এর পর থেকে ....
পাঁচ : বাম বিকল্প না অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকার
২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত ৭ম কংগ্রেস (সর্বশেষ কংগ্রেস) যে রাজনৈতিক লাইন গ্রহণ করেছিল বর্তমানে পার্টির লাইন তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৭ম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাবে বলা হয়েছিল- ‘... তারা (সাম্রাজ্যবাদ) এদেশে একটি দ্বিদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে তার মাধ্যমে এই শোষণ লুণ্টনের ধারা অব্যাহত রাখতে চেয়েছে। কিন্তু সেই দ্বিদলীয় ব্যবস্থা দ্বারাও সংকট থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়নি। এই অবস্থায় বুর্জোয়া রাজনীতির বেড়াজাল ছিন্ন করে বামপন্থীদের নেতৃত্বে বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি কর্তব্য হিসাবে উপস্থিত হয়েছে। জনগণের প্রতিটি সংগ্রামে, নির্বাচনে, অভ্যুত্থানে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্পের এই ধারণাকে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। দেশে বর্তমানে যে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা চলছে তার বিপরীতে জনগণের আস্থাভাজন যোগ্যতাসম্পন্ন বাম গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে।’
বর্তমানে পার্টির লাইন কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন বলা হচ্ছে, এই পর্যায়ের রাজনৈতিক লক্ষ্য হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এই তত্ত্বায়নের ভিত্তিতে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা হলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট গঠন ও ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন। লক্ষ্য হলো, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠন, যে সরকারকে বলা হচ্ছে ‘অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকার’। এখানে স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটা প্রশ্ন উঠে আসে।
(১) অসাম্প্রদায়িক দল হিসাবে আওয়ামী লীগ কতটা নির্ভরযোগ্য। আওয়ামী লীগ কি ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে? ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে খিলাফত মজলিসের সাথে ৫ দফা চুক্তি কি প্রমাণ করে?
(২) আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে ‘অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকার’ গঠন করার জন্য পার্টি সক্রিয় রয়েছে, পার্টি কি সেই সরকারে অংশ নেবে? এর উত্তর এখনও পরিস্কার করে দেয়া হয়নি।
(৩) আমরা বরাবর বলে এসেছি যে দেশের জন্য বর্তমান পর্যায়ে দুইটি আশু বিপদ রয়েছে- সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদ। তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া যাক, মৌলবাদকে ঠেকানোর জন্য দরকার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জোট ও সরকার (পার্টির বর্তমান নেতৃত্ব সেই কথাই বলছেন)। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের প্রশ্নে কোন ধরনের জোট ও সরকার দরকার হবে? নাকি মৌলবাদকে ঠেকানোর নামে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামকে আপাততঃ কিছুটা পেছনে সরিয়ে রাখা হবে? এই প্রশ্নেরও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। যোগ্য ও বিপ্লবী নেতৃত্বকে অবশ্যই সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সুবিধাবাদ যখন গ্রাস করে, তখনই কেবল প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয় এবং তাত্ত্বিক বিষয়ে ঝাপসা করে রাখা হয়। আমার বিবেচনায়, সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ দুইটি পৃথক জিনিস হলেও, উভয়ের মধ্যে যোগসূত্র আছে।
আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে দুইটি ভ্রান্ত প্রবণতা দেখা যায়। (অবশ্য তার বাইরেও সঠিক চিন্তার কাছাকাছি বাম বুদ্ধিজীবীও আছেন)। একদল মনে করেন ও বলেন যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে রুখতে ধর্মীয় মৌলবাদের সঙ্গে আপোষ করা প্রয়োজন। আরেক দল মনে করেন ও বলেন যে, ধর্মীয় মৌলবাদের বিপদকে রুখতে মার্কিন প্রশাসনের সহযোগিতা দরকার। আমাদের পার্টি কিন্তু তত্ত্বগতভাবে এই দুই ভ্রান্ত প্রবণতার বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখে
এসেছে। (৬ষ্ঠ ও ৭ম কংগ্রেসের দলিল দ্রষ্টব্য)। কিন্তু বাস্তবে পার্টি যা করছে, তা হলো ধর্মীয় মৌলবাদকে অধিকতর বিপদ রূপে দেখিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামকে কার্যত আড়াল করা।
এই প্রসঙ্গে আমি পুনর্বার বলতে চাই যে, ধর্মীয় মৌলবাদের ভয়ংকর বিপদকে প্রতিহত করার জন্য সকল সেক্যুলার ও অসাম্প্রদায়িক শক্তির ঐক্য প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের মতো আপোষকামী দোদুল্যমান ও অনির্ভরযোগ্য শক্তির সঙ্গেও ঐক্য করার বিরোধী আমি নই। কিন্তু সে ঐক্য হবে সাময়িক ও শর্ত সাপেক্ষ। যুগপৎ ধারায় ইস্যু ভিত্তিক ঐক্য অনুমোদন করা যায়। কিন্তু বুর্জোয়া নেতৃত্বাধীন প্রায় স্থায়ী ধরনের জোট (অর্থাৎ ১৪ দল) শুধু যে ভুল রণকৌশল বলে বিবেচিত হবে তাই-ই নয়, কার্যত তা কোন না কোনভাবে বুর্জোয়ার কাছে আত্মসমর্পণের নীতি ছাড়া আর কিছুই না। সম্প্রতি নির্বাচনে পার্টির ভূমিকা সেটাই প্রমাণ করলো।
(৪) পার্টির নেতৃত্ব প্রায়ই বলেন যে, ‘যে কারণে ১৪ দল গঠিত হয়েছে, সেই কারণটি বর্তমান থাকা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে থাকতেই হবে।’ তারা আরও বলেন, ‘যে কোর্সের মধ্যে আমরা প্রবেশ করেছি, তা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত হঠাৎ করে এর থেকে বেরিয়ে আসা যায় না, আসা উচিত নয়।’
কমরেডগণ একটু ভেবে দেখলে দেখবেন, এই ধরনের কথার মধ্যে কি দারুণ ফাঁকি রয়েছে। রয়েছে যথেষ্ট অস্পষ্টতা। কবে সেই কোর্স শেষ হবে? মৌলবাদের বিপদ তো অনেক অনেক দিন পর্যন্ত থাকবে। এমনকি বিপ্লব সম্পন্ন হবার পরও এই বিপদ চলে যাবে না। তা হলে সেই কোর্সও শেষ হচ্ছে না। অর্থাৎ আমরা এক ধরনের নতুন রণনীতি সজ্ঞানে বা সচেতনভাবে গ্রহণ করে ফেলেছি। এর মানে হল, আমরা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনীতি (শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সাম্রাজ্যাবাদ সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া বিরোধী বিপ্লব) ইতিমধ্যেই পরিত্যাগ করেছি। তাই-ই যদি হয়, তাহলে সেটা পরিষ্কার করে বলা দরকার।
লিখিত রণনীতিকে বইয়ের পাতায় আবদ্ধ রেখে ভিন্নতর (বলা যায়, সম্পূর্ণ বিপরীত) রণনীতিকে কৌশলে চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা অসততা ও সুবিধাবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়।
ছয় : নির্বাচন প্রসেঙ্গ নীতি ও কৌশল
৭ম কংগ্রেসের (২০০৫ সাল) রাজনৈতিক প্রস্তাবে নির্বাচন প্রসঙ্গে আমাদের নীতি ও কৌশল কি হওয়া উচিত, তার উপর স্বতন্ত্রভাবে একটা অধ্যায় রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ‘নির্বাচনী সংগ্রামের লক্ষ্যও হবে ঐ বিপ্লবী গণ অভ্যুত্থান। বিপ্লবী গণ অভ্যুত্থানের অধীনস্থ করেই সকল স্তরের নির্বাচনকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করতে হবে।’ (৭ম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাব - পৃষ্ঠা-১৮)
বাস্তবে আমরা এখন যে ধারায় নির্বাচন করছি তাতে গণঅভ্যুত্থানের কথা নেহায়েত পরিহাস বলেই মনে হবে। এই ধরনের দ্বৈত আচরণ অর্থাৎ প্রস্তাবে লেখা এক রকম আর কাজে আরেক রকম, তা কি নিকৃষ্ট ধরনের সুবিধাবাদ নয়?
কংগ্রেসের প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, ‘জাতীয় সংসদসহ প্রতিটি নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানে পার্টি তথা বামপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব আনার সর্বাধিক প্রচেষ্টা নিতে হবে। তবে যে কোনভাবে নির্বাচনে কিছু আসন লাভ করলে পার্টির প্রভাব বাড়বে, এরকম ধারনা ভুল।’
(ঐ) প্রস্তাবের এই অধ্যায়ের সর্বশেষ বাক্যটি এই রকম- ‘পার্লামেন্টারী ক্রিটিনিজমের প্রবণতার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।’ (ঐ)
[পার্লামেন্টারী ক্রেটিনিজিম মানে হল পার্লামেন্ট সর্বস্বতা অর্থাৎ যে নীতি প্রধানতঃ পার্লামেন্ট কেন্দ্রিক, যা পার্লামেন্টারী সংগ্রাম বা সংসদ নির্বাচনকে একমাত্র বা সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়, তাকে বলা হয় পার্লামেন্টারী ক্রিটিসিজম। মার্কসবাদ সংসদীয় সংগ্রামকে অনুমোদন করলেও সংসদ বহির্ভূত বিপ্লবী সংগ্রামকে প্রধান গুরুত্ব দেয়, সংসদীয় সংগ্রামকে বড়জোর সহায়ক সংগ্রাম বলে বিবেচনা করতে পারে। পার্লামেন্টারী ক্রিটিনিজমের বিরুদ্ধে মার্কস এঙ্গেলস ও লেনিন সবসময় সংগ্রাম করেছেন]
আমরা এখন যেভাবে নির্বাচন করছি তাতে দেখা যায়, পার্লামেন্টারী ক্রিটিনিজম দ্বারা পার্টি দারুণভাবে আক্রান্তও হয়েছে। পার্টি নেতৃত্বের মধ্যেও পার্লামেন্টারী ক্রিটিনিজমের প্রবণতা প্রবলভাবে বিদ্যমান রয়েছে। যেনতেন প্রকারের কিছু আসন লাভ করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই নৌকা প্রতীক গ্রহণের জন্য তারা এতটা আগ্রহী।
সাত: নৌকা প্রতীকের প্রসঙ্গ
নৌকা প্রতীক গ্রহণের বিষয়টি একটু ঘটনাভিত্তিক ব্যাখ্যা করা দরকার। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে এই বলে যে আমি নাকি ২০০৬ সালে নৌকা প্রতীকে সম্মত হয়েছিলাম। তাই আমার ব্যক্তিগত ভূমিকার কথা আপনাদের জানানো দরকার। কিছু
ভিতরের কথা লিখতে বাধ্য হচ্ছি, যা লিখিত দলিলে পাওয়া যাবে না।
২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর পার্টির সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভা ডাকেন। তখন ১৪ দল ভিত্তিক ও মহাজোট ভিত্তিক নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছিল। ২৬ ডিসেম্বর ছিল মনোয়নপত্র পেশ করার শেষ তারিখ। আওয়ামী লীগ ওয়ার্কার্স পার্টির জন্য দুইটি আসন (রাশেদ খান মেনন ও ফজলে হোসেন বাদশা) ছাড়তে রাজি ছিল। এমনকি সাধারণ সম্পাদক কমরেড বিমল বিশ্বাসের জন্য নড়াইলের আসনটি ছাড়তে রাজি হয়নি। উপরন্তু তার কয়েকদিন আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে খেলাফত মজলিসের চুক্তি সর্বমহলে দারুণ ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
সেই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভায় উপস্থিত সদস্যরা প্রায় সকলেই ১৪দলীয় সমঝোতা থেকে বেরিয়ে এসে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার জন্য মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন নেতার কাছে, বিশেষ করে যারা নির্বাচনে প্রার্থী হবেন, তাদের কাছে বলেছিলাম, ‘এই অবস্থায় পার্টির সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত এইরকম যে, আসন বণ্টনের সমঝোতায় আমরা যে মাত্র দুইটি আসন পেয়েছি, তা আমরা প্রত্যাখ্যান করবো এবং নির্বাচনে কোন আসনেই আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো না, কিন্তু বিএনপি-জামাত জোটের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় প্রার্থীদের সমর্থন দেবো।’ আমার এই কথায় সায় দেননি পার্টি প্রধান নেতৃত্ব, বিশেষ করে যারা মহাজোটের প্রার্থী হবার সুযোগ লাভ করেছিলেন। আমি দেখলাম, পার্টি দারুণ সংকটের মধ্যে পড়েছে। পার্টির প্রধান নেতৃত্বের সঙ্গে সাধারণ কর্মীদের চিন্তার ফারাক বিরাট, এমনকি বিপরীতমুখী। এই অবস্থায় পার্টির ঐক্য রক্ষার খাতিরে আমি কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভায় উপস্থিত কমরেডদের কাছে আবেদন রাখলাম, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে তারা যেন এখনই কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে গোটা বিষয়টি পলিটব্যুরোর হাতে ছেড়ে দেন। বর্ধিত সভা সেই মতোই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আজ আমি আত্মসমালোচনা করে বলতে চাই যে, আমি ভুল করেছিলাম।
পরবর্তীতে পলিটব্যুরো দুইটি আসনে নৌকা মার্কায় নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ব্যাপক কমরেডদের মতামতকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। তখনও কয়েকজন পিবি সদস্য এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।
অতীতে পার্টি ভুল করেছিল (আমিও ভুল করেছিলাম) বলে কি বার বার একই ভুল করবো? ২০০৭ সালে আমাদের এই সময়ের ভূমিকার কিছুটা পর্যালোচনা করা হয় (যদিও পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা এখনও করা হয়নি)। ২০০৭ সালে ২১ জুলাই কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় যে পর্যালোচনা করা হয় তা থেকে কয়েকটি বাক্য উদ্ধৃত করছি।
‘নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে পার্টির বর্ধিত সভায় নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করার মতামতের প্রতিফলন ঘটলেও পার্টির পলিটব্যুরো সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটা নিঃসন্দেহে একটি পশ্চাৎপসরণ। নৌকা প্রতীক নেয়াকে নেতা-কর্মী গ্রহণ করতে পারেনি।’
এরপর গোটা পার্টিতে সাধারণভাবে এই অভিমত ছিল যে, ভবিষ্যতে পার্টি আর এই ভুল করবে না। অর্থাৎ ভবিষ্যতে পার্টি নিজস্ব প্রতীক হাতুড়ি মার্কায় নির্বাচন করবে, অন্যের প্রতীক ধার নেবে না।
সর্বশেষ কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় ও কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে পার্টি নিজস্ব হাতুড়ি মার্কায় নির্বাচন করবে। এমনকি পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড বিমল বিশ্বাস সহ পার্টির নেতৃত্বের অনেকেই জোরের সঙ্গে বারবার বলেছেন যে ‘এবার কোনক্রমেই নৌকায় ওঠা চলবে না।’ সাধারণ সম্পাদক বিভিন্ন সার্কুলারে যে কথা একাধিকবার বলেছেন, তার সঙ্গেও বর্তমানে পার্টির নেতৃত্বের ভূমিকা একেবারেই মিলছে না। যেমন সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, (সার্কুলার ২১ মার্চ ২০০৮), ‘শোষক শ্রেণীর কোন দলের অনুকম্পা ও দয়ার উপর নির্ভর করে কমিউনিস্টরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে না।’ অথবা (সার্কুলার ১ অক্টোবর ২০০৭) ‘নিজস্ব শক্তি ভিত গড়ে না তুলে আওয়ামী লীগের সাথে নির্বাচনী সমঝোতার কথা ভাবলে চলবে না।’
বর্তমানে পার্টি নেতৃত্বের ভূমিকার সঙ্গে এইসকল কথার কি কোন মিল পাওয়া যাবে?
শেখ হাসিনার মুক্তিলাভ ও আমেরিকা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম যে ১৪ দলের সভা হয়েছিল, সেই সভায় পার্টির প্রেসিডেন্ট রাশেদ খান মেনন বলে এসেছিলেন যে, ওয়ার্কার্স পার্টি নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করবে, যদিও ১৪ দলের অন্যান্য শরীকগণ নৌকা প্রতীক নিতে অসম্মত ছিলেন। স্বয়ং কমরেড মেননই পার্টির কাছে এই রিপোর্ট করেছিলেন। এরপর হঠাৎ করেই নৌকা প্রতীকের প্রস্তাবটি আসলো নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি দিকে পলিটব্যুরোর সভায়। এ নিয়ে বির্তক চলে। কোন সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। তারপর ঠিক হয় যে, ৫ ডিসেম্বর পুনরায় পলিটব্যুরো সভা হবে এবং ৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটির সভা হবে। এরপরের ঘটনা বেশ নাটকীয়। মাত্র একদিন আগে আমাকে সাধারণ সম্পাদক জানালেন যে, ২ ডিসেম্বর সকাল ৮টায় পলিটব্যুরোর জরুরি সভা হবে। মৌখিক নোটিশ এবং কোন এজেন্ডা নাই। সাধারণ সম্পাদক বললেন, সভাটি আমার বাসায় হবে। আমি আপত্তি করিনি। সম্ভবত: তিনি পার্টি অফিস এড়াতে চেয়েছিলেন।
২ ডসেম্বর সকাল ৮টায় আমার বাসায় পলিটব্যুরোর সভা হলো। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হলো যে, পার্টি আওয়ামী লীগের কাছ থেকে যে কয়টি আসন পাবে সেই কয়টি আসনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করবে। আমি এবং আরও কয়েকজন পলিটব্যুরোর সদস্য (কমরেড নুরুল হাসান, কমরেড একবাল কবীর জাহিদ, কমরেড আজিজুর রহমান) এই রকম নির্লজ্জ আত্মসমপর্ণকারী সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলাম। একই সঙ্গে আমরা আরও বললাম কেন্দ্রীয় কমিটির ও কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভার সিদ্ধান্তকে বাতিল করে পলিটব্যুরোর কোন অধিকার নাই এইরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের। আমাদের প্রতিবাদের প্রতি কোনরকম কর্ণপাত করা হলো না। বরং পার্টির নেতৃত্বে ৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য কেন্দ্রীয় কমিটির সভা অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করলেন।
কমরেডগণ, ঘটনার বিবরণ আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। পলিটব্যুরোর এইরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ কতটা নৈতিকতা, কতটা বৈধ এবং এর পেছনে কার কি ধরনের মানসিকতা বা ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাস কাজ করেছে, তা আপনাদের বিবেচনার উপরই ছেড়ে দিলাম। নৌকা প্রতীক গ্রহণের মারাত্মক বিপদের দিকটিও আমি তুলে ধরতে চাই।
প্রথমত: আইনগত দিক। আমার জানামতে নৌকা প্রতীক গ্রহণের ফলে ওয়ার্কার্স পার্টির বিজয়ী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারী বোর্ডের অধীন হবেন। পার্টির নেতারা যারা নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন, তারা অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কোন ব্যাখ্যা সঠিক সেই বির্তকে না গিয়েও এটা বলা যায় যেওয়ার্কার্স পার্টির বিজয়ী সাংসদরা ভবিষ্যতে বেশ ঝুকির মধ্যে পড়বেন এবং গোটা বিষয়টি হাইকোর্ট, সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে।
দ্বিতীয়ত: রাজনৈতিক ও নৈতিক দিক। আওয়ামী লীগের উপর পুরোপুরি নির্ভর করে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করলে বিজয়ী প্রার্থীরা (এবং প্রার্থী তিনজনই পার্টির সর্বোচ্চ নেতা) নৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের উপর নির্ভরশীল থাকবেন। স্বাধীন রাজনৈতিক ভূমিকা নেবার ক্ষেত্রে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু নেতার ব্যক্তিগত বুর্জোয়া উচ্চাভিলাসকে চরিতার্থ করার জন্য পার্টিকে এতবড় বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া, এত বড় নির্লজ্জ সুবিধাবাদকে মেনে নেয়া যায় না। শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী পার্টির পক্ষে কোনভাবেই এই রকম নৈতিক ও রাজনৈতিক পরাজয় মেনে নেয়া যায় না।
আট: বুর্জোয়া সংকট ও করণীয়
সর্বশেষ কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক গৃহীত সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টটি সার্কুলার আকারে পাঠানো হয় (তারিখ: ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮)। সেই রিপোর্টের শেষ প্যারাটি এখানে উদ্ধৃত করা হচ্ছে।
‘আমরা জাতীয় জীবনের এক সন্ধিক্ষণে রয়েছি। বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থায় সংকট আমাদের সামনে অপার সুযোগ সৃষ্টি করলেও তা গ্রহণ করার মতো রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক যোগ্যতা না থাকার কারণে সেটা পারছি না। বাংলাদেশের বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থার এই সংকট দৃঢ়প্রোথিত এবং বারবার ঘুরে ঘুরে আসবে। ওয়ার্কার্স পার্টি কত যোগ্যতার সাথে এ ধরনের পরিস্থিতিতে এগিয়ে যেতে পারবে তার উপর নির্ভর করছে পার্টির সাফল্য। আসুন সেই আশায় যোগ্য হয়ে উঠি।’
এখানে যে বুর্জোয়া সংকটের কথা বলা হয়েছে তা শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির জন্য অপার সুযোগ সৃষ্টি করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বক্তব্যের এই অংশটি পুরোপুরি সঠিক। কিন্তু সেই সুযোগ কেন গ্রহণ করা যায়নি? সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক যোগ্যতার অভাবের কারণে তা পারা যায়নি। আমি মনে করি নেতৃত্বের প্রধান অংশের অনীহা এবং রাজনৈতিক অনিচ্ছাই মূল কারণ।
২০০৭ সালের ২১ জুলাই কেন্দ্রীয় কমিটি এই ধরনের বুর্জোয়া সংকটের অবস্থা মনে রেখে যে সকল করণীয় নির্ধারণ করেছিল, তার মধ্যে একটি ছিল এইরূপ:
‘বর্তমান বুর্জোয়া ব্যবস্থায় যে সকল ক্লেদ ও অসঙ্গতি বেরিয়ে এসেছে সেগুলোকে জনগণের সামনে উন্মোচিত করে পার্টির ২১ দফা কর্মসূচীকে সময়োপযোগী ও উন্নত করে বাম বিকল্পের ধারণাকে জনগণের সামনে বেশি বেশি করে নিয়ে আসা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে’।
২০০৭ সালের জুলাই মাসে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও পার্টি নেতৃত্ব বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির ‘ক্লেদ ও অসঙ্গতি’ জনগণের সামনে উন্মোচন করেনি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে সমালোচনা করা থেকে সযত্নে বিরত থেকেছে। যেন আওয়ামী লীগ সবরকম ক্লেদ ও দুর্নীতি মুক্ত। অথচ পার্টির ৬ষ্ঠ কংগ্রেসের (২০০০ সাল) রাজনৈতিক প্রস্তাবের ৯১ প্যারায় বলা হয়েছিল (পৃষ্ঠা- ৪২) ‘লুটেরা ধনীকশ্রেণীর শাসনের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আওয়ামী শাসনে অপচয়, দুর্নীতি, দলবাজী, মিথ্যাচার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আওয়ামী শাসনের আবারও রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে। সরকারের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত
ঘুষ-দুর্নীতি এখন সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে’।
ঠিক এই সকল কারণে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটে। পরবর্তী পাঁচ বছর রাজত্ব করে বিএনপি-জামাত জোট। এই পাঁচ বছরে দুর্নীতি, দলবাজী, দুঃশাসন সকল সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এটা এখন সাধারণভাবে বোঝা যায় যে, বুর্জোয়ারা এই দেশে কিছুটা দুর্নীতিমুক্ত, কিছুটা জনকল্যাণমুখী, কিছুটা গণতান্ত্রিক কিছুটা সুশাসন দিতে পারে না। বাংলাদেশের শাসক বুর্জোয়া শ্রেণী যে ধরনের লুটেরা চরিত্রের এবং যেভাবে সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল তাতে সামান্য ভালো কিছু আশা করা যায় না। উপরন্তু সাম্রাজ্যবাদের হস্তক্ষেপ ও লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আনতে হবে। আজকের এই সংক্ষিপ্ত
চিঠিতে সাম্রাজ্যবাদের বিষয়টি আলোচনা করা হচ্ছে না, যদিও এই আলোচনা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
বুর্জোয়া শ্রেণীর এই ধরনের লুটেরা চরিত্রের এবং সাম্রাজ্যবাদের শোষণ ও হস্তক্ষেপের কারণে বারবার বুর্জোয়া রাজনীতির সংকট দেখা দিয়েছে। কখনও কখনও সেই সংকট চরম আকার ধারণ করে, যেমন করেছিল ২০০৬ ও ২০০৭ সালে। এগারই জানুয়ারির পরিবর্তন ছিল সেই সংকটেরই প্রকাশ ও পরিণতি। পার্টির দলিলে সেই সংকটের কথাই বলা হয়েছে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর ক্ষমতায় এলো নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার; যার পেছনে ছিল সামরিক আমলাতন্ত্র। তারা ৩৬ বছরের জঞ্জাল পরিষ্কারের আশার বাণী শুনিয়েছিল। কিন্তু তাদের দুবছরের রাজত্ব প্রমাণ করলো, তারাও ব্যর্থ। শুধু ব্যর্থই নয়, তারাও চরমভাবে অগণতান্ত্রিক। জরুরি আইন, নিষ্ঠুর দমননীতি, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়া, বিরাজনীতিকীকরণের প্রয়াস, নতুন করে দুর্নীতির প্রসার, দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, অর্থনীতির অচলাবস্থা এই নতুন শাসকদের শাসন ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। কারণটা খুবই সহজ। এই শাসকরাও আওয়ামী লীগ-বিএনপির চেয়ে ভিন্ন শ্রেণীর কেউ নন।
তাই সংকটের নিরসন হয়নি। অনেক ঘটনাবলীর পর এখন নির্বাচন হতে চলেছে। কিন্তু বুর্জোয়া সংকটের নিরসন হবে না। বুর্জোয়া সংকট কিভাবে আমাদের জন্য অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে (যা সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে বলা হয়েছে)?
লেনিন বিপ্লবী অভ্যুত্থানের জন্য যে তিনটি শর্তের কথা উল্লেখ করেছিলেন (দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের পতন) তার সবকয়টি শর্ত বর্তমানে বাংলাদেশে উপস্থিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শর্তটি হচ্ছে এই যে, শাসকগোষ্ঠীর মধ্যেও সংকট দেখা দিয়েছে, যখন শাসকশ্রেণী পুরানো পন্থায় আর শাসন করতে পারছে না। এইটাই বুর্জোয়া রাজনীতির সংকট, যা শ্রমিকশ্রেণীর সামনে বিপ্লবী সম্ভাবনার দিক উন্মোচন করে।
কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেই আপনা-আপনি বিপ্লবী অভ্যুত্থান শুরু হয়ে যাবে না। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর মতো পার্টি থাকা দরকার, আরও দরকার সাবজেকটিভ প্রস্তুতি। লেনিন বিপ্লবের অবজেকটিভ অবস্থার পাশাপাশি সাবজেকটিভ দিকের কথাও বলেছিলেন। আমাদের সেইরকম উপযুক্ত পার্টি নাই। কিন্তু নাই বলে কি হতাশ হয়ে নিশ্চুপ বসে থাকবো? নাকি অবজেকটিভ অবস্থার, বুর্জোয়া সংকটের সুযোগ নিয়ে (সাধারণ সম্পাদকের ভাষায় ‘অপার সম্ভাবনা’) দ্রুত পার্টিকে পরিস্থিতি অনুযায়ী যোগ্য করে তুলবো?
সেজন্য পার্টিকে নিজস্ব শ্রেণী ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে উপযুক্ত কর্মসূচী দিতে হবে। বুর্জোয়া সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে এবং বুর্জোয়া দলগুলির ‘ক্লেদ ও অসঙ্গতি’ প্রকাশ করতে হবে। পার্টি নেতৃত্ব সেদিকে না গিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যের ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা মনোযোগী হয়েছে, যার চূড়ান্ত লক্ষ ছিল কোনভাবেই আসন আওয়ামী লীগের কাছ থেকে পাওয়া যায় কিনা।
কমরেডগণ, আমি মনে করি, এখনও সময় ও সুযোগ আছে। কিন্তু সেজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সুবিধাবাদ থেকে পার্টিকে মুক্ত করা এবং সময়ের দাবি অনুসারে বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা। এই প্রসঙ্গে আমি লেনিনের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করতে চাই। লেনিন বলেছেন, ‘বিপ্লব যে একেবারেই ছোট একটা পার্টি দিয়ে শুরু হতে পারে ও বিজয়ে সমাপ্ত হতে পারে, একথা আমি আদৌ অস্বীকার করছি না। কিন্তু জানা চাই কী পদ্ধতিতে নিজের পক্ষে জনগণকে টানতে হবে। তার জন্য বিপ্লবের আমূল প্রস্তুতি দরকার। আমূল প্রস্তুতি ছাড়া আপনারা একটা দেশেও বিজয় অর্জন করবেন না। জনগণকে পেছনে টানার জন্য একেবারে ছোট পার্টিতেও বেশ চলে। নির্দিষ্ট কোনো কোনো সময় বৃহৎ সংগঠনের দরকার হয় না।’
(কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের তৃতীয় কংগ্রেসের লেনিনের বক্তৃতা ১ জুলাই ১৯২১)
নয়: আহ্বান
কমরেডগণ, আমাদের পার্টি এখনও সেই যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু পারতে হবে। আমাদের দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন বহুধা বিভক্ত এবং সামগ্রিকভাবে দুর্বল। অথচ এখনই সময়, দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে পার্টি ও কমিউনিস্ট আন্দোলনেক পুনর্গঠিত করা।
যে সকল বিচ্যুতি ও সুবিধাবাদের কথা এখানে আলোচিত হয়েছে, তার থেকে পার্টিকে মুক্ত করা দরকার। এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম জোরদার করা দরকার। অতীতে পার্টি অভ্যন্তরে কিছু কিছু সংগ্রাম হয়েছে। অনেক সময় বলা হয় যে, আন্তঃপার্টি সংগ্রাম নাকি পার্টিকে দুর্বল করে। না, তা ঠিক নয়, বরং এই সংগ্রাম পার্টিকে শক্তিশালী করে। অতীতে পার্টির অভ্যন্তরে সুবিধাবাদ বা দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতির বিরুদ্ধে যেটুকু সংগ্রাম হয়েছে, তার কিছু ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। আবার কখনও কখনও অসংগঠিতভাবে, বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে অথবা কোন ভুলপয়েন্টে যে সকল আন্তপার্টি সংগ্রাম হয়েছিল তা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়নি। এখন আমাদের সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে জোরদার করে পার্টির কমরেডদের বিপ্লবী ধারায়
ঐক্যবদ্ধ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এই সংগ্রামকে এখন জোরদার করতে হবে।
এই চিঠিতে আমি একাধিকবার ‘পার্টি নেতৃত্ব’ শব্দটি উচ্চারণ করেছি। আমি নিজেও নেতৃত্বের অংশ। ফলে নেতৃত্বের দোষ ত্রুটি ও বিচ্যুতির দায়ভার অংশত আমাদের কাঁধেও পড়ে। এই স্বীকারোক্তি আমি করছি।
পার্টির ব্যাপক কর্মীদের মধ্যে দুই ধরনের প্রবণতা আছে। একদিকে আছে বিপ্লবী আকাঙ্খা এবং সেটাই ভরসার জায়গা। কিছু কিছু অঞ্চলে পার্টির পরিচালনায় প্রশংসনীয় গণসংগ্রাম ও শ্রেণী সংগ্রাম গড়ে উঠেছে। কিন্তু পার্টির সামগ্রিক নীতি যদি অপরিষ্কার থাকে অথবা সুবিধাবাদ দ্বারা আচ্ছন্ন থাকে তাহলে সেই সব শ্রেণী ও গণসংগ্রাম কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। এই প্রসঙ্গে লেনিনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি বারবার স্মরণ করতে হয়, ‘বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া কোন বিপ্লবী আন্দোলন হতে পারবে না।’ (কি করতে হইবে) অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক চর্চার ফলে পার্টির মধ্যে এক ধরনের অতিবিপ্লবী (এবং কিছুটা সুবিধাবাদীও) পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।
আসুন, আমরা সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জোরদার করি। বিপ্লবী মতাদর্শভিত্তিক ঐক্যকে জোরদার করি। সকল প্রকার ডান ও বাম বিচ্যুতি থেকে মুক্ত করে বিপ্লবী ধারায় পার্টি কমরেডদের পুনগঠিত করি। এই সঙ্গে সমগ্র কমিউনিস্ট আন্দোলনকেও ঐক্যবদ্ধ ও পুনর্গঠিত করার তাগিদে আমরা প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে যেন ভূমিকা রাখতে পারি, সেই আশাও আমি করছি। বুর্জোয়ারা ব্যর্থ। তাদের রাজনৈতিক দলগুলিও ব্যর্থ। সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ। জনগণ বিকল্পের সন্ধানে। আসুন আমরা ‘বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প’ তুলে ধরি। সেই লক্ষ্যে পার্টি ও কমিউনিস্ট আন্দোলনকে পুনর্গঠিত করি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

