somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অর্থনৈতিক বৈষম্যঃ বিশ্ব-পরিস্থিতি

২০ শে নভেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৫:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘ বর্তমান বিশ্বে ব্যক্তিগত সম্পদের বৈষম্য সম্পর্কিত যে রিপোর্টটি প্রকাশ করে তা থেকে প্রকৃত চিত্রের একটি আংশিক ধারণাই আমরা পেতে পারি, যে চিত্রে আমরা দেখি বিশ্বের ধনীতম অংশটির হাতে বিশ্বসম্পদের সিংহভাগ কেন্দ্রীভূত হতে এবং উল্টাদিকে বাকি বিশ্বের কাছে আছে সীমাহীন দারিদ্র ও অর্থনৈতিক অনিশ্চিয়তা।

ওয়ার্ল্ড ইনস্টিটিউট ফর ডেভলোপমেন্ট ইকোনোমিক রিসার্চ (WIDER)- ২০০০ সাল থেকে সংগৃহীত ডাটার উপর নির্ভর করে যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, দুনিয়ার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের শীর্ষ ১% (প্রায় ৩৭ মিলিয়ন লোক) এর হাতে আছে দুনিয়ার মোট সম্পদের ৪০%। শীর্ষ ২% এর হাতে আছে ৮৫% সম্পদ। এখানে সম্পদের হিসাবটি করা হয়েছে শুধুমাত্র মানুষের বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সম্পদকে গণনায় নিয়ে।
অপরদিকে, দুনিয়ার প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে তলানির অর্ধেক মানুষের(১.৮৫ বিলিয়ন লোক) হাতে আছে দুনিয়ার মোট সম্পদের মাত্র ১%।
এ থেকে বুঝা যায় যে, দুনিয়ার শীর্ষ ১% লোকের হাতে যে সম্পদ আছে তা তলানির ৫০% লোকের মোট সম্পদের তুলনায় ৪০ গুন এবং তলানির ৯০% লোকের মোট সম্পদের ৩ গুন। অন্যভাবে, রিপোর্টটিতে প্রকাশক বলেছেন, " গড়ে শীর্ষ ১০% লোক, তলানির ১০% লোকের চেয়ে ৩০০০ গুন ধনী এবং শীর্ষ ১% লোক তলানির ১% লোকের চেয়ে ১৩,০০০ গুন ধনী"।
রিপোর্টটি প্রস্তুতির সময় শুধু ২০ বছর বয়সী বা তদুর্ধ্বদেরকে গণনায় ধরা হয়েছে। এই রিপোর্টটিতে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, তা হল- ব্যাপক হারে তথ্য বা ডাটার অপ্রতুলতা, বিশেষত দরিদ্রতর দেশসমূহের ডাটা ছাড়াই এই গবেষণাটি চালানো হয়, সেই সাথে দুনিয়ার শীর্ষমাত্রার ধনীদের অভ্যন্তরীন অনেক কিছুই এর আওতামুক্ত থেকে গেছে। প্রকৃতপক্ষে, দুনিয়ার মোট সম্পদের আরো অনেক বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে শীর্ষ ১% এর এক দশমাংশ লোকের হাতেই।
গবেষণাপত্রটি বিশ্বের অর্থনৈতিক বৈষম্যের এই চিত্র উপস্থাপনের সাথে সাথে আঞ্চলিক বৈষম্যও তুলে ধরেছে। যথারীতি বিশ্বসম্পদের সিংহভাগ কেন্দ্রীভূত আছে খুব অল্প কয়টি দেশে। এবং এই 'ধনীতম'' দেশেও আছে বিশাল বৈষম্য।
যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু গড় সম্পদ ১৪৪,০০০ ডলার, এবং এটি দুনিয়ার দেশসমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ, যেখানে ভারতে মাথাপিছু গড় সম্পদের পরিমাণ ৬৫০০ ডলার, যেটি সর্বনিম্ন (যেসব দরিদ্র দেশের ডাটা পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে)। আর, যুক্তরাষ্ট্রেই সবচেয়ে বেশী সম্পদ কেন্দ্রীভূত আছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১% এর কাছে আছে দেশটির মোট সম্পদের ৩২.৭%, এই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়তে অবস্থান করছে, কেননা প্রথম অবস্থানটি সুইজারল্যান্ডের। সুইজারল্যান্ডের শীর্ষ ১% এর কাছে আছে ৩৪.৭%।
WIDER এর রিপোর্টে বিভিন্ন দেশ ও এলাকা অনুযায়ী সম্পদের বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, দুনিয়ার সম্পদধারীদের মধ্যে শীর্ষ ১০% ও শীর্ষ ১% এর উল্লেখযোগ্য অংশই যুক্তরাষ্ট্রের (যথাক্রমে ৩৭% ও ২৫%)। আবার যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনগণের(২০ বছরের উর্ধে) ৪৫.৫% ই (৯২ মিলিয়ন লোক) দুনিয়ার শীর্ষ ১০% সম্পদধারী লোকের তালিকায় অবস্থান করে।

WIDER এর রিপোর্টে প্রকাশিত এই চিত্রের পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈষম্যের চিত্রটিও একপলক দেখা যাক। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের এবং স্বাধীনতার ৩০ বছর পরের - এদুটি সময়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরলে এ ভূখণ্ডে সম্পদের কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টি আমাদের সামনে সহজেই পরিষ্কার হতে পারে।
১৯৭৪ সালে শীর্ষ ৫% ধনীর হাতে পুঞ্জীভুত ছিল মোট সম্পদের ১৬.৪% এবং শীর্ষ দশভাগের হাতে ছিল ২৮.৪ ভাগ। উল্টোদিকে, দরিদ্রতম ৫% এর হাতে ছিল ১.২ ভাগ ও ১০ ভাগের হাতে ছিল ২.৮ ভাগ সম্পদ। এর ৩০ বছরের মধ্যে এই চিত্রটি অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তন সম্পদের আরো কেন্দ্রীভুত হওয়াকেই নির্দেশ করে। এসময়কালে ধনীরা আরো ধনী আর গরীবরা হয়েছে আরো গরীব। এখন শীর্ষ ৫% ধনীর হাতে আছে মোট সম্পদের ৩০.৬৬% ও শীর্ষ ১০% এর কাছে আছে ৪০.৭২%, যেখানে দরিদ্রতম ৫% এর কাছে আছে মোট সম্পদের মাত্র ০.৬৭% ও ১০% এর কাছে আছে ১.৫%। এই পরিসংখ্যান প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং গরীবেরা প্রতিনিয়তই নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে হচ্ছে ও উল্টোদিকে কিছু মানুষের হাতে জমা হচ্ছে সম্পদের পাহাড়।

এই হচ্ছে, সংক্ষেপে, বর্তমান দুনিয়ার অর্থনৈতিক বৈষম্যের চালচিত্র, যদিও এই চিত্র পূর্ণাঙ্গ নয় এবং পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও ভয়ঙ্কর।

এই ভয়াবহ চিত্রটি বর্তমান সভ্য জগতকে প্রতিনিয়ত উপহাস করছে, কিন্তু বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অসংগঠিত ও প্রতিবাদহীন হওয়ায় তা দিনে দিনে আরও ভয়াবহ ও নৃশংস হচ্ছে।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ২:৩০
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×