নির্মল বিনোদনের উৎস। তাঁর ভাষায়,
দেশে কত রকমের চিড়িয়া আছে সেটা এই পাতাটা না পড়লে বোঝা যায় না। দ্বিমত করার কিছু পাইনি, মা মাঝে মাঝেই জোরে জোরে পড়ে শোনান আর হাসতে হাসতে প্রায় গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা হয় আমাদের। বাজি ধরে বলতে পারি, কারো মনমেজাজ বাড়াবাড়ি খারাপ থাকলে পড়তে পারেন এগুলো, এমন বিনোদন পয়সা দিয়ে মিলবে না। :)

গতকালকেও আম্মা পড়ছিলেন, আমি শুনছিলাম। মাঝে কি কাজে যেন মা উঠে গেলেন, আমি পত্রিকাটা দখল করলাম, আর কি মনে করে ঐ পাতাটাই আগে ধরলাম। অন্যদিনের উল্টো ঘটনা ঘটলো কাল, ভাল মেজাজ খারাপ হয়ে যেতে শুরু করলো বিজ্ঞাপনগুলো পড়তে পড়তে। যদিও অন্যদিনের মতই সেগুলো, কিন্তু অন্যদিন হয়তো এভাবে ভাবিনি। কি ভাষা একেকটা বিজ্ঞাপনের। কি নির্লজ্জ আত্মপ্রচার, নিজেকে বিয়ের বাজারে পণ্য করার কি প্রাণপণ প্রচেষ্টা। আবার উল্টোদিকে, একেকজনের কি বেহায়ার মত চাহিদা! নিজের জীবনসঙ্গী খুঁজছে নাকি আদমবাজারে নিজের জন্য সেরা পণ্যটা খুঁজছে বোঝা মুশকিল। লোভের কদর্য প্রকাশ ছত্রে ছত্রে, সব মিলে মনটা বিষিয়ে গেল নিজেদের ওপরই।

আচ্ছা, ২-১টা নমুনা দিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার করা যাক। "ঢাকায় নিজস্ব বাড়ি-গাড়ি, বিদেশে পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক, ২৬ বছর, ৫'৯" 'সুদর্শন' পাত্রের জন্য 'ঢাকায় বসবাসকারী' পর্দানশীন ৫'৩" ঊর্ধ্ব উচ্চতার "প্রকৃত" সুন্দরী পাত্রী চাই।" কি মনে হচ্ছে? বিয়ের পাত্রীর খোঁজ, নাকি দোকানে গিয়ে সর্বোচ্চ দামে ভাল 'মাল'টা কেনার প্রচেষ্টা? "প্রকৃত সুন্দরী" টা কি বস্তু? আরেকটা নমুনা দিই। "বিদেশি হাউজিং কোম্পানির সিইও, এমবিএ, ঢাকায় বসবাসরত সুদর্শন পাত্রের জন্য আর্কিটেক্ট/ইন্ঞ্জিনিয়ারিং/এমবিএ অধ্যয়নরতা 'ঢাকায় সেটেল্ড', "লম্বা, সুন্দরী" পাত্রী আবশ্যক। বোঝ ঠ্যালা, গুণের ম্যালা! দু'দিকেই এত গুণের সমাহার হলে না কলসি উপচে পড়ে রে!

এত গেল পাত্র পক্ষের ছ্যাঁচড়ামি, পাত্রীপক্ষও কিন্তু পিছিয়ে নেই। এদিকের আকর্ষণটা অবশ্য সৌন্দর্যে নয়, মাকাল ফল দিয়ে তারা কি করবেন? তাদের আকর্ষণ টাকা-পয়সায়। নমুনা দেখুন-- '
সরকারি পদস্থ কর্মকর্তার ডাক্তার কন্যার (এফসিপিএস ১ম পার্ট ও ২৮তম বিসিএস লিখিত সমাপ্ত) এবং সুন্দরী পাত্রীর জন্য বিসিএস ডাক্তার বা ইন্ঞ্জিনিয়ার পাত্র চাই।" হুম, সমানে সমান। আরেকটু দেখি।
"ঢাকায় স্থায়ী, সুদর্শনা মাস্টার্স মাল্টিন্যাশনালে চাকরিরত পাত্রীর জন্য অভিজাত মুসলিম পরিবারের ডাক্তার/ইন্ঞ্জিনিয়ার/ব্যাংকার।মাল্টিন্যাশনালে চাকরিরত/ব্যবসায়ী 'প্রতিষ্ঠিত' পাত্র আবশ্যক।" এই হলো অবস্থা। হিন্দু পাত্ররা আজকাল অবশ্য একটা উদারতা দেখান, নমুনাটা এমন--- "আমেরিকায় ডাক্তারির লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফর্সা দেবনাথ পাত্রের জন্য "শুধুমাত্র আমরিকার নাগরিক অথবা গ্রিনকার্ডধারী"পাত্রী চাই, অসমবর্ণে আপত্তি নেই।" আহা কি উদারতা। তাই তো, বর্ণ পাত্তা দিলে তো গ্রিনকার্ডের লোভ ছাড়তে হয়, তারচেয়ে জাত যাক, লক্ষ্মীদেবীর অধিষ্ঠান হোক।

আর কত বলবো? সবই মোটামুটি একরকম। সবগুলো বিজ্ঞাপন দেখলে মোটামুটি একটা ছাঁচ পাওয়া যায়। পাত্রপক্ষের চাহিদা হলো বউখানা হবে স্বর্গের পরী, একেবারে পটে লেখা কবিতা, এমন একখানা শোপিস যে সবাইকে দেখিয়ে চোখ টেরিয়ে দেয়া যাবে। সোজা কথায়, ড্রয়িংরুমের শোভাবর্ধক। ভাল শোপিসের দামটাও সেরকম, আর সেটা কেনার সামর্থ্য যে তাদের আছে সেটা বিজ্ঞাপনে বেশ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়েই বলা হয়। ওদিকে পাত্রীপক্ষের দরকার প্রতিষ্ঠিত গাড়িবাড়িওয়ালা পাত্র, যেনতেন ফুলদানিতে তো আর ঘরের ফুলটাকে রাখা যায় না! কাজেই মেয়ে বড়ই সুশীলা, আদবলেহাজের অভাব নেই, ওদিকে আবার আধুনিকা, স্মার্ট, ড্রইংরুমে বেশ মানাবে। যদি আবার চাকরিবাকরি করে তবে পোয়াবারো, এবার একখানা রকফেলার না হোক টাটা-বিড়লার মত কেউ না হলে চলবেই না। সেদিন ফেসবুকে বন্ধু নাজমুল দারুণ একটা মন্তব্য করলো--" বাঙ্গালি পোলারা বউ খুঁজতে গেলে সবসময় অ্যাণ্ঞ্জেলিনা জোলি খুঁজে, সমস্যা হইলো নিজে যে ব্র্যাড পিট না সেইটা ভুলে যায়। ঐদিকে মাইয়ারা বিল গেটস না হইলেও তার ভাইরে অন্তত বিয়া করতে চায়, এর নিচে প্রেস্টিজ থাকে না।"

এখানে আমার আপত্তি কোথায়? আমি কি সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি? মোটেই না, তেমন স্বপ্নই দেখি না। যে যার যোগ্যতা আর পছন্দ অনুযায়ী জীবনসাথী বেছে নিতেই পারে। আপত্তির
জায়গাটা মানসিক দীনতার দিকে। বিজ্ঞাপনে তো সরাসরি বলে, কিন্তু নিজেদের মাঝেও যখন পাত্র-পাত্রী খুঁজতে দেখি, মনে হয় "সুন্দরী মেয়ে" আর "পয়সাওয়ালা ছেলে" এই দুই জাত বাদ দিলে দুনিয়ার আর কারো বিয়ে করাই উচিত না। একটা মেয়ে দেখতে সুন্দর না হলে তার মনের খবর কয়জন রাখে সন্দেহ, আর ছেলে যদি পয়সাওয়ালা হয়, তা সে পয়সা যে পথেই আসুক, তার সাতখুন মাফ। চাকরির বাজারে কিন্তু সরকারি ইন্ঞ্জিনিয়ার আর পুলিশের ব্যাপক দাম, সেটা যে তাদের সরকারি বেতনের স্কেল দেখে নয়, সেটা বুদ্ধিমান মাত্রেই আর বুঝিয়ে বলতে হবে না। এমনিতেই তো আর বলে না,জামাইয়ের রাজা পুলিশ!

বিয়ে জিনিসটা আসলে মানুষ কি জন্য করে সেটা নিয়ে নানা ব্যাখ্যা থাকতে পারে, বিবাহিতরা হয়তো ভাল বলতে পারবেন। এককালে রাজা-বাদশাহরা বিয়েকে একটা "রাজনৈতিক চুক্তি" হিসেবেও দেখতেন, সম্রাট আকবরের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিবাহ তার একটা ভাল উদাহরণ। মনের মিল সেখানে গৌণ। তবে আধুনিক কালেও সেটা চুক্তির বাইরে কতটা যায় ভাবার বিষয়, অন্তত বিজ্ঞাপন দেখে আর পরিচিতমহলে পাত্র-পাত্রীর প্রয়োজনীয় যোগ্যতার বহর শুনে পরিস্থিতি সম্রাট আকবরের কালের চেয়েও ভয়াবহ বলেই বোধ হয়। একেকজন যা চায় তার জন্য মঙ্গলগ্রহে গেলেও তা মিলবে কিনা বলা মুশকিল, আর শেষ পর্যন্ত যা পায় সেটা নিয়ে তারা সারাজীবন কতটা খুশি থাকে সেটাও আর কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠেনি। অবশ্য, সব মিলিয়ে একটা সফল চুক্তি হলে দু'পক্ষই খুশি থাকে, সেদিক দিয়ে হতেও পারে, মন ব্যাপারটাই হয়তো এই ডিজুস যুগে গৌণ হয়ে গেছে।

কখনো দেশের বাইরে যাইনি, তবে সিনেমা-টিনেমা দেখে আর প্রবাসী আর বিদেশফেরত দেশী ভাইদের কাছে যা শুনি, তাতে বিদেশীদের একটা ব্যাপার বেশ লাগে। বিয়ের ব্যাপারে মনে হয় তাদের মনোভাব যতটা না ব্যবসায়িক তারচেয়ে অনেক বেশি মনোজাগতিক। ভাল না লাগলে হয়তো ক'দিন পরেই ছেড়ে দিল, কিন্তু মনের সাথে না মিললে জোর করে কোন কম্প্রোমাইজ বা লোভের জন্য কাউকে ধরে রাখার প্রবণতা এদের কম লোকেরই আছে বলে মনে হয়। আমাদের অবস্থা উল্টো, আকাশসমান আশা আর পর্বতসমান লোভ নিয়ে গাঁটছড়া বাঁধলো, তারপর মিলুক আর না মিলুক
চালিয়ে যাও। কারো সংসারে অশান্তি, অমুক ভাবীর এত গয়না, চড়ে লেক্সাসে, আমার কেন টয়োটা করোলা? কেউ বা যৌতুক না পেয়ে বউ পেটাও, দরকারে মেরে সিলিং ফ্যানে ঝুলিয়ে
দাও, বিচার তো নেই। মূলে কি সেই বিবাহপূর্ব লোভের বেসাতি-ই নয়?

গুরু মুজতবা আলীর কোন একটা বইতে পড়েছিলাম, কোন জাতির মানসিকতা বুঝতে বাজারে যেতে হবে আর খাদ্যাভ্যাস দেখতে হবে। এখন বলি, কারা কিভাবে অথবা কি দেখে বিয়ে করে সেটা
দেখলেও বেশ বোঝা যায় এদের মনাসিকতা কতটা উঁচু বা নিচু।

শালার বাঙ্গালির পাত্র/পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনগুলো দেখলেই বোঝা যায় জাতি হিসেবে আমরা কত্তো বড় ছোটলোক।
১০০টি মন্তব্য ১০০টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×