somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্ন মৃত্যু ভালবাসা

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পরশ আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলনা। স্কুলে একসাথে পড়তাম, ফর্সা, গাট্টাগোট্টা, একটু রাফ এন্ড টাফ। আবার যতখানি দূরের হলে ভুলে যাওয়া যায় ততখানি দূরেরও মনে হয় ছিলাম না। পরশ, ইফতিখার যার আসল নাম, কেউ কেউ ডাকতো ইফতি, ওর দলটা ছিল আলাদা। সাইফের সাথে ছিল মানিকজোড়, স্কুলে, কলেজে, সম্ভবত তারপরেও। স্কুলে থাকতে জ্বালাতো খুব আমাকে সাইফ, কলেজেও, তবে তখন পরশ ঢাকা কলেজে, আমরা নটরডেমে। ওর সাথে আর দেখা হতোনা তখন, মাঝে মাঝে কলেজে আসতো অবশ্য, হাই-হ্যালো পর্যন্ত। বড়লোকের ছেলে, বাবা ডাক্তার, সাইফ-পরশ ২ জনেরই। ২ জনেরই ছিল গতির নেশা, নিজেরাই গাড়ি চালিয়ে আসতো, সেই কলেজ থেকেই। ঠিক আমাদের মত নয়, তাই আমাদের সাথে সম্পর্ক হলেও হৃদ্যতা কতখানি ছিল জানি না।

কলেজ থেকে বের হবার পরে দু'জনের কারো সাথেই আর দেখা হতো না। সাইফ আইবিএ তে, পরশ ডেন্টালে, আমরা বুয়েটে। মাঝে মাঝে সাইফ বুয়েটে আসতো, বছর তিনেক আগে একদিন হঠাৎ হলের বারান্দায় দেখা, দেখেই পরিচিত ভঙ্গিতে সেই স্কুল-কলেজের কোডনেম ধরে হুংকার। কেন যেন খুব ভালো লাগলো, পরিচিত মুখে অনেকদিন পরে পরিচিত ডাক শুনতে খুব মধুর লাগে। দাঁড়িয়ে খানিক কথা বললাম, কি কাজে যেন এসেছে, আমিও ক্লাসে যাবো, অল্প কথাবার্তার পরে কখনো ওর এলাকায় যাওয়ার কথা বলে বিদায়। একসময় আমাকে চরম জ্বালাতো যে সাইফ, তার সাথে দেখা হয়েছিল শুনে বন্ধুরাও বেশ মজা পেল, এখনো আমাকে ঐভাবে জ্বালালে কি হতো ভেবে সবাই বেশ হাসাহাসি করলাম। ঠিক ২ সপ্তাহ পরে, একদিন রাতে এক বন্ধু ফোন করে জানালো, সাইফ রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে!

হঠাৎ খবরটা শুনে ভাবলাম, হতেই পারে না, মাত্র ২ সপ্তাহ আগে যাকে দেখলাম, সে মারা যায় কিভাবে? কিন্তু সাইফ আমাদের সাথে কলেজেও পড়েছে একসাথে, কমন ফ্রেন্ড অনেক, সবাই যখন জানাতে শুরু করলো, দুঃস্বপ্নটা বাস্তব হয়ে ধরা দিতে শুরু করলো। উত্তরা থেকে গাড়ি চালিয়ে বন্ধুরা ফিরছিলো, দুর্ঘটনায় পড়েছিল, ও সহ আরেকজন মারা গেছে, বাকিরাও মারাত্নকভাবেই আহত। বন্ধুরা অনেকে গেল জানাযায়, আমি গেলাম না। মাত্র ২ সপ্তাহ আগে যাকে হাসিমুখে আমার দিকে এগিয়ে এসে হাত মিলাতে দেখেছি, তার জানাযায় যাওয়ার মত মনের জোর আমার হয়নি। অনেকদিন এটা নিয়ে কেমন কেমন লাগতো, সবাই বলতো, বাড়াবাড়ি করছি, কিন্তু আমার বিশ্বাস করতে অনেক সময় লেগেছিল যে ছেলেটা আর ফিরবে না, কোনভাবেই না।

পরশের বন্ধু ছিল সাইফ, ওরা ছিল মানিকজোড়, আশ্চর্য মিল ছিল ওদের আচরণ আর পারিবারিক পটভূমি আর জীবনযাত্রায়। পরশ পড়তো আমারই এক পাড়ার বন্ধুর সাথে ডেন্টালে। মাঝে মাঝে নাম শুনতাম, ওর বেশ ভাল পরিচয় ছিল, দেখা হয়নি। হঠাৎ একদিন ফেসবুকে দেখি ১টা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, ইফতিখার এইচ খান। আসল নামটা ভুলে গিয়েছিলাম, ছবি দেখে চিনলাম, যোগ করে রাখলাম, কথা হতো না। ৩-৪ দিন আগে, দেখি পরশের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখা--"১৫২ কিলোমিটারে গাড়ি চালাইলাম, ম্যান আয়্যাম ফাস্ট।" মনের মাঝে কোথাও একটা ধাক্কা মারলো, ঠিক একইভাবে আরো একজন কথা বলতো। ৭ বছর পরে প্রথম কথা বললাম, স্ট্যাটাসের নিচে মন্তব্য লিখলাম--"দোস্ত, কাজটা বিপজ্জনক, সাবধানে, এইটা বাংলাদেশের রাস্তা, কেউ নিয়ম মানে না।" প্রতিমন্তব্য এলো, যেন ৭ দিন পরে কথা হচ্ছে--"আরে ব্যাটা তুই দেখি আমার মা আর বউয়ের মত কথা কস।" আবারো খুব ভালো লাগলো, অনেকদিন পরে পরিচিত কোন মুখে পরিচিতের মতই কথা, যেন গতকাল দেখা হয়েছে। জবাব দিলাম--" রাস্তাঘাট সেফ না, তুই গাড়ি টান দিলি, সাইড রোড থেকে একটা ট্রাক নাক বের করল, কি করবি?" জবাব দিল--" জানি তুই সাইফের কথা বলবি। সে আমার শুধু বন্ধু না, ছায়া ছিল, ওর মতই আমারো গতির নেশা, থামাতে পারি না। যখন ঐভাবে চালাই,মনে হয় সাইফ আমার পাশে আছে। মনে হয় আমারো রোড অ্যাক্সিডেন্টে মরণ আছে।" বদ রসিকতা আমি পছন্দ করি না, কাজেই জবাব দিলাম না।

২ দিন পরে, গতকাল রাতে, আবার ফেসবুকে নক, দোস্ত তোর বিসিএসের কি খবর? বললাম--"হইসে রিটেন এ, ভাইভা নিয়া কি করবো ভাবতেসি, লবিং নাই। তোর কী খবর?" জানালো, বেশ ভালই, ডেন্টাল সার্জন নিবে ১৪০ টা, ওরা পাশই করেছে ৫২ জন, নিশ্চিতই বলা যায়। খুশি হয়ে কংগ্রাটস দিলাম, উপদেশ চাইলাম কিভাবে ভাইভার জন্য পড়া যায়। প্রায় ঘণ্টাখানেক এটা-ওটা বললো, শেষে বললো, এখন আছে অ্যাড-হক এ, এবার স্থায়ী হয়ে গেলে শান্তি। বললো, যে বইগুলি বললাম কালকেই কিনে আন, রাতে ২ জন আলোচনা করে পড়া যাবে, কাজে লাগবে। খুশি হয়ে বললাম, খুব ভালো, কালকেই আনবো। একটু পরে বলে, যাইগা, বউ ঘুমানির জন্য চিল্লায়, সংসার! অবাক হয়ে বললাম, গার্লফ্রেন্ড না আসল বউ? বলে-- "দূরররর ব্যাটা, বিয়া করলাম প্রায় আড়াই বছর, একটা মেয়ে আছে দেড় বছরের, তুই তো কিছুই জানস না।" ব্যাপক মজা লাগলো, আবারো অভিনন্দন দিলাম, বাচ্চার ছবি দেখতে চাইলাম। ফেসবুকে আছে, জানালো। ছবিতে দেখি, অসম্ভব মায়াবী একটা মোটাসোটা দেবশিশু, নানাভাবে সাজিয়ে মাথায় ওড়না দিয়ে তোলা ছবি, অ্যালবামের শিরোনাম--"ছোট্ট ছোটন।" খুব খুব ভাল লাগলো দেখে, মনে হলো, নিজেরও এমন একটা খেলার পুতুল থাকলে মন্দ হয় না। বললাম--"ব্যাটা আস্ত পুতুল পেয়ে গেছিস খেলার জন্য, তোর দেখি বিশাল মজা। তোর বাচ্চারে বলিস, বিসিএসে আমার হয়ে গেলে এক বাক্স চকলেট পাঠাবো।" বললো,পাঠাস। আমি আরো খানিক্ষন মুগ্ধ হয়ে ছবিগুলো দেখলাম, হাসিখুশি একটা শিশুর চেয়ে পৃথিবীতে আর সুন্দর কি আছে? সবশেষে মন্তব্য লিখলাম--"একটা লিভিং ডল রে, ইউ আর লাকি, ম্যান।" ছেলেটার পরিবর্তন দেখে আর বাচ্চাটার ছবি দেখে মনটা ভাল হয়ে গেল, অনেকদিন পরে বেশ খুশি খুশি মনে নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।

সকালে উঠেছি, আম্মাকে এমন মজার একটা খবর দিতে সবাই বেশ মজা করলাম, এইটুকু ছেলে, তার আবার এইটুকু একটা বাচ্চা। সুখ কী একেই বলে? দুপুরে নীলক্ষেত গিয়ে বই কিনলাম, যেগুলো বলেছিল। পুরানো বই কিনবো কিনা ভাবতে ভাবতেই মনে হলো এখবার ফোন করি ব্যাটাকে, পরক্ষণেই মনে পড়লো ফোন নম্বর তো নেই। আচ্ছা এখন কিনি, আর কিছু লাগলে রাতে ইয়াহুতে জিজ্ঞেস করে নিলেই হবে, ভেবে কিনে নিলাম বইগুলো। বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা, কোনমতে ইফতার, মোবাইলটার দিকে তাকাইও নি। ইফতার করে মোবাইলের দিকে তাকানোর ফুরসৎ মিললো, তাকিয়েই দেখি একটা এসএমএস। হবে সিটিসেলের কোন বস্তাপচা অফার, ভেবে খুলতেই দেখি, আমার পাড়াতো ডেন্টিস্ট বন্ধুর লেখা--"ডাক্তার ইফতিখার রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে।"

পরেরটুকু আর কি লিখবো, আমি জানি না। এবার আর আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়নি, লেখাটা দেখার সাথে সাথেই কেন যেন আমি জানতাম, এখানে কোন ভুল নেই। কালকে রাতে যার সাথে আমার কথা হয়েছে, যার পুতুলটাকে আমার এক বাক্স চকলেট পাঠাবার কথা ছিল, যার সাথে আজকে রাতে আমার জোর গলায় আলোচনা করবার কথা ছিলো কিভাবে ভাইভা বোর্ডের লোকগুলোকে কাবু করা যায়, যার সাথে সাত বছর পরে গতকাল রাতেই আমার প্রথম কথা হয়েছিল, যাকে আমার মনে হয়েছিল খুব সুখী একজন মানুষ, সে তার সব স্বপ্ন আর ভালবাসা নিয়ে চলে গেছে। আমি তার পরিবারের কাউকে চিনি না, আমি তার বন্ধুদের চিনি না, আমি তার জানাযায় যেতে পারিনি, যেমন পারিনি সাইফকে শেষবারের মত দেখতে। আমি শুধু জানি তার সাথে আমার ৭ বছর পরে কথা হয়েছিল, তার সাথে অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমরা কথা বলেছিলাম, তার ছোট্ট ছোটনকে আমার এক বাক্স চকলেট পাঠাবার কথা ছিল।

সবাই আমার বন্ধু ইফতিখার হায়াত খান পরশের জন্য দোয়া করবেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ ভোর ৫:৪৪
৬৭টি মন্তব্য ৬৭টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×