(সতর্কীকরণ: ইহা একটি শতভাগ শিশুতোষ গল্প)
সাল ২০৫০। মানব সভ্যতা অনেকদূর এগিয়েছে। এগিয়েছে ভূতরাও। তবে জ্ঞান-বিজ্ঞানে ভূতরা মানুষের চেয়ে বেশখানি পিছিয়েই আছে। মানুষ গেছে প্লুটোয়, আর ভূত সবে চাঁদের মাটিতে পা দিয়েছে। নাসা (আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র) যেখানে একের পর এক এলিয়েনের গ্রহ আবিষ্কার করে চলেছে, ভূতদের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র টাঁসা তখন সবে নেপচুন-ইউরেনাসে ভূতবাহী নভোযান পাঠানোর প্ল্যান করেছে।
ভূতদের নামও পাল্টেছে। একসময় তাদের গেছোভূত, মেছোভূত, পানিভূত বলে ডাকা হতো। এখন তাদের নাম হয়েছে, টাওয়ার ভূত, স্যাটেলাইট ভূত, টারবো জেট ভূত। মোটকথা, শুধু ভয় দেখানোই এখন ভূতদের একমাত্র কাজ নয়। পড়াশোনা করে তারা একেকজন বিজ্ঞানীও হয়েছে। আবিষ্কার করেছে নতুন অনেক কিছুই। কিছু কিছু আবিষ্কার মানুষকেও পেছনে ফেলে দেয়ার মতো। তবে কারণে অকারণে মানুষকে ভয় দেখানোর অভ্যেসটুকু অনেক ভূতই এখনো ছাড়তে পারেনি। এমনকি ভয় দেখানোর কৌশল বের করতে নিত্য নতুন গবেষণাও চলছে তাদের মাঝে। পিলে চমকে দিতে বানাচ্ছে একের পর এক অত্যাধুনিক ভুতোস্কোপ (ভয় দেখানোর যন্ত্র)। তেমনি এক ভুতোস্কোপ বিশেষজ্ঞ হলেন ভয়ানস্কি (তার বাড়ি রাশিয়ার রেড স্কয়ারে)। কিছুদিন আগে ভয় দেখানোর ওপর তিনি একটা বইও লিখেছেন। নাম দা ভুতোং কোড। ভূতদের মাঝে বেস্ট সেলার। সেই ভয়ানস্কির নতুন প্রজেক্ট নিয়েই এই গল্প।
সকালের নাস্তায় আরশোলার কাটা মুণ্ডুর সঙ্গে পিপিংগা (বিশেষ জেলি) মিশিয়ে কামড় দিতেই প্রথম আইডিয়াটি পেলেন ভয়ানস্কি। বয়স যতো বাড়ছে ততোই তার মাথা খুলছে। মারা গিয়েছিলেন ২০২০-এর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি’র প্রধান বিজ্ঞানী ছিলেন তিনি। মরে গিয়ে হলেন ভূত-বিজ্ঞানী। তবে ভূতদের মধ্যে কোনো রাশিয়া-আমেরিকা বা ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব নেই। তাই গবেষণার জন্য অফুরন্ত সময় পাচ্ছেন তিনি।
নাস্তা সেরে ঝটপট টিন্টারনেটে (ভূতদের ইন্টারনেট) নিউজ হেডলাইনগুলো পড়ে নিলেন ভয়ানস্কি। চাঁদের মিশন আরো দশ দিন পিছিয়েছে। ‘নাহ, টাঁসার ভূতগুলোর মাথায় নির্ভেজাল গোবর, প্রত্যেককে আছড়ে মানুষ বানিয়ে দেয়া উচিৎ’ আপনমনে বিড়বিড় করলেন ভয়ানস্কি।
গত এক মাস ধরে বিজ্ঞানী ভয়ানস্কি আমেরিকার নিউইয়র্কে একটি উঁচু টাওয়ারের চূড়ায় পরিত্যাক্ত এক গ্যাস চেম্বারে থাকছেন। উষ্ণ হাওয়াটা মোটামুটি আরামদায়ক। শুধু ঘর ছেড়ে বেরুলেই এসির ঠাণ্ডা হাওয়ায় তার বায়বীয় শরীরটা কুঁকড়ে আসে। তবে আজ নামার সময় অতোটা ঠাণ্ডা লাগলো না। ভয়ানস্কির মন তাই নিমেশেই ফুরফুরে হয়ে গেল। পকেটে চাবির রিং সাইজের মিনি ভুতোস্কোপ। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দুটো বাচ্চাকে দেখলেন ঝগড়া করছে। বাচ্চা দেখলেই ভুতোস্কোপটা নিতে ভয়ানস্কির হাত নিশপিশ করে। যন্ত্রটা হাতে নিয়েই ফেললেন। লাল বোতামে চাপ দিতেই বেরিয়ে আসলো সাদা কাপড় পড়া এক হলোগ্রাফিক মুণ্ডুকাটা মানুষ। ভয়ানস্কি নিজেই খানিকটা শিউরে উঠলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো বাচ্চাগুলো একটুও ভয় পেলো না। ঝগড়া থামিয়ে দুজনেই মুণ্ডুকাটা হলোগ্রাফিক ভিডিওর দিকে তাকিয়ে থাকলো। একজনতো সাহস করে হাতই বাড়িয়ে দিল সামনে। হাত বাড়িয়েই বিরক্ত চোখে বললো, ধূর! এই ভূতটা একদম আনস্মার্ট। দ্যাখ না, টাইটা কতো পুরনো। আবার দুজনের ঝগড়া শুরু। ভয়ানস্কি শুধু অবাকই হলেন না, কিছুটা লজ্জাও পেলেন। অথচ, ভুতোং কোড বইতে তিনি এই ভুতোস্কোপের কতো গুণকীর্তনই না গেয়েছেন! ছি ছি, এটা শুনলে ভূতরা কী বলবে!
অবশ্য নতুন যে আইডিয়াটি পেয়েছেন তা নিয়ে ভয়ানস্কি দারুণ আশাবাদি। ভূতরাই জ্ঞান রাখতে হিমশিম খাবে, আর মানুষতো নস্যি। ভয়ানস্কি দেরি করলেন না। নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায় খানিকটা উড়ে উড়ে চলতে লাগলেন। যতো দ্রুত সম্ভব জিনিসটা বানাতে হবে।
দশটা দোকান ঘুরে সবগুলো জিনিস সংগ্রহ করলেন ভয়ানস্কি। পকেটের সব ডলার শেষ। তারপরও খুশি। যে জিনিসটা বানাতে যাচ্ছেন তাতে সফল হলে প্রয়োজনে তিন রাত না খেয়ে থাকবেন। নতুন প্রজেক্টের নামটা দিলেন সেই বেস্ট সেলার বইয়ের নামেই। প্রজেক্টের নাম ভুতোং কোড। যে কোড পুরো মানব সভ্যতাকে মুহূর্তের মধ্যে ভড়কে দেবে। আতঙ্কে নীল করে দেবে সবাইকে। দিবাস্বপ্ন দেখা শুরু করে দিলেন ভয়ানস্কি। ব্যাগভর্তি যন্ত্রপাতি নিয়ে নিজের আস্তানায় ফিরে এলেন। এতোক্ষণ মানুষের রূপ ধরে হাঁটাচলা করলেও এখন তিনি আস্ত ভুত। নিজের ঘরে মানুষের রূপ ধরে থাকতে তার ভালো লাগে না। ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায়। যাই হোক, ভয়ানস্কি তার ভিডিও কনফারেন্স অন করলেন। সঙ্গে সঙ্গে বড় একটি স্ক্রিনে আন্তর্জাতিক ভুত সংঘের সদস্যদের দেখা গেলো। কারো মুণ্ডু নেই, কারো হাত-পা কাটা, কারো বা দুই মাথা। ভয়ানস্কি দেরি না করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশে বলা শুরু করলেন, ‘সম্মানিত ভুতবৃন্দ, আপনাদের অভিবাদন। আজ আমার জীবনের বিশেষ একটি দিন। আজ আমি এমন একটি যন্ত্র বানাতে যাচ্ছি যা দিয়ে মানব সভ্যতাকে চিরতার রসের মতো ভুতের ভয় গিলিয়ে দেয়া যাবে। যতোদিন বেঁচে থাকবে ততোদিন এ ভয়ের স্মৃতি তারা ভুলতে পারবে না।’ এমন সময় স্ক্রিনের এক সদস্য রাশভারী কণ্ঠে বললেন, ‘আপনার ভুতোস্কোপ এখন অকেজো হয়ে গেছে ভয়ানস্কি। নতুন কিছু করুন।' ভয়ানস্কির বায়বীয় চেহারায় মৃদু হাসির ছাপ। সঙ্গে আত্ববিশ্বাসও রয়েছে। যাক ভুত সংঘের কাছ থেকে নতুন প্রজেক্টের জন্য মোটা অংকের ডলারও পাওয়া যাবে মনে হচ্ছে।
টানা ৫ ঘণ্টা খেটে যন্ত্রটা বানালেন ভয়ানস্কি। তার মনে দুশ্চিন্তা, আনন্দ, উচ্ছ্বাস সবই আছে। যন্ত্রটা চালাতে হলে স্যাটেলাইট ভুতের সাহায্য লাগবে। ভয়ানস্কির এক বন্ধু সিয়ার্স টাওয়ারে থাকে। তার সঙ্গেই যোগাযোগ করবেন বলে ঠিক করলেন। টেঁলফোনে (ভুতের মোবাইল) স্যাটেলাইট ভুত একচোখা উইলিয়ামের নাম্বার ডায়াল করলেন ভয়ানস্কি।
হ্যালো উইলিয়াম আমি ভয়ানস্কি। অপরপ্রান্ত থেকে, হ্যাঁ বন্ধুঁ বঁলঁ। ভয়ানস্কি বললেন, তোমার নাকি সুরে কথা বলার অভ্যেসটা আর গেলো না। দ্রুত কাজের কথায় চলে গেলেন ভয়ানস্কি, শোন নতুন মেশিন বানিয়েছি। নাম রেখেছি 'হাউমাউ'। উঁচু একটা টাওয়ারে বসাতে হবে। ঝটপট একচোখা উইলিয়ামকে নতুন মেশিনের খুঁটিনাটি সব বুঝিয়ে দিলেন ভয়ানস্কি। উইলিয়ামও বেজায় খুশি। যাক অনেকদিন পর মানুষকে বাগে পেতে যাচ্ছে তারা। এবার ভয় না পেয়ে বাছারা যাবে কই!
স্যাটেলাইট ভুত উইলিয়ামের সহায়তায় ভয়ানস্কি তার নতুন মেশিনটি বসিয়ে দিলেন কপথে ঘুরতে থাকা সবচে বড় স্যাটেলাইটটিতে। এবার যথাযথ সময়ের অপো। অমাবস্যা শুরু হলেই হাউমাউয়েরর বুজরুকি শুরু হবে। মনে মনে বেশ শিহরিত হলেন ভয়ানস্কি। এবার একজন দুজন নয়, পুরো মানব জাতিকে ভয় আর আতঙ্কের সাগরে ডুবিয়ে ছাড়বেন।
যথারীতি একদিন অমাবস্যা এলো। নিজের ঘরে বসে বড় একটি স্ক্রিনের সামনে বসে আছেন ভয়ানস্কি। হাতে ছোট্ট একটি রিমোট কন্ট্রোলার। তাতে লাল ও সবুজ রংয়ের দুটো সুইচ। ভয়ানস্কি লাল বাটনের উপর হাসি হাসি মুখে হাত বুলোচ্ছেন। ঠিক বারোটা বাজতেই তাতে চাপ দিলেন। অন হয়ে গেলো হাউমাউ। সিয়ার্স টাওয়ারের ওপর মৃদু আলোর ঝলকানি দেখা গেলো। চকচকে চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন ভয়ানস্কি। মিনিট খানেক পরই পুরো শহরের সবগুলো টিভি রেডিও অন হয়ে গেলো। জেগে উঠলো পুরো দেশের মানুষ। একসঙ্গে ফুল সাউন্ডে বেজে উঠলো সবগুলো টিভি, প্রজেক্টর, রেডিও, কম্পিউটার, হলোগ্রাফিক স্ক্রিন। সামনে রাখা জ্বলজ্বলে স্ক্রিনে সবই দেখতে পাচ্ছেন ভয়ানস্কি। সবগুলো চ্যানেলেই দেখা যাচ্ছে ভুত সংঘের একজন সংবাদ পাঠক মানুষের রূপ ধরে খবর পড়ছে। লোকজন আতঙ্কিত হয়ে সেই খবর শুনছে। খবরে বলা হচ্ছে, ‘পুরো মানব সভ্যতার জন্য ভয়াবহ দুঃসংবাদ। একটি অতিকায় গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে। বিজ্ঞানীরা সেই গ্রহাণুকে আটকাতে পারছেন না। আর এক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রহাণুটি পৃথিবীর মাটিতে আছড়ে পড়বে। পুরো পৃথিবীই ধ্বংস হয়ে যাবে। বাঁচার আর কোনো উপায় নেই।’ বারকয়েক এ খবর শোনার পর সবগুলো টিভি একযোগে বন্ধ হয়ে গেলো। সিয়ার্স টাওয়ারের উপর রাখা ভুতোং কোড মেশিনটিও বন্ধ হয়ে গেলো। ভয়ানস্কির পরিশ্রম সার্থক হলো। মানুষজন চিৎকার ছুঁড়তে ছুঁড়তে পাগলের মতো এদিক সেদিক দৌড়াচ্ছে। কেউ বা মাটি খুঁড়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। কেউ রাস্তায় শুয়ে হাউ মাউ করে কাঁদছে। বাচ্চারা ভয়ে কাঁদতেও ভুলে গেছে। মা-বাবারাও উদভ্রান্তের মতো সন্তানদের নিয়ে দৌড়াচ্ছে। পুরো পৃথিবীই যেখানে ধ্বংস হয়ে যাবে সেখানে পালানোটা অর্থহীন। এটা যেনে অনেকেই একযোগে প্রার্থনায় মেতেছে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো দেশজুড়ে কান্নার রোল পড়ে গেলো। ভয়ানস্কির খুশি আর ধরে না। টিভি চ্যানেল আর পাওয়ার স্টেশনগুলো কব্জা করে কি ভয়টাই না দেখানো গেলো! হঠাৎ স্ক্রিনের একটা দৃশ্যে চোখ আটকে গেলো ভয়ানস্কির। রাস্তায় একটা ছোট্ট শিশু বসে কাঁদছে। সঙ্গে মা-বাবা নেই। কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। ভয়ানস্কির মনটা কেমন যেন করে উঠলো। নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছে তার। নাহ কাজটা ঠিক হয়নি। মানুষকে অতো ভয় দেখানো ঠিক না। পরে আর ছোটখাট ভৌতিক ঘটনায় কেউ ভয় পাবে না। আর বাচ্চাদের মিছিমিছি কষ্ট দিয়ে কী লাভ। ভয়ানস্কি রিমোটের সবুজ সুইচটায় চাপ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে শহরের সবগুলো টিভি, রেডিও আবার অন হয়ে গেলো। সবাই চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ ফেলে তাকিয়ে রইলো নতুন খবর শোনার আশায়। স্ক্রিনে আবার সেই মানুষরূপী ভুত। তবে এবার আর সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথা বলছে না সেই সংবাদ পাঠক। কিছুটা কৌতুকের সুরে বললো, ‘সুধী দর্শকবৃন্দ। আপনাদের স্বাগতম। আমি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ভুত ভয়ানস্কির তৈরি একটি সিম্যুলেশন সফটওয়্যার। একটু আগে আপনারা যা শুনেছিলেন তার পুরোটাই মিথ্যে। সাময়িকভাবে ভয় দেখানোর জন্য আমরা মানে ভুতরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’ সবগুলো টিভি আবার বন্ধ হয়ে গেলো। মানুষের ভয় এখনো কাটেনি। সবাই হা করে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। ভয়ানস্কি তার আস্তানায় চুপচাপ বসে রইলেন।
(ধ্রুব নীল, গোল্লাছুট, প্রথম আলো)
ধ্রুব নীল = ফয়সল আবদুল্লাহ = ফয়সল

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

