২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘ বর্তমান বিশ্বে ব্যক্তিগত সম্পদের বৈষম্য সম্পর্কিত যে রিপোর্টটি প্রকাশ করে তা থেকে প্রকৃত চিত্রের একটি আংশিক ধারণাই আমরা পেতে পারি, যে চিত্রে আমরা দেখি বিশ্বের ধনীতম অংশটির হাতে বিশ্বসম্পদের সিংহভাগ কেন্দ্রীভূত হতে এবং উল্টাদিকে বাকি বিশ্বের কাছে আছে সীমাহীন দারিদ্র ও অর্থনৈতিক অনিশ্চিয়তা।
ওয়ার্ল্ড ইনস্টিটিউট ফর ডেভলোপমেন্ট ইকোনোমিক রিসার্চ (WIDER)- ২০০০ সাল থেকে সংগৃহীত ডাটার উপর নির্ভর করে যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, দুনিয়ার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের শীর্ষ ১% (প্রায় ৩৭ মিলিয়ন লোক) এর হাতে আছে দুনিয়ার মোট সম্পদের ৪০%। শীর্ষ ২% এর হাতে আছে ৮৫% সম্পদ। এখানে সম্পদের হিসাবটি করা হয়েছে শুধুমাত্র মানুষের বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সম্পদকে গণনায় নিয়ে।
অপরদিকে, দুনিয়ার প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে তলানির অর্ধেক মানুষের(১.৮৫ বিলিয়ন লোক) হাতে আছে দুনিয়ার মোট সম্পদের মাত্র ১%।
এ থেকে বুঝা যায় যে, দুনিয়ার শীর্ষ ১% লোকের হাতে যে সম্পদ আছে তা তলানির ৫০% লোকের মোট সম্পদের তুলনায় ৪০ গুন এবং তলানির ৯০% লোকের মোট সম্পদের ৩ গুন। অন্যভাবে, রিপোর্টটিতে প্রকাশক বলেছেন, " গড়ে শীর্ষ ১০% লোক, তলানির ১০% লোকের চেয়ে ৩০০০ গুন ধনী এবং শীর্ষ ১% লোক তলানির ১% লোকের চেয়ে ১৩,০০০ গুন ধনী"।
রিপোর্টটি প্রস্তুতির সময় শুধু ২০ বছর বয়সী বা তদুর্ধ্বদেরকে গণনায় ধরা হয়েছে। এই রিপোর্টটিতে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, তা হল- ব্যাপক হারে তথ্য বা ডাটার অপ্রতুলতা, বিশেষত দরিদ্রতর দেশসমূহের ডাটা ছাড়াই এই গবেষণাটি চালানো হয়, সেই সাথে দুনিয়ার শীর্ষমাত্রার ধনীদের অভ্যন্তরীন অনেক কিছুই এর আওতামুক্ত থেকে গেছে। প্রকৃতপক্ষে, দুনিয়ার মোট সম্পদের আরো অনেক বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে শীর্ষ ১% এর এক দশমাংশ লোকের হাতেই।
গবেষণাপত্রটি বিশ্বের অর্থনৈতিক বৈষম্যের এই চিত্র উপস্থাপনের সাথে সাথে আঞ্চলিক বৈষম্যও তুলে ধরেছে। যথারীতি বিশ্বসম্পদের সিংহভাগ কেন্দ্রীভূত আছে খুব অল্প কয়টি দেশে। এবং এই 'ধনীতম'' দেশেও আছে বিশাল বৈষম্য।
যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু গড় সম্পদ ১৪৪,০০০ ডলার, এবং এটি দুনিয়ার দেশসমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ, যেখানে ভারতে মাথাপিছু গড় সম্পদের পরিমাণ ৬৫০০ ডলার, যেটি সর্বনিম্ন (যেসব দরিদ্র দেশের ডাটা পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে)। আর, যুক্তরাষ্ট্রেই সবচেয়ে বেশী সম্পদ কেন্দ্রীভূত আছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১% এর কাছে আছে দেশটির মোট সম্পদের ৩২.৭%, এই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়তে অবস্থান করছে, কেননা প্রথম অবস্থানটি সুইজারল্যান্ডের। সুইজারল্যান্ডের শীর্ষ ১% এর কাছে আছে ৩৪.৭%।
WIDER এর রিপোর্টে বিভিন্ন দেশ ও এলাকা অনুযায়ী সম্পদের বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, দুনিয়ার সম্পদধারীদের মধ্যে শীর্ষ ১০% ও শীর্ষ ১% এর উল্লেখযোগ্য অংশই যুক্তরাষ্ট্রের (যথাক্রমে ৩৭% ও ২৫%)। আবার যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনগণের(২০ বছরের উর্ধে) ৪৫.৫% ই (৯২ মিলিয়ন লোক) দুনিয়ার শীর্ষ ১০% সম্পদধারী লোকের তালিকায় অবস্থান করে।
WIDER এর রিপোর্টে প্রকাশিত এই চিত্রের পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈষম্যের চিত্রটিও একপলক দেখা যাক। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের এবং স্বাধীনতার ৩০ বছর পরের - এদুটি সময়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরলে এ ভূখণ্ডে সম্পদের কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টি আমাদের সামনে সহজেই পরিষ্কার হতে পারে।
১৯৭৪ সালে শীর্ষ ৫% ধনীর হাতে পুঞ্জীভুত ছিল মোট সম্পদের ১৬.৪% এবং শীর্ষ দশভাগের হাতে ছিল ২৮.৪ ভাগ। উল্টোদিকে, দরিদ্রতম ৫% এর হাতে ছিল ১.২ ভাগ ও ১০ ভাগের হাতে ছিল ২.৮ ভাগ সম্পদ। এর ৩০ বছরের মধ্যে এই চিত্রটি অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তন সম্পদের আরো কেন্দ্রীভুত হওয়াকেই নির্দেশ করে। এসময়কালে ধনীরা আরো ধনী আর গরীবরা হয়েছে আরো গরীব। এখন শীর্ষ ৫% ধনীর হাতে আছে মোট সম্পদের ৩০.৬৬% ও শীর্ষ ১০% এর কাছে আছে ৪০.৭২%, যেখানে দরিদ্রতম ৫% এর কাছে আছে মোট সম্পদের মাত্র ০.৬৭% ও ১০% এর কাছে আছে ১.৫%। এই পরিসংখ্যান প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং গরীবেরা প্রতিনিয়তই নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে হচ্ছে ও উল্টোদিকে কিছু মানুষের হাতে জমা হচ্ছে সম্পদের পাহাড়।
এই হচ্ছে, সংক্ষেপে, বর্তমান দুনিয়ার অর্থনৈতিক বৈষম্যের চালচিত্র, যদিও এই চিত্র পূর্ণাঙ্গ নয় এবং পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও ভয়ঙ্কর।
এই ভয়াবহ চিত্রটি বর্তমান সভ্য জগতকে প্রতিনিয়ত উপহাস করছে, কিন্তু বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অসংগঠিত ও প্রতিবাদহীন হওয়ায় তা দিনে দিনে আরও ভয়াবহ ও নৃশংস হচ্ছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

