মাশরাফি বললো-- "আশু, ৫০ নিবি নাকি ১০০?"
আশুর সগর্ব জবাব--"অবশ্যই ১০০।"
মাশু আবদার করলো--"ওরে আশু, ৫০ টা এই প্র্যাকটিস ম্যাচে নিয়া নে, ১০০ টা টেস্টের জন্য রেখে দে।"
আশুর চিন্তিত জবাব--"এইটা অবশ্য ঠিকই কইসোস, সব মাইর এদের দিলে তো ফিদেল এডোয়ার্ডসরা বাঁইচা যাইবো, ওর লাইগা ১০টা ছক্কা বাঁচায়া রাখলাম। এইবার ৫০, টেস্টে ১০০, চলেগা?"
মাশুর উৎফুল্ল চিৎকার--"আরে চলেগা মানে, দৌড়েগা, এই না হইলে আশু ভাই। ফিদেলের খবরই আছে, ভাইসব, আশু ভাইয়ের সালাম নিন, ছক্কা মার্কায় ভোট দিন।"
না, এটা কোন কাল্পনিক সংলাপ নয়, ভাষারীতিতে সামান্য গরমিল থাকলেও এটা প্রথম আলোর খেলার পাতায় তাদের বিশিষ্ট সাম্বাদিক উট-পাল শুভ্র'র একটা ফিচারের প্রথম কয়েক লাইন। সেই উট-পাল, যিনি এতকাল শত ঝড়ঝাপ্টার মাঝেও হাবিবুল বাশারের চা-নাস্তার ঋণ শোধ করেছেন একের পর এক হাবিবুল-বন্দনা লিখে, এরপর আশরাফুলের সিঙ্গারা-সমুচার দাম শোধ দিয়েছেন "আশরাফুল খেললেই বাংলাদেশ জেতে" মীথের সফল প্রচার সম্পাদক হিসেবে কাজ করে। এবার তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজে, ধ্বজভঙ্গ মুরগি-হৃদয় বাংলাদেশ দলের সকল কীর্তি প্রচার এবং অপকীর্তি ধামাচাপা দেয়ার মহান দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে।
এখন পর্যন্ত বলা যায়, উট-পাল তার অ্যাসাইনমেন্টে সফল। পত্রিকার পয়সায় (নাকি স্পন্সরদের পয়সায়?) দামী হোটেলে থাকা এবং মুফতে খানাদানা, সাথে ক্যারিবিয়ানের আকাশ-বাতাস নিয়ে কাব্য লেখা, এবং মাঝে মাঝে ক্যারিবিয়ান স্বল্পবসনা ললনাদের ছবি তোলা এবং তা নিয়ে রসালো কিছু রিপোর্ট লেখা, এইটুকুই তার কাজ। গত পরশু তার মূল রিপোর্ট ছিল সেন্ট ভিনসেন্টের আকাশ আর সাগর নিয়ে, সেখানে নিজেকে কবিগুরু কাছাকাছি একটা পর্যায়ে তুলে নিয়ে গিয়েছেন। গতকালকে রিপোর্টের বিষয় ছিল সেন্ট ভিনসেন্টের কার্নিভ্যাল, বোঝা মুশকিল তাকে বাংলাদেশের পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয়েছে নাকি স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে। আজকের কাজ অবশ্য সব কিছুকে ছাড়িয়ে গিয়েছে, প্রয়াত স্যার ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের পক্ষ থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক ক্রিস গেইলকে উদ্দেশ্য করে লম্বা এক উপদেশমূলক কাল্পনিক চিঠি। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই চিঠি পড়লে গেইল আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ড তাদের বিবাদ ভুলে উভয় পক্ষই উট-পাল আর বাংলাদেশ দলকে লাথি দিয়ে ক্যারিবিয়ান থেকে বের করে দেবার দাবীতে এককাট্টা হয়ে যাবে।
তো, সব মিলিয়ে উটুর মেজাজ ভালই ছিল। আশু-মাশুর ৫০-১০০ এর গপ্পোটা ফাঁদার পরে সে বেশ আত্মতৃপ্তি বোধ করে। দেশে ক্রীড়া সাংবাদিকের বড়ই অভাব, যারাও আছে তাদের পত্রিকা বিদেশ সফরে পাঠাতে পারে না, কাজেই প্রেস রিলিজ থেকে নেয়া খেলোয়ারদের
কথাবার্তাকেও উটু "প্রথম আলোর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকার" বলে চালিয়ে দিলেও প্রতিবাদ করবার কেউ থাকে না। যে খেলোয়ারদের একেজনের ইন্টারভিউ নিতে আন্তর্জাতিক পত্রিকাগুলোর বাঘা সাংবাদিকরা হাজার হাজার ডলার খরচ করেও স্লট পায় না, সেইসব খেলোয়াররা ঠিক কি কারণে উট-পালের মত একটা উটুল কেই "একান্ত সাক্ষাৎকার" দিতে রাজি হয়ে যান, সেই প্রশ্নটাও কেন নির্বোধ বাঙ্গালি করে না এটা ভেবে উটু নিজেও মাঝে মাঝে অবাক হয়। আসলেই, তেলবাজি আর চাপাবাজি জানলে এই দেশে করা যায় না এমন কিছু নেই, উটু তো উটু, শুয়োরও মন্ত্রী হয়।
কিন্তু ক্যারিবিয়ানের এই মধ্যবেলায় উটু একটু দুশ্চিন্তায় ভোগে। সব তো বেশ যাচ্ছিল, মাঝ দিয়ে এই আশরাফুল হারামজাদা বিপাকে ফেলে দিল। ছোকরা মহা ধুরন্ধর, ক'দিন আগেও কি সুন্দরভাবে "আবার খাবো" রেস্তোরাঁয় গিয়ে তাকে "ইস্পিশাল মালাই চা" আর ভেজাল রসগোল্লা খাইয়ে কেলেপানা মুখটা চাঁদপানা করে বললো-- শুভ্র দা একটু উঠায়া দেন, এরপরে একটা ২০-৩০ মারমুই, তাইলে আর
আমারে পায় কে? উটুও ফ্রেশ পাত্তি গরম চায়ে চুমুক দিয়ে তৎক্ষণাৎ একটা প্লট বের করে ফেলে, পরের দিন রিপোর্ট হয়ে যায়,-- "সবাই তো খারাপ খেলে, শুধু আমরা হারলেই দোষ।" তারপর ইনিয়ে-বিনিয়ে লেখা বাংলাদেশ কোন সিরিজে কাকে চরমভাবে দৌড়ানি দিয়ে "অল্পের জন্য" হেরে গেল, কে বাংলাদেশকে বলে গেল তারা রীতিমত ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল, কার আবার আশরাফুলের ভয়ে রাতের ঘুমই হয় না। এমনকি স্যার গারফিল্ড সোবার্স এবং এভার্টন উইকসের মত ব্যাটসম্যান, এবং স্বয়ং আইসিসি প্রধান ডেভিড মরগ্যান যে আশরাফুলের মত প্রতিভাবান ব্যাটসম্যানকে নিয়ে খুবই চিন্তিত, এবং তারা যে ব্যাটিং শ্যাডো করে দেখান আশরাফুল কিভাবে শট খেলে, সেটাও ফলাও করে বলতে ভুল করেনি উট-পাল। এখানে অবশ্য উটু নিজেই বোঝে চাপাবাজিটা বেশি হয়ে গেছিলো, কারণ সে লিখে বসেছিল ডেভিড মরগ্যানের সাথে তার দেখা হয়েছিল ট্রেনের কামরায়, এবং তার পরিচয় পেয়ে মরগ্যান পত্নী আহ্লাদে আটখানা হয়ে তাদের সাংসারিক জীবনের গল্প পর্যন্তও করে ফেলেছিলেন। মরগ্যান নিজেও নাকি বাংলাদেশের টেস্ট ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে এ ব্যাপারে সত্ত্বর কিছু একটা লেখার জন্য তাকে তাগিদ দিয়েছিলেন।
তারপরেও সব ঠিকঠাক চলছিলো, কিন্তু আশু হারামজাদা মনে হয় তাকে না ডুবিয়ে ছাড়বে না। মাশরাফি পোলাটা একটু বিবেচক, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩ নম্বর টিম নামাবে শুনে মোটেই খুশি হতে পারেনি সে। হবে কি করে, অন্তত এটা বোঝার বুদ্ধি বিয়ের পরে মাশুর হয়েছে যে ৩ নম্বর টিমের কাছেও বাংলাদেশের ধোলাই খাবার সম্ভাবনা প্রবল, ইংল্যান্ডে গিয়ে ৬ হাজার পাউন্ডের মুরগী সাবাড় করা আর টেস্ট খেলা তো একরকম না। আর সেরকম হলে মার যে একটাও মাটিতে পড়বে না, সেটা মাশুর চেয়ে ভাল আর কে জানে? এজন্যই মনে হয় তার বৌ বিদায় দেবার সময় কাঁদো কাঁদো হয়ে গিয়েছিল, উটু চালু মাল, সে নিয়েও রিপোর্টিং করে ফেললো--"হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে প্রিয় কৌশিককে বিদায় দিতে গিয়ে সুমীর সে কি অঝোর কান্না!" লেখাটা পড়ে অনেকেই যে চোখের জল মুছেছে, সেই ব্যাপারে উটু নিশ্চিত।
মাশুর আশংকা যে মিথ্যা ছিল না, বাংলাদেশের খেলোয়াররা সেটার প্রমাণই এ বেলা দিয়ে যাচ্ছে। গতকালটা বেশ ভাবে কাটানো গেছে, বৃষ্টি হওয়াতে মাশু বেশ খুশি, উটুও খুশ, যাক আরেকটা জম্পেশ গপ্পো লেখা যাবে যে বৃষ্টি না হলে বাংলাদেশ কিভাবে এককালের প্রবল পরাক্রান্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতো সেটা নিয়ে। কিন্তু বিধি বাম, মাঠ শুকিয়ে গেল, ব্যাটিংয়েও নামতে হলো। তামিম সেই ক্যারিয়ারের শুরুতেই ব্যাটকে পেন্ডুলাম হিসেবে ভেবে এসেছে, প্রতিবারই সে ব্যাট চালানোর সাথে সাথে সমর্থকদের হৃৎপিণ্ড গলার কাছে চলে আসে। গতকাল শূন্য রানেই ওভাবে একবার
চালিয়ে বেঁচে গেছে, কিন্তু বানর কি আর মানুষ হয়? আজকেও ওভাবে তলোয়ারের মত ব্যাট চালিয়ে আউট। জুনায়েদ আর ইমরুলকে নিয়ে কথা বলার নেই, ফুটওয়ার্ক ছাড়াও যে টেস্ট দলে ঢকা
যায় এরা বেশ দেখাচ্ছে। রকিবুলকে কেন দলে নেয়া হলো সেটা উটুর ধান্দাবাজ মাথাতেও ঢোকেনা, যে ছোকরা টি-টোয়েন্টিতে টেস্ট আর টেস্টে টি-টোয়েন্টি খেলে, তাকে বাঁচানোর মত লেখা এমনকি
উটুর ল্যাপটপেও আসবে না। গোটা তিনেক ক্যাচ ফেলে দেয়ার পরেও ১৪ রানে আউট। ভেবেছিল সাকিব দাঁড়িয়ে গেলে ওকে বর্ম বানিয়েই বাকিগুলোকে বাঁচিয়ে দেবে, কিন্তু বাংলাদেশের সাথেই মনে হয়
দুনিয়ার সবচেয়ে অথর্ব আম্পায়ার গুলোকে দেয়া হয়। অশোকা ডি সিলভার চোখের অপারেশনের সময় হয়েছে অনেক আগে, তারপরেও বাংলাদেশের লীগের খেলা চালানোরও অযোগ্য এই কেলেভূতটাকে কেন যেন বারবার বাংলাদেশের খেলাতেই দেয়া হয়। মাথায় থান ইট দিয়ে গোটা দুই বাড়ি দিলেই সিধা হয়ে যেত, হুঁ হুঁ বাবা মোহামেডান আর কলাবাগানের ম্যাচে থাকতি, বুঝতি মজা, গাল
চুলকে ভাবে শুভ্র।
তাও না হয় দেখানো গেল, অশোকাকে ছিলে-কেটে কয়েকটা লাইন চলবে, কিন্তু আশুর কি হবে? এত যে বড় গলা করে বললো দেখিয়ে দেবে, আশু ভাল না খেললে বাংলাদেশ জেতে না, বাংলাদেশের শচীন বা ব্র্যাডম্যানই তো বানিয়ে দিয়েছিল প্রায়। যদিও বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট প্লেয়িং দেশের বিরুদ্ধে জেতে ৯৯ এ, চূড়ান্ত ফর্মে থাকা পাকিস্তানকে যখন হারিয়েছিল আশু তখন ছিল না, কিন্তু তাই বলে তো আর খালেদ মাহমুদ সুজনকে আশুর সাথে তুলনা চলে না। এমনকি আতাহার-হাবিবুল-বুলবুলের অ্যাভারেজও আশুর চেয়ে ভাল ছিল, কিন্তু সেটা লোকজন মনে করে না, আর উটুর তো পরের বেলার লান্ঞ্চের টাকাটা যোগার করতে হবে, মনে করিয়ে লাভ কি? ওয়ানডেতে ২১ আর টেস্টে ২৩ অ্যাভারেজ নিয়ে দুনিয়ার আর কোন দেশেই যে আশুর জায়গা হতো না, এটা কি উটুও বোঝে না? কিন্তু চাপাবাজি বলে কথা, এখানে সত্যি কথার জায়গা নেই।
কিন্তু আজ কি হবে? কপালের ঘাম মোছে শুভ্র। আজ তো আশু ৬ করে অক্কা পেল, তাও ৩০ বলে। যেভাবে আউট হলো সেটাও নভিশের মত, ৫০টা টেস্ট খেলে এভাবে আউট হলে অন্য দেশে শুধু এই অপরাধেই দল থেকে বাদ দিয়ে দিত। ওরে আশু, তুই আর কত শিখবি, লোকজনকে আমি আর কতদিন চাপা দিয়ে ম্যানেজ করবো রে? তোর চা-নাস্তার লোভে কি শেষমেশ আমি বেঘোরে প্রাণটা খোয়াবো পাবলিকের হাতে? এখন আমি কি করি? ভাবটে থাকে উটু, আজ মহাবিপদ। হঠাৎ খুশি হয়ে ওঠে সে, বৃষ্টি নেমেছে, আম্পায়াররা মাঠ ছেড়ে আসছেন, আজ আর খেলা হবে না। হে বিধাতা, ধন্যবাদ তোমায়, এ বেলা যুৎসই একটা গপ্পো খাড়া করে ফেলতে হবে। পাগলের মত ভাবতে থাকে উট-পাল, কালকে আশু আর মাশুর পিঠ বাঁচানোর হেডলাইনটা কি
হতে পারে? "প্রত্যাশার প্রচণ্ড চাপে ভেঙে পড়ছেন আশরাফুল, আপনারা তাকে রেহাই দিন?" নাহ, ভাল হলো না, আরো মোক্ষম কিছু লাগবে। প্রিয় ব্লগারগণ, আপনারা কি উটুর এই
দুর্দিনে তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবেন না?
[বি: দ্র: এই লেখার একটা হেডলাইন ও বানানো নয়, কমিক মনে হতে পারে কিন্তু প্রতিটা নিউজই উট-পাল শুভ্রের নিজের করা, অধম ব্লগার সেগুলো একজায়গায় জড়ো করেছে মাত্র]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

