'ইটস ইম্পসিবল মাই লিটল হিউম্যান বয়, এ কিছুতেই সম্ভব নয়'। বলেই টিস্যু দিয়ে মুখ মুছলেন ভয়ানস্কি। কাঁচা পাকা দাড়ির আড়ালে সামান্য হেসেছেনও। তবে সামনে বসা বছর দশ বারো বয়সী ছেলেটা তা টের পায়নি। পেলে চিত্কার দিয়ে গোটা কোম্পানি মাথায় তুলতো।
ছেলেটার নাম অন্তু। একটা পা নেই। ক্রাচে ভর করে চলে। আধঘণ্টা অপো শেষে কোম্পানির মহাপরিচালক ভয়ানস্কি ভুতোকোভের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে সে। সুতরাং এক কথাতে হার মানবে বলে মনে হয় না। রিসেপশনের ভুতটা অবশ্য বেশ ক'বার শাসিয়েছে, 'স্যারের সঙ্গে মোটেও তর্ক করা যাবে না!' এও বলেছে, যা হবার নয়, তা নিয়ে যেন অন্তু মোটেও বাড়াবাড়ি না করে। কিন্তু ছোট হলে কী হবে! অন্তু নাছোড়বান্দা।
৩০৩৩ সালের ২৮ আগস্ট যেদিন ভুতের সঙ্গে মানুষের শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় সেদিন ভয়ানস্কি প্রথম মাথায় হাত দেন। চুক্তির পরই তার ভয় দেখানোর কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের ব্যবসায় ধস নামে। ভুত ও মানুষে বন্ধুত্ব হয়ে যাওয়ায় তার ভয় দেখানোর যন্ত্র ভুতোস্কোপের বিক্রিও শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এরপর মনের দুঃখে সুদুর আমেরিকা থেকে পথ হারিয়ে ভুত সাম্রাজ্যের এককালের মহাতারকা ভুত-বিজ্ঞানী ভয়ানস্কি চলে আসেন বাংলাদেশে। এসেই পেয়ে যান নতুন ব্যবসার আইডিয়া। মাত্র ৩ বছরেই তার নিজ হাতে গড়া 'ভুতুড়ে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি' রমরমা ব্যবসা শুরু করে। কোম্পানির কাজ হল, বিশেষ প্রয়োজনে ভুত ভাড়া দেয়া। বিশেষ করে ভুতের সিনেমা হলে তো কথাই নেই। নায়ক-নায়িকা সবই আছে তার কোম্পানিতে। আসল ভুত থাকতে কেউ আর শখ করে হরর মুভিতে মানুষকে কাজে লাগায়!
'কিন্তু ভুত আমার চাই চাই!' অন্তু এবার কিছুটা চিত্কার করে বলল। ভয়ানস্কির চোখ কুঁচকে গেল। 'দেখ ছেলে, তোমার এখনও আঠার হয়নি, তোমার সঙ্গে ব্যবসা করা সম্ভব নয়।'
'কিন্তু আমি তোমাকে টাকা দেব। কত চাই বল!' অন্তুর কথার ঝাঁঝ বোঝার চেষ্টা করলেন ভয়ানস্কি। মনে হচ্ছে হার স্বীকার করতেই হবে।
'ঠিকাছে দেব, ভুত ভাড়া দেব, কিন্তু আগেই বলে রাখছি, এ কাজে আমার কোম্পানির এজেন্টরা নির্ঘাত ফেল করবে। ওরা কখনও...'।
'ওদের জেতানোর দায়িত্ব আমার মিস্টার ভয়ানস্কি।' অন্তুর কথার দৃঢ়তা দেখে অবাক না হয়ে পারলেন না ভয়ানস্কি। তারপরও মাথা নিচু করে এদিক সেদিক মাথা নাড়লেন। 'উঁহু, ওরা পারবে না, শুধু শুধু আমার কোম্পানির সুনাম নষ্ট হবে আর কি!'
'এই নিন টাকা!' বলেই টেবিলে একটা ব্যাগ রাখে অন্তু। 'ভেতরে এক হাজারটা দুই টাকার নোট আছে। বেশিরভাগই ছেঁড়া, তবে দুই টাকার নোট সবই চলে!' ভয়ানস্কির চেহারায় এবার কিছুটা খুশির ভাব ফুটে। মনে মনে ভাবেন, 'যাক্, নরমাল রেটের দেড়গুণ বেশি পাওয়া যাচ্ছে।'
'হুম। ঠিকাছে। সময়মত পাঠিয়ে দেব। তবে এগারোর বেশি একজনও পাঠাতে পারব না।'
'আমার এগার জনই দরকার। ক্রিকেট খেলতে এগার জনই লাগে।' বলেই অন্তু আর বসলো না। ক্রাচ বগলদাবা করে হন হন করে হাঁটা দিল। যাওয়ার সময় রিসেপশনে বসা ভুতের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকে বলল, শাকচুন্নি!
ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে ভাবছেন ভয়ানস্কি। ক্রিকেট পুরোটাই মানুষের খেলা। খেলতে মগজ লাগে। ভুতরা বড়জোর কানামাছি খেলতে পারে। তাছাড়া বেশিরভাগ ভুতের তো মাথাই নেই। খেলবে কী করে!
গত বছরেই সপ্তাহে নতুন একটা দিন যোগ করা হয়েছে; খেলাবার। এদিন সকল সরকারি কর্মচারিদের বাধ্যতামূলকভাবে খেলতে হবে। স্কুলপড়ুয়ারারা খেলবে ইচ্ছেমত, যা খুশি। কেউ বাধা দিতে পারবে না। বাধা দিলেই জেল-জরিমানা।
আজকের খেলাবারটা অন্তুর জন্য বিশেষ দিন। আজ তার ভুত একাদশ খেলবে রাক্ষস একাদশের বিরুদ্ধে। একটা পা নেই দেখে অন্তু নিজে খেলতে পারে না। তাতে কী! এগারোটা ভুতকে ভাল করে বোলিং ব্যাটিং শিখিয়েছে। কোচ হিসেবে যে সে ব্যর্থ নয়, এটা প্রমাণ করতে ভালমতই প্রস্তুত ভুত একাদশ।
খেলাটা অন্যরকম। তাই বেশকটি টিভি চ্যানেল আল্ট্রা স্যাটেলাইট সম্প্রচার করবে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এক মাঠের খেলা দেখা যাবে গোটা সৌরজগতে।
রাসদের দল রেডি। ভুতদের সব টেকনিক শেষবারের মত বুঝিয়ে দিচ্ছে অন্তু। 'শোনো কন্ধকাটা, হাত নেড়ে বাতাসের গতি মেপে বুঝে নিতে হবে, বল কোনদিকে যাচ্ছে, ঠিকাছে?' 'ইঁয়েঁস স্যাঁর'। সঙ্গে সঙ্গে হাতকাটা ভুত বলল, 'আঁর আঁমার কাঁজ হঁল ফুঁ দিয়ে অঁক্কা মারা।' 'অক্কা না! গাধা কোথাকার! ছক্কা!' 'ভুঁল হঁয়ে গেঁছে স্যাঁর'।
আগে ব্যাটিং করবে রাক্ষস একাদশ। সুতরাং ভুত খেলোয়াড়দের সঙ্গে আর কথা বলার সুযোগ নেই অন্তুর। ফাস্ট বোলার পঞ্চহাতি ভুত জায়গা মত পৌঁছে গেছে। হাত পাঁচটা। একবার এক হাতে বল নিয়ে লোফালুফি খেলছে। ব্যাটসম্যান রাক্ষসও মহা মুশকিলে পড়েছে। কোন হাতের দিকে খেয়াল রাখবে!
খেলা শুরু! একি! উইকেট কিপারের গ্লাভস নেই! পরবে কোথায়! হাতই তো নেই! তবে! অন্তু মোটেও চিন্তিত নয়। দাঁত দিয়ে কামড়ে বল ধরার টেকনিক শিখিয়েছে হাতাকাটা ভুতকে।
প্রথম বল। রাক্ষসের ইয়া মোটা পায়ের আড়ালে চলে গেছে স্ট্যাম্প। তাই পায়েই বল ছুড়েছে পঞ্চহাতি। রাবারের মত পা। তাতেই বল বাউন্স করে সোজা সীমানার বাইরে। মুখ কালো করে বল কুড়িয়ে আনলো কেলে ভুত।
পরের বল, এবারও একই ঘটনা। রাক্ষসের ভুড়িতে লেগে ছক্কা। ওভারের শেষ বল। পঞ্চহাতিকে ভয়ার্ত দেখাচ্ছে। কেননা, অপর প্রান্তের রাক্ষসটা দাঁত কেলিয়ে হাসছে। এবার বোধহয় ব্যাট দিয়েই মারবে।
অন্তু যা আশঙ্কা করছিল তাই। সজোরে হাঁকিয়েছে রাক্ষসটা। খেলা দেখতে আসা দর্শকরা সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ দূরবীনে চোখ লাগাল। বল যতদূরেই যাক না কেন, দেখা যাবে। সবাই যা দেখল, বিশ্বাস করা মুশকিল। বল মাঠের বাইরে, একটু পর বাংলাদেশের বাইরে, এরপর এশিয়ার বাইরে! সবাই অপেক্ষা করছে বলের জন্য। ভাগ্যিস পৃথিবীটা গোল। তাই একসময় গোটা দুনিয়া ঘুরে শেষে বল পৌঁছাল মাঠের উল্টো পাশ দিয়ে। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই বলে রান হয়েছে সোয়া এক লাখ। বল যতটুকু জায়গা ঘুরে এসেছে তাতে শুধু ছয় কিছুতেই দেয়া যায় না।
অন্তুর চোখে হতাশা। নাহ্, ভুতরা এতো রান কিভাবে করবে! পাঁচ ওভারে রাক্ষসদের রান নিরানব্বই লাখ পঁচাত্তর হাজার চারশ। পরের ওভার করতে দৌড় শুরু করেছে চারচোখা। তার সমস্যা, সে তিনটার জায়গায় ছটা স্ট্যাম্প দেখছে। কাজের কাজ হয়েছে এতে। অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বল। কানায় লেগে বল কিপারের মুখে। আউট! ভুতদের উল্লাস দেখে কে! রীতিমত শরীর থেকে হাত-পা খুলে চেঁচামেচি।
চারচোখা এক ওভারেই পাঁচ উইকেট নিল। পরের ওভার করবে একপায়া। লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে আসছে। সজোরে বল ছুড়লো।
'হ্যাঁচ্চো!' আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাঁচি দিল ব্যাটসম্যান। হাঁচির ধাক্কায় বল ছিটকে গেল বোলারের দিকে। ক্যাচ ধরবে কি! একপায়ার হাত ফুটো করে বল স্টেডিয়ামের বাইরে।
পরের বল। ব্যাট চালাতে গিয়ে ভুলে পা চালিয়ে দিল রাক্ষস ব্যাটসম্যান। বল সোজা উপরে। মেঘের স্তর ভেদ করতেই বাতাসের ধাক্কায় সীমানা বরাবর পৌঁছে গেল। এক সঙ্গে এগার ভুত ছুটল সেই বল ধরতে। কে কার উপর গড়িয়ে পড়লো বোঝা গেল না। তবে বল আর খুঁজে পাওয়া গেল না। নতুন বল আনতে আনতে বিদ্যুত গতিতে রান নিল রাক্ষসরা। এক মিনিটে পঞ্চান্ন হাজার দুইশ তিন রান!
প্রথম ইনিংসের খেলা শেষ। রাক্ষসদের স্কোর দুই কোটি দশ লাখ বত্রিশ হাজার। ভুতদের মুখ কালো। অন্তু আশা ছেড়ে দিয়েছে। তার টিফিনের পয়সা বাঁচানো টাকাটা জলেই গেল বুঝি।
ওপেনিং ব্যাটসম্যান হাতকাটা ভুত ও কন্ধকাটা। হাতকাটার হাত নেই তাই ব্যাট ছাড়াই নেমেছে। দানবাকৃতির রাক্ষস বল হাতে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। যেন আগুনের গোলা ছুড়ে মারবে।
প্রথম বল! সজোরে ফুঁ দিল হাতকাটা। উড়তে উড়তে বল গেল দর্শক সারিতে। চার রান। কিন্তু বিশ ওভারের খেলায় বলপ্রতি পৌনে দুই লাখ করে রান লাগবে। কেউ তাই হাত তালি দিল না। তবে রাক্ষস বোলার রেগেছে ঠিকই। চোখ লাল করে ছুড়লো ওভারের পরের বল। এলবিডব্লিউর আবেদন করার জন্য উইকেট কিপার হাত তুলেছিল। কিন্তু ততক্ষণে ব্যাটসম্যানের পা ফুটো করে যাওয়া বলের ধাক্কায় স্ট্যাম্প সীমানার বাইরে।
পরের ব্যাটসম্যান শ্যাওড়া ভুত। লিকলিকে শরীর। ব্যাটটাও চিকন। পা দুটো ঠক ঠক করে কাঁপছে।
পরের বল। কিন্তু বল জায়গামত পৌঁছানোর আগেই ব্যাটসম্যান সীমানার বাইরে। মাঠে নামার আগে আরো তিনজন ব্যাটসম্যান গায়েব। ভয়ে পালিয়েছে। বাকি যারা আছে তারা অন্তুর ভয়ে পালাতে পারছে না। পালালে ভুতুড়ে কোম্পানির চাকরি হারাতে হবে। অবশ্য জান বাঁচাবে না চাকরি বাঁচাবে তা নিয়েই ভাবছে তারা।
পরের ওভারের প্রথম বলেই গেছো ভুত মাঠের বাইরের তালগাছে চড়ে বসে। মেছো ভুত মাঠেই অজ্ঞান। তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় দুজন ভুতের ডাক্তারও আনতে হল।
আর তিন উইকেট বাকি। অনেক জোরাজুরি করে ব্যাট হাতে ধরিয়ে মামদো ভুতকে মাঠে পাঠাল অন্তু। বোলারের দৌড় শুরু। বল আসার আগেই চোখ বন্ধ করে ব্যাট চালাতে লাগল মামদো। একবার না একবার তো লাগবেই। কপাল খারাপ। টাইমিং হয়নি। স্ট্যাম্প ভেঙে চৌচির।
প্রথমে আসলেও কন্ধকাটা এখনও ব্যাট করার সুযোগ পায়নি। অপর প্রান্তে নতুন ব্যাটসম্যান তিন মাথা ভুত। তিন মাথায় ছটা চোখ। ছয় পাশ থেকে বল দেখছে। তা না হলে লেগ স্পিনে তিন পা এগিয়ে পুল শট খেলবে কেন! কিপার রাক্ষস লম্বা একটা হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে বল ছোঁয়াল স্ট্যাম্পে।
আর এক উইকেট! শেষ ওভার শুরু। এই প্রথম ব্যাট করার সুযোগ পেয়েছে কন্ধকাটা। রান দরকার দুই কোটি দশ লাখ একত্রিশ হাজার নয়শ নব্বই। প্রথম বল। হাত নেড়ে বাতাসে বলের গতি বুঝে ব্যাট চালালো কন্ধকাটা। কোন রান হল না।
অন্তু এখনও খেলা দেখছে। সে আর চ্যানেলের লোকজন ছাড়া খুব বেশি দর্শক নেই।
ওভারের শেষ বল। রানের খাতা খোলেনি কন্ধকাটা। গুটি গুটি পায়ে দৌড়ে আসছে বোলার রাক্ষস। পরের বল! সজোরে হাঁকালো কন্ধকাটা। সবকটা ক্যামেরা বলের দিকে। বল উপরের দিকে উঠছে তো উঠছেই। থামার নাম নেই। বায়ুমণ্ডলের ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্রাটোস্ফিয়ার, আয়োনোস্ফিয়ার স্তরগুলো পেরিয়ে গেল বেশ দ্রুত। সবার চোখ মাঠের পাশের বড় স্ক্রিনে। তাতেই বলটা দেখা যাচ্ছে। একটু পর দেখা গেল দশ হাজার কিলোমিটার উপরের এক্সোস্ফিয়ার স্তরটাও পেরিয়ে গেছে। উঠছে তো উঠছেই। বিশ মিনিটের মধ্যে চাঁদ পেরিয়ে আরো কয়েক লাখ মাইল উপরে। এদিকে কোচ অন্তুর কথামত দৌড়াচ্ছে দুই ব্যাটসম্যান। হিসেব মত বল এখনো মাঠের সীমানা পেরোয়নি। তাই দৌড়ে রান নেয়া যাবে যত খুশি।
হুট করে থেমে গেল বলটা। কত উপরে আছে বোঝা গেল না। তবে নেমেও আসছে না। আটকে গেছে বলটা! দর্শক সারির এক বয়স্ক লোক অন্তুর দিকে তাকিয়ে বলল, 'বাছা, ওটা এখন পৃথিবীর স্যাটেলাইট হয়ে গেছে। আর নামবে না, ওখানে বসেই চক্কর খাবে'।
অন্তু চিন্তিত। বল নামবে না ঠিকই। তবে দুই কোটি রান করতে ভুত দুটোর কত বছর দৌড়াতে হবে তার ঠিক নেই। ভুতের দল একরকম জিতেছে বলা যায়। এখন রাক্ষসরা হার মানলেই তো হয়!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

