হয়ে গেল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব গুলোর একটা, বিশ্বকাপ ফুটবলের ড্র। অনুষ্ঠান নিয়ে বেশি কিছু বলার নেই, শার্লিজ থেরনের হাস্যমুখও দর্শকসারিতে থাকা উদ্বিগ্ন কোচদের মুখে বিন্দুমাত্র হাসি আনতে না পারাই বলে দেয় মূল খেলার চেয়ে উৎকণ্ঠার কোন অংশে কমতি ছিল না এখানেও। বরং দেখে নিই কেমন হলো দলগুলোর বিন্যাস।
আপাতত বলা যায় সবচেয়ে সহজ গ্রুপে পড়েছে ইতালি--- প্যারাগুয়ে, নিউজিল্যান্ড আর প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলা স্লোভাকিয়াকে পেয়ে যে কোন ফুটবল পরাশক্তিরই খুশি হয়ে যাবার কথা। যদিও দক্ষিন আমেরিকার বাছাইপর্বে প্যারাগুয়ে ২ এ ছিল, কিন্তু ল্যাটিন ধারার সাথে একেবারেই বেমানান বিরক্তিকর রকমের রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলা এই দলটির বিশ্বকাপের সাফল্য ২য় রাউন্ড পর্যন্তই। কনফেডারেশনস
কাপে নিয়মিত ৪-৫ টা গোল খেয়ে আসা নিউজিল্যান্ড এই বিশ্বকাপের জোকার টিম হবার দৌড়ে বেশ উপরেই আছে, আর নবাগত স্লোভাকিয়া কোন চমক দেখাতে না পারলে এখান থেকে ইতালি আর প্যারাগুয়ের পরের রাউন্ডে যাত্রা খুব কঠিন হবার কথা নয়।
ইতালির উল্টো অবস্থা ব্রাজিলের। গত কয়েকবারই মোটামুটি সহজ গ্রুপে পড়া ব্রাজিলের এবারের গ্রুপ প্রতিপক্ষ ইউরোপিয়ান পরাশক্তি পর্তুগাল, আফ্রিকান জায়ান্ট আইভরি কোস্ট আর ৪৩ বছর পরে বিশ্বকাপ খেলা উত্তর কোরিয়া। ক্রিস্টিয়ান রোনালদো, রিকার্দো কার্ভালহো, ন্যানির মত তারকাসমৃদ্ধ পর্তুগাল আর দিদিয়ের দ্রগবা, কোলো তোরে, সলোমন কালুর মত আফ্রিকান দানবদের সমন্বয়ে গঠিত আইভরি কোস্টের সাথে ব্রাজিল, সব মিলিয়ে এটাকে অনায়াসেই "গ্রুপ অভ ডেথ" বলা যায়। উত্তর কোরিয়া একেবারেই ব্ল্যাক হোলের থেকে উদয় হয়েছে, তারপরেও এই গ্রুপে তাদের বিশেষ কোন সুযোগ নেই বলেই মনে হয়, আর বর্তমান ফর্মের ব্রাজিলেরও পরের পর্বে না ওঠা অঘটনই হবে, কিন্তু "গ্রুপ অভ ডেথ" এ তো অঘটনই স্বাভাবিক ঘটনা।
ব্রাজিলের তুলনায় তাদের ল্যাটিন শত্রু আর্জেন্টিনা বরং অনেক বেশি নির্ভার, অন্তত নাইজেরিয়া, গ্রীস আর দক্ষিন কোরিয়ার পক্ষে বড় কোন অঘটন ঘটানো সম্ভব নয়, যদি আর্জেন্টিনা নিজেরাই চরমতম বাজে না খেলে। একইভাবে সি গ্রুপে ইংল্যান্ডও খুশি হবে বলেই ধরে নেয়া যায়, ৩ দলের মাঝে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউএসএ কেই ধরা যায়, যদিও রাশিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপে আসা স্লোভেনিয়া আর মিশরের সাথে "যুদ্ধ" জিতে আসা আলজেরিয়ার কাছ থেকে ২-১টা অঘটন দেখতে মন্দ লাগবে না।
বিশ্বকাপে কোন স্বাগতিক দলই কখনো প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়েনি, কিন্তু ফ্রান্স, মেক্সিকো আর উরুগুয়ের সাথে এ গ্রুপে থাকা চরম বাজে ফর্মের দক্ষিন আফ্রিকা সেটাই হয়তো প্রথমবারের মত ঘটিয়ে দিতে পারে। ইতিহাসের ধারা রাখতে দক্ষিন আফ্রিকার ব্রাজিলিয়ান কোচ কার্লোস আলবার্তো পারেইরাকে অনেকদূরই যেতে হবে, সন্দেহ নেই। তবে কষ্ট করতে হবে না স্পেনের কোচকে, ভয়াবহ ফুটবল খেলে বাছাই পর্বে ১০ ম্যাচের সবক'টিতেই জয় পাওয়া স্পেনের কাছে হন্ডুরাস, চিলি আর সুইজারল্যান্ডকে শিশুতোষ দল মনে হওয়াই স্বাভাবিক। বাছাইপর্বের শেষদিকের ফর্ম ধরে রাখতে পারলে, স্পেনের সাথে এখান থেকে ২য় রাউন্ডে চিলি একটা জায়গা করে নিতেও পারে।
জার্মানির গ্রুপটাও সম্ভবত "গ্রুপ অভ ডেথ" এর জন্য নাম জমা দিতে পারে। সদ্য এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনে যোগ দেয়া অস্ট্রেলিয়া গত বিশ্বকাপে যথেষ্টই সমীহ জাগানো খেলা দেখিয়েছে, যেমন অনেক বড় দলের আতংক হয়ে দেখা দিতে পারে মাইকেল এসিয়েনের ঘানা-ও। সার্বিয়া নতুন দল, সুযোগ থাকছে তাদেরও। এদিকে হল্যান্ডের গ্রুপটাও একেবারে সোজা না, নিজের মহাদেশে ক্যামেরুন আর বাছাইপর্বে ভাল খেলা বরাবরের জায়ান্টকিলার ডেনমার্ক পরের রাউন্ডের দাবীদার, সব মিলিয়ে জাপানের সম্ভাবনা এখানে কমই।
তবে, এতসব হিসাব-নিকাশ শুধুই আড্ডার টেবিল গরম করার জন্য, বিশ্বকাপ ফুটবল, বা বলা ভালো, ফুটবল খেলাটাই কবে হিসাব মেনে চলেছে? হিসাব মানলে তো আর ১৯৫০ এ ফুটবল পরাশক্তি ইংল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হারে না, প্রথমবার বিশ্বকাপে আসা উত্তর কোরিয়া কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে পারে না ১৯৬৬ তে, ১৯৯০ এ রজার মিলার ক্যামেরুনের কাছে হোঁচট খায় না আর্জেন্টিনা, সেনেগাল ফ্রান্সকে বাড়ির টিকেট ধরিয়ে দেয় না। অঘটনের সংখ্যা বলে শেষ করা যায় না, আর সেটাই এই খেলার সৌন্দর্য্য, শেষ কথা বলে কোন কিছু ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত নেই।
ফুটবল পাগলরা, আসুন আমরা সেই মুহূর্তগুলোর অপেক্ষায় থাকি, আর ততক্ষণ আড্ডার টেবিল গরম করে ফেলি ফুটবল নিয়ে।
ফুটবলের জয় হোক।
[খবরে দেখলাম, বাংলাদেশ ৪-১ গোলে ভূটানকে হারিয়েছে, স্বস্তি পেলাম, খানিকটা খুশিও। মনে হয়, বেইজ্জতি এইবার একটু কম হবে। শুভকামনা ওদের জন্যও।]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

