somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আবারও টিফা: নাছোড়-বান্দা আমেরিকা নতজানু সরকার

২৯ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১০:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জনগণকে অন্ধকারে রেখে আরো একটি চুক্তি, আরো একটি সম্ভাব্য দাসত্বের খৎ আমাদের সামনে। টিফা। টিফা মানে Trade and Investment Framework Agreement অর্থাৎ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কিত কাঠামোগত রূপরেখা। এ বিষয়ে বেশ অনেকদিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর কথা-বার্তা চলছে। প্রথমে ২০০৩ সালের অগাষ্ট মাসে, এর পর ২০০৪ সালের মার্চ মাসে এবং এরপর ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে টিফা চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা চলে।(১) তখন বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো সহ দেশ প্রেমিক জনগণের আন্দোলনের মুখে জোট সরকার আর বিষয়টি নিয়ে বেশি এগোয় নি। একই কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও দুই একবার এ সম্পর্কে কথাবার্তা শোনাগেলেও তারা আগানোর সাহস করেনি। বর্তমানে আওয়ামী লিগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই টিফা চুক্তি নিয়ে আবারও নতুন করে কথা বার্তা শুরু হয়। বাণিজ্য মন্ত্রী ফারুক খান মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টির কাছে টিফা চুক্তির বিষয়ে বর্তমান সরকারের আগ্রহের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। গত ৩ ফেব্রুয়ারী তিনি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ(অ্যামচেম) এর মাসিক মধ্যাহ্হ্রভোজ সভায় বলেছেনঃ "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংগে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ রূপরেখা চুক্তি (টিফা) হওয়ার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। এখন মন্ত্রীসভার অনুমোদনের অপেক্ষায়। টিফা হলে বাংলাদেশী জনগণ উপকৃত হবে-- "।(২) সর্বশেষ দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন য্ক্তুরাষ্ট্রের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল জে. ডিলানি গত ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশে এলে আবারও টিফার বিষয়টি সামনে চলে আসে। পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কয়েস সংবাদ মাধ্যমকে জানান যে সরকার টিফা চুক্তিটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে। অথচ পরিক্ষা-নিরিক্ষার আগেই আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রী ফারুক খান টিফার ব্যাপারে সরকারের মতামত জানিয়ে দিয়ে বসে আছেন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কি মত দেবে । অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের এরকম একটা চুক্তি হতে যাচ্ছে জনগণের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে । বলা হচ্ছে চুক্তি হলে দেশের জনগণ উপকৃত হবে কিন্তু যে খসড়া চুক্তির উপর ভিত্তি করে আলোচনা শুরু হবে, সেটাই প্রকাশ করা হচ্ছে না । আমরা মনে করি এ ধরনের একটা চুক্তি হওয়ার আগে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন, জনগণের মতামত গ্রহণ প্রয়োজন, প্রয়োজন ব্যপক ভিত্তিতে তার আলোচনা হওয়ার। অথচ সেটা না করে সরকার যেনতেন ভাবে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক একটা চুক্তি । কে জানে এটাই হয়ত এদের দিন বদলের নমুনা !

আমাদের হাতে আছে ২০০৫ সালে প্রস্তাবিত TIFA এর ড্রাফট।(৩) এইবার তাতে আরো কিছু আর্টিকেল যুক্ত কিংবা বিযুক্ত হয়েছে কিনা তা আমরা এখন পর্যন্ত জানি না। জানি না আমাদের প্রতি সেই কৃপা এই মহাপরাক্রমশালী ডিজিটাল সরকার করবে কিনা। অথচ এই চুক্তির ডিজিটাল কপি প্রকাশ করে ডিজিটাল আলোচনার মাধ্যমে একটা ডিজিটাল সিদ্ধান্ত নেয়া কতই না সহজ ছিল ! ২০০৫ সালের জানুয়ারী মাসে চুক্তির সর্বশেষ যে খসড়াটি করা হয়েছিল ফেব্রুয়ারী মাসের আলোচনার জন্য, সেটি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করে আমরা এখানে অনুবাদ করছি। পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য। এখন আমরা কেন টিফা চুক্তির বিরোধীতা করছি সে বিষয়ে আমাদের যুক্তিগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব।

টিফা কি স্রেফ একটা বাণিজ্য চুক্তি?

টিফা চুক্তির প্রস্তাবনা কিংবা ধারায় ব্যাবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ইত্যাদি কথা থাকলেও চুক্তির ব্যাবহার কিন্তু স্রেফ বাণিজ্যিক নয়। বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে স্বল্পন্নোত দেশগুলো জোট বাধতে থাকায় মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে তার স্বার্থ হাসিল করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এখনকার লক্ষ হলো বহুপাক্ষিক ফোরামে তার স্বার্থ বিরোধী তৎপরতা বন্ধ ও দুর্বল দেশগুলোর সাথে আলাদা আলাদা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে একদিকে অধিকতর বাণিজ্য সুবিধা আদায় অন্যদিকে ভূরাজনৈকিত, সামরিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রে প্রাধান্যবিস্তার। এই প্রেক্ষিতে একটা বিষয় লক্ষণীয়। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যতগুলো দেশের সাথে টিফা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তার কোনটির সাথেই কিন্তু তার সম্পর্ক স্রেফ বাণিজ্য কেন্দ্রিক নয়। সবচেয়ে বাণিজ্যিক লেনদেন যেসব দেশের সাথে যেমন: কানাডা, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ইত্যাদির সাথে কিন্তু আমেরিকার কোন টিফা নেই। টিফা আছে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের সাথে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্তমহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ব্রুনেই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপিনস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের সাথে, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে আলজেরিয়া, বাহরাইন, মিশর, জর্জিয়া, আইসল্যান্ড, ইরাক, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদিআরব, টিউনিশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইয়েমেনের সাথে, আমেরিকা মহাদেশের মধ্যে ক্যারীবিয়ান দেশগুলো ও উরুগুয়ের সাথে এবং আফ্রিকা অঞ্চলের মধ্যে অ্যাঙ্গোলা, ঘানা, লাইবেরিয়া, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি দেশের সাথে।(৪) দেশগুলোর তালিকা একটু খেয়াল করলেই বোঝা কঠিন নয় টিফা নামের এই বাণিজ্য চুক্তিটি আসলে যতটা না বাণিজ্য বিষয়ক তার চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বের দেশে দেশে আমেরিকার রাজনৈতিক-সামরিক স্ট্রাটেজি বা কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহ্রত হচ্ছে।

একেবারে সাম্প্রতিক একটি উদাহরনের দিকে তাকাই। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি উরুগুয়ের সাথে যুক্তরাষ্ট্র টিফা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ফাইনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার মতে মাত্র ১৩ বিলিয়ন ডলারের জিডিপির দেশ উরুগুয়ের সাথে আমেরিকার দ্বিপাক্ষিয় বাণিজ্য এতই সামান্য যে অর্থনৈতিক হিসেবে এই টিফা খুব সামান্য গুরুত্বই বহন করে। তাহলে যুক্তরাষ্ট্র উরুগুয়ের সাথে টিফা স্বাক্ষর করতে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ল কেন? যে কোন টিফা চুক্তির পরবর্তী ধাপই হলো এফটিএ বা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট। মজার ব্যাপার হলো টিফা চুক্তির পেছনে এই এফটিপি স্বাক্ষরের প্রণোদনার চেয়ে বড় আরেকটি প্রণোদনা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে আর তা হলো ল্যাটিন আমেরিকার আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি Mercusor কে দুর্বল করে ফেলা। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে মিলে ১৯৯১ সালে স্বাক্ষরিত মারকাসর বা Mercado Comun del Sur (Sothurn Common Market) এর মূল শ্লোগান হলো Our North is the South বা দক্ষিণই হলো আমাদের উত্তর অর্থাৎ NAFTA বা North American Free Trade Agreement এর আওতায় চলমান যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আসা। চার সদস্য রাষ্ট্র ছাড়াও পরবর্তীতে সহযোগী সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে এ চুক্তির সহযোগী সদস্য দেশ হিসেবে রয়েছে আরও ৫ টি দেশ- বলিভিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর ও পেরু। ভেনিজুয়েলারও সদস্য দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি প্রকৃয়াধীন।(৫) মারকাসর শুরু থেকেই তার সদস্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রেখেছে ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ওয়াশিংটন মারকাসরকে দেখছে ল্যাটিন আমেরিকায় তার সাম্রাজ্যবাদি আধিপত্য বিস্তারের অন্তরায় হিসেবে। উরুগুয়ের সাথে টিফা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে ঠিক এরকমই একটা প্রেক্ষাপটে। আমেরিকার হিসেবটা এরকম: উরুগুয়েকে দিয়ে যদি এরপর এফটিএ স্বাক্ষর করানো যায় তাহলে হয় মারকাসর থেকে তাকে বের করে দেয়া হবে অথবা মারকসরের নিয়কানুন পরিবর্তন করে এর সদস্যদেশগুলোকে আমেরিকার সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর পথ খুলে দিতে বাধ্য হবে। এর যে কোন একটিই ব্লকটিকে দুর্বল করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।(৬)

কাজেই টিফার মতো যে কোন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক লক্ষের সাথে সম্পর্কিত। যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিগুলোকে ব্যবহার করে তার দুর্বল পার্টনাদের কাছ থেকে বিবিধ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সুবিধা হাসিল করে নেয়। ইরাক আগ্রাসন কিংবা ”সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” ইত্যাদি ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান কিংবা মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোকে ব্যাবহার করার কাজে দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোকে কাজে লাগানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির বক্তব্যটি স্মরণীয়:
”পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব সন্ত্রাস দমনের বিরুদ্ধে পরস্পের সহযোগী। একটা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে যেন উভয় অর্থনীতির রপ্তানিকারক ও বিনিয়োগকারীরা নতুন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে এবং সন্ত্রাস দমনের জন্য উপযুক্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরী করতে সহায়তা করতে পারে।” একই ভাবে জোয়েলিক ২০০৪ এর মার্চ মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে টিফা চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও বলেন এ চুক্তি ”অর্থনৈতিক স্তরে উভয় দেশের সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে যা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধকে আরও শক্তিশালী করতে সম্পূরক ভূমিকা পালন করবে”।(৭)

কাজেই টিফা চুক্তিকে আর দশটা সাধারণ বাণিজ্যচুক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না।


সব টিফা কি একরকম?

কাঠামোগত অর্থে সব টিফা একরকম কিন্তু বাজার উদারীকরণের মাত্রা ও ধরণ ধারণের ক্ষেত্রে স্বাক্ষরকারী দেশের শক্তিমত্তা অনুসারে বিভিন্ন দেশের মধ্যকার টিফার প্রস্তাবনায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষ করা যায়। সাধারণ ভাবে সব টিফারই দু্টি অংশ- প্রস্তাবনা ও মূল ধারা। অন্য যে কোন চুক্তির সাথে টিফার পার্থক্য হলো মূল ধারাগুলোর কোন গুরুত্ব না রেখে মূল গুরুত্ব আরোপ করা হয় প্রস্তাবনা অংশের উপর। প্রস্তাবনাগুলো মেনে নিয়েই মূল ধারাগুলোতে স্বাক্ষর করতে হয়। মূল ধারাগুলো দুনিয়ার সব টিফার ক্ষেত্রে একরকম হলেও প্রস্তাবনাগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের শাসক শ্রেণীর ধরণ ধারণ, শক্তিমত্তা ও জাতীয় স্বার্থরক্ষার তাগিদ অনুসারে কিছুটা ভিন্নরকম হয়ে থাকে। বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত টিফার প্রস্তাবনাগুলোর সাথে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলংকার সাথে বেশ মিল লক্ষ করা যায় কিন্তু মালশিয়ার টিফার সাথে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ করা যায়। মাহাথির শাসনের পরবর্তীতে মালেয়শিয়া যে সময়ে বাজার উদারীকরণের দিকে হাঁটে, সে পর্যায়ে, মে ১০, ২০০৪ সালে স্বাক্ষরিত মালেশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র টিফায় যেখানে প্রস্তাবনা রয়েছে ১১ টি(৮), সেখানে বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত টিফায় প্রস্তাবনা হলো ১৯ টি। মালেয়শিয়ার টিফাও যে খুব একটা জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে হয়েছে তা নয়- সেটিতেও দেশী-বিদেশী বেসরকারী খাতের উৎসাহ দান, বাণিজ্য উদারীকরণ কিংবা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস ইত্যাদির বাধ্য-বাধকতা রয়েছে কিন্তু যে প্রস্তাবনাগুলো মালেয়শিয়ার টিফায় নেই কিন্তু বাংলাদেশের টিফায় রয়েছে সেগুলো আরো ভয়ংকর, অধিকতর জাতীয় স্বার্থ বিরোধী। যেমন: বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত টিফার প্রস্তাবনা ৪ এ উল্লেখিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগে স্বচ্ছতা বা ট্রান্সপারেন্সি, প্রস্তাবনা ৬ এ উল্লেখিত সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার ”কুফল” বিষয়ে বক্তব্য, প্রস্তাবনা ৮ উল্লেখিত সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের ”সুফল” সম্পর্কিত বক্তব্য, প্রস্তাবনা ১৩ তে উভয় দেশের মধ্যে শুধু সেবাখাতের বাণিজ্য বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ এবং ১৪ তে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার বা অশুল্ক বাণিজ্য বাধা তুলে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার ইত্যাদি বিষয়গুলো কিন্তু মালয়েশিয়ার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা টিফা চুক্তিতে একেবারেই নেই।

ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটসের বাস্তবায়ন:

টিফা চুক্তির প্রস্তাবনা ১৫ তে বুদ্ধিবৃত্তিজাত সম্পত্তির অধিকার বা intellectual property rights (Trade-Related Aspects of Intellectual Property Rights ev TRIPS) বিষয়ক চুক্তি বা অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিজাত সম্পত্তি রক্ষার প্রচলিত নীতির পর্যাপ্ত এবং কার্যকর প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। অথচ ২০০৫ এ ডব্লিও টি ও এর দেয়া ঘোষণা অনুসারে বাংলাদেশ সহ অন্যান্য এলডিসি দেশগুলো ডবি−উ টি ও এর আওতায় ২০১৩ সাল পর্যন্ত ট্রেডমার্ক, কপিরাইট, পেটেন্ট ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি সম্পর্ক আইনের আওতার বাইরে থাকার সুযোগ পেয়েছে আর ফার্মাসিউটিক্যালসগুলো পেয়েছে ২০১৬ সাল পর্যন্ত।(৯) বলা হচ্ছে যেহেতু প্রস্তাবনা ৭ অনুসারে টিফা চুক্তিতে ডবি−উ টি ও এর আইন ও সমঝোতার আওতায় প্রত্যেক দেশের নিজ নিজ দ্বায়িত্ব ও অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে ফলে ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিজাত সম্পত্তি রক্ষার আইন বিষয়ক টিফার প্রস্তাবনা কার্যকর হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। অথচ বলা হচ্ছে না প্রস্তাবনা ৭ এর আরো পরের প্রস্তাবনা ১৮’র আওতায় ডবি−উ টি ও এরই দোহা এজেন্ডা বাস্তবায়নের অঙ্গিকারের কথা । ২০০১ সালে দোহায় অনুষ্ঠিত ডবি−উ টি ও এর মন্ত্রীসভা থেকে যে ঘোষণাগুলো আসে সেগুলোই দোহা এজেন্ডা নামে পরিচিত। এ ঘোষণার অন্যতম এজেন্ডা হচ্ছে ট্রিপস বাস্তবায়ন যা ঘোষণাটির ১৭, ১৮ এবং ১৯ নম্বর আর্টিক্যাল তিনটিতে ব্যক্ত করা হয়েছে।(১০) অর্থাৎ প্রস্তাবনা ৭ এককথায় পরিবর্তি প্রস্তাবনা ১৮ এর মাধ্যমে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। ফলে সন্দেহ নাই যে টিফা স্বাক্ষরের সাথে সাথে প্রস্তাবনা ১৫ অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে বাধ্য করবে ট্রিপস বাস্তবায়ন করতে ফলে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস বা ঔষধ শিল্প, কম্পিউটার-সফওয়ারস সহ গোটা তথ্যপ্রযুক্তি খাত আমেরিকার কম্পানিগুলোর পেটেন্ট, কপিরাইট, ট্রেডমার্ক ইত্যাদির লাইসেন্স খরচ বহন করতে করতে দেউলিয়া হয়ে যাবে। শুধু তথ্য প্রযুক্তি খাতেই দেশকে মেধাসত্ত্ব আইনের অধীনে সফটওয়্যার লাইসেন্স বাবদ ৫০ কোটি ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। ২০০৮ সালে Business Software Alliance (BSA) এর করা এক সমীক্ষা অনুসারে গোটা এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সফ্টওয়ার ”পাইরেসির” হার সবচেয়ে বেশি- ৯২% আর ৯০% পাইরেসি নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শ্রীলংকা। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত শ্রীলংকা-আমেরিকা ৭ম টিফা বৈঠকে আমেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল ডিলানির নেতৃত্বাধীন বাণিজ্য প্রতিনিধি দল এ বিষয়ে শৃলংকার উপর তীব্র চাপ প্রয়োগ করে। বৈঠকে মাইকেল ডিলানি বলেন:

"We’d like to see a strengthened focus on intellectual property protection and strengthened enforcement." (১১)

অর্থাৎ ” আমরা দেখতে চাই মেধাসত্ত্ব সংরক্ষণের উপর জোর দেয়া হচ্ছে এবং এ আইন বাস্তবায়ন জোরদার হচ্ছে।” সফটওয়্যার পাইরেসিতে ২য় স্থান অধিকারকারী শ্রীলংকার উপর যে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে তা থেকে সহজেই অনুমেয় ১ম স্থান অধিকারী বাংলাদেশের অবস্থা কি হবে।

মেধাস্বত্ত্বের পাপ:

মেধাস্বত্ত্ব বিষয়ে আনেকের মাঝেই এক ধরণের অপরাধ বোধ লক্ষ করা যায়। তারা মনে করেন মাইক্রোসফটের সফটওয়ার কিংবা নীল ক্ষেতে বিদেশী বইয়ের কপি/ফটোকপি ক্রয় ইত্যাদি এক ধরণের চুরি। ফলে একধরণের জাতীয় অপরাধ বোধও আমাদের কারও কারও মাঝে কার্যকর দেখা যায়। আমরা এ ধারণার সাথে একমত পোষণা করি না। আমরা মনে করি এই মেধাস্বত্তের ধারণাটিই একটি বড় ডাকাতি বা লুটপাটের ধারণা ফলে ডব্লিও টি ও এর আওতায় ২০১৩ কিংবা ২০১৬ সাল পর্যন্ত ছাড় নয় বরং গোটা ট্রিপস চুক্তিকেই আমরা প্রত্যাখান করি। মেধাসত্ত্ব আইনের পক্ষে যে যুক্তিটি মূলত দেয়া হয় তা হলো এভাবে কপি করে নেয়ার ফলে উদ্ভাবক তার উদ্ভাবনের উপযুক্ত মূল্য থেকে বঞ্চিত হয় আর উদ্ভাবক যদি তার উদ্ভাবনার উপযুক্ত মূল্য না পায় তাহলে নতুন নতুন উদ্ভাবনার প্রেরণাও হারিয়ে ফেলে, ফলে নতুন নতুন ধারণার উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বস্তুত এ ধরণের যুক্তির মধ্যে গুরুতর কিছু ভুল ধারণা বা স্ববিরোধ রয়েছে।

প্রথমত, ধরে নেয়া হচ্ছে কোন একটি উদ্ভাবনের পেছনে ব্যাক্তির একার বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানই একমাত্র- এর পেছনের সামাজিক বুদ্ধিবৃত্তিজাত ধ্যান-ধারণার কোন অবদান নেই। বাস্তবে কোন উদ্ভাবনই শূণ্য থেকে ঘটে না। আজকের দিনের কোন একটি আবিস্কারের পেছনে রয়েছে হাজার বছর ধরে মানবজাতির যৌথ সাধনার অবদান, বর্তমান সময়ের চকচকে মোবাইল কিংবা স্পোর্টসকার কিংবা সর্বশেষ ভারসনের অপারেটিং সফটওয়ারটি উদ্ভাবন সম্ভব হতো না যদি যুগে যুগে বিভিন্ন পদার্থ বিদ, গণিত বিদ সহ জ্ঞান বিজ্ঞানের হরেক শাখায় হরেক রকম সূত্র বা নিয়কানুন আবিস্কার না হতো।

দ্বিতীয়ত, একদিকে নতুন নতুন আইডিয়া বা ধারণার উদ্ভাবনের যুক্তি হাজির করা হচ্ছে অন্যাদিকে মেধাস্বত্ত্ব সংরক্ষরণের নামে, আইডিয়ার বাজারিকরণের মাধ্যমে সেই আইডিয়াকে গুটিকয়েক সামর্থবান লোকের হাতে কুক্ষিগত করে ফেলা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, আইডিয়া বা ধারণা যদি এভাবে কুক্ষিগত হয়ে যায় তাহলে জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতিও গুটিকয়েক ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে ক্রমশ কুক্ষিগত হয়ে যাবে এবং একসময় এর বিকাশও রুদ্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া মেধাস্বত্ত্ব আইন বা পেটেন্ট, কপিরাইট ইত্যাদি তো অতিসা¤প্রতিক কিছু ধারণা যা পুজিবাদ বিকাশের সাথে সম্পর্কিত। এই তো ১৮০০ সালের আগ পর্যন্ত তো খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই তো কোন কপিরাইট আইন ছিল না এবং এই কিছু দিন আগপর্যন্ত দুনিয়ার বেশির ভাগ দেশেই রাসায়নিক ও ঔষধশিল্পের উপর কোন পেটেন্ট ছিল না। কিন্তু তাই বলে কি তার আগে আবিস্কার উদ্ভাবন ইত্যাদি থেমে ছিল?

তৃতীয়ত, ব্যাক্তি উদ্ভাবকের শ্রমের মূল্য, উদ্ভাবনের প্রেরণা ইত্যাদি মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে পেছনের কর্পোরেট স্বার্থের ব্যাপারটিকে আড়াল করা হচ্ছে। ব্যাপারটাকি এরকম যে বাংলাদেশে বসে আপনি একটি সফটওয়ারের পাইরেট কপি না কিনে মাইক্রোসফটের অরিজিনাল কপি কিনলে সফটওয়্যারটি তৈরীকরার পেছনে যে প্রোগ্রামার আছেন তিনি দু’ডলার বেশি পাবেন? না, মাইক্রোসফট তার মজুরী বা বেতন আগেই দিয়ে দিয়েছে, এর পর যত কপিই বিক্রি হোক তার পুরোটাই যাবে মাইক্রোসফটের হাতে। এখানে ব্যাক্তির শ্রমের মূল্য বা প্রেরণা ইত্যাদি কোন বিষয় না আসল বিষয় হলো মাইক্রোসফটের মতো সব বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফা। এই সব বহুজাতিক কোম্পানি একদিকে মানবজাতির হাজার বছরের বুদ্ধিবৃত্তিগত সাধারণ সম্পদ ব্যবহার করবে, নিমগাছের প্যাটেন্ট করবে, বাসমতি চালের পেটেন্ট করবে, আদিবাসীদের ব্যবহ্রত তুলার প্রজাতি ব্যাবহার করে বিটি কটন নাম দেবে, মানুষের যুগ যুগের ভেষজ ও আয়ুর্বেদীয় জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ওষুধ তেরী করবে আর আমরা এসব আমাদের মত করে ব্যবহার করতে গেলেই বলবে চুরি হয়ে গেল বুদ্ধি বৃত্তিক সম্পদ, এর চেয়ে অদ্ভুত ও হাস্যকর কথা আর কিছু হয়না।

বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার উরুগুয়ে সম্মেলন থেকেই Intellectual Property Committee নামের DuPont, Pfizer, IBM, General Motors, Rockwell, Bristol-Myers সহ ১৩ টি বৃহৎ মার্কিন কোম্পানির এক কোয়ালিশান মেধাসত্ত্ব আইনকে ডব্লিউ টি ও এর বিভিন্ন এগ্রিমেন্টের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছিল। উরুগুয়ে রাউন্ডে ট্রিপস বিষয়ক আলোচনার সময় উপস্থিত ১১১ জনের মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের ৯৬ জনই ছিল বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানি থেকে আগত। ট্রিপসকে ডব্লিও টি ও এর বিভিন্ন নেগোসিয়েশানের আওতায় নিয়ে আসার পর এবার মার্কিন বহুজাতিকরা চেষ্টা করছে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের উপর ট্রিপস-প্লাস চাপিয়ে দিতে। যেহেতু ডব্লিও টি ও এর আওতায় ট্রিপসের ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশগুলো ২০১৩ সাল পর্যন্ত ছাড় পাবে এবং যেহেতু গাছ-পালা ও জীবজন্তুর পেটেন্টের বিষয়টি ঐচ্ছিক এবং বায়োটেকনিক্যাল উদ্ভাবনগুলো এর আওতার বাইরে সেহেতু এসব কর্পোরেশনগুলো এখন বিভিন্ন ভাবে ট্রিপস-প্লাস এর জন্য লবিং করছে। যেমন এদের লবিং এবং চাপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টিফা স্বাক্ষর কারী কিছু দেশ যেমন ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ও সিঙ্গাপুর ট্রিপস প্লাসের আওতায় বিভিন্ন প্ল্যান্ট বা গাছপালার প্যাটেন্ট আইন জারি করেছে।(১২) টিফা স্বাক্ষর হলে বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকতে পারবে এমনটি ভাবনা পাগলামো ছাড়া আর কিছুই নয়।

মার্কিন কবলে পড়বে সেবা খাত:

চুক্তির প্রস্তাবনা ৮ এ প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাণিজ্য বিকাশ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন তরানি¡ত করা ইত্যাদির জন্য সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের ধনাত্বক ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। তো কোন খাতে ঘটবে এ বিনিয়োগ সে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যায় প্রস্তাবনা ১৩ তে এসে যেখানে সেবা খাতের বাণিজ্য বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ টিফার মাধ্যমে বাংলাদেশের সেবা খাত মার্কিন বেসরকারী পুজির বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যে বাংলাদেশের জ্বালানীসহ বিভিন্ন সেবা খাতে বিনিয়োগ করতেই আগ্রহী সে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কথা থেকেই:

”--- গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জ্বালানি কোম্পানি শত শত মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশে এখনও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানী দরকার। যুক্তরাষ্ট্র এসব খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।”(১৩)

আর যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে এসব খাতে বিনিয়োগ করার সুযোগ করে দেয়ার জন্যই জ্বালানী খাতে বাপেক্স বা পেট্রোবাংলাকে যেমন দুর্বল করে রাখা হয়েছে ক্রমশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, বন্দর, ডাক ও যোগাযোগ খাতেরও একই অবস্থা করা হবে। এবং একসময় জ্বালানী খাতের মত অন্যান্য খাতের ক্ষেত্রেও বলা হবে বাংলাদেশের দক্ষতা নাই, প্রযুক্তি নাই, অর্থ নাই, সুতরাং মার্কিন বহুজাতিকের বিনিয়োগ ছাড়া আর উপায় কি! অথচ এই সব সেবা খাতে আমাদের মোট শ্রম শক্তির ২১.৪০ ভাগ নিয়োজিত এবং মোট দেশজ উতপাদনের ৪১.৩৭ ভাগ আসে এ খাত থেকে। টিফা চুক্তি হলে এসবই চলে যাবে মার্কিন পুজি-বিনিয়োগ কারীদের হাতে, বাণিজ্যিকীকরণের ফলে আরো বেড়ে যাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ইত্যাদি সেবার দাম এবং বহুজাতিকের মুনাফার স্বার্থে কাজ হারাবে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক।

বাজার উন্মুক্তকরণ: বাংলাদেশের পণ্য কি শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে?

একথা এখন সুবিদিত যে টিফা হলে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের পূর্ব ধাপ। আমেরিকা যত দেশের সাথে টিফা স্বাক্ষর করেছে পরবর্তিতে তাদের তিন ভাগের এক ভাগের সাথে ইতোমধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরও করেছে। বাংলাদেশের বেলায়ও যে তা হবে তার ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন বাংলাদেশ সফরে আসা আমেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধি ডিলানি। তিনি বলেছেন:

"Tifa can be a stepping stone to future trade agreements between our nations, but at its heart Tifa is simply an agreement in which both sides agree to meet regularly and explore opportunities to expand economic relations."(১৪)

অর্থাৎ ”আমাদের দুই জাতির মধ্যে ভবিষ্যত বাণিজ্য চুক্তির প্রাথমিক ধাপ হতে পারে টিফা কিন্তু মূলত টিফা হলো এমন একটি চুক্তি যেখানে উভয় পক্ষ নিয়মিত আলোচনা করা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার ব্যাপারে একমত হয়।”

আর এই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিস্তার যে কোন দিকে যাবে তার ইঙ্গিত পরিস্কার ভাবে টিফা চুক্তির ১৪ নং প্রস্তাবনায় উল্লিখিত অশুল্ক বাধা দূর করণ ও প্রস্তাবণা ১৯ এ উল্লিখিত বাণিজ্য উদারীকরণের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব আরোপ করা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। এর আগের বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার চুক্তি অনুসারে আমেরিকার মত উন্নত দেশগুলোতে বাংলাদেশের মতো সল্পোন্নুত দেশ গুলোর মোট ৯৭% পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ দেয়ার কথা। অর্থাৎ কোন স্বল্পোন্নত দেশ ১০০টি পণ্য রপ্তানি করলে ৯৭ টি বিনা শুল্কে রপ্তানি করতে পারবে এবং বাকি ৩ টি পণ্যের ক্ষেত্রে তাকে শুল্ক দিয়ে আমেরিকার বাজারে ঢুকতে হবে। আমেরিকা বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পন্য যেমন: গার্মেন্টস পণ্য, চামড়াজাত পণ্য ও ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্যকে এই ৩% এর মধ্যে ফেলে দেয়ায় বাংলাদেশ কার্যত এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রাপ্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধার কিছুই পাচ্ছে না। উল্টো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে গড় শুল্কহার ১২% হলেও বাংলাদেশকে আমেরিকার বাজারে ঢুকতে হলে ১৬% শুল্ক দিয়ে ঢুকতে হয়।(১৫)
প্রশ্ন হলো টিফা হলে কি বাংলাদেশের গার্মেন্টস বা অন্যান্য পণ্য এই ৩% এর বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে? টিফা চুক্তিতে এ বিষয়ে কোন কথাই নেই। চুক্তিতে অ-শুল্ক বাধা বা নন ট্যারিফ ব্যারিয়ার উভয় দেশেরই তুলে নেয়ার কথা থাকলেও ট্যারিফ বা শুল্ক মুক্ত বাজার সুবিধার কিছুই নেই। টিফার আওতায় বাংলাদেশ যে এ ধরণের কোন কিছুই পাবেনা তা ডিলানির নসিহত থেকেও স্পষ্ট, তিনি মনে করেন:

”শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধার চেয়ে বরং শুল্ক হ্রাস এবং অগ্রাধিকার সুবিধার জন্য বাংলাদেশকে নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ চালিয়ে যাওয়া উচিত --- আর তৃতীয় বিকল্প হতে পারে দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি(এফটিএ)।”(১৬)

অর্থাৎ ভয়ংকর ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে আমেরিকার বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের কোন সুযোগ যে নেই সেটা স্পষ্ট। টিফাতে অ-শুল্ক বাধা তুলে দেয়ার যে কথা আছে তাতে বাংলাদেশের কি কোন উপকার হবে? অশুল্ক বাধা হচ্ছে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য দেশীয় শিল্প কিংবা কৃষিজ পণ্যকে বিদেশী বহুজাতিকের পণ্যের হাত থেকে রক্ষা করার সর্বশেষ হাতিয়ার। বাংলাদেশ যদি মনে করে আমেরিকার রপ্তানিকরা কোন পণ্য বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিংবা দেশের কোন উদীয়মান শিল্পের বা কৃষিজাত পণ্যের জন্য হুমকীস্বরূপ সেক্ষেত্রে এখন চাইলে সেই পণ্য দেশে আমদানী নিষিদ্ধ করতে পারে কিংবা আরো বিভিন্ন ধরণের শর্তের বেড়াজালে ফেলে সে পণ্য আমদানী নিরুৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু টিফার মাধ্যমে যদি নাকে খত দিয়ে ফেলে যে আর অ-শুল্ক বাধা আরোপ করবে না তাহলে বাংলাদেশের অবস্থা টিফা চুক্তি করা শ্রীলংকা কিংবা থাইল্যান্ডের মতোই হবে- থাইল্যান্ডকে চাপ দেয়া হচ্ছে আমেরিকা থেকে জেনিটিক্যালি মডিফাইড বা জিম বীজ আমদানীর উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে আর শ্রীলংকাকে চাপ দেয়া হচ্ছে জিএম খাদ্য আমদানীর উপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য।

ভূতের মুখে রাম নাম:

১৬ এবং ১৭ নং প্রস্তাবনায় উল্লিখিত শ্রম আইন এবং পরিবেশ বিষয়ক নীতিমালা মেনে চলার গুরুত্বারোপ আপাত দৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও এগুলোর মাধ্যমে মূলত নীতিগত ভাবে আমেরিকা তার বাজার যেসব ক্ষেত্রে খুলে দেবে, কার্যক্ষেত্রে সে সব খাতে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশে বাধা আরোপে বিভিন্ন ধরনের অজুহাত তৈরী করবে। শুল্ক বহির্ভূত বাধা বা নন ট্যারিফ ব্যারিয়ার হিসেবে মানবাধিকার, শ্রমমান ও পরিবেশ ইত্যাদি বিষয় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মধ্যে সংযুক্ত করতে বহুদিন ধরে চাপ প্রয়োগ করে চলেছে মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র যেন এগুলোকে কাজে লাগিয়ে সে দেশে দেশে অর্থনেতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ হাসিল করে নিতে পারে, বলতে পারে অমুক দেশ মানবাধিকার মানছেনা, অমুক দেশ শিশু শ্রম আইন পালন করছেনা কিংবা পরিবেশ ধ্বংশ করছে সুতরাং এর উপর অবরোধ চাপানো কিংবা হামলা করা জায়েজ। বাস্তবে যে দেশ একবছরের মধ্যে বিনা নোটিশে লাখ লাখ শ্রমিক ছাটাই করাটা ব্যাবসায়ির স্বাধীনতা বলে গণ্য হয় এবং যে দেশ কোন বহুপাক্ষিক পরিবেশ চুক্তি মেনে নেয় না, সেই আমেরিকার মুখে শ্রম আইন ও পরিবেশ বিষয়ক নীতি মালার কথা ভুতের মুখে রাম নাম এর মতই শোনায়।


থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকার অভিজ্ঞাতায় টিফা:

থাইল্যান্ড টিফা চুক্তি করে ২০০২ সালের অক্টোবরে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই থাইল্যান্ডকে বাধ্য করা হতে থাকে আমেরিকার কর্পোরেট মনোপলির স্বার্থে এর বিভিন্ন সেবা খাত বেসরকারী করে দিতে। Electricity Generating Authority of Thailand (EGAT) বেসরকারী করণের উদ্যোগ নেয়া হয়। শুধু তাই নয়, EGAT বিক্রির পরমর্শক দের মধ্যে অন্যতম কর্পোরেশন Morgan Stanley, Citigroup and JP Morgan Chase and Co. অন্যান্য রাষ্ট্রায়াত্ব প্রতিষ্ঠান যেমন: Metropolitan Waterworks Authority, Provincial Waterworks Authority, the Government Pharmaceutical Organization, the Port Authority of Thailand, the Expressway and Rapid Transit Authority of Thailand ইত্যাদি বিক্রি করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়। জনগণের তীব্য আন্দোলন সংগ্রাম এর কারণে এগুলো এখন বাস্তবায়ন করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, ১৯৯৯ সাল থেকে থাইল্যান্ড জেনিটিক্যালী ইঞ্জিনিয়ারড বীজ আমদানীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, মুক্ত বাণিজ্যের নামে মনসান্টোর বিটি কটন আর রাউন্ড আপ রেডি কর্ন থাইল্যান্ডের বাজারে ঢুকানোর জন্য আমেরিকা ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করছে। আবার ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস এর আওতায় থাইল্যান্ডের সুগন্ধি চাল জেসমিন এর ও পেটেন্ট করার চেষ্টা চলে। আবার শ্রীলঙ্কার সাথে ২০০২ সালে টিফা চুক্তির সময় আমেরিকা গার্মেন্টস পণ্যের কোটা মুক্ত সুবিধার কথা বললেও বাস্তবে তা না দেয়ার জন্য নানান শর্ত চাপিয়ে দেয়-যেমন রুলস অব অরিজিনের এমন শর্ত যে শ্রীলঙ্কার উৎপাদিত গার্মেন্টস পন্য তেরী হতে হবে আমেরিকান ফ্যাব্রিক্স ব্যবহার করে, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস বাস্তবায়ন ইত্যাদি। ২০০৩ সালে পার্লামেন্ট এ ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস সম্পর্কিত আইন পাশ করতে গেলে তীব্র বাধার সম্মুখীন হয় এবং এক পর্যায়ে আদালতে মামলা পর্যন্ত হয় এবং আদালত মামলা কারীর পক্ষেই রায় দেন।(১৭) সর্বশেষ ২০০৯ সালে ৭ম টিফা বৈঠকে আমেরিকা আবার ট্রিপস বাস্তবায়নের ব্যাপারে শ্রীলংকাকে চাপ দেয় এবং সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জেনিটিক্যালী মডিফাইড ফুড আমদানীর উপর শ্রীলংকার যে নিষেধাজ্ঞা আছে সেটাও তুলে নেয়ার ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করে।

এরকম উদাহরণের শেষ নেই, যেখানেই টিফা স্বাক্ষরিত হয়েছে সেখানেই এই ধরণের ঘটনা ঘটছে, অবিলম্বে প্রতিরোধ করা না গেলে বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোন কারণ দেখছিনা।

পরিশিষ্ট ও তথ্যসূত্র পরবর্তি পোস্টে দেখুন(বোধহয় লেখার আকার বিষয়ে কোন লিমিটেশন আছে, পুরো লেখাটি একবারে দেয়া যাচ্ছে না।)
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১১:৪৯
১০টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×