ক্ষোভ-হতাশা প্রকাশ করে লেখা ছেড়ে দিয়েছি আজকাল, এতদিনের অভিজ্ঞতায় এটা জেনে গেছি যে লেখালেখি করে কিছুই হয় না। আমাদের আগেও অনেক বড় বড় কুতুব সেই চেষ্টা করে গেছেন এবং শেষপর্যন্ত দুর্বৃত্তদের বাঁকা হাসি দেখা ছাড়া আর কোন লাভ হয়েছে বলে মনে পড়ে না, সেটা রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি সবখানেই সত্যি। আমজনতা সম্ভবত প্রতিকার চায়ও না, বরং যারা প্রতিকার চায় তাদের পাগল ঠাউরে হুজুগে জনতার লাফঝাঁপও দেখা যায়, মাঝ দিয়ে সময় নষ্ট শুধুশুধু। তারপরেও ক্রোধ মাঝে মাঝে সীমা ছাড়িয়ে যায়, চেপে রাখলে স্বাস্থ্যহানির সম্ভাবনা, অন্তত
দু'টো চিৎকার দিয়ে সেটাকে বের করে দিলে দেশ-জাতির না হোক, নিজের স্বাস্থ্যের মঙ্গল হবে ভেবেই এবারে কীবোর্ডে খটখট করা।
যে কারণে, বা বলা ভাল, যে মহামানবের জন্য এই প্যাঁচালের অবতারণা, তিনি হলেন মান্যবর জনাবে আ'লা আলী আহসান মুজাহিদী, আমজনতার কাছে যিনি একজন বিশিষ্ট রাজাকার হিসেবে পরিচিত। "রাজাকার" এর যোগরূঢ়ি অর্থ যেসব নাবালক এখনো জানেন না, তাদের জন্য বলি, শাব্দিক অর্থে "সাহায্যকারী" হলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে "রাজাকার" বলতে এক প্রকার মানুষের চেহারার ঘৃণ্য প্রাণীকে বুঝায়, যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে হানাদার নরপশু পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর জবরদখল এবং গণহত্যায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছিল, মদদ দিয়েছিল নিজের
জাতিকে ধ্বংস করার চক্রান্তে। এদের উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের মাঝে রয়েছে পাকিস্তানী সেনানায়কদের গণহত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নে তথ্য এবং লোকবল এবং সরাসরি অস্ত্রহাতে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান দেয়া এবং তাদের উপর আক্রমণ, পাকবাহিনীর জন্য লুটপাট এবং রসদ সরবরাহে অংশ নেয়া, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশ এবং মুক্তিবাহিনীকে "ভারতীয়দের চর" এবং "দুষ্কৃতিকারী" আখ্যা দিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতি প্রকাশ করা, সর্বোপরি গণহত্যা এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরুদ্ধে সক্রিয় পরিকল্পক হিসেবে অংশ নেয়া।
তো, এতসব কীর্তিকাণ্ডের সর্দারস্থানীয় যারা, তাদের মাঝে গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদী, মঈনুদ্দীন, কামারুজ্জামান প্রভৃতি রাজাকারের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এত রাজাকারের মাঝে এই মহাত্মাদের নাম এত তাজিমের সাথে উচ্চারণ করার কারণ হলো, গণহত্যা এবং মুক্তিবাহিনীকে ধ্বংসের পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের এদের সক্রিয় এবং অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন। মোটের উপর, জোর করে চোখ বন্ধ করে না রাখলে এদের কার্যকলাপ এমনকি তাদের নিজেদের পক্ষেও এড়িয়ে যাওয়া কষ্টকর। তৎকালীন প্রতিটি সংবাদপত্রে এদের কীর্তিকলাপের বিবরণ জ্বলজ্বল করছে, এমনকি তাদের নিজস্ব পত্রিকা "দৈনিক সংগ্রাম" এর তখনকার সংখ্যাগুলো দেখলেই সেটা বোঝা যায়।
এই গলাকাটা দলের সর্দাররা স্বাধীনতার পরে ভেগে যায় নানা জায়গায়, তারপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে "জামাতে ইসলামী" নামের একটা দলের সর্দার হয়ে বসে। ছলে-বলে-কৌশলে এরা মোটামুটি সংখ্যক নিবেদিতপ্রাণ সদস্য জুটিয়ে ফেলে, বিশেষ করে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদেরই "টার্গেট গ্রুপ" করায় অচিরেই এই দলটি বাংলাদেশের রাজনীতি এবং অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় বেশ জাঁকিয়ে বসে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলনে এরা বেশ দৌড়ের উপর থাকলেও, পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের সাথে জোট বেঁধে এরা সংসদেও চলে যায়, যদিও শোনা যায়, তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীও হুজুরে আ'লা গোলাম আযমের পদধূলি নিতে গিয়েছিলেন।
আস্তে আস্তে এরা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে থাকে, এবং ২০০১ এর নির্বাচনের পর মন্ত্রীসভায় দু'টি জায়গাও বাগিয়ে ফেলে, কুখ্যাত রাজাকার মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মুজাহিদী সেই জায়গা দু'টি নিয়ে দলের ভিত শক্তও করে। এরই মাঝে তারা বেশ কিছু ব্যাঙ্ক, বীমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব রাখার মত একটা অবস্থায় চলে যায়, সাথে মধ্যপ্রাচ্যের অবিরাম সমর্থন এদের সুরক্ষাবর্ম হিসেবেও কাজ করে। সাথে চলে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের দলে অন্তর্ভুক্ত এবং ব্রেইনওয়াশ করে এবং একই সাথে যোগ্যতা অনুযায়ী নানা সুযোগসুবিধা দিয়ে দলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, এবং দৃঢ় ও কার্যকরী চেইন অভ কমান্ড স্থাপন। সব মিলিয়েই জামাতে ইসলামী নিজেদের কুকীর্তি ঢাকা দেয়ার জন্য বেশ গোছালো একটা ব্যবস্থা করে ফেলে নিজেদের একটা ধরাছোঁয়ার বাইরের অবস্থাতেই নিয়ে যায়।
এরই মাঝে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে জামাতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বিএনপি ক্ষমতা হারায়,এবং দিনবদল আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। বেকুব জনতা আবারো আশায় বুক বেঁধে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ক্ষমতায় আনে আওয়ামী লীগকে, শেখ হাসিনার মিঠে বুলিতে ভুলে যায় যে ১৯৯৬ তেও ক্ষমতায় যাবার আগে এমন এক প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেটা ভাঙার উদাহরণ আছে এই দলের। সরকার গড়া হয়, দিন যায়, ধীরে ধীরে যুদ্ধাপরাধী ইস্যুও ডিপফ্রিজে ঢুকে যেতে থাকে। গর্ত থেকে আবারো মাথা তোলে কালসাপ, লকলক করে জিহ্বা বের করে নিজামী আর মুজাহিদীর মত বিশ্বাসঘাতক নরপিশাচ। অন্য দলের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেয় জামাত, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বৃত্তি দেয় জামাত, জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুভানুধ্যায়ী আর নিবেদিতপ্রাণ সদস্য বাড়িয়ে চলে জামাত, অন্য দুই দলের সন্ত্রাস আর টেন্ডারবাজির কুকুর লড়াইয়ের ফাঁকে মেধাবী প্রজন্মের চোখে ধুলো দিয়ে তাদের মগজধোলাই করে চলে জামাত।
অবশেষে, এবার, ডিসেম্বর মাসে, বিজয়ের এই মাসে, যখন ৩৮ বছর আগে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছিল কুকুর আর হায়েনারা আর আমরা তথাকথিত আন্তর্জাতিক চাপ আর উদারতার নামে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম সেসব কুকুরদের, তারা আবার লেজ উঁচিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে নানা টালবাহানায় ধীরে ধীরে বোঝা হয়ে যেতে থাকে, নেহাৎই ভোটে জেতার অস্ত্র হিসেবেই ছিল এই স্লোগান, আর সেটা বুঝেই যেন আরেক দল তাদের কাউন্সিলে অতিথি করে নেয় মতিউর রহমান নিজামীকে। সদর্পে এবার ঘোষণা আসে মুজাহিদীর পক্ষ থেকে--
"আমরাই স্বাধীনতা এনেছি, আমরাই তা রক্ষা করবো।"
৩৮ বছর পরে, অবশেষে, এবার যেন সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চূড়ান্ত পরাজয় ঘটলো, স্বাধীন বাংলার বুকে হায়েনার এই দর্পিত উচ্চারণে পদাঘাত হলো ৩০ লক্ষ শহীদের বুকে। তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার যখন ক্ষমতায়, তখন বুদ্ধিজীবি হত্যাসহ পাকবাহিনীর সকল গণহত্যার প্রত্যক্ষ মদদদাতার এই উচ্চারণ সত্যিকার অর্থেই জাতি হিসেবে আমাদের সকল সম্মান ধুলায় মিশিয়ে দিল।
সম্ভবত আমরাই দায়ী, ভোটের খেলায় হয় আমরা ক্ষমতায় পাঠাই রাজাকারের পাচাটা বিএনপি নয়তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগকে, আর দূরে বসে জিভ বের করে হাসে গোলাম আযমের প্রেতাত্মারা। বিচার হয় না, শান্তি পায় না গণকবরে শুয়ে থাকা আমার দেশের নিরীহ মানুষগুলো, বেয়নেট আর বুলেটের ক্ষত নিয়ে মাটির গহীনে কাঁদে আমার নিহত পূর্বপুরুষ। অভিশাপ দেয় আমাদের শহীদ
শিক্ষাগুরুরা, ধিক্কার দেয় আমাদের বীরশ্রেষ্ঠরা, আর আমরা বুড়ো আঙ্গুল মুখে পুরে ডিজিটাল নেটওয়ার্কে বসে ভাবি, যাকগে, এত আগের কথা ভেবে লাভ কি, ক্ষতি তো কিছু হচ্ছে না, খামোকা ৩৮ বছর আগের ঘটনা নিয়ে টানাটানি।
সত্যিই তাই? এভাবেই আমরা ছেড়ে দেব? নেতারা বিচার করেনি বলে কি ক্ষমা করে দেবে আমাদের শহীদ যোদ্ধারা? কারা নেতা? বিচার করার তারা কে? বিচার না করলেই কি খুনী রাজাকার নিষ্পাপ হয়ে যায়? ভুলে যেতে বলে আমাদের, কেন আমরা ভুলে যাব? ৩০ লক্ষ মানুষের জীবন ফিরিয়ে দিতে যদি না পারে, কেন আমরা ক্ষমা করবো? বুলেট আর ট্যাঙ্কের গোলায় ছিন্নভিন্ন জ্বলন্ত বাংলাদেশের আত্মা যাদের ক্ষমা করবে না, নিয়ন আলোয় স্বাধীন দেশে শীতল হাওয়া খেয়ে তাদের ক্ষমা করার আমরা কে? আমরা ভুলবো না, আমরা ক্ষমা করবো না, যদি জীবিত অবস্থায় ওদের বিচার করতে না পারি, আমরা ওদের লাশের বিচার চাই। এই নরপিশাচদের আদর্শ নিয়ে যে বিষবৃক্ষ বড় হয়ে উঠছে, সেই বিষবৃক্ষের শেকড়সহ আমরা উপড়ে ফেলতে চাই। আমরা আরেকবার
আমাদের বাংলার বুকে সাপের বিষনিঃশ্বাস দেখতে চাই না, আমরা স্বাধীনতা নিয়ে মুজাহিদীদের অশ্লীল রসিকতা দেখতে চাই না।
আমরা খুনী-দালাল যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের রক্ষাকারীদের অস্তিত্বসহ বিনাশ চাই, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তেঋণের বিনিময় চাই, আমরা হত্যাকারী ঘাতক দালালদের ফাঁসি চাই।
[পোস্টের বিষয়বস্তু পুরানো, কিন্তু পুরানো জিনিস মাঝে মাঝে ঝালাই করে নিলে স্মৃতির ধুলো সরে, মরচে পরিষ্কার হয়। জাতি হিসেবে আমরা আবার বড়ই বিস্মৃতিপরায়ণ কিনা!]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

