আমার ছোটবেলার এক প্রিয় মানুষরে কোন এক রোজার ঈদের দিন হারাইছি । তখন থিকাই ঈদ জিনিসটা ঠিক আনন্দ নিয়ে আসে না আমার কাছে । ছোটবেলার সেই শোক কাটায় ওঠা গেলেও কেমন যেন ঈদের আনন্দ আর আমার মধ্যে একটা পর্দা পইড়া গেছে । সকালে কোন একটা পুরনো একটা পাঞ্জাবি পাজামা পরেই নামাজটা শেষ করে সারাদিনের জন্য ঘুম ।
তো এই কৈরাই যাইতেছিল ঈদের দিনগুলা । সকালে নামাজ তারপর সারাদিন ঘুম । কি এক দুর্বিপাকে আয়া পড়লাম জার্মানিতে । আইলাম তো আইলাম তাও একটা ছোট্ট শহরে । দ্রশহর নিজেই গায়ে গতরে ছোট বৈলা কমিউনিটিও ছোট । প্রথম যেইবার ঈদ আইলো তখন আমি এখানে একেবারে নতুন । ঈদের সময় আসনের পর বুঝলাম এইখানে ঈদ কবে হইবো সেইটা নিয়া তুর্কাই আর আরবগো সবসময় দুইটা মত থাকে । আর তার কোনটাই চাদ নির্ভর মত না । আর আমরা নিজেরা চাদ দেইখা ঈদ করুম সেইটাও সম্ভব না । শীতকালে মেঘের কারনে চাদ দেখা যায় না এখানে । তো বাঙ্গালিগো মইধ্যে সৌদি সমর্থক গোষ্ঠি বলবান হওয়ায় সৌদিগো সাথেই ঈদ করা হইতো ।
তো যা কৈতে ছিলাম । নতুন আইছি বৈদেশে । ভাবচক্কর বুঝি না তেমন একটা । দেশী ভাইরা জানাইলো ঈদের নামাজ পড়তে যাইতে হইবো ট্রেনে কৈরা পাশের শহরে । আরব মসজিদে । সকালে বাসে কৈরা হাউপটবানহফ । তারপর ট্রেন ধৈরা মসজিদ । মসজিদ আসলে আমরা আদর কৈরা ডাকতাম । কুলটুর সেন্টার বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিলো ঐটা । ঐ ঈদের কয়েকদিন পরই জার্মান সরকার সন্ত্রাসবাদের সাথে যোগাযোগ থাকায় ঐ সেন্টার বন কৈরা দেয় । এরপর থিকা আরবরা ওগো কারো গ্যারেজে প্রলেতারিয়েত স্টাইলে নামাজের আয়োজন করে । লাদেন কাগুর লগে যোগাযোগের কারনে সৌদিগো থুইয়া এখন আমাগো পাল্লাটা তুর্কাইগো দিকেই ঝুকে বেশী । কিন্তু পাল্লা তুর্কাইগো দিকে ঝুকলেও ঈদের আগের রাইতটাতেই আসলে আমাগো ঝগড়াঝাটি কৈরা ডিসাইড করতে হয় কাগো কুলটুর সেন্টারে যামু । কুন সেন্টারে মামুগো নজর কম । কুনখানে গেলে টেররিস্টগো লগে এক কাতারে নামাজ পড়তে হইবো না ।
যাউগ্গা কাহিনীতে আসি । সেই ঈদে সকাল বেলা সকাল সকাল উইঠা বাসের জন্য হাটা দিলাম । হাইটা ১ থিকা দেড় মিনিট দুরত্বে বাসস্টপেজ । নতুন আইছি বৈলা তখনো জানতাম না এইখানে সকালের প্রথম বাসগুলা আর রাইতের শেষ বাসগুলার টাইম একটু এদিক ওদিক হয় । কপালে ছিলো বৈলা সেইদিন বাস আইলো আগে আগে । চক্ষের সামনে দিয়া দেখলাম ড্রাইভার মামু (পরে জানছি হালায় শহরের সবচেয়ে খতরনাক মামু) বাস লয়া আগে আয়া আগে চইলা গেলো । দৌড়ায় ধরতে পারলাম না । এরপরের বাস ধৈরা করলাম ট্রেন মিস । পুরা আনুশেহর নামাজ আমার হইলো না আমার টাইপ অবস্থা । নামাজ মিস কৈরা যথারীতি শুকনা মুখে সারাদিন ক্লাস কৈরা তারপর সন্ধায় সবার সাথে আড্ডা । আর সেই সাথে অমানুষিক স্কেলে রান্না বান্না খাওয়া দাওয়া ।
আমাগো এই কন্টিনেন্টাল ইউরোপে বাঙ্গালিগো ঈদের চেহারা মোটামুটি এইরকমই । সারাদিন কামলা দিয়া রাইতের বেলা বেদম খাওয়া দাওয়ার সাথে আড্ডা । ঈদ কপাল জোরে উইকএন্ডে পড়লে রান্নাআড্ডার দৈর্ঘ্য এক বেলা বাড়ে । অনেক সময় ঈদের খাওন দাওন আড্ডাটা উইকএন্ডের দিকেই বাধ্য হইয়া ঠেলতে হয় ।
এখন যেই শহরে থাকি সেইখানে সবেধন নীলমনি আমি একাই বাঙ্গালি মুসলমান হিসেবে বিরাজ করি । এদিককার বাঙ্গালি কমিউনিটির লুকজন কমতে কমতে এতো কমছে যে কাইলকা আমারে একাই নামাজ পড়তে হাটা দিতে হইবো সকাল সকাল । রাইত বাজে অনেক । এখনো পর্যন্ত জানি না কৈ নামাজ পড়ুম - তুর্কাইগো কুলটুর সেন্টারে নাকি কোন আরবের বাসার গ্যারেজে । আগের বার পন্ত এর ওর সাথে ঝগড়া ঝাটি তর্ক বিতর্ক করছি কোথায় নামাজ পড়া হইবো এই নিয়া । তারপর যাই হোক একটা ডিসিশন নিয়া রওনা দিছি সকালবেলা একসাথে । এইবার সেই ঝগড়া করার লুকও নাই । তো না থাকুক । অসুবিধা নাই । সকালে বাইরামু । গেট থিকা একটু সামনে যামু । বাসার দিকে ফিরমু ।ঘুমন্ত পড়শিগো জানলার দিকে তাকামু । তারপর চিক্কুর পাইড়া কমু - ঐ শালারা , উঠ ঘুম থিকা । আইজকা ঈদ । ঈদ মোবারক ।
----------------------------------------------
হাউপটবানহফ – শহরের মূল ট্রেইন স্টেশন ।
কুলটুর - কালচার
দ্রষ্টব্য: লেখাটা প্রায় একই সময়ে সচলায়তনে প্রকাশিত ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

