দেশে যখন কর্মসংস্থানের অভাব প্রকট ও বেকারের সংখ্যা প্রায় পৌনে চার কোটি তখন কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনার দিকটি বিশেষভাবে অনুসন্ধান করে দেখা কর্তব্য। অধ্যাপক এন্ডারসানের এক গবেষণায় দেখা যায়, কৃষিতে যদি কেউ এক ডলার বিনিয়োগ করতে পারে, তাহলে তার অতিরিক্ত ছয় ডলার আয় হয়। সমাজের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয় ১৫ শতাংশ। কৃষিতে উন্নতি করতে হলে আগে কৃষকের উন্নতি বিধান প্রয়োজন। এ বিষয়টি মনে রেখেই কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসারে উদ্যোগী হওয়া দরকার। বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে ইতিমধ্যেই দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীরা এগিয়ে এসেছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণেই তারা বড়ো শিল্প গড়ে তুলতে পারছে না। প্রয়োজনীয় পুঁজি ও ইকোনমিক সাপোর্ট পেলে এই ধরনের শিল্প আরো সম্প্রসারিত হবে বলেই অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। জানা গেছে, শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীরা মোটামুটি নিজেদের উদ্যোগে যেসব শিল্প গড়ে তুলেছে তার মধ্যে আছে বিভিন্ন মসলার প্যাকেটজাতকরণ, আম, আনারস প্রভৃতির আচার তৈরি এবং আটা, ময়দা, সুজি, ভোজ্য তেল ও লবণের প্যাকেটজাতকরণ। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এখানে কৃষিজাত পণ্যও অনেক। এখানে কৃষিজাত পণ্যের বাজারও অনেক বড়ো। এতোদিন কৃষিজাত পণ্য বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহৃত না হওয়ায় এগুলোর বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। জুস, জেলিসহ যেসব পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করা হয় তার সবই দেশে উৎপাদিত হতে পারে। এর যেমন একটি বিরাট বাজার রয়েছে তেমনি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও রয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতি বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এক্ষেত্রে পুঁজি লগ্নির সুযোগ যে এখনো সীমিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে আরো বলা হয়েছে গ্রামের উদ্যোগী কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ঋণ পায় না। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর। ঐ গবেষণায় আরো জানা যায়, গ্রামে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এক টাকা আমানত সংগ্রহ করলে এর মাত্র পঞ্চাশ পয়সা সেখানে বিনিয়োগ করা হয়। এই কলামে আগেও উল্লেখ করেছি শ্রমনির্ভর ক্ষুদ্র শিল্পে মূলধন কম লাগে। শিল্পের কাঁচামালও সহজেই পাওয়া যায়। কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্প ও কৃষির উন্নতি ঘটলে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নতি ঘটবে। দেশের সার্বিক উন্নতির জন্যই গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নতি প্রয়োজন। দেশের দুঃখ-দারিদ্র্য, অভাব-অনটন নিয়ে কম লেখালেখি হয়নি। এই দুঃখ-দারিদ্র্য ও অভাব-অনটন নতুন কিছুও নয়। যুগের পর যুগ ধরে এরকমই চলছে। সেজন্যই বলতে হয় কেবল দুঃখ-দারিদ্র্যের কথা লেখাই যথেষ্ট নয়, তার সঙ্গে প্রয়োজন তার প্রতিকার বা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা। বহু যুগের সঞ্চিত এই দুঃখ-দারিদ্র্য ও অভাব অনটন দূর করতে হলে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আর কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন শিল্প-কলকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার।
দেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার কথা আজকাল বেশ অনেকের মুখেই শোনা যায়। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। এদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা যে অলীক কিছু নয় তা বোধকরি অধিক ব্যাখ্যা না করলেও চলে। দেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার অনেক সুযোগও বিদ্যমান। কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও উদ্যোগের অভাবে কৃষিনির্ভর দেশের কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার তেমন ব্যবস্থা হয়নি। আমরা দেশের পাট ও পাট শিল্পের কথা জানি। পাটের অবস্থা দিন দিনই শোচনীয় হয়ে পড়ছে। পাট চাষীরা হতাশ ও বিপন্ন। পাটজাত পণ্য উৎপাদনেও আমরা পিছিয়ে আছি। দেশের পাটকলগুলোর অবস্থাও কমবেশি সকলেরই জানা। অথচ পাট ও পাট শিল্পের এখনো যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এদেশের পাটজাত পণ্যের কদরও বিদেশের বাজারে খুব কম নয়। কিন্তু সেই বাজার ধরে রাখার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে দেশের পাট ও পাটশিল্প দিন দিন এমনি শোচনীয় অবস্থার মুখে এসে পৌঁছেছে। পাট দেশের এক সময়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। সেই পাটেরই এই দুরবস্থা। এই পরিস্থিতিতে কৃষিতে নিয়োজিত লোকজনদের অভাব-অনটন ও দুঃখ-দুর্দশা ঘুচবে কীভাবে যেখানে একটি কৃষি নির্ভর দেশের কৃষিপণ্য ও কৃষিভিত্তিক শিল্পেরই এই অবস্থা। পাটের পাশাপাশি চায়ের কথাও বলতে হয়। পাটের মতোই দেশের চা-শিল্পের অবস্থাও এখন আর খুব ভালো যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে চা-এর চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন বাড়ছে না। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ১৫৮টি চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ৫৮টি বাগান ইতিমধ্যেই রুগ্ন হিসেবে চিহ্নিত। এসব চা বাগানে চা উৎপাদনের পরিমাণ প্রতি হেক্টরে ৫ থেকে ৬ কেজির বেশি নয়। গত এক দশকে চা-এর উৎপাদন বৃদ্ধির হার ভারতে ২৫ শতাংশ, শ্রীলংকায় ২২ শতাংশ ও বাংলাদেশে মাত্র ১৪ শতাংশ। এই অর্থকরী ফসলটির ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন অনেকেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠছেন।
বাংলাদেশের মোট জনশক্তির শতকরা ৬২ ভাগ কোনো না কোনোভাবে কৃষির সাথে যুক্ত। কৃষি জমির মোট আয়তন হ্রাস পাওয়ার পরও কৃষি উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য মোটেও উপেক্ষণীয় নয়। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কৃষিজাত পণ্য আমদানি করে থাকে। দেশে যে পরিমাণ গুঁড়ো দুধের ব্যবহার হয় তার সবটাই আনা হয় বিদেশ থেকে। নানা জাতের শিশুখাদ্য ও পুষ্টিকর খাবারও বিদেশ থেকেই আসে। অথচ বাংলাদেশে যেসব শস্য উৎপন্ন হয়, যেসব ফল-ফলারি জন্মায় প্রক্রিয়াকরণ ও রূপান্তরিত করার মাধ্যমে তা দিয়ে আমদানি বিকল্প পণ্য এখানেই উৎপাদন করা সম্ভব। বাংলাদেশে গোল আলু, মিষ্টি আলু উৎপন্ন হয়। এইসব আলুর ফ্লেক বা গুঁড়োর বিদেশে চাহিদা রয়েছে। একইভাবে আনারস, আম প্রভৃতি ফলের টিনজাত রস উৎপাদন করে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ও আহরণ দুইই সম্ভব। অনেক দেশেরই এই খাতে আয় খুব সামান্য নয়। অনুরূপ অর্জন বাংলাদেশের পক্ষেও সম্ভব। কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপনে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ উভয় আয়তনে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে তা অর্থনৈতিক উন্নয়নে যেমন সহায়ক হবে তেমনি বহু লোকের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


