somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... দরকষাকষির ইতিবৃত্ত-১: প্রস্তুতি ও পদ্ধতি
এই দরকষাকষির বিষয়টা শুধু মাছের বা গরুর বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকলে, এটা নিয়ে সম্ভবত লেখার দরকার হতো না। কিন্তু "নেগোশিয়েশান" বা মুলামুলি ব্যাপারটা মাছবাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কূটনীতি আর বাণিজ্যেও। এতটাই যে দক্ষ একজন নেগোশিয়েটর (মুলাবাজ বলা যায় কি?) গড়ে তোলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, অভিজ্ঞতার ব্যাপার তো আছেই। কারণ? সহজ একটা উদাহরণ দেয়া যায়, বাংলাদেশ কেন আন্তার্জাতিক চুক্তিগুলোতে সবসময় "ব্যাকফুট"-এ থাকে? কেন দেখা যায় প্রায় সবধরণের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক চুক্তিতেই আমাদের লোকসান হয়? চুক্তি সম্পাদন হয়ে যায়, কাজ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু যখনই কোন ঝামেলা দেখা দেয়, তখন ফাঁস হয়,, মূল চুক্তির প্রায় প্রতিটি শর্তই আমাদের প্রতিকূলে করা। তখন নানারকম অজুহাতও বের হয়ে যায়, খেয়াল করা হয়নি, জানা ছিল না, প্রতিপক্ষ শক্তিশালী রাষ্ট্র ইত্যাদি। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি বলুন, ট্রানজিট চুক্তি বলুন, তেল-গ্যাস রপ্তানি চুক্তি বলুন, আর হালের ব্যর্থ তিস্তা চুক্তি বলুন, প্রতিটিতেই আমাদের উপরমহলের সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অভাব এবং দরকষাকষিতে অভিজ্ঞতা আর দক্ষতার অভাবকেও বড় একটা জায়গা দিতেই হবে।

তাহলে, এই দরকষাকষির জন্য কি করতে হবে? প্রথম কথাই হলো, দীর্ঘ এবং শ্রমসাপেক্ষ প্রস্তুতি, এর কোন বিকল্প নেই। এটা মনে রাখা জরুরী, যে বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক কোন চুক্তি হয়, এবং সেটা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, সেটার অর্থমূল্য যেমন অকল্পনীয় হতে পারে, এর রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী হয়, কাজেই আপনার প্রতিপক্ষ সর্বোচ্চ প্রস্তুতি এবং তাদের সবচেয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়েই আসবে, যাদের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভারত এর একটা ভাল উদাহরণ, বাংলাদেশের সাথে যে কোন ধরণের চুক্তির দরকষাকষিতে তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবচয়ে ঝানু ব্যক্তিদেরই পাঠায়। উল্টোদিকে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে, ভারতের সচীব পর্যায়ের ধুরন্ধর, অভিজ্ঞ, দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত প্রতিপক্ষের ভ্রুকুন্ঞ্চন আর কৌশলের কাছে মার খেয়ে তাদের শর্ত মেনে নিয়েছেন। ভারতীয়দের "টিম ওয়ার্ক" বা দলীয় সমঝোতা অসাধারণ, কে আগে কথা বলবে, কে পরে, কার কথার পিঠে কে কি যোগ করবে, যে কোন অভিজ্ঞ নেগোশিয়েশন টিমের মতই তাদের সেটা আগেই ড্রেস রিহার্সাল করা থাকে, এবং বার্সেলোনার পাসিং ফুটবলের সামনে মোহামেডানের যে অবস্থা হতে পারে, বাংলাদেশের অবস্থা মোটামুটি তাই হয়। ভারতীয়দের দোষ দিয়ে লাভ নেই, বাজারের সেরা মাছটা কম দামে কিনে যখন আপনি বাড়ি ফেরেন, আপনার স্ত্রী নিশ্চয়ই অখুশি হন না।

এই দরকষাকষি বা নেগোশিয়েশান কে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। আমরা যেটা আলোচনা দেখি, সেটা আসলে অনেক পরের ব্যাপার। প্রস্তুতি, তথ্য সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ, আলোচনা, বিডিং বা প্রস্তাব উত্থাপন, তর্ক, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, র্যাটিফিকেশন বা অনুমোদন এবং সবশেষে চুক্তি স্বাক্ষর। এর মাঝে যে কোন পর্যায়ে আলোচনা ভেঙেও যেতে পারে, সেটা অন্য ব্যাপার। প্রস্তুতি পর্ব, আগেই বলেছি, শ্রমসাধ্য, সময়সাপেক্ষ, এবং অনেক ক্ষেত্রেই ব্যয়বহুল হতে পারে। প্রথমেই নিজেদের এজেন্ডা এবং চাহিদাগুলো পরিষ্কারভাবে জেনে নিতে হয়, মোটামুটি ৩টি ভাগে ভাগ করে নিতে হয়-- যে দাবীগুলো অবশ্যই আদায় করতে হবে, যেগুলো আদায় করতে পারলে ভাল হয়, এবং সবশেষে যেগুলো আদায় না হলেও খুব ক্ষতি নেই কিন্তু হলে একেবারে পোয়াবারো। এজেন্ডা ঠিক করে নিয়ে পরবর্তী কাজ হলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সত্যিকারের বিশেষজ্ঞদের নেগোশিয়েশান টিমে নিয়োগ দেয়া, যে জায়গায় আমরা বরাবরই পিছিয়ে থাকি। এখানে বেশিরভাগ দলেই জায়গা পাওয়া যায় লবিংয়ের ভিত্তিতে, এই সুযোগে বিদেশ ভ্রমণ হয়ে গেলে তো কথাই নেই। বিশেষজ্ঞদের সাথে একজন অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত নেগোশিয়েটর থাকবেন পুরো ব্যাপারটা সমন্বয় করার জন্য, যিনি, যদি চুক্তির ইস্যুতেও একজন বিশেষজ্ঞ হন তবে দলনেতার ভূমিকাও পালন করতে পারেন। এ পর্যায়ে শুরু হয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের খুঁটিনাটি পর্যালোচনা, নিজেদের শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা, সম্ভাব্য সমাধান, এবং আলোচনা কোন কোন দিকে মোড় নিতে পারে এবং সেক্ষেত্রে করণীয়। একইসাথে নিজেদের "রেজিস্ট্যান্স পয়েন্ট" কতটুকু, অর্থাৎ কতটা ছাড় দেয়া সম্ভব এবং কোন পর্যায়ে আলোচনা ভেঙে উঠে যাওয়াই মঙ্গলজনক, সেটাও নির্ধারণ করতে হয়। আলোচনা ভেঙে গেলে সম্ভাব্য বিকল্পগুলো কি হতে পারে, অথবা বিকল্প আরো কোন প্রস্তাব দেয়া হবে কিনা, সেটাও পূর্বনির্ধারিত থাকা জরুরী। এখানে মনে রাখা ভাল যে যার হাতে সম্ভাব্য বিকল্প যত বেশি, আলোচনার টেবিলে তার অবস্থান ততটাই শক্তিশালী, এবং আলোচনার শুরুতেই নিজেদের এই বিকল্পের ব্যাপারটা আভাসে-ইঙ্গিতে প্রতিপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়াও কৌশল হিসেবে মন্দ নয়।

শুধু নিজেদের প্রস্তুতি নেয়াটা যথেষ্ট না, প্রতিপক্ষ সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, তাদের সম্ভাব্য দরকষাকষির কৌশল, তাদের "রেজিস্ট্যান্স পয়েন্ট", সম্ভাব্য সামর্থ্য ও প্রস্তাব, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিপক্ষের হয়ে কারা দরকষাকষি তে আসছেন সেসব ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রোফাইল ও আলোচনার কৌশল নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা খুবই গুরুত্ববহ। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, আমাদের আমলা বাহিনী নিজেদের এজেন্ডা নিয়েই ঠিকমত রিসার্চ বা গবেষণা করেন না, প্রতিপক্ষ তো দূরে থাক, যার ১০০ ভাগ সুযোগ নিয়ে যায় অন্যপক্ষ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, নেগোশিয়েশানের উপর ক্লাস নিতে এসেও সিনিয়র আমলারা খেই হারিয়ে তো তো করেন, কারণ যেটা পড়াচ্ছেন সেটা একবার তারা দেখে আসারও প্রয়োজন বোধ করেননি। ব্যাপারটা নিজেদের দলের আত্মবিশ্বাসকে তলানিতে নামিয়ে দেয়, আর প্রতিপক্ষ নিশ্চিত হয়ে যায় আমাদের অপ্রস্তুত অবস্থা ও নিজেদের অবস্থানের ব্যাপারে, ফলে সম্ভব-অসম্ভব সবরকম শর্ত চাপিয়ে দেয় আমাদের উপর এবং যেহেতু আমলা বাহিনীর এসব ব্যাপারে কোন ধারণা আর মাথাব্যথা কোনটাই নেই, তারা কোনমতে চুক্তিটা সই করে শপিংয়ে চলে যান, ফলাফল টের পাওয়া যায় যখন অক্সিডেন্টাল কোন গ্যাসকূপ জ্বালিয়ে দেয় বা নাইকোর চুক্তিতে আমরা ধরা খেয়ে যাই।

প্রতিপক্ষের অবস্থান ও শক্তিমত্তা বোঝার সাথে সাথেই ঠিক করে নিতে হয়, ঠিক কোন পদ্ধতি বা "অ্যাপ্রোচ" অনুসরণ করা হবে আলোচনার টেবিলে। সাধারণভাবে ২ ধরণের পদ্ধতি আছে, প্রতিপক্ষ যদি দুর্বল হয়, এবং নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী হয়, এবং সুসম্পর্কের ব্যাপারে খুব বেশি মাথাব্যথা না থাকে, সেখানে "কাড়াকাড়ি" বা "ডিস্ট্রিবিউটিভ" অ্যাপ্রোচ। এটাকে তুলনা করা যায় একটা "পাই" বা কেক এর সাথে, যার আকার নির্দিষ্ট, একজন যদি খানিকটা বেশি নেয়, তো আরেকজনের ভাগে কম পড়বে,কাজেই ছলে-বলে-কৌশলে যতটা পারো বেশি আদায় করে নাও। বাংলাদেশের সাথে আলোচনার টেবিলে বসলে ভারত বা আমেরিকার মত রাষ্ট্রগুলো এই কাজই করে থাকে। এক্ষেত্রে, শক্তিশালী কূটনীতি থাকলে (যেটা আমাদের নেই), বাংলাদেশ যে অ্যাপ্রোচটা নিতে পারে, সেটাকে বলা হয় "সহযোগী" বা "ইন্টিগ্রেটিভ" অ্যাপ্রোচ। প্রতিপক্ষ সমশক্তির হলে, বা চুক্তির বিষয়বস্তু দু'পক্ষের কাছের সমান গুরুত্বপূর্ণ হলে, অথবা সু-সম্পর্কের বিষয়টা গুরুত্ব পেলে এই পদ্ধতি নেয়া যায়। ধরে নেয়া যাক একটা কেক আছে, দু'পক্ষ মিলে ঠিক করলো কোন বিকল্প উপায়ে যদি কেক বা "পাই"টার আকার বড় করা যায়,
সেখানে দু'জনই খানিকটা বেশি পেতে পারে। এখানে সমস্যাগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হয়, এবং বলের চেয়ে বন্ধুত্ব গুরুত্ব পায়। এই পদ্ধতিতে "কস্ট ট্রান্সপারেন্সি" কথাটা ব্যবসায়িক মহলে বেশ গুরুত্ব পায়। উদাহরণ দিই। ধরুন কোরবানির হাটে গরু ব্যবসায়ী তার খরিদ্দারকে জানাবে গরুটা পালতে তার কত খরচ হয়েছে, কিভাবে হয়েছে, গাবতলীর হাটে আনতে কত চাঁদা দিতে হয়েছে, খরিদ্দারও জানাবে এটা বাড়ি নিতে কত খরচ আর ঝামেলা হবে, এমন সময় গরু বিক্রেতা প্রস্তাব করতে পারে, নিখরচায় তার লোক গরুটাকে খরিদ্দারের বাড়ি পৌঁছে দেবে, খরিদ্দার যেন তার বলা দামটা একটু বিবেচনা করেন। মানে দু'পক্ষ
একেবারে ভাই-ভাই। বাংলাদেশের সাথে ভূটান বা মালদ্বীপের চুক্তিগুলো সাধারণত এই ধরণের হয়ে থাকে। এ ধরণের দ্বি-পাক্ষিক ছাড় বা "কনসেশন" কাড়াকাড়ি অ্যাপ্রোচেও হয়, তবে সেখানে শক্তিশালী পক্ষ সামান্য ছাড় দিয়েই এমন ভাব করবে যেন কৃতার্থ করে ফেললো, বদলে নিজেরা বিশাল কোন "কনসেশান" আদায় করে নেবে। উদাহরণ? ভারত আমাদের কিছু পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দিল, যেগুলো আসলে তাদের নিজস্ব পণ্যের বাজারে তেমন ক্ষতি করবে না, বদলে হয়তো আদায় করে নিল ট্রানজিট ফি এর উপর বড় ধরণের ছাড়, আমরাও ভাবলাম, যাক বাবা, বিশাল জিতলুম, যদি ছাড় না দিত, কি করতুম?

আলোচনা কিভাবে এগোবে সেটা ঠিক করার পর সত্যিকারের আলোচনায় বসার পালা। তবে তার আগেই নিজেদের মাঝে মহড়া দিয়ে নেয়া জরুরী। এখানে অভিজ্ঞ নেগোশিয়েটররা আগেই দু'টো দল করে নেন, একটা দল "মার্ডারার" এর ভূমিকা পালন করে, যাদের কাজ হলো নেগোশিয়েশান টিম-এর সম্ভাব্য সকল খুঁত ধরে তাদের খুন করে ফেলা, যাতে সত্যিকারের আলোচনায় তারা খুন হয়ে না যায়। কোন কোন ইস্যুগুলোতে ছাড় দেয়া যায়, কোথায় দেয়া যায় না, এর সাথেই ঠিক করে ফেলতে হয় "প্রটোকল", অর্থাৎ কোথায় আলোচনা হবে, কতক্ষণ ধরে চলবে, বসার আয়োজন কেমন হবে, কারা অংশ নেবে, কারা কথা বলবে,, কারা সাহায্য করবে, কারা আলোচনার অগ্রগতি লিপিবদ্ধ করবে ইত্যাদি প্রতিটি খুঁটিনাটি।আবারো মনে করিয়ে দেয়া যায়, টিমওয়ার্ক এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পারস্পরিক সমঝোতা থাকলে প্রতিকূল পরিবেশকেও নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসা যায়। একইসাথে প্রস্তুত থাকা ভাল সম্ভাব্য যেকোন রকম অপ্রত্যাশিত আক্রমণের জন্য, এবং এধরণের পরিস্থিতি হলে "টাইম আউট" বা সময় নিয়ে ধীরে-সুস্থে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই ভাল। প্রতিপক্ষ সবসময়ই চাইবে এ ধরণের আচমকা আক্রমণে সুবিধা বাগিয়ে নিতে, এক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করে তাদের সাথে একমত হয়ে গেলে নিজের পক্ষের বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যাবার কথা। এখানেও জানতে হবে ঠিক কতটুকু ছাড় দেয়া যায়, নিজেদের সীমাটুকু জানা থাকলে, যদি সেই লক্ষ্য অর্জিত না হয়, এমনকি আলোচনা ভেস্তে গেলেও সেক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার বদলে "দুঃখিত" বলে উঠে আসাই দক্ষ নেগোশিয়েটর এর কাজ।

সবশেষে, দু'পক্ষের ছাড়-আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত শর্তগুলো ঠিক হয়ে গেলে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ সেটা রাটিফাই বা অনুমোদন করবেন, এরপরই চূড়ান্ত হবে চুক্তি। তবে এখানেও মনে রাখা প্রয়োজন, যদিও নেগোশিয়েটরের হাতেই প্রায় সব ক্ষমতা থাকে আলোচনার, কিন্তু সব শর্ত চূড়ান্ত হবার মুহূর্তেও প্রতিপক্ষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত দিয়ে বসতে পারে (পরবর্তী পর্বে আলোচ্য), কাজেই যিনি রাটিফাই বা অনুমোদন করবেন, তাঁকেও বিদেশের দর্শনীয় জায়গা দেখার তাড়াহুড়োতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে না দিয়ে পুরো ব্যাপারটা শেষবার নিজেদের মাঝে আলোচনা করে অনুমোদন দেয়ার ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে।

এবার, এমন গুরুদায়িত্ব যার কাঁধে, কেমন হবেন তিনি? তাঁর যোগ্যতা, দক্ষতা কি? আলোচনার টেবিলে তার কৌশল, আচরণ কেমন হতে পারে, বা হওয়া উচিত? প্রতিপক্ষের ঝানু অভিজ্ঞ নেগোশিয়েটর দের আক্রমণ তিনি সামাল দেবেন কিভাবে?যদি এখনো পাঠক বিরক্ত হয়ে গিয়ে না থাকেন, পরের পর্বে আলোচনার আশা রাখি। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29489777 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29489777 2011-11-24 20:20:46
উচ্চশিক্ষার অধিকার এবং বেনিয়াদের ধান্দাবাজিঃ প্রসঙ্গ জগন্নাথ
এবার একটু অন্যদিকে তাকাই। আজকের পত্রিকার খবর-- "কর দেবেন না মন্ত্রী-সাংসদরা।" নাও সামলাও এবার, ২ পয়সার কর্মচারীরাও কর দেবে কিন্তু মহান নেতারা দেবেন না, তারা যে আমাদের ভোটে দেশ-জাতি উদ্ধারের ইজারা পেয়েছেন। দেশের সব লোক গাড়ি আমদানি করলে ৪০০% শুল্ক, হুজুররা করলে শুল্ক মাফ। নামে-বেনামে থাকা তাদের নানারকম ব্যবসা-বাণিজ্যে তারা কত হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকি দেন সেটা বাদ-ই দিলাম, কিন্তু এই সরকারী বেতন-ভাতার উপরও নির্লজ্জের মত করটা মওকুফ করিয়ে না নিলে তাদের হচ্ছিলো না। এখানে আবার মজার বিষয় আছে, সারাবছর আমাদের দু'দলের নেতা-নেত্রীরা একে অপরের মা-বাপ তুলে গালিগালাজ করে থাকেন, কিন্তু বেতন-ভাতা বৃদ্ধি বা কর-শুল্ক মওকুফের বেলায় সব সুড়সুড় করে এক বাক্সেই ভোট দেন, এমনকি বিরোধিতার খাতিরেও কেউ বিরোধিতা করেন না। কতখানি বেহায়া হতে হয় এই দেশে রাজনীতি করতে হলে?

আবার প্রথম প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমজনতার যেকোন দাবীকে যেকোন সরকারই সন্দেহের চোখে দেখে থাকে, আমাদের দেশের সরকারগুলো আরো এক কাঠি বেশি সন্দেহবাতিকগ্রস্থ, মানুষের যে কোন দাবীকেই তারা সরকারের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। সরকারপ্রধানদের কানে পানি ঢালার জন্য সুবিধাবাদী চাটুকারদেরও অভাব হয় না, কাজেই জগন্নাথের ছাত্রদের প্রতিবাদে সরকারের প্রতিক্রিয়াও আশার বিপরীত কিছু হয়নি, পুলিশ নামিয়ে এবং সাথে দলীয় ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী নামিয়ে বেয়াদব পোলাপানকে আচ্ছামত শায়েস্তা করা হয়েছে। সরকারের এধরনের প্রতিক্রিয়ায় আজকাল আর অবাক বা হতাশ কোনটাই হই না, অনেক আশা নিয়ে ভোট দিয়ে বোকা জনগণ বুটের লাথি খাবে এটাই নিয়ম হয়ে গেছে, এবং যতদিন এসব আবর্জনাকে ছুঁড়ে ফেলার মত বুদ্ধি তাদের মাথায় না গজাবে ততদিন এই লাথি তাদের পাওনা বলেই মনে করি, পৃথিবীটা বোকাদের জায়গা না। কিন্তু হতাশ এবং আতঙ্কিত হই, যখন আন্তর্জালের শিক্ষিত সুবিধাভোগী শ্রেণীর লোকজন "অর্থের বিনিময়ে উচ্চশিক্ষা" জাতীয় ধারণা নিয়ে কোমর বেঁধে নামেন, আর নানারকম উচ্চমার্গের যুক্তি আর রেফারেন্স দিয়ে সেটাকে জায়েজ করার চেষ্টায় প্রাণপাত করেন।

এই শ্রেণীর লোকজনের যুক্তিগুলোর ২-১টা নমুনা দেয়া যাক। প্রথম ও প্রধান যুক্তি, শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার, উচ্চশিক্ষা নয়, সেটা "প্রিভিলেজ" বা সুবিধা। আরেকটা হলো, দেশের সরকারের টাকা নেই, এত টাকা উচ্চশিক্ষায় ব্যয় করে শিক্ষিত বেকার বাড়ানোর কোন মানে নেই, তারচেয়ে এই টাকা প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যয় করা ভালো (আহা, কত দরদ!)। আরো একটা হলো, আমেরিকার সব বিশ্ববিদ্যালয় তো নিজের খরচে চলে, আমরা পারবো না কেন? বেশ, খুবই চমৎকার সব যুক্তি, দেখা যাক এগুলোর পেছনে সারবস্তু কতটুকু। প্রথমেই, উচ্চশিক্ষা মৌলিক অধিকার নয়, গরিবের জন্য ওটা বিলাসিতা, ঐ জিনিস শুধু বড়লোকদের অধিকার। বটে? তোর বাপের পয়সা আছে বলে তুই সব খাবি, আমার বাপের নেই বলে আমি দু'পাতা বেশি পড়তে পারবো না? মহোদয়গণ, যে পয়সায় আপনি উচ্চশিক্ষা কিনতে চান, সেটা কি আপনি জন্মের সময় পকেটে করে নিয়ে এসেছেন? বাপের পয়সায় এমন ফুটানি যে অন্যদেরকে উঠতেও দেবেন না, সব নিজেই খাবেন? দেশের সব সম্পদ এবং সুবিধা একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শ্রেনীর ভোগ করার বন্দোবস্তকে পাকাপাকি করে ফেলার এই বু্দ্ধি অনেক আগেই ব্রিটিশরা আমাদের দিয়ে গিয়েছিল, এখন তাদেরই উত্তরাধিকারী বিশ্বব্যাংকের কূটচাল সফল করার জন্য হায়দরাবাদের নিজাম আর মীরজাফরের প্রেতাত্মাদের মাঠে নামতে দেখে খানিকটা আতঙ্ক বোধ না করে উপায় থাকে না। দোযখের বাঙালির কড়াইতে যে দারোয়ান লাগে না, এবং সামান্য হাড্ডি পেলেই যে আমরা স্বজাতির গায়ে কামড় বসাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করি না, এটা বেনিয়ারা অনেক আগেই বুঝেছিল আর সে বোঝাতে যে কোন ভুল ছিল না, নিজেরটুকু আদায় করে নিয়ে অন্যের অধিকার বন্ধ করে দেয়ার পক্ষের দালালদের গলাবাজিতে সেটা স্পষ্ট।

এরপরের যুক্তিটা আরো হাস্যকর, সরকারের টাকা নেই, কাজেই শিক্ষাখাতে ভর্তুকি কমাও। ঠিক ঠিক, দেশে আরো অন্তত ১০০ টা লোকসানি খাত আছে, সব বাদ দিয়ে কিনা শিক্ষাকেই ধরতে হবে। প্রতিরক্ষা খাতে বিশাল ব্যয় হয়, একটু কাটছাঁট করা হোক, বাংলাদেশ বিমান বিশাল অংকের লোকসান দেয়, সেটাকে লাভজনক করা হোক, যত বড় ব্যবসায়ী আছে, প্রতি বছর তারা কয়েক হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়ে থাকে, প্রকাশ্যেই ফাঁকি দেয় বলা যায়, সেসব বকেয়া কর আদায় করা হোক, আদায় করা হোক সকল খেলাপী ঋণ। মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সর্বস্তরের দুর্নীতি বাদ-ই দিলাম, শুধুমাত্র উপযুক্ত লোকসানি খাত সনাক্ত করে সেগুলো কিভাবে লাভজনক করা যায় সেই পরিকল্পনা নিলে এবং বড় অংকের কর ফাঁকিগুলো ধরলেই এরকম কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয় রাজার হালে চালানো যায়। সেটা না করে, কোন খাত লোকসান দিলেই সেটা বন্ধ করে দেয়া মানে মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা। এখানে উল্লেখ করা যায় আদমজীর কথা, ইউনিয়নবাজি আর দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংকের সুপারিশে আদমজী বন্ধ করে দেয়া হলো এমন একটা সময়ে, যখন বিশ্ববাজারে নতুন করে পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা দেখা দিচ্ছে। চাইলেই যে খাতটিকে অন্যতম লাভজনক শিল্পে পরিণত করা যেত, বেনিয়াদের সুপারিশে সেটা বন্ধ করে সেই বাজারটা তুলে দেয়া হলো ভারত এবং শ্রীলঙ্কার হাতে। তাছাড়া বড় কথা হলো, শিক্ষা কি কোন ব্যবসা খাত যে এটায় লাভ-লোকসান দেখতে হবে?

শেষ যুক্তিটা সবচেয়ে হাস্যকর, আমেরিকাতেও তো উচ্চশিক্ষা বিনা পয়সায় হয় না। কথা সত্যি, তবে ফাঁকি আছে। আমেরিকার সরকারি বেসরকারী সব বিশ্ববিদ্যালয়েই বিপুল পরিমাণে গবেষণা তহবিল আসে, ছাত্র-ছাত্রীদের সেটা নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাবার সুযোগ আছে। আমেরিকা সেভাবে জনশক্তি রপ্তানি করে না, ওদের ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষা নিয়ে বাইরে গিয়ে দেশের নাম ফাটাবে, এমন লক্ষ্যও তাদের নেই। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার ছেলেমেয়ে বের হয়ে বেকার ঘুরে বেড়ায় না, এদের অনেকেই পশ্চিমা দেশগুলোরই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতিত্বের সাথে কাজ করছে। এসব ছেলেমেয়ের অনেকেরই নিজের পয়সায় উচ্চশিক্ষা নেয়ার সামর্থ্য ছিল না, এই "অর্থের বিনিময়ে উচ্চশিক্ষা"র নীতি অনুসরণ করলে ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে উন্নত জীবন পাবার বদলে এদের অনেককেই এখন মোটর গ্যারেজে সেইসব অর্থবিত্তবান উচ্চশিক্ষাধারীদের গাড়ী মেরামত করেই জীবন কাটাতে হতো। আর উচ্চশিক্ষার মডেল যদি অনুসরণ করতেই হয়, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ের মত স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মডেল কেন নয় যেখানে উচ্চশিক্ষা অবৈতনিক? কেন বিশ্বব্যাংকের মডেলই নিতে হবে, যাদের মডেল অনুসরণ করে আজ পর্যন্ত কোন উন্নয়নশীল দেশ কোন দীর্ঘমেয়াদী সুফল পায়নি?

শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে এই অধমের ব্যক্তিগত কিছু মতামত আছে। শিক্ষা জিনিসটা কোন বাজারি জিনিস নয় যে সেটা অর্থমূল্যে পরিমাপ করা যাবে। শিক্ষা, সেটা প্রাথমিক হোক আর উচ্চশিক্ষা হোক, তার ফলাফল সুদূরপ্রসারী, এর মুল্য "ফিনানসিয়ালি" বা "অর্থকরী" ভাবে পরিমাপ না করে "ইকোনমিক্যালি" বা "অর্থনৈতিক"ভাবে পরিমাপ করাই উচিত। শিক্ষার উদ্দেশ্য টাকাকড়ি কামানো নয়, জ্ঞান অন্বেষণ এবং আত্মিক উন্নতি, এবং সত্যিকার অর্থে প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি্ষ্ঠার উদ্দেশ্য সেটাই ছিল, সে অতীশ দীপঙ্করের পাঠশালাই হোক আর অক্সফোর্ড আর ক্যামব্রিজই হোক। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন সব বিষয় পড়ানো হয় যেগুলোর তাৎক্ষণিক আর্থিক মূল্য মাপা সম্ভব নয়। দর্শন বা সংস্কৃত বা প্রাচ্যের ইতিহাস পড়ে কয় টাকা রোজগার হয়? ইজিপ্টোলজি পড়ার কি দরকার? সরবোঁতে যে পাগল ভাষাবিজ্ঞান পড়ে, সে কত টাকা রোজগারের আশায় যায়? ক্যালিগ্রাফির কোর্স করে কি হয়? মজার ব্যাপার হলো,, এই জ্ঞান অন্বেষণের ধারণাটা পশ্চিমারা নিজেদের মাঝে রেখে দিলেও সুকৌশলে আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে--"লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে", অর্থাৎ কিনা, পড়াশোনা করার লক্ষ্য হলো পয়সা কামানো। আর সত্যি বলতে কি, পয়সা কামাতে পড়াশোনা না করলেও চলে, বাজারের চালের আড়তদারের পয়সাকড়ি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় অধ্যাপকের চেয়ে অনেক বেশি, কিন্তু অধ্যাপক মশাইয়ের সাথে কথা বলে যে আত্মিক উন্নতিটুকু হয়, চালের আড়তদারের সাথে সারাদিন আড্ডা পেটালেও সেটা হচ্ছে না, এখানেই গোলমাল। কিন্তু আমাদের মাথায় ঢুকে গেছে, লেখাপড়া করতে হবে পয়সা কামানোর জন্য, কাজেই ব্যাঙের ছাতার মত গজাচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, আর সেখানে পড়ানোর বিষয় হলো হয় বিবিএ নয়তো কম্পিউটার নয়তো তড়িৎকৌশল, বাজারদর বেশি যে!

সে হোক, বাজারদর বেশি এমন বিষয় পড়ানোতে দোষের কিছু নেই, দক্ষ জনশক্তি খারাপ কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা বাঁধে যখন এই বাজারি ব্যবসা চালু রাখতে গিয়ে উচ্চশিক্ষার আসল উদ্দেশ্যের ঘাড়ে কোপ মারা হয়। যেহেতু ধারণা ঢুকে গেছে যে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো পয়সা কামানো এবং সেটার জন্য উচ্চশিক্ষার কোন দরকারই নেই, কাজেই পয়সা দিয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পোষার দরকার কি, দাও বন্ধ করে। স্বীকার করতে খারাপ লাগলেও এটা সত্যি, অনেকগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মান মাঝারি মানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ভাল নয়, বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেশনজটমুক্ত অনেকাংশে, রঙচঙও বেশি, কাজেই ভর্তুকি বন্ধ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার খরচ ১০ গুণ করে দিতে পারলে নিশ্চিতভাবেই এসব ছেলেমেয়ে সরকারি বাদ দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই ভর্তি হবে। লাভ টা কার? পরিসংখ্যান না দিলেও খোঁজ নিলে জানা যাবে, এই ভর্তুকি বাতিলের জন্য যারা কাজ করে যাচ্ছে, তাদের অনেকেরই এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানায় অংশীদারিত্ব আছে, অনেকগুলোর উপাচার্য বা শিক্ষক বা প্রশাসনিক পদেও উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে এসব কুলাঙ্গার। দীর্ঘমেয়াদী সুফল? ছেড়ে দিন না, আগেই তো বলেছি দোযখের বাঙালি কড়াইতে দারোয়ান লাগে না, নিজেরটা খেতে পারলে আমরা কবে পাশের লোকের দিকে তাকিয়েছি? আর বিশ্বব্যাংকের লাভ? হালাকু খান বাগদাদ দখল করে সবার আগে তার গ্রন্থাগার ধ্বংস করে দিয়েছিল, পাকিস্তানিরা বাংলাদেশ ছেড়ে যাবার আগে মেরে সাফ করে দিয়েছিল এদেশের বুদ্ধিজীবিদের। একটা দেশকে চিরতরে পঙ্গু করে রাখতে চাইলে, একটা চিন্তাভাবনার ক্ষমতাশূন্য মেধাহীন প্রজন্ম গড়ে তোলার বিকল্প আর কি হতে পারে?

সবশেষে একটু নিজের কথা বলি। মোটামুটি নিম্ন আয়ের পরিবারের ছেলে ছিলাম, ছোটখাটো একটা চাকরির বেতনে ঢাকা শহরে থাকা-খাওয়ার খরচা সামলে বাবা মোটামুটি কষ্ট করেই পড়াশোনা করিয়েছেন, এক সন্তান না হলে পারতেন কিনা সন্দেহ। বুয়েটে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম খানিক, ভর্তি হতে লেগেছে ৩৬০০ টাকা, বছর শেষে দিতেও হয় ওরকম একটা কিছুই। পরের বছর থেকে দেখি সেটা ১৪ হাজার বা ১৫ হাজার হয়ে গেছে, আমার বাবার বেতনের প্রায় সমান, মনে মনে ভাবলাম, যাক বাবা বেঁচে গেছি, স্বার্থপরের মতই। খরচ তেমন নেই, টুকটাক টিউশনি করি, ভালই চলে যায়। টনক নড়লো কিছু সিনিয়র, সহপাঠী এবং জুনিয়রকে দেখে, এমন অনেক ছেলে আছে বুয়েটেও, যাদের বছরশেষে ঐ ৩৬০০ টাকা দিতেও কষ্ট হয়, নিজেকে টিউশনি করে চলতে তো হয়-ই, বাড়িতেও টাকা পাঠাতে হয়, কখনো কখনো খাওয়ার কষ্টেও ভুগতে হয়। যারা একটু বেশি মনোযোগী ছাত্র, তাদের পক্ষে বেশি টিউশনি করা কঠিন, এদের অবস্থা না বলাই ভাল, আমার বিভাগের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ফলাফল করা এক বড় ভাই টিউশনি করতেন না, কোনমতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওয়া বৃত্তিগুলো (সেগুলোর পরিমাণও এত কম যে শুনলে লজ্জা পেতে হয় নিজেরও) দিয়ে চলতে হতো। বাকি গল্পটুকু রূপকথার মত, ঐ বড় ভাই আমার বিভাগেরই শিক্ষক হয়েছেন, ঐরকম ছেলেমেয়েরাও প্রায় সবাই দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত, এবং এটা শুধু নিজের দেখা অংশটুকুর কথা বলতে পারি, নিশ্চিত করে বলতে পারবো এমন রূপকথা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ বছরের ইতিহাসে আরো হাজারবার লেখা হয়েছে, এবং হবে, এবং খুঁজলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এমন গল্প কম পাওয়া যাবেনা। যেসব কুলাঙ্গার বলে উচ্চশিক্ষা মানুষের অধিকার নয়, যারা বলে যাদের বাবার টাকা নেই তাদের উচ্চশিক্ষার দরকার নেই, সেসব সারমেয়শাবকদের কাছে একটাই প্রশ্ন, বুয়েটের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সিজিপিএ ধারীদের একজনের কি উচ্চশিক্ষা পাবার অধিকার ছিল না?

বুয়েটে ভর্তির যুদ্ধটা বেশ তীব্র, উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলের ভিত্তিতে ভর্তি করে শুনে বুয়েটে পরীক্ষা দেবার আগে আরো ২-১টা জায়গায় ভর্তির আবেদন করেছিলাম, একটা ছিল আই ইউ টি। গিয়ে দেখি, ভর্তি হতে লাগে ২ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, যার মাঝে ৪ বছরে আবার বেশ খানিকটা ফেরত দেয়া হয়। হিসেব মিললো না, যদিও আই ইউটি-ও চলে ওআইসি'র ভর্তুকির টাকায় এবং অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় খরচটা অনেক কম, তারপরেও এত টাকা? মানে মানে কেটে পড়লাম, বুয়েটে যদি না-ও হয়, অন্য কোন একটা সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা পাবোই এমন আশায়। সুযোগ পেয়েছি, পড়ালেখা শেষ করে প্রকৌশলী হয়েছি, বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি করি এখন, বাবা-মায়ের উজ্জ্বল মুখের দিকে যখন তাকাই, নিজের জীবনটা সার্থক মনে হয়, এক জীবনে আর কি চাইতে পারি? তারপর যখন পত্রিকার পাতায় দেখি, আমার মত ছেলেগুলো নিজের অধিকার চাইতে গিয়ে বুটের লাথি খাচ্ছে, আর সুবিধাভোগী শ্রেণীর কিছু বরাহ শাবক, যারা কখনোই বুঝবে না পয়সার জন্য পড়তে না পারার কষ্ট টা কেমন, দাবী করছে যে সামর্থ্য না থাকলে উচ্চশিক্ষার "ঘোড়ারোগ" বাদ দিয়ে কারিগরি শিক্ষায় ঢুকে পড়তে যাতে সারাজীবন তাদের পদলেহন করা যায়, তখন সেই মুখ কালো হয়ে যায়। আমার মত "ফকিন্নির পোলা" দের তাহলে অধিকার নেই "হুজুর"দের কাতারে ওঠার? ব্রিটিশ ভূত তাহলে এখনো আমাদের ছাড়েনি যেখানে প্রভু সর্বদা প্রভু থাকবেন আর দাস থাকবে দাস? আমার মত হাজার হাজার ছেলেমেয়ে যারা সরকার এবং জনগনের বদান্যতায় নিজের জীবনটা গড়ে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছি, দেশে-বিদেশে থেকে কিছু একটা করার সুযোগ পাচ্ছি, তারা আসলে এতদিন অনধিকার সুযোগ ভোগ করেছে? একদিন আমিও আকাশ ছোঁব, এই স্বপ্ন দেখার অধিকার তাহলে আর কোন সামর্থ্যহীন ছেলে বা মেয়ের থাকবে না?

নিজের ভেতর থেকে জানি যে যদি প্রায় বিনা খরচে উচ্চশিক্ষা নেয়ার এই সুযোগটুকু আমার দেশের সরকার এবং মানুষ আমাকে করে না দিত, এখানে বসে নিজের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে এই লেখাটা লেখার সামর্থ্য আমার হতো না, আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখার দুঃসাহসও করতে পারতাম না, তাহলে কেন আমরা অন্যের আকাশ ছোঁয়ার সুযোগটুকুকে শুধুমাত্র তার সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে রুদ্ধ করে দিতে চাই?

এইটুকু স্বপ্ন দেখার অধিকার দিতে,এইসব সামর্থ্যহীন ছেলেমেয়ের মাঝে যে বিপুল সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে সেটা বিকাশের সুযোগ করে দিতে তো বিপ্লবী হবার দরকার নেই, মানুষ হলেই চলে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29458432 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29458432 2011-10-01 22:46:00
৯/১১ আর আধুনিক বর্ণবাদ
তাহলে? প্রশ্নটা আসলে "মুসলিম-অমুসলিম" নিয়ে না, প্রশ্নটা চিরাচরিত "সারভাইভ্যাল অভ দ্য ফিটেস্ট" এর "নৈতিকতা" নিয়ে, বা "ফুড চেইন"-এর উপরে থেকে অন্যকে খেয়ে আরো উপরে ওঠাই যৌক্তিক কিনা সেটা নিয়ে। একটু ব্যাখ্যায় যাওয়া লাগে তাহলে। জীবজগতের মূলনীতিই হলো, যার শক্তি বেশি, সে টিকে থাকবে, যে দুর্বল সে প্রাকৃতিক নিয়মেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সবল দুর্বলকে খাবে, যদি তার উপরে গিয়ে টিকে থাকার যথেষ্ট সামর্থ্য না থাকে তো আরেকজন তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে। মানুষ যদি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হয়ে থাকে, এক্ষেত্রে মানবজাতিও সেই নীতিই অনুসরণ করছে অন্য প্রজাতির বেলায়। অহিংস নিরামিষাশীরাও সত্যিকার অর্থে অন্য ১টা প্রাণ ধ্বংস না করে বেঁচে থাকতে পারে না, সম্পর্কটাই খাদ্য আর খাদকের। এই ফুড চেইনে "নৈতিকতা"র প্রশ্নটা তখনই আসে, যখন কাক খাওয়া শুরু করে কাকের মাংস, মানবজাতিরই কোন একটা অংশ অন্য কোন অংশের উপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করে বসে আর নিজেকে খাদকের সুবিধাভোগী আসনে বসিয়ে অন্যদের আপেক্ষিক মূল্য মানুষ অপেক্ষা নিচুতর কোন পর্যায়ে নিয়ে যায়।

এই ফুড চেইনের উপরে থাকার মীমাংসা করার পদ্ধতিটা মানবজাতির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত একই, হানাহানি। ঝাঁপিয়ে পড়ো, মেরে-কেটে খেয়ে ফেলো। আদিকালে গোত্র সর্দার হতো সবচেয়ে নিষ্ঠুর যুদ্ধবাজ হিংস্র ব্যক্তিটি, এখনো ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে আসীন ব্যক্তি অন্য মোড়কে একই রকম ক্রুর, কুটিল, প্রচলিত ভাষায় আমরা অনেকে তাদের "রাজনীতিবিদ" বলে থাকি। একটা সময় বর্শা-কুড়াল-তলোয়ার নিয়ে শক্তিশালী গোত্রপতি নিজেই নেতৃত্ব দিতেন, এখন শুধু সুসজ্জিত কক্ষে বসে বোতাম টিপে আদেশ জারি করে থাকেন। প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে, বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে, মূল উদ্দেশ্যে কোন ব্যাঘাত ঘটছে না, সেই নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার নিরন্তর প্রচেষ্টা।

মূল কথা থেকে আসলে অনেকদূর সরে গেছি, কথা হচ্ছিলো মুসলমান, সোমালিয়া, ৩য় বিশ্ব অথবা পশ্চিমা সভ্যতা নিয়ে। বিশেষ করে পশ্চিমাদের কথাই কেন এল, সেটা একটু বলি। গত ২-৩ হাজার বছরের ইতিহাসে, মাঝের কয়েক শতাব্দীর মুসলিম আগ্রাসন বাদ দিলে, উপনিবেশবাদ বা সাম্রাজ্য বিস্তারের ব্যাপারে পৃথিবীর পশ্চিমাংশের লোকদের অবদানই বেশি ছিল, সেটা রোমান সাম্রাজ্য বলি, ব্রিটিশ বা ইউরোপিয়ান উপনিবেশ বলি, আর হালের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই বলি। কেন এরাই বারবার আধিপত্য বিস্তার করে সেটা নিয়ে বিশাল গবেষণা হতে পারে, আদতে তারা শ্রেষ্ঠ কিনা সেটাও আরেক বিষয়, কিন্তু এই শ্রেষ্ঠ ভাবার প্রবণতা এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রাণপণ চেষ্টা যে তাদের মাঝে রয়েছে সেটা নিঃসন্দেহ। জ্ঞান-বিজ্ঞানে শ্রেয়তর হবার চেষ্টা করার দোষের কিছু নেই, কিন্তু তার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে প্রতিবারই চলে এসেছে অন্য জাতিগোষ্ঠীর উপর সেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেবার উদগ্র বাসনা। আনবিক শক্তির উদ্ভাবন মানবসভ্যতার গতিপথ ইতিবাচকভাবে পাল্টে দিতে পারতো, কিন্তু তার প্রথম উল্লেখযোগ্য ব্যবহার হলো আনবিক বোমা বানিয়ে হিরোশিমা আর নাগাসাকির নিরীহ মানুষের উপর। প্রথম ধাক্কাতেই "ফ্ল্যাশ বার্ন"- এ হিরোশিমাতে মারা যায় ৯০,০০০ মানুষ, আর নাগাসাকিতে ৬০,০০০ (অনেকেই বলেন হিসেবটা রক্ষণশীল), পরবর্তীতে তেজষ্ক্রিয়তার কারণে হিরোশিমার সংখ্যাটা ১,৫০,০০০ এ দাঁড়ায়, নাগাসাকিতে ১ লাখের কাছাকাছি। হায়, পৃথিবীর ইতিহাসে এত গণহত্যার কথা আমরা বলি, অথচ "সভ্যতম" জাতির দ্বারা স্বল্পতম সময়ে সংঘটিত বৃহত্তম গণহত্যার কথা কত সাবধানে এড়িয়ে যাই!

বিতর্কটা এখানেই যে, নিজেদের "সভ্য" দাবী করা কোন জাতি সেই আদিমতম "খাদ্য-খাদক" নীতির উপর চলতে পারে কিনা, আর যদি চলে, তাহলে তাদেরকে কেন এই পশুবৃত্তির জন্য পশুর পর্যায়ে বিবেচনা না করে "মানুষ", বা আরো সুক্ষ্মভাবে, "সভ্য মানুষ" হিসেবে বিবেচনা করা হবে। হিরোশিমা আর নাগাসাকির ঘটনা প্রকৃতপক্ষে পার্ল হারবারে জাপানী বিমান হামলার (সেটাও জাপানী আগ্রাসনের একটা নমুনা) একধরণের প্রতিশোধ, যে হামলায় প্রায় ৫ হাজার আমেরিকান সৈন্য মারা গিয়েছিল। পার্ল হারবার নিয়ে সাহিত্য-সিনেমার কোন অন্ত নেই, হাহাকার চলছে এই ৭০ বছর পরেও, কিন্তু তার ৫০ গুণ বেশি মানুষ মারা যাবার পরেও হিরোশিমা-নাগাসাকির বোমাবাজিকে "গণহত্যা" বলে কয়জন উল্লেখ করেন? তারমানে কি দাঁড়ায় যে একজন বিজয়ীর জীবন=৫০ জন পরাজিতর জীবন? বা অর্থসম্পদে সামরিক শক্তিতে উন্নত জাতির একজনের জীবনের দাম পিছিয়ে থাকা কোন জাতির শত শত মানুষের চেয়েও বেশি? খুব সাবধানে চিন্তা করলে, এটাই কিন্তু "বর্ণবাদ"-এর মূল কথা। "আর্য" জাতির শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য হিটলার যে ইহুদী নিধন কর্মসূচী শুরু করেছিল, তার মূল কথাও ছিল আর্যরা সভ্য, অন্য জাতিগোষ্ঠীকে পথ দেখানোর দায়িত্ব তাদের, বিশ্বের শান্তি-সমৃদ্ধির জন্য পথ দেখাতেও হবে জার্মানদের, বাকিরা তাদের অনুসরণ করবে মাত্র। কথাগুলো কি খুব পরিচিত মনে হচ্ছে? হতেই হবে, বিশ্ব মানবাধিকার রক্ষা এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে "স্বাধীনতা" দেয়ার জন্য যখন মার্কিন বাহিনী নামে, তাদের কাছ থেকে এই মুখস্ত বুলি প্রায়ই শুনে থাকি আমরা। হিটলার মরেও ওপার থেকে অট্টহাসি দিচ্ছে নিশ্চয়ই, তার আদর্শ, তার প্রেতাত্মা তারই ঘোরতর শত্রুর কাঁধে সওয়ার হয়ে দিব্যি এগিয়ে চলেছে।

এতদিন পরে এই পুরানো কাসুন্দি নিয়ে ঘাঁটাঘাটি কেন? কারণ খানিকটা "গোয়েবলসীয়" প্রচারণার দিকে বিরক্তি আর খানিকটা সেটা নিয়ে সবার লাফঝাঁপ দেখে। তেলা মাথায় তেল দিতে সবাই পছন্দ করে, কাজেই ৯/১১ এর দশম বর্ষপূর্তি নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ার হাহাকারের সাথে তাবৎ বিশ্বের বুদ্ধিজীবি মহল যোগ দিয়েছে, বাংলাদেশী মিডিয়াও পিছিয়ে নেই। ৫,০০০ মানুষের মৃত্যু কোন মুখের কথা নয়, ভয়াবহ এবং দুঃখজনক বললেও সেটা কম হয়ে যায়, টুইন টাওয়ারে নিহত মানুষগুলোর জন্য সারা বিশ্ব কাঁদতেই পারে। কিন্তু সেটার প্রতিশোধ নিতে ইরাকে বাঁধিয়ে দেয়া যুদ্ধে শুধুমাত্র সংবাদপত্রের হিসাবেই এখন পর্যন্ত মারা গেছে ১,১১,০০০ ইরাকী, যারা কেউই কোনরকম সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িত নয়। (http://www.iraqbodycount.org/)। এর সাথে যোগ করা যায় একটি দেশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া, এবং যুদ্ধ পরবর্তী দুর্ভিক্ষে ভবিষ্যতে মৃতের সংখ্যা, যেটা আমাদের অনুমানের বাইরে। ৯/১১ এর ধাক্কায় ঐ তাৎক্ষণিক ৫,০০০ মানুষের জীবনের দাম মেটাচ্ছে কোটি কোটি মানুষ, ঘুরেফিরে সেই একই প্রশ্ন, একজন সভ্য মানুষের জীবনের দাম আসলে কতজন "অনুন্নত" বিশ্বের মানুষের সমান? আবারো বলি, টুইন টাওয়ারে হামলা মানবসভ্যতার এক জঘন্য ঘটনা (এখানে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো বাদ দিচ্ছি, ধরে নিচ্ছি এই হামলা সন্ত্রাসবাদীদের কাজ), এবং ৫,০০০ কেন, ৫ জন মানুষের জীবনও অমূল্য। সেক্ষেত্রে, টুইন টাওয়ারের ৫,০০০ মানুষের জীবন আর ইরাকের ৫,০০০ মানুষের জীবনের মূল্যে কোন তফাৎ হওয়া উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হচ্ছে, অনেক বড় ব্যবধান হচ্ছে। টুইন টাওয়ারে মৃত মানুষগুলোকে নিয়ে এত হাহাকার, সেটা কি তারা "মানুষ" বলে, নাকি উন্নত বিশ্বে বসবাসকারী "সভ্য শিক্ষিত" মানুষ বলে? সেক্ষেত্রে, যারা প্রথম বিশ্বে থাকে না, তারা কি "মানুষ" বলে গণ্য হবে না? নাকি তাদেরকে আমরা আদিমযুগের মতই "খাদ্য-খাদক" সম্পর্কে নিচুতলায় বসিয়ে "আধুনিক বর্ণবাদ" চালু করবো?

এবার দৃষ্টি ফেরাই আফগানিস্তানের দিকে। আফগানরা সম্ভবত জংলী (আমাদের উদারমনা "বুদ্ধিজীবি"দের মতে), কিন্তু সেটাও আসলে তাদেরকে পাইকারী বোমা মেরে খুন করার অনুমতি দেয়না। কেউ যদি সেটা ভাবে, তাহলে তা ঐ ব্রিটিশ এবং ইউরোপিয়ান উপনিবেশবাদীদের মতই হয়ে গেল, যারা আমেরিকায় পা দিয়েই রেড ইনডিয়ানদের "জংলী" এবং "হিংস্র" উপাধি দিয়ে পাইকারী হারে খুন করে তাদেরই জমি দখল করে আজকের তথাকথিত "আমেরিকান সভ্যতা" গড়ে তুলেছে। রেড ইনডিয়ানরা এখনো নিজভূমে পরবাসী, ইনডিয়ান রিজার্ভে আলাদা হয়ে বাস করে, নিজের জমিতে তাদের থাকতে হয় শ্বেতাঙ্গদের দয়ার উপর, যারা কিনা এখন সারা দুনিয়াকে "স্বাধীনতা" আর "মানবাধিকার"-এর সংজ্ঞা শিখিয়ে বেড়ায়। শুধুমাত্র আমেরিকাতেই অষ্টাদশ শতকে রেড ইনডিয়ান ছিল ১ মিলিয়নের বেশি, রোগ আর যুদ্ধে, এবং তাদের নিজস্ব বাসস্থান থেকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়াতে এখন কমতে কমতে সেটা দাঁড়িয়েছে ২,৫০,০০০ এর কাছাকাছি। (http://en.wikipedia.org/wiki Population_history_of_indigenous_peoples_of_the_Americas)। আফগানিস্তানে ২০০১ থেকে এখন পর্যন্ত মৃতের আনুমানিক সংখ্যা ২০ হাজারের কাছাকাছি (http://www.unknownnews.net/casualties.html)। এই ওয়েবসাইট টির মতে ইরাকে মৃতের সংখ্যা ৮ লাখের বেশি, পূর্বে উল্লিখিত "ইরাক বডি কাউন্ট" নামের সাইট টি শুধুমাত্র সংবাদপত্রে প্রকাশিত মৃতের সংখ্যা হিসেব করে বলে বাস্তবের চেয়ে সেটা অনেকটাই কম বলে ধরা যায়।

সভ্য দুনিয়ার সবচেয়ে বড় প্রহসন, এবং একই সাথে "মুসলিম ভ্রাতৃত্বের" প্রতি চরমতম উপহাস হয়ে টিকে থাকা ফিলিস্তিনের দিকে দেখা যাক। গত ৫০০ বছরে এই "মুসলিম ভ্রাতৃত্ব" সত্যিকার অর্থে মুসলিমদের কোন উপকারে এসেছে বলে এই বান্দার জানা নেই, সেখানেও এই বর্ণবাদ, "আশরাফ-আতরাফ" সমস্যা। আরবরা নিজেদের ভাবে অভিজাত মুসলিম, আমাদের মত ৩য় বিশ্বের মুসলিমরা "মিসকিন", কাজেই ১৯৭১ সালে সৌদী বাদশাহদের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল পাকিস্তানের প্রতি, বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যায় ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যুতে আরব নেতারা ফিরে দেখার দরকার বোধ করেনি। পাকিস্তানিদের এই বাঙালি নিধনের পেছনেও কাজ করেছে পরোক্ষ বর্ণবাদ। ওদিকে ফিলিস্তিনের ব্যাপারে বিশ্ববিবেক আর মুসলিম বিবেক দু'টোই আশ্চর্যজনকভাবে নীরব, এমনকি ফিলিস্তিনে মৃতের সংখ্যা ঠিক কত এটা নিয়েও বিতর্ক খুব বেশি। অন্য সব ব্যাপারে মোটামুটি নির্ভরযোগ্য উইকিপিডিয়া ফিলিস্তিন ইস্যুতে পুরোপুরি পক্ষপাতদুষ্ট, গত ৬০ বছরে তাদের হিসেব অনুযায়ী মাত্র ৭ হাজার ফিলিস্তিনি মারা গেছে, অন্যান্য আরব মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী সংখ্যাটা ২ লাখের কাছাকাছি। ১৯৪৮ সালেই প্রায় ৫০ লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু হয়, যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা যে আরো বাড়তে পারে, সন্দেহ নেই। এখানে বিশ্ববিবেক আমেরিকা নির্লজ্জভাবে বারবার ভেটো দিয়ে গেছে জাতিসংঘে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যে কোন নিন্দা প্রস্তাবে, এবং "আমেরিকান ড্রিম"-এ স্বপ্নালু বাংলাদেশীদের মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে, এটা আমেরিকান প্রশাসনের জন্য নতুন কিছু নয়, গণহত্যাকারী পাকবাহিনীকে জেনেশুনেই তারা ১৯৭১ সালে অকুণ্ঠ নৈতিক ও সামরিক সমর্থন দিয়েছিল।

যুদ্ধ আর সরাসরি আগ্রাসন বাদ দিয়ে শুধুমাত্র বিশুদ্ধ বর্ণবাদের দিকে চোখ ফেরানো যাক। একদম গোড়ায় ফেরা যাক বর্ণবাদের, কালো আফ্রিকাতে, দাস ব্যবসায়। "আটলান্টিক স্লেভ ট্রেডিং" নামে পরিচিত দাস আমদানির বয়বসা ছিল ষোড়ষ থে অষ্টাদশ শতকের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা, মধ্যযুগে মূলত যার দখল ছিল আরবদের হাতে, এরপর সেটা চলে যায় ইউরোপিয়ান, বিশেষ করে পর্তুগীজ, ওলন্দাজ আর ব্রিটিশদের কাছে। মৃতের সংখ্যা? গোণা সম্ভব নয়, তবে মোটামুটি রক্ষণশীল হিসেবেও সেটা ১০ মিলিয়ন বা ১ কোটির (ভুল দেখছেন না, ১ কোটি-ই) কাছাকাছি। (http://en.wikipedia.org/wiki/Atlantic_slave_trade) এটা শুধু আনা-নেয়াতে মৃতের সংখ্যা, আনার পর কঠিন পরিশ্রম আর খাদ্যাভাবে মৃতের সংখ্যা কত, কেউ জানে না, সংখ্যাটা দ্বিগুণ হলেও অবাক হবার কিছু নেই। এবার বর্তমানে ফেরত আসি, অবস্থা কি খুব বদলেছে? ফরাসী অর্থনীতির বড় একটা অংশে এখনো অবদান রাখে আফ্রিকার হীরা, যার অনেকগুলোরই পরিচিতি "ব্লাড ডায়মন্ড" হিসেবে। সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে গৃহযুদ্ধে ইন্ধন দেয়ার অভিযোগ আছে ফরাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে, সাথে জোট বাঁধা আছে ডি বিয়ার্সের মত আন্তর্জাতিক হীরা ব্যবসায়ীদেরও। একটা ছোট্ট হিসেব অনুযায়ী, শুধুমাত্র সিয়েরা লিওনের হীরার খনিসংক্রান্ত সংঘাতে মৃতের সংখ্যা ৭৫,০০০, বাস্তুহারা হয়েছে আরো ২ মিলিয়নের বেশি (Click This Link)। তা হোক না, ৬০ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার কাছে লাখখানেক মানুষের জীবনের দাম আর কত? দাস ব্যবসায়ীদের মনোভাবের সাথে কোন পার্থক্য পাচ্ছেন কি?

সোমালিয়ার দিকে তাকাই। দুর্ভিক্ষ আর গৃহযুদ্ধের কারণে অবিশ্বাস্য রকমের বেশি, প্রতি ১০০০ জনে ১৫ জন প্রায়। (Click This Link)। অন্যানয় আফ্রিকান দেশগুলিতেও যে অবস্থা এরচেয়ে খুব ভাল তা নয়। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য পশ্চিমা সংস্থা সাহায্য দিচ্ছে, তবে সেটা খুবই অপ্রতুল। সাহায্যের সাথে সাথে এসব দেশে একনায়ক শাসক বসিয়ে রাখা এবং গৃহযুদ্ধ বজায় রাখার ব্যাপারেও তারা সমান তৎপর, অস্ত্র ব্যবসার বিশাল একটা অংশ যে এই আফ্রিকাতেই। শোনা কথা, তবে শান্তিরক্ষী বাহিনীগুলোতে নাকি আমেরিকান আর ইউরোপিয়ান সৈন্যদের বেতন-ভাতা বাংলাদেশী এবং অন্যান্য সৈন্যদের ৩ গুণ। তা বটে, উন্নত জাত বলে কথা! এই দেখুন না, আমেরিকার হারিকেন ক্যাটরিনাতে মারা গেছে মোটামুটি ১,৮০০, তাতেই মনে হচ্ছে কেয়ামত হয়ে গেছে, অন্তত পশ্চিমা মিডিয়ার মতে। ১৯৯১ তে বাংলাদেশে সাইক্লোনে মারা গিয়েছিল আনুমানিক ১,৩৮,০০০ লোক, এই তুলনায় কতটা কথা হয় সেটা নিয়ে? ঐ একই ব্যাপার, জীবনের আপেক্ষিক দাম, ৩য় বিশ্বে জন্মালে ১ম বিশ্বের তুলনায় ১০০ ভাগের এক ভাগ হতেও পারে, সেজন্যই মনে হয় তথাকথিত সভ্য প্রথম বিশ্বের নাগরিক হয়ে ফুড চেইনের উপরে উঠে যেতে আমাদের এই প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। আর যদি কেউ সেটা হয়ে যায়, সে তখন "মোর আমেরিকান দ্যান বুশ", বাস্কেটবল আর বেসবলের ফ্যান হবার সাথে সাথে ৯/১১ নিয়ে বাণী দেয়া তখন নিয়মিত কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশের পত্রপত্রিকাতেও তখন নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের "ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস" আর তাদের শোকদুঃখগাঁথা নিয়ে বড় বড় কলাম বরাদ্দ হয়, কিন্তু ইরাক বা সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষ নিয়ে কয় লাইন লেখা হয়, সেটা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজে বের করতে হয়।

৯/১১ এর নিহতদের স্মরণে যারা গ্রাউন্ড জিরোতে মোমবাতি জ্বালান আর বড় বড় প্রবন্ধ ফাঁদেন, তারা একবারও কি যুদ্ধ আর অনাহারে মৃত লাখ লাখ "৩য় শ্রেণীর" এসব মানুষের কথা মনে করেন? যদি না করেন, আপনি কি "আধুনিক বর্ণবাদ"-এর শ্রেষ্ঠত্ব ধারণ করে গর্বিত?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29449436 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29449436 2011-09-16 23:40:10
শ্রদ্ধান্ঞ্জলী: সাম্বাদিক উট-পাল ও তারেক মামদোর একদিন
ঘটনার শুরু এক দুপুরে, ক্রিকেট বোর্ডে চুকলিবাজি করতে গিয়ে সাকিবের ধাতানো খেয়ে উটুদা'র মেজাজ সেদিন ভয়ানক গরম। গিয়েছিলো একটু এর নামে ওর, ওর নামে তার কথা লাগিয়ে একটু মজা দেখতে, ফাঁকে যদি কারো মুখ থেকে ২-১টা বেফাঁস কথা চলেই আসে, পরের ৭ দিনের রসদ হয়ে গেল। "হাডুডু" পাতায় অনেকদিন হলো কোন খবর নেই, আর দ্রব্যমূল্য, ভেজাল, ভাঙা রাস্তা নিয়ে বরাবর দৌড়ে থাকা বাঙালি এখন এমনই উড়ন্ত হালে আছে যে জিম্বাবুয়ে গিয়ে পোলাপানগুলো যে রাম ঠ্যাঙানি খেয়ে কোঁত পাড়ছে সেদিকে কারো খেয়ালই নেই। উটুদা'র মতলব ছিল এই সুযোগে যদি সাকিবকে একটা ঠেলা দিয়ে পেয়ারের আশুকে জায়গামত বসিয়ে দেয়া যায়, হাজার হোক এতদিনের "ইসপিশাল চা" আর বিনা পয়সার "ফরেন মাল"-এর একটা দেনা আছে না? পোলাটা বেশ বিনয়ীও বটে, দেখা হলেই বিগলিত মুখে সালাম-আদাব দেয়, আজকাল এমন দেখাই যায় না। উটু মাঝে মাঝে "আলুর কারবারী" পত্রিকার অফিসে সবাইকে বলে বেড়ায়, আরে, এই একটা পোলা জন্মাইসিলো এই বেজন্মা দ্যাশে, পোলা তো না য্যান আগুনের গোলা, ওরে বাদ দিয়া কাপ্তান করসে কিনা কোন এক সাকি-বাল রে, কিছু কইবার গেলেই পিছন দিয়া আঙ্গুল দেখাইয়া দেয়, চেহারা দেখলে মনে লয় আঙ্গুলটা আমাগো পিছে ঢুকাইবার পারলে আরো খুশি হইতো।"

তা উট-পালের দুঃখের কারণ আছে বৈকি। দীর্ঘদিন ধরে হাবুল বাশার, যাকে দুর্মুখেরা হাবা বলেও ডাকে, আর আশু'র কল্যাণে ক্রিকেট বোর্ডে বেশ একটা ভাবের জায়গা পেয়ে আসছিলো, আর বিদেশ থেকে এলে "ফরেন মাল"-এর ভাগ তো ছিলই। ছেলেগুলো বড় বিনয়ী, তাকে বেশ ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। আর সাকিব পোলাটা "জোম্মের বিয়াদ্দপ",তাকে দেখলে একটা "সালামালকি"ও দেয় না। যদিও পয়সার দিকে বেশ লোভ আছে ছোঁড়াটার, কিসব টি-২০ খেলে এত কামায়, তাও "আলুর কারবারী"তে কলাম লিখে দু'টো পয়সার লোভ ছাড়তে পারেনা। খুশিই হয়েছিল উটু, কলামের লোভে তাকে হয়তো একটু তেলাবে, এই সুযোগে এবার বিদেশ গেলে দু'টো স্কচের অর্ডার দিয়ে দেবে। হা-হতোস্মি, মহা নিমকহারাম, কলাম লিখে পয়সাটা পেয়েই আর তাকে চেনে না। আলু ব্যবসা বোঝে, সাকিবের লাগামছাড়া কথাবার্তা পাবলিক খায় ভাল, কাজেই লেখাটা বন্ধও করে দিতে পারছে না। চামে অবশ্য সেবার "বিনয় শিক্ষা"র উপর বেশ কিছু তৈরি লেকচার দিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু খোমাখাতা আর "বোলোগ"-এ আরো এত এত বেয়াদব গজিয়ে গেছে যে তার সেসবশিক্ষা পানিতে গেছে।

তো এসব কারণে এবার বিদেশ সফরে সদ্য গোঁফ গজানো একটা দলের কাছে সাকিবালের দলকে আড়ং ধোলাই খেতে দেখে উটুদা বেশ দিলখুশ। আশু আবার টেস্টে ভাল করে ফেলেছে, এ নিয়ে বেশ ক'দিন বগল বাজানো গেছে, এরপর সাকিবাল কে "ক্যামনে কি" শিখিয়ে দেয়ার একটা প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছে, কিন্তু ছোকরাটা বেয়াদব হলেও নিজের কাজ জানে, কিছুতেই আশুর মত ১০০ ভাগ ডাব্বা নিয়ে ফেরে না। তামিমটা আরেক বেয়াদব, এবার অবশ্য ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, তবে উটু'র ধারণা, যতই ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসাম মাখুক, এই পোলা ফর্সা, থুক্কু, বিনয় শিখবে না, কয়লা সে কয়লাই থাকবে। ফোকটে এবার উটু চেষ্টাও করেছে জিম্বাবুয়ে সফরে সবার "পারফর্ম্যান্স রেটিং" করে আশুকে একটু তোলা যায় কিনা, কিন্তু গাধাটা দুই ইনিংস ভাল খেলেই যথারীতি কর্তব্য শেষ করাতে সেখানেও সুবিধে হয়নি। সব মিলে খেলার পাতা ঠাণ্ডা, মতি ভাই পর্যন্ত ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেন, রোববারের দিন বিক্কিরি কমে যাচ্ছে হে, তোমাদের ঈদ বোনাস দিতে তো কষ্ট হয়ে যাবে উটুবাবু!

সেজন্যই নতুন কিছুর খোঁজে উটু নিজেই গেসলো বিসিবি অফিসে। ড্রেসিংরুমের দিকে যাওয়ার পথেই তামিমের সাথে দেখা, পশ্চাদ্দেশ কিন্ঞ্চিৎ ভারী, একটু ফর্সাও হলো নাকি? ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসাম কেমন কাজ করছে জিজ্ঞেস করবে কিনা ভাবতে ভাবতেই তামিম এগিয়ে এসে হাত বাড়ায়, উটু ভাবে, মনে হয় ভয়ে আছে, হুঁ হুঁ বাবা, ধরা খেয়েছো কিনা! কুশল প্রশ্ন শেষে হালকা খোঁচা মারে-- কিহে তামিমবাবু, ভিটরি কি স্বপ্নে দেখা দেয়? হেহেহে করে খানিক হেসে তামিম বলে--আরে উটুদা এইটা একটা কথা কইলেন, আমি লর্ডস ছাড়া ভাল খেলিনা এইটা তাবৎ দুনিয়ার লোকে জানে, ভিটরির মত সেইদিনের পোলারে মারলে আমার একটা ইজ্জতের ব্যাপার আছে না? আর টিমের বেকতেই বাল ফেলায়, খালি সাকিব এট্টু ভাল খেলে,এইসব নিয়া ভাবতাসি না, দেখেন না, আমারে বিজনেস ক্লাস না দিয়া পারসে?আরেকটা সেন্ঞ্চুরি মারলে ভাবতাসি ডাইরেক্ট পাইলটের লগে সিট চামু, হালায় না দিয়া যাইবো কই? চোখ টিপি দিয়ে এগিয়ে যায় তামিম, এই কথাগুলো গুছিয়ে লিখলে একটা ভাল খবর হতে পারে কিনা ভাবতে ভাবতে এগোয় উটু, সিডু যাওয়ার পরে জুনায়েদ বেশ ভয়ে আছে, ওরে চাপ দিলে কিছু "ইনসাইড" নিউজ আসতে পারে। ভাবতে ভাবতেই ড্রেসিংরুম এসে যায়, উঁকি দিতেই হুংকার, কে রে? উট-পাল আঁতকে উঠে দু'পা পিছিয়ে যায়, ভয়ে ভয়ে আবার এগোয়, নবাবজাদার মত সাকিবাল বসা, ভঙ্গি দেখলে গা জ্বলে যায়। উটু হালকা হাসি দিয়ে বলে, আসবো? সাকিব থমথমে মুখে বলে, না আসবেন না, আপনাদের সবার প্রবেশ নিষেধ, এখন বিদায় হন, বহুৎ বিলা আছি। অপমানিত বোধ করে সে, কিন্তু হাম্বা হতে হলে অপমানবোধ থাকতে হয় না, আমতা আমতা করে বলে, কোন সমস্যা? সাকিবাল এবার কোন কথা না বলে উঠে এসে দড়াম করে দরজা লাগিয়ে দেয়, উটুর মুখের ওপরই।

এমন অপমানের পর আর কার মেজাজ ঠিক থাকে? মনে মনে সাকিবালের মাতাসংযোগে কিন্ঞ্চিৎ গালিবর্ষণ করতে করতে আলুর বারান্দায় পা দেয়, আর সোজা সামনে মামদো। আর যায় কোথায়? "কি মিয়া কই থাকো, বালসাল তোমাগো খুঁইজা পাওয়া যায় না, এই গরমের মধ্যে তোমরা ঠাণ্ডা হাওয়ায় বাল ছিঁড়বা আর আমি বিসিবি অফিসে দৌড়ামু? নেক্সট সপ্তাহে ভাল ফিচার দিবার পারলে দেও, নাইলে বিদায় হও, বলদ পালার দরকার আমার নাই, মতি ভাইরে কমু ১টা ছাগল আইনা দিতে।" হতভম্ব মামদোকে রেখেই গরগর করতে করতে ভেতরে চলে যায় উটপাল, ব্যাপার কিছু খারাপ বুঝে মামদোও চুপ থাকে, তবে কিছু একটা যে করতে হবে সেই জেদ তার মাথায়ও চেপে যায়। বলদ, হাহ! তুমি শেয়াল হলে আমি নেকড়ে,বাবা উটু, দেখো কি করতে পারি।

তো সেই "করা"র ফলাফল এখন ল্যাপটপের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে, এককালের জাতীয় দলের ফাস্ট বোলার শাহাদাঁতের আস্ত একখানা সাক্ষাৎকার। পড়ছে আর দাঁত বের করে নিজেই হাসছে মামদো, কি সব প্রশ্ন আর কি তার জবাব, প্রতিটা বাঁধাই করে রাখার মত। জাতীয় দলে এখন বেয়াদবগুলোর আনাগোনা, উটুকে কিছু বলে না বটে, কিন্তু তাকে চড়চাপড় মেরে দিতে পারে, ওদিক গেলে লাভ নেই, কাজেই খুঁজেপেতে দল থেকে বাদ পড়া রামছাগল প্রকৃতির একটাকে দরকার ছিল তার। নারায়নগন্ঞ্জের সকল কলেজ বালিকাদের পেছনে শাহাদাঁতের ঘুরপাক খাওয়ার বিষয়টা জানা ছিল তার, কোরবানী করার জন্য এই বলদটাই ভাল মনে হলো। পয়সাকড়ি পেলে আসলেই যে মূর্খগুলোর মাথা বিগড়ে যায় সেটা একে দেখলে বোঝা যায়, নব্য ধনীর মতই সামান্য তেল দিলেই হড়বড় করে সব বের হতে থাকে। অবশ্য মামদো আরেকটু সাফল্যের জন্য দু'ঢোক গিলিয়েছেও ছোঁড়াকে, নিজেও চালান করেছে কয়েক পেগ, অবশ্যই ছাগলটার পয়সায়, নিজের পকেট থেকে তারা কখনোই খায়না। শুরুতে ভেবেছিল প্রেম-ভালবাসা নিয়ে দু'চার কথা বের করতে পারলেই উটুকে ঠাণ্ডা করার মত একটা খবর হবে, কিন্তু উপরওয়ালা সেদিন তার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন, কাজেই শাহাদাঁতের প্রেমের ইতিহাস থেকে শুরু করে সে যে "ল্যাক্সাস" এ চড়ে তার বান্ধবীদের ঘুরাতো সেটার রসালো বর্ণনাও শোনা হয়ে গেছে, সাথে সিনেমায় নামলে বিন্দুকে নিয়ে কি কি করবে তার বিশদ বর্ণনা। সাক্ষাৎকারে অবশ্য সেসব লেখা যায় না, তবে রেকর্ড করা আছে, ছোকরা ঝামেলা করলে দেখানোর জন্য। বলদটার এত বুদ্ধি নেই, নিজেকে শাহরুখ খান ভেবে মহা ফুর্তিতে তাকে দু'প্যাকেট লেক্সাস বিস্কিট সহ নিজের লেক্সাসে চড়িয়ে বাড়ি নামিয়ে দিয়ে গেছে, ভাগ্যে গভীর রাত ছিল, নয়তো মাতালটার গাড়ির নিচে দু'চারটা চাপা পড়লে অবাক হবার কিছু ছিল না।

সাক্ষাৎকারটার ড্রাফট উটুদা'কে দেখানোর পর গুরু বাকরুদ্ধ হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছেন, পিঠে দু'টো চাপড় দিয়ে বুঝিয়েছেন, শিষ্যের কাছে তার আশা আজ পূরণ হলো। এইরকম কাদা ঘেঁটে নোংরা বের না করলে আর উটুদা'র চ্যালা? নিজে সংশোধন করে দিয়েছেন লেখা, পরদিন লেখাটা ছাপা হবার পর থেকে বিপুল সাড়া দেখে মামদো নিজেই মুগ্ধ। খোমাখাতা আর বোলোগে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, বলদটার কথাবার্তায় সবাই ঈদের আনন্দ পাচ্ছে। কিছু দুর্মুখ অবশ্য এর মাঝেও তাকে গালি দিয়ে গেছে, কিন্তু মামদোর মতে--"কোন মার্কেটিংই খারাপ নয়।" স্বয়ং মতিভাই এসে অভিনন্দন জানিয়ে গেছেন, বলেছেন এমন আর দু'চারটা রিপোর্ট করলেই বেতন বাড়িয়ে দেবেন। এমনকি উটুদা'র মত হাড়হাভাতে পর্যন্ত নিচে নেমে খাসির "ইসপিশাল চাপ" আর "খাস্তা পরাটা" খাইয়ে দিল, কি কপাল! মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে ভুঁড়ির ওপর হাত বোলায় সে, সুখের চোটে মনে মনে বিন্দু মেয়েটাকেও কল্পনা করে ফেলে নিজের পাশে দু'এক মুহূর্ত, অরুণ চোধরি পারলে সে নয় কেন?

কল্পনায় বাধা পড়ে মোবাইলের রিংটোনে--ঢিংকা চিকা ঢিংকা চিকা তালে মোবাইলটা কানে লাগায় সে। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে উটুদা'র উত্তেজিত গলা-- ওরে মামদো, মার দিয়া কেল্লা। সোজা হয়ে বসে সে-- কি হলো বস? কেডা মরলো? "আর কেডা, বেয়াদব সাকিবাল, লগে তাইম্মা। ২টাই ফিনিশ। দিসি লাগায়া। আমাগো লগে বিয়াদ্দবি করসে তো করসেই, আমাগো হাবু ভাইরেও নাকি রুমে ঢুকবার দিত না, এইবার ফিনিশ, ক্যাপ্টেনসি গেসে। জলদি সোনারগাঁওতে আয়, এট্টু পানির লগে প্ল্যান করি আমগো আশুরে এই চান্সে কাপ্তান বানায়া দেওন যায় নাকি!"

ফোনটা কেটে দিয়ে শিষ দিয়ে "শীলা কি জওয়ানি" ভাঁজতে ভাঁজতে আন্ডারওয়্যারটা নিচে গলায় মামদো, হাবুল বাশারের পকেট কেটে আজকে "ফরেন জিনিস" দিয়ে ভাল ফূর্তি হবে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29444006 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29444006 2011-09-06 22:46:27
বৃষ্টি
একমুঠো বৃষ্টির জন্য বরং আরো হাজার বছর অগ্নিস্নাত রোদে পুড়ে তলিয়ে যাবো শ্রাবণের অবিশ্রাম কলরোলে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29442208 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29442208 2011-09-02 21:57:09
৫ মিনিটের বিবেকের দাম যখন তারেক মাসুদের জীবন
৩-৪ মাস পরের কথা, দিন-তারিখ মনে রাখি না, কি হবে, এবার ফোন না, পত্রিকার পাতায় খবর, একই মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু। না, অনুমান করতে বুদ্ধিমান হতে হবে না, সেই ভদ্রলোক। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিলো না, কিভাবে সম্ভব? এই সেদিন দেখলাম। একটু পরেই ফোন এল, খবরটা সত্যি। একই পথে, একইভাবে। এবারো গেলাম, কিন্তু এবার আর কথাই বললাম না,সাজানো একটা পরিবারকে এভাবে তছনছ হয়ে যেতে দেখা এই প্রথম। মেয়েটার পরীক্ষা ছিল সামনে, দেয়া হলো না। ভদ্রলোকের সামাজিক মর্যাদার কারণেই হয়তো, পত্রপত্রিকায় ২-৪ দিন লেখালেখি হলো, তার পরিবার নিরাপদ সড়কের দাবীতে কিছুদিন এখানে-ওখাবে ধর্ণা দিল, এরপর ধামাচাপা পড়ে গেল সব।

পরবর্তী দৃশ্যপট সড়ক ও জনপথের মিলনায়তন, সড়ক নিরাপত্তার ওপর সেমিনার হচ্ছে। বিদেশী বিশেষজ্ঞ, বুয়েটের শিক্ষক, সওজের প্রকৌশলী, অন্যান্য সংস্থার কর্তারাও হাজির। সারাদিন এই নিয়ে ওয়ার্কশপ,বিশেষজ্ঞ (নাম গ্রেগ স্মিথ) একজন অল্পবয়সী ছেলে, আমাদের সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে তাকে ভয়াবহ রকমের উদ্বিগ্ন দেখা গেল। তাদের দলটা কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সড়কের "নিরাপত্তা রেটিং" দিচ্ছে, সবচেয়ে নিরাপদ সড়ক হলো "৫ তারা", সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো "১ তারা", আমাদের মহাসড়কগুলোর মাঝে "৫ তারা" খুবই কম, বেশির ভাগই "২ তারা" বা "৩ তারা",, "১ তারা"র সংখ্যা অনেক। অবাক হলাম না, কারণ হিসেবে বিজ্ঞের মত যখন বলা শুরু করলাম ভাঙ্গাচোরা রাস্তার কথা, থামিয়ে দিয়ে জানালো, ভাঙ্গা রাস্তা বরং গতি কম রেখে "মুখোমুখি সংঘর্ষ" কমিয়ে মৃত্যুহার কমিয়ে রাখছে। সত্যি বলতে কি, আমাদের ওরকম "উচ্চ গতির মসৃণ" মহাসড়কের প্রয়োজনও নেই, বরং সঠিক দক্ষ প্রশিক্ষিত চালক, "ফিট ভেহিকল" এবং সঠিকমানের "সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্হা" না রেখে এমন "উচ্চ গতি" এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করলে সেটা মরণফাঁদ হয়ে দেখা দিতে পারে।এই সড়কগুলো যখন ঠিক হবে, তীব্রগতিতে আসা যানবাহন গুলোর মাঝে "হেড-অন কলিশন" বা "মুখোমুখি সংঘর্ষ" আরো বাড়বে, সাথে বাড়বে মৃত্যুর সংখ্যা। এবার অবাক হলাম, স্মিথ জানালো, আমাদের সড়কগুলোর জ্যামিতিক (জিওমেট্রিক) ডিজাইনে সমস্যা আছে, নানা রকম বাঁক, কিন্তু তারচেয়েও বড় সমস্যা হলো আমাদের অসচেতনতা এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজকারবার। মহাসড়কগুলোতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ নিরাপত্তা সরন্ঞ্জাম এবং সাইন-সিগন্যাল না থাকা, এবং থাকলেও সেগুলো বোঝার মত শিক্ষিত চালকের অভাব, রাস্তার দু'পাশে বাজার থেকে পথচারী পারাপার,সব মিলিয়ে আমাদের আসলেই উপরওয়ালার কাছে যাবার সব প্রস্তুতি নিয়েই রাস্তায় নামা উচিত। "হাইওয়ে অ্যাক্ট" অনুযায়ী, মহাসড়কের দুই পাশে যে কোন রকম বাজার, ঘরবাড়ি বা স্থাপনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কিন্তু কখনো রাজনৈতিক, কখনো স্থানীয় জনগণের চাপে বেশিরভাগ সময়েই রাস্তার দু'পাশে "রাইট অভ ওয়ে" রাখা যাচ্ছে না। সহজ উদাহরণ হিসেবে ছবি দেখালো টঙ্গী বা গাজীপুরে রাস্তার দু'পাশে গড়ে ওঠা বাজার, গার্মেন্টস কারখানা, দোকানপাট, এমনকি শপিং মলগুলোকেও। ইদানিংকার আলোচিত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জায়গায় জায়গায় গড়ে ওঠা বাজারগুলোও দেখুন একবার। উত্তরবঙ্গের অনেক জায়গাতেই দেখেছি, খানিক পরপর রাস্তার উপর লোকজন ধান-চাল শুকাচ্ছে, গরুও চরায় কোথাও কোথাও।একদিকে এই স্থাপনাগুলো যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে মহাসড়কের ট্রাফিক জ্যাম বাধাচ্ছে,বাজারে থেমে থাকা পণ্যবাহী যানবাহন আর পথচারীদের রাস্তা এপার-ওপার করার জন্য একইসাথে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে দুর্ঘটনার সংখ্যা। গার্মেন্টসের শ্রমিকরা বা বাজারে আসা লোকজন যেভাবে দৌড়ে রাস্তা পার হয়, অনেকসময়ই উচ্চগতিতে আসা বাস বা ট্রাক এদের বাঁচাতে গিয়েও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। সরাবেন এগুলো? ঘাড়ে মাথা ক'টা আপনার? মন্ত্রী বা স্থানীয় এমপি'র ফোনে যদি বদলী না হন, আমাদের বীর জনগণই যে পিটিয়ে আপনাকে তক্তা বানাবে, লিখে দেয়া যায় সেটা।জানা তথ্য সব, তারপরেও এভাবে গোছানো অবস্থায় দেখে গায়ে কাঁটা দিল। গুগল ম্যাপে দেখিয়ে দিলাম আরো কয়েকটা বিপজ্জনক জায়গা, জানালো, শিগগিরি দলবল নিয়ে সেখানে যাবে।

সেমিনারে এরপর অনেক কথাই হয়েছে, মন্ত্রী এসে বরাবরের মতই বড় বড় কথা বলেছেন, কিন্তু আতংকজনক বিষয়টা হলো, সড়ক নিরাপত্তার কর্তৃপক্ষ যে কারা,সেটা কারোরই জানা নেই। সড়ক ও জনপথে এই বিষয়ে একটা বিভাগ আছে, দেখা গেল, সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার আইনগত অধিকার তাদের নেই। তবে কি বুয়েটের "দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান (এআরআই)"? উঁহু, তাদের কাজ গবেষণা, আইনী ক্ষমতা নেই। তাহলে বিআরটিএ? দায়িত্ব নিতে তারাও রাজি নয়। মোটের উপর সেমিনার শেষ হলো অনেক ভাল ভাল কথা এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে, কিন্তু কারা যে এগুলো বাস্তবায়ন করবে সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হলো না। সাধারণ মানুষ নিজে থেকে ট্রাফিক আইন মানবে এমন আশা করাই অন্যায়, পশ্চিমা বিশ্বে এত কঠোর আইন, সার্ভেইল্যান্স ক্যামেরা, হাইওয়ে পুলিশ থাকার পরেও সুযোগ পেলেই যেখানে লোকজন গতিসীমা ভাঙে, সেখানে আমাদের অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত লোকজন মানবে সেটা অসম্ভব। প্রয়োজন ব্যাপক পরিমাণে সচেতনতা কার্যক্রম নেয়া এবং তারচেয়েও বেশি প্রয়োজন সেগুলোর প্রয়োগ ঘটানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণে লোকবল এবং সম্পদ নিয়োগ করা। কিন্তু করতে গেলেই কখনো এর স্বার্থে, কখনো ওর স্বার্থে ঘা পড়ে, আর যা-ও বা করা যেত, সেটাও করা হয় না আমাদের তথাকথিত "শিক্ষিত দায়িত্বশীল" শ্রেণীর দায়িত্বহীনতার কারণে, এটুকু কাজ করতে অন্যের জীবন ও সম্পদের প্রতি যতটা সহানুভূতি থাকা দরকার, সেটা আমরা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি।পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি, রাস্তা বানানোর বা মেরামতের বাজেটে "সড়ক নিরাপত্তা' খাতে "রোড সাইন" বা "রোড মার্কিং"য়ের জন্য যে বাজেট রাখা হয়, পরিকল্পনা কমিশন সেটাকে কেটেকুটে মোটামুটি শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসে, এগুলোর যে দরকার হতে পারে, হুজুরদের মোটামাথায় সেটা কোনমতেই ঢোকানো যায় না।জানি না স্মিথদের তারা গোনা শেষ হয়েছে কিনা, কিন্তু এই পিংপং খেলা দেখে সে যদি এর মাঝেই চোখে আকাশের তারা না দেখে থাকে, স্যালুট! সেমিনারে অনেকের মতই একজন নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন, ইলিয়াস কান্ঞ্চন, বরাবরের মত নিরাপদ সড়কের দাবীতে অটল। ভদ্রলোকের অভিনয়ের জন্যই কিনা, অনেকে তাঁকে নিয়ে হাসছিলো, আমি হাসতে পারলান না, চেনা মানুষের অপঘাত মৃত্যুই যেখানে সহ্য হয় না, সবচেয়ে কাছের মানুষের মৃত্যুকে যে বয়ে বেড়ায় আর বিচারের দাবীতে দ্বারে দ্বারে ঘোরে, তাকে নিয়ে হাসার মত অমানুষ এখনো হয়ে উঠতে পারিনি।

এগুলো কয়েক মাস আগের কথা, এসব সেমিনারের যে কোন ফলাফল আসে না সেটা সবাই জানি এবং যা কথা হয় সব ভুলে যাই, আমরাও ভুলে গেলাম। রোজই পত্রিকার কোণায়কানায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২-১ জনের মৃত্যুর খবর দেখি, কাঁধ ঝাঁকিয়ে এড়িয়ে যাই, আমার কেউ তো মরেনি, এখনো তো বেঁচে আছি। তবে কিছু দুর্ঘটনায় জাতি মাঝে মাঝে একটু নড়েচড়ে বসে, কারণটা বিবেক, এমন বোধ হয় না, সম্ভবত সংবাদ হিসেবে সেটা চান্ঞ্চল্যকর বলে। সেরকম একটা দুর্ঘটনা দেখে সবার মত একটু গা ঝাড়া দিয়ে বসলাম, মিরেরসরাইতে ট্রাক উল্টে ৪০ জন স্কুল ছাত্রের মৃত্যুর খবরে। মানুষের জীবনের দাম যে কত কম সেটা আরেকবার দেখা গেল, অন্য কোন দেশে হলে সম্ভবত জাতীয় শোক দিবস হয়ে যেত, আমাদের মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীরা গেলেন অনেক দেরিতে, হেলেদুলে, কিছু মেকি শোকের প্রকাশ দেখা গেল, কেন অতজন এক ট্রাকে উঠেছিল সেটা নিয়ে খানিক বয়ান হলো, চালকও গ্রেপ্তার হলো, মিডিয়াতে ২ দিন হইচই, তারপর আবার সব ব্ল্যাকআউট। শোনা গেল চালকের লাইসেন্স নেই (যেন এটা নতুন খবর!), সে মোবাইল ফোনে কথা বলছিল (রোজই তো দেখি, আমরাও গাড়ি আর মটরসাইকেল চালানোর সময় কথা বলি, কেউ কি কখনো প্রতিবাদ করেছেন?), কিন্তু শেষমেশ এই মামলা চলবে কিনা, চালক জামিন পেয়ে গেল কিনা, তার কোন খবর পাওয়া গেল না। "আল্লাহ"র অনেকগুলি "মাল" কে আল্লাহ নিয়ে গিয়ে দেশের জনসংখ্যার বোঝা কমিয়ে দিয়েছেন, এই ভেবে হয়তো কর্তারা স্বস্তিও পেলেন খানিক, কিন্তু মূল ইস্যু যে সড়কের নিরাপত্তা, সেটা নিয়ে কেউ টুঁ শব্দটিও করলো না। কে করবে, আমরা এতই নির্লজ্জ স্বার্থপর জাত, নিজের না মরে ভাইয়েরটা মরলেও আমরা ফিরে তাকাই না, কার মায়ের বুক খালি হয়ে গেল,, সেটা দেখার সময় কোথায় আমাদের?

মৃ্ত্যুর মিছিলে সর্বশেষ সংযোজন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীর, সাথে আরো ৩ জন। খ্যাতিমান, এবং অনেক বেশি স্টেকহোল্ডার আছে বলেই তাদের মৃত্যুতে হল্লাটা একটু বেশি হচ্ছে, আবেগটাও আমাদের বেশি। জাতির যে সূর্যসন্তানরা আমাদের সর্বস্ব দিয়েছেন, অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে তাদেরকে বন্ঞ্চনা ছাড়া কিছুই আমরা কখনো দিতে পারিনি, এই দু'জনই বা তার ব্যতিক্রম হবেন কেন? এখন তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনীরকে নিয়ে অনেক ভাল ভাল কথা হবে, জীবনেও যারা তাদের নাম শোনেনি তারাও এখন চোখের জলে তাদের শ্রদ্ধান্ঞ্জলী লিখবে, চালকের গ্রেপ্তার ও ফাঁসীর দাবীও তুলবে কেউ কেউ। চালক গ্রেপ্তার হয়েছে ঠিকই, বদমাশটাকে দেখা গেল নিজের সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করতে, করুণা বোধ করলাম, মূর্খ অমানুষটা জানেও না তার মত ১৬ কোটি অপদার্থের চেয়েও ১টা তারেক মাসুদ, এমনকি মিরেরসরাইয়ের ১টা কোমল প্রাণও অনেক বেশি মূল্যবান ছিল। এর মাঝেই আমাদের অপদার্থ যোগাযোগমন্ত্রী হাসপাতালে গিয়েছেন, এবং বলে এসেছেন, জোট সরকারের ব্যর্থতার কারণেই রাস্তার এই হাল। বলি, আড়াই বছর গবেষণা করে কি এটাই বের করলেন হুজুর? এখানেও শেষ হলে কথা ছিল, আহত দিলারা জলি, যার স্বামী ঢালী আল-মামুন একই দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মৃত্যশয্যায়, তাকে মন্ত্রীমশাই বলে দিলেন, আপনাদের চালকের ভুলেই এই দুঘটনা, এভাবে চালানো ঠিক হয়নি! কতখানি অমানুষ হলে সব হারানো একজন মানুষকে এভাবে বলা যায়, ভেবে পেলাম না। কোন এক অর্বাচীন তাকে মনে করিয়ে দিল, পুলিশ বলেছে চালকের ভুলে এই দুর্ঘটনা, সাথে সাথে পীরসাহেবের জামাতার জবাব, পুলিশ বললেই হলো! তাই তো, তিনি বুজুর্গ মানুষ, পুলিশ আবার কি, তার কথাই তো এজাতির জন্য ঐশীবাণী, এটাই আমাদের পাওনা।

তবে তারো আগে কাজ সেরে রেখেছেন আমাদের নৌপরিবহন মন্ত্রী। জলপথের দায়িত্ব দেয়া হলেও তিনি সড়কপথের ব্যাপারেই বেশি উৎসাহী, কারণটাও দুর্বোধ্য নয়, জনাব ছিলেন পরিবহন শ্রমিক নেতা। দুনিয়ার মজদুরদের দিকে শ্রদ্ধা রেখেই বলতে পারি, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মত দুর্নীতিগ্রস্থ দলবদ্ধ অমানুষ দেখার মত দুর্ভাগ্য এই ক্ষুদ্র জীবনে কমই হয়েছে। নেতা হিসেবে অনুসারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং একই সাথে ভোটব্যাংক সুরক্ষিত করার বিষয়ে তিনি সচেতন, কাজেই দুর্ঘটনাস্থলে না গিয়েই জানিয়ে দিলেন, দুর্ঘটনা চালকদের দোষে হয় না। আহা, অমৃতবাণী! বাঁধিয়ে রাখুন, কারণ এরপরেই প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা গেল, বাসের চালক ওভারটেক করতে গিয়েই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটিয়েছে। মন্ত্রীর উক্তির কারণ বোঝা যায়, এ বছরই তিনি কোনরকম পরীক্ষা নেয়া ছাড়াই ২৪ হাজার "ভারি যানবাহন" চালনার লাইসেন্স দেয়ার সুপারিশ করেছেন। বিআরটিএ কে দায়ী করতে পারেন অনেকে, এটা যে এক দুর্নীতিগ্রস্থ প্রতিষ্ঠান সেটা আমরাও জানি, কিন্তু মন্ত্রী সুপারিশ করার পর তাকে লাইসেন্স দেবেনা, কার ঘাড়ে কয়টা মাথা বলুন তো? আর মন্ত্রীর দোষ-ই বা দিচ্ছি কেন, আমাদের মাঝে কয়জন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে তারা পরীক্ষা দিয়ে বিধিসম্মতভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়েছেন? কয়জন বলতে পারবেন যে তারা গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালাবার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন না, বা তাদের চালক কথা বললে বাধা দেন না? ট্রাফিক আইন মেনে চলি আমরা কয়জন? সুযোগ পেলেই দুম করে রংসাইডে গাড়ি ঢুকিয়ে দেয়া, ইউটার্ন নেয়া, ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে দৌড়ে রাস্তা পার হওয়া, আমরা আমজনতাও কম যাই না, অশিক্ষিত চালককে আর কি বলবো?

তবে এসব বললে কর্তৃপক্ষের দায় কমে না। কমে যায় না ২৪ হাজার অদক্ষ চালকের হাতে মৃত্যুবাণ তুলে দেয়ার পাপ। কেন ফিটনেস বিহীন গাড়ি রাস্তায় নামে, সম্ভবত বিআরটিএ'র কোন কর্তাই এর সন্তোষজনক জবাব দিতে পারবেন না, সে মুখ তাদের নেই। কেন মহাসড়কের বেহাল দশা, সেটার সন্তোষজনক জবাবও যেমন প্রকৌশলীরা দিতে পারবেন না। রাজনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক জটিলতা, অর্থাভাব নানা কারণ আছে, কিন্তু প্রকৌশল বিভাগগুলোর বড়কর্তারা তাদের নিজেদের দায় কি এড়াতে পারেন? বেশি কথা বললে কোথা থেকে কার ফোনে কোনদিকে বদলি হয়ে যায়, বা চাকরিবিধির নানা প্যাঁচে পড়ে কিভাবে নাজেহাল হতে হয়, ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন, এখানে আর সে প্রসঙ্গ না-ই টানলাম। এত মৃত্যু, এত কথা, কিন্তু সড়ক নিরাপত্তার কোন জাতীয় বিধি আজ পর্যন্ত হয়নি। যতবারই এরকম কোন পলিসি নেয়ার কথা উঠেছে, গাড়ির ফিটনেস টেস্ট, চালকদের দক্ষতার পরীক্ষা নিয়ে কথা হয়েছে, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মন রাখতে গিয়ে সরকার পিছিয়ে গেছে।মহাসড়কগুলোর পাশে কেন দুর্ঘটনারোধী ব্যারিয়ার নেই, কেন মহাসড়কগুলোর জিওমেট্রিক ডিজাইন সঠিকভাবে হচ্ছে না, সড়কগুলোর ট্রাফিক সার্ভে কিভাবে হচ্ছে, তার কোন জবাব কারো কাছে পাওয়া যাবে না। গত ১২ বছরে সরকারী হিসেবে লোক মরেছে ৩৮ হাজার, বেসরকারী হিসেবে সংখ্যাটা দ্বিগুণ। তা মানুষ মরছে, মরুক না, ১৬ কোটি মানুষ, ক'টা মরলে কি হয়, অন্যের জীবনের ফুটো পয়সা দাম দিলে তো এদেশে ওপরে ওঠা যায় না! আর সব কথার শেষ কথা তো আছেই, সব আগের সরকারের দোষ, নিজেরা সাধু। কিন্তু এক্ষেত্রে সব সরকারই এক পথের যাত্রী, চালকের দোষে নরহত্যা হলে আগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান ছিল, সেটা রদ করে সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত শাস্তির বিধান করা হয়েছে। চালক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পালানোর প্রস্তুতি নিয়েই রাখে, চালকের সিটের নিচে নাকি ইট রাখা থাকে জানালা ভেঙে পালানোর জন্য, কারণ সবাই জানে, একবার গণপিটুনি থেকে বেঁচে পালাতে পারলেই তার আর কিছু হবে না। কেন? কারণ চালকের দোষে মানুষ মারা গেলেও সেটা এদেশের আইনে জামিনযোগ্য অপরাধ, চালক জানে, তার মালিক তাকে ২ দিনেই ছাড়িয়ে আনবে যদি ধরাও পড়ে। এরা এমন বিবেকহীন একদিনে হয়নি, এদের প্রশ্রয় দিয়েছে এদেশের আইন, আশ্রয় দিয়েছে আমাদেরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। দুর্ঘটনা কমানোর জন্য বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের চেয়েও বেশি দরকার সামান্য সচেতনতা, সামান্য কাণ্ডজ্ঞান, খানিকটা বিবেক, আর আইনের কঠোর প্রয়োগ। আমাদের মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্য হাইওয়ে পেট্রল নেই, কাজেই দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়াও খুবই সহজ। আমাদের নেতাদের বিদেশ সফরে যাবার জন্য কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ পাওয়া যায়, কিন্তু জনগণের জীবন রক্ষার এসব উদ্যোগের জন্য তাদের বরাদ্দ মেলে না।সত্যি বলতে কি, মানুষ মনে করলে তবে না মিলবে, আমরা নিজেরাই কি নিজেদের মানুষের পর্যায়ে রেখেছি? নয়তো দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটি থেকে যখন আহতরা সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছিলেন, একটা গাড়িও তাদের সাহায্য করার জন্য থামেনি কেন? আমরা কোথায় যাচ্ছি?

যাকগে, এত কথা বলছি কেন? আসলে তো কিছুই হবে না, কখনোই কিছু হয় না। এ এমন এক দেশ, যেখানে শিশু হত্যা হলে মন্ত্রী বলেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন। আমরা এমন-ই জাতি, সব জায়গায় লাথি খেয়ে আমাদের বীরত্ব ফলাই ১৬ বছরেরকিশোরকে পিটিয়ে হত্যা করে। খাদ্যমন্ত্রী যখন কম খাওয়ার পরামর্শ দেন, আমরা দাঁত কেলিয়ে সেটা শুনে সেই ক্ষোভ মেটাই এক টুকরো রুটি চুরি করে ধরা পড়া দু'টি শিশুকে নির্মমভাবে পিটিয়ে। প্রতিদিন দুর্ঘটনায় মানুষ মরার পরেও আমাদের নৌমন্ত্রী আরো ২৪ হাজার অবৈধ লাইসেন্সের জন্য সুপারিশ করেন, আমরা ভাবি, এ সুযোগে আমার চেনা কাউকে লাইসেন্সটা করিয়ে দিতে পারলে মন্দ হতো না। আমরা আমাদের বোন আর মেয়েরা শিক্ষকের হাতে ধর্ষিতা হবার পরে বলি, জামাকাপড় ঠিকমত পড়লেই তো বদনজর লাগে না! আমাদের ৪০টি শিশু খাদে পড়ে ডুবে যাওয়ার খবর শুনেও আমাদের মনে বিকার হয় না। ক্ষীণস্মৃতি বাঙালি বীরগণ, একটু মনে করে দেখুন তো, একটা ঘটনারও বিচার হয়েছে কিনা! না, ছোটখাটো আমার-আপনার মত আমজনতার কথা বাদ দিন, খুব বড় আলোড়ন তোলা ঘটনার বিচার হয়েছে কি?মনে করতে পারেন? পারবেন না, কারণ বিচার হয়নি, হবার সম্ভাবনাও নেই, বিচার চাইবার মত মেরুদণ্ড আমাদের অনেক আগেই ভেঙে গেছে। যখন তারেক মাসুদের মত কেউ মারা যান, ৫ মিনিটের জন্য আমাদের বিবেক একটু গুঁতোগুঁতি করে, তারপর কেঁচোর মত গুটিয়ে যায় ঘরের কোণে, আশায় থাকে আকাশ থেকে কেউ নেমে বিচার করে দেবে, আর আমরা সেই গায়েবি কুদরত দেখে বগল বাজাবো। ক'টা দিন এখন আমরা নিজেদের বিবেকবান প্রমাণ করতে চাইবো, ব্লগে-ফেসবুকে ঝড় তুলবো, কিন্তু সাহস করে কেউ আমাদের নেতাদের নোংরা মুখে জুতো মারতে পারবো না। কেউ প্রশ্ন করবে না, ২৪ হাজার মৃত্যুবান তুলে দেয়ার অধিকার কে আপনাকে দিয়েছে হে হারামখোর মন্ত্রী? কেউ বলবে না, আইন নেই তো কি হয়েছে, বিচারকদের রায়েও তো আইন হয়, এই দু'টো দুর্ঘটনায় ধৃত চালকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে নতুন আইন তৈরি করুন না! দুর্ঘটনা প্রতিরোধী পদক্ষেপ নিতে "রকেট সাইন্টিস্ট" হতে হয় না, খুবই, প্রায় হাস্যকর রকমের সহজ কিছু কাজ করলেই দুর্ঘটনার হার অবিশ্বাস্য রকমের কমে যেতে পারে। যে জায়গাটায় তারেক মাসুদ নিহত হয়েছেন, বাঁকটা প্রায় সমকোণী, অনেকেই বলছেন সেখানে "সাইট ডিসট্যান্স" যথেষ্ট নেই, কিন্তু নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি সেখানে যতখানি প্রতিরোধী ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব নেয়া আছে। মহাসড়কের বাঁকের কাছে এবং স্পর্শকাতর জায়গাতে রোডসাইনদেয়া থাকে যেখানে লেখা থাকে ওভারটেকিং নিষেধ, রাস্তার ওপর সাদা রেখা বা "ফার্ম লাইন" টানা থাকে যার মানে হলো এখানে ওভারটেক করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ, এবং দেশের প্রতিটি মহাসড়কেই এই "রোড মার্কিং"গুলো দেয়ার কষ্ট টুকু অন্তত আমাদের প্রকৌশলীরা করে রেখেছেন।নানা কারণে অনেক সময়ই সড়কগুলো সোজা করা যায় না, কিন্তু বাঁকের কাছে গতি কমাতে হয়, এবং যথেষ্ট পরিমাণ "ব্রেকিং ডিস্ট্যান্স" যাতে থাকে ঐটুকু গতির বেশি তোলা যায় না, এগুলো মহাসড়কে যানবাহন চালানোর অতি সাধারণ নিয়ম। এবার বলুন তো, যারা "হানিফ" বা "শ্যামলী" বা "এস আলম" নামধারী পরিবহণ গুলোতে যাতায়াত করেন, এদের একটা চালকও এই নিয়মগুলো কখনো মেনেছে কিনা? এই অতি সাধারণ "ওভারটেক নিষেধ" মানার মত সচেতন না হয়েই যেখানে আমাদের হাজার হাজার চালক লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে "অতি উচ্চ ক্ষমতার' সুপারিশে, তখন দায়টা কার উপর বর্তায়, সেই ক্ষমতাবানের উপর, নাকি আমরা যারা তাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতাবান বানাচ্ছি তাদের উপর?আইন বা নিয়ম থাকলেই হয় না, সেগুলো মেনে চলার মত সচেতনতা দরকার, আমাদের নিজেদের বা এদেশের চালকদের সেটা মেনে চলার মত সচেতনতা, বিবেক বা প্রশিক্ষণ নেই, বাজি ধরে বলা যায়। এদেশে নিয়মতান্ত্রিকভাবে "ভারি যানবাহন চালনা"র লাইসেন্স পাওয়া যথেষ্ট কঠিন, ৩ থেকে ৪ টি ধাপ পার হয়ে প্রায় ৯-১০ বছর ড্রাইভিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকার পরেই সেটা পাওয়া সম্ভব, কিন্তু আন্তঃজেলা বাস বা ট্রাকচালকদের কতজনের সেঅভিজ্ঞতা বা দক্ষতা আছে? আবার যোগাযোগমন্ত্রী মিনমিন করে জানিয়েছেন, আচ্ছা, একটা পরীক্ষা নিয়েই নাহয় লাইসেন্সগুলো দেয়া হবে। অদ্ভুত, আইন অনুযায়ী তাহলে যে প্রায় ১০ বছরের "ছোট, মাঝারি" যানবাহন চালনার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়, সেটা কোথা থেকে আসবে? এটা নিয়ে কেউ আমাদের নেতাদের চাপ দিতে পারবেন? পারবেন বিনা পরীক্ষায় দেয়া ২৪ হাজার লাইসেন্স ফিরিয়ে নেয়ার দাবী তুলতে? টকশো গরম করা পা-চাটা বুদ্ধিজীবিরা কেউ পারবেন অমানুষটার বিচার দাবী করে একটা মামলা ঠুকে দিতে, জনস্বার্থে? আর যদি কেউ ঠুকেই দেন, এই দানবদের আক্রমণ থেকে তাকে বাঁচানোর জন্য কি তখন আমরা রাস্তায় নামবো?

না, আমাদের বীরত্ব তখন হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে, ফেসবুকে আধ্যাত্মিক আর প্রেমময় স্ট্যাটাস দেয়াতে আমরা যতটা পারদর্শী, কাজের বেলায় তার সিকিভাগও নই। অন্যের দোষ ধরাতে আমরা যতটা পটু, নিজে এগিয়ে সেটা করার বেলায় ততটাই পিছপা। বরং এই সুযোগে ক'টা দিন নিজেদের সচেতন সংস্কৃতিবান নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করার জন্য "মাটির ময়না'র পাইরেটেড ডিভিডি কিনে আনবো, "মুক্তির গান" দেখে আহা-উহু করবো, বুদ্ধিজীবিরা টক শো'তে গরম বুলি ছাড়বেন, সেমিনার হবে বিশাল বিশাল, আবারো মন্ত্রী-এমপিরা সেখানে সচিবদের লিখে দেয়া ভারি ভারি বয়ান করবেন, বিশেষজ্ঞরা সরকারী পয়সায় লান্ঞ্চ করে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে আলোচনা করবেন পূর্ণিমার খাবার ভালো নাকি সোনারগাঁয়ের। আমাদের ইলিয়াস কান্ঞ্চন বৃথাই আবারো দৌড়াবেন নিরাপদ সড়কের দাবী নিয়ে আর আমরা তাঁকে হেসেই উড়িয়ে দেব, আর নিশ্চিতভাবেই পরবর্তী নির্বাচনেও এই জারজ নেতাদেরই ভোট দিয়ে আরো একবার তাদের সামনে পশ্চাদ্দেশ পেতে দেব, যারা আবারো সবচেয়ে অযোগ্য অদক্ষ লোকগুলোই যাতে আমাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব পায় সেটা নিশ্চিত করবেন। আমরা ভুলে যাবো, কিন্তু আমরা আরেকজন তারেক মাসুদ পাবো না, আমরা ইলিয়াস কান্ঞ্চনের দুঃখ বুঝবো না, বাবা-বোনকে হারিয়ে তছনছ হয়ে যাওয়া পরিবারটির কষ্ট আমাদের স্পর্শ করবে না, ৪০ টি উজ্ঝ্বল সন্তানের মুখ আমাদের মনে পীড়া দেবে না, কারণ বিবেকের দংশন হয় মানুষের, সম্ভবত আমরা নিজেদের "মানুষ" বলার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি।

নিরীহ শান্তিপ্রিয় ভদ্রলোকগণ, আসুন আমরা চুপ করে বসে থাকি, বসে অপেক্ষা করি, টিভি সেটের সামনে বসে আহা-উহু করি, হয়তো কোন একদিন সকালে খবরের কাগজে আরেকটি চান্ঞ্চল্যকর খবরের অংশ হবার সৌভাগ্য হবে--"অমুক মহাসড়কে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অতজন নিহত"।

তারেক মাসুদের মত বরেণ্য ব্যক্তির জন্য যে জাতির বিবেক জেগে ওঠে মাত্র ৫ মিনিটের জন্য, আপনার-আমার মত অজ্ঞাতকুলশীলের জন্য তাদের বিবেক ৫ সেকেন্ডের জন্যও কাঁদবে, এমন নিশ্চয়তা দিতে পারছি না বলে অত্যন্ত দুঃখিত।

[সঠিক তথ্য-উপাত্ত ও কারিগরি ধারণা দিয়ে সাহায্য করার জন্য বন্ধুবর তানভীর রাহাতের কাছে কৃতজ্ঞতা]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29433586 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29433586 2011-08-17 11:44:34
পুরুষবাদীর ভাবনাচিন্তাঃ প্রসঙ্গ ভিকারুন্নিসা
তো আজকে হঠাৎ করেই এমন বহুবিতর্কিত অনিচ্ছুক বিষয় নিয়ে প্যাঁচাল কেন? প্যাঁচালের হেতু, এবার সমস্যা নিজের ঘাড়ে এসে পড়েছে। নিজের বলতে, মধ্যবিত্তের ঘাড়ে। এতদিন যখন গার্মেন্টসের মেয়ে পুলিশের হাতে ধর্ষিতা হতো, বা কোন এক পাড়াগাঁয়ে চেয়ারম্যানের ছেলে পরাজিত পক্ষের মেয়েকে পাটক্ষেতে তুলে নিয়ে যেত, তখন আমাদের খুব একটা গা না করলেও হতো। এমনকি উচ্চবিত্তের কন্যা শাজনীনকে যখন বাড়ির পুরুষ চাকরটা ধর্ষণ করে খুন করে, তখনো আমরা খানিক কৌতুহল নিয়ে খবরগুলো পড়তাম, মনে মনে ভাবতাম, বড়লোকের মেয়ে কিনা, সমস্যা আছে, হুঁ হুঁ বাবা! আর মিডিয়ার সেলিব্রিটি তিন্নির লাশ ব্রিজের গোড়ায় পাওয়া গেলে তো কথাই নেই, আরে, পর্নস্টার, মরলেই কি! প্রভার ভিডিও বের হলে আরো খুশি,এইবারে দেখা যাবে ঐ নিষ্পাপ মুখের আড়ালে কত বড় বড় শয়তান, দেখলেন, দেখে কি মনে হয়, আর শরীরে কি! চৈতীর ভিডিও বের হবার খবরে ব্লগে আর ফেসবুকে আকুতি, ভাই লিংকটা দিয়েন ইনবক্সে, মেইল আইডি দিয়া গেলাম, মাগীরে ভালমতন দেখবার চাই!

ভাল, এরা নারী, এদেরকেই নিজের সবকিছু রক্ষা করে চলতে হবে, পুরুষ আছে শুধু দেখার জন্য আর ভোগ করার জন্য, বেশ। এদের একেকজনের সামাজিক মর্যাদা, প্রতিষ্ঠা একেকরকম, কেউ নিম্নবি্ত্ত, কেউ মধ্যবিত্ত, কেউ চাকুরিজীবি, কেউ তারকা, কিন্তু একটা জায়গায় সবাই সমান, এরা নারী, এরা "ভিক্টিম"। এরা আমাদের, পুরুষদের থাবার শিকার। এখানে আমাদের বাছবিচার নেই, আমেরিকার স্পাই স্যাটেলাইটের চেয়েও সর্বগামী আমাদের দৃষ্টি। কোথায় কোন মেয়ের ওড়না সরে গেল, কোথায় কার জামা দিয়ে শরীর কতখানি ফুটে উঠলো, তা নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। হোক না কোটিপতির মেয়ে, পুরুষ চাকরের কাছে সে শুধুই মাংসপিণ্ড। কাজের মেয়ে হলেই বা কি, তার শরীরে কি আর সামাজিক মর্যাদা লেখা থাকে? কালো-ধলা, ছোট-বড়, আত্মীয়া-বান্ধবীতে তফাৎ নেই, দেখো আর মজা নাও আর উপভোগ করো। প্রেমিকা? যতক্ষণ আছে ততক্ষণ, ছেড়ে গেলেই একান্ত বিশ্বাসে সমর্পণ করা মুহূর্তগুলোর ভিডিও ছেড়ে দাও সবার সামনে, তুমি একবার ভোগ করেছ, এবার সবাই মিলে চোখ দিয়ে আর মুখ দিয়ে ধর্ষণ করুক, একার মাল দিয়ে কাজ নেই, মালে গণিমতেই আসল সওয়াব।

এগুলো নিয়মিত ঘটনা, গা সওয়া হয়ে গেছে। যেসব পুরুষ প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে এসব কর্মকাণ্ডের সাক্ষী, বা হোতা, তাদেরও ঘরে মা আছে, নিজের বোনের নিরাপত্তা নিয়ে তারাও সময় সময় চিন্তিত হয়, তারপরেই ঘরে ফিরে খোঁজ করতে বসে, আজকে কোন বাংলাদেশী কলেজ গার্লের বয়ফ্রেন্ডের সাথে নতুন ভিডিও বের হলো, সেই কলেজ গার্লটা যে তার নিজের বোনও হতে পারে সেটা ভুলে গিয়েই। নিজেও যে এর খুব ব্যতিক্রম তা নয়, তবে পার্থক্য হয়তো এটাই যে নিজের ঘরের নিরাপত্তা নিয়ে এই অধম একটু বেশি চিন্তিত, তাই অন্যের মেয়ে যখন ভিডিওতে ধরা পড়ে বা ধর্ষিতা হয়ে বিচার চাইবার বদলে আত্মহত্যা করে বা ঘরের কোণে মুখ লুকায়, সেখানে নিজের ঘরের মেয়েটাকে চিন্তা করে ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আমার বোনটা তো কলেজে গেছে, কার সাথে ঘুরছে, কাকে বিশ্বাস করে নিজেকে তুলে দিচ্ছে, আমার মেয়েটাও তো একদিন স্কুলে যাবে, পিতৃতুল্য শিক্ষকের কাছে পড়া বুঝতে যাবে, সহপাঠী ছেলেটার সাথে সরল বিশ্বাসে কথা বলবে, তখন?

তখন কি হবে, এটা সম্ভবত আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের খানিকটা মাথায় ঢুকেছে, রাজধানীর সবচেয়ে খ্যাতনামা স্কুলগুলোর একটি, ভিকারুন্নিসা নুন কলেজের এক ছাত্রী তার শিক্ষকের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হবার পর। এই ছাত্রীকে এরপর এই শিক্ষকরূপী পশু ব্ল্যাকমেইল করে তার জঘন্য কাজ চালিয়ে যায়, এবং এক পর্যায়ে এই ছাত্রী তার অভিভাবকদের মাধ্যমে স্কুল কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ জানায়। এর সাথে অন্য ছাত্রীরা আরো ৪ জন শিক্ষকের নামে একই ধরনের অভিযোগ করে। আতঙ্কজনক বিষয়টা ঘটে এরপর, কলেজ শাখার প্রধান বিষয়টা চেপে যান, কিন্তু ততক্ষনে ঘটনাটা প্রচার পেয়ে যাওয়াতে অন্য অভিভাবকরাও ক্ষোভে ফেটে পড়েন, এবং এই প্রেক্ষিতে তাকে অপসারণ করা হয়, এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে বাকি ৪ জনকে অন্য শাখায় বদলি করা হয়। এতে ছাত্রীরা এবং অভিভাবকরা সন্তুষ্ট না হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান, এবং সেই অবস্থায় কলেজের অধ্যক্ষা হোসনে আরা নির্যাতিতা ছাত্রীকেই টিসি দেয়ার হুমকি দেন। এমনকি পরবর্তীতে যখন অভিযুক্ত শিক্ষক পরিমল গ্রেপ্তার হয়ে ধর্ষনের কথা স্বীকার করে, তখনো এই অধ্যক্ষা গদী আঁকড়ে রাখার জন্য এই ঘটনাকে "মিউচুয়াল সেক্স" বলে আখ্যা দেন, এবং ছাত্রীদের আন্দোলনকে "এক শ্রেণীর ক্ষমতালোভীর কলেজকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত বলে ঘোষণা করেন।

এই হলো ঘটনার সারসংক্ষেপ, কিন্তু এটাকে বলা যায় "টিপ অভ দ্য আইসবার্গ", শুধু বাইরেরটুকুই দেখা যাচ্ছে, এসবব ঘৃণ্য আচরণের নিচে জমে থাকা আরো অনেক পঙ্কিলতা, আমাদের মনের নীচতা চাপা-ই পড়ে আছে। যেমন ধরুন, এর মাঝেই নানাভাবে ঘটনাকে দলীয় রূপ দেয়া হয়ে গেছে। এক পক্ষ বলে, অমুক দলের লোক সব ধর্ষক, আরেক পক্ষ বলে, অমুক দল আমাদের গায়ে কালি দিচ্ছে। মাঝ দিয়ে যে মেয়েটার এত দুর্দশা, তাকেই হুমকি দিয়ে বসলেন অধ্যক্ষা। একজন "আন্ডার এজড" বা অপরিণত মেয়ের সম্মতিতেও তার সাথে মিলিত হলেও সেটা ধর্ষণ, যে কোন দেশের আইনেই, কাজেই এটাকে যে বা যারা "মিউচুয়াল সেক্স" বলে চালাতে চান, তাদের সাথে সাথেই পদচ্যুতি এবং তাদের নামে মামলা করা সম্ভব। এখানে আবার আরেকদল বুদ্ধিজীবি "আইন ও বিচার এবং অধিকার" জাতীয় বুলি নিয়ে উদয় হলেন, তর্ক লেগে গেল আওয়ামী-বিএনপি-জামাত ইস্যুতে, কমিটি সরানো বৈধ নাকি অবৈধ এই নিয়ে শুরু হলো চুলাচুলি, এর মাঝে আবার আরেকদল উদয় হলো, তাদের কথা হলো, ভিকির মেয়েরা যেমনে চলে, ওদের দিকে তো নজর যাবেই, পুলিশের রিপোর্টে লেখা হলো, স্কার্ট আর টপস পরে গিয়েছিল বলেই পশুটা সেই মেয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

লে হালুয়া, এইবার সামলান ভাইয়েরা! মেয়েদের পোশাক দেখলেই আমাদের পুরুষত্ব জেগে ওঠে, খালি পরিমলের দোষ দেই কেন, ফেসবুকে দেখলাম একখানা গ্রুপ খোলা হয়েছে, তার নাম-- "ঐ ছেমড়ি, গলায় ওড়না না দিয়া বুকে দে, কামে দিবো।" কোন এক নৈতিকতার ধ্বজাধারী এই বান্দাকেও সেখানে যোগ করেছেন, গিয়ে দেখি সেখানে মডেল দের ওড়না ছাড়া ছবি, আর প্রতিটা ছবির নিচে যেসব মন্তব্য, সেগুলো পড়ে এইসব নীতিবাগীশদের সম্পর্কে একটা কথাই মনে আসে-"ধর্ষকামী"। তাদের কাম যাতে প্যান্টের ভেতরে থাকে, সেজন্য মেয়েদের ওড়না পরতে হবে, তাদের ধর্ম রক্ষার জন্য মেয়েদের সারা গা ঢেকে চলতে হবে, কিন্তু ধর্মে যে এইসব বীরপুঙ্গবদেরও দৃষ্টি সংযত ও নত রাখতে বলা হয়েছে, সেই অংশটুকু নীতির কারবারীরা বেমালুম ভুলে যান। ব্যক্তিগতভাবে রক্ষণশীল বলে এরকম ডিজুস ফ্যাশন পছন্দ নয়, ঘরের বৌ বা বোন এভাবে ঘুরবে সেটাও চাইনা, কিন্তু অন্যের মেয়ে বা বৌ কিভাবে ঘুরলো, সেদিকে চোখ দিয়ে তাকে চেটে খেয়ে জনসমক্ষে কথা দিয়ে তাকে ধর্ষণ করার মত নিচেও বোধহয় এখনো নামতে পারিনি। আরে ব্যাটা, আপনি ভাল তো জগৎ ভাল, কে কিভাবে ঘুরবে, কার সাথে ঘুরবে, এটা সম্পূর্ণই তার নিজের অধিকার, যতক্ষণ সে তোমার ক্ষতি না করবে। পছন্দ না হয়, চোখ নামা, নিজের ঈমান আর নৈতিকতা এতই দুর্বল যে মেয়েদের পোশাক দেখলেই নোলা সামলাতে পারিস না, তুই আসিস উপদেশ দিতে ক্যামনে ঈমান রক্ষা করা যায়, ভণ্ড আর কাকে বলে! পরিমলের সাথে এদের একটাই তফাৎ, পরিমলের সাহস বেশি, এদের নেই, সুযোগ পেলে এরাও ছেড়ে দেবে, এই ভরসা তো পাই না!

ভার্চুয়াল জগৎ ছেড়ে একটু বাস্তবে নামি। ধরুন পাবলিক বাসের কথা, গাদাগাদি ভিড়ের মাঝেও আজকাল মহিলাদের বাসে উঠতে হয়, আর বিশ্বাস করুন, সেটা সুখের কোন অভিজ্ঞতা না। আমরা এমনই ভদ্রলোক যে কারো গায়ে ধাক্কা না দিয়ে যেতে পারি না, সম্ভব হলে একটু গায়ে হাত দিয়ে সরতেও বলি। বাস কন্ডাকটর আরেকটু সরেস, মেয়েদের পিঠে হাত না দিয়ে বাস থেকে নামাতেই পারে না। কোন মেয়ে প্রতিবাদ করলেই সেই পুরানো যুক্তি, পাবলিক বাসে উঠেছেন, ধাক্কা তো লাগবেই, এত শখ থাকলে গাড়িতে যান। কিছু চামার আছে, পেছনে জায়গা খালি থাকলেও বসে যাবে সামনের মহিলা সিটে, মহিলা উঠলেও মোষের মত বসেই থাকবে, উঠতে বললে বলবে, সমানাধিকার চান, খাড়ায়া যান। আরে ব্যাটা, ঐ কথা বলার আগে কোনদিন ভাবিস, তুই যেভাবে চলিস, মেয়েটা কি ঐভাবে চলতে পারে? রাত ১২টায় তো আপনি নিশ্চিন্তে রাস্তায় হেঁটে যেতে পারেন, পারবেন আপনার মেয়েটাকে হাঁটতে দিতে? যেদিন পারবেন সমান পরিবেশ নিশ্চিত করতে, সেদিন নিশ্চয়ই জোর গলায় বাসের মহিলা আসন তুলে দিতে বলবো, তার আগে পর্যন্ত পুরুষ হিসেবে লজ্জা থাকলে একটু চুপ করে থাকুন না!

নিজেদের কীর্তিকাণ্ডের বয়ান কত দেব? অফিসে সহকর্মী আর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পথে বখাটে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহপাঠী আর শিক্ষক, কোথায় নিরাপদ? একজনের কাছে শুনেছিলাম, বাসে ওঠার পরে ১২-১৪ জন কলেজ ছাত্র সারাটা পথ তাকে উদ্দেশ্য করে শিষ দিয়ে গেছে আর রসালো মন্তব্য করে গেছে সারাটা পথ, পুরো বাসে একটা লোকও কথা বলেনি। অন্যের কথা কি বলি, যখন কলেজে পড়ি, বড় বোনকে নিয়ে দোকান থেকে বের হচ্ছি, কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ পা বাড়িয়ে বোনের পায়ে বাঁধিয়ে দিল। বোন ঘুরে গালাগালি শুরু করলো, বদমাশগুলো দাঁত বের করে হাসতে লাগলো, কাপুরুষের মত দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রতিবাদ করবেন? সাথে সাথেই মন্তব্য আসা শুরু হবে, ভাই আপনার এত দরদ কেন? কিছু আছে নাকি? এইরকম বেলেল্লার মত দেখায়া বেড়াইলে তো ঠোকর দিবেই, ঢাইকা রাখবার পারে না? খুব সহজ রাস্তা, এই কলংক লেপে দেয়া। পুবদেশীয় সংস্কৃতিতে মেয়েদের "পবিত্রতা" নামক একটা বস্তুকে দাম দেয়া হয় খুব বেশি, এবং যত আধুনিকা-ই হোক, এই সংস্কারটা থেকে বের হয়ে আসা খুব কঠিন। এজন্য মোটামুটি থোড়াই কেয়ার টাইপ কোন মেয়েও সহজে কোথাও স্বীকার করবে না কার সাথে তার সম্পর্ক কতটা গভীর, এজন্যই আমাদের দেশে ধর্ষিতাকেই বহন করতে হয় সব দায়ভার, যেখানে ধর্ষক বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় সবার সামনে। প্রমাণ চান? গতকালকের পত্রিকাটা খুলে দেখুন, "ধুমধাম করে বিয়ে করলেন অপূর্ব।" বাহ মর্দ, দেখালে বটে! প্রভা কেমন মেয়ে, সে বিবেচনায় না যাই, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তার ক্যারিয়ার শেষ, কারণ সে মেয়ে, কিন্তু অপূর্ব বা রাজীবের জীবনে কোন পরিবর্তন হয়নি, হবেও না। ঠিক একারণেই, নির্যাতন করুন, ধর্ষণ করুন, একবার যদি প্রমাণ করা যায় যে "মেয়েটা খারাপ", আপনাকে আর পায় কে, অপরাধ থেকে রেহাই, সমাজের সহানুভূতি, সব হাতের মুঠোয়। রুমানা মনজুরের উদাহরণ চোখের সামনে, পশুরূপী স্বামী বেচারার চোখ খুবলে নিল, তারপর তার চরিত্রে কালি দিয়ে বোঝাতে চাইলো, যা করেছে ঠিকই করেছে, আর কি আশ্চর্য দেখুন, সেইসব নীতিবাগীশরা সাথে সাথে মাঠে নেমে গেলেন, যে তাই তো, পরকীয়া করবে কেন, চোখ তুলে নাও এর, মেরে ফেলো। এদের মাঝে অনেকে আছেন যারা দোররা মারার পর মোল্লাদের জাত উদ্ধার করেন, ওদের সাথে আপনাদের পার্থক্য কোথায়, ভণ্ডামি আরেকটু বেশি করছেন আপনারা, তাই তো? যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে একটা মেয়ে তথাকথিত "ভালো না", তাহলেই কি সে "মালে গণিমত" হয়ে গেল? তাকে যা খুশি তাই করার অধিকার পেয়ে গেলেন আপনারা? আদিম যুগের গুহামানবদের সাথে তবে আমাদের তফাৎটা কি রইলো?
এবার মূল ঘটনায় ফেরা যাক। পরিমল গ্রেপ্তার হয়েছে, অপরাধ স্বীকার করেছে, শুনে স্বস্তি পেয়েছিলাম। আরো স্বস্তি পেয়েছি যখন হোসনে আরা কে সরিয়ে দেয়া হলো, ভাবলাম যাক দেরিতে হলেও এখনো ভাল সিদ্ধান্ত আসে, দলীয় লোকজনকেও জনগণের কথা চিন্তা করে মাঝে মাঝে গারদে পোরা যায়। এরপরেই চমক, মন্ঞ্চে হাজির আমাদের প্রাণপ্রিয় রাজনীতিবিদরা। ভেঙে দেয়া হলো কমিটি, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষাকে প্রচার করা হলো জামাতি হিসেবে, আন্দোলনকারী বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রীদের পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হলো, হুমকি দেয়া হলো তাদের। প্রচারণা শুরু হলো, এটা কলেজের ক্ষমতা দখলের জন্য বিএনপি-জামাত জোটের ষড়যন্ত্র। উপরমহল থেকে আদেশ হলো, পরিমলকে নাকি বিশেষ যত্নে রাখতে হবে। আর সবচেয়ে ঘৃণ্য ভূমিকা নিল আমাদের "বিবেক" মিডিয়া-- পত্রিকা আর টিভি চ্যানেল গুলো। সবার রিপোর্টিংয়ে নানা রকম ভণিতা করে প্রমাণের চেষ্টা করা হলো, "কতিপয়" ছাত্রী ও অভিভাবকের ষড়যন্ত্রেই এই অস্থিতিশীলতা। প্রথম আলোতে মতি ভাই যুক্তিপূর্ণ সম্পাদকীয় লিখে সুশীল ভাষায় সবাইকে আহ্বান জানালেন পরিস্থিতি "স্থিতিশীল" করে ফেলতে। টিভি চ্যানেল আর পত্রিকার সাংবাদিকরা ক্রমাগত বাচ্চা মেয়েগুলোকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে বুঝাতে চাইলেন, তোমরা ভুল করছো, এগুলো কোন বিষয় না, চেপে যাও, সমঝোতা করো। যখন কাজ হলো না, তারা হুমকি দিলেন, আমাদের বিবেক, মিডিয়া, হুমকি দেয়া শুরু করলো আমাদেরই মেয়েদের, আমাদের সন্তানদের। একজনকে যখন বলা হলো,আপনার বোনকে রেইপ করলে আপনি কি করতেন, সেই মানুষরূপী কুলাঙগার বলে বসলো, দিস ইজ নান অভ মাই বিজনেস, আমি ক্লাস করতাম। হ্যাঁ, টা হয়তো তিনি করতেন,নিজের মা-বোন-কন্যাকে বিক্রি করতে না পারলে কি আর এই দেশে উপরে ওঠা যায়? একজন হোসনে আরার কাছে যেমন তার সন্তানতুল্য মেয়েদের চেয়ে একজন দলীয় ধর্ষকের মূল্য বেশি, হারামখোর পা-চাটা সাংবাদিকের কাছ থেকে আমরা আর কি আশা করতে পারি?

হায় সাংবাদিক ভাইয়েরা, হায় বুলবুল, মতি ভাই, হায় নারীনেত্রীর স্বামী, আপনাদের স্ত্রী-কন্যারা এখন কোথায়? নাকি নারী অধিকার শুধু আপনার ঘরে? ঐ মেয়েটি, যার পৃথিবীটা এক পলকে ঝলমলে রঙিন থেকে কুৎসিত কালো হয়ে গেছে, সে কি আপনাদের কাছে এতটাই অচ্ছ্যুৎ? ব্যবসা আর ক্ষমতার জন্য কি আপনারা ঐ পশুর অধম রাজাকারদের মতই নিজের ঘরের মেয়েকেও তুলে দেবেন? মতি ভাই, আপনার অন্নদাতার কন্যাও তো এই ঘৃণ্য অপরাধের স্বীকার, একটিবারও কি সেই স্মৃতি আপনাদের বুকটা কাঁপিয়ে দেয় না? নাকি পশু হতে হতে আমরা আদতে পশুকেও লজ্জায় ফেলে দিতে যাচ্ছি?

একটা জাতির সভ্যতার মাপকাঠি সম্ভবত তার সম্পদে বা ক্ষমতায় নয়, বরং সমতায়। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যাক। একটা সুইডেনের, একটা পাকিস্তানের। সুইডেনে নাকি, একটা মেয়ের সম্মতি নিয়ে তার সাথে মিলিত হলেও মেয়েটি অভিযোগ করলে সেটা আমলে নেয়া হবে, জুলিয়ান অ্যাসান্ঞ্জ সেটার উদাহরণ। এমনকি, কোন মেয়ে অভিযোগ করলে সেখানে পুরুষটির জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি। উল্টোদিকে পাকিস্তানে, ধর্ষিতাকে দু'জন পুরুষ সাক্ষী রেখে প্রমাণ করতে হবে যে সে ধর্ষিতা, যেন ব্যাপারটা এমন যে ধর্ষণের আগে দু'জন পুরুষকে ডেকে মেয়েটা বলবে, এসো, দেখো, তারপর সাক্ষ্য দাও। কোন জাতিকে আপনি সভ্য বলবেন, আর কোনটাকে বর্বর, আপনার বিবেচনা। এবার আমাদের দেশে আসুন, যেখানে ধর্ষিতাকে দোররা মারা হয়, নয়তো বিয়ে দেয়া হয় ধর্ষকের সাথে, এটাই সমাজের বিচার, আবার থানায় গেলে পুলিশি হয়রানি, ওদিকে প্রমাণ করার চেষ্টা চলবে, মেয়েটা "খারাপ", কাজেই সম্মান বাঁচাতে মেয়েটা চুপ থাকবে,, চুপ থাকবে তার পরিবারও। ভিকারুননিসার ঘটনায় দৃষ্টি ফেরাই, বাচ্চাটা চুপ ছিল প্রথমে, কারণ তাকে ব্ল্যাকমেইল করা হলো, ভিডিও ছেড়ে দেয়া হবে, এভাবে হুমকি দিয়ে একই কাজ করা হলো বারবার। না পেরে মেয়েটা অভিযোগ করলো, এবার কলেজের অধ্যক্ষা আর শিক্ষক-শিক্ষিকারা বললেন, চেপে যাও। যখন পারলেন না, হুমকি দিলেন, মেয়েটাকেই টিসি দেয়া হবে,ওদিকে আসামীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সব যখন চলে গেল নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এবার স্বয়ং ক্ষমতার ডাণ্ডা নিয়ে এগিয়ে এল তাদের আশ্রয়দাতারা, রাষ্ট্রযন্ত্র তার সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমাদের সন্তানদের উপর, তাদের মুখ বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা চললো, আর তাতে সরব বা নীরব সমর্থন যোগান দিয়ে চললো আমাদেরই তথাকথিত সভ্য লোকেরা। কি, নিজেদেরকে কি এখন পাকিস্তানী বর্বরদের চেয়ে খুব ভাল কিছু মনে হচ্ছে?

মাননীয় ভদ্রলোকরা, ভদ্রমহিলারা, জাতির বিবেকরা, একটু নিজেদের সমস্যা পাশে সরিয়ে এই মেয়েগুলোর সমস্যার দিকে তাকান। এরা আপনাদের সন্তান, আমাদের সন্তান, এরা ভিনদেশ থেকে আসেনি, ভিনগ্রহ থেকে নামেনি, এরা আপনার আমার অতি আদরের, অনেক স্নেহে গড়ে তোলা কন্যাসন্তান। এরা আমাদের ভবিষ্যৎকে গড়ে তুলবে, আমাদেরই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্মদাত্রী হবে, এদের সমান অধিকার দেয়ার মত সভ্য আমরা যদি না হতে পারি, অন্তত এদেরকে আমাদের সমান নিরাপত্তা দেয়ার মত বিবেক তো আমাদের আছে, এইটুকু আশা কি আমরা করতে পারি না? আমাদের ২ লক্ষ নারী বর্বর পাকিস্তানিদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন, আমরা কি এই স্বাধীন দেশে আমাদের শিশুদের কাছে নিজেদের সেরকম বর্বর হিসেবেই প্রমাণ করতে চাই? আজ আপনার মেয়ে সেখানে নেই, কিন্তু নিশ্চিত থাকুন, আমাদের মেয়েরা কোথাও নিরাপদ নয়, ঘরে না, বাইরেও না, কারণ আমরা এখনো পশু, এখনো কাপুরুষ, আমরা এখনো পুরুষ নামের যোগ্য হতে পারিনি, সম্ভবত, মানুষ বলে নিজেকে দাবী করারও যোগ্য হয়ে উঠিনি। আমরা যদি জেগে না উঠি, কোন একদিন, কোন এক নিকষ অন্ধকার মুহূর্তে, আপনার, আমার রক্তে-মাংসে গড়ে ওঠা মেয়েটার দিকেও কোন এক কুৎসিত জানোয়ার তার থাবা বাড়াবে, সেদিন যদি আপনার মেয়েটা প্রশ্ন তোলে, আমি এখন কোথায় যাবো, আমরা কি জবাব দেব তাদের কাছে?

কাকে আপনারা কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান হে ভদ্র-সভ্য নামধারী ভণ্ড বিবেকহীন মানুষেরা, ঐ জানোয়ারকে, নাকি নিজেদেরকে?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29414005 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29414005 2011-07-16 13:40:32
শিশুকালের খেলা, গায়ে মাখি ধুলা হয় চোর, ব্যাটার কপালে ম্যালা দুঃখ। তখন আমরা শিশু ছিলাম, আমাদের একটা মাটিগন্ধী শৈশব ছিল, এই কঠিন শহরেও আমরা বিদেশী ক্রিকেট আর ফুটবলের আগেই মাটির খেলার খোঁজ পেয়েছিলাম।

এসব অর্থহীন খেলার আগেই শোনা হয়ে গিয়েছিল নানা রকম ছড়া কাটা, ঐ বয়সে সবচেয়ে অপমানজনক ছিল যার মাথা ন্যাড়া তার জন্য একখানা চার লাইনের ছড়া---
"বেল মাথা চাইর আনা,
চাবি দিলে ঘুরেনা,
চাবি হইলো নষ্ট,
বেল মাথার কষ্ট।"
শুধু ছড়া কেটে ছেড়ে দিলে এক কথা ছিল, সাথে যে যখনি সুযোগ পেত মাথায় তবলা বাজিয়ে যেত, ওদিকে মা-বাপদের একটা ধারণা ছিল যে মাথাটা টাক্কু বেল করলে চুল হবে ঘন কালো, কাজেই নিয়মিত শুনতে হতো ঐ ছড়া, তবলার বোলের সাথে। ঐ যে মাথায় ন্যাড়াবেলের ব্যাপারে আতঙ্ক ঢুকে গিয়েছিল, এখনো চুল কাটাতে গেলেই অস্বস্তি লাগে, কদমছাঁট হয়ে যাবার আগেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ি ঝটপট।

মানুষ হয়েছি এই কঠিন শহরে একা, মাঝে মাঝে নানাবাড়ি গেলে খালাতো মামাতো ভাই-বোনরা খেলতো পুতুল আর রান্নাবাটি, ২-৪ দিন খেলেই উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম, এ জিনিসে পোষাবে না। বোনেরা ছড়া কাটতো আরো কিছু, কি যেন---
"আকাশ থেকে নেমে এল ছোট্ট একটি প্লেন,
সেই প্লেনে বসে ছিল একটি ছোট্ট মেম,
মেমকে আমি জিগেস করলাম হোয়াট ইজ ইউর নেম,
মেম আমাকে উত্তর দিল
মাই-নেম-ইজ-বিউ-টি-ফুল।"
এই বলে হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়তো, যদিও এই ছড়ায় এত হাসির কি আছে, এখনো বুঝিনি। মাঝে মাঝে সবাই হাত পাততো, আবার চলতো ছড়া, প্রতি শব্দে একেকজনের হাতে ছোঁয়া--"ইচিং বিচিং চিচিং চা, প্রজাপতি উড়ে যা"। যার হাতে পড়তো "যা", সে বাদ পড়ে গেল। তবে একটু উৎসাহ পেলাম "ফুল টোকা" তে, মহা গ্যান্ঞ্জামের খেলা। ভাগ হয়ে যেত দুই দলে, প্রত্যেক দলে একজন হতো রাজা, ২ দিকে বসতো ২ জন। বিপক্ষের একজন এসে ধরবে রাজার চোখ, আর আরেকজন এসে জোরসে একটা টোকা মেরে ফেরত যাবে তার দলে, চোখ খুলে রাজাকে গিয়ে ধরতে হবে কে মেরে গেল, ধরতে পারলেই সে বাদ, এভাবেই চলতে থাকবে যতক্ষণ না এক পক্ষের সব খেলোয়ার ধরা পড়ে। গ্যাণ্ঞ্জামটা ছিল, মহা দুই নম্বুরি হতো, যার চোখ ধরা হলো সে যেকোনভাবে হোক একটু দেখার চেষ্টা করতো। না পারলে, আগে থেকেই দলের মাঝে চোখ-হাতের নানা রকম ইশারা ঠিক করাই থাকতো, কে টোকা দিয়েছে সেটা ধরার জন্য। বিরক্ত হয়ে শেষমেশ কষে চোখ বাঁধার ব্যবস্থা হলো এক্কেবারে র্যাব স্টাইলে, কিন্তু কিসের কি, যে পক্ষ ধরা খাবে তারা একেবারে সাংবাদিকদের মতই হাউকাউ শুরু করে দিত চুরি-চোট্টামির অভিযোগ এনে, বেশিরভাগ দিনই খেলা শেষ হতো অমীমাংসিতভাবে।

তারপরে একটু বড় হয়েছি, তবে অতটা বড় না যে বড়দের সাথে খেলতে পারি, কিন্তু লাফঝাঁপ পারি হালকা, বোন আর প্রতিবেশিনীরা লোকজনের অভাবে মাঝে মাঝে ডাক দিতেন "কুতকুত" খেলায়। ১০০ ভাগ রমনীয় খেলা, টিভিতে পেপসির বিজ্ঞাপনে যেমনটা দেখায়, সাকিব আল হাসান উল্টো মুখ করে একটা ইটের টুকরো (যেটাকে চারা বলে) ছুঁড়ে দিচ্ছেন, আর তারপরে একদমে কুতকুত কুতকুত বলতে বলতে এক পায়ে লাফিয়ে সেই চারাটাকে ঠেলে ঠেলে কোর্টের শেষ মাথায় নিতে হবে, ৪ আর ৬ নম্বর ঘরে গিয়ে আবার ২ পা ফেলা যেত। আপুদের দড়িলাফেও মাঝে মাঝে অংশ নেয়ার সুযোগ হতো, দড়িতে পা বেঁধে পড়ে তাদের বিনোদন দেয়া ছিল আমাদের মত "দুধভাত" দের কাজ, মানে কিনা, তোমরা খেলার অংশ নও, তবে থাকতে পারো আরকি, কান্নাকাটি করো না। দুধভাত নেয়ার ব্যবস্থা সব খেলাতেই ছিল, যে পিচ্চিটা বড়রা খেলায় না নিলে গিয়ে বাপ-মাকে নালিশ করে সাধের খেলাটা পণ্ড করে দেয়ার ব্যবস্থা করবে তাকে ঠাণ্ডা করার রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেমন আমাদের নেতারা গত ৪০টি বছর ধরেই জনগণকে দুধভাত বানিয়ে দিব্যি খেলে যাচ্ছেন খেলারামের খেল।

একেবারেই উপভোগ করতে পারতাম না যে খেলাটা, তার নাম "কানামাছি।" একবার চোর হয়েছ তো তোমার দফা শেষ, চোখ বেঁধে মাঝখানে ছেড়ে দেয়া হবে আর তোমার কাজ হলো তোমার আশপাশে ঘুরে ঘুরে যারা "কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যারে পাবি তারে ছোঁ" বলে গায়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে (আসলে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকিয়ে যাচ্ছে) তাদের পাকড়াও করা। সিনেমাতে মাঝে মাঝে নায়ক-নায়িকা এই মহা রোমান্টিক খেলাটা খেলে থাকেন, আগেকার বাদশাহ-বেগমরাও নাকি খেলতেন আর সেখানে আনারকলিরা বরাবরই একটু খেলিয়ে সেলিমের আলিঙ্গনে ধরা দিতেন, কিন্তু এই বান্দা সারা জীবনে আনারকলি দূরে থাক কোন ম্যাডাম ফুলিও ধরতে পারেনি, শুধু কিল খেয়ে "ফুল" হওয়া ছাড়া। তারচেয়ে বরং "কুমির-কুমির" খেলাটা ভাল ছিল, ৪-৫ টা জায়গা ঠিক করা হতো উঠানে দাগ দিয়ে, ওগুলো হল জেগে ওঠা চর, বাকি জায়গাটুকু কুমিরের সম্পত্তি, মানে জল। যে ক'জন খেলোয়ার থাকতো চর থাকতো তারচেয়ে ২-৩টা কম, কোন চরে একসাথে দু'জনের বেশি থাকতে পারবে না, কাজেই দৌড়ে দৌড়ে জায়গা বদল করতে হতো কুমিরের হাত এড়িয়ে, ধরা পড়লে নিজেকেই হতে হবে কুমির। যে কুমির হতো তার বেশ কষ্ট, বিশেষ করে যখন অন্যরা চর থেকে অল্প একটু জলে নেমে "কুমির তোর জলে নেমেছি" বলে নাচ দিতো, পুরো গা জ্বলে যেত।

একদম বাচ্চাকালের আরেকটা খেলা ছিল, ওপেনটি বায়োস্কোপ। জেমসের গানটা মনে আছে? ওই যে---
"ওপেনটি বাইস্কোপ,
নাইন টেন টেইস্কোপ,
সুলতানা বিবিয়ানা
সাহেব বাবুর বৈঠকখানা।"
এই ছড়া বলতে বলতে রেলগাড়ির মত লাইন করে একদল ঘুরে ঘুরে যেত হাত উঁচু করে রাখা ২ জনের মাঝ দিয়ে, ছড়া শেষ হবার সাথে সাথে হাত নামিয়ে
একজনকে পাকড়াও করে ফেলা হয়, যে ধরা খাবে তার কাজ হলো ঐ দু'জনের ছড়ানো পায়ের উপর দিয়ে লাফ দেয়া। লাফ দিতে গিয়ে মাঝে মাঝেই মুখ থুবড়ে পড়লেও উৎসাহের অভাব নেই, ধুলা না লাগলে আর খেলাধুলা কি? ওটার সাথেই চলতো "এলন্ডি লন্ডন" নামের আরেকটা খেলা, যে চোর, সে পেছন ফিরে থাকবে, অন্যরা একটু দূর থেকে তার দিকে এগিয়ে আসবে, চোর "এলন্ডি লন্ডন" বলেই ঝট করে পেছন ফিরে তাকানোর আগেই একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হবে, যদি নড়াচড়া ধরা পড়ে তবে একদম আগের জায়গায়। যে সবার শেষে থাকবে, সে হবে পরবর্তী চোর। চোরের ভোগান্তি আরো বেশি ছিল "সাত পাতা" খেলায়, তার কাজ হলো ৭ রকমের পাতার নাম বলা, অন্যরা সেগুলো যোগাড় করে প্রতিটা থেকে ১টা করে টুকরো নিয়ে কোথাও লুকাবে, চোরের কাজ সেগুলো খুঁজে বের করা, যদিও বেশিরভাগ সময়ই সেটা পাওয়া ছিল একটা অসম্ভব ব্যাপার।

যখন মোটামুটি ছোটাছুটি খেলার পর্যায়ে চলে এলাম, তখন শুরু হলো "ছোঁয়াছুয়ি" বা চোর-পুলিশ খেলা, নিয়ম খুব সরল, চোর ধাওয়া করবে অন্যদের পেছনে, যাকে ছুঁয়ে দেবে সে হবে চোর। (আহা, তখন কতই নিষ্পাপ ছিলাম, বালিকাদের ছোঁয়া থেকে বাঁচতে দিতাম ছুট, এখন হলে ধরা দিতাম যেচে)। এর একটু জটিল আর দলীয় সংস্করণ ছিল "বরফ-পানি", এক দল আরেক দলকে ধাওয়া করতো, বিপক্ষ দলের কাউকে ছুঁয়ে "বরফ" বলে চিৎকার দিলেই তাকে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, যতক্ষণ না তার দলের কেউ এসে তাঁকে ছুঁয়ে "পানি" না বলবে। দলের লোকজনকে উদ্ধার করতে হতো বলে ব্যাপারটায় বেশ বীরত্বের ভাব ছিল, অনেক বেশি দৌড়াতে হতো বলে মাঠটাও লাগতো বড়, আর সত্যি বলতে কি, মাঝে মাঝে কোন "বরফ" বালিকাকে উদ্ধার করতে পারলে ঐ বয়সেই নিজেকে বেশ আলেকজান্ডার মনে হতো। দৌড়-ঝাঁপের আরেকটা খেলা ছিল দাঁড়িয়াবান্ধা, কেন যেন নিয়মটা ভুলে গেছি, আর ছিল গোল্লাছুট, সেখানে একটা স্তম্ভ বা ঘাঁটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকবে একটা দল, আরেক দলের কাজ হলো লম্বা দম নিয়ে ঐ ঘাঁটির আশপাশে ঘুরে আসা, এবং সুযোগ পেলেই ঐ স্তম্ভটাকে ছুঁয়ে প্রতিপক্ষের হাত এড়িয়ে নিজের কোর্টে ফিরে আসা, তাতে বিপক্ষের একজন খেলোয়ার বসে যাবে, এভাবে চলবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত। কাছাকাছি নিয়ম "বউ-চি" বা "বুড়ি-চি" খেলার, শুধু স্তম্ভের বদলে ওখানে নিজেদের একজনকে সাজাতে হতো বউ, তাকে ছুঁয়ে আসতে হতো। "মাংস-চোর" খেলাটাও ছিল এটার আরেক সংস্করণ, বিপক্ষ দল একটা দাগের পেছনে থাকতো, সামনে একটা ঘরে থাকতো মাংসরূপী ইটের টুকরো, আরেকদলের লক্ষ্য ছিল একই সাথে একদমে প্রতিপক্ষের কোন খেলোয়ারকে ছুঁয়ে বসিয়ে দেয়া আর মাংসটা চুরি করে খেলা জেতা, তবে ধরা পড়লে নিজেকেই বসে যেতে হবে। খেলাটা কঠিন, বেশিরভাগ সময়েই দমের অভাবে ধরা পড়ে যেতে হয়, একেবারে হাডুডুর মতই বিপক্ষ ঝাঁপিয়ে পড়ে চেপে ধরে তখন।

সন্ধ্যার পরে যদি ঘরে আটকা পড়ে যেতাম, তখন চলতো "চোর-পুলিশ-সাহেব-গোলাম", চার টুকরো কাগজে চারটা নাম লেখা হবে, প্রতিটায় আলাদা পয়েন্ট থাকবে, না দেখেই চারজন চারটা তুলে নেবে, যে পুলিশ পাবে, তাকে অনুমান করতে হবে কে চোর। যদি পারে, চোরের পয়েন্ট টাও সে পাবে, না পারলে, শূন্য। বালিশ মারামারি ছিল আরেক বিনোদন, যদিও অভিভাবকদের মহা আপত্তি ছিল ওটায়, বালিশগুলোর ১২টা তো বাজতোই, সাথে ঘরের দু'চারটা জিনিসও অক্কা পেত। তখন অত লোডশেডিং ছিলনা, মাঝে মাঝে হলে সেটা বিনোদন, পড়ায় ফাঁকি মেরে নেমে যেতাম সবচেয়ে গা ছমছম খেলায়, শুদ্ধ ভাষায় যার নাম "লুকোচুরি", বাচ্চাদের ভাষায় "টিলোস্প্রেস", "পলান্তিস" ইত্যাদি। চোর মুখ ঢেকে গুণবে ১০০ পর্যন্ত জোরে জোরে, এই ফাঁকে বাকিরা লুকাবে, এরপর চোর খুঁজে বের করবে সবাইকে। যদি চোর দেখার আগেই কেউ তার গায়ে ছুঁয়ে দিতে পারে, তবে সে বেঁচে গেল, যদি চোর কাউকে দেখে ফেলে আগেই, তবে সে ফেঁসে গেল, পরের চোর হিসেবে। চোর হওয়াটা এখানে আনন্দের বিষয় ছিল না মোটেই, ছাদের আর বাড়ির কোণাকান্ঞ্চি থেকে অন্ধকারে কে কখন হালুম করে "এসপ্রেস" বলে ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে, এই ভয়ে সারাক্ষণ বুক কাঁপতে থাকতো, আর গ্রামের বাড়িতে এই খেলা মানে পুরো ভূতুড়ে অবস্থা।

গ্রামে গিয়েই একটা খেলা ডেখেছিলাম যেটা শহরে কখনো দেখিনি, সেটার নাম "মুলাবাড়ি।" একটা ভেজা গামছা পাকিয়ে শক্ত করা হতো, সেটা হলো "মুলা", তারপর একজন সেটা নিয়ে ধাওয়া করতো সবাইকে, নাগালে পেলেই ধুমধাম বাড়ি, যার গায়ে লাগতো সে বুঝতো মুলা জিনিসটা আসলে বেশি সুবিধার না, গাধা ছাড়া আর কারো ওটার পেছনে দৌড়ানো উচিতও নয়। "ডাঙ্গুলি" খেলাটা একটু বিপজ্জনক দেখে ২-১ বারের বেশি খেলতে দেয়া হয়নি, একটা চোখা বাঁশের টুকরোকে একটা গর্তের মাঝে রেখে আরেকটা পাটকাঠি জাতীয় কিছু দিয়ে গদাম বাড়ি দেয়া হতো, বিপক্ষের উদ্দেশ্য থাকতো সেটা উড়ন্ত অবস্থায় ধরে আউট করা, বেসবলের বাংলা ভার্সন বলা যায় আরকি। ব্যথা পাবার ১০০ ভাগ সম্ভাবনা নিয়েও অবশ্য "বম্বাস্টিং" খেলেছি নিয়মিত, অনেকে ওটাকে বলতো "পিঠ জ্বলান্তিস" বা "কিং-কুইন"। একটা টেনিস বল নিয়ে যাকে নাগালে পাও তাকেই গায়ের জোরে মেরে বসতে হবে, যার গায়ে লাগবে সে আউট, লাস্ট ম্যান স্ট্যান্ডিং হবে বিজয়ী, তবে ২ দলে ভাগ হয়েও খেলা যায়। টেনিস বল লাগতো আরেকটা খেলাতেও, সেটা "সাত চারা", একটা ইটের উপর ৭টা চারা (ইটের টুকরো) বসিয়ে দূর থেকে বল মেরে সেগুলো মাটিতে ফেলেই ভোঁ দৌড় দিতে হবে, এবং তারপর বিপক্ষের হাত এড়িয়ে আবার ওই চারাগুলো ইটের উপর বসাতে হবে। বিপক্ষের কাজ হবে বলটা নিয়ে চারাভাঙ্গা দলের গায়ে লাগানো, বলাই বাহুল্য, এখানেও গায়ে বল মারার ব্যাপারে কোনরকম দয়ামায়া চলতো না, চারা বসানোর বীরপুরুষ হওয়া তাই খুব একটা সোজা কাজ ছিল না।

একদম শেষে যেটার কথা মনে পড়ছে, নিজে সেটায় বিশেষ সুবিধা করতে পারতাম না, সেটা হলো "মোরগ লড়াই"। এক হাত দিয়ে এক পা ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে অন্যদের গুঁতোধাক্কা দিয়ে বৃত্ত থেকে বাইরে ফেলতে হতো, দামড়া ছেলেপেলেদের আধিপত্য ছিল সেখানে বেশি। তবে জেতার জন্য কি শিশুরা খেলে? আজকে যখন দেখি শিশুরা "মার্ক্স অলরাউন্ডার" বা "চ্যানেল আই ক্ষুদে প্রতিভা" হবার জন্য মরণপণ লড়াইতে নামে, বাদ পড়ে যাওয়ার পড়ে বুড়ো-হাবড়া বিচারকদের মায়াকান্না দেখে ছোট্ট নিষ্পাপ মুখগুলোতে তীব্র বেদনার ছায়া নামে, তখন মনে পড়ে অর্থহীন ওপেনটি বাইস্কোপের ছড়া। ক্লাস ওয়ান-টু তে পড়া বাচ্চাগুলো যখন কোচিং আর প্রাইভেট টিউটরের যন্ত্রণায় হাঁসফাঁস করে গম্ভীর বাবু হয়ে যায়, মনের আকাশে খেলতে থাকে সন্ধ্যাবেলার লুকোচুরি। বাক্স অ্যাপার্টমেন্টের গ্রিল ধরে থাকা শিশুটা যখন কম্পিউটার গেমস নিয়ে বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, তখন মনে হয় খুব বেশি কি পিছিয়ে গেছি আমরা ঐ বয়সে খোলা মাঠে বরফ-পানি খেলে? নাকি আসলে আমরা অতীতচারী, এখনো বেঁচে আছি পায়ের নিচে ঘাসের ছোঁয়া আর ধুলো মেখে বালির ঘর বানানোর মিথ্যে স্বপ্ন নিয়ে? হতেও পারে, তারপরেও সন্তান যেন আমার বুনো মানব হয় আমার চেয়েও অনেক বেশি, যন্ত্রঘেঁষা পণ্ডিত দিয়ে আমি মাটির পৃথিবীকে পাথরের দানবে বদলে দিতে চাই না, আমার সন্তানের সবুজ শৈশবকে ধুসর করে দিতে চাইনা, শিশু যেন আমার বেড়ে ওঠে ধুলো আর মাটিতে, ধুলো মাখা তার ছোট্ট হাতগুলো দেখে আরেকবার যেন বলতে পারি--"ইচিং বিচিং চিচিং চা, প্রজাপতি উড়ে যা।"

ভালো থাকুক আমাদের সন্তানেরা, দুধে-ভাতে না হোক, আলোতে আর বাতাসে।

[লেখাটা মাথায় এসেছিল আমার ভার্সিটির এক জুনিয়র, তানজিনা আফরিনের সাথে কথা বলতে গিয়ে, অবাক হয়ে দেখেছিলাম আমাদের শৈশবের খেলাধুলাগুলোর কি আশ্চর্য মিল। তাই কৃতজ্ঞতা সহ লেখাটা তাকেই উৎসর্গ করা হলো।]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29374587 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29374587 2011-05-03 21:56:01
কষ্টচারিতা আজ আমি রাতপ্রহরে দুঃখপ্যাঁচাদের ঘুম পাড়াবো,
আর শেষবিকেলের ফেরিওয়ালার মত হাঁক দিয়ে বলবো--
"কষ্টরা বাড়ি আছো?
একমুঠো রোদ্দুরের বদলে তোমাদের কিনতে এসেছি!"

সন্ধ্যাপথের বুনো আলোয় কষ্টগুলো বেতালের ভূতের মত
চেপে বসে ঘাড়ে।
মাঝে মাঝে টুকটাক আলাপ চলে।
ভাল-মন্দ, সওয়াল-জবাব।

-"আজকাল তোমরা বেশ সস্তায় বিক্রি হয়ে যাচ্ছো, তাই না?"
-"তা যাচ্ছি, বিনা পয়সাতেই বলতে পারো,
কিনতে চায় না বলে জোর করে বাড়ি বাড়ি গছাতে হয়।"
-"এই দুর্মূল্যের বাজারে কষ্টের দাম কমে গেল কেন,
বাম্পার ফলন বুঝি?
-"কষ্ট করে কে আর কষ্ট কেনে বলো?
ঈশ্বরের পলিসিতে বরাবরই গণ্ডগোল ছিল,
কয়েকটা সুখের মোহর বানিয়ে কষ্টগুলোকে তামার পয়সার মত
ছুঁড়ে দিয়েছেন সবখানে।"
-"তা-ও বটে।তবে কি জানো, মোহর না পেলে তামার পয়সাই সই,
পরের জন্মে নাহয় সুখের কারবারী হবো।"
-"পলাতক। হতাশাবাদীরাই কেবল পরজন্মের কথা বলে।"
-"হতে পারে, অক্ষমের শেষ অস্ত্র।"
-"তুমি জন্মান্তর মানো?"
-"মানি না, কর্মান্তর মানি তবে। ঝুড়ি ঝুড়ি দুঃখ ফেরি করে
হয়তো কোন এক দুঃস্বপ্নের পাপ কেটে যাবে,
এক লক্ষ তামার বদলে একটা মোহর পাবার আশা তো আছে!
আমি সেই মোহর দিয়ে ঢেউয়ের চূড়ায় একটা কুঁড়েঘর বানাবো।"

[কিছুদিন হলো লোকজনকে জ্বালাতে ইচ্ছা করছে। এই বাবদে মনে পড়লো, আমাদের এক কবিবন্ধু তার স্বরচিত কবিতা ঘাড়ে ধরে পড়িয়ে আমাদের সর্বোচ্চ বিরক্ত করতো, উঠতি কবিদের যা হয় আরকি। মনে হলো, এইটাই সেরা উপায়, শুরু করা যাক তবে।]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29360128 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29360128 2011-04-10 02:52:05
গুঁড়াকাব্য-১: ভালবাসা
১.

হাতটা তোমার পাতো,
দু'জন মিলে বৃষ্টি ভিজে
শিল কুড়ানোয় মাতো।

২.

এইবারেতে চুপ!
মধ্যরাতে জোছনা হাতে
দেখবো তোমার মুখ।

৩.

ভালবাসা অল্প না
চাঁদপানা ঐ মুখটা দেখে করছি কত জল্পনা।
মানিব্যাগে হাতটা রেখেই ফানুস হলো কল্পনা।

৪.

জল পড়ে পাতা নড়ে পাতায় পাতায় হিয়া,
চ্যাংড়া পোলা ভাইগা গেলো ডার্লিং আমার নিয়া।

৫.

অন্তরে অন্তর
ভালবাসা নয়তো কোন ফুসমন্তর!
বাড়ি আর গাড়ি আর শাড়ি তিনে মিলে
ভালবাসা তাল হয় তিল থেকে তিলে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29354912 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29354912 2011-04-01 14:51:13
বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা: কী, কেন, কিভাবে বাংলাদেশ সরকারের অধীনে কাজ করার জন্য। সম্প্রতি ৩১তম বিসিএস পরীক্ষার প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে, বিভিন্ন ক্যাডারে ২১০৮ জন কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য। যদিও এই পদের সংখ্যা প্রায়ই কমবেশি হয়, এবং গত ২-৩টি পরীক্ষার ধারা বিবেচনায় নিলে
বলা যায়, পদসংখ্যা বাড়বে বই কমবে না। এই অধম সৌভাগ্যক্রমে এই পরীক্ষার ধাপগুলো একবার অতিক্রম করেছে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে আগ্রহী প্রার্থীদের জন্য ২-৪ কথা বলার লোভ সামলানো গেল না, একে কোন রকম উপদেশ মনে না করে
অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির চেষ্টা মনে করলেই বাধিত হবো।

যে কেউ বিসিএস দেবার আগে একটাই অনুরোধ, আগে ভেবে দেখুন আসলেই আপনি সরকারী চাকরি করতে ইচ্ছুক কিনা। সরকারী চাকরির পক্ষে-বিপক্ষে অনেকরকম যুক্তি-পাল্টা যুক্তি রয়েছে, নিজে যাচাই করে দেখুন সেগুলো। প্রথম অভিযোগ,সরকারী চাকরির বেতন বাড়াবাড়ি রকমের কম, এমনকি চাকরিতে যোগদান করেও অনেককে এই অভিযোগ করতে এবং একসময় চাকরি ছেড়ে আবারো অন্য জায়গায় চলে যেতে দেখেছি।অভিযোগটা পুরোপুরি মিথ্যে নয়, আপনার যদি বেশি টাকাপয়সার দরকার থাকে বা কোটিপতি হবার ইচ্ছে থাকে, সেক্ষেত্রে সরকারি চাকরিতে যোগদান না করাই ভাল। এক্ষেত্রে আগে থেকেই ধরে নিচ্ছি আপনি সৎ থাকতে চাইছেন এবং কোনরকম অনিয়ম করে ধনী হতে রাজি নন, এবং সেক্ষেত্রে আপনাকে মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হবে মাঝারি (এবং অনেকের মতে অপ্রতুল) বেতনে সংসার চালাতে। পাল্টা যুক্তি হিসেবে দেয়া যায়, সরকারি
চাকরিতে আপনি কিছু আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা পাবেন, সরকারি বাড়ি এবং ক্ষেত্রবিশেষে যানবাহন, যেটা দিয়ে মোটামুটিভাবে
আপনার পোষাবে। তারপরেও বলি, টাকাপয়সার দিক দিয়ে উচ্চাভিলাষী হলে না আসাই ভাল, এবং ঘুষের লোভে আসার চেয়ে না আসা আরো ভাল, খামোকা দীর্ঘহ একটা প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে গিয়ে সময় নষ্ট করবেন। তবে আপনি এক্ষেত্রে সরাসরি জনসাধারণের জন্য কাজ করার এবং দেশের উন্নতিতে সরাসরি অবদান রাখার দুর্লভ সুযোগ ও ক্ষমতা পাচ্ছেন, দেশ আপনাকে যা দিয়েছে তা ফিরিয়ে দেবার এরচেয়ে ভাল সুযোগ আর হয় না বলেই
ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। সরকারী কাজের আরেকটা অসুবিধা হলো কাজকর্ম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেশ ধীরগতির, এবং বেশিরভাগ জায়গাতেই আধুনিকায়ন হয়নি বলে শুরুতে তাল মেলানো কঠিন হতে পারে, তবে পরিস্থিতি আস্তে আস্তে বদলাচ্ছে, এবং আধুনিক মনের মেধাবীরা যোগ দিলে আরো পাল্টাবে তাতে সন্দেহ নেই। যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন নেই বলে আরেকটা অভিযোগ রয়েছে, তেলবাজরা উপরে উঠে যায় বা প্রমোশন পায় আগে এমন কথা প্রায়ই দেখি, কিছুটা সত্যতাও আছে এটায়, তবে এটাও ঠিক, কর্পোরেট এবং লোভনীয় প্রাইভেট চাকরি বলতে আমরা যা বুঝি, সেখানে এই তেলবাজি এবং পেছন থেকে ছুরি মারা আরো অনেক বেশি চলে এবং যেখানেই উপরে ওঠার প্রশ্ন, সেখানেই এই জিনিস থাকবেই, একতরফা সরকারি চাকরির জন্য কথাটা খাটে না।

যা হোক, এই বিতর্ক এখানে না ওঠানোই ভাল, বরং ধরে নিচ্ছি যারা লেখাটি পড়ছেন তারা একটু হলেও চেষ্টা করে দেখতে আগ্রহী। সেক্ষেত্রে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে দিন এখনি, কারণ আবেদনপত্র জমা দেবার শেষ তারিখ ২৮ ফেব্রুয়ারি, এবং বলে
রাখা ভাল যে যাদের এখনো অনার্সের ফলাফল বের হয়নি তারাও "অ্যাপিয়ার্ড" সার্টিফিকেট নিয়ে পরীক্ষা দিতে পারবেন। পরীক্ষাটা হয় ৩ ধাপে, আগেই বলেছি, প্রথম ধাপটা হলো ১০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি বা বাছাই পরীক্ষা, যার প্রশ্নগুলো হয় এমসিকিউ বা মাল্টিপল চয়েস কোশ্চেন। প্রতিটি প্রশ্নের সম্ভাব্য ৪টি উত্তর থেকে বেছে নিতে হয় সঠিক ১টি উত্তর, এবং প্রতিটি সঠিক উত্তরের জন্য ১ নম্বর পাবার পাশে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য কাটা যাবে ০.৫ নম্বর, বিষয়টা খেয়াল রাখা ভাল। গত ৩টি বিসিএস থেকে দেখা যাচ্ছে, কম-বেশি আড়াই লাখের মত প্রার্থী থাকে, এবং প্রাথমিক বাছাইয়ের পর রাখা হয় ১৩ থেকে ১৪ হাজারের মত। কাজেই প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কত পেলে আপনি সেই ১৪ হাজারের ১ জন হবেন তার ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, প্রশ্ন কঠিন এবং "আনকমন" হলে ৪৮-৫০ পেয়েও টিকে যেতে পারেন, সহজ হলে ৬৫-৭০ নিরাপদ।

আশা করা যায় মার্চের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে পরীক্ষাটা হবে, কাজেই শুরু করে দিন এখনি। প্রস্তুতি একেকজন একেকভাবে নিতে পারেন, এখানে শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু অযাচিত পরামর্শ দিতে পারি। প্রশ্ন হয় বাংলা, ইংরেজি,
বাংলাদেশ বিষয়াবলী, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী, গণিত এবং সাধারণ বিজ্ঞানের উপর। প্রথমেই বাংলা। এখানে প্রশ্নগুলো আসে বাংলা ভাষার ইতিহাস এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে, এজন্য সবচেয়ে ভালো বই নিঃসন্দেহে প্রয়াত অধ্যাপক হুমায়ুন
আজাদের লেখা "লাল নীল দীপাবলী" (অবশ্যপাঠ্য) এবং "কত নদী সরোবর"। নীলক্ষেত গেলে পাবেন, তবে বইমেলাতে এখন হুমায়ুন আজাদের সব বই-ই পাওয়া যাচ্ছে, এই দু'টোও, কিনে ফেলুন। বাংলাতে আরেকটা ব্যাপার হলো
কবি-সাহিত্যিকদের নাম, নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা বইটা নিয়ে ভদ্রলোকদের নাম ও গুরুত্বপূর্ন বইগুলোর নামের উপর চোখ বুলালে আশা করা যায় কষ্টটা বৃথা যাবে না। যারা ইংরেজিতে ভালো তাদের জন্য বিশেষ কোন কিছুর দরকার নেই, তারপরেও
Preposition এবং common mistakes এর উপর জোর দিতে পারেন। কিছু
translation ও আসে, এবং কিছু voice, মোটের উপর, ভাল ১টা ইংরেজি গ্রামার বই পড়লে প্রিলিমিনারি পার হয়ে যাওয়ার কথা। গণিতের বেলায় বলবো, ছোট ছোট সমস্যা আসে, এবং প্রায় সবই অষ্টম বা নবম শ্রেণীর পর্যায়ের, চাইলে ঐ বইগুলো থেকে দেখতে পারেন, আর যাদের বিজ্ঞানের পড়াশোনা, অত না দেখলেও সম্ভবত চলবে।

এবারে বাংলাদেশ বিষয়াবলী ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী, আর এখানেই চলে আসে গাইড বইয়ের প্রশ্ন। আপনার কাজটা সহজ করবে এবং খানিকটা গুছিয়ে দেবে গাইড বইগুলো, প্রশ্ন সম্পর্কেও ধারণা পাবেন। নীলক্ষেত থেকে এই ২ বিষয়ের উপর ওরাকল বা প্রফেসর'স এর গাইড বই কিনে ফেলুন, যে কোন একটা কিনলেই হবে। সব পড়া নিষ্প্রয়োজন, শুরুতেই দেখুন গাইডের পেছন দিকে, বিগত বিসিএস গুলোর প্রশ্ন এবং আরো কিছু সরকারী চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন আছে, সেগুলো দেখুন, ভাল একটা ধারণা পাবেন কি ধরণের বিষয়ের প্রতি জোর দিতে হবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর বিস্তারিত পড়াশোনা করুন, গাইড থেকে এবং এর বাইরেও যা পান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও তারিখ, স্থান, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, সেক্টর ও সেক্টর কমান্ডার, মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ইত্যাদি। বাংলাদেশের কোথায় কোন ভাস্কর্য রয়েছে, সেগুলোর নাম, উন্মোচনের তারিখ, স্থপতির নাম এগুলোর ব্যাপারেও ২-১টা প্রশ্ন থাকে। সাথে থাকে বাংলাদেশের উপজিলা-থানার সংখ্যা, বৃহত্তম-ক্ষুদ্রতম-দূরতম এই জাতীয় ২-১টা প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বিষয়ে গেলে, বিগত বছরের প্রশ্ন গুলোর সাথে দেখতে পারেন বিভিন্ন দেশের সীমান্ত, মুদ্রা, সাগর, রাজধানী, গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি, ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান, এবং অতি অবশ্যই জাতিসংঘ ও তার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন গুলোর উপর বিস্তারিত। সম্ভব হলে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিষয়েও কিছু জেনে যাওয়া ভাল, যে সময়ে যা নিয়ম।

এগুলোর বাইরে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত পত্রিকা পড়া। মুখস্ত করার দরকার নেই, গুরুত্বপূর্ণ খবর এবং অবশ্যই আন্তর্জাতিক পাতার উপর নিয়মিত চোখ বুলান, অন্তত গত ৩-৪ মাসের। সত্যি বলতে কি, নিয়মিত পত্রিকা পড়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কম করেও ৫-৭টা প্রশ্ন সরাসরি আসে ইদানিংকালের গুরুত্বপূর্ণ দেশী-বিদেশী ঘটনার উপর। সাথে কিনে ফেলুন "কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স" ম্যাগাজিনের সালতামামি ২০১০ সংখ্যা, এবং সাথে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি সংখ্যা। সব পড়তে হবে না, সারসংক্ষেপ পড়ুন, প্রধান ২-১টা প্রবন্ধ দেখুন, পরেও কাজে লাগবে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে কিছু পড়াশোনা করুন, খবর রাখুন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২৮তম বিসিএস এ "হট টপিক" ছিল বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ও বারাক ওবামা, প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় বেশ অনেকগুলো প্রশ্ন এসেছিল এর উপর। গতবার সেটা ছিল জলবায়ু পরিবর্তন। এবার, নিশ্চিত করেই বলা যায়, তিউনিসিয়া ও মিশরের সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান বেশ ভালই গুরুত্ব পাবে।

সবার শেষে বিজ্ঞান। প্রশ্ন গুলো খুবই সাধারণ, তবে ব্যক্তিগতভাবে খুব ১টা সুবিধার লাগেনি, চা পাতায় কোন ভিটামিন থাকে বা সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কত, এই জাতীয় জিনিস অনেক আগে পড়া, কাজেই একদম অবহেলা না করে ওরাকল বা প্রফেসর'স
এর বিজ্ঞানের গাইডটাও কিনে নিয়ে বইটার শেষ দিকে বিগত বছরের প্রশ্নগুলো দেখে যাওয়া ভাল। এরপরেও কারো হাতে কিছু সময় থাকলে, কিরণ এর "আজকের বিশ্ব" থেকে বাংলাদেশ বিষয়াবলী ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর অংশটা খানিকটা দেখে নিতে পারেন, যদিও ৫০০-৬০০ পৃষ্ঠার জ্ঞানভাণ্ডার হজম হবে না ভেবে নিজে আর ঐ পথ মাড়াইনি। প্রিলিমিনারির একদম আগে
আগে নীলক্ষেতে "শিওর সাকসেস" নামে ছোটখাটো সাজেশন বই বের হয়, নিজে কিনিনি, তবে কেউ কেউ নাকি উপকার পেয়েছেন, শেষমুহূর্তে নিজেকে ঝালাই করে নিতে চাইলে কিনতেও পারেন, যদিও কার্যকর কিনা সেটা বলতে পারছি না।

সবার শেষে, ইন্টারনেট। নিয়মিত খবরের সাইটগুলোতে ঢুঁ মারুন, ব্লগে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর তথ্যসমৃদ্ধ লেখাগুলো পড়ুন, ফেব্রুয়ারি আর মার্চ মাস যখন সামনে, ভাষা আন্দোলনের উপরও কিছু পড়াশোনা করে নিন, আর মুক্তিযুদ্ধের উপরও, আর
কিছু না হোক, নিজের ইতিহাসটা তো ভালভাবে জানবেন। একটু চোখ-কান খোলা রাখুন চারপাশের ব্যাপারে, এবং আবারো বলছি, নিয়মিত খবর ও পত্রিকার সাথে সময় কাটান।পরীক্ষার হলে গিয়ে ভুল উত্তরের ব্যাপারে সাবধান থাকুন, এই তো,
এমন কিছু কঠিন নয়, শুধু আপনার ইচ্ছার ব্যাপার। একবার চেষ্টা করেই দেখুন না, দেশথেকে তো কম নিলাম না, এবার দেশকে কিছু ফিরিয়ে দেবার পালা, বিনিময়ে কথা দিতে পারি, দেশ আপনাকে একেবারে কম দেবে না।

সব পরীক্ষার্থীর জন্য শুভকামনা।

[লেখাটায় তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করার জন্য বন্ধুবর তানভীর হোসেন রাহাত, রেজাউল করিম রানা ও শাহরুল আমিন সনেটের কাছে কৃতজ্ঞতা। লেখায় অনেককিছু বাকি থাকতে পারে, এবং অবশ্যই এটা কোন "শিওর সাকসেস" বা অবশ্য পালনীয় নির্দেশিকা নয়, নিজেই নিজের মত প্রস্তুতি নিতে পারেন, শুধু আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আপনারা সামান্য উপকৃত হলেও নিজেদের সফল মনে করবো। যেকোন প্রশ্ন থাকলে, এখানে রেখে গেলে যথাসাধ্য জবাব দেবার চেষ্টা করবো। আবারো শুভকামনা।]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29321575 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29321575 2011-02-06 23:32:40
কোলাহল http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29280414 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29280414 2010-11-29 23:33:03 গানের জীবন-৩: সামার অভ সিক্সটি-নাইন না, কাজেই দাঁতে দাঁত চেপে হজম করে গেলাম কিছুদিন। পুরো ব্যাপারটায় আমার কোন উপকার হয়নি, তবে ভিডিও গেমের দোকানিদের ভালো ব্যবসা হয়েছিল, কোনমতে শিক্ষক মশাই পড়াটা শেষ করলেই উঠে দৌড় দিতাম পাশের দোকানে। তখনকার ব্যাপক জনপ্রিয় গেম হলো "মোস্তফা", আসল নাম জেনেছি অনেক পরে, সেখানে কে কত বড় নায়ক তা নিয়ে মহা হইচই, মাত্রই আসা এই জিনিসের ব্যাপারে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই। অন্য বন্ধুরা ভাল খেলে, অন্য সবকিছুর মতই এই ব্যাপারেও আমার প্রতিভা শূন্যের কাছাকাছি, পকেটে পয়সাও বিশেষ থাকেনা, রিকশাভাড়া বাঁচিয়ে যা পাই তার সবটাই চলে যায় তিন গোয়েন্দা আর কিশোর ক্লাসিক কিনতে। ২-৪ টাকা যা থাকে তা দিয়ে ২-১টা কয়েন কিনতে পারি, এবং খুব তাড়াতাড়ি
"কসাই বস" এর কোপে অক্কা পেয়ে বিরস বদনে পরের জনকে জায়গা ছেড়ে দিই।

বন্ধুদের মাঝে কানা'র গেমের হাত ভাল, মেহরাব আর দিপু খেলে মোটামুটি, দাঁড়িয়ে ওদের খেলা দেখি, দুধের সাধ ঘোলে মোটামুটি মিটে যায়। ১০টার আগেই পড়া শেষ, ১২টা পর্যন্ত গেমের দোকানে দাঁড়িয়ে ছুটতে ছুটতে কোনমতে স্কুলের গেটে পৌঁছাই, ততক্ষণে "অ্যাসেম্বলি" নামের আরেকটা মহা অত্যাচার শুরু হয়ে গেছে, স্কুলের প্রধান ফটকও বন্ধ, বাইরে দাঁড়িয়ে দেখি গ্রীষ্মকালের কাবাব করা রোদে
দাঁড়িয়ে লাইন ধরে ছেলেরা শপথবাক্য পড়ছে-- "আমি ওয়াদা করছি যে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে---" ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঝে মাঝে শিক্ষকদের হুংকার, আরামে দাঁড়াও (ঐ গরমে আরামে কিভাবে দাঁড়ায় কে জানে!), সোজা হও, সামনে দু'হাত তুলে জায়গা নাও। এরপর জাতীয় সঙ্গীত, সে আরেক মজা, বাজাবে না, কাউকে গিয়ে গাইতে হবে। নিয়মিত কিছু গায়ক ছিল, তারা সামনের সিমেন্টের মন্ঞ্চে গিয়ে গাইবে, বাকিদের গলা মিলাতে হবে। পুরো ব্যাপারটাকে শ্রদ্ধা দেখানোর
চিন্তা ঐ বয়সের ছেলেদের মাথায় আসার কথা না, কাজেই গলা মিলানোর বদলে বেশিরভাগই হাসি চাপতে হিমসিম খেত, অবশ্য শিক্ষকদের বেতের বাড়ি পশ্চাদ্দেশে পড়লে সেই হাসি এমনিতেই মিলিয়ে যেত।

তবে বেতের বাড়ির সাথেই মনে করিয়ে দেয়া দরকার, এই অধম তখনো গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে। সাথের ছেলেরা অনেকেই তখন পাশের গেট দিয়ে বের হওয়া কন্যাদের সাথে দৃষ্টি বিনিময়ে ব্যস্ত, কিন্তু সাধ থাকলেও নিজের চেহারাখানার দিকে তাকিয়ে ঐ সাধ্য কখনো হয়নি, কাজেই বান্দা ভাবছে আজকে কতক্ষণ বারান্দায় কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা লাগবে। জাতীয় সঙ্গীতের শেষে সারি বেঁধে অপরাধী লেট লতিফদের ভেতরে ঢোকানো হলো, তারপরে ঐ আগুনে সূর্যের নিচে ১০ মিনিট দাঁড় করিয়ে ক্লাসে ফেরত। ততক্ষণে নাম ডাকা হয়ে গেছে, শিক্ষক মশাই তার নিয়মিত লেট লতিফের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে ভেতরে ঢুকতে বললেন, শেষ দিকে ভদ্রলোক মেনেই নিয়েছিলেন যে এই ছোকরা কোনদিনই সময়মত ট্রেন ধরতে পারবে না।

কিন্তু ছিলাম তো গানের কথায়, গ্রীষ্মের দুপুরে ক্লাস করার কথায় নয়। বলা যায়, গ্রীষ্ম তো গায়কের একার নয়, আমার গ্রীষ্ম তো অন্যরকম, তারপরেও যেন খুব বেশিই একরকম। সেই ক্লাস নাইনে থাকতেই শাহান, আমাদের বন্ধু, কম্পিউটার কিনে ফেললো, উইন্ডোজ ৯৮ অপারেটিং সিস্টেমে চলে,সেটায় আবার গান শোনা যায় যা খুশি,গেম তো খেলাই যায়। আমাদের স্থায়ী আস্তানা হয়ে গেল তার বাসা, শাহানের মা চাকরি করেন,কাজেই ওখানে গিয়ে জ্বালাতে সমস্যা নেই। স্কুলের খুব কাছেই
তার বাসা, কাজেই ১২টার আগের সময়টা, আর বৃহস্পতিবারের হাফ স্কুলের পরের সময়টা সেখানেই কাটতে লাগলো আমাদের।

এর আগ পর্যন্ত গান বলতে আমার কাছে বাবার রবীন্দ্র আর নজরুল আর এদিকে আইয়ুব বাচ্চু। শিপলু ভাই আর শাহানের গানের সংগ্রহে আমরাও ভাগ বসালাম, গানস এন রোজেস, ঈগলস, স্করপিয়নস, জন ডেনভার, ফিল কলিন্সের সাথে চেনা হয়ে গেল ব্রায়ান অ্যাডামসকে, আর চিরকালের জন্য চেনা হলো "সামার অভ সিক্সটি-নাইন" কে।

গিটারের ৬-তারের প্রথম ঝংকারের সাথে সাথেই গানটা রক্তে কেমন যেন ওলোট-পালোট করে দিল, মনে হলো ঠিক এটাই আমাদের গান, "রক" গানকে কেন "রক" বলা হয় সেটার জন্য এরচেয়ে ভাল কোন নমুনা সম্ভবত হয় না। গানের কথা
কি সেটা পরে বোঝা যাবে, অতসব না বুঝেই আমরা মাথা নাড়াই, পায়ে তাল ঠুকি, বেসুরো গলায় তাল মিলিয়ে মাঝেমাঝেই অহেতুক হাত-পা ছুঁড়ি। কিছু একটা করে ফেলতে ইচ্ছা হয়, রকের তালে তালে জীবনটাকে তখন অনেক বেশি
গতিময় মনে হয়, আর ক্লাসরুমে গিয়ে ঝিম ধরা দুপুরে যখন গানটা মাথায় ঘুরঘুর করে তখন সবকিছু ছেড়ে ঘুমঘুম দুপুরটাকে ভেঙেচুরে কাঁপিয়ে দিতে ইচ্ছা হয়।

সেই শুরু। এরপর দিন গেছে, গান শোনার পরিধি বেড়েছে, কিন্তু "সামার অভ সিক্সটি-নাইন" আরো বেশি করে মাথায় জেঁকে বসেছে। নস্টালজিক লিরিক, পাগল পাগল সুর, সব মিলিয়ে জীবনকে ঘুরে দেখা, নতুনভাবে ফিরে যাওয়া পুরানোতে।
স্কুল ছাড়িয়ে তখন নটরডেমে ভর্তি হয়েছি, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে টিটি আর ভলিবল খেলি, মাঝে মাঝে বিভিন্ন ক্লাবের অনুষ্ঠান হলে বাইরের কলেজ থেকে আসা পরীদের আশপাশে নিষ্ফল ঘুরঘুর করি, সামার অভ সিক্সটি-নাইন তখন আরো অনেক বেশি
প্রাসঙ্গিক। ব্রায়ান অ্যাডামস রকস, লাইফ রকস, সব মিলে এলোমেলো অবস্থা, একেই মনে হয় বলে পাখা গজানো। পড়াশোনা কলেজে উঠেই মোটামুটি শিকেয় তুলে ফেলেছিলাম, গণিতে ২৯ পেয়ে ফেল করার পরেও বিশেষ বোধোদয় হলো না, আশপাশে আরো অনেকেরই একই অবস্থা, পরেরটা পরে দেখবো এমন একটা ভাব। সাইকেল চালিয়ে কলেজে যাই-আসি, নিজেকে বড় বড় মনে হয়, পড়াশোনাটা ঐচ্ছিক বিষয়ের মত। বন্ধুদের সাথে মাঝে মাঝে "ব্যাচে পড়তে" যাই, তখন নির্বাচনের একটা
হাওয়া, রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝেই গলা কাঁপিয়ে আমরা স্লোগান দিই বিড়াল-কুকুর যাহোক একটা মার্কা নিয়ে, সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকাই, আমাদের আনন্দ দেখে কে!

ভার্সিটিতে আসার পরে জীবনে বড় রকমের একটা পরিবর্তন এসে গেল, চেনা মানুষজন থেকে মোটামুটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। নতুন ক্লাস, নতুন মানুষ, কোন কিছুর সাথেই আর মানাতে পারি না। পড়াশোনা কাজকর্ম সবই অর্থহীন লাগে। কষ্টেসৃষ্টে টিউশনির
টাকা জমিয়ে কিস্তিতে একটা কম্পিউটার কিনে ফেলেছি, সেটাই দিনরাতের সঙ্গী, সেখানে সারাদিন সামার অভ সিক্সটি-নাইন বাজিয়ে স্মৃতি হাতড়াই আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি--"দোজ ওয়্যার দ্য বেস্ট ডেজ অভ মাই লাইফ।" সময় থামে না, আস্তে
আস্তে এখানেও বন্ধুবান্ধব জুটে যায়,যতটুকু পড়াশোনা না করলেই নয় ততটুকু করি, বাকি সময় ক্যাফেতে বসে রাজা-উজির মারা আর অডিটরিয়ামের সামনে বসে পরী দেখা। সুযোগ পেলেই ক্লাসের পেছনের দরজা দিয়ে কেটে পড়ে হলে গিয়ে ঘুম, রাতে হলে আড্ডা মেরে ২টা ৩টার সময় চানখাঁর পুলের পরোটা, ধীরে ধীরে আবারো মনে হতে থাকে, বেঁচে থাকাটা খারাপ না।

একসময় এখান থেকেও বিদায়ের দিন চলে আসে, র‌্যাগের পরদিন শূন্য ক্যাফেটেরিয়ার দিকে তাকিয়ে আরেকবার বুঝতে পারি আবারো একলা চলার সময় হয়ে এল। একসময়ের সারাদিনরাতের বন্ধুরা বেশিরভাগই দেশের বাইরে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সন্ধানে, দেশে যারা আছে তাদেরো কালেভদ্রে দেখা পাই। মাসে-দু'মাসে একবার ভার্সিটিতে যাই,আমরা বের হয়ে যাবার পরে সেখানে আরো ৩টা নতুন ব্যাচ চলে এসেছে, নিজেকে বুড়ো দাদু মনে হয়। মাঝে মাঝে চেনা কিছু মুখের সাথে দেখা হয়ে যায়, হই-হুল্লোড়, হাত মেলানো, টেবিল চাপড়ে বিস্বাদ চা দিয়ে গল্পগুজব। অডিটরিয়ামের সামনে বসে র‌্যাগ কর্নারের দিকে তাকালে
দেখা যায় ছেলেপেলেদের জমায়েত, হল্লা আর গান, মুখগুলো বদলে যায়, দূরে বহুদূরে থাকা আবছা অতীতের মানুষগুলোকে নতুন করে দেখি এলোমেলো চুল আর ছেঁড়াফাটা জিন্সে, স্কুলের আরামে দাঁড়াও, টিটি টেবিলের ঠকাঠক, সাইকেলের ছুটে যাওয়া, ক্যাফের সামনে রঙ নিয়ে ছোটাছুটি, আর শেষবেলার কান্না। গনগনে গ্রীষ্মের দুপুরে হঠাৎ করেই ওদের কোরাস বদলে গিয়ে হয়ে যায় প্রবল সবুজ নস্টালজিয়ার "সামার অভ সিক্সটি-নাইন", ঝাপসা হয়ে আসা চোখে আমি ধুলিকণা খুঁজি।

[কাছের, দূরের, যারা ছিল, আছে,থাকবে, যাদের জন্য আমার থাকা আর না-থাকা, আমার সব বন্ধুদের জন্য]

http://www.youtube.com/watch?v=9f06QZCVUHg]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29270555 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29270555 2010-11-11 23:31:20
বাঙালির ধর্মপালন এবং ধর্মবিরোধ
ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি বা ধর্মীয় আচারের জন্য শুধু এই নিরীহ বাঙ্গালির উপর খড়্গ ধরার মানে নেই, পুরো উপমহাদেশেই এই রোগ পুরানো। হিন্দু ধর্মের নাকি ৩৩ কোটি দেবতা, সে থাকুক, কিন্তু বাঙ্গালি হিন্দুর মাঝে মনে হয় আচার-অনুষ্ঠানের দেবতার প্রভাবখানাই সবচেয়ে বেশি ছিল। অল্পস্বল্প ইতিহাস যা দেখা যায়, নিজের মনে নিজের ঘরে ধর্ম পালনের চেয়ে প্রতিবেশীর বিধবাটা কি খেল কই গেল বা অমুকে কোন পাপ করলো সেদিকেই আমাদের পূর্বপুরুষদের দৃষ্টি ছিল বেশি আর তা নিয়ে কথা বলতে গেলেই সমাজে একঘরে করার রেওয়াজ তো আজ পর্যন্তও চলে আসছে, শুধু পক্ষটা বদলে গেছে, ব্রাহ্মণ পুরুতের বদলে এখন মোল্লারা এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ভারত কাগজে-কলমে একখানা সেক্যুলার রাষ্ট্র কিন্তু গুজরাটে দাঙ্গা লাগলেই কেন যেন "মেরা ভারত মহান" বাণীকে কাঁচকলা দেখিয়ে রামদা নিয়ে ধর্মরক্ষায় শিবসেনারা শিবের ষাঁড়ের মত বেড়িয়ে পড়ে। গান্ধীজী নিজে ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন এমন কথা শোনা যায় না, তাঁকে সমান সমান করতেই ওদিকে গজালেন কিস্তি টুপি পরা নিয়মিত মদ্যপায়ী জিন্নাহ হুজুর, মুসলমানদের জন্য "লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান" বলে যিনি কিনা কায়েদে আজম বনে গেলেন। পৃথিবীর বর্বরতম জাতিটার অধীনে যে আমাদের ২৪টা বছর নরকযন্ত্রণা পেয়ে শেষমেশ আরেক নরক দেখে মুক্তি পাওয়া লাগলো, সেজন্য জিন্নাহ-নেহেরুর সাম্প্রদায়িকতার সাথে উপমহাদেশের অধিবাসীদের ধর্মীয় বাড়াবাড়িকে দায় না দিয়ে পারা যায় না।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে যে বাংলাদেশিদের ধর্ম সম্পর্কে ধারণা তেমন বদলেছে সেটা মনে হয় না, তারা ধর্মেও আছে, জিরাফেও আছে।
পাকিস্তানীদের দেখেই যথেষ্ট শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল, অদ্যাবধি সেটা হয়নি, ধর্মটা ক্রমশই আরো বেশি করে ব্যক্তিগত জীবনাচরণ আর বিশ্বাস থেকে লোকদেখানো আচার আর উন্মাদনার দিকে চলে যাচ্ছে। ধর্ম শব্দের অর্থই হলো ধারণ করা, কাজেই যা বিশ্বাস করো সেটা নিজের মাঝে ধারণ করো, জীবনে সেটার ১০০ ভাগ প্রতিফলন না আসুক অন্তত চেষ্টা থাকুক, ধর্ম বলতে এই অধমের এটাই ধারণা। মুসলমান নাকি হিন্দু নাকি খ্রিস্টান সেটা মুখ্য না, মুখ্য হলো যা বিশ্বাস করি তা পালন করি কিনা। বিষয় হলো, আমরা সম্ভবত জানি-ই না আমরা কি বিশ্বাস করি, ধর্ম নিয়ে ১৪ পুরুষ যা বলেছে সেটাই যথেষ্ট, নিজে জানার সময় কোথায়? তবে দেখাতে তো হবে আমি ধার্মিক, ভণ্ড সমাজে বেশ কল্কে পাওয়া যায়, কাজেই আচারে আছে সেরের উপর সোয়া সের। জুমা'র নামাজে ভিড় দেখলেই বোঝা যায় ঘটনা কি, সপ্তাহে ছ'দিন মসজিদ ফাঁকা, শুক্কুরবারে রাস্তা বন্ধ। ঈদের নামাজে তো কথাই নেই, তা লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ হয়, বিষয়টা মন্দ না। সমস্যা দাঁড়ায় যখন শুক্কুরবারে জুমার নামায পড়তে গিয়ে বায়তুল মোকাররমে দুই দল মুসুল্লি জুতা-স্যান্ডেল নিয়ে খতিব নির্ণয়ে নেমে পড়েন, তখন পুরো ধর্মকেই হাসির পাত্র করা ছাড়া আমরা আর কি পাই, বলা মুশকিল।

যাকগে, ছোটখাট সাময়িক মতিভ্রম, উড়িয়ে দেয়া গেল। ধর্ম নিয়ে পড়াশোনার সময় কোথায়, পেটে ভাত না থাকলে তত্ত্বকথা কানে ঢোকেও কম। তুমি আচার পালন করো, আমাকে জ্বালাতন কম করো, আমি খুশি। সে আবার বাঙ্গালি করবে না, সবাই মিলে গুষ্ঠীসুখ না নিলে আমাদের চলে না। কাজেই মিলাদ করো, মাইক মারো, আর তোমার ধর্ম খারাপ, আমারটা ভাল, ও ব্যাটা তো আসল মুসলমান না, এর বউ ঘোমটা দেয় না, ওর মেয়ে ছেলেদের সাথে ঘোরে, এই নিয়ে শুরু করো পরচর্চা। নিজের ঘরের বউ বাজারে যাবে খালি মাথায় কিন্তু ওদিকে প্রতিবেশীর বাসায় গেলেই বোরকা পরা বাধ্যতামূলক, এদিকে বাসায় ফিরে আরেক দফা পরচর্চা। বলি, ইসলামে কোন জায়গায় অন্যের দোষ ধরার জন্য জান্নাত কবুল করেছে? ওদিকে কোরবানী চলে এলো, বাজারের সবচেয়ে বড় গরুটা কিনতে হবে, পাশের বাসার হাজী সাহেব কিনেছেন দেড় লাখে, আমারটা ৩ লাখ হতে হবে। টাকাগুলো কোথা থেকে আসে সে আরেক ইতিহাস, ঢাকাইয়া হাজীরটা সম্ভবত চালের সিন্ডিকেট দিয়ে লোকজনকে জিম্মি করে, এদিকে আধুনিক হোয়াইট কলার গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরটা এসেছে কারখানার শ্রমিকের বোনাস মেরে দিয়ে। ধর্ম তখন পকেটে, টাকা তখন ঈশ্বর, মাথায় টুপি মুখে দাঁড়ি কিন্তু টংকেশ্বরের কাছে তখন আরশের আল্লাহ আর স্বর্গের ভগবান সবাই অচ্ছ্যুৎ।

কোরবানি যখন চলেই এল, মনে হয় রোজাও আসতে পারে। রমজান মাসের শিক্ষা সম্ভবত সংযম, কিন্তু বাংলাদেশে রমজান মাস এলে মনে হয় আমরা শিক্ষা পেয়েছি অসংযমের অসভ্যতম প্রদর্শনী করার। পয়লা রমজান থেকে রাস্তায় বেরোনো দায়, আক্ষরিক অর্থেই হাজার হাজার শপিং মল আর লাখ লাখ মানুষ সেখানে যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কে কতটা অসভ্যভাবে নিজের পকেটের জোর প্রমাণ করতে পারে সেটার প্রদর্শনী করতে। আচারসর্বস্ব ধর্ম কত বেশি বিপজ্জনক সেটা বোঝা যায় এই মাসে, ঈদের দিন বেলায় বেলায় সবচেয়ে দামী পোশাকটা যেন বউ-ছেলে-মেয়ে পরে বের হতে পারে সেজন্য তখন সরকারী লোকজনের ঘুষের রেট বেড়ে যায়, নানা সংস্থার লোকজন ব্যস্ত হয়ে পড়ে ঈদ কালেকশনে, ওদিকে ব্যবসায়ীরা খালি ঈদের দিন কেন, সারা বছরের ফুটানির রসদ যোগার করে নেয় আমজনতার গলায় পা দিয়ে। দ্রব্যমূল্য নিয়ে কি তেলেসমাতি হয় সে বোঝানো মানে বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখানো, সেদিকে আর গেলাম না, তবে যে বেচারাদের সারা বছরে ঈদেই দু'চারটা কাপড় কেনার সামর্থ্য থাকে তাদের আর বাজারে ঢোকার সাহস হয় না, লাখ টাকার কাস্টমার যেখানে বিনা দরদামে দু'লাখ ৫ লাখ হাত ঝেড়ে দিয়ে দিচ্ছে সেখানে গরিব-গুর্বাদের দিকে ফিরে তাকাবে এত উদার আমাদের ব্যবসায়ীরা হননি।

এ পর্যন্ত পড়ে কেউ যদি অধমকে নাস্তিক বা মৌলবাদী যে কোন এক দলে ফেলে দেন, দোষ দেব না। সবাইকে ধর্মের মূলে যেতে হবে অথবা ধর্ম ছেড়ে নাস্তিক হতে হবে,এ দাবীও এই অধম করে না। তবে কিনা, একটু চিন্তাভাবনা করে ধর্ম যদি পালন করি বা না করি, তবে ক্ষতি কি? এ বেচারা নেহাৎই ভুক্তভোগী তিতিবিরক্ত আরেক আধাভণ্ড আম-বাঙালি, ধর্মের আচারের ঠেলায় যার নাভিশ্বাস উঠে যায় মাঝে মাঝেই। রোজার ঈদে ঘুষখোরের আর সিন্ডিকেটওয়ালা ব্যবসায়ীর ছেলেমেয়ের হালফ্যাশানের জামা আর বউয়ের লাখ টাকার শাড়ির খরচ যোগাতে অধমের পকেট ১ দিনেই ফাঁকা হয়ে যায়, ওদিকে বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের ইফতার পার্টির পেছনে লাখ টাকা খরচার ঠেলায় যার ভাল ইফতার করতেও জীবন বের হয়ে যায়। যে ব্যাটা যত দেখাবে সে তত বড় ধার্মিক, এমন ধারণা গেড়ে বসেছে বলেই কিনা, জায়নামাজ থেকে উঠে এসে টুপিখানা মাথায় নিয়েই হাত বাড়িয়ে ঘুষটা পকেটস্থ করেন কেউ, ওদিকে গুদামের মজুদটা ঠিকমত আটকে দিয়ে কাবা শরীফ তওয়াফে চলে যান আরেকজন। এক ঋণখেলাপী আরেক কাঠি বাড়া, কয়েক হাজার কোটি টাকার খেলাপী আজকাল নাকি বাড়িতে বিশ্ববিখ্যাত আলেম এনে ধর্ম শেখান, শোনা কথা। যেমন আমরা, নেতাও জোটে তেমন, কাজেই ধর্মকে পুঁজি করে এরশাদের আটরশির পীর যেমন ওপরে ওঠে, ঘৃণ্য নরঘাতক নিজামী-গোলাম আজমও টিকে থাকে, বাবারে, কত্ত নূরানী লোক, পায়ে ধরে বসলেই বেহেশত। এদিকে এক নেত্রীর পুত্রধন হাজার কোটি টাকা চুরি করে ফুর্তি করেন, উনি দু'দিন পর পর ওমরাহ করেন, আরেক নেত্রী সংবিধানে বিসমিল্লাহয় বড় আপত্তি কিন্তু নির্বাচনের মৌসুম এলেই মাথায় ঘোমটা হাতে তসবিহ উঠে যায়, আর চরমোনাইর পীরের সাথে জোট করতেও বাঁধে না। হবেই, যস্মিন দেশে যদাচার, ধর্ম যেথায় কদাকার, কি আর করা!

আমাদের ছোটবেলায় এক শিক্ষক ছিলেন,মাঝে মাঝেই বলতেন, বেহেশতি মানুষ ভালাভোলা, এত কিছু বোঝে না, এত কিছু ভাবে না, খালি বোঝে নামাজ রোজা কর, পয়সা থাকলে বান্দারে কিছু দানখয়রাত কর,চুরি-ডাকাতি গুলা বন্ধ রাখো, এর বেশি তো আল্লাহয় কোনদিন বলে নাই, এত ভেজালের দরকার কি? কথা সত্যি, কিন্তু সেটা বোঝায় কে? পাশের বাসার যে লোককে ২ বছরেও নিজের বাপকে পেট ভরে খেতে দিতে দেখলাম না, বাপ মরলে মিলাদে পাড়ার লোক দাওয়াত করে খাওয়ালো, মিলাদে হুজুর আকাশ ফাটিয়ে মোনাজাত করলেন, ধর্ম আর সমাজ দুই-ই বেজায় খুশি। তারই ভগ্নিপতি দেখি তারাবীর নামাজে পয়লা কাতারে, কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী খোদাতালার কোন নেয়ামতে ঈদে ২ লাখ টাকার বাজার করে, সেই কুদরতের খোঁজ পেলাম না। তবে মিলাদ যখন বড় হয়েছে, আর ঈদে যখন বড় গরুটাই কোরবানী হবে, আচার পালিত হয়েছে, কাজেই বড় ধার্মিকই হবে নিশ্চয়ই, আমরা বেকুব কিনা, বুঝতে পারছি না। সেদিন টিভিতে দেখি এক মহিলা দাঁত কেলিয়ে জানাচ্ছে, ৫০হাজার টাকায় ১টা শাড়ি কিনতেই হবে, বাকিগুলো আরো বেশি দাম, পরিবারের সবাইকেই দিতে হবে তো! ইচ্ছে করছিলো জুতিয়ে দাঁত ফেলে দিই, দোকানদার যে আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না, সে তো এমনি এমনি না।

ধর্মপালন নিয়ে বলতে বলতে মনে হলো, একটু ধর্মবিরোধ নিয়েও দু'কথা বলি, মার খেলে দু'দিকেই খাই। বাঙালি আবার বিচিত্র ধরণের নাস্তিক, আসল নাস্তিকের সর্ব ধর্মে সমান অবিশ্বাস থাকার কথা, বাঙালি নাস্তিকের কেন যেন ইসলামের দিকেই সকল ক্ষোভ। ব্যক্তিগতভাবে ২-১ জন নাস্তিককে চিনি, পড়াশোনা ব্যাপক, কিন্তু আগ বাড়িয়ে কখনো ধর্ম নিয়ে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে দেখিনি। নাস্তিক্যবাদ যদি বিশ্বাস হয়ে থাকে তো আস্তিক্যবাদের মতই সেটাও নিজের ভেতরেই রাখার কথা, কিন্তু বাঙালি যেমন ধর্মপালনে আচারসর্বস্ব তেমনি বিরোধেও আচারনিষ্ঠ, গলা ফাটিয়ে নবী মুহাম্মদ(সা) কে দু'টো গালি না দিলে তাদের চলে না। অবশ্য লাভের পাল্লাটা মন্দ নয়, ধর্ম যেখানে ইফতার পার্টি আর লাখ টাকার লেহেঙ্গাতে সীমাবদ্ধ সেখানকার বেকুবদের খেপিয়ে তোলা যথেষ্ট সহজ, তাদের কাছে নাস্তিকের কল্লা নেয়া হলো সহজতম সমাধান। আর কপালগুণে যদি তার মাথার উপর দাম ঘোষণা হয়ে যায়, তবে তো পোয়াবারো, বুদ্ধিজীবি সমাজে উচ্চাসনের পাশাপাশি আমেরিকা ইউরোপে আশ্রয়ও জুটে যেতে পারে। অবশ্য তখন যদি তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়, "ইন গড উই ট্রাস্ট" যারা লিখে রাখে সেই আমেরিকাতে গিয়ে সেক্যুলারিজমের ক্ষয়ক্ষতি হবে কিনা, তখন এই আধা-মস্তিষ্কধারী নাস্তিকরা পিছলে যাবে। অন্তত ৯/১১ এর আগে যেখানে আমেরিকা নিজের দেশে হলেও ব্যক্তিস্বাধীনতা আর আইনের শাসন নিশ্চিত করে রেখেছিল রাজনীতিতে খ্রিস্টান চার্চের প্রত্যক্ষ প্রভাবকে সঙ্গী করেই, সেখানে সেক্যুলার রাষ্ট্র করে আমরা তাদের কতটা কাছাকাছি চলে যাবো সেটার উত্তরও আমাদের জানা নেই, ধর্ম-অধর্ম তো পরের ব্যাপার, আমরা মনের ভিতরেই দ্বিধাগ্রস্ত, সেই মন আর বিশ্বাস ঠিক না করলে আস্তিক্যবাদ আর নাস্তিক্যবাদ সেই কদাচার, ফলাফলের আশা বৃথা। আমাদের উদ্দেশ্য দেখানো, আমাদের ধর্ম-অধর্ম বিশ্বাস নয়, সেখানেও অন্যকে এক হাত দেখিয়ে দেয়া,সেজন্যই সম্ভবত দোযখে বাঙালির কড়াইতে পাহারাদার থাকে না।

বাইরে থেকে দ্বিধাবিভক্ত জাতি করে গৃহযুদ্ধ, কিন্তু ভেতর থেকে নিজের বিশ্বাসে দ্বিধাবিভক্ত জাত তো থাকে জতুগৃহে, সে আগুন নেভায় কার বাবার সাধ্য?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29235879 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29235879 2010-09-06 04:05:06
সম্রাটের জন্য এলিজি
এই ক্যাম্পাস কখনো আমার কাছে নিজের বাড়ির চেয়ে কম আপন ছিল না, কখনো হবেও না। ভার্সিটির বড় ভাইদের দেখতাম ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার অনেক বছর পরেও ঘুরে ঘুরে আসতে, কিসের মায়ায়, সেটা এখন বুঝি। আমরা তর্ক করি, আমরা ঝগড়া করি, আমরা কখনো হাতাহাতিও করি, কিন্তু আমরা এক টেবিলে বসে হাত মেলাতেও পারি। এই মুখগুলো কখনো আমাকে ফিরিয়ে দেয়নি, আমি জানি কখনো আমাকে ফেরাবেও না। এই ছেলেমেয়েগুলো তাদের ক্যান্সারে আক্রান্ত সহপাঠীর জন্য নিজের কাজকর্ম পড়াশোনা বাদ দিয়ে রাতদিন রাস্তায় পড়ে থাকে, এই যন্ত্রমানবেরা ১০ বছর আগে ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়া বড় ভাইয়ের দুর্ঘটনার খবর শুনে নিজের পকেট খালি করে দেয়। ৪-৫টা বছরে এই বুয়েট আমাদের এক আত্মা হতে শিখিয়েছে, তাই যখন আমাদেরই কোন একজনকে কোন নির্বোধ বাসচালক চাপা দিয়ে মগজ বের করে দেয়, তখন আমরা তথাকথিত সুশীলদের মত মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারি না। সম্ভবত এখনো আমরা পুরোপুরি অমানুষ হতে পারিনি, কাজেই কারো সহপাঠী, কারো ছোট ভাই যখন লাশ হয়ে ফেরে, তখন আমরা সেই মৃত মানুষটার উপরেই দোষ চাপিয়ে দিয়ে তার সমালোচনা করতে পারি না। আমাদের ভেতর অনেকদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ফুঁসে ওঠে, আমরা রাস্তায় নামি, এতদিনের নির্লজ্জ নীরবতা ঢাকার জন্য আমাদের ছেলেরা বাস ভাঙে, পরিবহণ মালিকদের টাকার কাছে নীরব বেহায়া সরকার আর প্রশাসন আর সুশীল সদাব্যস্ত দেশপ্রেমিক জনতার ঘুম একবারের জন্য হলেও ভাঙবে এই আশায় রাস্তা অবরোধ করে। জানি এসবের কোন ফলাফল নেই, ২ দিন বাদে আমরাও একই পথের পথিক হবো, তবু যতদিন বিবেক সামান্য হলেও খোঁচাখুঁচি করে, ততদিন নিজের কাছে সান্ত্বনা খোঁজা। হায় খোদা, তারপরেও আমরা খারাপ, আমরা দেশের সম্পদ বিনষ্টকারী, কয়েকটা বাসের মূল্য আমাদের, এই মানুষগুলোর জীবনের চেয়ে এতই বেশি!!!

আবেগের কথাবার্তা অনেক বেশি চলে আসছে, যুক্তিবাদী সুশীল দেশপ্রেমিকদের সেগুলো পছন্দ না-ও হতে পারে, কাজেই একটু প্রাতিষ্ঠানিক আর যুক্তিবাদী লাইনেই যাওয়ার চেষ্টা করি। পরিবহণ প্রকৌশল ও ব্যবস্থাপনা (ট্রান্সপোর্টেশন এন্ড ট্রাফিক এন্ঞ্জিনিয়ারিং এন্ড প্ল্যানিং) আমার পড়াশোনার বিষয় ছিল, সেখানে অধমের অল্প যতটুকু জানা হয়েছে, তাতে বলে, আরবান বা শহরের ট্রাফিক ডিজাইনে সবসময়ই "পেডেস্ট্রিয়ান প্রায়োরিটি" থাকবে, সোজা বাংলায় যেটাকে বলে, পথচারীর সাতখুন মাফ। গাড়ির চালক গাড়ির স্টিয়ারিং ধরামাত্র "সুপিরিয়র" বা শ্রেয়তর অবস্থানে চলে যায়,
কাজেই নিয়মকানুন বেশিরভাগটাই তারই মানার কথা, আর যদি না মানে, তবে ঘাড়ে ধরে মানানোর ব্যবস্থা থাকার কথা, তবে সেটা যারা করবেন, সেই সম্মানিত ট্রাফিক ভাইরা সময় সময় ঘাড়ে ধরে চাঁদাবাজি করা আর বেশিরভাগ সময় নাকের লোম ছেঁড়া ছাড়া কিছু করেন বলে মনে হয় না। চালকের জেব্রা ক্রসিং মানার কথা, চালকের লালবাতি মানার কথা, সুশীলের দল হলফ করে বলুন তো, কয়টা বাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি বা রাইডার জেব্রা ক্রসিংয়ে যানবাহন থামায়?

তত্ত্ব বাদ দিই, একটু বাস্তব অবস্থার দিকে চোখ ফেরাই। পলাশীর মোড়ে সম্রাট যেখানটায় মারা গেছে, সেখানে সে আর কোথায় দাঁড়াতে পারতো? ৪ মোড়ের ৪ দিক দিয়ে দানবের মট সেখানে বাস ছোটাছুটি করে, এদিকে রাস্তার ২ পাশে বুয়েটের দুই ক্যাম্পাস, এখনো সেখানে ক্লাস ধরার জন্য ছেলেমেয়েদের ছোটাছুটি করতে হয়, নয়তো দুপুরে খাবার জন্য মূল ক্যাম্পাসে আসতে হয়। ডানা না গজালে ওখান দিয়ে বাসগুলোকে এড়িয়ে কিভাবে আসা যায় আমার জানা নেই, ভাগ্য খুব বেশি ভাল বলেই এতদিনেও ওখানে এমন দুর্ঘটনা মাত্র একটাই ঘটলো। চোখ ফেরান একটু দূরে, আজিমপুরের দিকে, বিভিন্ন কাউন্টার সার্ভিস আর লোকাল সার্ভিসের বাসগুলো কিভাবে একটা আরেকটাকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় থামে কেউ খেয়াল করেছেন? পথচারী খুব বেশি সতর্ক না থাকলে নির্ঘাৎ চাপা পড়বেন, আর চাপা পড়লে তো সুশীলরা আছেনই, ঐ ব্যাটা রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল কেন, একটা হেলিকপ্টার ভাড়া করলেই তো পারতো! আচ্ছা বলুন তো, আপনাদের মাঝে এমন কোন দুঃসাহসী ব্যক্তি আছেন যে একটা বাসকে দানবের মত ছুটে আসতে দেখেও জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হয়েছেন? পারবেন না, জানি, আমার মত আপনিও জানেন, বাসটা থামবে না, আপনার জীবনের দাম ঐ বাসের দামের চেয়ে অনেক কম, আর সেই দামটা কিন্তু আমি আপনিই কমিয়ে দিয়েছি, প্রতিটা দুর্ঘটনার পরে নীরব ভূমিকা পালন করে, মৃত মানুষটার ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে, অপরাধীকে পার করে দিয়ে।

পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর কি অবস্থা? সম্ভবত আমরাই পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগা ছাত্রছাত্রী যাদের ক্যাম্পাসের মাঝ দিয়ে এমন গতিতে যানবাহন চলতে পারে। আমরাই সম্ভবত সবচেয়ে দুর্ভাগা দেশ যেখানে দেশের ভবিষ্যতদের জীবনের দামের চেয়ে অর্থলোভী পরিবহন মালিকদের কথার দাম অনেক বেশি, আমরাই সম্ভবত একমাত্র দেশ যেখানে একজন ছাত্র মারা গেলে শুনতে হয়, ভেঙে ফেলা কয়েকটা বাসের জন্য দেশের বিশাল ক্ষতি হয়ে গেল, কিন্তু যে ছেলেটা বা মেয়েটা মারা গেল, তার মৃত্যুতে দেশের কিছুই হয়নি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল, বুয়েট, দেশের শ্রেষ্ঠ ৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস যেখানে, তার মাঝখান দিয়ে অনবরত ভারি যানবাহন কিভাবে ঘণ্টায় ৬০-৭০ মাইল গতিতে চলার অনুমতি পায়, সেটা তো বোধগম্য নয়ই, অন্য কোন দেশের লোক যদি জিজ্ঞেস করে যে এই এলাকায় যন্ত্রচালিত যানবাহন ঢোকার অনুমতি পায় কিভাবে, সেটার জবাব কিভাবে আমাদের দেশদরদী সুশীলরা দেন, সেটা জানার খুব ইচ্ছা থাকলো।কোন কোন গণ্ডমূর্খ এরপরেও বলবে, ছেলেমেয়েগুলো
রাস্তায় সাবধানে চলে না কেন? সেইসব মহামূর্খদের অবগতির জন্য জানাই, প্রায় সব দেশেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতে ভারি যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ, এমনকি গাড়ি চলতে হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয় এবং সেটাও সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কাজেই নিজের এলাকায় ছেলেমেয়েরা সামনে তাকাবে নাকি আকাশের তারা দেখে হাঁটবে সেই অধিকার তাদের আছে, বরং নিজেদের ধিক্কার দিন যে আমরা সেই অধিকার তাদের দিতে পারছিনা।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব কষ্টের কিছু স্মৃতি আছে, আমার অনেকদিনের পুরনো এক বন্ধু ৩ বছর আগে মারা গিয়েছিল গাড়ি দুর্ঘটনায়, মাত্র এক বছর আগে মারা গেছে আরেক বন্ধু, দেড় বছরের একটা মেয়ে রেখে, উল্টোদিক থেকে আসা বাসটা গাড়িটাকে ধাক্কা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল। মাত্র এক মাস আগে আমার এক ছাত্রীর ২ বোন মারা গেছে হাইওয়েতে, এবারও উল্টোদিক থেকে আসা বাসের কাণ্ড। প্রতিটা দুর্ঘটনায় পরিবারের অন্য মানুষগুলোর অবর্ণনীয় কষ্ট দেখেছি, নিজের কষ্ট টাও জানি। হাইওয়েতে বাসগুলো কিভাবে চলে সেটা অভিজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রেই জানেন, তবে আজকাল শহরেও কিভাবে সামান্য জায়গা দিয়ে বাসগুলো চলে সেটাও মনে হয় কাউকে বলে দিতে হবে না। বেশিরভাগ চালকের লাইসেন্স ভুয়া, হেলপাররাও চালায় অনেক সময়, ধরার বা দেখার কেউ নেই। এমনকি ট্রাফিক ধরলেও অনেক যাত্রীকে উল্টো ট্রাফিককেই গালি দিতে দেখেছি, তাদের সময় যে মহামূল্যবান। ভাইয়েরা, যার যায়, সে বোঝে, আজ আপনি রাস্তার যে মানুষটাকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যাওয়াকে নীরব সম্মতি দিলেন, কালকে সেখানে আপনারই কোন প্রিয়জন পড়ে থাকবে, অন্যায়কে বাড়তে দিলে সেটা আপনার ঘাড়েই ছোবল বসাবে, কোন ভুল নেই।

এলোমেলো অনেক কথা বলে ফেললাম, শেষ করি। বরং আমার যেসব ছোট ভাই-বোনরা তাদের সহপাঠীর জন্য রাস্তা অবরোধ করেছে, বাস ভাঙচুর করেছে, তাদের ২-১টা কথা বলেই শেষ করি। আমি বুয়েটে পড়তাম বলে বাড়তি কোন গর্ববোধ ছিল না, যেকোন ছাত্র বা কর্মচারীর যে প্রাতিষ্ঠানিক গর্ব থাকে, সেটুকুই ছিল। কিন্তু আজকে আমি বলতে পারি, ওরা যা করেছে, আমি তার জন্য গর্বিত। নিজেদের সহপাঠী, নিজেদের ছোট ভাইয়ের জন্য যে ওরা রাস্তায় নামতে পেরেছে, সুশীলের মত খামোকাই নিজের ভাইয়ের জীবনের চেয়ে কয়েকটা বাসের দাম বেশি ভাবেনি, একটা অন্যায়কে প্রতিরোধ করার জন্য মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে, সেজন্য এই প্রতিষ্ঠানের একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমি গর্ব বোধ করছি। আমরা বড় বেশি সুশীল, বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক, বড় বেশি জড় হয়ে গেছি, আমাদের মাঝে মাঝে একটু নাড়াচাড়া দেয়া দরকার, নইলে এই জীবন্মৃত অবস্থা থেকে আমরা জাগবো না। আমাদের ক্যাম্পাসে আমরা নির্ভয়ে হাঁটতে চাই, একটা মানুষের জীবনের চেয়ে সারা পৃথিবীর সমস্ত যন্ত্রের দাম বেশি না, যদি মানুষ মেরে দেশের উন্নতি করতে হয়, আমাদের সেই উন্নতির দরকার নেই।

সুশীলের দল, আমরা বাস ভাঙ্গার সমস্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেব, আপনারা আমাদের ভাই খন্দকার খানজাহান সম্রাটের জীবন ফিরিয়ে দিন। যদি তা না পারেন, তবে দয়া করে দূরে গিয়ে কেঁচোর মত গর্ত খুঁড়ে বসে থাকুন, এই শোকের মুহূর্তে আপনাদের শকুনের চিৎকারে আমাদের বিরক্ত করবেন না।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29165046 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29165046 2010-05-29 17:56:20
ভালবাসা যেখানে মার্কেট প্রোডাক্ট সেখানে প্রতিদিন দেখি সহপাঠীর লাশ
ভালবাসার অত্যাচারের আরেক দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে আন্তর্জালে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস, কারো ভালবাসা উথলে পড়ে ঘর ভেসে যাচ্ছে, তো কারো ভালবাসার কেউ নেই বলে কেঁদে দু'কুল উপচে যাচ্ছে। অত্যাচার এখানে শেষ হলে কথা ছিল, ফেসবুকের ওয়ালে হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে, মেসেন্ঞ্জারে ভালবাসা দিবসের শুভেচ্ছা, ক্লাসে গেলে ভ্যালেন্টাইনস ডে'র পরিকল্পনা শুনিয়ে কান ঝালাপালা। যাকে বলে, ভালবাসা বিলালে বেড়ে যায়, কাজেই অন্যকে জোর করে গিলিয়ে হলেও সেটা বাড়াতে হবে। এই ভালবাসার অত্যাচারে তিতিবিরক্ত হয়ে গতবার এক বন্ধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে রেখেছিল--- "পয়লা ফাল্গুন, বইয়া বইয়া বাল গুন, সবাইরে হ্যাপি বাল-এ-টান ডে।" আপাত অশ্লীল কথাটা খারাপ কাজে দেয়নি, অন্তত তাকে কেউ ভালবাসা জানাতে আসেনি।

ভালবাসা দিবস নিয়ে এমনতরো বিরক্তি প্রকাশে অনেকেই আবার মহাখাপ্পা। আরে ব্যাটা আমি ভালবাসা দেখাবো তোর কি? পান না তাই খান না? আমার পয়সা খরচ করে আমি যদি প্রেমিকা নিয়ে ঢলাঢলি করি তোর গা জ্বলে কেন রে? আবার অনেকে এতটা রূঢ় নন, তারা হাজির করেন সুশীল যুক্তি, আরে ভাই ভালবাসা যদিও সারা বছরের জিনিস, তাও মাঝে মাঝে প্রকাশ করা ভাল, বছরের একদিন করলে ক্ষতি কি? জবাবে বলি, তো সেটা নির্দিষ্ট একদিন করে দুনিয়ার লোককে জানান দিয়েই কেন করতে হবে বাপ? আসল ভালবাসা যদি কিছু থেকেও থাকে, সেটার থেকে লোককে দেখানোই তো বড় হয়ে যাচ্ছে, লোকের তাকানোর ঠেলায় ভালবাসার তো জানালা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার যোগার।

এসব পাল্টা যুক্তিতে অবশ্য প্রেমিক হৃদয়ের বাঙ্গালিকে টলানো সম্ভব না, টলবে এমন আশাও করি না, কেউ যদি নিজের ঘরের ভালবাসা দিয়ে বিশ্বচরাচর ভাসিয়ে দিতে চায় তাতেও বাধা দেয়ার কোন কারণ দেখি না। বিরক্তিটা তখনই লাগে যখন ভালবাসা দিবসের ভালবাসার জ্যামে পড়ে ১২ মিনিটের রাস্তা যেতে মাত্র ১ ঘণ্টা ১২ মিনিট লাগে আর জরুরী ক্লাসের প্রায় পুরোটাই পার হয়ে যায়। আরো বিরক্ত লাগে যখন যতটা না ভালবাসা তারচেয়েও বেশি রাস্তার লোককে গায়ে পড়ে দেখানোর চেষ্টাকে। দ্যাখ ব্যাটা, আমি কত আগে, পশ্চিমারাও লজ্জা পাবে, তুই পারবি? এদিকে পোলাপানের মাথা হয়েছে গরম, স্কুলের বাচ্চারাও নেমে গেছে মাঠে প্রেমিক-প্রেমিকা, বা ওদের ভাষায়, বিএফ জিএফ খুঁজতে। লাভের লাভ, মোবাইল কোম্পানির পোয়া বারো, আর বাপ-মায়ের মাথা গরম। রাস্তায় পা ফেলা যায় না, কুঁচো চিংড়ির বয়সী জোড়ারা গায়ে এসে পড়ে, ,রেস্টুরেন্টে খাবার জায়গা নেই, ৩ দিন আগে থেকে নাকি সব বড় রেস্টুরেন্টের টেবিল সংরক্ষিত। নিজের না থাকলে বাপের পকেট কাটো, কিন্ত বিএফ জিএফকে ইমপ্রেস করা কিন্তু চাই। সত্যিকারের প্রেমিক-প্রেমিকারাও এই বাবদে বিপদে, সব লোক ভ্যালেন্টাইন ডে তে ঘুরতে যায়, আমরা না গেলে কেমন হয়? কাজেই আবারো সময় আর পয়সার শ্রাদ্ধ। ওদিকে ডিজুস জেনারেশনের বছর বছর নতুন ভ্যালেন্টাইন, সাথে ডিজে পার্টি, ফুর্তিই ফুর্তি, মূল্যবোধ চুলোয় যাক, সাথে একজন হাইক্লাস না থাকলে আর সবাইকে দেখাতে না পারলে দাম আছে নাকি?

তথাকথিত মূল্যবোধের ফান্ডা করে দিতে একধাপ এগিয়ে আবার পত্রপত্রিকার ধান্দাবাজ সম্পাদক আর গর্দভ সাংবাদিকগুলো, পাল্লা দিয়ে চলছে টিভি চ্যানেলগুলোও। প্রথম আলো যেমন বদলে দেবার শপথ নিয়েই নেমেছে, কাজেই বিজয় দিবসে তারা লাল-সবুজ খাবারের মত পয়লা ফাল্গুনে বাসন্তী খাবার বানানোতে অবাক হইনা। সাথে থাকে ফাল্গুনের বিশেষ সাজগোজের উপর বিশেষ সংখ্যা, কোন জামাটা এবার না পরলে আর লোকে যুগের সাথে বদলাচ্ছেই না, কোথায় গিয়ে ফাল্গুনের দুপুরে লান্ঞ্চ না করলে প্রগতিশীল বলাই যাচ্ছে না, তার নানা খবর নিয়ে প্রতিদিনই আসছে বিশেষ প্রতিবেদন। আজকের প্রতিবেদনের শিরোনাম-- "যুগলরা কোথায় যাবেন?" হা খোদা, বাঙালির বদলে যাবার কি করুণ নমুনা, যুগলদের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারেও এখন যুগবদলের কারিগররা দিকনির্দেশনা দিয়ে দেয়, কর্পোরেট আগ্রাসনের কি ভয়াবহ চিত্র। নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, অমানুষগুলো জাতীয় শোক দিবস একুশে ফেব্রুয়ারির জন্যও বিশেষ ফ্যাশন সংখ্যা বের করবে, শিরোনামটা হয়তো হতে পারে--- "সাদা-কালোতে একুশের দুপুর"- যেখানে কোমর বাঁকিয়ে মোহময়ী ভঙ্গিমায় কোন বাংলা না জানা তরুণী অমর একুশের শহীদদের আত্মাকে নির্মম ব্যঙ্গ করে যাবে।

তবে এই কর্পোরেট আগ্রাসন আর গা ভাসানোর মাঝে এসব ফালতু বকবক করে বিশেষ একটা লাভ হয় না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে গণধোলাই খাবার আশংকাটাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। আজকাল আবার সব"প্রাইভেট ম্যাটার", যার যার তার তার। এই যার যার পাওনা তার তার করে নেয়ার প্রতিযোগিতাতেই তাই ছুটছে সবাই, ওর আছে, কাজেই আমারো থাকতে হবে। ও দেখাচ্ছে, তাই আমাকে আরো বেশি দেখাতে হবে। সেটা জাঁকজমক আর বিলাসদ্রব্যের বেলায় যদি সত্যি হয়, ভালবাসার বেলায় কেন সত্যি নয়? কাজেই ভালবাসারও দেখাদেখি এবং দেখানো চলছে জোরেশোরে, মুখের হাসি বড় হচ্ছে মোবাইল কোম্পানির আর মিডিয়ার, ব্যবসাই ব্যবসা, লালে লাল। ভালবাসার খাবার, ভালবাসার পোশাক, ভালবাসার কার্ড, ভালবাসার চকলেট, ভালবাসার গাড়ি, ভালবাসার শাড়ি, এত পণ্যের ভালবাসার মাঝে শুধু হারিয়ে যাচ্ছে ভালবাসার এক মুহূর্তের চোখাচোখি হৃদয়ের সবটুকু ভালবাসা নিয়ে।কোটি কোটি টাকা একদিনেই বাতাসে উড়ছে, যে ছেলেটা দু'টাকা পকেট থেকে বের করে টিএসসির বাচ্চাটার কাছ থেকে চকলেট কিনতে গেলেও মাথায় রক্ত উঠে যায়, কখনো বা লাথিও মারতে চায়, প্রেমিকার চাঁদমুখের দিকে তাকিয়ে আজ তার পকেট থেকেই অনায়াসে বেরিয়ে আসে হাজার টাকার ৫ খানা নোট, ১০ খানাও হতে পারে। টিএসসিতে আবু বকরের মৃত্যুতে একটা মিছিলে যাবার সময় নেই যে ছেলের, নতুন জিএফের মান রাখতে শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে বেড়ায় সে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের জন্য ১৪ ফেব্রুয়ারির একমুঠো ভালবাসা মেলে না আমাদের বুকে, ভালবাসা মেলে শুধু প্রেমিকার রজনীগন্ধায়। ভালবাসা এখন বাজারী পণ্য, তাই ভবিষ্যতে যে ছেলেটা ভালবাসতেও পারতো, ছাত্ররাজনীতির সন্ত্রাসীদের আঘাতে মৃত সেই ছেলের জন্য তার ক্যাম্পাসের মানুষগুলো দু'দণ্ড ভালবেসে চোখের জল ফেলে না, দূরের এক গ্রামে বড় বেশি ভালবাসার মৃত ছেলেটার জন্য যে বাবা-মা চোখের জল ফেলেন, তাদের কথা ভাবার আমাদের সময় হয় না। অবাক চোখে দেখি যে ক্যাম্পাস এককালে জ্বলে উঠতো সামান্য অবিচারে আগুনের মত, সেখানে আজ এত বড় অবিচারের প্রতিকারের দাবীতে সামান্য একটা স্ফুলিঙ্গ নেই। নেতাদের ভালবেসে আজ আমরা মিছিল করি, দলকে ভালবেসে মিছিল করি, প্রেমিকাকে ভালবেসে জীবন দিতে অঙ্গীকার করি, অথচ প্রতিদিন যে ছেলেটা গুটি গুটি পায়ে ক্যাম্পাস দিয়ে হেঁটে যেত তার জন্য চোখের পলক ফেলি না, তার জন্য আমাদের বিশাল হৃদয়ের এক কণা জায়গাও বরাদ্দ নেই। থাকবে কিভাবে, এত্ত এত্ত ভালবাসা দিয়ে সব ভরাট হয়ে গেছে যে গো, আবর্জনার জায়গা কোথায় সেখানে?এসব নিয়ে যেসব অর্বাচীন হল্লা করে, কর্পোরেট ভালবাসার ঘোরলাগা চোখে আমরা তাদের বলি, দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর, ভালবাসিবারে দে মোরে অবসর।

এই ভ্যালেন্টাইন ডেতে তাই আমরা ভালবাসবো, আমরা হাসবো, আমরা ঘোরের মাঝে হারিয়ে যাবো, আমরা আনন্দে অবগাহন করবো ফাল্গুনের রঙে। আবু বকরের মাথার পেছনে আঘাত করে যে অমানুষ তার স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়েছিল, আজ হয়তো সে-ও তার প্রেমিকার কোলে মাথা রাখবে, কোন একদিন এই আমরাই আবার তাকে ভালবেসে নেতা বানাবো, এমপি বানিয়ে সংসদে পাঠাবো, মন্ত্রী হয়ে তারা আবার ভালবেসেই আমাদের পশ্চাদ্দেশে বাঁশ ঢুকিয়ে সেই ভালবাসার প্রতিদান দেবেন, আমরা তখনো তাদের ভালবেসে ফুলের মালা পরাবো, এদেশ তো ভালবাসার দেশ, এখানে ঘৃণার স্থান কোথায়?

টিএসসি আজ ফুলে ফুলে ছেয়ে যাবে, বাসন্তী রঙে রঙিন হবে আমাদের কাপুরুষ হৃদয়, একে-অপরের চোখে তাকিয়ে আমরা স্বর্গ খুঁজবো, শুধু স্বর্গত মৃত সহপাঠীর কথা আজ আমরা ভাববো না, তার জন্য ভালবেসে আমরা একবারো চোখ ভেজাবো না, তার হত্যার বিচার চেয়ে আমরা আজ একটা কথাও বলবো না, বাজারিকরণের এই যুগে নিরীহ একটা অরাজনৈতিক ভালবাসার কোন দাম এখন আমাদের কাছে নেই। একটা যুদ্ধের কালে মায়ের জন্য ভালবাসায় যে জাতির মেরুদণ্ড ইস্পাতের চেয়েও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, মার্কেট ব্র্যান্ড ভালবাসায় স্বার্থপর শহরে আজ তা রাবারের চেয়েও নরম হয়ে গেছে।

ভালবাসার রসে আমরা বড় বেশি ভিজে গেছি, রসসিক্ত এই ভালবাসার ভিড়ে সামান্য বারুদ আমাদের খুব বেশি দরকার, বারুদের সেই ভালবাসায় বিশুদ্ধ হওয়া আমাদের অনেক বেশি প্রয়োজন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29098079 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29098079 2010-02-15 04:17:50
থ্রি ইডিয়টস ও স্লামডগ মিলিয়নেয়ার: অতি প্রচারণার কাছে পরাজিত "কোয়ালিটি" এমন না যে কোন কোন সিনেমা দেখে খুব বেশি নাড়া খাই না, সেগুলোকে আলাদা একটা জায়গা সবসময়ই দিয়ে রাখতে হয়, কিন্তু কোন একটা "চলনসই" ম্যুভিকে যখন স্রেফ বাজারজাতকরণ নীতি বা অতি প্রচারণার জোরে "কিংবদন্তী" বা সমাজ-সংস্কার বদলের পথপ্রদর্শক বানিয়ে দেয়ার অশ্লীল চেষ্টা করা হয় আর সেটার সাথে আমজামযদুমধু জনতার মত একেবারে বোদ্ধারাও লাফঝাঁপ দিতে থাকে, তখন এই নাদানের মনেও কিছু ভারি দর্শনের উদয় হয়, উদাস হয়ে ভাবি, হায় সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দুনিয়া, সবকিছুই যে বিক্রিযোগ্য হয়ে গেল!

যে ম্যুভিখানা এই অচিন্তাশীলের মাথাতেও ভারি চিন্তার উদয় ঘটালো, সেটা সাম্প্রতিক সময়ের উপমহাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ছবি, আমির খান অভিনীত "থ্রি ইডিয়টস"। দর্শক হিসেবে আমি নিম্নশ্রেণীর, কুব্রিকের "ক্লকওয়ার্ক অরেন্ঞ্জ" কে ৩ দিয়ে ক্যামেরনের টার্মিনেটর-২ কে ৯ রেটিং দিয়ে দেই এমন অবস্থা, যুক্তি সহজ, এত ভাবের জিনিস বুঝতে গেলে দর্শনের ক্লাস করলেই হয়, ম্যুভি দেখা কেন? কিন্তু এরপরেও হিন্দি ম্যুভি জিনিসটা ঠিক হজম হয় না, অতি নাটুকেপনা, অহেতুক নাচগান আর হয় বস্তাপচা নইলে নকল করা কাহিনীর জন্য হিন্দি ম্যুভি এড়িয়েই চলি, তবে
বক্স অফিস হিট ২-১টা মাঝে মাঝে দেখা হয়। অভিনেতা হিসেবে আমির খানকেও যথেষ্ট উঁচুমানের মনে হয়, কাহিনী যাই হোক নিজের অভিনয়ের তার টা যথেষ্ট উঁচুতেই তিনি বেঁধে রাখেন। সেদিক থেকে দেখলে, থ্রি ইডিয়টস মন্দ না, টাইমপাস ম্যুভি হিসেবে ভালই বিনোদন দেয়। নিজে প্রকৌশলী বলে কৌতুকের পেছনের বাস্তব কষ্টটাও অন্য যে কারো চেয়ে অনেক বেশি অনুভব করি। মোটের উপর সময়টা
খারাপ কাটে না, যদিও প্রচলিত হিন্দি ছবির অনেক আলতুফালতু বিষয় এই ম্যুভিতেও এড়ানো যায়নি। অহেতুক কিছু নাচগান, তারচেয়েও অহেতুক একটা শোপিস নায়িকা আমদানি যার পুরো ম্যুভিতেই কোন ভূমিকা নেই, আর চিকিৎসার বদলে চিৎকার চেঁচামেচি করেই রোগী ভাল করে ফেলার "ঢাকাই সিনেমা"র অবাস্তব কায়দা, এবং সবশেষে সেই মেলোড্রামা, সবাই নিজের ভুল বুঝতে পেরে ভাল হয়ে যাওয়া (যেন দুনিয়াতে সব ফেরেশতা), অল ইজ ওয়েল!!!

তারপরেও, শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব কিছু সমস্যা খুব প্রকটভাবে উঠে এসেছে, যেটা ভারতে কেমন জানি না, বাংলাদেশের জন্য খুবই সত্যি। সমাধান গুলো আবার সেরকমই অবাস্তব, কিন্তু সিনেমা তো আর কেউ দেশ-জাতি-সভ্যতা বদলে দেয়ার জন্য দেখতে বসে না, বসে বিনোদনের জন্যই। ঠিক এখানটাতেই অধমের আপত্তি, এই ম্যুভিটাকে নিয়ে আমাদের মাঝে মাতামাতিটা এমন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে যে মনে হচ্ছে এই ম্যুভিটা একেবারে দেশকাল বদলে দেয়ার হাতিয়ার হয়ে গেছে আর অস্কারটা এবার আমাদের ঘরেই চলে আসতে যাচ্ছে। বিনোদন পাতার গর্দভ প্রতিবেদকগুলোর কথা বাদই দিলাম,
ফেসবুক বলি মেসেন্ঞ্জার বলি ব্লগ বলি সবখানেই এমন হল্লা যেন এরকম যুগান্তকারী প্লট বা ধারণা নিয়ে কোন সিনেমা আর কেউ কখনো বানায়নি, বন্ধুদের মাঝে এক গাধা তো দেখলাম ফেসবুকে বিশাল এক আবেগী নোট লিখে বসেছে যে এমন ম্যুভি পরিচালকের নখের সমান যোগ্যতাও বাংলাদেশের কারো নেই আর ভারতের ম্যুভি দেখে বাংলাদেশীদের শেখা উচিত কিভাবে ম্যুভি বানাতে হয়। আমি বলি, তওবা, সাফ তওবা, আর লাখো শুকরিয়া যে এখনো বাংলাদেশে প্রচলিত ঢাকাই ফর্মূলার বাইরে যে ক'টা ভাল সিনেমা বানানো হয় সেগুলো হিন্দি সিনেমার ফর্মূলার বাইরে আছে। ভারতীয়দের ম্যুভি, কাজেই তারা লাফঝাঁপ দিলে দোষ দেয়া যায় না, কিন্তু এই ম্যুভি ব্লকবাস্টার হিট হলে বাংলাদেশের কার ঘাড়ে ক'টা মাথা গজাবে সেটাই এই অধমের মাথায় ঢুকলো না। সে-ও মানলাম, আন্ঞ্চলিক স্বজাত্যবোধ, উৎসাহ, ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু লাফঝাঁপ দিতে হলে একদম সত্যিকারের মান দেখে দেয়াই ভাল না? বলিউড চিরকালই হলিউডের নকল করে মেরে দিয়েছে, আমির খানে আগের হিট
"গজিনী"-ও ছিল "মেমেন্টো"র নকল, আর থ্রি ইডিয়টস এবং রাজকুমার হিরানীর আরেক হিট "মুন্নাভাই এমবিবিএস" এর প্লট যে ১৯৯৭ সালের হলিউডি ম্যুভি "প্যাচ অ্যাডামস" থেকে নেয়া, সেটাতেও সন্দেহ নেই। তো, মারবি তো মারবি, সেটা স্বীকারও করবি না, এমন ম্যুভি দেখে সাময়িক বিনোদন নিলে আপত্তি নেই, কিন্তু একেবারে সমাজ বদলের "আদর্শ" হিসেবে নেয়া কেন বাবা?

কারণটা সম্ভবত, যা মাথায় আসে, মার্কেটিং, বাজারজাতকরণ। সেই সাথে, আমাদের "ভারত অনুকরণীয়" নীতি। ভারতীয়দের মার্কেটিং পলিসি আসলেই অনুকরণীয়, বস্তাপচা যা-ই বানাও, অন্যের বাজারে ডাম্পিং করে দাও, কম দামে সস্তা জিনিস দাও, সাথে নিজেরা অন্যের জিনিস, তা সে যত ভালই হোক, ব্যবহারে বিরত থাকো। কাজেই বস্তাপচা হিন্দি সিনেমা আর সিরিয়ালগুলো শুধু বাংলাদেশ না, বরং গোটা উপমহাদেশ ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পূর্ণ বাজারটাই দখল করেছে আর প্রবাসী ভারতীয়দের কল্যাণে আমেরিকা বা ইউকে তেও বাজার নেহাৎ মন্দ না। এই সুযোগটা আবার নিয়েছে ড্যানি বয়েলের মত ধুরন্ধর কিছু পরিচালক, স্লামডগ মিলিয়নিয়ারের মত মেলোড্রামা বানিয়ে। দ্বিতীয় শ্রেণীর এই পরিচালকের অস্কার মনোনয়ন পাওয়াই যেখানে কঠিন, ভারতীয় পটভূমিতে ভারতীয় কলাকুশলী আর সঙ্গীতজ্ঞদের নিয়ে চরম মেলোড্রামাটিক ছবি বানিয়ে ভারতের বাজারে এমনই ঝড় তুলেছে যে অস্কারটাই বাগিয়ে নিয়েছে। অস্কারের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও এটা যে বক্স অফিস
দিয়েও খানিক প্রভাবিত হয় সন্দেহ নেই, শশ্যাঙ্ক রিডেম্পশনের মত ছবির একটাও অস্কার না পাওয়া আর "টাইটানিক" এর ১১ খানা অস্কার সেই ধারণাকেই জোরালো করে। এখানেও সেই মার্কেটিং, প্রচারের আর প্রসারের আলোয় সমালোচক আর নাকউঁচু বোদ্ধাদেরও অনেক সময় চোখ ধাঁধিয়ে যায়, ঠিক থাকেনা পুরস্কার প্রদানের মানদণ্ডও। সেই সুযোগটা হেলায় হারাবে, এমন বোকা ভারতীয়রা কখনোই
ছিল না, ব্রিটিশরাও না, শেষমেশ কে কার ঘাড়ে কাঁঠাল ভাঙলো বোঝা না গেলেও, ৩য় শ্রেণীর একটা ম্যুভি অস্কার জিতে গিয়ে মনে হয় আসল কাঁঠালটা "কোয়ালিটি" নামক শব্দটার ঘাড়েই ভাঙলো।

তা সেই কাঁঠাল যতক্ষণ আমার ঘাড়ে না ভাঙে, সমস্যা নেই। সমস্যা তখনই দাঁড়ায় যখন বাংলার ঘাড়ে হিন্দি কাঁঠাল ভাঙে আর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রী নেয়া ছেলেমেয়েরা অত্যন্ত জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব করে কোন সামাজিক নেটওয়ার্কে জানায় যে বাংলাদেশী কোন পরিচালকের হিন্দি ছবির কোন পরিচালকের পায়ের কাছে যাবারও সামর্থ্য নেই, বাংলাকে হিন্দি সিনেমা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
সমস্যা দাঁড়ায় যখন ফেসবুক বা মেসেন্ঞ্জারে হিন্দিতে স্ট্যাটাস মেসেজ লিখাকে উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা "স্ট্যাটাস সিম্বল" হিসেবে দেখে। সমস্যা দাঁড়ায় যখন বাংলাদেশের মানুষজন একটা খুবই সাধারন বিনোদনমূলক হিন্দি সিনেমাকে "সমাজবদলের হাতিয়ার" হিসেবে বিবেচনা করে অবসেসড হয়ে সবাইকে সেটা দেখতে আকুল আবেদন জানায় আর সেখানকার মহা অবাস্তব সব সমাধান নিজের জীবনে খাটানোর জন্য কোমর বেঁধে নামতে বলে। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আজকালকার অনেক বাবা-মা যখন বাচ্চাকে ভাত খাওয়ান হিন্দি সিরিয়াল দেখিয়ে আর বাচ্চারা বাংলা কোন কবিতার চেয়ে হিন্দি গান আর
হিন্দি সিরিয়ালের কাহিনী অনেক ভালভাবে গড়গড় করে বলে যেতে পারে। অবাস্তব এবং অপ্রয়োজনীয় আগ্রাসী বাজারজাতকরণ নীতি কিভাবে একটা প্রজন্মের ধ্যানধারণাকে বদলে দিতে পারে, গ্রামীনফোন বা মোবাইলের "ডিজুস মার্কেটিং" সেটার একটা ভাল উদাহরণ, আমরা এখন মোবাইলে খাই, মোবাইলে ঘুমাই আর মোবাইলে স্বপ্ন দেখি। ভারতীয়রা সেটা করছে সিনেমার মাধ্যমে, এমনিতেই আমাদের
ভারতভক্তির কমতি নেই, তা ভারতের ভাল দিকের কমতি নেই, কিন্তু ভারতীয়দের দেশপ্রেমের বদলে তাদের বস্তাপচা সিনেমা আর সিরিয়ালকেই কেন আমাদের আদর্শ মানতে হবে আর সেটার জন্য নিজের খেয়ে ফেসবুকে হিন্দি সিনেমার মোষের দুধ বিলাতে হবে, সেটাই এই অধমের মোটা মাথায় ঢোকে না। তারপরেও যারা এশিয়ান ভ্রাতৃত্ববোধ ইত্যাদিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে এইরকম ম্যুভিগুলোকে মাথায় তুলবেনই, তাদের জন্য অধমের নিবেদন, একটু কষ্ট করে এই এশিয়ারই জাপান বা ইরানের দু'-চারটা ম্যুভি দেখুন না! নিজেরাই বুঝে যাবেন হালকা বিনোদনমূলক ম্যুভির সাথে কালজয়ী বা সত্যিকারের চিন্তাধারা বদলে দেয়ার মত অথচ সহজবোধ্য, এমন ম্যুভির তফাৎ কোথায়, আর বেচারা বাংলাদেশি পরিচালকদের যদি কাউকে অনুসরণ করতেই হয়, সেটা নকলবাজ বলিউডি ডিরেক্টরদের না করে কাদেরকে করা উচিত।

আমরা নিজেরা তো মরেই গেছি, আমাদের পরের প্রজন্মকে একটু বাংলাদেশের নিজের হাওয়াতে নিঃশ্বাস নেবার সুযোগটা করে দিলে ভাল হয় না?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29079948 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29079948 2010-01-16 23:47:09
মুজাহিদের দর্পবচন এবং রাজাকারের অ-আ-ক-খ----বিচার চাই দু'টো চিৎকার দিয়ে সেটাকে বের করে দিলে দেশ-জাতির না হোক, নিজের স্বাস্থ্যের মঙ্গল হবে ভেবেই এবারে কীবোর্ডে খটখট করা।

যে কারণে, বা বলা ভাল, যে মহামানবের জন্য এই প্যাঁচালের অবতারণা, তিনি হলেন মান্যবর জনাবে আ'লা আলী আহসান মুজাহিদী, আমজনতার কাছে যিনি একজন বিশিষ্ট রাজাকার হিসেবে পরিচিত। "রাজাকার" এর যোগরূঢ়ি অর্থ যেসব নাবালক এখনো জানেন না, তাদের জন্য বলি, শাব্দিক অর্থে "সাহায্যকারী" হলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে "রাজাকার" বলতে এক প্রকার মানুষের চেহারার ঘৃণ্য প্রাণীকে বুঝায়, যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে হানাদার নরপশু পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর জবরদখল এবং গণহত্যায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছিল, মদদ দিয়েছিল নিজের
জাতিকে ধ্বংস করার চক্রান্তে। এদের উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের মাঝে রয়েছে পাকিস্তানী সেনানায়কদের গণহত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নে তথ্য এবং লোকবল এবং সরাসরি অস্ত্রহাতে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান দেয়া এবং তাদের উপর আক্রমণ, পাকবাহিনীর জন্য লুটপাট এবং রসদ সরবরাহে অংশ নেয়া, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশ এবং মুক্তিবাহিনীকে "ভারতীয়দের চর" এবং "দুষ্কৃতিকারী" আখ্যা দিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতি প্রকাশ করা, সর্বোপরি গণহত্যা এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরুদ্ধে সক্রিয় পরিকল্পক হিসেবে অংশ নেয়া।

তো, এতসব কীর্তিকাণ্ডের সর্দারস্থানীয় যারা, তাদের মাঝে গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদী, মঈনুদ্দীন, কামারুজ্জামান প্রভৃতি রাজাকারের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এত রাজাকারের মাঝে এই মহাত্মাদের নাম এত তাজিমের সাথে উচ্চারণ করার কারণ হলো, গণহত্যা এবং মুক্তিবাহিনীকে ধ্বংসের পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের এদের সক্রিয় এবং অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন। মোটের উপর, জোর করে চোখ বন্ধ করে না রাখলে এদের কার্যকলাপ এমনকি তাদের নিজেদের পক্ষেও এড়িয়ে যাওয়া কষ্টকর। তৎকালীন প্রতিটি সংবাদপত্রে এদের কীর্তিকলাপের বিবরণ জ্বলজ্বল করছে, এমনকি তাদের নিজস্ব পত্রিকা "দৈনিক সংগ্রাম" এর তখনকার সংখ্যাগুলো দেখলেই সেটা বোঝা যায়।

এই গলাকাটা দলের সর্দাররা স্বাধীনতার পরে ভেগে যায় নানা জায়গায়, তারপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে "জামাতে ইসলামী" নামের একটা দলের সর্দার হয়ে বসে। ছলে-বলে-কৌশলে এরা মোটামুটি সংখ্যক নিবেদিতপ্রাণ সদস্য জুটিয়ে ফেলে, বিশেষ করে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদেরই "টার্গেট গ্রুপ" করায় অচিরেই এই দলটি বাংলাদেশের রাজনীতি এবং অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় বেশ জাঁকিয়ে বসে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলনে এরা বেশ দৌড়ের উপর থাকলেও, পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের সাথে জোট বেঁধে এরা সংসদেও চলে যায়, যদিও শোনা যায়, তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীও হুজুরে আ'লা গোলাম আযমের পদধূলি নিতে গিয়েছিলেন।

আস্তে আস্তে এরা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে থাকে, এবং ২০০১ এর নির্বাচনের পর মন্ত্রীসভায় দু'টি জায়গাও বাগিয়ে ফেলে, কুখ্যাত রাজাকার মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মুজাহিদী সেই জায়গা দু'টি নিয়ে দলের ভিত শক্তও করে। এরই মাঝে তারা বেশ কিছু ব্যাঙ্ক, বীমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব রাখার মত একটা অবস্থায় চলে যায়, সাথে মধ্যপ্রাচ্যের অবিরাম সমর্থন এদের সুরক্ষাবর্ম হিসেবেও কাজ করে। সাথে চলে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের দলে অন্তর্ভুক্ত এবং ব্রেইনওয়াশ করে এবং একই সাথে যোগ্যতা অনুযায়ী নানা সুযোগসুবিধা দিয়ে দলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, এবং দৃঢ় ও কার্যকরী চেইন অভ কমান্ড স্থাপন। সব মিলিয়েই জামাতে ইসলামী নিজেদের কুকীর্তি ঢাকা দেয়ার জন্য বেশ গোছালো একটা ব্যবস্থা করে ফেলে নিজেদের একটা ধরাছোঁয়ার বাইরের অবস্থাতেই নিয়ে যায়।

এরই মাঝে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে জামাতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বিএনপি ক্ষমতা হারায়,এবং দিনবদল আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। বেকুব জনতা আবারো আশায় বুক বেঁধে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ক্ষমতায় আনে আওয়ামী লীগকে, শেখ হাসিনার মিঠে বুলিতে ভুলে যায় যে ১৯৯৬ তেও ক্ষমতায় যাবার আগে এমন এক প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেটা ভাঙার উদাহরণ আছে এই দলের। সরকার গড়া হয়, দিন যায়, ধীরে ধীরে যুদ্ধাপরাধী ইস্যুও ডিপফ্রিজে ঢুকে যেতে থাকে। গর্ত থেকে আবারো মাথা তোলে কালসাপ, লকলক করে জিহ্বা বের করে নিজামী আর মুজাহিদীর মত বিশ্বাসঘাতক নরপিশাচ। অন্য দলের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেয় জামাত, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বৃত্তি দেয় জামাত, জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুভানুধ্যায়ী আর নিবেদিতপ্রাণ সদস্য বাড়িয়ে চলে জামাত, অন্য দুই দলের সন্ত্রাস আর টেন্ডারবাজির কুকুর লড়াইয়ের ফাঁকে মেধাবী প্রজন্মের চোখে ধুলো দিয়ে তাদের মগজধোলাই করে চলে জামাত।

অবশেষে, এবার, ডিসেম্বর মাসে, বিজয়ের এই মাসে, যখন ৩৮ বছর আগে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছিল কুকুর আর হায়েনারা আর আমরা তথাকথিত আন্তর্জাতিক চাপ আর উদারতার নামে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম সেসব কুকুরদের, তারা আবার লেজ উঁচিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে নানা টালবাহানায় ধীরে ধীরে বোঝা হয়ে যেতে থাকে, নেহাৎই ভোটে জেতার অস্ত্র হিসেবেই ছিল এই স্লোগান, আর সেটা বুঝেই যেন আরেক দল তাদের কাউন্সিলে অতিথি করে নেয় মতিউর রহমান নিজামীকে। সদর্পে এবার ঘোষণা আসে মুজাহিদীর পক্ষ থেকে--
"আমরাই স্বাধীনতা এনেছি, আমরাই তা রক্ষা করবো।"

৩৮ বছর পরে, অবশেষে, এবার যেন সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চূড়ান্ত পরাজয় ঘটলো, স্বাধীন বাংলার বুকে হায়েনার এই দর্পিত উচ্চারণে পদাঘাত হলো ৩০ লক্ষ শহীদের বুকে। তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার যখন ক্ষমতায়, তখন বুদ্ধিজীবি হত্যাসহ পাকবাহিনীর সকল গণহত্যার প্রত্যক্ষ মদদদাতার এই উচ্চারণ সত্যিকার অর্থেই জাতি হিসেবে আমাদের সকল সম্মান ধুলায় মিশিয়ে দিল।
সম্ভবত আমরাই দায়ী, ভোটের খেলায় হয় আমরা ক্ষমতায় পাঠাই রাজাকারের পাচাটা বিএনপি নয়তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগকে, আর দূরে বসে জিভ বের করে হাসে গোলাম আযমের প্রেতাত্মারা। বিচার হয় না, শান্তি পায় না গণকবরে শুয়ে থাকা আমার দেশের নিরীহ মানুষগুলো, বেয়নেট আর বুলেটের ক্ষত নিয়ে মাটির গহীনে কাঁদে আমার নিহত পূর্বপুরুষ। অভিশাপ দেয় আমাদের শহীদ
শিক্ষাগুরুরা, ধিক্কার দেয় আমাদের বীরশ্রেষ্ঠরা, আর আমরা বুড়ো আঙ্গুল মুখে পুরে ডিজিটাল নেটওয়ার্কে বসে ভাবি, যাকগে, এত আগের কথা ভেবে লাভ কি, ক্ষতি তো কিছু হচ্ছে না, খামোকা ৩৮ বছর আগের ঘটনা নিয়ে টানাটানি।


সত্যিই তাই? এভাবেই আমরা ছেড়ে দেব? নেতারা বিচার করেনি বলে কি ক্ষমা করে দেবে আমাদের শহীদ যোদ্ধারা? কারা নেতা? বিচার করার তারা কে? বিচার না করলেই কি খুনী রাজাকার নিষ্পাপ হয়ে যায়? ভুলে যেতে বলে আমাদের, কেন আমরা ভুলে যাব? ৩০ লক্ষ মানুষের জীবন ফিরিয়ে দিতে যদি না পারে, কেন আমরা ক্ষমা করবো? বুলেট আর ট্যাঙ্কের গোলায় ছিন্নভিন্ন জ্বলন্ত বাংলাদেশের আত্মা যাদের ক্ষমা করবে না, নিয়ন আলোয় স্বাধীন দেশে শীতল হাওয়া খেয়ে তাদের ক্ষমা করার আমরা কে? আমরা ভুলবো না, আমরা ক্ষমা করবো না, যদি জীবিত অবস্থায় ওদের বিচার করতে না পারি, আমরা ওদের লাশের বিচার চাই। এই নরপিশাচদের আদর্শ নিয়ে যে বিষবৃক্ষ বড় হয়ে উঠছে, সেই বিষবৃক্ষের শেকড়সহ আমরা উপড়ে ফেলতে চাই। আমরা আরেকবার
আমাদের বাংলার বুকে সাপের বিষনিঃশ্বাস দেখতে চাই না, আমরা স্বাধীনতা নিয়ে মুজাহিদীদের অশ্লীল রসিকতা দেখতে চাই না।

আমরা খুনী-দালাল যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের রক্ষাকারীদের অস্তিত্বসহ বিনাশ চাই, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তেঋণের বিনিময় চাই, আমরা হত্যাকারী ঘাতক দালালদের ফাঁসি চাই।

[পোস্টের বিষয়বস্তু পুরানো, কিন্তু পুরানো জিনিস মাঝে মাঝে ঝালাই করে নিলে স্মৃতির ধুলো সরে, মরচে পরিষ্কার হয়। জাতি হিসেবে আমরা আবার বড়ই বিস্মৃতিপরায়ণ কিনা!]
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29060274 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29060274 2009-12-16 23:41:50
বাংলা ব্লগ দিবস: একটি প্রস্তাবনা
একটা ব্যাপার স্বীকার করতেই হবে, ব্লগিং এখন আর হেলাফেলা করার মত কোন বিষয় নয়, বা চরিত্রে শৌখিন হলেও বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে মোটেই শৌখিন নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, কোন খবর বা তথ্য দরকার হলে আজকাল আর বাইরের কোন সাইটে খুঁজি না, ব্লগেই পেয়ে যাই, বা না পেলেও ব্লগারদের সাহায্য চাইলে মিলে যায়। বাংলাতে কিছু লিখে সার্চ করলেও সবার আগে এই কয়টা বাংলা ব্লগেরই কোন পোস্টের লিংক চলে আসে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলা ব্লগ মত প্রকাশের একটা বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়াবে, ব্লগাররা হয়ে যাবেন একটা গুরুত্বপূর্ণ "প্রেশার গ্রুপ"। বিশেষ করে, কর্পোরেট আর ব্যক্তিমালিকানাধীন মূলধারার মিডিয়ার জাঁতাকলে হাঁসফাঁস করা জনতার ব্লগের শরণ নেয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

কাজেই, ব্লগ এখন শুধুমাত্র একটি বা দু'টি সাইট নয়, ব্লগিং এক নতুন যুগের সূচনা, সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলানোর পথে আরেকটা পদক্ষেপ। এর জন্য দরকার ব্লগিংকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া, এবং যতদূর বুঝি, "ব্লগ দিবস"-এর প্রয়োজন সেখানেই। প্রশ্নটা হলো, সেই ব্লগ দিবসটা কবে হবে? তার কার্যক্রমই বা কি হবে? ব্লগে এর মাঝেই এই নিয়ে বেশ কিছু পোস্ট চলে এসেছে, একজন সাধারণ ব্লগার হিসেবে নিজের মতামত জানানোর একটা চেষ্টা করার ইচ্ছা হলো তাই। ব্যক্তিগতভাবে, আমার মতামত সামহোয়্যারের জন্মদিনের পক্ষেই। খানিকটা পক্ষপাত আছে, অস্বীকার করি না, কারণ এখানেই আমার এবং আমার মত অনেকের ব্লগিংয়ের শুরু, এমনকি যারা এখন অন্য ব্লগ সাইটে লেখালেখি করেন বা সেগুলোর স্রষ্টা, তাদেরও যাত্রা শুরু এই ব্লগেই। যে পথ দেখায়, তাকে সেটার স্বীকৃতি দেয়ার মাঝে অগৌরবের কিছু তো দেখি না, কাজেই বাংলা ব্লগ দিবস সামহোয়্যারের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে হলে সেখানে সামহোয়্যার ব্লগের আধিপত্যের কিছু আমি অন্তত খুঁজে পাই না।

এবার দেখি, ঐ দিনটা পালনে সমস্যাগুলো ঠিক কোথায়। ১৫ ডিসেম্বর আবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দু'টো দিবসের মাঝে স্যান্ডউইচ হয়ে যায়, স্বাভাবিকভাবেই, যেকোন দিবসের চেয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস বা বিজয় দিবসের গুরুত্ব বহুগুণে বেশি। এখানে ব্লগিংকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া একটা উদ্দেশ্য, কাজেই সেটা যেন সবাই গুরুত্ব দিয়েই গ্রহণ করে সেটাও দেখা জরুরী। সেজন্য সবাই উদযাপন করতে পারে, এমন একটা দিনেই ব্লগ দিবস হওয়া উচিত, এবং সেজন্য ডিসেম্বরের ৩য় বা ৪র্থ শুক্রবার (সাপ্তাহিক ছুটি, সবার উদযাপনের সুবিধা) ব্লগ দিবস পালন করা যায়, আর ১৫ ডিসেম্বরকে সামহোয়্যারের জন্মদিন হিসেবে পালন করাই শ্রেয়। আবার এর পাল্টা যুক্তি হিসেবে, অনির্দিষ্ট কোন দিনকে ব্লগ দিবস হিসেবে পালন করায় অনেকের আপত্তি আছে, প্রতি বছর দিন পাল্টে গেলেই বা কেমন লাগে? সেক্ষেত্রে, ১৬ থেকে ২৫ ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কোন একটা দিন উপযুক্ত হতে পারে, সেটা ১৮, ১৯, ২০ বা ২১ ডিসেম্বর হতে পারে, যা কিনা বাংলা ব্লগিংয়ের যাত্রা শুরুর আশেপাশেই থাকে, একই সাথে গুরুত্বপূর্ণ দু'টো জাতীয় দিবসের মাঝখানে বসেও বাগড়া বাধায় না।

এবার উদযাপনের কথা বলি ২-১টা। একটা জমায়েত হতেই পারে, সাথে অনলাইনেও লেখালেখি হতে পারে সেদিন। হতে পারে, সেদিন প্রত্যেক ব্লগার তার নিজের নিজের বলয়ে ব্লগিংকে প্রমোট করবেন। একই সাথে, ব্লগিংয়ের যারা ভবিষ্যৎ, তাদের ব্লগিং সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য ব্লগারদের পক্ষ থেকে কয়েকটি দল কোন কোন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারেন, ঠাকতে পারে লাইভ রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা এবং ব্লগে তার উপর তাৎক্ষণিক পোস্ট এবং অন্যান্য ব্লগারদের ফিডব্যাক ও মন্তব্য করার কার্যক্রম। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এমন একটি দারুণ ইন্টারঅ্যাকটিভ মাধ্যমে সরাসরি মতবিনময়ের সুযোগ তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করবেই। একটা ব্লগ দিবসে ১০টা কলেজ-ভার্সিটি থেকে যদি ৫০০ জনকেও রেজিস্ট্রেশন করানো যায়, তাদের ২০% টিকে গেলেও কিন্তু সেটা ভবিষ্যতের ভিত্তি হয়ে থাকবে।

ব্লগাররা কি একজন সামান্য ব্লগারের সামান্য কথাগুলো একটু বিবেচনা করে দেখবেন?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29059557 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29059557 2009-12-15 23:01:19
দিনলিপি ১১: আকাশের কাছাকাছি ধোঁয়াটে জানালায়
যাকগে, মনে হয় খেই হারিয়ে ফেলেছি, কি যেন শুরু করতে গিয়েছিলাম আর বুড়ো মানুষের মত কোন কথা থেকে কোথায় চলে গেলাম! একবার একজন বলেছিল আমি নাকি কখনোই মূল কথা থেকে সরিনা, ঘুরেফিরে আসি, আজকাল কথাটা খুব ভুল মনে হয়। কেবলই ভুলে যাই আর সরে যাই। এই তো সেদিন, কার একটা বই কিনবো বলে বের হলাম, এরপর দোকানে গিয়ে গেলাম ভুলে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে লেখকের নামটা যা-ও মনে পড়লো, বইটার নাম আর মনেই এলোনা। কাকে যেন টাকা দেব বলে বের হয়েছি বাসা থেকে, গন্তব্যে পৌঁছে মনে পড়লো, পকেটের রুমালটাও এনেছি, মায় ভাঙতি দু'টাকাও, কিন্তু আসল টাকাটাই আনা হয়নি।

অথচ এমনটা হয় না, এমনটা হবার কথাও ছিল না। স্মৃতি আমার বরাবরই ভাল কাজ করে, ভুলি না কিছু। আনন্দের আর বন্ধুত্বের স্মৃতি মনে থাকে, তারচেয়েও বেশি মনে থাকে দুঃস্বপ্নের আর অপমানের স্মৃতি। ৭ বছর বয়সে মেনিনজাইটিস হয়ে মৃত্যুর খুব কাছে থেকে ফিরে আসার কথা মনে আছে, টানা ১০ দিন যমে-মানুষে টানাটানি। মনে আছে পাশের কেবিনের বাচ্চাটার কথাও, লিউকোমিয়া হয়েছিল, ২ কেবিনের মাঝের পর্দা দিয়ে কথা বলতো, আমি সে যাত্রা ফিরে এলেও তার আর ফেরা হয়নি কখনো। আবার যমরাজকে কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখেছিলাম কলেজে থাকতে, যেদিন মাঝরাস্তায় বেবিট্যাক্সির ধাক্কায় সাইকেল ঠেকে ছিটকে পড়েছিলাম। চারপাশের বাস-ট্রাকগুলো সেবার কিভাবে আমাকে এড়িয়ে গেল সেটা বোধহয় একমাত্র উপরওয়ালাই ভাল বলতে পারবেন। আবার সেদিনকার কথাও খুব স্পষ্ট মনে আছে, এয়ারপোর্ট রোডে বাস থেকে নামতেই আরেকটা বাস তেড়ে এল, লাফিয়ে পিছাতে গিয়ে নিজের বাসটার সামনেই পড়েছিলাম, ড্রাইভারের প্রতিক্রিয়া খুব দ্রুত না হলে এতদিনে অন্য কোন জগতে হিসাবের খাতা খুলতে হতো।

এতসব অভিজ্ঞতা মানুষকে সাহসী করে তোলার কথা, আমাকে আরো ভীতু বানিয়ে দিয়েছে। সেজন্যই এই ভুলো রোগ কিনা কে জানে, হয়তো এজন্যই ছিনতাইকারী ধরলে বিনাবাক্যব্যয়ে সেলফোনটা আর পকেটের টাকাগুলো দিয়ে দিই আর বাসায় ফিরে নির্বিকারে ঘটনাটা ভুলে যেতে চাই। এজন্যই অন্ধ দুর্নীতির দেশে থেকেও উপরওয়ালার সুকীর্তি ভুলে গিয়ে বিষ খেয়ে বিষ হজম করি আর গর্জনের বদলে মিউ মিউ করি। শালার পেটের দায় আর জানের মায়া, মানুষকে গোলাম বানাতে বেশি কিছু লাগে না!

ভুলে যাওয়ার জন্য এই ১১ তলার ছাদটা মন্দ না, একে তো মাটি থেকে এত উপরে, তার ওপর প্রায় ঝড়ো বাতাস ভাবনাগুলোকেও কেমন উড়িয়ে নিতে চায়। নিচে তাকালে ইচ্ছে হয় উড়ে চলে যাই, সিঁড়ি দিয়ে নামা বড় কষ্ট। সেদিন বসেছিলাম এয়ারপোর্টের দিকটায়, দানবীয় বিমানগুলোর ওড়াওড়ি দেখতে, আজ বসেছি উল্টোদিকে। দৃশ্যগুলো পাল্টে গেছে অনেকটা, একটা জায়গায় মিল আছে শুধু,
দূরের প্রান্তে সব ধোঁয়া ধোঁয়া। কুয়াশা নয়, ধুলো আর ধূসর রঙের নিষ্প্রাণ শহর। গাড়ির আওয়াজ কম এখানটায়, কিন্তু রানওয়েতে অবিরাম ওঠানামা করা বিমানের গর্জন আর বিমানবাহিনীর ফাইটারগুলোর অবিশ্রান্ত ওড়াওড়ি রীতিমত যুদ্ধাবস্থার পূর্বাভাস দেয়। ব্যাটাদের কোন মহড়া চলছে মনে হয় আজকাল, উড়ানখেলা দেখতে মন্দ লাগে না, চিৎকাত হয়ে উড়ে উড়ে বেশ একখানা রঙ্গ। তবে
সার্কাস দেখানো ছাড়া এই মান্ধাতা আমলের ফাইটার পুষে দেশের কি সুরক্ষা হয় বলা মুশকিল, নেপাল-ভূটান-মালদ্বীপের মত কয়েকটা দেশ বাদে মোটামুটি সব দেশের বিমানই আরেকটু জাতের বলে বোধ করি।

৪ নম্বর সেক্টরের এদিকটায় একটা খেলার মাঠ আছে, ভূমিদস্যু আর সরকারের হাত এড়িয়ে কইমাছের জান নিয়ে বেঁচে যাওয়া কয়েকটা মাঠের একটা। গোলপোস্ট আছে দু'টো, তবে ছেলেপিলের সেটাকে স্টাম্প বানিয়ে ক্রিকেট খেলার দিকে উৎসাহই বেশি, দেশের ফুটবলের দুর্দশা দেখতে বেশিদূর যেতে হয়না। ছেলেগুলোকে দেখে স্মৃতিকাতরতা আর ঈর্ষার যুগপৎ আক্রমণে আক্রান্ত হই, আবারো উড়ে গিয়ে ওদের মাঝে নামতে ইচ্ছে করে। সবার আগে, বিকেলেরও বেশ আগে, ভরদুপুরও বলা যায়, মাঠে আসে একটা ছেলে, দুইটা ছেলে। মাথার ওপরে তখন কাকের আনাগোনা, ভয়ে থাকি কখন প্রাকৃতিক বোমাবর্ষণ শুরু হয়। ডানা ঝাপটে ছাদে জমা পানিতে কাকভেজা হয় দাঁড়কাকেরা আর ঠোঁট দিয়ে সেই পানিই ঠুকরে খায়, আশপাশে আরো ২-১টা পাখির সন্ধানে তাকিয়েও কিছু পাইনা। কাকের মত আবর্জনাখোর না হলে মনে হয় অত ওপরতলায় ওঠা যায় না। ওদিকে দূরের দুই ছাদে দুই তরুণ-তরুণীর মুখোমুখি দাঁড়ানো দেখে সেই গল্পটা মনে পড়ে যায়, সেই যে, পাশের বাসার ছেলেটা সকাল থেকে সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে থাকতো ছাদে, মেয়েটা থাকতো জানালায়, আর ভরদুপুরে কোন মহিলা, ছেলেটার মা-ই হবে, হুংকার দিয়ে বলতো-- "আরে দুপুরের খাওয়াটা খায়া যা, তার পরে ডিউটি দে!" বেচারারা, এত বড় শহরেও প্রেম করার জায়গার
বড় অভাব, শুধুই ভর্ৎসনা আর কৌতুহলের দৃষ্টির চাবুক।

মাঠের ছেলেদু'টো ঠুকঠাক করে, দল ভারি হতে থাকে। একজন-দু'জন করে গণ্ডায় গণ্ডায় ছেলেপুলে মাঠে নামে, দল ভাগ করে। সজোরে হাঁকানো, ছুট, আর একটা ক্যাচ ধরে বিশ্বজয়ের উল্লাসে হাত ছোঁড়া, এত দূর থেকেও সম্মিলিত চিৎকারটা কল্পনা করে নিতে কষ্ট হয় না। কতদিন অমনভাবে বাতাসে হাত ছড়িয়ে লাফিয়ে উঠিনা? এক বছর? দুই বছর? তিন বা চার বছরও হতে পারে। স্কুলের ছুটির দিনগুলোতে দলবল নিয়ে সকাল ৯টায় মাঠ দখল, হালকা কুয়াশায় দল ভাগাভাগি, তারপর আনাড়ি পায়ে ভেজা ঘাসের উপর দৌড়ে আনাড়ি খেলা, মিসফিল্ডিংয়ের মহড়া। দুপুরে ঘেমেঘুমে বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনি শুকোবার আগেই ফুটবলটা নিয়ে একছুটে আবার মাঠে। অর্থহীন ছুটোছুটির জন্য তখনো কয়েকটা বড় মাঠ অবশিষ্ট ছিল, খুব মারকুটে ব্যাটসম্যান বা তাগড়া জোয়ান ফুটবলার না হলে বল মাঠ পার করে বাড়ির জানালা ভাঙা বড় সহজ ব্যাপার ছিল না। ফুটবল আর ক্রিকেটের মাঠগুলো আমাদের কৈশোরেই দখল করে নিয়েছিল কংক্রিটের দানবগুলো, তারপরেও ব্যাডমিন্টনের লাফঝাঁপ ছিল আমাদের শেষ ভরসা। এখন তো দানবদের সঙ্গীসাথীরা এসে শিশুদের মন-মগজকে মাঠসহ ঢুকিয়ে দিয়েছে কম্পিউটারের পর্দায়, আর আমাদের মত কতক অথর্ব অতীতচারীর কলমের ডগায়। আহা জীবন, সবকিছুই কেবলই হারিয়ে যায়!

তাই এই শেষ বিকেলে অতীতের ছায়া দেখে মনে মনে একটু সিনেমা বানাই, ঐ কংক্রিটের দৈত্যকুলের মাঝে একটুকরো সবুজ প্রহ্লাদ মেঠো জমি, তার মাঝে গাছের ছায়া ঘনায়। গর্জনশীল শহরে চুঁই চুঁই করে ডাকতে থাকা ছোট্ট পাখিটাকে খুঁজে ফেরে ক্লান্ত তরুণের বৃদ্ধ চোখ। একটা বল, দুইটা বল, বড়, ছোট, এদিক, ওদিক, হাউজ দ্যাট? ক্যাচ, আউট, গোল, হুল্লোড়। দুষ্ট ছেলের দলের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। আযানের শেষে সূর্যডোবা আলোয় ধুলোপায়ে বাড়ি ফেরা বালকের মনে যখন বৃষ্টি নামে, এখানে তখন ১১ তলায় বিষণ্ন তরুণ চাতকের মত জল খোঁজে বাজপাখির চোখে।

এ শহর ছেড়ে একদিন পালাতে হবেই, নাগরিক মূলধন নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখার অনেকদিন তো হয়েই গেল, সবুজ খড়কুটোর মাঝে ছাই হয়ে ফিরে যাবার আশায় তাই নির্নিমেষে তাকিয়ে থাকি মেঘের অরণ্যে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29057834 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29057834 2009-12-13 00:02:33
বিশ্বকাপ ড্র: কারা পড়লো মৃত্যুকূপে?
আপাতত বলা যায় সবচেয়ে সহজ গ্রুপে পড়েছে ইতালি--- প্যারাগুয়ে, নিউজিল্যান্ড আর প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলা স্লোভাকিয়াকে পেয়ে যে কোন ফুটবল পরাশক্তিরই খুশি হয়ে যাবার কথা। যদিও দক্ষিন আমেরিকার বাছাইপর্বে প্যারাগুয়ে ২ এ ছিল, কিন্তু ল্যাটিন ধারার সাথে একেবারেই বেমানান বিরক্তিকর রকমের রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলা এই দলটির বিশ্বকাপের সাফল্য ২য় রাউন্ড পর্যন্তই। কনফেডারেশনস
কাপে নিয়মিত ৪-৫ টা গোল খেয়ে আসা নিউজিল্যান্ড এই বিশ্বকাপের জোকার টিম হবার দৌড়ে বেশ উপরেই আছে, আর নবাগত স্লোভাকিয়া কোন চমক দেখাতে না পারলে এখান থেকে ইতালি আর প্যারাগুয়ের পরের রাউন্ডে যাত্রা খুব কঠিন হবার কথা নয়।

ইতালির উল্টো অবস্থা ব্রাজিলের। গত কয়েকবারই মোটামুটি সহজ গ্রুপে পড়া ব্রাজিলের এবারের গ্রুপ প্রতিপক্ষ ইউরোপিয়ান পরাশক্তি পর্তুগাল, আফ্রিকান জায়ান্ট আইভরি কোস্ট আর ৪৩ বছর পরে বিশ্বকাপ খেলা উত্তর কোরিয়া। ক্রিস্টিয়ান রোনালদো, রিকার্দো কার্ভালহো, ন্যানির মত তারকাসমৃদ্ধ পর্তুগাল আর দিদিয়ের দ্রগবা, কোলো তোরে, সলোমন কালুর মত আফ্রিকান দানবদের সমন্বয়ে গঠিত আইভরি কোস্টের সাথে ব্রাজিল, সব মিলিয়ে এটাকে অনায়াসেই "গ্রুপ অভ ডেথ" বলা যায়। উত্তর কোরিয়া একেবারেই ব্ল্যাক হোলের থেকে উদয় হয়েছে, তারপরেও এই গ্রুপে তাদের বিশেষ কোন সুযোগ নেই বলেই মনে হয়, আর বর্তমান ফর্মের ব্রাজিলেরও পরের পর্বে না ওঠা অঘটনই হবে, কিন্তু "গ্রুপ অভ ডেথ" এ তো অঘটনই স্বাভাবিক ঘটনা।

ব্রাজিলের তুলনায় তাদের ল্যাটিন শত্রু আর্জেন্টিনা বরং অনেক বেশি নির্ভার, অন্তত নাইজেরিয়া, গ্রীস আর দক্ষিন কোরিয়ার পক্ষে বড় কোন অঘটন ঘটানো সম্ভব নয়, যদি আর্জেন্টিনা নিজেরাই চরমতম বাজে না খেলে। একইভাবে সি গ্রুপে ইংল্যান্ডও খুশি হবে বলেই ধরে নেয়া যায়, ৩ দলের মাঝে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউএসএ কেই ধরা যায়, যদিও রাশিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপে আসা স্লোভেনিয়া আর মিশরের সাথে "যুদ্ধ" জিতে আসা আলজেরিয়ার কাছ থেকে ২-১টা অঘটন দেখতে মন্দ লাগবে না।

বিশ্বকাপে কোন স্বাগতিক দলই কখনো প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়েনি, কিন্তু ফ্রান্স, মেক্সিকো আর উরুগুয়ের সাথে এ গ্রুপে থাকা চরম বাজে ফর্মের দক্ষিন আফ্রিকা সেটাই হয়তো প্রথমবারের মত ঘটিয়ে দিতে পারে। ইতিহাসের ধারা রাখতে দক্ষিন আফ্রিকার ব্রাজিলিয়ান কোচ কার্লোস আলবার্তো পারেইরাকে অনেকদূরই যেতে হবে, সন্দেহ নেই। তবে কষ্ট করতে হবে না স্পেনের কোচকে, ভয়াবহ ফুটবল খেলে বাছাই পর্বে ১০ ম্যাচের সবক'টিতেই জয় পাওয়া স্পেনের কাছে হন্ডুরাস, চিলি আর সুইজারল্যান্ডকে শিশুতোষ দল মনে হওয়াই স্বাভাবিক। বাছাইপর্বের শেষদিকের ফর্ম ধরে রাখতে পারলে, স্পেনের সাথে এখান থেকে ২য় রাউন্ডে চিলি একটা জায়গা করে নিতেও পারে।

জার্মানির গ্রুপটাও সম্ভবত "গ্রুপ অভ ডেথ" এর জন্য নাম জমা দিতে পারে। সদ্য এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনে যোগ দেয়া অস্ট্রেলিয়া গত বিশ্বকাপে যথেষ্টই সমীহ জাগানো খেলা দেখিয়েছে, যেমন অনেক বড় দলের আতংক হয়ে দেখা দিতে পারে মাইকেল এসিয়েনের ঘানা-ও। সার্বিয়া নতুন দল, সুযোগ থাকছে তাদেরও। এদিকে হল্যান্ডের গ্রুপটাও একেবারে সোজা না, নিজের মহাদেশে ক্যামেরুন আর বাছাইপর্বে ভাল খেলা বরাবরের জায়ান্টকিলার ডেনমার্ক পরের রাউন্ডের দাবীদার, সব মিলিয়ে জাপানের সম্ভাবনা এখানে কমই।

তবে, এতসব হিসাব-নিকাশ শুধুই আড্ডার টেবিল গরম করার জন্য, বিশ্বকাপ ফুটবল, বা বলা ভালো, ফুটবল খেলাটাই কবে হিসাব মেনে চলেছে? হিসাব মানলে তো আর ১৯৫০ এ ফুটবল পরাশক্তি ইংল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হারে না, প্রথমবার বিশ্বকাপে আসা উত্তর কোরিয়া কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে পারে না ১৯৬৬ তে, ১৯৯০ এ রজার মিলার ক্যামেরুনের কাছে হোঁচট খায় না আর্জেন্টিনা, সেনেগাল ফ্রান্সকে বাড়ির টিকেট ধরিয়ে দেয় না। অঘটনের সংখ্যা বলে শেষ করা যায় না, আর সেটাই এই খেলার সৌন্দর্য্য, শেষ কথা বলে কোন কিছু ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত নেই।

ফুটবল পাগলরা, আসুন আমরা সেই মুহূর্তগুলোর অপেক্ষায় থাকি, আর ততক্ষণ আড্ডার টেবিল গরম করে ফেলি ফুটবল নিয়ে।

ফুটবলের জয় হোক।

[খবরে দেখলাম, বাংলাদেশ ৪-১ গোলে ভূটানকে হারিয়েছে, স্বস্তি পেলাম, খানিকটা খুশিও। মনে হয়, বেইজ্জতি এইবার একটু কম হবে। শুভকামনা ওদের জন্যও।]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29053675 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29053675 2009-12-05 02:10:36
তবুও ঈদ.............
বাসায় লোকজন বলতে অবশ্য আমরা ৩ জনই, তবে রুটিনের কথা বলতে গেলে আরো অনেকের কথা চলে আসে। এই যেমন দৌড়াতে দৌড়াতেই টের পাচ্ছি, মানুষের শেকড় আসলে অনেক জায়গাতে ছড়িয়ে যায়, যত সময় যায় ততই গভীরে চলে যায়, টেনে তুলতে গেলে মনে হয় আত্মা ছিঁড়ে বের করা হচ্ছে। নিজের মানুষ, ঘরের মানুষ, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, দিন দিন শেকড় শুধু ছড়াতেই
থাকে। সেই একদম ৬ বছর বয়স থেকে, ঢাকাতে ঈদ করলেই, ঈদের সকালে বড় রাস্তায় নামায পড়ে প্রথম নাস্তা করা হয় পাড়াতো বন্ধু কাদিরের বাসায়, নিজের বাসারও আগে। এই নিয়মের ব্যতিক্রম কখনোই হয়নি, এবারো সেটা রক্ষার জন্যই এই ছোটাছুটি। সেই ৫ বছর বয়সে, পাশের বাসার দেয়ালের উপর বসা যে ছেলেটা প্রথম জিজ্ঞেস করেছিল--তোমার নাম কি, সেখান থেকেই প্রথম
বন্ধুত্বের সংজ্ঞা শেখা শুরু। ২১ বছর পার হয়ে গেছে, আমরা এখন যার যার পেশা আর পরিবার নিয়ে ব্যস্ত মানুষ, দু'জনেই বদলে গেছি অনেক, বদলে গেছে আমাদের চারপাশের মানুষগুলো, হারিয়েও গেছে অনেকে, বলয় থেকে, পৃথিবী থেকেও, কিন্তু বদলায়নি আমাদের ঈদের সকাল, সম্ভবত বন্ধুত্বের চেহারাও একই আছে। কবি সুকান্ত বেঁচেছিলেন ২১ বছর, বন্ধুত্বের আর ঈদের সকালে সেই একই বাড়িতে প্রথম সেমাই খাবার ২১ বছর পার হয়ে গেল, জীবনের অর্জনের খাতায় মনে হয় বড় করে এটা লেখাই যায়।

এবারের ঈদে অবশ্য তেমন কিছু করার নেই, বন্ধুবান্ধবরা তেমন কেউ নেই। ২ বছর আগেও ঈদের আগের রাত থেকে ঈদের পরের রাত পর্যম্ত মোটামুটি ১০ জনের একটা দল বের হয়ে যেতাম ঢাকা চক্কর দিতে, হিসেব করে দেখলাম এবার আছি মাত্র ৩ জন, বাকি সবাই পেশাগত কাজে হয় ঢাকার বাইরে নয়তো দেশেরই বাইরে, আগামী বছর সম্ভবত কেউই আর ঢাকাতে থাকবে না। দেশের বাড়িতে গেলেও ম্যালা লোকজন, কিন্তু আস্তে আস্তে সেখানেও কমে আসছে, বয়স্করা অনেকেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন যারা পুরো পরিবারকে বেঁধে রাখতেন এক সুতোয়, ভাই-বোনরা একেকজন একেক দেশে একেক শহরে। মানুষ না থাকলে আর শেকড় কোথায়, সেজন্যই আর এই বাস-ট্রেনের হুজ্জোত পার হয়ে যাবার উৎসাহ পেলাম না, এভাবেই বোধহয় ধীরে ধীরে শেকড় উপড়ে আসে।

তো এই ভাসমান শহরে ভাসমান আমার ধান্দা ছিল বাসায় এসে একটা ঘুম দেয়ার, কোরবানির কাজে আমাকে পাওয়া যাবেনা এটা বাবা ধরেই নিয়েছেন। একবার বলেছিলেন বটে গরুটা দেখতে যাবো কিনা, জবাব দিলাম, দুনিয়া সব গরুই হাম্বা হাম্বা করে ডাকে, দেখার কি আছে? তোরে দিয়া কিছু হবে না, এই ধরণের কিছু একটা বলে এরপর আর এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। মানসিক বার্ধক্য মনে হয় ধরেই ফেলেছে, নয়তো একপাল লোকজনের সামনে দাঁত কেলিয়ে সামাজিকতা করতে হবেনা এই সম্ভাবনায় মনে মনে খুশি হয়ে যাবো কেন?

তারপরেও ঈদ উপলক্ষে কিছু একটা করা দরকার, কি করা যায় ভাবতে গিয়ে দেখলাম ঈদ এলে একটু বিপদেই পড়ে যাই এই করা বা না করা নিয়ে। টিভি দেখা বাদ দিয়েছি ম্যালাদিন, ঈদের অনুষ্ঠান দেখার তো প্রশ্নই আসেনা, যতবার টিভি ছাড়ি বস্তাপচা বিজ্ঞাপন ছাড়া কিছুই পাই না, আর কপালজোরে মাঝে মাঝে পাই তারচেয়েও বস্তাপচা নিম্নরুচির হাসির নাটকের নামে কিছু ভাঁড়ামি। আজকাল সাথে যোগ হয়েছে কিছু গানের অনুষ্ঠান যেখানে মিলা টাইপের কয়েকটা সং এসে হুল্লোড় করে আর তারকাকথন জাতীয় কিছু একটা যেগুলোতে সেজেগুজে এসে নেকু নেকু গলায় তারকারা তাদের ঈদ কিভাবে
কাটলো সেটার মুখস্ত বর্ণনা দেন, সাথে বয়ান করেন এবারের ঈদে তারা অস্কার পাবার মত কত দুর্ধর্ষ একেকটা কাজ কত কষ্ট করে করলেন। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সেই দুর্ধর্ষ কাজ দেখলে দুর্ধর্ষতম দস্যু মোহনেরও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে।

রাস্তাঘাটে বের হওয়াও আজকে মুশকিল, গরুর গন্ধে ক'দিন ধরেই নাক জ্বলে যাচ্ছে, কেন যেন এটায় কখনোই অভ্যস্ত হতে পারিনি, কোরবানির পরে নাড়িভুড়ি আর গোবরের সুবাস বাড়তি পাওনা। লোকজনের ফূর্তির অভাব নেই, গতবার ঢাকাতে ঈদের দিনেও ট্রাফিক জ্যাম দেখে বুঝেছি দিনকাল আসলেই বদলে গেছে। ঢাকার নারীকূল সম্ভবত আজকাল ঈদের ৩ দিন আগে থেকেই পার্লারে গমন শুরু করে, অন্তত তাদের প্লাস্টার করা মুখমন্ডল আর ইস্ত্রি করা কেশরাজি দেখে সেটাই মনে হয়, আর চাক্ষুষ প্রমাণ দেখলাম গত পরশু। অফিসের পাশেই একটা বিউটি পার্লার আছে, অফিসের পর এক বন্ধুকে আসতে বলে দাঁড়িয়ে ছিলাম ৩০ মিনিট প্রায়, এর মাঝে সেখানে যারা ঢুকেছেন তাদের মাঝে সবচেয়ে কমবয়সীজন হবেন ১৩-১৪ বছরের, সবচেয়ে বয়স্কজন নির্ঘাত ৫০। গাড়ি থেকে নেমে যেমন কেউ
কেউ এসেছেন, তেমনি কাউকে কাউকে দেখে বুঝতে বাধ্য যে কোন পোশাকবালিকাও এই উপলক্ষে একটু সেজে নিতে চায়। চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপন আর ডিজুসের যুগ এমনই জিনিস, একবার হুজুগটা শুধু ধরিয়ে দিতে হয়, হুজুগে মানুষ এরপর নিজেকে বিক্রি করে হলেও পণ্য আর সেবা কিনবেই কিনবে।

তাই বলে ভাবার কারণ নেই ঈদের এই দিনেও নিরানন্দের কথা বলে সবার আনন্দ মাটি করতে হাজির হয়েছি, বলা যায় খাঁটি খানিকটা আনন্দের খোঁজেই বান্দার আগমন, যেমনটা পাই সকালের ঐ প্রথম সেমাই খেয়ে অথবা বছরে ঐ ২টা দিনই মা-বাবাকে সালাম করে। বন্ধুবান্ধব বিশেষ এখন না থাকলেও যে ৩-৪ জন আছে তাদের নিয়েই শহরের অলিগলিতে ঢুঁ মারবো আজ না হলেও কাল-পরশু, হানা দেব এর-ওর বাড়িতে কিছু খানাখাদ্যের লোভেও। অমুকের বাড়ির সেমাইটা খাঁটি দুধের, তমুকের মা চটপটিটা ভাল রাঁধেন, এর বাড়ির পায়েসটা বেশ, ওর বাড়িতে গেলে গরুর ভুনা বরাদ্দ, মাথায় থাকেই এগুলো। পুরানো মুখগুলোর সাথে দেখা হবে এ সুযোগে, যারা আমাদের হাঁটি হাঁটি পা পা থেকে বড় হয়ে উঠতে দেখেছেন। আনন্দ আর আশীর্বাদে এই একটা দিন হবে আমাদের জন্য মঙ্গলময়, পাওয়ার খাতায় কম বলে ধরি না সেটাকেও।ঈদের নামাযে আর রাস্তায় ঝিকমিকে পোশাকের ফুটফুটে শিশুগুলোকে দেখে স্বর্গের আনন্দের রূপটা পৃথিবীতেই দেখি, এ-ও বা কম কি?

এত আনন্দের মাঝেও তবুও অস্বস্তির কাঁটা কোথায় খচখচ করে, এড়িয়ে যেতে চাই। দেখতে চাই না ধবধবে সাদা নয়তো সূচারু নকশী পান্ঞ্জাবীর পাশে ছেঁড়া ফতুয়ার মলিন চাউনি, অথবা টুকটুকে শিশুর পাশে অবাক চোখে তাকানো ধুলিমাখা দেবদূত। আমাদের আনন্দ যেন ঠিক ওদের জন্য না, আমাদের জগতে ওদের প্রবেশাধিকার নেই। এটাই দুনিয়ার নিয়ম, আমরাও তো কত জায়গায় পা দিতে পারি না, এমন হাতেম তাই হলে চলে নাকি, ভেবেও ঠিক এড়ানো যায় না। ওদের জন্য আজকে শুধুই ২ টুকরো মাংস খাবার দিন। যেখানে দিনরাত গর্জন করে পাজেরো আর বিএমডব্লু, সেই তিলোত্তমা নগরেও বেশিরভাগ লোকে বছরে এক দিন মাংস খায়, হঠাৎ ভাবলে মনে হয় কোন এক দূর নরকের গল্প পড়ছি। সমস্যা হলো, নরকটা আমাদের হাতের নাগালে, অথবা আমরাই নিজের হাতে এই নরক গড়ে তুলেছি অনেক যত্নে। এই নরক থেকেই প্রতি ঈদে উত্তাল নদী পার হতে গিয়ে অতল জলের নীচে চলে যায় অনেক জীবন, কয়েকটা ছাগল আর টিভি চ্যানেলের নাকিকান্না আর ডিপফ্রিজে ঢুকে যাওয়া একটা তদন্ত রিপোর্ট দিয়ে যেসব জীবনের দাম নির্ধারণ করি আমরা। এসব জীবনের দামে ঈদ করেন আমাদের বড়বাবুরা, তাদের সিঙ্গাপুরের ঈদ শপিংয়ের দাম দিতে গিয়ে মেঘনার অতলে লক্ষ মানুষের কবর হলেই কার কি? এই গল্প লেখা হয় প্রতিদিন প্রতিবেলা, এই গল্প পড়ে আমরা একটু আনমনা হই, এই গল্প পড়ে আমরা ছোট একটা শ্বাস ফেলি, এরপরে গল্পটা ডাস্টবিনে ফেলে আমরা কাঁধটা ঝেড়ে সামনে পা বাড়াই। এভাবে পেছনে তাকালে চলে না, এভাবে পেছনে তাকানো যায় না, এভাবে তাকালে আনন্দ করা যায় না। আমাদের এই আনন্দনগরের বাসিন্দাদের কাছে এসব দুঃখী গল্পের কাগজে কিংবা আন্তর্জালে খানিক বাহবা কুড়ানো ছাড়া আর কোন মূল্য নেই, এ শহরের বাসিন্দারা নিরন্তর উড়ছে অলৌকিক এক সুখের ফানুসের পেছনে। আসুন, আমরা আজ আনন্দ করি, আজ আমাদের ঈদের দিন, আসুন, আজ আমরা সব কিছু ভুলে অতিপ্রাকৃত সেই ফানুস জ্বালাই।

যত যাই হোক, আজ তো ঈদের দিন, নষ্ট মানুষের পাপে পিষ্ট এই নষ্ট শহরের খুশির দিন।

সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29050962 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29050962 2009-11-28 23:09:37
একজন বড়ভাইকে বাঁচাতে সাহায্য চাই (আপডেট)
সেই সাহসটা হলো বুয়েটে ভর্তি হবার পর, যখন বাড়তি দু'পয়সা কামাবার ধান্দায় আমি আর আরো অনেক বন্ধুবান্ধবই কোচিংয়ে এসে জুটেছি, অন্যরা একটু এলিট, ক্লাস নেয় হবু বুয়েটিয়ানদের, আমি খাতা দেখি, পরীক্ষা নিই, মাঝে মাঝে ২-১টা ক্লাস পাই। বেশিরভাগ সময়ই এক জায়গায় বসে খাতা দেখতে হয় বলে শাম্মা ভাইয়ের সাথে সারাক্ষনই কথাবার্তা বলি, বাচাল হিসেবে আমার কুখ্যাতি আছে, সেটা কতটা বেশি ভাইয়া হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। বিরক্ত হবার কথা, কিন্তু স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে দীর্ঘ কয়েকটা মাস এই অধমের অত্যাচার সহ্য করে গেলেন। একদিন জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, চাকরিবাকরি না করে এখানে কেন? জানালেন, বাজার ভাল না, আর মালিকপক্ষের সাথে বনিবনা হয় না, ক'দিন পরপরই চাকরি ছাড়েন। মাঝে প্রথম আলোতেও নাকি ক'দিন কাজ করেছেন, সেখানেও বনেনি, এখন কোচিংয়ে পড়ান। প্রথম আলো নিয়ে তখন আমরা বেশ অবসেসড, এমন জায়গায় সুযোগ পেয়েও যে ছাড়ে, সে খানিক বেকুব টাইপেরই হবে, ধরে নিলাম।
যাই হোক, এ নিয়ে ঘাঁটালাম না, যার যার ব্যাপার।

তো এহেন শাম্মা ভাই যখন হুট করে একদিন ওমেকার চাকরি ছেড়েও হাওয়া হয়ে গেলেন, অবাক হলাম না। ওমেকার মিজান ভাই ধান্দাবাজ লোক, তাঁর সাথে ঘাড়ত্যাড়া কারো বনিবনা হবার কথা না, শাম্মা ভাইয়ের মত হলে তো কথাই নেই। ফোন করে জানলাম, ঘটনা সেরকমই। এরপর মোবাইল ছিনতাই হলো আমার, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, একমাথা কাঁচাপাকা চুলের লোকটার কথা প্রায় ভুলেই গেলাম।

সময় যায়, বুয়েটে শেষবর্ষে চলে এসেছি, বড় হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে জীবনের অনেক কিছু নিয়েই মোহভঙ্গ ঘটেছে ততদিনে। পুরকৌশলীদের চাকরির বাজার নিয়ে যেমন, তেমনি প্রথম আলোর মত সুশীলদের নিয়ে, শাম্মা ভাইয়ের আপাতরূঢ় কথাগুলোর অর্থ বুঝতে শিখেছি অনেক দাম দিয়ে। একদিন আনমনে ক্যাম্পাসে হাঁটছি, হঠাৎ একরাশ কাঁচাপাকা চুল দেখে দৌড় দিলাম, ঠিক সেরকমই আছেন, শাম্মা ভাই কিন্তু দেখেই চিনলেন, কথা শুনে মনে হলো, মাত্রই গতকাল দেখা হয়েছে। এবারে বেশ স্থির হয়ে বসেছেন, একটা স্থায়ী চাকরিও হয়েছে, মাস্টার্স করেন বুয়েটে, স্বভাব অনুযায়ী এখানেও এর মাঝেই একবার একটা ছেড়ে আরেকটায় ঢুকেছেন। কথাবার্তা বলে সান্ত্বনা দিলেন, তাঁর যখন গতি হয়েছে আমাদেরও যে হবে এনিয়ে কোন সন্দেহ নাকি তাঁর নেই। ঠিক আগের মানুষটাই আছেন, দেখে ভাল লাগলো খুব, একটা সময় পাখি ঘরে ফেরেই।

যোগাযোগ হয়েছে এরপরে নিয়মিতই, অফিসেও গেছি, কিন্তু গত প্রায় ৬ মাস ব্যক্তিগত ব্যস্ততার জন্যই কোন যোগাযোগ নেই। গতকালকে ফেসবুকে হঠাৎ একটা গ্রুপ থেকে মেইল, সাধারণত এসব মেইল দেখার আগেই ডিলিট করে দেই, প্রথম শব্দটাই "শাম্মা, সিভিল ৯৫" দেখে ঢুকলাম। যা দেখলাম তার জন্য তৈরি ছিলাম না, গত ২১ অক্টোবর, বুধবার, মালিবাগের কাছে শাম্মা ভাই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়েছেন। বেঁচে গেছেন, কিন্তু ডান পা খানা ৩ টুকরো হয়ে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি অপারেশন করতে হবে যদি পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচাতে হয়, কিন্তু অপারেশনের খরচ প্রায় ২০ লাখ টাকা, যেতে হবে ব্যাঙ্কক। দেখার পর মাথা এলোমেলো হয়ে গেল, ওরকম প্রাণবন্ত হাসিখুশি একজন মানুষকে কিছুতেই হাসপাতালের বেডে অথবা পঙ্গু হিসেবে কল্পনা করতে পারলাম না, আমি নিশ্চিত যারা একবার হলেও শাম্মা ভাইয়ের সাথে কথা বলেছে তারা দুঃস্বপ্নেও সেটা কল্পনা করতে পারবে না।

মেইলটার সাথে একটা অ্যাকাউন্ট নাম্বার আর মোবাইল নাম্বার দেয়া ছিল, তাড়াতাড়ি পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ করে জানা গেল যা দেখছি সেটা দুঃস্বপ্ন না, নির্মম বাস্তব। মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ এক লোক রাস্তায় নেমে আসে, তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, মোটরবাইকটা তাঁর ডানপায়ের উপর পড়ে হাড় টুকরো করে দিয়েছে। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে আছেন, ডাক্তাররা
জানিয়েছেন, বাংলাদেশে এই ধরণের অপারেশনের ব্যবস্থা নেই, ৫-৬ দিনের মাঝে ব্যাঙ্ককে নিয়ে অপারেশন করতে হবে। সময় খুবই কম, দেরি হলে আজীবন এই ভাঙা পা নিয়ে থাকতে হবে তাঁকে। বন্ধুরা চেষ্টা করছেন, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি এত টাকার ব্যবস্থা করা যে কারো জন্যই কঠিন ব্যাপার। প্রাথমিক খরচ অর্থাৎ বাইরে যাওয়া, ভর্তি, ওষুধপত্র হিসেবেই ৮ লাখ টাকা লাগবে, কয়েকদিনের মাঝেই। বুয়েটে যাই না অনেকদিন, কিছু করার ক্ষমতা নেই বললেই চলে, ব্যাচমেটরাও বাইরে, যে ক'জন চেনা লোক আছে জানালাম, কয়েকজন জুনিয়রকেও জানানো গেল। ব্লগার অদ্রোহ আর বোহেমিয়ানকে যখন বললাম, জানালো যথাসাধ্য চেষ্টা করবে, তবে ব্লগে একটা পোস্ট দিয়ে যেন জানাই, নিশ্চয়ই কারো না কারো সাহায্য পাওয়া যাবে।

কথা শুনে মনে হলো, আগেও এটা ভাবলে পারতাম। আমি ক্ষুদ্র মানুষ হতে পারি, ক্ষমতা সীমিত হতে পারি, কিন্তু সামহোয়্যারইন ব্লগের ২০ হাজার ব্লগারের মাঝে অনেক অনেক বড় মনের মানুষ আছেন, সবসময়ই সেটার প্রমাণ পেয়েছি। আমরা ক'জন সামান্য মানুষ যদি তাদের বড় ভাইয়ের জন্য হাত পেতে দাঁড়াই, আমি নিশ্চিতভাবে জানি তাঁরা আমাদের ফিরিয়ে দেবেন না। খুব বেশি কিছু করতে হবে না, আমাদের যা সামর্থ্য সেই অনুযায়ী সামান্য দিলেও কিন্তু হয়ে যায়, ২০ হাজার মানুষ ১০০ টাকা করে দিলেও ২০ লাখ টাকা হয়। কারো এক প্যাকেট সিগারেটের দাম, কারো এক বেলা ঘোরাঘুরির টাকা, কারো আড্ডার বাজেট, কারো একটা টিশার্ট কেনার টাকা, কারো এক বেলা ব্যুফে খাবার টাকাটা যদি উৎসর্গ করি, একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেয়া যায় তাঁর বিনিময়ে, প্রাপ্তির তুলনায় ব্যয়টা তখন খুব সামান্য মনে হয় না?

যতদিন আমরা ভার্সিটিতে ছিলাম, কোন কিছু হলে মাঠে নেমেছি। সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছি অনেক সহৃদয় বন্ধুকে। আজকে ক্যাম্পাস থেকে অনেক দূরে, কিন্তু আমরা জানি, মৃত্যু আর অসহায়তার সামনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা যুদ্ধ করবো, আমাদের সহযোদ্ধার অভাব হবে না। সামহোয়্যারের ব্লগাররা, কোন দয়া নয়, শুধু একজন মানুষ যখন পঙ্গুত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন, তাঁর সাথে কাঁধে কাঁধ মেলাতে আপনারাও এগিয়ে আসুন, আপনাদের সহৃদয় হাত বাড়িয়ে দিন একজন যোদ্ধার উঠে দাঁড়ানোর জন্য। আমি জানি, আমরা জানি, আপনারা পিছিয়ে যাবেন না, মানুষ কখনো পিছিয়ে যায় না, মানুষ হারে না, হারতে পারে না।

যারা দেওয়ান আইনুল হক শাম্মাকে বাঁচানোর লড়াইয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চান, তাঁদের জন্য নিচের ইস্টার্ন ব্যাঙ্কে শাম্মা ভাইয়ের বন্ধু রেশাদ ভাইয়ের অ্যাকাউন্ট নাম্বার ও মোবাইল নম্বর:

Kazi Reshad Islam
A/C no- 101-102-12687
Eastern Bank Ltd
Dhanmondi Branch, Dhaka-1205
Mobile no - +880 1819 202020
মেইল--

যারা আমেরিকা বা অন্যান্য দেশ থেকে টাকা পাঠাতে চান, তারা moneygram বা
Western Union এর মাধ্যমে পাঠাতে পারেন। পাঠানোর পরে কোড নাম্বারটা রেশাদ ভাইয়ের কাছে জানালেই তিনি তুলে নেবার ব্যবস্থা করবেন, অথবা যারা আমেরিকায় আছেন তারা এখানেও যোগাযোগ করতে পারেন:

Jony কন্টাক্ট নাম্বার--- (405 429 9354)

অস্ট্রেলিয়া থেকে কেউ ডোনেশন দিতে চাইলে তাঁদের জন্য:

Australia:
BSB: 012224, AC: 500696251
Account Name: S M Rubayet Ferdous Robin
Mob: 0419740418

রামপুরা বা আশপাশের এলাকার ব্লগাররা যদি কোন সাহায্য করতে চান, আমার এই নম্বরে ফোন করলে, অথবা মেইল করলে নিজ দায়িত্বে সেটা পৌঁছানোর চেষ্টা করবো।

01190-535292



যারা বুয়েটে টাকা জমা দিতে চান, তাঁরা দয়া করে ব্লগার বোহেমিয়ান কথকতার (CSE, Batch 05) সাথে যোগাযোগ করুন। কন্টাক্ট নাম্বার:

01733-731856


ব্লগাররা, সবার কাছেই হাত পাতছি, খুব তাড়াতাড়ি সাহায্য দরকার, দয়া করে আমাদের ফিরিয়ে দেবেন না।

আপডেট: আজকে বিকালে রেশাদ ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে, শাম্মা ভাইকে ইনটেনসিভ কেয়ার থেকে সাধারণ কেবিনে নেয়া হয়েছে। তাঁর পায়ের হাড়ের টুকরোগুলো সব খুঁজে না পাওয়াতে হিপ থেকে হাড় নিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হয়েছিল, তবে আশা করা যায় সেগুলো জোড়া লেগে যাবে, গতকাল রক্তপাতও বন্ধ হয়েছে। কিন্তু মূল সমস্যা হলো তাঁর ডান পা বাঁকা করা যাবে না, ডাক্তার আগরওয়ালের কথা অনুযায়ী, টানা এক থেকে দেড় বছর ফোর্স ফিজিওথেরাপি দিলে সম্ভবত তিনি পা ৬০ ডিগ্রির মত বাঁকা করতে পারবেন, এমনকি স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতেও ঐরকমই সময় লাগবে। তিন থেকে ৫ বছরের মাঝে, হয়তো পুরোপুরি বাঁকা করতেও পারেন। এবার কঠিন দিকটা বলি, প্রাথমিক অপারেশনের খরচটা পাওয়া গেছে মোটামুটি, কিন্তু অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই ফিজিওথেরাপি দেড় বছর চালাতেও অনেক টাকার প্রয়োজন, বর্তমানে ৮ লাখ টাকার কাছাকাছি আছে, কিন্তু কমপক্ষে আরো আট লাখ লাগবেই। যেহেতু ৩ মাস পর থেকে তাঁর সরকারি চাকরি থেকেও বেতন বন্ধ হয়ে যাবে, সেক্ষেত্রে জীবিকা চালাতে পারলেও ফিজিওথেরাপির খরচটা চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। কাজেই আমাদের সামনে অনেকটা কাজই বাকি রয়ে গেছে, শাম্মা ভাইকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আরো অনেক কাজই করতে হবে। এখানে জানিয়ে রাখি, তিনি আছেন অ্যাপোলো হাসপাতালের ৪৪৫২ নম্বর কেবিনে, ভিজিটিং আওয়ার বিকাল ৫টা থেকে ৭টা। ব্লগারদের মাঝে কয়েকজন এর মাঝেই ব্যক্তিগতভাবে ব্যাঙ্কে টাকা দিয়েছেন, আমার হাতেও পৌঁছে দিয়েছেন ২ জন, তাঁদের সহৃদয়তা আমাদের সবাইকে সাহস যোগাচ্ছে। আশা করছি বোহেমিয়ান এবং অদ্রোহ বুয়েটে ফান্ড তোলার জন্য কিছু একটা উদ্যোগ নেবে। নভেম্বর মাসেও যদি কেউ সাহায্য করতে চান, ইস্টার্ন ব্যাঙ্কের যে কোন শাখাতে এই অ্যাকাউন্ট নম্বরের উদ্দেশ্যে টাকাটা জমা দিয়ে দিলেই হবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29033032 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29033032 2009-10-27 23:34:10
মানুষ
কাজেই এখন বাস কাউন্টারের আশপাশে ঘুরে ঘুরে ভাবছি রাতটা থাকবো নাকি ঢাকার বাস ধরবো, নাকি শাহজালালের মাজারেই রাত পার করার চেষ্টা করবো। একবার এগোই একবার পিছাই, এরমাঝেই মোবাইল বের করে দেখে ফেলেছি ১২টা বাজে প্রায়। এমন সময় দেখি কানে মোবাইল নিয়ে কথা বলতে বলতে এক ছেলে বের হচ্ছে, বয়স আমার চেয়ে কিছু বেশিই হবে, ফর্সা, চেহারা দেখে ভরসা হলো যে কিছু জিজ্ঞেস করলে ধাতানি দেবে না। আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে পাকড়াও করলাম, জানালাম যে মাধবকুণ্ড গিয়েছিলাম, ফিরতে রাত হয়ে গেছে, কোন হোটেলে রুম পাচ্ছি না। একা মাধবকুণ্ডে গিয়েছিলাম সেটা বিশ্বাস করা মুশকিল, কি ভাবলো কে জানে, তবে খানিক চিন্তাভাবনা করে জানালো, তা পরিচিত হোটেল আছে একটা, ভালই মোটামুটি, কম ভাড়াতেই থাকতে পারবো। সেদিকেই নাকি যাচ্ছে, চাইলে আমাকে নামিয়ে একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারে। মনে মনে ভাবলাম, নিলে তো নেবে মোবাইলটা, বড়জোর কয়টা টাকা, তা এখানে থাকলেও কেউ না কেউ নেবে, উঠেই পড়ি। আল্লাহর নামে রওনা দিলাম। পথে জানলাম, নাম তামীম, সিলেটের বেশ বনেদী পরিবারের ছেলে, অনেকেই নাকি চেনে। ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, ঢাকায়ও আছে, প্রায়ই আসা হয়। গল্প করতে করতেই হোটেলে পৌঁছে গেলাম, তালতলা এলাকায়, ম্যানেজার বেশ খাতির করে অর্ধেক ভাড়ায় রুম দিয়ে দিল, যাওয়ার সময় ফোন নম্বর দিয়ে বলে গেলেন কোন সমস্যা হলেই যেন তখনই জানাই। ধন্যবাদ কিভাবে দেয়া যায় ভাবতে ভাবতেই হাওয়া, আমি আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে উপরওয়ালার শুকরিয়া করে ঘুম, একদিনের জন্য অনেক বেশিই হয়ে গেছে।

তামীম ভাইয়ের কল্যাণে মহাঝামেলা থেকে রক্ষা পেয়ে পরদিন জোশ বেড়ে গেল, একা একাই জাফলং আর সিলেট ঘুরে বীরদর্পে ঢাকা ফিরলাম। অবাক ব্যাপার, ফেরার দিনই আবার ফোন করে খোঁজ নিলেন ভদ্রলোক, মা তাঁকে জানালেন, তাঁর এই মহাবেকুব পুত্রকে বিপদের সময় সাহায্য করার জন্য তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমি নিজে চুপ থাকলাম, কখনো কখনো ধন্যবাদ দিলে অমর্যাদাই করা হয়, কিছু ঋণ শোধ করার ক্ষমতা বিধাতা মানুষকে দেননি।

অতীত থেকে একটু বর্তমানে ফিরি। গতকালকের কথা, সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরেছি, নতুন চাকরি, চরম খাটুনি, সাথে সারাদিন এর-ওর সাথে খ্যাচম্যাচ লেগেই আছে, প্রায় বিধ্বস্ত অবস্থা। ফিরে শুনলাম, সকালবেলা বাবা অফিসের দিকে গিয়ে এখনো ফেরেননি। সেটা মাঝে মাঝেই হয়, মাথা ঘামানোর অবস্থা নেই, কিন্তু ৭টার পরেও না ফেরায় দুশ্চিন্তা শুরু করতেই হলো। এরমাঝেই হঠাৎ মোবাইলে ফোন, বাবার নম্বর থেকে, ধরতেই একটা অপরিচিত গলা শুধালো, আপনার নাম অমুক? বললাম হ্যাঁ, আবার প্রশ্ন, এটা যার নম্বর তিনি কে? বললাম আমার বাবা। সাথে সাথেই জানালেন, বাবাকে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাঙ্ক হাসপাতালে নেয়া হয়েছে, মৌচাকের কাছে নাকি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, সম্ভবত হিট স্ট্রোক জাতীয় কিছু, তিনিসহ আরো ২জন নিয়ে এসেছেন, আমি এখনি যেন যাই। মাথাটা ওলোটপালট হয়ে গেল, অনুরোধ করলাম তিনি যেন কষ্ট করে অপেক্ষা করেন, এখুনি রওনা হচ্ছি। অসহনীয় উদ্বেগ নিয়ে জ্যামের মাঝে এক ঘণ্টা লাগিয়ে হাসপাতালে পৌঁছালাম, জরুরী বিভাগে গিয়ে দেখি একজন দাড়িওয়ালা লোকের সাথে এক ভদ্রমহিলা, সাথে আমাদের বয়সী একটা ছেলে। বাবাকে দেখালেন, অক্সিজেন দিয়ে রাখা, তখনো জ্ঞান ফেরেনি, ডাক্তার জানিয়েছেন সিটিস্ক্যান করাতে হবে ব্রেম হ্যামারেজ হয়েছে কিনা দেখার জন্য, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন তারা, বললেই করা হবে।

কথা বলারও সময় নেই, সাথে সাথে ডাক্তারের সাথে কথা বলে স্ক্যানিং মেশিনে ঢোকানো হলো উপরে নিয়ে, এর মাঝেই জানলাম দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের নাম রকিবুল ইসলাম, ভদ্রমহিলার নাম শানু, আর ছেলেটা পদ্মা ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের একজন কর্মচারী। কেউই কাউকে চেনেন না, মৌচাক মোড়ে বাবাকে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যেতে দেখে প্রথমে রকিব ভাই ধরে পদ্মাতে নিয়ে আসেন, শানু আপা এসেছিলেন তাঁর বাবার পরীক্ষা করাতে, একা রকিব ভাই সামলাতে পারছেন না দেখে নিজের বাবাকে বিদায় করে শানু আপা এগিয়ে আসেন, এরপর থেকেই আছেন। পদ্মার ঐ ছেলেটাকে নিয়ে ৩ জন এসেছেন হাসপাতালে, জরুরী বিভাগে ভর্তি করেছেন ছোটাছুটি করে, অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনেছেন, ডাক্তার আর কর্মচারীদের বলেকয়ে অক্সিজেন আর স্যালাইন দেবার ব্যবস্থা করেছেন, এবং বাবার মোবাইল থেকে ১০-১৫টা জায়গায় ফোন করে অবশেষে আমাকে খুঁজে পেয়েছেন, এবং এরপরেও আছেন আমাদের সাথে।

কথা শুনতে শুনতেই সিটিস্ক্যানের ফলাফল পাওয়া গেল, ভাল খবর হলো রক্তক্ষরণ হয়নি, তবে জরুরীবিভাগের চ্যাঙরা ডাক্তার ঝুঁকিতে নেই, পাঠালেন উপরে বুড়ো ডাক্তারের কাছে। আবার স্ট্রেচার নিয়ে ছোটা, ফর্ম পূরণ করা, আমি নিজেকে ঠাণ্ডা মাথার মানুষ দাবী করতে পারি না, রকিব ভাই একাই সব করলেন, শানু আপা তখন মায়ের সাথে। বুড়ো ডাক্তার জানালেন, একদিন হাসপাতালে রাখলে ভাল হয়, ওষুধপত্র দিয়ে দিচ্ছেন। ভর্তি করাতে গিয়ে শুনি, সিট নেই, হাতেপায়ে ধরেও লাভ হলো না। আমার হতভম্ব মুখ দেখে আবারো রকিব ভাই ছোটাছুটি করে অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করলেন, বুড়োর কাছ থেকে বারাকাহ জেনারেল হাসপাতালে একটা কেবিন দেয়ার চিঠিও লেখালেন। সব নিয়ে যখন আমরা রাজারবাগের পথে, রাত তখন সাড়ে দশটা।

বারাকাহ হাসপাতালে যেতে যেতেই বাবার জ্ঞান ফিরলো, কথাও বললেন। সেখানে গিয়ে দেখি, ওটাকে হাসপাতাল না বলে খোঁয়াড় বলাই ভাল, অব্যবস্থাপনা আর নোংরামির চূড়ান্ত উদাহরণ। কেবিন দেখে মনে হলো, এখানে থাকলে সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে যাবে। এরমাঝেই জরুরী বিভাগের ডাক্তার দেখে বললেন, জ্ঞান যখন ফিরেছে আর মস্তিষ্কে যেহেতু রক্তক্ষরণ হয়নি, বাড়ি নিয়ে যেতে পারি, এমনিতেও এখানে আর তেমন কোন সেবা পাবো না। পরামর্শের জন্য তাকালাম ২ হিতৈষীর দিকে, দু'জনই বাড়ি নেবার জন্য মত দিলেন। এরমাঝেই এক আত্মীয় চলে এসেছেন, বাসায় নেবার জন্য লোক পাচ্ছি, ২ জন বিদায় চাইলেন। এবারও আর ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা জানানোর চেষ্টা করলাম না, এমন মানুষদের ধন্যবাদ জানানোর মত মানুষ এখনো হয়ে উঠতে পারিনি।

কথা অনেক বাড়িয়ে ফেলেছি, ২-১টা কথা বলেই ইতি টানি। মায়ের কাছে জানলাম, রকিব ভাই বিকম পাশ করেছেন, আগে কোন একটা ওষুধ কোম্পানিতে ছিলেন, বিদেশ যাবার চেষ্টা করে টাকাপয়সা অনেক গেছে, এখন কিছু করেন না, ছোটখাটো কিছু করা যায় কিনা চেষ্টা করছেন। আমার কুটিল মনে প্রশ্ন জাগলো, বাবার পকেটে মোবাইল ছিল, সাড়ে আট হাজার টাকা ছিল, একজন মানুষ যার টাকার প্রয়োজন, কিভাবে সবকিছুকে উপেক্ষা করে, এমনকি অজ্ঞান বা মৃতপ্রায় রোগী বহনে কত বেশি ঝুঁকি সেটা জেনেও এভাবে না খেয়ে না ঘুমিয়ে একজন অপরিচিত মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে কিভাবে? শানু আপার কথা ভেবে মনে হলো, যেখানে সবাই শুধু দায়িত্ব এড়াতে চায়, একজন সাধারণ মানুষ তখন অতিমানবী হয়ে ওঠেন কোন শক্তিতে? খানিক পরে হাল ছেড়ে দিলাম, আমার মত ক্ষুদ্র নিচুমনের মানুষের পক্ষে সত্যিকারের মানুষের কাছাকাছি হয়ে ওঠা কখনোই হবেনা। রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষ দেখে যে উটকো ঝামেলা ভেবে ঝটপট কেটে পড়ি, সে কিভাবে খাঁটি মানুষের মন বুঝবে?

মাঝে মাঝেই জীবনের দিকে আর মানুষের দিকে হতাশ হয়ে মানুষের দিকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি, এমন একটা পেশায় আছি যেখানে প্রতিনিয়তই মানুষের নীচতা, শঠতা, ভণ্ডামি দেখতে হয়, পৃথিবীতে মানুষ নামের জীবটার খুব অভাব বোধ করি তখন। তামীম ভাই, রকিব ভাই, শানু আপা, আর নাম না জানা পদ্মার সেই কর্মী-- আপনাদের যদি জীবনরক্ষার কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই, সে হবে আপনাদের অনেক বেশি ছোট করা, বরং কৃতজ্ঞতা জানাই এই ক্ষুদ্র মানুষের নিজেকে ভাল মানুষ ভাবার অহংকার ভেঙে দেয়ার জন্য, নিজের ক্ষুদ্রতা আরেকবার দেখে নেবার সুযোগ দেয়ার জন্য, আর মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকে যাওয়াও ভাল সেটা আরো একবার ভাবানোর জন্য, ধরার বুকে স্রষ্টার করুণাধারা বারবার অনুভব করানোর জন্য।

স্রষ্টার পৃথিবীর আনাচেকানাচে যেসব "মানুষ" আমাদের প্রতিদিন মানুষ হতে শেখাচ্ছেন, তাঁদের প্রতি এই অধমের নতমস্তকে অভিবাদন এবং কৃতজ্ঞতা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29026569 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29026569 2009-10-16 01:07:18
আমাজনের মৃত্যুদূত--২
টারান্টুলা



এই মাকড়সার নাম শোনেনি এমন লোক পাওয়া মুশকিল। যাদের মাকড়সা ভীতি আছে, তাদের না দেখাই ভাল, নিজে খানিকটা মাকড়সা ভয় পাই বলেই বলছি, রোমশ আর বিশাল আকারের এই প্রাণীটার মত বীভৎস কিছু আমার জীবনে খুব বেশি দেখিনি। ছোটখাটো কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে ব্যাঙ, এমনকি ইঁদুর পর্যন্ত সাবড়ে দেয় জাল না বোনা এই মাকড়সা, ঘাপটি মেরে থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে
সামনের দু'টো দাঁত দিয়ে বিষ ঢেলে--যদিও মানুষের জন্য সেটা খুব বিপজ্জনক নয়-- আস্তে আস্তে সাবাড় করে শিকারকে। বড় আকারের একটা টারান্টুলার ব্যাস ৩০ সেন্টিমিটার বা ১ ফুট পর্যন্তও হতে পারে।

ব্রাজিল ওয়ান্ডারার্স স্পাইডার



আকারে টারান্টুলার অর্ধেক হলেও মানুষের জন্য এই মাকড়সা অনেক বেশি ভয়ংকর, কারণ টারান্টুলার বিষ নেই, ওয়ান্ডারার্সের আছে। যাযাবরের মতই ঘুরে বেড়ায় বলে এর এই নাম, কখনোই বাসা বাঁধে না কোথাও, শিকারকে কাবু করে বিষ দিয়ে, চিকিৎসা দিতে দেরি হলে যাতে মানুষেরও মৃত্যু হতে পারে। দেখতে যদিও অতটা ভয়ংকর নয়, তারপরেও ব্রাজিল থেকে আমদানী করা কলা আর ফলমূলের বাক্স খোলার সময় যথেষ্ট সাবধান থাকে লোকজন, যেকোন সময় একটা ওয়ান্ডারার্স বেড়িয়ে এসে কামড়ে দিলে স্পাইডারম্যান হবার বদলে ডেডম্যান হয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশি কিনা!

ল্যান্সহেড ভাইপার



বিষের কথাই যদি আসে, তো সর্পদেবকে আনতেই হবে। আর আমাজনের বিষাক্ত সাপগুলোর মাঝে উপরের দিকে থাকবে ল্যান্সহেড ভাইপার। ভাইপারের অন্যান্য সব প্রজাতির মতই অত্যন্ত বিষাক্ত, হিংস্র এবং বদমেজাজী। লম্বায় ৭৫ থেকে ১২৫ সেন্টিমিটার, অর্থাৎ ৫ ফিট পর্যন্তও হতে পারে। বাদামী, ডোরাকাটা, ব্রোন্ঞ্জ বা সোনালী রঙেরও হয়। যদিও মাটিতেই থাকে, তবে দরকারে গাছেও উঠতে
পারে,পানিতেও ভাল সাঁতারু। নিশাচর হলেও খাদ্যের সন্ধানে দিনেও বের হয়। ছোটখাটো ইঁদুর জাতীয় প্রাণী এদের খাবার, এগুলোর সন্ধানে ঘুরে বেড়ায় কফির বা কলার বাগানে, বোঝাই যায় না কোথায় ঘাপটি মেরে আছে। সামান্য বিরক্ত হলেই কামড়ে দেয়, মাত্র ৬২ মিলিগ্রাম বিষই যথেষ্ট মানুষের মৃত্যুর জন্য। প্রথমে আক্রান্ত স্থানের টিস্যুগুলোকে মেরে ফেলে এই বিষ, রক্তবাহী শিরার মাধ্যমে দ্রুতই ফুসফুসে পৌঁছে গিয়ে শ্বাস নেয়া বন্ধ করে দেয়। যদিও চিকিৎসা আছে, তবে সেটা করতে হয় দ্রুত, আমাজনের মত জায়গায় সেটা খুব তাড়াতাড়ি পাওয়া যায় না বলে দক্ষিন আমেরিকার অন্য যেকোন সরিসৃপের তুলনায় এর আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর হার বেশি।

বুশমাস্টার



বিষের দিক থেকে বুশমাস্টারও কম যায় না। বাদামী-কালো এই সাপটি ভাইপার গোত্রের বৃহত্তম, এবং একই সাথে পশ্চিম গোলার্ধেরও দীর্ঘতম বিষধর সাপ। লম্বায় হয় সাধারণত ৬.৫ থেকে ৮.২৫ ফিট, তবে ১০ ফিট পর্যন্তও দেখা গেছে। কুণ্ডলি পাকিয়ে পড়ে থাকা এই সাপ বেশ খানিকটা দূর থেকেই ছোবল মেরে বসে, একেকবারে কয়েকটা ছোবলও দিতে পারে। একে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে এর অস্বাভাবিক
ধৈর্য্য, শিকারের গন্ধ শুঁকে এর যাতায়াতের পথটা খুঁজে নিয়ে এরপর সেই পথে ঘাপটিমেরে অপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো দিন পার হয়ে যায়। তারপরে বাগে পেলেই খতম।

বোয়া কন্সট্রিকটর



বিষাক্ত সাপদের ছেড়ে এবার বিষহীন তবে শক্তিমানদের দিকে চোখ ফেরানো যাক। এখানে প্রথমেই নাম আসে বোয়া কন্সট্রিক্টরের। এই পরিবারের সব ক'টা সাপকেই বোয়া কন্সট্রিক্টর বলে, তবে প্রচলিত অর্থে এই নামে যে সাপটাকে আমরা বুঝে থাকি সেটার প্রকৃত নাম বোয়া কন্সট্রিক্টর কন্সট্রিক্টর। ১৩ ফিট পর্যন্ত লম্বা, প্রচণ্ড শক্তিশালী এই সাপ শিকারকে মারে বিষ দিয়ে নয়, বরং জড়িয়ে ধরে চাপ দিয়ে পিষে, এর জন্যই এর নাম কন্সট্রিক্টর। খাদ্য হলো ইঁদুর জাতীয় প্রাণী আর পেকারির মত ছোটখাটো জন্তু, সাথে পাখি। মূলত নিশাচর, থাকে মাটিতে, তবে প্রথম বয়সে গাছেও উঠতে পারে। বাদামী বা ধুসর রঙের এই সাপ এমনিতে মোটামুটি শান্ত, বিরক্ত করা না হলে আক্রমণও করে না। বিরক্ত করলে কামড়ে দেয়, তবে বিষাক্ত নয়, এমনিতে মানুষ মারার কোন রেকর্ডও নেই। এই শান্ত স্বভাবের জন্যই একে পোষও মানানো যায়, পোষা সাপ হিসেবে ইউরোপ আমেরিকাতে এর বেশ কদরও আছে, কদর আছে এর চামড়ার জন্যও, ফলে শিকারীদের বড় লক্ষ্য। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৩ এর মাঝে শুধু আমেরিকাতেই রপ্তানি হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার বোয়া, ফলে এর অস্তিত্বই বিপন্ন হতে বসেছিল। বর্তমানে অবশ্য এই সাপ খামার করেও জন্মানো হয়, ফলে বনের গুলো বেঁচে গেছে খানিকটা।

কাঁকড়া বিছা বা স্করপিয়ন



আবারো একটু ছোটখাটো প্রাণীর দিকে ফেরা যাক, যদিও কাঁকড়া বিছা বা স্করপিয়নকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। কালো রঙের, আর লেজের আগায় বাঁকানো হুল লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো এই ছোটখাটো প্রাণীটা যেমনই বদমেজাজী তেমনই বিপজ্জনক। যেহেতু লোকালয়ের আশপাশে ঘুরাঘুরি করে, মানুষজন প্রায়ই কামড় খায় এর, সময়মত চিকিৎসা না করলে এই কামড় মৃত্যুরও কারণ হতে পারে।

সৈনিক পিঁপড়া



তবে এই মৃত্যুদূত সাপ বা স্করপিয়নকে যদি জিজ্ঞেস করা যায় তাদের কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী কি, নিশ্চিতভাবেই বিস্ময়কর একটা জবাব দেবে তারা, সেটার নাম সৈনিক পিঁপড়া। সাধারণ পিঁপড়ার চেয়েও কয়েকগুণ বড়, তবে সেটার জন্য নয়, বরং মাংসাশী এই পিঁপড়ার ঝাঁক কুখ্যাত তাদের শিকারী স্বভাব এবং একগুঁয়ে চলার জন্য। সৈনিকদের মতই এরা কোন বাধার সামনে থামে না, বরং
সামনে যা পায় তাকে মেরেকেটে সাফ করে, বা এদের বেলায় বলা যায়, খেয়েদেয়ে সাফ করে চলে যাওয়াই নিয়ম। একেকটা সৈনিক পিঁপড়ার কলোনিতে ১০ লাখ থেকে ২ কোটির উপরে পিঁপড়া থাকতে পারে,এবং পুরো কলোনি মোটামুটি একই সাথে ঘুরে বেড়ায়, কোথাও স্থায়ী বাসা বাঁধে না। পথ দেখায় স্কাউট পিঁপড়া, তার দেখানো পথে খাদ্যকে অনুসরণ করে যায় বাকিগুলো। একেকটা সৈনিক পিঁপড়ার সারি মাইল পর্যন্ত লম্বা হয়, কামড়ে খানিকটা বিষ আছে, এবং যে শিকারই সামনে পেয়ে যাক, হোক সেটা সাপ বা কুমীর বা ছোট জন্তু বা মানুষ, হাজার হাজর পিঁপড়া তার উপর ঝাঁপিয়ে হুল ফুটিয়ে দিতে থাকে আর কামড়ে মাংস তুলে নিতে থাকে, ফলে কয়েক মিনিট পরেই শিকারের কঙ্কাল ছাড়া কোন কিছু অবশিষ্ট থাকে না। মাইলখানেক লম্বা এই কোটি পিঁপড়ার সাথে লড়াই চলে না, ফলে যখনই সৈনিক পিঁপড়ার দল আমাজনের কোন এলাকার উপর দিয়ে তাদের "রেইড" শুরু করে, মানুষ থেকে বড়সড় বাঘ পর্যন্ত তাদের পথ ছেড়ে বাপ বাপ করে সরে পড়ে, এমনকি কোন গ্রামের উপর দিয়ে গেলে সেখানকার বাসিন্দারা পর্যন্ত গ্রাম খালি করে কেটে পড়ে, যতক্ষণ না পিঁপড়ার ঝাঁক সরে না যায়, ফিরে এসে দেখে পুরো গ্রামের পোকামাকড় ইঁদুর-বাদর খেয়ে সাফ।

অ্যানাকোন্ডা



অ্যানাকোন্ডা!! "একটা ভয়ংকর সাপ"-- এই কথা বললে একে অপমানই করা হয়। অ্যানাকোন্ডা নামটা শুনলেই ভয়, আতঙ্ক, বিস্ময় মেশানো একটা বিচিত্র অনুভূতি জেগে ওঠে যে কারো মনে, আমাজনের অধিবাসীদের কাছে অবশ্য সেটা বিশুদ্ধ আতঙ্ক। এই একটা প্রাণীকে নিয়ে যত উপকথা আর ভয়ংকর গুজব আছে, পৃথিবীর আর কোন প্রাণীই তার ধারেকাছেও যাবে না, অ্যানাকোন্ডা যেন এক অশরীরি কিংবদন্তী। নিঃশব্দ চলাচল, দৈর্ঘ্য, অস্বাভাবিক শক্তি আর অসামাজিক হিংস্র স্বভাব নিয়ে অ্যানাকোন্ডা আমাজনের বাসিন্দাদের কাছে অশুভ এক প্রেতাত্মারই নামান্তর। এর বাসস্থানটাও তার জন্য মানানসই, নদী বা জলাভূমির ঘোলা পানিতে বা নদীর নিচের কোন জলজ আগাছা ঘেরা খাদে, দিনের পর দিন লুকিয়ে থাকতে পারে সেখানে। ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে শিকারের, পানির নিচে দম না নিয়ে থাকতে পারে ১০ মিনিটেরও বেশি, মাথাটা সামান্য জাগিয়ে শিকারের সন্ধানে সাঁতরে বেড়ায়, বেশিরভাগ সময়েই তাই একদম গায়ের কাছে এসে পড়লেও শিকার টেরই পায় না মৃত্যু তার কত কাছে। অন্য সাপের তুলনায় ব্যতিক্রম, অ্যানাকোন্ডার দাঁত ২ সারিতে বসানো। ঝাঁপিয়ে পড়ার মুহূর্তেই কামড়ে ধরে শিকারকে যাতে ছুটে না যায়, এরপর বোয়া গোষ্ঠীর এই সাপ
(অ্যানাকোন্ডার আরেক নাম ওয়াটার বোয়া) শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে, যতবার আক্রান্ত প্রাণী শ্বাস ছাড়ে ততবারই বাঁধন আরো শক্ত করে শ্বাস নেয়া অসম্ভব করে দেয়, মৃত শিকারকে এরপরে আস্তে আস্তে গিলে খায়। সাধারনত এর খাবার ক্যাপিবারা বা পেকারির মত মাঝারি আকারের প্রাণী, মানুষ খাওয়ার যতই গুজব থাকুক এখনো তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে মানুষ মারার রেকর্ড অনেকই আছে। কিংবদন্তীতে যদিও এই সাপের দৈর্ঘ্য মাইল ছাড়িয়েছে, তবে এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আকারের অ্যানাকোন্ডা যেটা ধরা পড়েছে তার দৈর্ঘ্য ৩০ ফিট। তবে যে বৈশিষ্ট্য এমনকি বাস্তবেও অ্যানাকোন্ডাকে অদ্বিতীয় ভয়ঙ্কর করে তুলেছে তা হলো, অ্যানাকোন্ডা কখনোই পোষ মানে না, কোন ভাবেই না। মহাবনের মহাভয়ঙ্করের উপযুক্ত স্বভাবই বটে!

অনেক ভয়ঙ্কর প্রাণীর বর্ণনা হলো, যার সবই শুধু আমাজনের সম্পদ। সুন্দর প্রাণীগুলো আপাতত বাদ গেল, অবশ্য সেগুলোর সব এখনো আবিষ্কৃতও হয়নি, এই মহাকাশ যুগেও আমাজন তার অপার রহস্যের সব মানুষের কাছে প্রকাশ করেনি। কিন্তু মানুষ বড় ভয়ঙ্কর, এমনকি আমাজনের হিংস্রতম জন্তুও সম্ভবত মানুষের চেয়ে অনেক নিরীহ। পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের খাদ্যের যোগানদাতা আমাজনকেও তাই পড়তে হয় চোরাশিকারী আর গাছকাটার লোলুপ থাবার মুখে, উজাড় হয় মহা অরণ্য, বিপন্ন হয় গোটা পৃথিবীই সেই সাথে। যাদের নামে নাম সেই আমাজন নামের নারী যোদ্ধাদের মতই ভয়ঙ্কর সুন্দর এই আমাজনকে আমরা, মানুষ নামের জন্তুগুলো কি একটু শান্তিতে নিজের মত থাকতে দিতে পারি না? আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্যই যে সেটার খুব বেশি প্রয়োজন।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29022713 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29022713 2009-10-09 00:07:36
আমাজনের মৃত্যুদূত-১


এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে এর অনেক অংশ, এখনো জানা নেই আরো কত প্রজাতির উদ্ভিদ আর প্রাণী আমাদের চোখের আড়ালে রয়ে গেছে। আর কী তার বৈচিত্র্য! লক্ষ লক্ষ প্রজাতির এসব জীবের কথা লিখতে গেলে আলাদা এনসাইক্লোপিডিয়া লাগবে, বরং ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের চোখে আমাজনের সবচেয়ে ভয়ংকর ক'টা প্রাণীর উপর একটু চোখ বুলিয়ে আসা যাক এই বেলা।

পিরানহা



আমাজন বললেই যে কয়েকটা নাম চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তার একটা পিরানহা। আকারে ক্ষুদ্র, মাত্র ৬ থেকে ১০ ইন্ঞ্চি, কিন্তু হিংস্রতায় ভয়াবহ। আমাজন নদীতে ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়ানো এই মাছগুলো ছেড়ে কথা বলে না কাউকেই, শিকার পেলেই দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের চোয়ালে বসানো সারি সারি ক্ষুরধার দাঁত নিয়ে আর মুহূর্তের মাঝেই মাংস খেয়ে সাফ করে ফেলে। ছোট মাছ থেকে কুমীর, কেউই বাদ যায় না, সুযোগ পেলে কামড়ে মানুষেরও মাংস তুলে নিয়ে যায় রক্তের সামান্য গন্ধেই ছুটে আসা এই মাছের ঝাঁক, যদিও এখনো মানুষ মারার প্রমাণিত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

বুলহেড শার্ক



তবে বুলহেড শার্কের মানুষ মারায় কোন আপত্তি নেই, সেই শক্তিরও অভাব নেই। হাঙর জীবটা মূলত লোনা পানির হলেও আমাজনের অধিবাসীদের দুঃস্বপ্ন বাড়াতেই যেন এই বস্তু আমাজন নদীর স্বাদু পানিতে দিব্যি ঘুরে বেড়ায় শিকারের সন্ধানে। দাঁতগুলো ছুরির মত ধারালো, টর্পেডোর মত শরীর, নাকের সামনের দিকে বসানো অত্যন্ত বেশি সক্রিয় ঘ্রাণেন্দ্রিয় যেটা কিনা বহূদূর থেকেও পানিতে সামান্য একফোঁটা রক্তের গন্ধ পেয়ে যায় আর সামনে যা পায় তা-ই শিকার ভেবে খাওয়ার প্রবণতা, সব মিলিয়ে তার প্রজাতির আর সব ভাইবেরাদারের মতই বুলহেড শার্ক একটা জীবন্ত কিলিং মেশিন।

স্টিং রে



লোনা পানির গুলোর মত বিশাল না হলেও, ভয়ংকরত্বের দিক দিয়ে আমাজনের স্টিং রে-ও খুব একটা কম যায় না। দেখতে অনেকটা বড় আকারের বাঁদুড়ের মত, পানির তলায় ডানা বিছিয়ে শুয়ে থাকে আর শিকার পেলেই ডানা বিছিয়ে সেটাকে ঢেকে ফেলে ছিঁড়ে খায়। চারপাশের পরিবেশের সাথে এমনভাবেই মিশে ঘাপটি মেরে থাকে যে একদম গায়ের উপর না থাকলে বুঝাও কঠিন এখানে আছে কিছু। তাতেও যদি কাজ না হয়, তবে আত্মরক্ষার জন্য এর পেছনে লেজের সাথে আছে তলোয়ারের মত ধারালো এবং একই সাথে বিষাক্ত স্টিং বা হুল, যার বিষে অকল্পনীয় ব্যথা, আর বুকে বা ফুসফুসের কাছাকাছি বিঁধলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে মানুষের।

ইলেক্ট্রিল ঈল



চেহারাটা যেন জীবন্ত একটা দুঃস্বপ্ন, অন্তত পর্দায় দেখে সেরকমই মনে হয়। অনেকটা সাপের মত লম্বা, ৩ মিটার বা ১০ ফিট পর্যন্তও হতে পারে, নিজের প্রজাতি ঈলের চেয়ে ক্যাটফিশের সাথেই মিল বেশি। চোখেও ভাল দেখে না, শিকারের অস্তিত্ব অনুভব করে সেন্সর দিয়ে। আর এর শিকারের অস্ত্র হলো এর গায়ে বসানো প্রাকৃতিক ডায়নামো থেকে দেয়া বৈদ্যুতিক শক। প্রচণ্ড এই শকে সামনের কয়েক মিটারের মাঝে সমস্ত ছোটখাট মাছ অবশ হয়ে যায়, আর দাঁতবিহীন ইলেক্ট্রিক ঈল সোজা গিয়ে সেটাকে গিলে ফেলে। সেরকম বড়সড় একটা ঈলের শকে ঘোড়া পর্যন্ত কাবু হয়ে যায়, মানুষেরও হবার কথা। একবার দেখা গিয়েছিল একটা মাঝারি সাইজের অ্যালিগেটর পর্যন্ত একটা ঈলকে ধরতে গিয়ে শক খেয়ে কাবু হয়ে গিয়েছিল, এই শক ঈলের আত্মরক্ষার উপায়ও বটে।

কেইমান অ্যালিগেটর



অ্যালিগেটরের কথাই যখন এলো, কুমীরের গোত্রের এই প্রাণীটির বৃহত্তম প্রজাতি, কেইমান অ্যালিগেটরের কথা না বললেই নয়। আমাজন নদীতে গাছের গুঁড়ির মত ভেসে বেড়ানো বা পাড়ে কাদায় শুয়ে রোদ পোহানো এই প্রাণীটি আসলেই জলজ্যান্ত মৃত্যদূত। কালো রঙের, একেকটা পূর্ণবয়স্ক কেইমান অ্যালিগেটর ৫ মিটার বা ১৬ ফিটের চেয়েও বেশি লম্বা হতে পারে। মূল খাদ্য ক্যাপিবারা, বা পেকারির মত মাঝারি আকারের জন্তুগুলো আর পানিতে ছোট-বড় সবরকমের মাছ, তবে বাগে পেলে মানুষের উপর হামলা করারও রেকর্ড কম নয় এদের। খপ করে শিকারকে ধরে চোয়াল দিয়ে যে কামড়টা দেয়, সেটার ওজন মাত্র ১৩০০ কেজি, যেকোন পূর্ণবয়স্ক প্রাণীর হাড় গুঁড়িয়ে দেবার জন্য যথেষ্টরও বেশি।

[এ পর্বে জলজ মৃত্যুদূতদের কথা বলে শেষ করলাম, পরের পর্বে থাকবে ডাঙার মৃত্যুদূতদের কথা।]


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29019475 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29019475 2009-10-03 00:09:30
কত অজানারে!
চাকা

গাড়ির চাকা আসলে কেন খাঁজকাটা হয়? অর্থাৎ চাকাতে কেন থ্রেড দেয়া হয়? অনেকগুলো কারণের মাঝে একটা দেখা যাক বাস্তব পরীক্ষা দিয়ে। একটা ট্র্যাক বানানো হলো, রেসিং ট্র্যাকের মত। চারপাশ থেকে ফোয়ারার পানি দিয়ে বৃষ্টির আবহ সৃষ্টি করা হলো। প্রথমে খাঁজকাটা চাকা দিয়ে শুরু হলো, ৪০ কিমি গতি তুলে হার্ডব্রেক করা হলো। দেখা গেল গাড়িটা থামার আগে যাচ্ছে প্রায় ৫৩ মিটার। এবার খাঁজছাড়া চাকা। ব্রেক করার পর গাড়িটা থামার আগে কতদূর গিয়েছে আন্দাজ করুন তো! ১২৫ মিটার।

পেপার ক্লিপ

প্রতিদিন যে এলিপ্টিক্যাল শেপে ৩ বার বাঁকানো পেপার ক্লিপগুলো আমরা ব্যবহার করি, সেটা ঠিক এই আকারে আসতে বেশ সময় লেগেছে। সেফটিপিনের মত, তিনকোণা, তারার মত, এমন নানা আকার পার হয়ে এখনকার জেমস ক্লিপের আকার পেয়েছে এটা। এই আকারটা সাধারণ ইস্পাত হলে ধরে রাখতে পারতো না, যতবারই বাঁকানো হতো তার আগের আকারে অর্থাৎ কিনা সোজা হয়ে যেতে চাইতো। যেভাবে ইচ্ছা বাঁকানোর জন্য সাধারণ ইস্পাতের সাথে মেশানো হয় সামান্য ম্যাঙ্গানিজ আর সিলিকন, যার জন্য এই ইস্পাতকে ইচ্ছামত বাঁকিয়ে আকার দেয়া এবং সেই আকারেই রেখে দেয়া যায়। অবিশ্বাস্য হলো, প্রতি বছর সারা বিশ্বে এই পেপার ক্লিপ তৈরি হয় ২০ বিলিয়ন অর্থাৎ ২ হাজার কোটি, যার জন্য খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার টন ইস্পাত। <img src=" style="border:0;" />

এয়ারক্রাফট টায়ার

আবারো ফেরত আসি চাকায়, তবে সাধারণ চাকা নয়, উড়োজাহাজের চাকায়। এ চাকার সাথে সাধারণ চাকার পার্থক্য থাকতেই হবে, এয়ারক্রাফট টায়ারকে একই সাথে যেকোন ট্রাকের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ওজন আর ধাক্কা এবং সেই সাথে ফর্মূলা ওয়ানের রেসিং কারের চেয়েও বেশি গতি হজম করার ক্ষমতা থাকতে হবে। বিশেষভাবে বানানো এই চাকাগুলোকে তাই চরমতম পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেরকম একটা পরীক্ষা দেখতেই ন্যাটজিও টিম গিয়েছিল বিশ্বখ্যাত টায়ার নির্মাতা ডানলপের কারখানায়, যারা কিনা ছোট গাড়ি থেকে শুরু করে বোয়িং জাম্বোজেটেরও চাকা বানিয়ে থাকে। ১৯১০ সাল থেকে বিমানের চাকা বানানো শুরু করে এই প্রতিষ্ঠানটি, এখনো টিকে আছে সুনামের সাথে। দেখা গেল তাদের কারখানায় কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা। প্রতিটা চাকাকে পরীক্ষা করা হয় ডায়নামোমিটার নামের একটা বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে, যেটা একই সাথে ইমপ্যাক্ট (আকস্মিক ধাক্কা), ওজন আর অ্যাব্রেশান (গতি আর আঘাতজনিত ক্ষয়) টেস্ট করতে পারে। অবশ্যই সাধারণভাবে যা আসার কথা তারচেয়ে বেশ কিছুটা বেশি ধরেই পরীক্ষাগুলো করা হয়। প্রশ্ন আসতে পারে, এই বেশিটা কি? জবাব হলো, ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং, বা এয়ার পারাবতের মত খালেবিলে মাঠেঘাটে নেমে পড়া, অথবা আরো খারাপ হলে, দুর্ঘটনা। সাধারণ একটা এয়ারক্রাফট টায়ারের জন্য চাপ ধরা হয় ২২০ পিএসআই, অর্থাৎ প্রতি বর্গইন্ঞ্চিতে ২২০ পাউন্ড, তবে সবার শেষে যে "ইনফ্লেটেবল টেস্ট" করা হয়, সেখানে ধরা হয় এক্সট্রিম কন্ডিশান, যাতে টায়ার ফেটে যাবে। এজন্য ডিজাইন প্রেশারের অন্তত ৪ গুণ প্রেশার দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। একটা বায়ুশূন্য কক্ষে টায়ারটা রাখা হয়, আর ভিতরে ভরা হয়, না, বাতাস না, পানি। পানি কেন? কারণ বাতাস দিয়ে ঐ চাপ সৃষ্টি করতে চাইলে এটা এত বেশি আয়তনে বাড়বে যে যখন ফাটবে তখন ফ্যাক্টরি বিল্ডিংয়ের অর্ধেকটা উড়িয়ে নিয়ে যাবে। শেষ এই বোকামিটা ডানলপ করেছিল ১৯৩৯ সালে, সেবার পুরো প্রেশার চেম্বারটা উড়ে গেলে পর এই পানি দিয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা। যাই হোক, পানি দেয়া হচ্ছে, চাপ বাড়ছে, ৩০০, ৪০০, ৬০০, ৮০০, ৯০০, ১০০০, এবং বুম! টায়ারটা ছিটকে গেল এদিক ওদিক, তবে এত চরম কন্ডিশনেও কিন্তু একটা দিক ফাটলো চাকাটার, ছিন্নবিচ্ছিন্ন হলো না। বোঝাই যায়, ডানলপ এমনি এমনি এত নামডাক করেনি।

গ্লু বা আঠা

খুবই পরিচিত জিনিস। গৃহস্থালী ব্যবহারের যে গ্লু, তার ক্যাটাগরি ৩টা। প্রথমটা, অ্যাডহেসিভ টেপে যেমন থাকে, বা স্টিকিং প্লাস্টারে। এমনিতে শুকনো থাকে, হাতে লাগলেও আটকে যায় না, কিন্তু চামড়ায় বা অন্য কোথাও লাগিয়ে সামান্য চাপ দিলেই এই চাপের কারণে আটকে যায়। পরেরটা হলো "থার্মোপ্লাস্টিক গ্লু"। তরল অবস্থায় যেকোন কিছুর উপর দিয়ে যেতে পারে, কিন্তু যেই শুকিয়ে যায়, প্রচণ্ড শক্তভাবে ঐ বস্তুর সাথেই লেগে যায়। হাতের উপর লাগিয়ে দেখা গেছে, তোলার সময় হাতের লোমসহ ছিঁড়ে আনে। আর শেষটা, ইভাপোরেটিং ডিপেন্ডেন্ট গ্লু, সবচেয়ে শক্তিশালী, দেয়ালে পোস্টার লাগানোর জন্য যে তরল আঠা ব্যবহার করি সেগুলো। এর কণাগুলো যে বস্তুর সাথে লাগানো হয় তার অণুর সাথে বাতাসের উপস্থিতিতে বিক্রিয়া করে লেগে যায়। কেমন শক্তিশালী এটা? একটা কাঠের পাটাতনে একটা ইউনিফর্ম লাগিয়ে দেয়া হলো এই গ্লু দিয়ে, এরপর ৪ দিন শুকানো হলো। একজন লোককে বুকখোলা এই ইউনিফর্মে ঢুকিয়ে আটকে দেয়া হলো, এরপর ক্রেন দিয়ে তোলা হলো উপরে। ৯৫ কেজি ওজনের লোকটাকে তুলে নিলো, আর পুরো ওজনটাকে সাপোর্ট দিলো সাধারণ আঠা, দেখেও বিশ্বাস হয় না।<img src=" style="border:0;" />

ব্রিটিশ পাউন্ড

টাকা জাল করা ঠেকাতে কত পদ্ধতিই তো নেয়া হয়, আমাদের টাকার মতই ব্রিটিশ পাউন্ডেও মেটাল থ্রেড থেকে শুরু করে আল্ট্রাভায়োলেট রে দিয়ে দেখা যায় এমন গোপন নম্বরও আছে। তবে জাল টাকা নিখুঁত করে ধরা খেয়ে গিয়েছিল জার্মানরা, ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ঐসময়ে জার্মানরা এতই নিখুঁত পাউন্ড বানাতো যে ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞরাও সেটা ধরতে পারতো না। শেষ পর্যন্ট সেটা ধরা পড়লো কিভাবে? না, জার্মানদের অতি খুঁতখুঁতে কাজের কারণে। ব্রিটিশ পাউন্ডে কোণার দিকে যে "N" থাকে, সেই "N" এর বাম দিকের কোণাটা, ব্রিটিশ ছাপাকারকদের খানিক অবহেলার কারণেই, বেশ ছড়ানো থাকতো, অনেকটা কালি ছড়িয়ে গেলে যা হয়। সবকিছুতেই খুঁতখুঁতে জার্মানদের সেটা হজম হয়নি, তারা পুরো নিখুঁত "N"-ই দিয়ে রাখতো, আর ঐ দেখেই ব্রিটিশরা ধরে ফেলতো, এই কাজ তাদের না। মাঝে মাঝে কাজে অবহেলাও সুফল আনে দেখা যায়! <img src=" style="border:0;" />

সুপার গ্লু

আবার ফিরে আসি আঠাতে, তবে সাধারণ আঠা নয়, সুপার গ্লু। এটার আবিষ্কার একদম আকস্মিক। ১৯৪২ এর কথা, কোডাক (ফিল্ম কোম্পানি) এর ডঃ হ্যারি কুভার চেষ্টা করছিলেন স্নাইপারদের রাইফেলের গান-সাইটে ব্যবহারের জন্য স্বচ্ছ প্লাস্টিক বানাতে, মাঝ দিয়ে যেটা হলো, এমন এক যৌগ আবিষ্কার করে ফেললেন, যেটা ১০ সেকেন্ডের মাঝে চরমভাবে আটকে যায় যেকোন কিছুর সাথে, এমনকি মানুষের চামড়ার সাথেও। রাসায়নিক নাম "সায়ানোঅ্যাক্রাইলেট", পেটেন্ট করে এর নাম দেয়া হলো "সুপার গ্লু", বাজারজাতকরণ শুরু হয় ১৯৫৮ থেকে।
অবশ্য, এর থেকেও শক্তিশালী দামী গ্লু আবিষ্কৃত হয়েছে এর পরে, যেগুলোকে বলা হয় "ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্লু", শিল্পকারখানা বা বিশেষ ধরণের যন্ত্রপাতিতেই সেগুলো ব্যবহৃত হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্টিকিং প্লাস্টার এতই শক্তিশালী যে ৫ বর্গসেন্টিমিটারের একটা টেপ একটা ৯৫ কেজি মানুষকে শূন্যে ধরে রাখতে পারে ৫৮ সেকেন্ড, আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্লু? মাত্র কয়েক ফোঁটা গ্লু দিয়ে ছোট, কয়েক ইন্ঞ্চির দু'টো অ্যালুমিনিয়ামের পাত জোড়া লাগানো হলো। এরপর ২ দিক থেকে শুরু হলো টানাটানি, একদিকে ৭০০ কেজি ওজন, অন্যদিকে টাগ-অভ-ওয়্যার দল, এরাও যে টান দিলো সেটার মান ওরকমই। হলো না কিছু। এরপরে টানা হলো গাড়ি দিয়ে, ছুটলো না। শেষমেশ ল্যাবরেটরিতে নিয়ে ইস্পাতের রডের শক্তি পরীক্ষার যন্ত্র দিয়ে টান দেয়া হলো। অবশেষে ছিঁড়লো, তবে কত শক্তি লেগেছিলো জানলে চোখ কপালে উঠে যাবে। মাত্র কয়েক ফোঁটা গ্লুকে ছাড়াতে লেগেছিলো পুরো ১৭০০ কেজি বল।<img src=" style="border:0;" />

টাকা দিয়েই শেষ করি। মাঝেমাঝেই আমাদের বলা হয় হাত দিয়ে টাকা ধরলে হাত ধুয়ে ফেলতে, জীবাণু আছে। কথাটা পরীক্ষা করে দেখা হলো ঐ ব্রিটিশ পাউন্ডের উপরই। ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে দেখা গেল, এর আঁশগুলোর ফাঁকে ফাঁকে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া, অনেকগুলোই কঠিন রোগ সৃষ্টিকারী। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো নিষ্ক্রিয় ব্যাকটেরিয়াগুলো। আপাতত এরা ক্ষতি করছে না, তবে উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই এরা সক্রিয় হয়ে উঠে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিতে পারে।

আসলেই, অর্থই অনর্থের মূল।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29015743 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29015743 2009-09-26 00:28:50
বসুন্ধরা সিটিতে, আলো ঝলমল রাতে
এই রাত ১০টায়ও জায়গাটা দেখে মনে হচ্ছে বিকাল ৪টা, বা অফিস ঘণ্টাও বলা যায়। পিলপিল করে লোকজন ঢুকছে তো ঢুকছেই, মোটাসোটা খালামনি থেকে শুরু করে রঙবেরঙের প্রজাপতি আপুমনি বা ফড়িঙের মত টিঙটিঙে ছোকরা, আবার নানী-দাদীরও অভাব নেই। এই অধমের উদ্দেশ্য অবশ্য কেনাকাটা নয়, অনুরোধে ঢেঁকি গিলে আগমন, এক বন্ধুর ঈদের কেনাকাটার জন্য তাকে সঙ্গদান।
বেচারার লক্ষ্য ছিল একজোড়া স্যান্ডেল কেনা, কিন্তু জুতোর দোকানগুলোতে ঢোকার পর থেকে আমাদের গলা শুকাতে শুকাতে এখন শিরিষ কাগজের মত ঠেকছে। আগুন দাম বলে একটা শব্দ ছিল, এখন এটাকে প্রতিস্থাপন করার মত কোন শব্দের দরকার, কারণ একদম রদ্দি মার্কা পুরোনো ডিজাইনের স্যান্ডেলের দামও যখন ১৫০০ টাকার উপরে, "আগুন" শব্দটা দিয়ে মধ্যবিত্তের কাছে এই দামের ভয়াবহতা বুঝানো যাবে না। দরজার সামনের দিকে বাটার দোকানে "নিউ আ্যরাইভ্যাল" ট্যাগ লাগানো কয়েকটা স্যান্ডেল, দাম দেখে আঁতকে উঠলাম, কোনটাই ২০০০ এর নিচে না, সর্বোচ্চ ৪৯০০ পর্যন্তও আছে। গ্যালারি অ্যাপেক্সে এমনকি রদ্দি মার্কাগুলোরও দাম ২০০০ এর উপরে, লোকজন দেদার কিনছে, আমরা বেইল পাবোনা বুঝে সরে পড়লাম। "হাশ পাপিজ" নামে নতুন একটা বিদেশী ব্র্যান্ডের দোকান খুলেছে, কোন কুক্ষণে উঁকি দিয়েছিলাম জানি না, সর্বনিম্ন দাম ৪৯০০ এবং আশপাশেরগুলো ১০ থেকে ১২ হাজার দেখে তখন থেকে চোখে সর্ষেফুল দেখছি।

কাজেই স্যান্ডেল কেনার আশা বাদ দিয়ে বন্ধু এখন গেছে চোখেমুখে পানি দিতে আর আমি দাঁড়িয়ে আছি ৪ তলায় রেলিং ধরে উদাস চোখে। নিজে অবশ্য ঈদ গায়ে দিয়েই ঘুরছি, গ্রামীন থেকে কেনা ২৫০ টাকার হালকা শার্ট আর অনেক কষ্টে চক্রাবক্রা ছেঁড়াফাটা না লেডিস-না জেন্টস জিন্সের ভিড় থেকে উদ্ধার করা একটা প্লেইন ব্লু জিন্স, আশপাশের ডিজুসদের ভিড়ে বেশ খ্যাত ধরণের লাগছে সেটা অস্বীকার করছি না। তবে আপাতত চিন্তা হলো বন্ধুর বাজেটের মাঝে কি করে একটা ভদ্রস্থ শার্ট কেনা যায় সেটা। দোকানে গিয়ে দোধারী তলোয়ারের আক্রমণের মত দ্বিমুখী সমস্যায় পড়া গেছে। প্রথম সমস্যা ডিজাইন নিয়ে, লোকে যতই খ্যাত বলুক, আজকালকার জোড়াতালি দেয়া ডিজাইন কিছুতেই আমাদের পছন্দ হচ্ছে না, বিশেষ করে হাতে-কাঁধে-পিঠে তালি মারা এবং আরো জঘণ্যভাবে কাঁধের উপর রেলওয়ের টিটিদের মত ব্যাজ লাগানো শার্ট কেন পয়সা দিয়ে কিনতে হবে সেটা অনেক ভেবেও বের করতে পারিনি। ওরকম চাইলে তো বাসার পুরোনো শার্টগুলোই এদিক ওদিক কেটে নিয়ে আরেক জায়গায় লাগালেই হয়, দোকানে আসতে যাবো কেন? নতুন প্রজন্ম মনে হয় আমাদের সাথে একমত নয়, দেখি এক ডিজুস কিশোর তার মা'কে বোঝাচ্ছে, আজকাল এসবই চলে, এটাই কিনবো, হাতে একটা রঙবেরঙের জিন্স আর ব্লাউজ সাইজের শার্ট। মাতাজী মনে হয় এখনো ঠিক মানিয়ে উঠতে পারেননি, বেশ একটা বিতর্ক জমে উঠেছে।

সবাই আবার এই মাতাজির মত নন, পাশ দিয়ে হঠাৎ কিম্ভুত কিছু একটা চলে যেতে ঘাড় ঘুরাই, বেশ খানিক সময় লাগে বুঝতে এটা একটা মানুষ, আরো স্পষ্ট করে বললে, একটা মেয়ে। ড্রেসআপের বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন, কারো কৌতুহল হলে তিশমাকে দেখে নিতে পারেন, তবে মেকআপে তিশমাও পিছনে পড়েছে, এমন কালো রঙের মেকআপ দেখে গথিক ব্যান্ডের গায়িকারাও লজ্জা পেয়ে যাবে। সাথের ভদ্রলোক সম্ভবত তার বাবা, মেয়ের কীর্তিতে ঘাড় উঁচু করে মোরগের মত চলেছেন। আশপাশে এমন নমুনা আরো কয়েকটা দেখা গেল, আর নিশ্চিতভাবেই দেশে আজকাল সাম্যাবস্থা বিরাজমান, ছেলে-মেয়ে সবাই জিন্স জিনিসটাকে হাঁটু পর্যন্ত পড়ার ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ, এর নিচে হলে সম্ভবত সৌন্দর্য দেখানো যায় না। যদিও যারা ইয়োগা চর্চার হাঁটু উঁচু স্কিনটাইট ট্রাউজার পরে বসুন্ধরায় চলে আসেন, তারা হলিউডের নায়িকাদের ছবিটা পাশে রেখে নিজেকে একটু মিলিয়ে দেখতে পারেন আগে। নিশ্চিতভাবেই, নিজেই নিজেকে দেখে বলে উঠবেন--"ওহ, অবসিন"।

বন্ধুর আগমনে নীতিচর্চা বা পরীচর্চায় ছেদ পড়ে, একটা শার্ট কেনার কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত হই। লোকজনের ভিড়ে দোকান গুলোতে ঢোকাই মুশকিল, কালো টাকা কোথায় যায় সেটা দেখার জন্য শপিং কমপ্লেক্সগুলো একটা ভাল জায়গা, কে কত দাম দিয়ে জিনিস কিনছে সেটা দেখে পিছন নিলেই কালো টাকা বা ঘুষখোরদের ধরতে কষ্ট করা লাগবে না বলেই মনে হয়। এখানে অবশ্য এই অধমের একটা ব্যক্তিগত অন্ধবিশ্বাস কাজ করে, সৎপথে না হোক, অন্তত কষ্ট করে যারা টাকা কামায়, তারা কেটে ফেলেও ঈদের মার্কেটে ১৫-২০ হাজার টাকা দিয়ে একটা জামা কিনে ফেলবে না, কোনভাবেই না। ইজি কাম, ইজি গো, কাজেই ঘরে এসে ঘুষের টাকা দিয়ে গেলে অথবা সাধারণ মানুষের গলায় ফাঁস লাগিয়ে যেসব ব্যবসায়ী রক্ত চুষে নেয়, তাদের জন্যই এভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা উড়িয়ে দেশের পণ্যের দাম আকাশে উঠিয়ে দেয়া সহজ এবং সেটাই হচ্ছে, হবে আরো। এমনকি ব্লগেও যখন দেখি ৪০০০ টাকা করে ২ সেট কি এক হিন্দি ছবির ট্রেন্ডে উঠে আসা জামা কিনে সেটা নিয়ে গর্ব করে পোস্ট দেয়া হয় আর সেটা নিয়ে সবার আদিখ্যেতা ফেটে পড়ে, তখন আসলেই নিজেকে খুব বেশি ছোট, খুব বেশি অসামাজিক মনে হয়। কে জানে, আমরাই হয়তো ভুল, আমরাই হয়তো পিছিয়ে আছি, এভাবে হাওয়ার সাথে তাল মিলাতে পারলেই না আধুনিক, কি আসে যায় বাকি কোটি মানুষ ২ বেলা খেতে পারলো কি পারলো না!

নীতিকথা বাদ দিই, কারণ আমরা এখন আছি দুর্নীতির প্রদর্শনীর আখড়াতে। কয়েকটা দোকানে ঘুরাঘুরি করে আমাদের শুকনো গলা এখন মরুভূমি, কারণ যেটাই পছন্দ হয় দাম ১৭০০-৩০০০, অথচ গত ঈদেই প্রায় একই ডিজাইনের শার্টগুলো ছিল ১০০০ এর কাছাকাছি। চামে পেলেই দাম বাড়িয়ে দেয়ার এই সংস্কৃতি আমাদের মধ্যবিত্তদের শেষমেশ ফুটপাথে নামিয়ে দেবে কিনা সেটা ভেবে শংকিত, অবশ্য
কালো টাকা আর ঘুষের অবাধ স্রোতে সেই শংকা অনেকেই হাওয়ায় উড়িয়ে দেবে জানা কথা। ১০০০ এর নিচে শার্ট নেই তা না, তবে সেগুলো মনে হয় ৩-৪ বছর আগের গুদামের মাল সোজা এনে ফেলে দিয়েছে, এরচয়ে বঙ্গমার্কেট জিন্দাবাদই ভাল। অনেক ঘুরে শেষমেশ ঠিক ১০১০ টাকায় একটা পাওয়া গেল, শুকনো মুখে বন্ধু টাকা বের করে শার্ট নিয়ে বের হলো, বেচারা সিভিল এন্ঞ্জিনিয়ার,
বেতনের ১০ ভাগের ১ ভাগ ১টা শার্টেই খতম।

বের হতে গিয়ে ঘড়িতে দেখি ১১টা, এখনো খালাম্মারা ঢুকছেন, হাতে একগাদা ব্যাগ, মনে হয় শেষবেলার খ্যাপটা দিয়ে যাচ্ছেন। ডিজুস পোলাপানের প্যান্ট খুলে আন্ডারওয়্যার দেখানো ফ্যাশন আর উদ্ভট গথিক মেকআপ আর হেয়ারকাটিং আর অশ্লীল বাংলিশের মিশ্রণে শরীর দেখানোর ভিড়ে সবকিছু কেমন যে অবাস্তব লাগে। পুরো শপিং কমপ্লেক্সটায় একমাত্র মন ভালো করা দৃশ্য হলো ছোট ছোট বাচ্চাগুলো,
পুরো দুনিয়ার সব খুশি নিয়ে রঙিন প্রজাপতির মত উড়ে বেড়াচ্ছে যেন বাবা-মায়ের হাত ধরে। এর মাঝেই ২টা বাচ্চা আমার পায়ের নিচ দিয়ে গলে যাবার চেষ্টা করেছে, হাত দিয়ে চুলগুলো এলোমেলো করে দেবার পরে চোখ পাকিয়ে তাকিয়েছে, গায়ে এসে ধাক্কা খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেছে আরো ৩টা, তারপরেই ছুটে গিয়ে আরো কারো ঘাড়ে পড়ার তাল, দেখলেই মনটা ভাল হয়ে যায়। কী এক
বিষাক্ত শহরে কতগুলো খোলা বাতাস, কি রেখে যাচ্ছি আমরা ওদের জন্য সীসা আর আবর্জনা বাদে? জবাব পাই না, আজকাল মাথা ঘামানো ছেড়ে দিয়েছি, খুব তাড়াতাড়ি যন্ত্র হয়ে যেতে হবে।

বের হয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলি, ফুটপাথেও ঈদের ধুম, তবে সেখানে "সব ২০০, মাত্র ২০০, নিয়া যান ২০০।" অনেক কম, তারপরেও কিনতে পারে না অনেকে, ঘ্রাণে অর্ধভোজনের মত তাদেরও দর্শনে অর্ধক্রয়। এখানে যখন হাজারে আর লাখে কারবার চলছে, ঠিক তখনই এই লাখের ক্রেতারা কোনদিক দিয়ে সিন্ডিকেট করে আমাদেরই সর্বস্বান্ত করার ধান্দা করছে, আর এই লাখে আর
কোটির "শো-অফ" এর খাঁড়ায় পড়ে দিন দিন সারা পৃথিবীর কাছে নিজেদের অসভ্যতম জাতি হিসেবে পরিচিত করে তুলছি আমরা, যাদের কিনা ৭০% লোক দু'বেলা খেতে পায় না কিন্তু যে দেশে ঈদের মার্কেটে লাখ টাকার লেহেঙ্গা-শাড়ি আর ১০ লাখের গরু বিক্রি হয়। বিশাল ঐ শপিং কমপ্লেক্সের আলো আর জাঁকজমক খুব বেশি অবাস্তব আর অসভ্য মনে হয় তখন, যদিও নিজেকে কখনোই প্রলেতারিয়েত হিসেবে দাবী করি না। সারভাইভ্যাল অভ দ্য ফিটেস্টের যুগে চিন্তাটাকে আলগা দুঃখবিলাস বলেও চালানো যায়, রাস্তায় জমে থাকা কাদাপানি ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে এড়িয়ে উঠে পড়ি দাঁড়িয়ে
থাকা একটা অন্ধকার বাসে, মাথা ঝাঁকিয়ে বন্ধুর অফিসের গল্পে মন দিই।

রাতে ভাল করে একটা ঘুম দিয়ে মাথা থেকে এসব জন্ঞ্জাল বের করে দিতে হবে, স্রোতের সাথে না মিশে গেলে কোনদিন যে ঘূর্ণিতে তলিয়ে যাবো, লাশটাও কেউ খুঁজে পাবে না। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29011184 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29011184 2009-09-16 00:39:58
স্বপ্ন মৃত্যু ভালবাসা
কলেজ থেকে বের হবার পরে দু'জনের কারো সাথেই আর দেখা হতো না। সাইফ আইবিএ তে, পরশ ডেন্টালে, আমরা বুয়েটে। মাঝে মাঝে সাইফ বুয়েটে আসতো, বছর তিনেক আগে একদিন হঠাৎ হলের বারান্দায় দেখা, দেখেই পরিচিত ভঙ্গিতে সেই স্কুল-কলেজের কোডনেম ধরে হুংকার। কেন যেন খুব ভালো লাগলো, পরিচিত মুখে অনেকদিন পরে পরিচিত ডাক শুনতে খুব মধুর লাগে। দাঁড়িয়ে খানিক কথা বললাম, কি কাজে যেন এসেছে, আমিও ক্লাসে যাবো, অল্প কথাবার্তার পরে কখনো ওর এলাকায় যাওয়ার কথা বলে বিদায়। একসময় আমাকে চরম জ্বালাতো যে সাইফ, তার সাথে দেখা হয়েছিল শুনে বন্ধুরাও বেশ মজা পেল, এখনো আমাকে ঐভাবে জ্বালালে কি হতো ভেবে সবাই বেশ হাসাহাসি করলাম। ঠিক ২ সপ্তাহ পরে, একদিন রাতে এক বন্ধু ফোন করে জানালো, সাইফ রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে!

হঠাৎ খবরটা শুনে ভাবলাম, হতেই পারে না, মাত্র ২ সপ্তাহ আগে যাকে দেখলাম, সে মারা যায় কিভাবে? কিন্তু সাইফ আমাদের সাথে কলেজেও পড়েছে একসাথে, কমন ফ্রেন্ড অনেক, সবাই যখন জানাতে শুরু করলো, দুঃস্বপ্নটা বাস্তব হয়ে ধরা দিতে শুরু করলো। উত্তরা থেকে গাড়ি চালিয়ে বন্ধুরা ফিরছিলো, দুর্ঘটনায় পড়েছিল, ও সহ আরেকজন মারা গেছে, বাকিরাও মারাত্নকভাবেই আহত। বন্ধুরা অনেকে গেল জানাযায়, আমি গেলাম না। মাত্র ২ সপ্তাহ আগে যাকে হাসিমুখে আমার দিকে এগিয়ে এসে হাত মিলাতে দেখেছি, তার জানাযায় যাওয়ার মত মনের জোর আমার হয়নি। অনেকদিন এটা নিয়ে কেমন কেমন লাগতো, সবাই বলতো, বাড়াবাড়ি করছি, কিন্তু আমার বিশ্বাস করতে অনেক সময় লেগেছিল যে ছেলেটা আর ফিরবে না, কোনভাবেই না।

পরশের বন্ধু ছিল সাইফ, ওরা ছিল মানিকজোড়, আশ্চর্য মিল ছিল ওদের আচরণ আর পারিবারিক পটভূমি আর জীবনযাত্রায়। পরশ পড়তো আমারই এক পাড়ার বন্ধুর সাথে ডেন্টালে। মাঝে মাঝে নাম শুনতাম, ওর বেশ ভাল পরিচয় ছিল, দেখা হয়নি। হঠাৎ একদিন ফেসবুকে দেখি ১টা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, ইফতিখার এইচ খান। আসল নামটা ভুলে গিয়েছিলাম, ছবি দেখে চিনলাম, যোগ করে রাখলাম, কথা হতো না। ৩-৪ দিন আগে, দেখি পরশের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখা--"১৫২ কিলোমিটারে গাড়ি চালাইলাম, ম্যান আয়্যাম ফাস্ট।" মনের মাঝে কোথাও একটা ধাক্কা মারলো, ঠিক একইভাবে আরো একজন কথা বলতো। ৭ বছর পরে প্রথম কথা বললাম, স্ট্যাটাসের নিচে মন্তব্য লিখলাম--"দোস্ত, কাজটা বিপজ্জনক, সাবধানে, এইটা বাংলাদেশের রাস্তা, কেউ নিয়ম মানে না।" প্রতিমন্তব্য এলো, যেন ৭ দিন পরে কথা হচ্ছে--"আরে ব্যাটা তুই দেখি আমার মা আর বউয়ের মত কথা কস।" আবারো খুব ভালো লাগলো, অনেকদিন পরে পরিচিত কোন মুখে পরিচিতের মতই কথা, যেন গতকাল দেখা হয়েছে। জবাব দিলাম--" রাস্তাঘাট সেফ না, তুই গাড়ি টান দিলি, সাইড রোড থেকে একটা ট্রাক নাক বের করল, কি করবি?" জবাব দিল--" জানি তুই সাইফের কথা বলবি। সে আমার শুধু বন্ধু না, ছায়া ছিল, ওর মতই আমারো গতির নেশা, থামাতে পারি না। যখন ঐভাবে চালাই,মনে হয় সাইফ আমার পাশে আছে। মনে হয় আমারো রোড অ্যাক্সিডেন্টে মরণ আছে।" বদ রসিকতা আমি পছন্দ করি না, কাজেই জবাব দিলাম না।

২ দিন পরে, গতকাল রাতে, আবার ফেসবুকে নক, দোস্ত তোর বিসিএসের কি খবর? বললাম--"হইসে রিটেন এ, ভাইভা নিয়া কি করবো ভাবতেসি, লবিং নাই। তোর কী খবর?" জানালো, বেশ ভালই, ডেন্টাল সার্জন নিবে ১৪০ টা, ওরা পাশই করেছে ৫২ জন, নিশ্চিতই বলা যায়। খুশি হয়ে কংগ্রাটস দিলাম, উপদেশ চাইলাম কিভাবে ভাইভার জন্য পড়া যায়। প্রায় ঘণ্টাখানেক এটা-ওটা বললো, শেষে বললো, এখন আছে অ্যাড-হক এ, এবার স্থায়ী হয়ে গেলে শান্তি। বললো, যে বইগুলি বললাম কালকেই কিনে আন, রাতে ২ জন আলোচনা করে পড়া যাবে, কাজে লাগবে। খুশি হয়ে বললাম, খুব ভালো, কালকেই আনবো। একটু পরে বলে, যাইগা, বউ ঘুমানির জন্য চিল্লায়, সংসার! অবাক হয়ে বললাম, গার্লফ্রেন্ড না আসল বউ? বলে-- "দূরররর ব্যাটা, বিয়া করলাম প্রায় আড়াই বছর, একটা মেয়ে আছে দেড় বছরের, তুই তো কিছুই জানস না।" ব্যাপক মজা লাগলো, আবারো অভিনন্দন দিলাম, বাচ্চার ছবি দেখতে চাইলাম। ফেসবুকে আছে, জানালো। ছবিতে দেখি, অসম্ভব মায়াবী একটা মোটাসোটা দেবশিশু, নানাভাবে সাজিয়ে মাথায় ওড়না দিয়ে তোলা ছবি, অ্যালবামের শিরোনাম--"ছোট্ট ছোটন।" খুব খুব ভাল লাগলো দেখে, মনে হলো, নিজেরও এমন একটা খেলার পুতুল থাকলে মন্দ হয় না। বললাম--"ব্যাটা আস্ত পুতুল পেয়ে গেছিস খেলার জন্য, তোর দেখি বিশাল মজা। তোর বাচ্চারে বলিস, বিসিএসে আমার হয়ে গেলে এক বাক্স চকলেট পাঠাবো।" বললো,পাঠাস। আমি আরো খানিক্ষন মুগ্ধ হয়ে ছবিগুলো দেখলাম, হাসিখুশি একটা শিশুর চেয়ে পৃথিবীতে আর সুন্দর কি আছে? সবশেষে মন্তব্য লিখলাম--"একটা লিভিং ডল রে, ইউ আর লাকি, ম্যান।" ছেলেটার পরিবর্তন দেখে আর বাচ্চাটার ছবি দেখে মনটা ভাল হয়ে গেল, অনেকদিন পরে বেশ খুশি খুশি মনে নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।

সকালে উঠেছি, আম্মাকে এমন মজার একটা খবর দিতে সবাই বেশ মজা করলাম, এইটুকু ছেলে, তার আবার এইটুকু একটা বাচ্চা। সুখ কী একেই বলে? দুপুরে নীলক্ষেত গিয়ে বই কিনলাম, যেগুলো বলেছিল। পুরানো বই কিনবো কিনা ভাবতে ভাবতেই মনে হলো এখবার ফোন করি ব্যাটাকে, পরক্ষণেই মনে পড়লো ফোন নম্বর তো নেই। আচ্ছা এখন কিনি, আর কিছু লাগলে রাতে ইয়াহুতে জিজ্ঞেস করে নিলেই হবে, ভেবে কিনে নিলাম বইগুলো। বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা, কোনমতে ইফতার, মোবাইলটার দিকে তাকাইও নি। ইফতার করে মোবাইলের দিকে তাকানোর ফুরসৎ মিললো, তাকিয়েই দেখি একটা এসএমএস। হবে সিটিসেলের কোন বস্তাপচা অফার, ভেবে খুলতেই দেখি, আমার পাড়াতো ডেন্টিস্ট বন্ধুর লেখা--"ডাক্তার ইফতিখার রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে।"

পরেরটুকু আর কি লিখবো, আমি জানি না। এবার আর আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়নি, লেখাটা দেখার সাথে সাথেই কেন যেন আমি জানতাম, এখানে কোন ভুল নেই। কালকে রাতে যার সাথে আমার কথা হয়েছে, যার পুতুলটাকে আমার এক বাক্স চকলেট পাঠাবার কথা ছিল, যার সাথে আজকে রাতে আমার জোর গলায় আলোচনা করবার কথা ছিলো কিভাবে ভাইভা বোর্ডের লোকগুলোকে কাবু করা যায়, যার সাথে সাত বছর পরে গতকাল রাতেই আমার প্রথম কথা হয়েছিল, যাকে আমার মনে হয়েছিল খুব সুখী একজন মানুষ, সে তার সব স্বপ্ন আর ভালবাসা নিয়ে চলে গেছে। আমি তার পরিবারের কাউকে চিনি না, আমি তার বন্ধুদের চিনি না, আমি তার জানাযায় যেতে পারিনি, যেমন পারিনি সাইফকে শেষবারের মত দেখতে। আমি শুধু জানি তার সাথে আমার ৭ বছর পরে কথা হয়েছিল, তার সাথে অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমরা কথা বলেছিলাম, তার ছোট্ট ছোটনকে আমার এক বাক্স চকলেট পাঠাবার কথা ছিল।

সবাই আমার বন্ধু ইফতিখার হায়াত খান পরশের জন্য দোয়া করবেন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29006487 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29006487 2009-09-08 00:15:08
অফিসের আহাজারি
হঠাৎ এভাবে খেপে গেলাম কেন? ব্যাখ্যায় যাই একটু। খেপাটা হঠাৎ নয়, সত্যি বলতে কি খেপে যাই-ও নি, একটু করুণ অভিজ্ঞতার বয়ান দেবার জন্য শখ হলো আরকি। একটা সাধারণ চিত্র তুলে ধরা যাক। ধরা যাক, আপনি অফিসে ঢুকলেন, মতলব হলো বসের সাথে দেখা করবেন, এসেছেন অন্য আরেকটা অফিস থেকে, অথবা আপনি আমারই মত হতভাগা কোন চাকরিপ্রার্থী। প্রথমেই আপনার দিকে (এখানে ধরে নিচ্ছি আপনি দারোয়ানের বাধা পার করে গেছেন) ভদ্রমহিলা বা ভদ্রতরুণীটি তাকাবেন না, তিনি তখন গভীর মনোযোগে মোবাইলে বা অফিসপ্রদত্ত ফোনটিতে গভীর মনোযোগে জনগুরুত্বপূর্ণ কোন আলাপে ব্যস্ত, না শুনলে নিশ্চিতভাবেই ধরে নেবেন এর উপর অফিসের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। তবে, একটু খেয়াল করলেই শুনতে পাবেন, আলাপের বিষয় হলো অফিসের কোন আপা বসের রুমে ঢুকলে আর বেরোয় না অথবা নতুন ফ্যাশনের দুলটা তার কানে মানাচ্ছে কিনা সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা কিংবা ঈদে এবার নকশাতে দেখানো বুটিকের জামাটার ডিজাইনের ব্যবচ্ছেদ। ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে একটু উসখুস শুরু করলে একবার চোখ তুলে তাকিয়ে "দেখো না কাজ করি" ধরণের একটা চাহনি দিয়ে আবার ফোনে মনোযোগ, সাথে সোফা বা চেয়ারে বসার ইশারা। বসলেন, ঝিমোচ্ছেন, ১০ মিনিট পরে হয়তো জনাবার দয়া হলো, ফোন রেখে ইশারায় ডাকলেন-- "কি চান?" আওয়াজ শুনে মনে হবে দজ্জাল গিন্নী ফেরিওয়ালা বিদায়ের চেষ্টায় আছে। ঢোঁক গিলে জবাব দিলেন, জ্বি অমুক সাহেবের সাথে একটু দেখা করতাম। এবার মনোযোগ সামনে রাখা প্যাড বা কম্পিউটারে, নিশ্চিতভাবেই সেখানে কাটাকুটি বা কার্ডের গেম চলছে। "কি দরকার??" এইবারে আপনি যদি অন্য অফিসের প্রতিনিধি হন, তিনি আস্তেধীরে ফোনটা তুলে "মিটিংয়ে ব্যস্ত" স্যারকে খবরটা দেবেন, তারপরে আবারো বসতে ইশারা করে (এদের কথা বলা শেখায় না?) ফের আঁকিবুকিতে নজর দেবেন। আর যদি চাকরিপ্রার্থী হয়ে থাকেন তো হয়ে গেল, তেলাপোকা দেখলে যেভাবে তাকায় সেরকম একটা চাউনি দিয়ে পাশের কোন একটা কক্ষে চালান করে অনির্দিষ্টকালের এক প্রতীক্ষায় ফেলে আবারো দুনিয়া উদ্ধারে মন দেবেন শাহাজাদী। এখানে আপনার একটু সাবধান থাকতেই হবে, তিনি যদিও ফোনালাপে ব্যস্ত বা আশপাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া লোকের সাথে মধুর আলাপে, আপনার ফোনটা যদি ভুলেও বেজে ওঠে এবং আপনি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফিসফিস করেও কথা বলে ফেলেন তো একগাদা উপদেশ শোনা অনিবার্য ঘটনা।

এবারে আপনি চালান হয়ে গেলেন বসের হাতে। সে ব্যাটা অতি অবশ্যই "জরুরী" কাজে আছে, যার মাঝে আছে কফি খাওয়া, পাতি বসের সাথে দেশ নিয়ে আলোচনা এবং লুইচ্চা ধরণের হলে সেক্রেটারী এবং সুন্দরী সহকর্মীর সাথে একান্ত আলাপ। একটা রিয়েল এস্টেটের অফিস জানি, সেখানে এমডি'র ফ্লোরে সব মহিলা কর্মচারী, প্রায়ই তাদের সাথে তার "একান্ত" আলাপ করার দরকার হয়, সেসময় অন্যদের প্রবেশ নিষেধ। এর মাঝে মাঝে দয়া হলে ইন্টারভিউতে ডাকছে, সত্যি সত্যি যাদের নেয়ার ইচ্ছে তাদের সাথে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করতেও পারে, এই অধমের সাথে সবসময়ই নাম কি (সেটা সিভিতেই আছে), বাপ কি করে (চাকরি তো করবো আমি, বাপ দিয়ে কি করবি?), জেলা কোথায় (সেটা জেনেই বা কি লাভ, আমি গাইবান্ধা নাকি কক্সবাজার তা দিয়ে কি বিল্ডিংয়ের ২টা হাত গজাবে?), আগে কোথাও কাজ তো মনে হয় করেননি, এবারই প্রথম (সিভিতে নামের নিচেই বড় বড় করে লেখা কোথায় কি কাজ করেছি, ইংরেজি পড়তে না জানলে বল পড়ে দিই), এধরণের খাজুরে আলাপ। পরবর্তী প্রশ্নটা থাকে, আপনি তো থাকবেন না (তাহলে ব্যাটা ডাকলি কেন?), আচ্ছা থাকলে বেতন কত নেবেন? এরপর মাছের বাজারের মত খানিক দরাদরি, সবশেষে আচ্ছা আমরা জানাবো, যদিও কোনদিনই জানা হয় না। মাল্টিন্যাশনাল অফিসগুলোতে সম্ভবত পরীক্ষা এবং নানা ধরণের ধাপের ব্যাপার আছে, একটা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে চলে সবকিছু, অবস্থা এর চেয়ে অনেক ভাল হবারই কথা, তবে অধমের ভাগ্যে এই ধরণের অফিসগুলোই জুটেছে বলে একটু সাধারণীকরণ করতে হলো।

বেসরকারি অফিসগুলোর যদি দারোয়ান আর রিসিপশনিস্টের পিণ্ডি চটকাই, সরকারি অফিসগুলোতে মশামাছি গুলোকেও গালিগালাজ করা উচিত, অন্তত ওখানকার মাছিমারা কেরানিগুলোকে তো অবশ্যই প্রতি বেলায় বেত দিয়ে পিটিয়ে ৪ মাইল ডাবল মার্চ করানো দরকার। সম্ভবত বিদেশীদের আমাদের দেশের সরকারী অফিসগুলোতে কোন কাজে যেতে হয় না, গেলে সন্দেহাতীতভাবে বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকায় এক নম্বর জায়গা দখল করে রাখতো। ঘুষ ছাড়া ওখানে ফাইল কেন, ফিতাটাও নড়ে না সেটা তো পুরানো কথা, কিন্তু এত জঘণ্য আচরণ দুনিয়ার আর কোথাও পাওয়া যাবেনা এটা লিখে দেয়া যায়। রিসিপশনিস্ট থাকতে দেখেছি শুধু হাসপাতালগুলোতে, তারাও অত্যন্ত তিরিক্ষি মেজাজে থাকে, বারডেমে রিসিপশনিস্টের ঝাড়ি শুনেছি ক'দিন আগেও। অন্য অফিসগুলোতে এমন কোন কিছু নেই, থাকলেও সেখানে ডেস্কে কাউকেই পাওয়া যায় না, এই টেবিল ঐ টেবিলে ঘুরলে দেখা যাবে কেরানিরা সব দল বেঁধে দেশ উদ্ধারে ব্যস্ত। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলে প্রথমে কিছু শুনবেই না, এরপরে উদাস চোখে ২-১বার তাকাবে, এরপরে মাছি তাড়ানোর মত হাত ঝাড়া দিয়ে বিদায় হতে বলবে। যদি একটু কিছু বলেছেন তো আপনার হয়ে গেল, হুমকিধামকি গালিগালাজ অনেক কিছুই শোনা যাবে। ইউনিয়ন জিনিসটা কর্মচারীদের অধিকারের জন্য রাখা হলেও, আমাদের দেশের সরকারী কর্মচারীদের ঘুষ দুর্নীতি কাজে অবহেলা সবকিছুর কেন্দ্রে এখন এই ইউনিয়নগুলো, কেউ কিছু করতে চাইলেও ৩য় বা ৪র্থ শ্রেণীর কর্মাচারীদের নেতার কাছে সবাই অসহায়। রোডস এন্ড হাইওয়েজের অফিসে একটা বইয়ের খোঁজে একদিন বেলা ১১টায় গিয়ে দেখি, সব টেবিল ফাঁকা। হল্লা শুনে এক রুমে গিয়ে দেখি, রাজ্যের কর্মচারী সব জড়ো হয়ে ভোটের উপর গরম আলোচনায় ব্যস্ত। বক্তৃতা দিতে দিতে একজনের জোশ এসে গেল, তিনি বঙ্গবন্ধু স্টাইলে আঙ্গুল উঁচিয়ে "এই দেশের মুক্তির জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে" বলতে বলতে সোজা চেয়ারে উঠে পড়লেন। কিন্তু অফিসাররা কোথায়? সম্ভবত, তারা অফিসে নেই।

আমাদের সম্ভবত ধারণা, আমাদের সরকার পয়সা দেবে আরাম করার জন্য, আর কাজ করার জন্য বাড়তি পয়সা দেবে জনগণ। সরকারী অফিসগুলোতে হানা দিয়ে এদের বেতিয়ে আচার ব্যবহার আর কাজ করা শেখানোর সময় আসলেই হয়ে এসেছে। কথা হলো, যারা শেখাবেন সেই কর্তাদের মাঝেই ভূত, সরষে দিয়ে না হয় ভূত তাড়ানো যায় কিন্তু সরষে তাড়াবে কে?

[ লেখাটা শেষ করে মনে হলো, আজকের অভিজ্ঞতাটাও এই বেলা লিখে ফেলি, মূল লেখার সাথে সম্পর্কহীন যদিও। যে অফিসটা থেকে একটু আগে বের হয়ে বাসায় ফিরলাম আরকি সেটার কথা। একদিন ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছি এখানে, আবার ডেকেছে, বেশ আশাবাদী হয়ে গেছি। রিসেপশনের আপুও সেদিনের মত "তেলাপোকা" চাউনি দিলেন না, যদিও দু'ঘণ্টা বসিয়ে রাখলেন ঠিকই। এরপরে দয়া করে একটা রুমে নিয়ে বসানো হলো, বসের আগমন, সাথে সহকারী, এই আপা আবার আগেরদিন ঐসব খাজুরে প্রশ্নেই ডায়েরিতে বিশদ নোট নিয়েছিলেন, কে জানে কি গবেষণা হলো। তারা জানালেন, আমাকে তাদের পছন্দ হয়েছে (বাহ বাহ, এতদিনে আমাকে চিনলো তবে!)। তবে বেতন যা চেয়েছি শুরুতে ৩ মাস তার চেয়ে কম দেবে (মন্দের ভাল)। তবে তাদের কিছু "টার্মস এন্ড কন্ডিশন" আছে। বেশ তো, শুনি। চাকরি ছাড়ার দু'মাস আগে জানাতে হবে। কোন সমস্যা নেই, জানাবো। আর কিছু? হ্যাঁ, মূল সার্টিফিকেট সব কয়টা তাদের কাছে জমা দিতে হবে। ব্যাটা বলে কি? হুম, তাদের ওখানে যারা জয়েন করছে সবাই নাকি এই শর্তেই এসেছে। এর আগে "বন্ড" চাইতে শুনেছি, গতকাল একজায়গায় চেয়েছেও, কিন্তু মূল সার্টিফিকেট জমা? যাব্বাবা! ১৬ বছর খেটেখুটে জমানো সার্টিফিকেটগুলো শুধুমাত্র বুয়েট আর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ছাড়া আর কারো হাতেই জমা দিতে আমি রাজি নই। ঝিম মেরে আছি দেখে আপা মিষ্টি হেসে জানালেন, আমি রাজি থাকলে তারা এখনই তাদের বাকি অফারগুলো বলতে পারেন। নিশ্চিতভাবেই আমার হাসিটা বেকুবের মত হয়েছিল, ওভাবেই বললাম, জ্বি আমি একটু বাসায় গিয়ে ভেবে জানাই? তিনি বললেন, অবশ্যই, কালকের মাঝে জানান। বললাম, আজকে রাতেই জানাবো। দু'জনের দিকে মাথা নেড়ে বের হয়ে এলাম, আস্তেধীরে লিফটে উঠে ফোন বের করে এক বন্ধুকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, দোস্ত একটা সিভি পাঠাইসি তোর বলা ঠিকানায়, একটু দেখিস তো! আচ্ছা আমি বলে দেব। থ্যাংকস দোস্ত, আরে না না ব্যাপার না, দেখ কি হয়!

লিফট থেকে বের হয়ে মনে পড়লো, মিষ্টহাসি ডায়েরিওয়ালি আপুর ফোন নম্বরটাই আনি নি।

ধ্যুৎ! ] ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29005932 http://www.somewhereinblog.net/blog/deathmetalblog/29005932 2009-09-06 23:58:33