বাংলাদেশের বাম আন্দোলনে কমরেড হায়দার আকবর খান রনো অত্যন্ত পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য। ওয়ার্কার্স পার্টির আওয়ামিলীগের সাথে মহাজোট গঠন, একসাথে ও নৌকা প্রতীকে তিনটি আসনে নির্বাচন করা প্রভৃতি বিষয়ে সম্প্রতি ওয়ার্কার্স পার্টির অভ্যন্তরে মতপার্থক্য ও বিতর্ক অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে কমরেড রনো ডিসেম্বর মাসে বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে আগে পার্টির কমরেডদের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি প্রদান করেন।
আমার মনে হয়েছে, বর্তমান বাম আন্দোলনের নানামুখী প্রবণতা, তার সমস্যা সংকট বুঝতে এই খোলা চিঠি একটি দলিলের ন্যায় কাজ করবে। তাই সেটি এখানেও তুলে দিচ্ছি। পরবর্তীতে এই চিঠির উপরে আরো কিছু আলোচনা করার ইচ্ছা থাকলো। খোলা চিঠিটি সংগৃহীত হয়েছে সিপিবি'র সাপ্তাহিক একতা'র সৌজন্যে। এবং এর বোল্ড, ইটালিক, আণ্ডারলাইন- গুরুত্বারোপ আমার।
প্রিয় কমরেডগণ
বিপ্লবী অভিনন্দন গ্রহণ করুন।
আপনারা সম্ভবতঃ আমার ৪ ডিসেম্বরের (২০০৮) বিবৃতি পাঠ করেছেন। আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে পার্টি নেতৃত্বের ভূমিকার সমালোচনা করে আমি পত্রিকায় প্রকাশার্থে বিবৃতিটি প্রদান করেছিলাম। সমালোচনার বিষয়বস্তু ছিল:
(১) পার্টির নিজস্ব মার্কার (হাতুড়ি) বদলে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কা গ্রহণ করে পার্টির তিন নেতা নির্বাচন করছেন এবং সামরিক শাসক এরশাদের সাম্প্রদায়িক দল জাতীয় পার্টিসহ মহাজোটের মধ্যে পার্টিকে বিলীন করে দেবার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমার বিবেচনায় পার্টির নেতৃত্বের এই ভূমিকা কেবল সাধারণ সুবিধাদই নয়, এর দ্বারা বুর্জোয়ার কাছে আত্মসমর্পণের ও কমিউনিস্ট আদর্শ থেকে বিচ্যুতিরও প্রমাণ পাওয়া যায়।
(২) কেন্দ্রীয় কমিটির ও কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভার সিদ্ধান্তকে অমান্য করে এই ধরনের ভূমিকা গ্রহণ করাকে পার্টি শৃঙ্খলাভঙ্গের গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য করা উচিত।
উপরোক্ত দুইটি বিষয়ে আমি এই চিঠিতে সামান্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো। তার আগে আমি কয়েকটি মৌলিক ও নীতিগত বিষয় আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই, যা অধিকতর মনোযোগ দাবি করে।
পার্টি নেতৃত্বের নির্বাচন সংক্রান্ত এই আচরণ হঠাৎ করে আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে পার্টি নেতৃত্ব যে কমিউনিস্ট আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছেন তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে। কেন এমন মতাদর্শগত বিচ্যুতি, কিভাবে সুবিধাবাদ বিস্তার লাভ করলো, সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু পর্যালোচনা তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।
এক : দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতি
পার্টির বিভিন্ন আচরণ, ভূমিকা কাজ ও কাজের পদ্ধতির মধ্যে যে দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ ছিল, পার্টির বিভিন্ন দলিলেও তার উল্লেখ আছে। সর্বশেষ কংগ্রেসের (৭ম কংগ্রেস, ২০০৫ সাল) রাজনৈতিক প্রস্তাবেও দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতির বিপদের কথা বলা হয়েছিল। তবে পরিতাপের কথা এই যে, তা কেবল কথার কথা হিসেবে ছিল। নিষ্ঠাবান কর্মীদের সন্তুষ্ট করার জন্য নামকাওয়াস্তে আত্মসমালোচনা করা হয়েছিল। কিন্তু বিচ্যুতি থেকে বেরিয়ে আসার কোন উদ্যোগ ছিল না। বাস্তবেই তা কেবল কথার কথা হিসেবে ছিল। মজার কথা হচ্ছে ‘৫ম ও ৬ষ্ঠ কংগ্রেসেও দক্ষিণপন্থী বিপদের কথা বলা হয়েছিল, তা কথার কথা হিসেবে থেকেছে।’ (৭ম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাব পৃষ্ঠা-২২)
উক্ত প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, ‘আমাদের সামনে এখনও সেই দক্ষিণপন্থী ঝোক কমবেশি রয়েছে যা শ্রেণী সংগ্রাম গণসংগ্রাম, রাজনৈতিক আচরণ ও সাংগঠনিক কাজের পদ্ধতিতে প্রকাশ পাচ্ছে।’ (ঐ পৃষ্ঠা-২২)
৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম কংগ্রেসে দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতিগুলি চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেগুলি হচ্ছে :
‘ (ক) সুনির্দিষ্ট ও শ্রেণী সংগ্রামের কাজের চেয়ে উপরোন্ত কাজের প্রতি অতি মাত্রায় ঝোক।
(খ) জনজমায়েতের ক্ষেত্রে কষ্টকর রাজনৈতিক প্রচার, সচেতনতা ও উপলব্ধি তৈরির কাজ বাদ দিয়ে কেবলমাত্র লোক জমায়েতের ঝোক এবং বুর্জোয়া পত্রিকায় প্রচারের উপর নির্ভর করা।
(গ) তাত্ত্বিক আলোচনা অবহেলা করা।
(ঘ) স্বতঃস্ফূর্ততায় গা ভাসিয়ে দেয়া ইত্যাদি।’
এর সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমি যোগ করতে চাই। তা হলো ফান্ড প্রসঙ্গে নীতি। এই প্রসঙ্গটি আমি ৭ম কংগ্রেসে উত্থাপন করেছিলাম। কিন্তু আমার মত গৃহীত হয়নি। আমার মত হলো, ফান্ডের প্রশ্নেও পার্টিকে প্রধানতঃ নির্ভর করতে হবে নিজস্ব শ্রেণী এবং মধ্যবিত্ত ও অন্যান্য মেহনতি শ্রেণীর উপর। অর্থাৎ পার্টির রাজনীতি ও কর্মসূচিকে যারা পছন্দ করেন, সেই সকল শুভানুধ্যায়ীর চাঁদার উপর। পার্টি সভ্যদের লেভী ও চাঁদা তো আছেই। কিন্তু বর্তমানে পার্টি ফান্ডের বড় অংশ আসে নানাভাবে সেইসব ধনীকদের কাছ থেকে যারা আসলে বৈরী শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এভাবে পার্টির শ্রেণী চরিত্র, বিপ্লবী মনোভাব কোনটাই রক্ষা পাবে না।
উপরোক্ত বিষয়গুলি শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী পার্টির জন্য অপরিহার্য শর্ত। এই সকল বুর্জোয়া প্রবণতা দূর করার কোন চেষ্টা তো হয়ইনি, বরং তা দিনে দিনে আরও গভীর হয়েছে, যা পার্টির বিপ্লবী চরিত্রকে প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
দুই : বুর্জোয়ার সঙ্গে ঐক্য প্রসঙ্গে
শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির বিপ্লবী ও শ্রেণী চরিত্র রাখতে পারবো কি না তা আরও যে সকল বিষয়ের উপর নির্ভর করে তার মধ্যে বৈরী শ্রেণী বুর্জোয়ার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং বুর্জোয়া নির্বাচন প্রসঙ্গে কৌশল অন্যতম। এই সকল বিষয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে কিভাবে বিচ্যুতি ঘটেছে তা একটু পেছন ফিরে পর্যালোচনা করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
বুর্জোয়া শ্রেণী হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর জন্মশত্রু । এটা কখনই ভুললে চলবে না। তবু জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে বুর্জোয়ার কোন কোন অংশের সঙ্গে কখনও কখনও শ্রমিক শ্রেণী ঐক্য করে। এই ঐক্যের বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা দরকার। এই প্রশ্ন থেকেই ডান বা বাম বিচ্যুতি জন্ম নিতে পারে। ডান বিচ্যুতি থেকে লেজুড়বৃত্তি পর্যন্ত গড়াতে পারে। আবার বাম বিচ্যুতি থেকে সংকীর্ণতাবাদ দেখা দিতে পারে।
আজকের বিপ্লবের স্তরের আমরা বুর্জোয়াকে দুই বড়ভাগে ভাগ করি-
(ক) জাতীয় বুর্জোয়া (খ) মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া।
জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে জাতীয় বুর্জোয়ার সঙ্গে শর্ত সাপেক্ষে ঐক্য করা চলে। তবে সে ক্ষেত্রেও পার্টির স্বাধীন সত্তা রক্ষা করে, এমনকি যার সঙ্গে সাময়িক মৈত্রী করছি সেই বুর্জোয়ার সমালোচনা করার অধিকার বজায় রেখেই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করা হবে। আমাদের পার্টির এ পর্যন্ত যত দলিল প্রণীত হয়েছে, সকল দলিলেই প্রধানতঃ চারটি রাজনৈতিক দলকে মুৎসুদ্দি ও লুটেরা বুর্জোয়ার রাজনৈতিক দল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই চারটি দল হচ্ছে, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামাত।
এর মধ্যে জামায়াতে ইসলাম হচ্ছে ধর্মীয় মৌলবাদী এবং সর্বাপেক্ষা প্রতিক্রিয়াশীল। এই সকল বিষয়ে নতুন করে বলার কোন প্রয়োজন নাই। পার্টির সকল কমরেড উপরোক্ত চার দলের শ্রেণী চরিত্র সম্পর্কে ভালোভাবেই জ্ঞাত আছেন।
কমরেডগণ, আমাদের এখনকার আলোচ্য বিষয় মুৎসুদ্দি ও লুটেরা বুর্জোয়া দল আওয়ামী লীগকে ঘিরে। এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলা দরকার যে আওয়ামী লীগ শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির রাজনৈতিক শত্রু । কিন্তু আমাদের আচরণে আওয়ামী লীগকে কেবল ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবেই বিবেচনা করা হয়নি, কার্যতঃ এই বুর্জোয়ার কাছে আত্মসমর্পণের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এক সময় সিপিবি আওয়ামীলীগকে মধ্যস্তরের জনগণের পার্টি বলে অভিহিত করে যে ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ করেছিল, বর্তমানে ওয়ার্কার্স পার্টি আওয়ামী লীগকে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ার পার্টি বলে স্বীকার করে নিয়েও (অন্ততঃ কাগজে কলমে) ঠিক আগেকার সিপিবির মতোই আচরণ করছে। সিপিবি আজ তাদের নীতি পরিবর্তন করেছে, আর আমরা সিপিবি’র পুরাতন রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি।
কখনও কখনও বিশেষ পরিস্থিতিতে (এবং কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতেই) আমরা যে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ার সঙ্গেও একত্রে আন্দোলন করতে পারি, তা অস্বীকার করছি না। কিন্তু সেই ঐক্যের পরিধি কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে? সেই ঐক্যের পদ্ধতি কি হবে? এই সকল প্রশ্ন গুরুতর বিবেচনার দাবি রাখে।
৭ম পার্টি কংগ্রেসে সেই রকম এক বিশেষ পরিস্থিতির ও আশু বিপদের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ২০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড নিক্ষেপ ও বাংলা ভাই প্রমুখ জঙ্গী মৌলবাদের উত্থানের ঘটনাটিকে পার্টি খুবই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে । ‘সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদের রাহুগ্রাস থেকে দেশকে মুক্ত করার’ প্রয়োজনে ‘আওয়ামী লীগ, জাসদসহ অন্যদের নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের ধারায় সমন্বিত আন্দোলনের কর্মসূচি পালন’ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। (কোটেশানর মধ্যে বাক্যাংশ ৭ম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাব থেকে নেয়া- পৃষ্ঠা ১৭)। ৭ম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে (পৃষ্ঠা-১৭) ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে আলাদা মঞ্চ থেকে বামগণতান্ত্রিক শক্তিভিত তথা ১১ দলীয় মোর্চার ভিত্তিতে আমরা ইস্যুভিত্তিক যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তুলবো।’
এখানে লক্ষ্যণীয় যে বিশেষ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেও পার্টি কংগ্রেস আওয়ামী লীগের ঐক্যের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাদা মঞ্চ থেকে এবং ইস্যুভিত্তিক যুগপৎ আন্দোলনের কথা ভেবেছে। তার বেশী কিছু নয়।
যুগপৎ আন্দোলন ও একমঞ্চে আন্দোলন দুইটি সম্পূর্ণ পৃথক জিনিস। আমাদের দেশে যুগপৎ আন্দোলন ঐক্যের একটি বিশেষ এবং নিম্নতর ঐক্যের ফর্ম হিসাবে বেরিয়ে এসেছে। পার্টি কংগ্রেস মৌলবাদের বিপদের কথা মাথায় রেখেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের অতিরিক্ত কোন উচ্চতর ফর্মের ঐক্যের কথা ভাবতে পারেনি। পার্টি কংগ্রেস সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পার্টি নেতৃত্ব কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত ও স্পিরিটের বাইরে গিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যের ব্যাপারে অতিরিক্ত উৎসাহ দেখিয়েছে। পার্টি যুগপৎ আন্দোলনের স্তরকে অতিক্রম করে একমঞ্চে, একজোটের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একত্রে (বাস্তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে) আন্দোলনে নামে। স্পষ্টতই কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে লংঘন করা হয়েছিল। অবশ্য কিছুদিন পর কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভা ডেকে পার্টি নেতৃত্ব ১৪ দলীয় মঞ্চকে অনুমোদন করিয়ে নেন। (যদিও কেন্দ্রীয় কমিটির ও পলিটব্যুরোর অনেকেই বিরোধিতা করেছিলেন। সেদিনও অনেক কমরেড প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, এই ভাবে কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে লংঘন করা যায় কি না) যুগপৎ থেকে যৌথ আন্দোলন, তারপর ১৪ দল গঠন, গোটা বিষয়টি কখনই বিশদ আলোচনার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক হয়নি। নেতৃত্বের কোন কোন অংশের মধ্যে আওয়ামী লীগের ব্যাপারে অতিরিক্ত উৎসাহ দেখা গেছে এবং প্রায়শ তাৎক্ষণিকতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পার্টির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সিদ্ধান্তসমূহ হয়তো পলিটব্যুরো বা কেন্দ্রীয় কমিটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে। তাই একথা বলা যাবে যে টেকনিক্যালি সবকিছু নিয়মমাফিক হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রলেতারীয় গণতান্ত্রিক নীতি অনুসরণ করা হয়নি বা তেমন কোন রাখা হয়নি। উপরন্তু ১৪ দলের মধ্যে পার্টি নিজস্ব সত্বাকে যেভাবে বিলীন করে দিয়েছিল তাতে বাম বিকল্পের ধারণা, বামফ্রন্ট, পার্টির ২১ দফা কর্মসূচি- সবকিছু আড়ালে পড়ে যায়। অথচ বাম বিকল্প গড়ে তোলার উপরই কংগ্রেস বেশী জোর দিয়েছিল।
প্রসঙ্গক্রমে, আরেকটি ঘটনার প্রতি কমরেডদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক (ও পরবর্তীতে মুখপাত্র) সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রায়ই বলেন যে, ১৪ দল হচ্ছে আদর্শভিত্তিক মোর্চা। এটা মোটেই সঠিক নয়। কিন্তু আমরা কখনই ব্যাখ্যা করে বলতে পারিনি, ‘না, ১৪ দল কখনই আদর্শভিত্তিক জোট হতে পারে না।’ বুর্জোয়ার সঙ্গে কি কখনও আদর্শভিত্তিক জোট হতে পারে? জনগণ তো দূরের কথা, পার্টি কমরেডদের কাছেও আমরা জোটের পরিধি, চরিত্র ও সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করিনি। ১১ দলও আদর্শভিত্তিক জোট নয়, ১৪ দল তো আরও দূরের কথা।
বামফ্রন্টকে আদর্শভিত্তিক জোট হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা হতে পারতো। কিন্তু বামফ্রন্টের বিকাশের সম্ভাবনা বিনষ্ট হয়ে যায় এবং তার জন্য অংশত ওয়ার্কার্স পার্টিও দায়ী। যাই হোক, ১৪ দল যে আদর্শভিত্তিক জোট নয়, একথা আমরা বলতে চাইনি বা পারিনি, কারণ ভয় ছিল পাছে আওয়ামী লীগ অসন্তুষ্ট হয়। আমাদের পার্লামেন্টে আসনের ভাগ পাবার সম্ভাবনা কমে যাবে।
এমন দৃষ্টিভঙ্গি শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির জন্য বড় লজ্জার কথা।
তিন : ১১ দল প্রসঙ্গে
বেশ অনেক আগেই পার্টি নেতৃত্ব বাম বিকল্প ধারণাকে কার্যতঃ পরিত্যাগ করেছিলেন। এর সূত্রপাত হয় ১১ দল গঠনের মধ্য দিয়ে। বেশ কয়েক বছর ১১ দল ও বামফ্রন্ট পাশাপাশি চলতে থাকে। কিন্তু মূল গুরুত্ব পড়ে ১১ দলের উপর। এ নিয়ে পার্টির মধ্যে বিতর্ক চলে। ৬ষ্ঠ কংগ্রেসে ভোটাভোটিও হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামসহ ১১ দল গঠিত হবে, যার ছিল ১৬ দফা কর্মসূচি। বলা হলো, ১৬ দফার ভিত্তিতে প্রচার এবং পরবর্তী ১১ দল ভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন করার পরও বলা হচ্ছে, ‘১১ দল কোন কর্মসূচিগত মোর্চা নয়, ওটা শুধুমাত্র ইস্যুভিত্তিক ঐক্য’। এই অদ্ভুত ধরনের তত্ত্বায়নের পক্ষে প্রধান প্রবক্তা ছিলেন সাইফুল হক, যিনি পার্টি নেতৃত্বের একাংশের পক্ষ হয়ে ৬ষ্ঠ কংগ্রেসের পূর্বে পার্টির ফোরামে প্রচুর লেখালেখি করেছেন। পার্টির কমরেডগণ যদি এখন একবার পেছনে ফিরে ওই সকল লেখালেখি পাঠ করেন, তাহলে দেখবেন কত কুযুক্তি পেশ করা হয়েছিল বামফ্রন্ট ও বামবিকল্পের ধারণাকে নাকচ করার জন্য। বস্তুতঃ পার্টির নেতৃত্বের একাংশের (তারাই মূল অংশ) মধ্যে বাম বিকল্পের ধারণা নাই। তারা কোনভাবে বুর্জোয়ার আশ্রয়ে রাজনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য আগ্রহী।
চার : কর্মসূচি
২০০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের বিরুদ্ধে (ও পরবর্তীতে) নীল নকশার নির্বাচনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ১৪ দলের যে আন্দোলন হয়েছিল, তা মর্মবস্তুর দিক থেকে সঠিক ছিল। পার্টির সাহসী ভূমিকাও প্রশংসনীয়। এই সংগ্রামে জীবন দিয়েছেন কমরেড রাসেল আহমদ খান।
তবে শ্রমিকশ্রেণীর পার্টিকে সব সময়ই যে কোন ধরনের আন্দোলনের মধ্যে শ্রমিক শ্রেণীর ভবিষ্যতের স্বার্থকে রক্ষা করতে হবে। (‘আশু লক্ষ্যসিদ্ধির জন্য, শ্রমিক শ্রেণীর সাময়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য কমিউনিস্ট লড়াই করে থাকে; কিন্তু বর্তমানের আন্দোলনের মধ্যে তারা সেই আন্দোলনের ভবিষ্যতের প্রতিনিধি এবং তার রক্ষক’- কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার)
সেদিকটি আমাদের নজরের বাইরে ছিল। আমরা সেদিন যে আন্দোলন করেছিলাম তা ছিল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ এবং অবশ্যই তা করা আমাদের কর্তব্য ছিল। এই আন্দোলন ছিল একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন(অবশ্যই তা শ্রেণী নিরপেক্ষ নয়) আদায়ের লক্ষ্যে
আন্দোলন। কিন্তু এর পাশাপাশি আমরা উদ্যোগী হতে পারিনি শ্রমিক-কৃষকের শ্রেণী দাবিকে সামনে আনতে এবং বুর্জোয়া সংকটের সুযোগ গ্রহণ করে শ্রেণী সংগ্রামকে তরান্বিত করতে। অথচ তার মাত্র অল্পদিন আগেই গার্মেন্ট শ্রমিকদের কী বিশাল অভ্যুত্থান হয়েছিল।
১৪ দলের ২৩ দফা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমাদের পার্টি নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল। ২৩ দফার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বিরোধী বক্তব্য জোরালোভাবে থাকলেও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বক্তব্য অথবা শ্রমিক কৃষকের দাবি অনুপস্থিত ছিল অথবা এমনভাবে ছিল যা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের নিকট গ্রহণযোগ্য হয়, অর্থাৎ যার দ্বারা বুর্জোয়ারা জনগণকে ধোকা দিতে পারে।
উদাহরণ ২৩ দফার ১৯ ধারায় বলা হয়েছে-
‘বাংলাদেশের গ্যাস-কয়লাসহ খনিজ সম্পদের জাতীয় স্বার্থে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, স্বচ্ছ জাতীয় নীতির অধীনে দেশীবিদেশী বিনিয়োগের ব্যবস্থা, জ্বালানী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। বন্দর ব্যবস্থাপনাকে দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানে উনড়বীত করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর ও মংলা বন্দরকে দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরে পরিণত করা।’
এখানে কৌশলের সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া, জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী গ্যাস উত্তোলন সংক্রান্তও উৎপাদনবণ্টন চুক্তিসমূহ অথবা ফুলবাড়ীর কয়লা সম্পদ লুণ্ঠনের বিষয়সমূহ। এখানে যা বলা হয়েছে, তা সাম্রাজ্যবাদের বশংবদ বিএনপি, আওয়ামী লীগ অথবা সাম্রাজ্যবাদের অনুকম্পাপ্রার্থী ব্যক্তিবর্গের কাছে চমৎকারভাবে গ্রহণযোগ্য।
আরও উদাহরণ : ১১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘কৃষি উপকরণের মূল্য হ্রাস উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, কৃষিতে ভর্তুকী প্রদান, কৃষি পুনর্ববাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, কৃষি শ্রমিক ও খেতমজুরদের কাজ ও মজুরির ব্যবস্থা করা, ভূমি ব্যবস্থার সংস্কার করা হবে।’ এখানেও ভূমি সংস্কারের মূল বিষয়গুলির (সিলিং বর্গাপ্রথা সংক্রান্তও দাবী) উল্লেখ নাই। খেতমজুরের মজুরী নির্দিষ্ট করা হয়নি।
আরও উদাহরণ : ৮ নম্বর ধারায় শিল্প ও শ্রমিক সংক্রান্তও যেসব কথা আছে, তাও একই ভাবে বুর্জোয়ার কাছে চমৎকারভাবে গ্রহণযোগ্য, কারণ শ্রমিকের মজুরীর সুনির্দিষ্টকরণ নাই, আরও নাই শ্রমিকের স্বার্থে শ্রম আইন প্রণয়নের বিষয়টি। অথচ গুরুত্ব পেয়েছে, ‘সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে দেশী বিদেশী বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি ও সহায়তা প্রদানের পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
কমরেডগণ, আমি জানি বুর্জোয়ার সঙ্গে একত্রে কর্মসূচী করতে গেলে শ্রমিক কৃষকের দাবি যথাযতভাবে আসবে না। আরও জানি যে আওয়ামী লীগের মতো সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর বুর্জোয়ার কাছ থেকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কর্মসূচী আশা করা যায় না। সেক্ষেত্রে এমন বুর্জোয়ার সঙ্গে কর্মসূচী প্রণয়ন করাটাই ভুল ছিল। বড়জোর মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী কয়েকটি পয়েন্টে Agreement বা সমঝোতা ঘোষণা করাই যথেষ্ট ছিল।
এই উপলদ্ধি যাদের ছিল, তাঁদের চাপের ফলেই পরবর্তীতে প্রায় দুই বছর পর এই সিদ্ধান্তে পার্টি আসতে পেরেছিল, ‘লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণীর কোন দলের সাথে কোন কর্মসূচীতে ঐক্য করা যাবে না।’ (৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ সাল, কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট)। পার্টির সুবিধাবাদী অংশ চাপে পড়েই এইরকম সিদ্ধান্তই অন্ততঃ তখনকার মতো মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।
চলবে.....

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

