সম্প্রতি বিপা চুক্তি নিয়ে অনেক লেখাজোখা চলছে ব্লগে। আমি ভাবলাম বিষয়টা নিয়ে আমিও কিছুটা পড়াশোনা করে নিই। প্রথমে ভেবেছিলাম ব্যাপারটা যথেষ্ট ঘোরতর। তবে ট্রানজ়িটকে পাশ কাটালেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এই চুক্তিটা সহজেই স্বাক্ষরিত হতে দেখে অবাকই হলাম। সপ্তাহান্তে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কিছু পড়াশোনা করে অবশেষে লিখতে বসলাম।
দিনমজুরের ব্লগে বিপা নিয়ে অনেকটা পড়লাম। চুক্তির ভাষ্যও ডেইলি স্টারের কল্যাণে পড়লাম। আরো অনেকের ব্লগেই পড়লাম। সবাইকে ধন্যবাদ এই বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য।
বিভিন্ন লেখায় চুক্তিটার বিপক্ষে যে যে অভিযোগগুলো উঠে এসেছে সেগুলো এরকম -
১) চুক্তিতে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সমান সুযোগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে - এতে দেশীয় শিল্প মার খাবে।
২) শিল্প জাতীয়করণের প্রতিবন্ধকতা
৩) সন্ত্রাস বা যুদ্ধ-বিগ্রহের শিকার হলে তার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা - এতে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাংলাদেশ সরকারের ঘাড়ে চাপে।
৪) বিনিয়োগ তুলে নিয়ে যাবার স্বাধীনতা থাকায় দেশ থেকে হঠাৎ পুঁজি বেরিয়ে অর্থনৈতিক ডামাডোলের সৃষ্টি হতে পারে।
এর সাথে এ বিষয়ে অনেকগুলো উদাহরণও পড়েছি। তবে একটা উদাহরণ প্রদত্ত বিষয়ের সাথে মানায় না - সেটা ভারত সরকারের ডাভোলকে দেওয়া ক্ষতিপূরণের উদাহরণ, কারণ আমেরিকার সাথে ভারতের কোনো দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নেই।
আমি অভিযোগগুলো পড়ে প্রথমেই অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোর খোঁজ করলাম। জাতিসংঘ পরিচালিত একটি সংস্থার সাইটে বাংলাদেশের অনেকগুলো দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির বয়ান পাওয়া গেল। তার মধ্যে কয়েকটা পড়ে দেখলাম। চুক্তি নিয়ে একটা অভিযোগ হল বড় দেশের সাথে এরকম চুক্তি করে কোনো লাভ নেই, লোকসানই বেশী। তাই আমি আগে আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিটা পড়লাম। চুক্তিটা কোনোভাবেই ভারত-বাংলাদেশ চুক্তির থেকে আলাদা নয়। একই ছাঁচে ফেলে তৈরী উভয় চুক্তিই। আর উপরোক্ত অভিযোগগুলো আমেরিকার সাথে বিরুদ্ধেও খাটে। মজার কথা, এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে আর তা কার্যকর হয়েছে ১৯৮৯ সালে। মানে, চুক্তিটা এখন ২০ বছর বলবৎ আছে, অথচ এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের প্রচুর ক্ষতি হচ্ছে - এমন কথা আমি কোথাও পেলাম না। একই ধরণের চুক্তি বাংলাদেশের সাথে কোরিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইরান, ফিলিপাইন্স, ইন্দোনেশিয়া সহ অন্তত ১৬টি দেশের সাথে আছে। অথচ তাতে দেশীয় শিল্প মারও খাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছেনা, বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে বলেও কথা উঠছেনা। ব্রিটেনের সাথে চুক্তিটা আরেকটু পুরোনো - ১৯৮০ সালের। তাতে প্রথম সমস্যাটা নেই, দেশীয় শিল্পকে বিদেশী শিল্পের সাথে সমগুরুত্ব দেবার কথা বলা নেই।
এরপরে আমি আরো কিছুটা খুঁজতে দেখি মোটামুটি সব দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিরই বয়ান একই রকম - সে ভারত-শ্রীলঙ্কাই হোক, বা পাকিস্তান-উজবেকিস্তানই হোক - মূল বিষয় এগুলোই। সাইটে খুঁজে দেখে নিতে পারেন কয়েকটা চুক্তির বয়ান। সাধারণত, দুপক্ষের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অনেক বেড়ে গেলে এ ধরণের চুক্তি করা হয়ে থাকে। আমার ধারণা, বাংলাদেশের সাথে পরবর্তী দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি হবে চিনের।
তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়? আমেরিকার সাথে চুক্তির ফলে যদি দেশীয় শিল্প মার না খায়, সেই চুক্তি নিয়ে যদি ঝামেলা না হয়, তাহলে ভারতের সাথে চুক্তি হতে গেলেই সমস্যার তো কোনো কারণ আমি দেখি না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

