দক্ষিণ আফ্রিকান ফুটবলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ভূভুজেলা বা স্টেডিয়াম হর্ণকে ইউরোপীয় দর্শক, ফুটবলার এবং সারা দুনিয়ার মিডিয়া ব্রডকাস্টাররা কান ঝালাপালা করে দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করে নিষিদ্ধ করার দাবী তুললে ফিফার প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটার আফ্রিকার সংস্কৃতির মহান-দরদী হিসেবে ঘোষণা করেন: ”আফ্রিকার ফুটবলকে ইউরোপীয়করণের চেষ্টা করা অনুচিত”। অথচ সেপ ব্লাটার যখন তার এই দরদ ঝরাচ্ছেন, ততদিনে বিশ্বকাপ উপলক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলকে ইউরোপীয়করণের সমস্ত আয়োজনই করে ফেলেছে কর্পোরেট ফিফা এবং তার স্থানীয় আফ্রিকান সহযোগী কালো পুঁজিপুতি শ্রেণী, (এদের প্রতিনিধি নিয়েই গঠিত হয়েছে স্থানীয় আয়োজক কমিটি- লোকাল আফ্রিকান কমিটি বা এলওসি) যারা বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো একটি প্রেসটিজিয়াস ইভেন্ট আয়োজন করে তাদের ইউরোপীয় সাদা ভাইদেরকে দেখিয়ে দিতে উন্মুখ হয়েছিল যে তারাও পিছিয়ে নেই। ইউরোপীয় সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন স্টেট অব দ্য আর্ট স্টেডিয়াম, যোগাযোগ অবকাঠামো, আবাসন সুযোগ-সুবিধা নির্মাণ থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের আশপাশ থেকে হকার উচ্ছেদ, ছিন্নমূল শিশু ও ঘরছাড়াদের একেবারে নগর ছাড়াকরণ, অন-লাইনে মূলত ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টিকিট বিক্রির আয়োজন ইত্যাদি সব কিছুই কর্পোরেট ফিফার ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড এর প্রতি আসক্তিরই নমুনা। আফ্রিকার কালো-নিপীড়িত-নিষ্পেষিত মানুষের সবচেয়ে প্রিয় খেলা ফুটবলকে কেন্দ্র করে কর্পোরেট পুঁজির এই বিশ্বকাপ সাময়িকভাবে দক্ষিণ আফ্রিকাসহ সমগ্র আফ্রিকাবাসীর মাঝে গর্বের অনুভুতি সঞ্চার করলেও এই ”জাতীয় গর্ব” অর্জনের বিনিময়ে দক্ষিণ-আফ্রিকার শ্রমজীবী মানুষকে ইতোমধ্যেই কি কি বঞ্চনা স্বীকার করতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো কিসের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে তার একটা রাজনৈতিক অর্থনৈতিক হিসাব নিকাশ করা জরুরী হয়ে পড়েছে।
আলোক উজ্জ্বল স্টেডিয়াম, আড়ালের অন্ধকার:
বিলাসবহুল ও জাকজমকপূর্ণ শ্বেতহস্তিরূপী ষ্টেডিয়ামগুলোর দিকে তাকালে ব্যয়বাহুল্যের বিষয়টি সহজেই চোখে পড়ে। জুলাই মাসে বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর এই অতিকায় ষ্টেডিয়ামগুলো কি কাজে লাগবে? এগুলো তৈরী করতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে দিতে হয়েছে ২৪ বিলিয়ন র্যান্ড(৭ র্যান্ড =১ ডলার অর্থাত ১ র্যান্ড = ১০ টাকা)। কেইপ টাউনের গ্রিনস পয়েন্ট বানাতে খরচ হয়েছে সবচেয়ে বেশি- ৪.৫ বিলিয়ন র্যান্ড। অথচ নিকটবর্তী এথলনেই একটি ষ্টেডিয়াম ছিল যেখানে সামান্য সংস্কার করে এবং কিছু আসন বাড়িয়ে সেমিফাইনাল আয়োজন করা যেত। কিন্তু হতদরিদ্র এথলন স্টেডিয়ামে খেলা আয়োজন সম্ভব হলো না কারণ, ফিফার ডকুমেন্ট বলছে: ”কোটি কোটি দর্শক টেলিভিশনের পর্দায় এইমাত্রার দারিদ্য্র ও বস্তির ছবি দেখতে স্বস্তি বোধ করবে না”। একই ভাবে, ৩.১ বিলিয়র র্যান্ড খরচ করে বানানো ডারবানের ৭০ হাজার আসন ক্ষমতা সম্পন্ন মুসা মাভিদা স্টেডিয়াম দেখে ততক্ষণই সুখ পাওয়া যাবে যতক্ষণ আমরা এর আড়ালের আবাসন সমস্যা, পানি-বিদ্যুতের অভাব, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যবস্থার দুরবস্থার কথা ভুলে থাকব। অথচ পাশেই ছিল শার্ক-রাগবি খ্যাত ৫২ হাজার আবাসন ক্ষমতা সম্পন্ন আবাসা স্টেডিয়াম, খুব সহজেই যার ধারণক্ষমতা আরো ২০ হাজার বাড়িয়ে নেয়া যেত।
এইসব স্টেডিয়াম, সড়ক ও হাইওয়ে, এয়ারপোর্ট ইত্যাদি অবকাঠামো খাতে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন র্যান্ড। এই ব্যয় ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান কিংবা ২০০৬ সালের জার্মানির বিশ্বকাপের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী। সে সময় বিশ্বে কোন অর্থনৈতিক মন্দা ছিল না কিন্তু তারপরও ঐসব দেশের জন্য সেই বিনিয়োগ কোন উল্লেগযোগ্য সুফল বয়ে আনেনি। আর বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ আফ্রিকার বেলায় সে সম্ভাবনা আরো কম। দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ আয়োজনের মোট খরচের পরিমাণটি পরিস্কার নয়। এখন পর্যন্ত তা প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে ৭৫৭ শতাংশ বেশি। বাস রেপিড ট্র্যান্সিটের কথা বাদ দিলে বিশ্ব কাপ উপলক্ষে ব্যয়ের ফলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদী খাত যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগ উল্ল্যেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। যেমন: বিশ্বকাপজনিত অবকাঠামো বিনিয়োগের পরিমাণ দশ বছরের আবাসন খাতের বিনিয়োগের সমান। দক্ষিণ আফ্রিকার মাত্র ৭% বিদ্যালয়ে কার্যকর লাইব্রেরী আছে। অথচ নতুন স্টেডিয়াম গুলোর প্রতি ৭টি সিটের খরচে একটি করে লাইব্রেরী গড়ে তোলা যেত। গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক খাতে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্থ করে বিশ্বকাপের পেছনে দক্ষিণ আফ্রিকার এই বিনিয়োগের সুফল ঘরে তুলছে ফিফা এবং অন্যন্যা বিদেশী বিনিয়োগকারীরা।
স্থানীয় অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো নির্মান শিল্পের মালিকেরা। ২০০৫ এবং ২০০৬ সালের মাঝে তাদের ট্যাক্সপূর্ব মুনাফা বাড়ে ৫৬ শতাংশ। এক্সিকিউটিভদের বেতন বাড়ে ৩৯%। অন্যদিকে নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের মাসিক আয় ছিল ১১৪৪ র্যান্ড থেকে ৪৫৭৬ র্যান্ড। বাস্তবে অনেক শ্রমিক এর চেয়ে অনেক কম পাচ্ছে- ঘন্টা প্রতি ৫.৫ র্যান্ড (ন্যূনতম মজুরীর অর্ধেক)। বেশির ভাগ শ্রমিকদের শ্রমিক ইউনিয়ন করার অধিকার নেই এবং তাদের বেশির ভাগকেই কাজ করতে হচ্ছে চুক্তি ভিত্তিতে (এলডিসি বা লিমিটেড ডিউরেশান কণ্ট্রাক্ট)। বিশ্বকাপ উপলক্ষে নির্মাণ কাজের সময় এ পর্যন্ত মোট ২৬টি ধর্মঘট সংগঠিত করেছে শ্রমিকেরা যার মধ্যে ২০টি ছিল বড় আকারের। এইসব স্বল্পমেয়াদী মজুরী ভিত্তিক কাজ প্রতিশ্র“তি মোতাবেক শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কোন ভূমিকাই রাখেনি। সরকার যেখানে দাবী করেছিল এভাবে ৪ লক্ষ ১৫ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে, বাস্তবে মাত্র ৫০ হাজার শ্রমিকের সাময়িক কর্মসংস্থান হয়েছে এর মাধ্যমে। অথচ ২৮ লক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকান তরুণের কোন কাজ নেই, নেই কোন শিক্ষা, দক্ষতা বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। ফলে শ্রমিক শ্রেণী প্রশ্ন তুলেছে, যে শাসক শ্রেণী ন্যূনতম আবাসন সমস্যার সমাধান করতে পারে না, সেই শাসক শ্রেণী কর্তৃক রেকর্ড পরিমাণ সময়ের মধ্যে ব্র্যান্ড নিউ স্টেডিয়াম তৈরী করে ফেলার রহস্য কি? কেন তীব্র দারিদ্র ও কর্মহীনতার মধ্যেও হাইওয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের মত উচ্চাভিলাষি প্রকল্প হাতে নেয়া হলো? মন্দা অর্থনীতির ফলে ২০০৯ সালেই ছাঁটাই করা হয়েছে ৯০ হাজার শ্রমিককে যার ফলে বেকরত্বের হার দাড়ায় ৩৫ শতাংশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক অধিকারের বেলায় শাসক শ্রেণী অর্থনৈতিক সংকটের কথা তুলে, অথচ স্টেডিয়াম বানানোর জন্য ২৪ বিলিয়ন র্যান্ড কিংবা অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৭৫৭ বিলিয়ন র্যান্ড খরচ করতে তাদের অর্থের অভাব হয় না!
আফ্রিকার নাগালের বাইরে আফ্রিকার বিশ্বকাপ
বিশ্বকাপ ফুটবলের টিকেট করা হয়েছিল ৪ ধরনের। এর মধ্যে ক্যাটাগরি-৪ হলো স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য সস্তায় খেলার দেখার টিকেট। বাকি তিনটি ক্যাটাগরি কেবল বিদেশীদের কাছে বিক্রির জন্য। সস্তা একটি ক্যাটাগরি করা হলেও দেশটির দরিদ্র অধিবাসীর কাছে টিকেটের দাম এবং ইন্টারনেট ও ক্রেডিট কার্ড ভিত্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ার কারণে সাধের বিশ্বকাপ নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে। যাদের ঘামের বিনিময়ে এই স্টেডিয়াম/অবকাঠামো নির্মিত হলো, তাদের জন্য বিশ্বকাপ দর্শন রীতিমত এক স্বপ্নের ব্যাপার- গ্র“প পর্যায়ের টিকেটের সর্বনিম্ন (ক্যাটাগরি ৪) দাম ১৪০ র্যান্ড(২০ ডলার)- একটি খেলা দেখার জন্য তাদেরকে বেশ কয়েকদিনের মজুরী জমিয়ে রাখতে হবে। আর ফাইনাল পর্যায়ের খেলায় তাদেরই নিজ হাতে বানানো একটি ভালো সিটে বসার জন্য এক জনকে প্রায় ৭ মাসের বেতন জমিয়ে রাখতে হবে। আর টেলিভিশন? লক্ষ লক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকানের ঘরে টেলিভিশন এবং বিদ্যুৎ সংযোগ নেই যে টেলিভিশনের মাধ্যমে তারা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবে।
কর্পোরেট ফিফা
দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকারই একটি প্রদেশ কাওয়াজুলু-নাটাল তার বিশ্বকাপ ‘লোগো’তে ”কাওয়াজুলু -নাটাল” শব্দের সাথে ”ওয়াল্ডকাপ ২০১০” শব্দটি জুড়ে দিতে চাইলে ফিফা কপিরাইটের নামে তাতে বাধা দেয় এবং নাটাল প্রদেশকে জানিয়ে দেয় এই কপিরাইট শব্দটি ব্যবহার করতে হলে তাকে ফিফার কাছ থেকে বিশেষ এক্রিডেশান কিনতে হবে অর্থাৎ ফিফার সাথে কমার্শিয়াল চুক্তি করতে হবে। অথচ ফিফা একটি বেসরকারী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত। এই তথাকথিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটির লাভজনক কমার্শিয়াল পার্টনাররা হলো: এডিডাস, সনি, ভিসা, এমিরাটস, কোকা-কোলা এবং হুনডাই-কিয়া মটরস যাদের প্রত্যেকটি ফিফাকে গড়ে ১২৫ মিলিয়ন ডলার প্রদান করেছে। শুধু টেলিভিশন স্বত্ত্ব বাবদ-ই ফিফা এই বিশ্বকাপ থেকে আয় করেছে ২.৮ বিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে প্রচার স্বত্ব্ , লোগো ব্যাবহার, কপিরাইট ইত্যাদি বাবদ এই বিশ্বকাপ থেকে ফিফার আয় হবে কমপক্ষে ২৪ বিলিয়ন র্যান্ড। চুক্তি অনযায়ী, এই অর্থ আয়ের বিনিময়ে ফিফা দক্ষিণ আফ্রিকাকে এক পয়সাও ট্যাক্স দেবে না। খেলার আয় থেকে বিদেশী খেলোয়ারদেরকে ট্যাক্স দিতে হলেও শুধু ফিফা নয়, তার সহযোগী বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, সম্প্রচার সহযোগী কাউকেই তাদের অর্জিত মুনাফার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারকে কোন ট্যাক্স দিতে হবে না। শুধু তাই না, ফিফার ষ্টান্ডার্ড অনুযায়ী ইউরোপীয় মানদন্ডের সাথে তাল মেলানোর প্রয়োজনীয় ফিফা এবং তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আমদানীকৃত পণ্যের উপরও কোন শুল্ক দিতে হচ্ছে না। দক্ষিণ আফ্রিকার রাজস্ব বিভাগকৃত হিসাব অনুযায়ী এপ্রিলের আগ পর্যন্ত এই টুর্নামেন্টের জন্য ৬১৩ মিলিয়ন ডলারের বিদেশী পণ্য আমদানী করা হয়েছে এবং ট্যাক্স মওকুফ করা হয়েছে ১১৮ মিলিয়ন র্যান্ড।
১৯৭৪ সালে ফিফার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ অ্যাডিডাসের সিইও হর্সট ডেসলার এবং বিপণন গুরু প্যাট্রিক নেলির সাথে মিলে বিশ্বকাপ ফুটবল-টেলিভিশন স¤প্রচার-কর্পোরেট স্পন্সরশিপ এই তিনের এক অভূতপূর্ব সম্মিলন ঘটান। এই সম্পর্কের ভিত্তিতেই তৈরী হয় পরবর্তী স্পোর্টস স্পন্সরশিপ প্যারাডাইম। স্পোর্টশ স্পন্সরশীপের জন্য ফিফা শুধু সারা দুনিয়ায় ব্যাবসা আছে এমন কোম্পানির সাথেই গাট ছাড়া বাধে এবং স্পনসরশিপ ও বিজ্ঞাপনের বিতরণ হয় পণ্য ভিত্তিতে- একেক পণ্যের জন্য একেক কোম্পানি। তখন থেকেই আয়োজক দেশের বদলে ফিফাই হয়ে উঠে স¤প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশীপ, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি বাবদ আয়ের একমাত্র দাবীদার।
গণতন্ত্র-মুক্ত বিশ্বকাপ
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার পর থেকেই ইউরোপ আমেরিকানরা আশংকা প্রকাশ করে আসছিল আফ্রিকার অপরাধ প্রবণতা বিষয়ে। ”তাদেরকে আশংকা মুক্ত” করতে তাই বিশ্বকাপ প্রস্তুতি এবং বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে অপরাধ, চরমপন্থা ইত্যদি নির্মুলের অভিপ্রায়ে এক অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে যেকোন মিছিল সমাবেশের বিরুদ্ধে। গত জানুয়ারি মাসে Motsoaledi Concerned Residents কে ’২০১০’ এবং বাস র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট বা বিআরটির কাজের কথা বলে মিছিল করার অনুমতি দেয়নি ডারবান মিউনিসিপ্যালিটি। পুলিশের অনুমতি না পেয়ে, অনুমতি ছাড়াই Orlando youth group মিছিল বের করলে তাদের উপর রাবার বুলেট ছুড়ে পুলিশ। মিছিল মিটিং এর অধিকার রহিত করার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ে পুলিশি নির্যাতন। বিশ্ব উপলক্ষে ৫০ হাজারের মত বাড়তি পুলিশ নিয়োগ করা হয়েছে, দমন-পীড়নের জন্য প্রয়োজনীয় ১০ টি জলকামানের সাথে সাথে ১০০টি বিএমডব্লিউ এবং চল্লিশটি হেলিকপ্টার কিনতে ৬৬৫ মিলিয়ন র্যান্ড ব্যয় করেছে পুলিশ।
কোথায় গেল ছিন্নমূল শিশু আর গৃহহীন মানুষ
পুরো দক্ষিণ আফ্রিকা জুড়েই নগর কর্তৃপক্ষ ব্যস্ত ছিল বিশ্বকাপের আগেই নগর পরিস্কারের কাজে- ময়লা আবর্জনার পাশাপাশি নগরগুলোকে ছিন্নমূল শিশু আর গৃহহীন মানুষের হাত থেকে ’মুক্ত’ করা হয়েছে। ’দুনিয়ার অন্যান্য নগরের সমকাতারে আসার জন্য’ জোহানসবার্গ নগর থেকে ১৫ হাজার গৃহহীনকে শহরের বাইরের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ডারবান থেকে মেট্রোপুলিশ নিয়মিত ভাবেই ছ্ন্নিমূল শিশুদেরকে জড়ো করে রেখে আসছে শহরের বাইরে- কখনও কোন আশ্রয় কেন্দ্রে, কখনও আত্মীয় স্বজনের বাড়ি আর কখনও স্রেফ রাস্তার পাশে। আহা! বিশ্বকাপ কতো ভালো, সাময়িক ভাবে হলেও তাদেরকে ’আশ্রয়ের’ স্বাদ পাইয়ে দিয়েছে।
যেন গরিবের কনসানট্রেশান ক্যাম্প
ফিফার চাহিদা অনুযায়ী স্টেডিয়াম নগরগুলোকে সাজানো হচ্ছে- ফলে গৃহহীন ও ছিন্নমুলের পাশাপাশি বস্তিবাসীদেরকেও বিশ্বকাপ ভেন্যুর আশপাশে থাকার ’অপরাধে’ তুলে নিয়ে রাখা হচ্ছে অস্থায়ী আবাসন এলাকায়। যেগুলোর আকার আকৃতি, ব্যাবস্থাপনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন কনসেনট্রেশান ক্যাম্পের কথাই মনে করিয়ে দেয়। কেপটাউনের পাশে এরকম একটি আবাসন এলাকার নাম হলো ব্লিকিসডরপ (Blikkiesdorp) । এখানে বালির উপর নির্মাণ করা হয়েছে ৩ মিটার প্রস্থ এবং ৬ মিটার দৈর্ঘের টিনের খুপরি। এথলনের স্টেডিয়ামটি যেহেতু ফুটলারদের ট্রেনিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহ্রত হবে, তাই এখানকার বস্তিবাসীদের জায়গা হলো ব্লিকিসডরপ এ। তাদেরকে এইসব খুপরিসহ নানান হোস্টেল, পরিত্যক্ত ভবন ইত্যদিতে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।
বিশ্বমানের বঞ্চনা
ফুটবল স্টেডিয়াম এবং তার আশপাশে ”বিশ্বমানের” পরিবেশ বজায় রাখার জন্য রাস্তার হকার এবং খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। ফিফার চাহিদা অনুযায়ী ফিাফার কর্পোরেট স্পন্সর যেমন ম্যাকডোনাল্ড, কোক, বাডওয়াইসার ইত্যাদির মনোপলি নিশ্চিত করার জন্য বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম এবং স্টেডিয়ামের আসার রাস্তার রাস্তা ছাড়াও এমনকি যে কোন ব্যস্ত স্থানেও হকারদের বিকিকিনি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফিফার বক্তব্য অনুযায়ী হকারদের এই নিষিদ্ধকৃত বেচাবিক্রির নাম হলো ”অ্যামবুশ মার্কেটিং”। এই অ্যামবুশ মার্কেটিং এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য রয়েছে ফিফার নিজস্ব প্যারা-পুলিশ। অথচ ফিফা কথিত এই ”অ্যামবুশ মার্কেটিং” হলো ভুভুজেলার মতোই আফ্রিকান ফুটবলের অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ এবং বিশেষত কালো নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের একটা বড় উপায়। যে বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে ভুভুজেলা নিষিদ্ধ হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেল, সেই বাণিজ্যিক কারণেই কিন্তু স্টেডিয়ামের আশপাশে হকার কর্তৃক প্যাপ, ইডোমবোলো, বারবিকিউ করা গরু ও মুরগীর মাংস, ভেইস ইত্যাদি বিক্রি নিষিদ্ধ করা হলো। বোধ হয় এই একটি বিষয়টিই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর জন্য যথেষ্ট বিশ্বকাপ স্থানিক ভাবে আফ্রিকার হলেও বিশ্ব পুঁজির থাবার নীচের এই বিশ্বকাপে পর্যটক ও ক্রীড়ামোদিরা কর্পোরেট ফিফা নির্দেশিত ইউরোপীয়ান এক্সপেরিয়ান্সের স্বাদই অনুভব করছে।
ফিফা আয়োজিত এই দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ২০১০ এর অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া এবং সময় থাকতেই সচেতন হওয়া জরুরী কারণ ২০১১ সালের ফ্রেব্র“য়ারীতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ ক্রিটের অন্যতম সহ আয়োজক বাংলাদেশ। এই ক্রিটেট বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে মুনাফার খেলা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। আয়োজক হওয়ার বিডে অষ্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড জুটিকে ভারত-শ্রীলংকা-বাংলাদেশ-পাকিস্তান এর সম্মিলিত বিডিং হারিয়েছে মূলত আইসিসিকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার বাড়তি লাভের প্রতিশ্র“তি দিয়ে। আইসিসি ইতোমধ্যেই ইএসপিএন-স্টার স্পোর্টসের কাছে ২ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে সারা বিশ্বের ২২০টি দেশে স¤প্রচার স্বত্ব বিক্রয় করে ফেলেছে। ভারতের ৮টি ভেন্যুতে মোট ২৯টি, শ্রীলংকার ৩ টি ভেন্যুতে মোট ১৪ টি এবং বাংলাদেশের ২ টি ভেন্যুতে মোট ৮টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এই বিশ্বকাপের স্থানীয় আয়োজক কমিটি ভারতের মুম্বাইয়ে অবস্থিত। ”অনিশ্চিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি”র কারণ দেখিয়ে পাকিস্তানের খেলাগুলোকে ভারত-শ্রীলংকা-বাংলাদেশের মাঝে ভাগাভাগি করে দেয়া হয়েছে। ”নিরাপত্তা পরিস্থিতি” এবং আইসিসি’র মুনাফা সুনিশ্চিত করতে বাংলাদেশে কি কি পরিস্থিতি তৈরী করা হয় সে বিষয়ে তাই দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আমাদের গণ নজরদারি জরুরী।
সূত্র: মূলত নীচের বিশ্লেষণগুলোকে অবলম্বন করে এই লেখাটি তৈরী করা হয়েছে-
1) World Cup 2010: Africa’s turn or the turn on Africa?
By Ashwin Desai and Goolam Vahed
2) A Political economy of 2010 World Cup
By Patric Bond(Slide Show)
3) South Africa wins the World Cup... of inequality
By Sheri Hamilton, Weizmann Hamilton and Liv Shange
4) South Africa: Will the World Cup party be worth the hangover?
By Patric Bond
5) Fifa's great SA rip-off
By Julian Rademeyer, Chandre Prince and Anna-Maria Lombard
6) Six red cards for Fifa
By Patric Bond
এই লেখাগুলো সহ প্রাসঙ্গিক আরো বিশ্লেষণ পাবেন এখানে:
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুন, ২০১০ রাত ১১:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


