বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো ভাড়া ও কলচার্জ হিসেবে গ্রাহকদের কাছ থেকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা আদায় করলেও সরকারকে ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে। চুক্তি অনুযায়ী মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো তাদের আয়ের শতকরা ১৫ ভাগ সরকারকে পরিশোধ করার কথা। কিন্তু, তারা এখন পর্যন্ত পরিশোধ করছে মাত্র ৫.৫ ভাগ। এ ব্যাপারে সরকারের গঠিত টাস্কফোর্স পদক্ষেপ নেয়ার কথা বললেও বিটিআরসি তা করছে না। ইতিমধ্যে প্রায় দু'বছর পার হয়ে গেছে। গ্রামীণ, একটেল, সিটিসেল, বাংলালিংক, টেলিটক ও ওয়ারিদ- এই ৬টি মোবাইল কোম্পানি দেশে কাজ করছে। এর মধ্যে টেলিটক ছাড়া বাকি ৫টিই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি এই মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর বছরে মোট আয়ের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। সেই হিসেবে বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব গচ্ছা যাচ্ছে সরকারের। এদের মধ্যে গ্রামীণ ফোন একাই বছরে প্রায় সাড়ে ৫ শ' কোটি টাকা রাজস্ব থেকে সরকারকে বঞ্চিত করছে। সরকারের এই রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ অর্থাৎ ১৫ ভাগ রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার জন্য ইতিপূর্বে দু'টি সরকারের আমলে দুই দফায় সংসদীয় সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এমনকি নতুন টেলিযোগাযোগ আইনও করা হয়েছিল। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনকে। কিন্তু, কিছুতেই সরকারের এই ন্যায্য পাওনা আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি। সর্বশেষ বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শুরুতে গঠন করা হয় টাস্কফোর্স। টাস্কফোর্সের ওই রিপোর্টে ২০০৭ সালের জুলাই থেকে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর আয়ের ওপর সরকারের শতকরা ১৫ ভাগ রাজস্ব বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়। এ রিপোর্ট বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে যথাসময়ে চিঠিও দেয়া হয়েছিল বিটিআরসি'কে। কিন্তু বিটিআরসি তা বাস্তবায়ন না করায় গত অর্থ বছরে সরকার প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা হারিয়েছে। চলতি অর্থ বছরেও প্রায় একই পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। অর্থাৎ এ দু’বছরে সরকারের প্রায় দু’হাজার কোটি টাকা গচ্ছা গেছে, শুধু টাস্কফোর্সের
রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করার কারণেই। সূত্রমতে, এরজন্য এককভাবে দায়ী বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)। বিটিআরসি’র শীর্ষ পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা মোটা অংকের বখরা খেয়ে এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। প্রসঙ্গত, গত ১০ ফেব্রুয়ারি বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মঞ্জুরুল আলম পদত্যাগ করেন। চেয়ারম্যানের পদে থেকে তিনি মোবাইল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে টাস্কফোর্সের রিপোর্ট বাস্তবায়নে গড়িমসি দেখিয়েছেন।
চুক্তিতে ঘাপলা এবং রাজস্ব ফাঁকি
১৯৯৬ সালের নভেম্বরে গ্রামীণফোন, একটেল ও সেবা টেলিকম (বর্তমানে বাংলালিংক) এই তিনটি কোম্পানির সঙ্গে সরকারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আগে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তাতে শর্ত ছিল গ্রাহকদের থেকে প্রাপ্ত আয়ের ১৫% সরকারকে দিতে হবে। এই শর্ত মেনেই তখন কোম্পানিগুলো দরপত্র দাখিল করেছিল। দরপত্র মূল্যায়িতও হয়েছিল সেভাবে। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এতে গলদ রেখে দেয়া হয়। তৎকালীন টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে চুক্তিতে বড় ধরনের ঘাপলা সৃষ্টি করেন। চুক্তিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ভাড়া ও কল চার্জের ১৫% প্রতি তিন মাস অন্তর প্রদান করার বিকল্প হিসেবে ৪ লাখ ডলার ও সংগৃহীত কলচার্জের ১% প্রদানের স্বাধীনতা দেয়া হয়, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। অতীতে কোনো চুক্তিতে আয়ের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে এভাবে ন্যূনতম ফি পরিশোধের স্বাধীনতা দেয়ার নজির নেই। কেবল বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর কোথাও এ ধরনের চুক্তি হয় না। মোটা অংকের বখরার বিনিময়ে গ্রামীণফোনসহ তিনটি কোম্পানিকে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির সুবিধা করে দেয়ার জন্যই উদ্দেশ্যমূলকভাবে চুক্তিতে এই ঘাপলা সৃষ্টি করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের চুক্তিতে সর্বোচ্চ সুবিধার নিশ্চয়তা সংক্রান্ত বিকল্প সুবিধা পাওয়ার কথা সরকারের। এজন্য চুক্তিতে উল্লেখ থাকা উচিত ছিল- 'ভাড়া ও কলচার্জ থেকে সংগৃহীত আয়ের ১৫% অথবা ৪ লাখ ডলার এবং ১% এই দু’য়ের মধ্যে যেটি বেশি তাই প্রদান করবে সরকারকে।' দেশি এবং আন্তর্জাতিক সব চুক্তির ক্ষেত্রেই এমনটি অনুসরণ করা হয়। অথচ, সরকার পক্ষের যারা এই চুক্তি সম্পাদনের দায়িত্বে ছিলেন তারা মোবাইল কোম্পানিগুলোকে অবৈধ সুবিধা দেয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবেই এর ব্যত্যয় ঘটান।
২০০২ সালের উদ্যোগ এখনও কার্যকর হয়নি
বেসরকারি টেলিফোন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি সরকার ইচ্ছা করলেই পুনর্মূল্যায়ন করার সুযোগ ছিল না। এমনকি চুক্তিতে কোনধরনের ত্রুটি থাকলেও বিদ্যমান আইনের দুর্বলতার কারণে তা সরাসরি সংশোধনের সুযোগ ছিল না। ফলে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে ঘাপলা বা ত্রুটির কারণে সরকার ক্রমাগতই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দেয়ায় ২০০১ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ এ্যাক্ট নামে একটি নতুন আইন তৈরি করা হয়। ওই আইনে বলা হয়, 'সরকার ইচ্ছা করলে যে কোন চুক্তি সংশোধন,পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারবে।'এই আইনের আওতায় ২৩ মার্চ ২০০২ গ্রামীণফোন, একটেল এবং সেবা টেলিকম (বাংলালিংক)-এর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করার জন্য বিটিআরসিকে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে সে চিঠিটি বিটিআরসি'তে চাপা পড়ে থাকে। বিটিআরসি এ ব্যাপারে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, মন্ত্রণালয় থেকেও আর কোন তাগাদা দেয়া হয়নি। এক সময়ে দেখা গেছে, মন্ত্রণালয় থেকে বিটিআরসি'কে লেখা চিঠিটিও গায়েব হয়ে গেছে। ফলে বিগত সময়ে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
সংসদীয় সাব-কমিটির বৈঠকে আলোচনা
মোবাইল কোম্পানিগুলোর রাজস্ব ফাঁকি ও চুক্তির অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন ঠার পর ১৯৯৯ সালের ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ৭ম জাতীয় সংসদের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ীকমিটির ৮ম বৈঠকে গ্রামীণফোনের রেভিনিউ ফাঁকির বিষয়ে তুমুল আলোচনা হয়। ওই আলোচনার প্রেক্ষিতে ৮ জুন ১৯৯৯ তৎকালীন হুইপ মিজানুর রহমান মানুর নেতৃত্বে একটি সংসদীয় সাব-কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে বেসরকারি মোবাইল কোম্পানিগুলোর অনিয়ম তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। সংসদীয় সাব-কমিটির সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, "গ্রামীণফোনের মূল টেন্ডার ইনভাইটেশনে প্রস্তাব ছিল, গ্রাহকদের কাছ থেকে যে আয় হবে তার ১৫% সরকার পাবে। কিন্তু চুক্তি সম্পাদনের সময় এটিকে বাইপাস করে ১৫% এর সঙ্গে 'অথবা' যুক্ত করা হল। চুক্তিতে বলা হয়,রাজস্বের ১৫% অথবা ১% এবং ৪ লাখ ডলার। এভাবে চুক্তি হতে পারে না। রাজস্বখাতে কোন চুক্তি করতে হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র লাগে। এক্ষেত্রে তাও নেয়া হয়নি।" তখনকার পরিস্থিতি উল্লেখ করে সাব-কমিটির বৈঠকে বলা হয়, 'এই মুহূর্তে গ্রামীণফোনের যদি ৩০ হাজার গ্রাহক থাকে এবং গ্রাহকপ্রতি যদি ৩ হাজার টাকা বিল আসে, তাহলে মাসে গ্রামীণফোন৯ কোটি টাকা অর্জন করবে। এই ৯ কোটি টাকার ১৫% হারে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা আসে। তাহলে ১২ মাসে সরকারের ১৫ কোটি টাকা অর্জিত হওয়ার কথা। অথচ, গ্রামীণফোন বছরে দিচ্ছে ১% এবং ৪ লাখ ডলার- যা মাত্র ২ কোটি টাকা হয়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে তাদের ১৩ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার একটা বিশেষ সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। কীভাবে এই চুক্তিটি হলো তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।' ১৯৯৯ সালের জুন মাসের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় সংসদীয় সাব-কমিটিতে। কিন্তু এখনকার প্রেক্ষাপট আরও বিস্তৃত। গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক প্রতিটির গ্রাহক সংখ্যা বর্তমানে কোটি ছাড়িয়ে গেছে। একটেল, সিটিসেলসহ অন্যান্য কোম্পানিরও গ্রাহক সংখ্যা অনেক। ১৯৯৯-এর ৮ জুন সংসদীয় সাব-কমিটি গঠনের পর কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু অন্তঃসারশূন্য বৈঠকের ফলাফলে সাব-কমিটির কোন রিপোর্ট প্রণীত হয়নি। এমনিভাবে এক পর্যায়ে অপমৃত্যু ঘটে সংসদীয় সেই সাব-কমিটির। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সংসদীয় সাব-কমিটির সেই সদস্যরা মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর অর্থের কাছে হার মেনেছেন।
চারদলীয় সরকারের সংসদীয় সাব-কমিটি
চারদলীয় জোট সরকার আমলে সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ-এ মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর রাজস্ব ফাঁকির এই কাহিনী তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে পর সরকারের উচ্চ পর্যায়েব্যাপক তোলপাড় হয়। জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক হয়। শীর্ষ কাগজে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে একটি সাব-কমিটি গঠিত হয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকারের অডিট বিভাগ থেকে গ্রামীণফোন ও একটেলকে চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে ওই দু’টি উদ্যোগের কোন ফলাফল অর্জিত হয়নি। এর কারণ ওই একটিই। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর অর্থের কাছে তারা নিজেরাই ম্যানেজ হয়ে গিয়েছে। এদিকে চুক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মোবাইল কোম্পানিগুলো অব্যাহতভাবে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চলছে।
তত্ত্বাবধায়ক আমলের উদ্যোগ এবং টাস্কফোর্স
সর্বশেষ, ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ১৯ মার্চ ২০০৭ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দফতরের পরিচালক (সিগন্যালস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রফিকুল ইসলাম, এনডিসি, পিএসসি’কে আহ্বায়ক করে ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। ২৮ মার্চ ২০০৭ বিটিআরসি’র সভাকক্ষে টাস্কফোর্সের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় টাস্কফোর্সের কার্যাবলীর সাধারণ রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়। সরকারের সাথে মোবাইল অপারেটরদের রেভিনিউ শেয়ারিং নির্ধারণ, মোবাইল টেলিফোনের শেয়ার পুঁজিবাজারে উন্মুক্তকরণ, মোবাইল টেলিফোনের বিভিনড়ব চার্জ পুনঃনির্ধারণ, মোবাইল ফোন সেক্টরে দেশীয় জনবলের কর্মসংস্থান প্রভৃতি বিষয়কে কমিটির টার্মস অব রেফারেন্স হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ওই বৈঠকে বিটিআরসি'র জনবল ও কারিগরি জ্ঞানের দুর্বলতা রয়েছে উল্লেখ করে টেলিকম অপারেটরদের কার্য¬ম নিয়ন্ত্রণে বিটিআরসি'র নিজস্ব কোন কার্যকরী ব্যবস্থা নেই মর্মে মত প্রকাশ করা হয়।
টাস্কফোর্স-এর রিপোর্টে যা আছে
টাস্কফোর্স-এর রিপোর্টে বিটিআরসি'র মোবাইল টেলিফোন সংক্রান্ত লাইসেন্স প্রদানের নীতিমালা, সকল মোবাইল অপারেটরের লাইসেন্স, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর টেলিকম রেগুলেটরি কার্যাবলী, কলচার্জ, লাইসেন্স ফি, সকল মোবাইল কোম্পানির বাৎসরিক হিসাব ও অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করে এই ফোন কোম্পানিগুলোর রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ, দেশের পুঁজিবাজারে তাদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করাসহ বিভিনড়ব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ এবং তা বাস্তবায়নের জন্য বিটিআরসিকে দিক-নির্দেশনা দেয়া হয়। বেসরকারি সেলুলার ফোন কোম্পানির অপারেটিং ব্যবস্থার ত্রুটি, তাদের আয়-ব্যয় অস্বচ্ছতা ও রাজস্ব প্রদানের ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়ার তথ্যপ্রমাণও পায় টাস্কফোর্স। গ্রামীণফোন ও একটেল-এর ২০০৫ সালের এবং বাংলালিংক-এর ২০০৬ সালের অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করে তদন্ত কমিটি এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছে যে, অডিট রিপোর্টে আয়ের পরিমাণ যা দেখানো হয়েছে প্রকৃত পক্ষে প্রতিটি মোবাইল কোম্পানির আয় আরও অনেক বেশি। এ কারণে কোম্পানিগুলোর অডিট ভালভাবে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণে রাখতে বলা হয়েছে টাস্কফোর্সের রিপোর্টে। এছাড়া টাস্কফোর্সের রিপোর্টে সরকারের বড় অংকের রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি বেশ গুরুত্ব সহকারেই তুলে ধরা হয়েছে। টাস্কফোর্সের অনুসন্ধানে দেখা যায়, চুক্তির সময় ওয়ারিদ টেলিকম ছাড়া অন্য মোবাইল কোম্পানিগুলো সরকার বা বিটিআরসিকে কোন লাইসেন্স ফি দেয়নি। এমনকি গ্রামীণ, একটেল ও বাংলালিংক গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ভাড়া ও কলচার্জের ১৫% প্রদান করার যে শর্ত ছিল তাও তারা পরিশোধ করেনি। চুক্তির ঘাপলার সুযোগ নিয়ে আয়ের ১৫%-এর পরিবর্তে এই শর্তের বিকল্প হিসেবে প্রথম ৫ বছরে প্রতি বছর ৪ লাখ মার্কিন ডলার এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ভাড়া ও কলচার্জের ১%, দ্বিতীয় ৫ বছরে ১৬ লাখ ডলার এবং ১% প্রদান করছে। কিন্তু কোম্পানিগুলোর আয় অনুযায়ী এই রাজস্ব যৎসামান্য বলে মন্তব্য করেছে টাস্কফোর্স। চুক্তিতে নীতি বহির্ভূতভাবে কোম্পানিগুলোকে তাদের ইচ্ছেমতো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছে। অথচ দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির রীতি নীতি অনুযায়ী এ অপশন পাবার কথা সরকারেরই। তাই টাস্কফোর্স একমাত্র ওয়ারিদ টেলিকম ছাড়া (যেহেতু কোম্পানিটি নতুন) অন্য মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ২০০৭ সালের ১ জুলাই থেকে পুরো ১৫% হারে রাজস্ব আদায়ের সুপারিশ করেছে। এই সময় ওয়ারিদের কাছ থেকে ১০% হারে আদায় এবং পরবর্তীতে বছরে ১% হারে বাড়ানোর কথা বলেছে টাস্কফোর্স। টাস্কফোর্সের ৬ নং সুপারিশমালায় তা উল্লেখ করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের ওই রিপোর্টে আরও দেখা যায়, মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোতে নিয়োজিত স্থানীয় জনবলের বেতন-ভাতা থেকে বিদেশি জনবলে বেতন-ভাতা অনেক বেশি। বহুসংখ্যক দেশি জনবলের জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানি যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে তার থেকে কয়েকগুণ বেশি অর্থ মাত্র ক'জন বিদেশির পেছনে ব্যয় করা হয়ে থাকে। জনবল নিয়োগের এ অসামঞ্জস্যতা অবিলম্বে দূর করতে বলা হয়েছে রিপোর্টে। টাস্কফোর্সের ৮ নং সুপারিশমালায় তা উল্লেখ করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের ১৬টি সুপারিশমালা সম্বলিত এ রিপোর্ট ১৬ মে ২০০৭ ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট দাখিল করে।
টাস্কফোর্সের সুপারিশ এবং মন্ত্রণালয়ের আদেশ মানছে না বিটিআরসি
টাস্কফোর্স এ রিপোর্ট ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পেশ করার পর পরই মন্ত্রণালয় উল্লেখিত সুপারিশমালা বাস্তবায়নের জন্য রিপোর্টটি বিটিআরসি'তে পাঠায় এবং বিটিআরসি’কে এই মর্মে পৃথক চিঠিতে নির্দেশও দেয়া হয়। এরপরও বিটিআরসি এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। জানা গেছে, বিটিআরসি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, বিশেষ করে দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান মোবাইল কোম্পানিগুলো থেকে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে টাস্কফোর্সের রিপোর্ট বাস্তবায়ন থেকে বিরত ছিলেন। এর ফলে একদিকে সরকার মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিটিআরসি’র চেয়ারম্যানসহ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা মোবাইল কোম্পানিগুলো থেকে অবৈধ উপায়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগকারী বিটিআরসি'র চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মঞ্জুরুল আলম শুধুমাত্র এ খাতে বেসরকারি মোবাইল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর ফলে তার দু’বছরের মেয়াদকালীন সময়ে সরকার এই খাত থেকে কমপক্ষে দু'হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
সূত্র: রিপোর্টটি সরাসরি সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ এর ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯ সংখ্যা থেকে তুলে দেয়া হলো
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

