somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভালোবাসার রসায়ন

১৬ ই জুন, ২০০৭ দুপুর ২:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সহস্র বছরের ইতিহাসকে এক সেকেন্ডে ভাবার চেষ্টা করুন। দুটো শব্দ উঁকি দেবে। মানুষ ও মানবিকতা। এবার মানবিকতাকে একটি বৃত্ত হিসেবে কল্পনা করুন। বৃত্তের ঠিক মাঝ বরাবর ম্যাগনিফাইং গ্লাস রেখে চোখ রাখুন। কেন্দ্রে একটিমাত্র শব্দের অস্তিত্ব। তা হলো, ভালোবাসা।
প্রাণী মাত্রই ভালবাসবে। আর তার সমার্থক হিসেবে কারো মনে যদি ‘প্রেম’ শব্দটা হানা দেয়, তবে তিনি মানুষ না হয়ে পারেন না। কেননা মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীর নিউরাল নেটওয়ার্ক অতোটা বিস্তৃত নয় যে একটি মাত্র শব্দের সঙ্গে সুতো জড়িয়ে তা থেকে সে রোমাঞ্চকর, জটিল, উদ্দীপক ও অসংজ্ঞায়িত আরেকটি ধোঁয়াটে বিষয়কে টেনে আনতে সম।
আর ভালোবাসার সংজ্ঞা? না, একে নিছক অনুভূতি বলতে প্রায় সকলেই কুণ্ঠাবোধ করবেন। আজ থেকে প্রায় ৪ হাজার বছর আগে ভারতীয় চারবাক দার্শনিকরা প্রাণকে ব্যাখ্যা করেছিলেন মদশক্তিগুণসম্পন্ন বিশেষ এক যৌগের সঙ্গে। অনুভূতি হলো যে যৌগের মাদকতা। উত্তর আধুনিক যুগের বিজ্ঞানীরাও প্রাণের সঙ্গে সেই মদশক্তির যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন (তবে বোতলটা ঢের পাল্টে গেছে)। অধুনাদের জন্য প্রাণের আরেক অর্থ হলো দেহকোষের ডিএনএর ভেতর চলতে থাকা জটিল এক রাসায়নিক খেলা। ভালোবাসাও যার উর্ধ্বে নয়। সোজাসাপ্টাভাবে বলতে গেলে, ভালোবাসা বিশেষ অনুভূতি ঠিকই, তবে বায়বীয় নয়। কাচের জারে রাখা রাসায়নিক যৌগের মতোই তরল (কিছুটা ঝাঁঝাঁলোও বটে)। আর এই তত্ত্বের ভিত্তিতে বেশ কবছর ধরে প্রকাশিত হয়ে আসছে ভালোবাসার সহজ সরল রাসায়নিক উপাখ্যান। একে একে আবিষ্কৃত হয়েছে হরমোনরূপী বেশকটি ভালোবাসার কারিগর, প্রেমের কন্ট্রোল ইউনিট এবং আবেগের জেট ইঞ্জিন।
অন্ধপ্রেমের মুখবন্ধ:
বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই মানব-মানবীযুগল একে অপরের প্রতি আকর্ষণবোধ করতে পারে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, আকর্ষণবোধের কয়েক সেকেন্ড আগে তাদের উভয়ের যকৃতের পাশে থাকা এড্রিনালিন গ্রন্থিতে ছোটখাট বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সাময়িকভাবে চোখে সর্ষে ফুল দেখার শুরুটাও হয় তখন থেকে।
এড্রিনালিন থেকে নির্গত হওয়া ফিনাইলইথাইলএমিন হরমোনটি øায়ুকোষে তথ্য আদান-প্রদানের গতি বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুন। এড্রিনালিন হরমোনের কারণে হৃদয়ের ভেতর শুরু হয় আবেগের ইঁদুর দৌড়। আর ভাললাগার অনুভূতির জন্য ডোপামিন তো রয়েছেই। পুরো প্রক্রিয়াটির জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে নরএপিনএফ্রিন হরমোন। এড্রিনালিন গ্রন্থিতে ক্রমাগত হরমোনের নিঃসরণ ঘটানোই যার কাজ। হরমোনগুলোর মিলিত রাসায়নিক প্রভাবে তৈরি হয় বাড়তি উদ্দীপনা। গোলাপি ডানায় ভর করে ভেসে বেড়ানো আর রাত জেগে ফোনালাপের ক্যালরির যোগান দেয়ার দায়িত্বটাও তাদের ঘাড়ে বর্তায়। প্রথম দর্শনে প্রেম তথা অন্ধপ্রেমের সূচনা ঘটে এভাবেই। তবে বিপরীত লিঙ্গের বিশেষ কাউকে ভাললাগার পেছনেও রয়েছে জটিল আরেক রসায়ন। শৈশবের স্মৃতি, মা-বাবার আচরণ এবং জিনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভালোবাসার মানচিত্রই (লাভ ম্যাপ) বলে দেবে কাকে দেখার পর আপনি চোখ বুজে ঝাঁপ দিতে পারেন।
যে কারণে একজনই সেরা:
স্তন্যপায়ী প্রাণীকুলে মাত্র ৩ শতাংশ একগামী। অর্থাৎ একজনেই তুষ্ট। দুর্ভাগ্য অথবা সৌভাগ্য যাই বলুন না কেন, প্রাকৃতিকভাবে মানুষ এর মধ্যে নেই। অর্থাৎ ভালোবাসার বিশ্বায়ন ঘটাতে মনুষ্যহৃদয় সদা প্রস্তুত। কিন্তু সামান্য পরিমাণ ভেসোপ্রেসিন আপনার হৃদয়ের কাঠামোয় এনে দিতে পারে আমূল পরিবর্তন। কেবল একজনকে ভেতরে রেখে আবেগের খোলা জানালাগুলো সটাসট বন্ধ করে দিতে ভেসোপ্রেসিনের জুড়ি নেই। এ জন্যই রাসায়নিক এ বস্তুটির আরেক নাম মনোগামাস (একগামী) কেমিক্যাল। যার শরীরে প্রাকৃতিকভাবে রাসায়নিক বস্তুটি অঢেল থাকে তাকে নানা জনের কাছে আবেগের ধরনা দিয়ে ঘুরতে হয় না। একবার যাকে ভাল লাগে তাকে নিয়েই তিনি পার্থিব, অপার্থিব সকল জগতের স্বপ্ন সাজাতে থাকেন।
স্পর্শের সমীকরণ:
প্রণয়জুটির স্পর্শ আর সাধারণ স্পর্শের মাঝে রয়েছে আকাশ-পাতাল ফারাক। বিশেষ স্পর্শে আপনার নিউরো ট্রান্সমিটারের মাথা খারাপ হয়ে যাওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। অথবা প্রিয়জনের বিশেষ চাহনী বা কণ্ঠও আপনার কাছে মাঝে মাঝে স্বর্গীয় বলে মনে হতে পারে। কারণ একটাই, তা হলো অক্সিটসিন হরমোনের আধিক্য। আবেগঘন সময় কাটাতে এ অক্সিটসিনই একমাত্র সহায়। তা না হলে যতোই বাঁকা চোখ আর হাত ধরাধরি করে বসে থাকুন না কেন, চোখ কুঁচকে আপনি ভাবতে থাকবেন, ইজ দিস লাভ?
বিরহ ঠেকাবে এন্ড্রোফিন:
ধরা যাক, উš§ত্ত দিনগুলো আপনি বেশ দৃঢ়চিত্তে পেরিয়ে এসেছেন। মহাড়ম্বরে বিয়েও করেছেন। কিন্তু কাছাকাছি না থাকার বিরহ যন্ত্রণাটুকু কিছুতেই তাড়াতে পারছেন না। আবার অনেককে দেখছেন সঙ্গী/সঙ্গিনী থেকে শতমাইল দূরে থাকা সত্ত্বেও হাসিমুখে দিনের পর দিন কাটাচ্ছে। ব্যাপারটা মোটেই গোলমেলে নয়। এন্ড্রোফিন হরমোনের স্বল্পতাই আপনাকে ক্রমশ কাতর করে দিচ্ছে। বিপরীতক্রমে যে হরমোনটির সরব উপস্থিতিতে প্রিয়জনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও অনেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘনিষ্ঠতা, নির্ভরশীলতা ও উষ্ণতার অনুভূতি পাচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক গাউলস্টোনের ভাষায়, ‘আমরা ভালোবাসা ভালবাসি, তাই এন্ড্রোফিনকে নিয়ে আমরা ভালবাসতে চাই।’
অতঃপর চকোলেট!:
ভালোবাসার রসায়নে চকোলেটের ভূমিকা নেহাৎ কম নয়। কেননা একেকটি চকোলেট ফিনাইলইথাইলএমিনের বিশাল ভাণ্ডার। যা কি-না এম্ফিটামিন হরমোনের সহোদর। যারা চকোলেট ভালবাসেন তাদের দেহে সেই ডোপামিন আর নরএপিনএফ্রিন তৈরি হয় যথেষ্ট পরিমাণে। øায়ুকোষ ও নিউরো ট্রান্সমিটারে তথ্য সরবরাহের গতিও বাড়ে জ্যামিতিক হারে। সুতরাং ভেবে দেখুন ভ্যালেন্টাইন ডে’র উপহার হিসেবে এক বাক্সো চকোলেট কতোটুকু উপকারী হতে পারে!
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×