যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বীমা প্রতিষ্ঠান আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ (এআইজি) কে যখন সে দেশের সরকার জনগণের অর্থ দিয়ে দিয়ে কোনরকমে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, এআইজির মালিক এবং ব্যবস্থাপনা পক্ষ তখন সে টাকায় নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়ার ধান্দায় ব্যস্ত। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় ডুবতে বসা এই বীমা প্রতিষ্ঠান কে মার্কিন সরকার গত বছরের সেপ্টম্বর থেকে এ পর্যন্ত ১৭ হাজার কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছে। তারপরও দেখা গেল শীর্ষকর্মকর্তারা মার্চের ১৫ তারিখে শুধুমাত্র বোনাস হিসাবেই নেন ১৬ কোটি ডলার অথচ ঠিক এ সময়েই লাখ লাখ দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত চাকুরী হারিয়ে বেকার হয়ে যাচ্ছে কিংবা তাদের ঘরবাড়ি নিলামে উঠে তারা হয়ে যাচ্ছে গৃহহীন। যখন প্রয়োজন ছিল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থদের নগদ অর্থসহায়তা দেয়া, তাদের কর্মসংস্থানের নিশ্চায়তা দেয়া, সরকারী খাতে আরো বেশী বেশী কর্মসংস্থান তৈরী করা, সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচী যেমন: শিক্ষা,স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে সরাসরি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানো তখন মুক্তিবাজার অর্থনীতির মার্কিন সরকার বেসরকারী লস কে সরকারীকরণের প্রকল্প হাতে নেয় এবং সব মিলিয়ে এ যাবত বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোর 'বিষাক্ত সম্পদ' কিনে নিতে এক লাখ কোটি ডলার বরাদ্দ করেছে। এসব নিয়ে মার্কিন মুল্লুকে শুরু থেকেই প্রতিবাদ প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে। সুদুর মার্কিন কিংবা ইউরোপীয় পুজিবাদী অর্থনীতের ভয়ংকরতম সংকটের তাপ-চাপ যখন আমাদের মতো দেশে এসে লাগতে শুরু করেছে- যখন গার্মেন্টস এবং আদম-সন্তান রপ্তানীখাতে মন্দার আচ পাওয়া যাচ্ছে, খোদ মার্কিন মুল্লুকের মতই এখানেও স্থানীয় শিল্পপতিগণ মন্দার সুযোগে কিছু ধান্দাপাতি করে নেয়ার পায়তারা শুরু করেছে।
মামাবাড়ীর যত আবদার
সম্ভাব্য মন্দাকে উপলক্ষ করে ব্যাবসায়ী শিল্পপতিদের বিভিন্ন সংগঠন- বিজেএমই, বিকেএমই, এফবিসিসিআই বিভিন্ন ভাবে তাদের যেসব দাবী দাওয়া হাজির করছে সেগুলোর কিছু উল্ল্যেখযোগ্য অংশ হলো:
# প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে এফবিসিসিআই নগদ ৬০০০ কোটি টাকার জরুরী তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেছে যার মধ্যে গার্মেন্টস খাতের জন্য সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা, বস্ত্র ও সূতা খাতের জন্য এক হাজার চারশ কোটি টাকা, বাকি এক হাজার একশ কোটি টাকা হলো পাট, চামড়া, হিমায়িত খাদ্য ও অন্যান্য রপ্তানী খাতের জন্য ব্যবহার করা হবে;
# কালোটাকা সাদা করার সুযোগ এবং এ লক্ষে পাচ বছর মেয়াদী ইনভেষ্টমেন্ট বন্ড এর সুবিধা;
# বিজেএমই এবং বিকেএমই নগদ ১০ শতাংশ নগদ সহায়তার দাবী জানাচ্ছে;
# মোট রপ্তানী আয়ের ৩০% এর উপর প্রতিডলার রপ্তানী আয়ের জন্য ১০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেয়া, যেটাকে বলা হচ্ছে "বিশেষ বিনিময় হার" এর সুবিধা;
# মেয়াদী ঋণের পুন:তফসিলীকরণ করণ করে ঋণপরিশোধের সময় আরও তিন বছর বাড়িয়ে দেয়া;
# ঋণের সুদের হার হ্রাস করে ৭% এর নীচে নিয়ে আসা;
# পোষাক খাতে ভ্যাট প্রত্যাহার;
# জেনারেটরের জন্য ডিজেলে ভর্তুকি;
# কর মওকুফের যোগ্য আয়ের সীমা ১.৬৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকায় উন্নীত করা ইত্যাদি।
ভর্তুকী কার জন্য:
বিশ্ব মন্দায় বিশ্ববাজারে রপ্তানী পণ্যের মূল্য কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন রপ্তানীকারী দেশগুলোকে পরস্পরের সাথে এক ভয়ংকর প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হতে হচ্ছে। এ প্রতিযোগীতা আগেও ছিল।মন্দায় তার তীব্রতা বেড়েছে কেবল। কোন দেশের বেসরকারী শিল্পমালিকদের মধ্যে যারাই কম মূল্যে পণ্য সরবরাহ করবে তারাই এই বাজারে টিকতে পারবে- পুজিবাদী অর্থনীতিতে এটা অন্যসব সময়ের মতোই এই মন্দার সময়েও সত্যি। প্রতিযোগীতামূলক বাজারে পণ্যের বাজার রক্ষার জন্য পণ্যমূল্য কম রাখার অর্থনৈতিক উপায় হলো উতপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে কমখরচে অধিক পণ্য উতপাদন করা, কোন খাতকে নগদ ভর্তুকী দিয়ে নয়। তবে যদি শিল্পটি সরকারী অর্থাত জনগনের হয় কিংবা কৃষির মতো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোন খাত হয় তাহলে সেখানে জনগনের করের টাকা ব্যায় করা যেতে পারে, তবে অবশ্যই মেকানিজমটি এমন হতে হবে যেন জনগনের করের টাকায় গুটি কয়েক ধনপতি লাভবান না হয়।
কাজেই প্রশ্ন হলো বেসরকারী পুজিমালিকের উতপাদিত পণ্যের মূল্য কমানোর জন্য সরকার অর্থ্যাত জনগনের করের টাকা কেন ব্যয় করা হবে? সেই শিল্পমালিক কি তার লাভের টাকা জনগণকে প্রদান করে? তাহলে তার লসের ব্যয়ভার কেন জনগণ বহন করবে? আর যদি ভর্তুকি দেয়া হয়, তাহলে তার ফলাফল হলো অন্য একটি দেশের নাগরিক যারা এই পণ্যটির ক্রেতা তাদের কে ভর্তুকী দেয়া কারণ তারা উতপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পণ্যটি কিনতে পারছে। আমরা কেন উন্নত দেশের ভোক্তাদের কম দামে পণ্য পেতে আমাদের করের টাকা খরচ করব--- সে চেষ্টাতো তাদের দেশের সরকারেরই করা উচিত, তাই না?
এখন এর উত্তরে যদি বলা হয়, বেসরকারী পুজিমালিক তো তার লাভ একা খায় না, সেটার বিনিময়ে লাখ লাখ শ্রমিকের তো কর্ম সংস্থান হয়, সেই পুজিপতি যদি নি:স্ব হয়ে যায়, তাহলে সেই শ্রমিকদের কি হবে, তাহলে আমাদের বলবার কথা হলো--প্রথমত, গার্মেন্টস খাতের মত একটা লাভজনক খাতের লাভের মাত্র এক শতাংশ শ্রমিকদের কাছে যায়- অন্যান্য খাতেও লাভের খুব সামন্য অংশই শ্রমিকের হাতে যায়, দ্বিতীয়ত: শিল্প বন্ধ হয়ে শ্রমিকের চাকরী হারানোর যুক্তিই যদি দেয়া তাহলে তো সে শিল্পকে নগদ অর্থ ভর্তুকী দেয়ার বদলে চাকুরীচ্যুত শ্রমিকদের আশু সংকট মোকাবেলা করার জন্য তহবিল গড়ে তোলা প্রয়োজন, বেকারত্ব ভাতার জন্য সে অর্থ ব্যয় করা প্রয়োজন এবং দীর্ঘ মেয়াদে যেন তারা সমস্যায় না পড়ে তার জন্য সরকারী ভাবে নতুন নতুন কলকারখানা নির্মান করার মাধ্যমে কিংবা বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা জাতীয়করণের মাধ্যমে সেগুলোতে নগদ অর্থবিনিয়োগ করে নতুন নতুন স্থায়ী কর্মস্থান তৈরী করা প্রয়োজন। এর ফলে ছাটাই হওয়া দেশীয় শ্রমিক যেমন কর্মসংস্থান পাবে তেমনি বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরাও ছাটাই হয়ে দেশে ফিরলে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।
শ্রমিকের দায়দ্বায়িত্ব কার
শ্রমিক ছাটাই প্রসংগে একটা কথা পরিস্কার করা দরকার- সুসময়ে যে পুজিমালিক শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে বিত্তের পাহাড় গড়ে তোলে, মন্দা কিংবা লসের সময় সে সেই শ্রমিকদের কোন দায়দায়িত্ব নেয়না, খুব সহজেই যখন তখন শ্রমিক ছাটাই করে দেয়। আসন্ন সংকটেও আমরা তাই ঘটতে দেখব- শিল্পমালিকেরা ভর্তুকীর কথা তোলার সময় আমাদেরকে এই ভয়ই দেখাচ্ছে যে, দেখ সরকার যদি আমাদের নগদ সহায়তা না দেয়, তাহলে আমার ইচ্ছামত শ্রমিক ছাটাই করতে শুরু করব- যেন শ্রমিকদের ওয়েলফেয়ার বিষয়ে তাদের কোন দায়ভার নেই! আমরা শিল্পমালিকদের এ অবস্থানের তীব্র বিরোধীতা করছি এবং শিল্পমালিকরা যেন যখন তখন যেন তেন ভাবে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ না দিয়ে শ্রমিক ছাটাই করতে না পারে সে জন্য সরকারের নজরদারীর দাবী জানাচ্ছি।
প্রয়োজন জনকল্যাণ মূলক খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বৃদ্ধি:
আরেকটা বিষয় হলো মন্দায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ কিন্তু পুজিমালিকেরা নয় বরং দেশের বৃহত্তর দরিদ্র জনগোষ্ঠী। মন্দায় পুজিমালিকের কারখানা বন্ধ হলেও তার ভাতের হাড়িতে টান পড়বেনা, বাসস্থানের অভাব ঘটবে না, চিকিতসায় ব্যাঘাত ঘটবে না কিংবা তাদের পোষ্যদের লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে যাবে না। কিন্তু এর সবকটিই ঘটবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যে। কাজেই মন্দার সময় সর্বাগ্রে এদের ভাবনাটাই ভাবা প্রয়োজন। মন্দায় যেসব শ্রমিক চাকরী হারাবে, যেসব কৃষক ফসলের উতপাদন খরচটুকুও তুলতে না পেরে নি:স্ব হয়ে যাবে তাদের ভাতের হাড়িটা কিভাবে চলবে, তাদের স্বাস্থ্য-চিকিতসা-বাসস্থানের কি ব্যাবস্থা হবে কিংবা তাদের সন্তানের পড়াশোনার খরচটা কেমন করে চলবে সে চিন্তা সর্বাগ্রে করা প্রয়োজন- প্রয়োজন তাদের জন্য একটা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা।
এবং তীব্র প্রতিরোধ:
পুজিবাদ এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে ব্যবস্থায় পুজিপতি ক্রমাগত মুনাফা অন্বেষণ করতে করতে অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত নানান সংকট ডেকে আনে এবং সে সংকট কে পুজিকরে আবার মুনাফার ধান্দা করে। আবার এ ব্যবস্থায় যখন পুজিপতির নিজের মুনাফার সংকট থাকে না, তখনও কিন্তু শ্রমিক-কৃষক সংকট মুক্ত থাকে না। মন্দা পুজিপতির জন্য একটা ব্যবসায়িক চক্র হলেও শ্রমিক-কৃষকের কিন্তু নিত্য বাস্তবতা। তবে সংকটের সময় সে বাস্তবতা আরো বেশী প্রত্যক্ষ আরও বেশী নির্মম। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও হয়তো এর ব্যাতিক্রম ঘটবে না। কাজেই আসন্ন সংকটে পুজিপতিরা যেন তাদের উপর আরও বেশী চেপে বসতে না পারে, যেন তাদের যথাযথ প্রাপ্য তাদের কে দিতে বাধ্য হয়, তাদেরকে যেন যখন তখন ছাটাই করতে না পারে, সরকার যেন তাদের টাকায় পুজিপতিদের কর রেয়াত কিংবা নগদ সহায়তা না দিতে পারে বরং যেন তাদের কর্মসংস্থান সহ তাদের পরিবার পরিজনের খাদ্য-বস্ত্র,বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিতসা ইত্যাদির যথাযথ নিশ্চায়তা দিতে বাধ্য হয় সে লক্ষে শ্রমিক-কৃষক এবং তাদের পক্ষের শক্তিকে আরো বেশী সজাগ, সংঘবদ্ধ এবং সোচ্চার থাকতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

