- হজ্ব ব্যবস্থাপনা সৌদি সরকারের ব্যর্থতা, নাকি ষড়যন্ত্র-
হজ্ব ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। যার আর্থিক ও দৈহিক সামথর্ আছে তার উপরই এই হজ্ব ফরজ। কিন্তু সৌদি সরকারের নিবুর্দ্ধিতা ও অব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি বছরই অনেকেই এই ফরজ আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, হচ্ছেন বিভিন্ন রকম হয়রানী ও প্রতারনার স্বীকার। সৌদি সরকারের বক্তব্য হচ্ছে জায়গার অভাবে সবাইকে হজ্ব করতে দেয়া যাচ্ছে না। পবিত্র মক্কা 'শরীফের পবিত্র কাবা ঘরের চতুর্দিকে হাজীদের তওয়াফের জন্য কিছু জায়গা (সম্ভবত ১০০ মি: হবে) রেখেই মসজিদের জন্য দেয়াল করা হয়েছে। কিছু জায়গা রেখে একদিকে সরাসরি দেয়াল, অন্য দিকে গাড়ী চলাচলের জন্য রাস্তা এবং কোন কোন দিকে সুউচ্চ হোটেল ও বিপণন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ভাবতেও অবাক
লাগে এ কেমন দূরদর্শীর্তা ? যেখানে তাওয়াফ ও জামাতের সঙ্গেঁ হাজ্বীদের নামাজ আদায় করতেই ভীড়ের চাপাচাপিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে কি করে সৌদি সরকার এত কাছাকাছি মসজিদের
গা ঘেষে হোটেল ও বিপণন বিতান তৈরী করার অনুমতি দিল? তওয়াফের জন্য কাবা শরীফের চতুর্দিকে যে অল্প পরিমান জায়গা রাখা হয়েছে তা থেকে ইউরোপে অনেক বড় জায়গা সমেত স্কয়ার দেখা যায়। সাড়া বিশ্বের মুসলমানদের মিলনের কেন্দ্র ভূমি, যাকে কেন্দ্র করে আমরা নামাজ আদায়
করি সেই পবিত্র জায়গাটিকে কি করে এরকম অপরিকল্পিতভাবে হোটেল ও বিপণন কেন্দ্রের দেয়ালের দ্বারা ঘিরে সঙ্কুচিত করে রাখা হয়েছে তা ভাবতেই আশ্চর্য লাগে। সাড়া বিশ্বের মুসলমানদের হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের সবচেয়ে প্রিয় জায়গাটি সম্ভবত এককভাবে সৌদিরা পরিকল্পনা ও পরিচালনা করছে।অন্যকোন দেশের মতামত ও পরামর্শ নেয়া হচ্ছে বলে মনে হয় না। পবিত্র কা'বা শরীফটাকে চতুর্দিক দিয়ে মসজিদের দেয়াল দিয়ে এমন ভাবে ঘিরে রাখা হয়েছে যে মসজিদের বাহির থেকে কাবাশরীফ দর্শন সম্ভব নয়। দর্শনার্থীকে অবশ্যই মসজিদ পার হয়ে ভিতরে ঢুকতে হবে। এ বৎসর (২০০৬) সরকারী হিসাব মতে প্রায় ৪০ লক্ষ মোসলমান পবিত্র হজ্জ পালন করেছে। এই লোকদের জন্য পর্যাপ্ত
পরিমান হোটেলও তৈরী করা হয়নি। ব্যক্তি মালিকানাধিক নির্দিষ্ট পরিমান জৌলুসপূর্ণ হোটেল তৈরি করা হয়েছে একেবারেই বাণিজ্যক ভিত্তিতে। পরিস্থিতি এমন যে হোটেলের মালিকরা যে ভাড়া চাইবে হাজীদের তাতেই রাজী হতে হবে। তাবলিগের মত ব্যক্তিগত বা দলবদ্বভাবে থাকা খওয়ার কোনই সুযোগ নেই। মোট কথা এখানকার হোটেল মালিকরা মনোপলি মোনাফা করে যাচ্ছে মোসলমানদের ফরজ একটি এবাদতের সুযোগে। উপরন্তু এতগুলো হাজীর জন্য খাওয়ার বড় কোন রেস্টুরেন্টও তেমন একটা নেই। ছোট ছোট দোকানের মধ্যে ইন্ডিয়ান মোসলমান নামধারী কিছ লোক যেমন ইচ্ছা্ তেমন রান্না করে দ্বিগুন মূল্যে বিক্রি করছে নিরিহ হাজীদের কাছে। মীনা এবং আরাফাতের অবস্থাতো আরো সোচনীয়। সৌদি সরকার ইচ্ছা করলে ( প্রয়োজনে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের সহায়তায়) এই হাজীদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা বীনামূল্যেই করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ভাবে এর কোন উদ্যোগ নেই উপরন্ত সাধারন সৌদি নাগরিকদেরও এ ক্ষেত্রে কোন রুপ উৎসাহিত করেনা। প্রায় প্রতিটি হোটেলের প্রবেশ মুখেই থাকে সৌদি বাদশাহদের জৌলুসপণূর্ সানগ্লাস যুক্ত ছবি। হোটেল থেকে কাবাশরীফের প্রবেশ পথের ধারেও বিরাট বিজ্ঞাপন সদৃশ সৌদি বাদশাহদের জৌলুসপণূর্ ছবি দেখা যায়। মনে হয় হাত নেড়ে নেড়ে হয়ত নিরিহ হাজীদের সঙ্গে উপহাস করছে। এ সাল (২০০৬) হোটেলের একটি
রুমের ভাড়া হজ্ব মৌসুমে দুই সাপ্তাহে প্রায় ১২ হাজার রিয়াল। যেখানে আমাদের দেশের সাধারন একজন শ্রমিক সারাদিন পরিশ্রম করে মাসে অনেকে পাঁচশত রিয়ালও বেতন পায় না। এরকম একটি হোটেলের বুকিং দিতে না পারলে হাজীদেরকে ভিসা দেয়া হবে না। ২০০০ সালে ইটালিতে থাকার সুবাদে দেখতে পেলাম খৃষ্টান ক্যাথলিকদের হজ্ব (পেলেগিড়বন)। এ উপলক্ষে সাড়া বিশ্ব থেকে ক্যাথলিকরা এসেছিল তাদেও ধর্মীয় সফরে রোম শহরে। এ উপলক্ষে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে তৈরী করা হয়েছিল হাজার হাজার তাবু। রোমের সাধারণ নাগরিকরাও অনেকে তাদের বাসায় স্থান দিয়েছিল এসকল পেলেগ্রিনদের বীনা পয়সায়। ইসলাম আসার পূর্বের পৌত্তলিকরাও নাকি কাবা শরীফে আসা লোকদের খেদমত করত। সৌদিতে বর্তমানে সেটা কল্পনাও করা যায় না। কারন বর্তমানে সৌদি সরকার অনুমোদিত হজ্ব এজেন্সি ছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে হজ্বে আসাও সম্ভব নয়। ইটালি থেকে দুই সপ্তাহের হজ্বের জন্য এজেন্সির মাধ্যমে আমার যে টাকা খরচ হয়েছে, সেই টাকায় আমেরিকায় একমাসের জন্য থাকা খাওয়াসহ ভ্রমন করা যেত। অথচ আমেরিকায় একজন সাধারন শ্রমিকের বেতন কমপক্ষে এক হাজার ডলার। অথচ সৌদিতে আমাদের দেশের অনেক শ্রমিক মাসে ৫০ ডলারও বেতন পায় না। হজ্ব এজেন্সীর লোকেরা এতই ব্যবসায়ীক যে আমাদের দুইজনের থাকার উপযোগী
একটি রুমে ৬ জনকে থাকতে বাধ্য করেছে। আমেরিকা থেকে আসা এক দল বাংলাদেশী হাজীকে এজেন্ট এয়ারপোটের্ রেখে পালিয়েছে , তারপর পবিত্র মক্কা ও মদিনা নগরীতে যে সকল নিরাপত্তাকর্মী দেখতে পেলাম তাদের খুব অল্প সংখ্যক লোকের মুখে দাড়ী দেখতে পেলাম এবং তাদের অধিকাংশের আচরনই বেয়াদব সূলভ। পরিশেষে হজ্জ মউসুমে সৌদি টেলিভিশনে প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপনের বর্ণনা দিয়ে আজকের মত আলোচনা শেষ করতে চাচ্ছি। বিজ্ঞাপনটি ছিল পবিত্র কাবা শরীফ সংলগ্ন তৈরী একটি দালানের এপার্টমেন্ট বিক্রি সংক্রান্ত। দালানটি কাবা শরীফ সংলগ্ন এবং মসজিদের মিনার থেকেও বহু উচু । বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছিল আপনি কি ঘুম থেকে জানালা খুলেই পবিত্র কাবা শরীফ দেখতে চান? তাহলে কাবা শরীফ সংলগ্ন তৈরী করা আমাদের একটি এপার্টমেন্ট ক্রয় করুন ।এপার্টমেন্টের মূল্য কেমন জানি না তবে ও রকম একটি হোটেলের একটি রুমের হজ্জ মউসুমের ভাড়া কমপক্ষে দশ থেকে বার হাজার রিয়াল। পবিত্র কাবা শরীফ ও মুসলমানদের একটি ফরজ ইবাদাত হজ্জকে কেন্দ্র করে যারা এই ব্যবসা করছে তাদেরকে খাদেম বলা যায় না। তাদের উপাধীর ভার পাঠকদের কাছেই ছেড়ে দিলাম। পরিশেষে আল্লাহ পাক মুসলমান নামধারী আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুন। আমিন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



