(সুত্র: Instrument of Accession of Jammu and Kashmir State 26 October, 1947, Legal Document No 113
Click This Link)
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ঐ চুক্তি স্বাক্ষরের ৬ দিন পর ঘোষণা করেন:
“We have declared that the fate of Kashmir is ultimately to be decided by the people. That pledge we have given, and the Maharaja has supported it, not only to the people of Kashmir but to the world. We will not and cannot back out of it. We are prepared when peace and law and order have been established to have a referendum held under international auspices like the United Nations. We want it to be a fair and just reference to the people and we shall accept their verdict. I can imagine no fairer and juster offer.”
(সুত্র: Click This Link)
অর্থাত “ আমরা ঘোষণা করেছি যে কাশ্মিরের ভাগ্য কাশ্মিরের জনগণই নির্ধারণ করবে। শুধু কাশ্মীরের জনগণই নয়, সারা দুনিয়ার কাছে আমরা এই প্রতিজ্ঞা করেছি আর মহারাজা আমাদের সমর্থন দিয়েছেন। এর অন্যথা আমাদের দ্বারা সম্ভব নয়। আমরা প্রস্তুত আছি, যে মুহুর্তে কাশ্মীরে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, সে মুহর্তেই জাতিসংঘের মতো কোন আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের অধিনে গণভোটের আয়োজন করা হবে। আমরা চাই এ নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে, জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে এবং আমরা এই জনরায় মেনেও নেব। এর চেয়ে ভালো এবং ন্যায়বিচারমূলক কোন প্রস্তাব তো আর আমার মাথায় আসছে না।” হ্যা, ন্যায় বিচারই বটে! নেহেরু এ কথা বলার পর ৬৩ বছর পার হতে চলেছে, ভারতীয় সাম্রজ্যবাদের ভয়ংকর থাবার নীচে থেকে কাশ্মীরে আর শান্তি-শৃঙ্খলা আর ফিরে এল না, গণভোটের তো প্রশ্নই আসে না!
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইরাক দখলের কালে ১৬৬ জন ইরাকী নাগরিক প্রতি একজন করে মার্কিন সেনা মোতায়েন করেছিল। আর কাশ্মীরে ২০ জন নাগরিক প্রতি একজন ভারতীয় সেনা বা আধা সেনা মোতায়েন আছে। কাশ্মীরে মোট জনসংখ্যা ১ কোটির সামান্য বেশি। আর ভারতীয় সেনা মোতায়েন হলো ৩ লক্ষ, ৭০ হাজার রাষ্ট্রীয় রাইফেল সেনা ও ১ লক্ষ ৩০ হাজার সিআরপিএফ জোয়ান। এছাড়াও আছে রাজ্যের লাখ খানেক পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনী। এই সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে দেয়া হয়েছে মানুষ খুন করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। ১৯৯০ সালের ৫ জুলাই কাশ্মীরে সামরিক বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন (আরমড ফোর্সেস স্পেসাল পাওয়ার এক্ট) জারি করে তাদের হাতে এই ক্ষমতা তুলে দেয়া হয়। এই আইনের ৪(এ) ধারায় বলা আছে যে, সশস্ত্র সামরিক বাহিনী যে কোন সন্দেহভাজন নাগরিককে হত্যা করতে পারবে।(সূত্র: স্যোসালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অব ইন্ডিয়ার বাংলা মুখপাত্র গণদাবীর ৬-১২ আগষ্ট সংখ্যা http://www.ganadabi.in/issues2010/gd080610.pdf) এই বিশেষ ক্ষমতায় বলিয়ান হয়ে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী গোটা কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতকে মাথায় রেখে আমরা সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কারণ খোজার চেষ্টা করব।
৮ই জানুয়ারী, ২০১০, ১৬ বছর বয়সী ইনায়েত খান বিকেলে কোটিং সেরে বাড়ি ফিরছিল। শ্রীনগরের বাদশা চকে প্রতিবাদ সভা চলছিল। পুলিশ প্রতিবাদীদের “ছত্রভঙ্গ করার” উদ্দেশ্যে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ ইনায়েত, পরেরদিন হাসপাতাল থেকে বাড়ি না গিয়ে কবরস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
৩১ জানুয়ারী, ১৩ বছরের ওমর ফারুক শ্রীনগরের গণি মেমরিয়াল স্টেডিয়ামে বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিল। পুলিশের কাদানে গ্যাসের শেলের আঘাতে সেদিন তার সব খেলা সাঙ্গ হয়।
৫ ফেব্রুয়ারী, কাশ্মীর যেদিন ওয়ামিকের শোকপালনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেইদিন আর এক বালক জাহিদ ১৪ বছর বয়সে বিএসএফএর গুলিতে প্রাণ হারায়।
১৩ এপ্রিল, সোপুরের সরকারি স্কুলের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র ১৭ বছরের যুবক যুবের আহমেদ ভাট ঝিলাম নদীর পাড়ে বসেছিল। বিক্ষোভরত কিছু মানুষ পুলিশের তাড়া খেয়ে সেখানে চলে আসে। পুলিশ নির্বিচারে সবার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুলিশ জুবের সহ প্রত্যেককে নদীতে ঝাপ দিতে বাধ্য করে। অন্যরা সাতরে পাড়ে উঠতে সক্ষম হলেও, জুবের তলিয়ে যেতে থাকে। মাঝিরা বাচাবার চেষ্টা করেছিল। পুলিশ ঝাকে ঝাকে কাদানে গ্যাসের শেল ছুড়তে থাকায়, তারা জুবেরের কাছে পৌছাতে ব্যর্থ হয়। জুবের প্রাণ হারায়। ২০০৬ সালে জুবেরের বড় ভাই এহমান-উল-হক পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিল।
রাজৌরির তোফায়েল আহমেদ মাত্তু তার পিতামাতার একমাত্র সন্তান এবং দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র। ১১ জুন টিউশানি শেষে সে বন্ধুদের সাথে বাড়ি ফিরছিল। কাধে ছিল স্কুল ব্যাগ। কাছেই হয়তো কোথাও বিক্ষোভ চলছিল, তোফায়েল জানতো না। একদল যুবক পুলিশের তাড়া খেয়ে দৌড়াচ্ছিল। তোফায়েলদের দেখতে পেয়ে পুলিশ তাদেরও পিছু নেয়। ভয় পেয়ে কিশোর তোফায়েলরা সামনের গণি মেমরিয়াল স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়ে। পুলিশ স্টেডিয়ামে ঢুকে গুলি চালায়। তোফায়েলের আর বাড়ি ফেরা হলো না। গুলি লেগে তোফায়েলের মস্তক চুর্ণ হয়ে যায়।
১২ জুন, সান্ধ্য-আইন এবং সমস্ত নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তোফায়েলের অন্তিম যাত্রায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। পুলিশ শবযাত্রাকেও রেহাই দেয় নি। মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে শবযাত্রীদের উদ্দেশ্যে কাদানে গ্যাস এবং ফাকা গুলি ছুড়ে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের পাচজন এবং একজন চিত্র সাংবাদিক আহত হন। পুলিশের আক্রমণ তুচ্ছ করে তোফায়েলের আত্মীয় পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, বৃদ্ধ ও যুবক শত শত শোকাহত জনতা শেষ পর্যন্ত স্থানীয় ঈদগাহে সমবেত হতে এবং শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। ঈদগাহ থেকে ফেরার পথেও পুলিশ দলবদ্ধ জনতার উপর কাদানে গ্যাস বর্ষণ করে।
সমস্ত কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে তোফায়েল হত্যার বিরুদ্ধে স্বত:স্ফুর্ত বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষুব্ধ জনতার উপর পুলিশ নির্মম ভাবে লাঠি চালায়। রাজৌরিতে সিআরপিএফ-এর রাইফেলের বাটের আঘাতে সাঙ্ঘাতিক আহত হয় রফিক বাঙরু। বয়স ২৪। সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভার্তি করা হয়। এক সপ্তাহ জীবণ-মরণ লড়াইয়ের পর রফিক ১৯ জুন মৃত্যুর কাছে আত্মসর্ম্পন করতে বাধ্য হয়। রফিক তাদের পরিবারের সপ্তম বলি। ১৯৯০ সালে গোলাম রসুল বাঙরুকে বিএসএফ তুলে নেয় যাওয়ার পর থেকে নিখোজ। বাকিরা বিভিন্ন সময়ে পুলিশের গুলিবর্ষণের শিকার।
২০ জুন, রফিককে কবর দিয়ে, যখন রফিকের আত্মীয়-বন্ধুরা ফিরে আসছিলেন, পথিমধ্যে তারা আবারও আক্রান্ত হন। পাচজন সিআরপিএফ এর গুলিতে আহত হয়। কিন্তু ১৭ বছরের কিশোর জাভেদ আহমেদ মাল্লাকে বাচানো যায়নি। জাভেদ ছিল তার পিতামাতার একমাত্র পুত্র সন্তান।
২৫ জুন, সোপুরে তথাকথিত, সংঘর্ষে দুজন যুবক সিআরপিএফ এর গুলিতে নিতহ হয়। পুলিশ ঐ দুজনের দেহ তুলে নিয়ে যায়। পুলিশি অবরোধ উঠে যাওয়ার পর স্থানীয় মানুষজন নিহতদের লাশ ফেরত দেয়ার দাবীতে বিক্ষোভ শুরু করে। টহলদারী সিআরপিএফ বাহিনী কোন রকম সতর্কতা না দেখিয়ে বক্ষোভকারী জনতার উপর গুলি চালায়। ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি শাকিল আহমেদ গণাই(২৪) যন্ত্রপাতি কিনতে বেরিয়েছিল। গুলি লেগে রাস্তাতেই লুটিয়ে পড়ে। ফিরদৌস আহমেদ কাকরু(২০) বাগানের পরিচর্যা করছিল। সিআরপিএফ তাকেও ছাড়ে নি। দুই যুবকের তাতক্ষণিক মৃত্যু হয়।
২৭ জুন পুলিশের গুলিতে বিলাল আহমেদ ওয়ানির মৃত্যু হয়। সাকিল আর ফিরদৌস হত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল প্রদক্ষিণ করছিল সোপুরের রাস্তা। রাজ্য সরকারের জন্য স্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের শ্রমিক বিলাল মিছিল দেখছিল। পুলিশ মিছিল লক্ষ্য করে গুলি চালালে বিলাল মারা যায়।
২৮ জুন সোপুরে আবারও গুলি চলে। দুজনের মৃত্যু হয়। তাদের একজন ৯ বছরের বালক তাকির আহমেদ। অপরজন কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্র তাজামুল বসির ভাট।
২৯ জুন পুলিশের গুলিতে অনন্তনাগে আরো তিনজন নিহত হয়- ইন্তিয়াক আহমেদ খান্ডে(১৫), সুজাত্তুল ইসলাম(১৮) এবং ইমতিয়াজ আহমেদ ইতু(১৮)। (সূত্র: এই মৃত্যু তালিকা নেয়া হয়েছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত মাসিক অনীক এর জুলাই ২০১০ সংখ্যা থেকে)
........... তালিকা আর কত বড় করতে হবে! এ হত্যাকান্ডগুলোর ধরণ/ধারণ খতিয়ে দেখলে অনুমান করা শক্ত নয় একটা জনগোষ্ঠীর তরুণ অংশকে একরকম খেয়াল খূশি মতো খুন করার প্রতিক্রিয়া সেই জনমানসের উপর কেমন হতে পারে। ইসরায়েলী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী জনতার মতোই পাথর হাতে বুলেটের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ। হত্যা-বিক্ষোভ-হত্যা চলছেই। সাম্প্রতিক বিক্ষোভের ১০০তম দিনে হত্যাকান্ডের সংখ্যা ছিল ৯৬। ইতোমধ্যে তা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। আর পুরনো হত্যাকান্ডগুলোর কথা না হয় নাই তুললাম। ইতোমধ্যে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর হাতে কাশ্মীরের ৭০ হাজার মানুষ খুন হয়েছে যার অধিকাংশই যুবক। কাজেই এরকম হত্যাকান্ড নির্যাতন লুণ্ঠনই কাশ্মীরের দিনলিপি। একদিকে সামরিক বাহিনীর নির্যাতন অন্যদিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য, তীব্র বেকারত্ব, শিল্প-কৃষির অনগ্রসরতা ইত্যাদি কাশ্মীরবাসীকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় দখলদার ভারতের সাথে তাদের সম্পর্কের স্বরুপ কি। কলকাতা থেকে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা অনীক এর জুলাই ২০১০ সংখ্যায় প্রণব দে লিখেছেন:”১৯৪৭ থেকে কাশ্মীর, ভারত ও পাকিস্তান- এই দুই পক্ষের মধ্যে পিষ্ট হচ্ছে। এটা দুপক্ষের মর্যাদার লড়াই অথবা অন্যবিচারে কাশ্মীর দুপক্ষেরই সেফটি ভাল্ব। শাসক শ্রেণীর সংকট মোচনে সীমান্ত যুদ্ধ বেশ শক্তিশালী দাওয়াই। আর কাশ্মীরের মানুষ(আজাদ কাশ্মীর সহ) এই রাজনৈতিক পুজর্চনায় বলিপ্রদত্ত পশু।” সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সহ ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে উঠে কাশ্মীরবাসী পরিস্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন বলির পাঠা আর তার থাকতে চাননা। তারা স্বাধীন কাশ্মীরেরই স্বপ্ন দেখেন।
(সূত্র: Click This Link)
যে জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ-শিশু-যুবা নির্বিশেষে পাথর হাতে রাস্তায় নেমে আসে দখলদারের বুলেট মোকাবেলা করতে তাদের আর দাবীয়ে রাখার সাধ্য কারো নেই। আমরা কাশ্মীরবাসীর স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


