বাজেট বক্তিৃতার মতো সংসদে যদি শিল্পনীতি পাঠ করার কোন রেওয়াজ থাকতো তাহলে তথাতথিক বামপন্থী শিল্প মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বে প্রণীত শিল্পনীতি ২০১০ পঠনের সময় শুধু ”ব্যাক্তি খাত”, ”ব্যাক্তি উদ্যোক্তা”, ”বেসরকারী বিনিয়োগ”, ”বিদেশী বিনিয়োগ” এই শব্দগুলো উচ্চারণ করতে করতে বড়ুয়া সাহেবের মুখ দিয়ে বোধ হয় ফেনা উঠে যেত! আর সেই ফেনায় হিক্কা তুলতে তুলতে তিনি ”শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের স্বার্থকে সমুন্নত” রাখার কথা বলতেন। শিল্পনীতিটি পড়লে আমরা দেখবো কতভাবেই না তিনি তার কথিত বামপন্থার গন্ধ দূর করার জন্য বেসরকারী ও বিদেশী বিনোয়গকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। যেমন:
# বাংলাদেশের শিল্প খাতের নিয়ামক হবে একটি উদ্দীপ্ত ও গতিশীল ব্যক্তিখাত। বেসরকারি খাতের দক্ষতা ও গতিশীলতা বজায়
রাখার লক্ষ্যে সরকার সহায়ক এবং তদারকিমূলক ভূমিকা পালন করবে। অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বৈশিষ্ট হবে
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব।(আর্টিক্যাল ২.২)
# অভীষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ নীতির একটি অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হবে ব্যক্তিখাতমুখী শিল্পায়ন কৌশলের প্রতি সরকারি
প্রতিশ্র“তির বিষয়ে ব্যক্তি খাতকে আস্থাশীল করা এবং এমন একটি ইতিবাচক ও কার্যক্ষম পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে বেসরকারি
বিনিয়োগকারীরা অহেতুক প্রতিবন্ধকতা, দীর্ঘসূত্রিতা এবং অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়াই শিল্প বিনিয়োগের কাজ করতে পারে।(আর্টিক্যাল ২.১০)
# শিল্পায়ন প্রচেষ্টার পুরোভাগে থাকবে ব্যক্তিখাত।(আর্টিক্যাল ২.১৭)
# শিল্প খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কেবল সেসব ক্ষেত্রে সীমিত থাকবে যেসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগকে সহায়তা করার প্রয়োজন
রয়েছে কিংবা জনস্বার্থ বা নিরাপত্তার বিষয় জড়িত রয়েছে কিংবা সামাজিক ভারসাম্য উদ্দেশ্য পূরণের বিষয় রয়েছে ।(আর্টিক্যাল ২.১৮.১)
বেসরকারি ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য সুসংবাদ হলো এরকম রাষ্ট্রীয়গুরত্বপূর্ণ খাত কেবল চারটি :সামরিক সরঞ্জাম, পারমাণবিক শক্তি, টাকশাল আর বনায়ন। অন্যান্য সকল খাতে এমনকি বিদ্যুৎ, তেল-গ্যাস-কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ আহরণ, বন্দর ইত্যদি যেসব খাতগুলোকে বুর্জোয়া রাষ্ট্র জাতীয়গুরুত্বপূর্ণ খাত বলে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে, সেখানে বাংলাদেশে চলমান প্রক্রিয়া অনুসারে স্থানীয় বেসরকারী কিংবা বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির দ্বারা এসবের লুটপাটের সুযোগ জারি রাখা হয়েছে এই শিল্পনীতিতে। এগুলোকে নিয়ন্ত্রিত শিল্পের তালিকায় রাখা হলেও বলা হয়েছে এগুলো ”সরকারের সংশিষ্ট মন্ত্রণালয়ের/কমিশনের (যেমন: সংস্কৃতি/ধর্ম মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি ইত্যাদি) অনুমোদন/অনাপত্তি গ্রহন সাপেক্ষে বেসরকারি খাতে স্থাপন করা যাবে।”(আর্টিক্যাল ৩.১১.১)
বিরাষ্ট্রীয়করণ চলছে, বিরাষ্ট্রীয় করণ চলবে
নতুন শিল্পায়ন রাষ্ট্র করবে না এটা পরিস্কার। কিন্তু যেসব কারখানা রাষ্ট্রীয় খাতে এখনো রয়ে গেছে সেগুলোর ব্যাপারে শিল্পনীতিতে কি বলা হলো? কেবল সরকারি পাটকলগুলো ”পুণরায় লাভজনক ভাবে চালু করার প্রচেষ্টা নেয়া”র (আর্টিক্যাল ২.৪২) কথা বললেও নতুন করে করে কোন পাটকল রাষ্ট্রীয় খাতে স্থাপন করা হবে না, কেবল ”পাটজাত পণ্যের বৈচিত্রায়ন ও উচ্চ মূল্যের পণ্য উৎপাদনের জন্য বেসরকারিখাতে নতুন পাটকল প্রতিষ্ঠায় উৎসাহদান, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কারিগরি সহায়তা ও ঋণ প্রাপ্তিতে সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”(আর্টিক্যাল ২.৪৩) গার্মেন্টস বা টেক্সটাইল শিল্পের এই রমরমা দিনেও সরকারী বস্ত্রখাতের ভাগ্য পাট খাতের মতো প্রসন্ন নয়, কারণ ধুকে ধুকে চলা বস্ত্রকলগুলোকে রাষ্ট্রীয় ব্যাবস্থাপনায় ভালো ভাবে চালানো হবে না বরং ”এই ক্ষেত্রে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপকে অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে।”(আর্টিক্যাল ২.৪৬) আর অন্যান্য রাষ্ট্রীয় রুগ্নশিল্পের ভাগ্য আরো খারাপ, এগুলো হলো ”অভিশাপ” এবং ফলে এগুলোকে স্রেফ ”বিদায় দিতে হবে”: ”রুগ্ন শিল্পের অভিশাপ থেকে দেশকে পরিত্রাণ পেতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে। এ লক্ষ্যে রুগ্ন শিল্প আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হবে। যে সব রুগ্ন শিল্প পূণরায় চালু করার সুযোগ বা সম্ভাবনা নেই, সেগুলো সনাক্ত করে অন্যান্য রুগ্ন শিল্পকে পুণরুজ্জীবনের প্রচেষ্টা নেয়া হবে। বিগত ১৫ বছর ধরে যে শিল্প রুগ্ন অবস্থায় আছে তাকে শিল্পখাত থেকে বহির্গমনের সুযোগ করে দিতে হবে। অর্থাৎ তার সহায় সম্পদ বিক্রয় করে, সুদ রেয়াতি দিয়ে আদায়যোগ্য মূলধন আদায় করে তাকে বিদায় দিতে হবে।”(আর্টিক্যাল ২.৩৯ )
বেসরকারী পুজির জন্য প্রণোদনা:
শিল্পনীতি ২০১০ অনুসারে যেহেতু ”শিল্পখাতে উন্নয়নের প্রধান ভূমিকা হলো ব্যক্তি মালিকানা খাতের। তাই সর্বতঃভাবে এই খাতের প্রসার সাধন করা হবে। ” (আর্টিক্যাল ৪.১) আর এই ব্যাক্তি পুজির প্রসারের জন্য যে সব সুযোগ সুবিধা পুঁজিপতিদের প্রদান করা হবে তার মধ্যে কয়েকটি এখানে উল্যেখ করা হলো:
১) বিদ্যমান কর অবকাশ চালু থাকবে:
(ক) তিন পার্বত্য জেলা ব্যতীত ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে স্থাপিত শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রথম দু’বছর আয়ের ১০০% ভাগ, পরবর্তী
দু’বছর ৫০% ও শেষ (৫ম) বছর ২৫% ভাগ কর অবকাশ।
(খ) রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল বিভাগ এবং তিন পার্বত্য জেলায় স্থাপিত শিল্প প্রতিষ্ঠাগুলোর জন্য ৭ (সাত) বছর মেয়াদী
কর অবকাশের মধ্যে প্র ম তিন বছর কর অবকাশের হার ১০০%, পরবর্তী ৩ বছর ৫০% ও শেষ বছরে (৭ম বছর) ২৫%।(আর্টিক্যাল ৫.৫)
২) কর অবকাশ সুবিধা লাভের আবেদনপত্র জমা প্রাপ্তির ৪৫ (পঁয়তালিশ) দিনের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সিদ্ধান্ত না
জানালে সংশিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আবেদন মঞ্জরীকৃত হিসেবে পরিগণিত হবে। আবেদনকারীকে শুনানী ব্যতিরেকে কোন আবেদন প্রত্যাখান করা যাবে না। (আর্টিক্যাল ৫.৭)
৩) ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত যে সব বেসরকারি বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করবে সে সব বিদ্যুৎ উৎপাদন
কোম্পানিগুলোর আয়ের উপর থেকে উৎপাদনের দিন হতে ১৫ বছর পর্যন্ত কর অব্যাহতির সুযোগ থাকবে; এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে
বেসরকারি উদ্যোক্তাগণকে (আইপিপি, এসআইপিপি) Private Sector Power Generation policy of Bangladesh অনুযায়ী অন্যান্য প্রণোদনা দেয়া হবে। (আর্টিক্যাল ৫.১৬)
৪) অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতের অধীনে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোকে বিশেষ সুবিধা ও ঝুঁকি তহবিল সহায়তা প্রদান করা হবে। (আর্টিক্যাল ৫.১৮)
৫) রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তি খাতে প্রতিষ্ঠিত একই ধরনের শিল্পের জন্য শুল্ক ও করের ক্ষেত্রে কোনো ”বৈষম্য” থাকবে না।(আর্টিক্যাল ৫.২৩)
দেশীয় খাতের অগ্রাধিকার?
শিল্পোনীতিতে বলা হয়েছে ”বাংলাদেশের শিল্পখাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে স্থানীয় শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ” (আর্টিক্যাল ২.৩)। অথচ একটু পর বলা হলো ”কর অবকাশ, রয়্যালটি প্রদান, প্রযুক্তি কৌশল ফি ইত্যাদির ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের মতো বিদেশি শিল্পোদ্যোক্তাগণও একই সুবিধা ভোগ করবেন।”(আর্টিক্যাল ১১.৫) এই কারণেই হয়তো ”দেশীয়” বা ”জাতীয়” শিল্পের বদলে ”স্থানীয়” শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশের কথাটি বলা হয়েছে কারণ বহুজাতিক কোম্পানির স্থানীয় শাখাকে জাতীয় বা দেশীয় না বলা গেলেও এক অর্থে ”স্থানীয়” তো বলা যেতেই পারে! কর, রয়্যালিটি ইত্যদি ছাড়াও বিদেশী বিনোয়গকারীদের জন্য আরো বেশ কিছু আকর্ষণ রয়েছে এই শিল্পনীতিতে:
# বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকৃত মূলধনের উপর বিদ্যমান আইনের আওতায় পূর্ণ প্রত্যাবাসনের সুবিধা প্রদান করা
হবে। অনুরূপভাবে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কর পরিশোধ সাপেক্ষে লাভ ও ডিভিডেন্ড সম্পূর্ণ স্থানান্তরযোগ্য।(আর্টিক্যাল ১১.৬)
# কোন বিদেশি বিনিয়োগকারী ৫ লক্ষ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে বা ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার কোন স্বীকৃত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে
ট্রান্সফার করলে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য বিবেচিত হবে।(আর্টিক্যাল ১১.৪)
# বাংলাদেশে কোন ভারী শিল্পে কিংবা দীর্ঘ মেয়াদে কোন শিল্পে/ব্যবসায়ে কমপক্ষে ৫ (পাঁচ) মিলিয়ন (পঞ্চাশ লাখ) মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছেন এরূপ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ অব্যাহত আছে মর্মে বিনিয়োগ বোর্ড/বেপজা কর্তৃক প্রত্যয়ন সাপেক্ষে বিদেশি বিনিয়োগকারী বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদেয় “No Visa Required (NVR)” সুবিধা পাবেন।
কর্ম সংস্থান ও দেশের ”সহজলভ্য জনসম্পদের” গন্তব্য
শিল্পোনীতিতে ২০২১ সালের মধ্যে ”প্রতিটি পরিবারে অন্তত: একজনের জন্য হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি”র কথা বলা হয়েছে (আর্টিক্যাল ১.৬) এবং এই শিল্পনীতিকে সরকার ”দেশের সহজলভ্য জনসম্পদকে” কাজে লাগিয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের একটি ”সম্ভাবনাপূর্ণ বিরল সুযোগ” হিসেব দেখছে (আর্টিক্যাল ১.৭)। কেমন করে হবে সেই কর্মসংস্থান তার কোন সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা শিল্পোনীতি নেই বরং যা আছে (বিরাষ্ট্রীয়করণ ও বেসরকারীকরণের ধারা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্র“তি) তাতে বরং কর্মসংস্থান হ্রাস পাওয়ারই কথা। সেকারণেই বোধ হয় মোট ২৮টি অগ্রাধিকার প্রাপ্য শিল্পখাতের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানেই আছে ”শ্রম শক্তি রপ্তানি”! আদম-রপ্তানি কোন্ ধরণের শিল্প আমাদের জানা নেই। আদমকে রপ্তানি করে বিশ্বায়িত দুনিয়ার নয়া শ্রম দাস বানানো একটা রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা বলেই আমরা জানতাম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পাট-চা-চামড়া-চিংড়ীর মতো আদমও একটি রপ্তানি যোগ্য পণ্য যাকে অগ্রাধিকারযুক্ত ”শিল্পখাত” এর আওতাভুক্ত করে বেসরকারী খাতের মাধ্যমে(আদম ব্যাবসায়ী)বিদেশে রপ্তানী করার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্র তার কর্মসংস্থান সৃষ্টির মহান দ্বায়িত্ব পালন করে।
তাহলে, এই হলো ”সহজ লভ্য জনসম্পদ” কাজে লাগিয়ে ”নতুন দিগন্ত উন্মোচনের” ভিশন ২০২১!
সূত্র: শিল্পনীতি ২০১০
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



