somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... গরু চোরাচালানের অর্থনীতি, বিএসএফ প্রধানের ঔদ্ধত্য ও আন্তর্জাতিক আইন
গরু চোরাচালানের অর্থনীতি: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রতিদিন বৈধ বাণিজ্যের সমপরিমাণ বা তারও বেশি পরিমাণে ফেন্সিডিল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ভারতীয় ভোগ্য পণ্যের কোটি কোটি টাকার চোরাচালান হলেও “অবৈধ কর্মকান্ড” বলতে মূলত ভারতীয় গরু বাংলাদেশে চোরাচালানের কথাই বলা হয়েছে কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় খুন হয়ে যাওয়া ব্যাক্তি ভারত থেকে গরু পাচার করার সময়ই বিএসএফ এর হাতে খুন হয়। বিএসএফ প্রতিবার সীমান্ত হত্যাকান্ড ঘটানোর পর নিহত বাংলাদেশী নাগরিককে গরু চোরাচালানী বলে অভিহিত করে যেন কেউ গরু চোরাচালান করলেই তাকে দেখা মাত্রই গুলি করা জায়েজ হয়ে যায়! প্রশ্ন হলো নিহত ব্যাক্তি যদি গরুচোরাচালান করেই থাকে, তাহলে সে কি চোরাচালান একাই করেছে? অন্য সব পণ্য চোরচালানের মতোই গরু চোরাচালান একটি যৌথকর্ম যার সাথে ভারতীয় বিক্রেতা এবং বাংলাদেশী ক্রেতা উভয় পক্ষই যুক্ত। সীমান্তের এই গরু চোরাচালানের মানে এই না যে বাংলাদেশের চোরাকারবারিরা ভারতে গিয়ে গরু চুরি করে আনছে, বরং এটা উভয় পক্ষের মধ্যে বেসরকারি ভাবে ও রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে ঘটা একটা বাণিজ্যিক লেনদেন, যেখানে ক্রেতা, বিক্রেতা, মধ্যস্বত্ত্বভোসহ বিভিন্ন ব্যাক্তি-গোষ্ঠী’র স্বার্থ নানান মাত্রায় যুক্ত থাকে।

ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে ভারত থেকে গরু রপ্তানি নিষিদ্ধ। কিন্তু ভারতে গরু উদ্বৃত্ত থাকে। ফলে ভারতের ব্যাবসায়ীদের স্বার্থেই এই গরু বেশি দামে বাংলাদেশের বাজারে রপ্তানি করা প্রয়োজন। ভারতের হারিয়ানা কিংবা রাজস্থানে যে গরুর দাম ৫০০ রুপি, চোরাচালানের জন্য যখন বাংলাদেশের বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা হয় হাত বদল হতে হতে পশ্চিম বঙ্গে এসে সেই গরুর দাম হয় ৫০০০ রুপি এবং বাংলাদেশের সীমান্ত পেরুলেই এর দাম হয় ১৫ হাজার রুপি যা রাজধানী ঢাকায় আরো অনেক বেশি দামে বিকোয়। এর ফলে একদিকে বাংলাদেশের ভোক্তাদের বার্ষিক মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক গরুর মাংসের যোগান হয় (যদিও এর ফলে দেশীয় গরু পালনকারীরা মারত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং বাংলাদেশের নিজস্ব গরু উৎপাদন খামারগুলো বিকশিত হতে পারছেনা) অন্যদিকে ভারতীয় উৎপাদনকারীরা ৫০০ রুপির গরু ১৫ হাজার রুপীতে বাংলাদেশে রপ্তানি করতে পারে যদিও এই অর্থের একটা বড় অংশই বিভিন্ন মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের হাতে চলে যায় যার মধ্যে ভারতের রাজনীতিবিদ, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিএসএফও যার অংশীদার নইলে রাজস্থান থেকে ১ হাজার মাইল পারি দিয়ে বছরে ১৫ লক্ষেরও বেশি গরু বাংলাদেশের বাজারে পৌছতে পারত না। সূত্র:
Battle of Cattle at Indo-Bangla border

Where's the beef? Indians don't want to know

এখন গরুচোরাচালান সিন্ডিকেটের সাথে বখরা নিয়ে বিএসএফ এর বিরোধ ঘটলে উপরের স্তরের বিশেষত ভারতীয় গডফাদারদের বিরুদ্ধে কিছু করতে না পারলেও হুমকি হিসেবে নিয়মিতভাবেই গরু আনা-নেয়াকারী নিরস্ত্র বাংলাদেশী নাগরিকদেরকে খুন করে কিংবা নির্যাতন করে বিএসএফ তার বখরা আদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই হলো ভারতীয় গরু চোলান বাণিজ্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বিএসএফ এর আদালত সেজে অপরাধ মূলক কর্মকান্ড দমনের নামে খুন-নির্যাতনের আসল মাজেজা।

ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন: সীমান্ত-হত্যা যে অবৈধ এবং ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনেরই বহি:প্রকাশ তা বোঝার জন্য কোন আইনি দোহাই লাগেনা। তারপরও চলুন দেখা যাক, বিএসএফ প্রধানের ঘোষণা অনুযায়ী, সীমান্তে গরু চোরাচালান বা অন্য কোন অপরাধ দমনের নামে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অনযায়ী বিএসএফ সীমান্ত হত্যা চালাতে পারে কি-না।
ভারতের কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর এর সেকশান ৪৬ অনুসারে:
(1) In making an arrest the police officer or other person making the same shall actually touch or confine the body of the person to be arrested, unless there be it submission to the custody by word or action.
(2) If such person forcibly resists the endeavour to arrest him, or attempts to evade the arrest, such police officer or other person may use all means necessary to effect the arrest.

(3) Nothing in this section gives a right to cause the death of a person who is not accused of an punishable with death or with imprisonment for life
সূত্র: http://www.vakilno1.com/bareacts/CrPc/s46.htm

অর্থাৎ অপরাধীকে গ্রেফতার করার জন্য সকল ধরণের প্রচেষ্টার বৈধতা দেয়া হলেও মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জিবন সাজা হওয়ার মতো অপারাধে লিপ্ত না হলে কোন ভাবেই হত্যা করা যাবে না।

অন্যদিকে ১৯৯০ সালে কিউবার হাভানায় জাতি সংঘের অষ্টম কংগ্রেসে গৃহীত Basic Principles on the Use of Force and Firearms by Law Enforcement Officials নামের
নীতিমালা অনুসারে:

4. Law enforcement officials, in carrying out their duty, shall, as far as possible, apply non-violent means before resorting to the use of force and firearms. They may use force and firearms only if other means remain ineffective or without any promise of achieving the intended result.

5. Whenever the lawful use of force and firearms is unavoidable, law enforcement officials shall:
( a ) Exercise restraint in such use and act in proportion to the seriousness of the offence and the legitimate objective to be achieved;
( b ) Minimize damage and injury, and respect and preserve human life;
( c ) Ensure that assistance and medical aid are rendered to any injured or affected persons at the earliest possible moment;
( d ) Ensure that relatives or close friends of the injured or affected person are notified at the earliest possible moment.
সূত্র: http://www2.ohchr.org/english/law/firearms.htm

অর্থাৎ জাতি সংঘের নীতিমালাতেও আইন প্রয়োগের বেলায় মানুষের জীবন রক্ষার ব্যাপারে(preserve human life) সর্বোচ্চগুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

সুতরাং ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক কোন আইনেই বিএসএফ সীমান্তে কথিত অপরাধ দমণের জন্য মানুষ হত্যা করতে পারেনা, নিপীড়ন চালাতে পারেনা।
এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন :
Extra Judicial Killing in India-Bangladesh Border


মেক্সিকোর উদাহরণ ও বাংলাদেশের নতজানু শাসক: মেক্সিকো-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে একটি খুন হলেও শুধু মেক্সিকো না, সারা দুনিয়ার সংবাদ মাধ্যমে খবর হয়ে যায়, মেক্সিকো’র নতজানু শাসকেরাও প্রতিবাদ জানায় এমনকি মার্কিন ফেডারেল সরকারকে বিপুল অর্থ খেসারত দিতে হয়।
সূত্র: Settlement Reached in Border Killing Civil Case
গত ২০১০ সালের জুন মাসে মেক্সিকোর সীমান্তে পাথর ছোড়ার অপরাধে মার্কিন বর্ডার পেট্রোল গার্ডের হাতে মেক্সিকোর এক তরুণ খুন হওয়ার পর মেক্সিকো কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়, মেক্সিকোর পররাষ্ট্র মন্ত্রী Patricia Espinosa তীব্র প্রতিবাদ জানান:
"We firmly repudiate and reject the violent actions by U.S. authorities in the last few days that have led to the deaths of Mexican citizens,"

এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট Felipe Calderon ঘোষণা করেন:
"The government of Mexico will use all means available to protect the rights of Mexican migrants,"

সূত্র: Mexico protests shooting death of teen at Texas border

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিংবা পররাষ্ট্র মন্ত্রী দিপুমণি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ এর নিয়মিত হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে এই ধরণের কড়া ও স্পষ্ট অবস্থান তো দূরের কথা, ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এনে জবাবদিহি চাওয়া এবং বারবার হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বিষয়টিকে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যূতে পরিণত করার কোন চেষ্টাই বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে করা হয়না, উল্টো সরকারের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি সীমান্ত হত্যা বিষয়ে মোটেই চিন্তিত নয়! অর্থাৎ এ ধরণের নতজানু বক্তব্যের মাধ্যমে এমনিতেই নাচুনি বুড়ি খুনে বিএসএফকে ঢোলে বাড়ি দিয়ে আরও খুনের ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয় যার ফলে বিএসএফ প্রধান সীমান্তে “গুলি চলবে” জাতীয় চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দেয়ার সাহস পায় এবং একই দিনে আমরা পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য চুক্তি নবায়ণ কিংবা বাংলদেশের বিপিএল এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতীয় কালচার ইন্ডাষ্ট্রির স্টারদের আমাদানী করে নাচানোর তৎপরতার খবর পাই।

অথচ প্রতিদিন বৈধ-অবৈধ যে বিপুল পণ্য ভারতের ব্যাবসায়ীরা বাংলাদেশে রপ্তানি করে তার কোনটাই এমন কোন পণ্য নয় যা বাংলাদেশকে ভারত থেকেই কিনতে হবে, চীন থাইল্যান্ড বা বিশ্বের অন্য কোন দেশ থেকে কেনা যাবে না বা ক্রমশ নিজেরাই উতপাদনে যাওয়া যাবে না। ক্রেতা দেশ হিসেবে পণ্য কেনা বন্ধ করার হুমকী দিয়ে ভারতীয় বিক্রেতা গোষ্ঠীর মাধ্যমে ভারতীয় শাসক গোষ্ঠীর উপর চাপ প্রয়োগ করে, দেশ থেকে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে বহি:স্কারের হুমকী দিয়ে, ট্রানজিট বন্দর ইত্যাদি ব্যাবহার বিষয়ক আলোচনা বন্ধকরে দিয়ে, সীমান্ত হত্যাকান্ড বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক ইস্যূতে পরিণত করে ইত্যাদি নানা ভাবেই বাংলাদেশ সীমান্ত হত্যা বন্ধের ব্যাপারে ভারতকে বাধ্য করা যায়। কিন্তু নতজানু শাসক গোষ্ঠী ব্যাক্তিগত-গোষ্ঠীগত-শ্রেণীগত স্বার্থে সীমান্ত হত্যা বন্ধের ব্যাপারে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে মোটেই উৎসাহিত নয়। যেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা-কর্মসংস্থানের মতো নাগরিকের জীবনের অধিকার নিশ্চিত করার দ্বায়িত্বটিও নিতে অস্বীকার করছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের নাগরিকদের অনেকেই ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছেন। আমরা মনে করি, সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ ভারতের কাছ থেকে নদ-নদীর পানির হিস্যা আদায় সহ অন্যান্য বিরোধ মীমাংসার জন্য ব্যাক্তিগত ভাবে পণ্য বর্জনের আন্দোলনটিকে বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠীকে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করার (নইলে গদিচ্যুত করে দ্বিদলীয় কিংবা দ্বিজোটিয় ধারার বাইরে সংখ্যারিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈকি শক্তির ক্ষমতায়ন করা) আন্দোলনের সাথে যুক্ত করা জরুরী।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29538256 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29538256 2012-02-10 03:40:04
সুন্দরবনের পাশে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র: পরিবেশ ও অর্থনৈতিক বিবেচনা ভারতের একটি খবর:
গত ৮ অক্টোবর ২০১০ তারিখে ভারতের দ্যা হিন্দু পত্রিকায় একটি খবর প্রকাশিত হয়, শিরোনাম: ”মধ্যপ্রদেশে এনটিপিসি’র কয়লা ভিত্তিক প্রকল্প বাতিল”। খবরে বলা হয়: জনবসতি সম্পন্ন এলাকায় কৃষিজমির উপর তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্রহন যোগ্য হতে পারে না বলে ভারতের কেন্দ্রিয় গ্রীন প্যানেল মধ্যপ্রদেশে ন্যাশনাল থারমার পাওয়ার করপোরেশন(এনটিপিসি) এর ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি। ভারতের সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি নরসিঙ্গপুর জেলার ঝিকলি ও তুমরা গ্রামের ১০০০ একর জমির উপর একটি ২X৬৬০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল।

সম্প্রতি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এক্সপার্ট এপ্রাইজাল কমিটি(ইএসি)’র এক সভায় বলা হয়, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জন্য নির্ধারিত স্থানটি মূলত কৃষিজমি প্রধান এবং এ বিষয়ে প্রকল্পের স্বপক্ষের লোকদের দেয়া তথ্য যথেষ্ট নয়। বলা হয়, ”এই স্থানটির বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে দো’ফসলি কৃষি জমি, যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

কমিটি আরো মনে করে, গাদারওয়ারা শহরের এত কাছে এরকম একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র কাঙ্খিত নয়। তাছাড়া, নরমদা নদী থেকে প্রকল্পের জন্য ৩২ কিউসেক পানি টেনে নেওয়াটাও বাস্তবসম্মত নয় যেহেতু রাজ্য সরকার ইতোমধ্যেই আরো অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য এই নদীর পানি বরাদ্দ দিয়ে বসে আছে।
সূত্র: NTPC’s coal-based project in MP turned down

বাংলাদেশের খবর:
বাংলাদেশ ভারত জয়েন্ট ভেঞ্চারে বাগেরহাটের রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াটের(২*৬৬০) একটি বিদ্যূৎ কেন্দ্র স্থাপিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ণ বোর্ড(পিডিবি) ও ভারতের ন্যাশনাল থার্মান পাওয়ার কোম্পানি(এনটিপিসি) যৌথ অর্থায়নে প্রায় এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে আজ ২৯ জানুয়ারি ২০১২। বিদ্যুতের দাম, কয়লার উৎস নির্ধারণ না করেই এবং কৃষি জমি নষ্ট ও পরিবেশগত প্রভাব বিষয়ক আপত্তি উপেক্ষা করেই এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। রামপাল উপজেলার সাপমারি, কাটাখালি ও কৈগরদাসকাঠি মৌজায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ১,৮৩৪ একর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করেছে।
সূত্র: Indo-Bangla power deal today
কোথা থেকে কয়লা আসবে বিদ্যুৎ এর দাম কত হবে অনিশ্চিত
সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র না করার দাবি

জরুরী প্রশ্ন:
তাহলে দেখা যাচ্ছে কৃষিজমি, নিকটবর্তী জনবসতি ও শহর থাকা, নদীর পানি স্বল্পতা, পরিবেশগত প্রভাব ইত্যাদি নানান বিবেচনায় যে এনটিপিসি’র মধ্যপ্রদেশে প্রস্তাবিত কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয় বাতিল করে দিয়েছে, সেই এনটিপিসি-ই বাংলাদেশের সাথে কথিত যৌথ বিনিয়োগে একই রকমের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাগেরহাটের রামপালে নির্মাণ করতে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, যে যে বিবেচনায় এনটিপিসি নিজের দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারে নি, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের বেলায় কি সেই বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়েছে? বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক-সামাজিক-পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ের লক্ষে অর্থনৈতিক-সামাজিক ফিজিবিলিটি স্টাডি কিংবা পরিবেশ গত সমীক্ষা(ইএসি) করার পরই কি এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে? পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুসারে ২০১০ সালের সেপ্টম্বর মাসে পিডিবির দেয়া ২ লক্ষ ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে ভারতের এনটিপিসি একটি ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ শুরু করে এবং গত এপ্রিল,২০১১ তে পিডিবি’র কাছে জামা দেয়ার কথা। কিন্তু সেই রিপোর্ট এখন পর্যন্ত অপ্রকাশিতই রয়েছে এবং আমরা জানিনা পরিবেশ, সামাজিক , অর্থনৈতিক ফ্যাক্টরগুলো আদৌ কোন বিচার বিবেচনা হয়েছে কিনা চুক্তি করার আগে। বিষয়টি গুরুতর, কারণ প্রকল্পের স্থানটি মূলত কৃষিজমির উপরে, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এবং সবচেয়ে বড় কথা সুন্দরবনের মতো একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একেবারেই নিকটে- ৯ কিমি এর মধ্যে।

পরিবেশগত বিবেচনা কেন জরুরী:
সুন্দরবনের একেবারেই নিকটে, আবাসিক এলাকায় এবং কৃষিজমির উপরে ১৩২০ মেগাওয়াটের বিশাল কয়লা ভিত্তিক বিদুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে যাওয়াটা কি ভয়ংকর একটি কাজ সেটা অনুধাবন করতে গেলে প্রথমে বোঝা দরকার একটি কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিবেশের উপর কি কি প্রভাব ফেলে :

ক) বায়ু দূষণ: একটি ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে উৎপাদিত বায়দূষণ কারী উপাদানগুলো হলো-
১) ৩৭ লক্ষ টন কার্বন ডাই অক্সাইড যা প্রায় ১৬ কোটি গাছ কেটে ফেলার সমান।
২) ১০ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড। এই সালাফার ডাই অক্সাইড এসিড রেইনের কারণ এবং অন্যান্য উপাদানের সাথে বাতাসে ক্ষুদ্র কণিকার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে যার ফলে ফুসফুস ও হার্টের রোগ সহ বিভিন্ন অসুখ বিসুখ হয়।
৩) ১০ হাজার ২০০ টন নাইট্রোজেন অক্সাইড। এই নাইট্রোজেন অক্সাইড ফুসফুসের টিস্যূ’র ক্ষতিকরে যার ফলে শ্বাসতন্ত্রের নানান রোগ হতে পারে।
৪) ৫০০ টন ক্ষুদ্র কণিকা যার ফলে ব্রংকাইটিস সহ ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ বেড়ে যায়।
৫) ৭২০ টন বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড।
৬) ১৭০ টন মারকারি বা পারদ। ২৫ একর আয়তনের একটা পুকুরে এক চা চামচের ৭০ ভাগের একভাগ পারদ পড়লে সেই পুকুরের মাছ বিষাক্ত হয়ে খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে। পারদের কারণে ব্রেন ডেমেজ সহ স্নায়ু তন্ত্রের নানান রোগ হয়।
৭) ২২৫ পাউন্ড বিষাক্ত আর্সেনিক যার ফলে আর্সেনিকোসিস এবং ক্যানসারের বিস্তার ঘটায়।
৮) ১১৪ পাউন্ড সীসা, ৪ পাউন্ড ক্যাডমিয়াম এবং পরিবেশ ও মানব স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য ভারী ধাতু।

খ)কঠিনও তরল বর্জ্য: কয়লা পুড়িয়ে ছাই তৈরী হয় এবং কয়লা ধোয়ার পর পানির সাথে মিশে তৈরী হয় আরেকটি বর্জ্য কোল স্লাজ বা স্লারি বা তরল কয়লা বর্জ্য। ছাই এবং স্লারি উভয় বর্জ্যই বিষাক্ত কারণ এতে বিষাক্ত আর্সেনিক, মার্কারি বা পারদ, ক্রোমিয়াম এমনকি তেজস্ক্রিয় ইউরোনিয়াম ও থোরিয়াম থাকে। ছাই বা ফ্লাই এশ কে বিদ্যুত কেন্দ্রের নিকটে অ্যাশ পন্ড বা ছাইয়ের পুকুরে গাদা করা হয় এবং স্লারি বা তরল বর্জ্য কে উপযুক্ত ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে দূষণ মুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ছাই বাতাসে উড়ে গেলে, ছাই ধোয়া পানি চুইয়ে কিংবা তরল বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে মাটিতে বা নদীতে মিশলে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ ঘটে। একটি ৫০০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ১ লক্ষ ২০ হাজার টন ছাই এবং ১ লক্ষ ৯৩ হাজার টন তরল কয়লা বর্জ্য বা স্লারি উৎপাদিত হয় যার উপযুক্ত ব্যাবস্থাপনা করা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি বড় সমস্যা।

গ)পানি দূষণ: কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কঠিন ও তরল বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে, সংরক্ষণ আধার থেকে চুইয়ে নানান ভাবে গ্রাউন্ড ও সারফেস ওয়াটারের সাথে মিশে পানি দূষণ ঘটায় যার ফলে পানির মাছ, জলজ উদ্ভিদ ইত্যাদি হুমকির মুখে পড়ে।

ঘ)শব্দ দূষণ: কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টারবাইন, কমপ্রেসার, পামপ, কুলিং টাওয়ার, কনস্ট্রাকশানের যন্ত্রপাতি, পরিবহনের যানবাহনের মাধ্যমে ব্যাপক শব্দ দূষণ ঘটে থাকে।

এসকল কারণেই আবাসিক এলাকা, কৃষিজমি এবং বনাঞ্চলের আশপাশে কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার অনুমতি প্রদান করা হয় না।

বিপন্ন সুন্দরবন , বিপন্ন পরিবেশ :
পরিবেশ দূষণ, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তণ, বন কেটে ধবংস করা ইত্যাদি নানান কারণেই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সুন্দরবন ধবংসের মুখে। প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে সুন্দর বনের দূরত্ব মাত্র ৯ কিমি। ফলে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে বায়ু-পানি-কঠিন-তরল যত ধরণের দূষণ ঘটতে পারে তার সবটুকুই সরাসরি সুন্দরবনকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। পশুর নদী থেকে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় পানি ঘন্টায় প্রায় ২৪/২৫ হাজার ঘনমিটার হারে প্ল্যান্টে টেনে নিলে সেক্ষেত্রে নদীর উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সেচ কার্য কিভাবে চলবে সেটা একটা প্রশ্ন। বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে দূষিত পানি নদীতে মিশে পশুর নদীর পানি দূষিত করবে যার ফলাফল নদীর উপর নির্ভরশীল চাষী-জেলে থেকে শুরু করে সুন্দরবনের গাছপালা-জীবজন্তুর উপর গিয়ে পড়বে। এসকল কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫ থেকে ২০ কিমি এর মধ্যে কয়লা বিদ্যূৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয় না। যে ভারতীয় এনটিপিসি বাংলাদেশের সুন্দরবন ধবংস করে এই বিদ্যূৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে চাইছে, সেই ভারতেরই ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশান এক্ট ১৯৭২ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে কোন বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জৈব বৈচিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্য প্রাণীর অভায়ারণ্য কিংবা অন্য কোন ধরণের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবে না। অথচ বাংলাদেশের সুন্দরবনের ৯ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে বিশাল একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে কোন রকম পরিবেশ সমীক্ষা ছাড়াই!

কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য ও পরিবেশ দূষণ- বড় পুকুরিয়ার চিত্র:
বাংলাদেশের একমাত্র কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বড়পুকুরিয়ার ২৫০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্ট। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ গত প্রভাব নিয়ে কোন সমীক্ষার কথা আমাদের জানা নেই। অথচ বিদ্যূৎ কেন্দ্র চালু হওয়ার পর থেকেই নানান ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। আশপাশের গ্রামবাসীর অভিযোগের শেষ নেই। মাঝেই মাঝেই তারা এসব সমস্যা সমাধানের দাবীতে কেন্দ্রটি ঘেরাও করছেন। একটি সমস্যা হলো পানি সমস্যা। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজনে ভুগর্ভস্থ পানি টেনে নেয়ার কারণে এলাকা বাসী চাষাবাদ ও দৈনন্দিন কাজে ব্যাবহারের পানি পাচ্ছেন না। গ্রামবাসীর অভিযোগ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন ১৪ টি পাম্পের কারণে দুধিপুর, তেলিপাড়া, ইছবপুরসহ আশপাশের গ্রামে পানির অভাব দেখা দিয়েছে। অগভীর নলকুপ থেকে পানি উঠছে না। আরেকটি সমস্যা হলো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কঠিন বর্জ্য ছাই ব্যাবস্থাপনা নিয়ে। ২৫০ মেগাওয়াটের এই কেন্দ্রটি চালু রাখতে প্রতিদিন কয়লা জ্বালাতে হয় ২ হাজার ৪০০ টন। এতে ছাই হয় প্রতিদিন ৩০০ মেট্রিকটন। একাধিক পুকুরে এই ছাই প্রতিদিন জমা হচ্ছে। সিমেন্ট কারখানার কাচা মাল হিসেবে এই ছাইয়ের একটা ব্যাবহার রয়েছে। কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে ২০১০ সালের মে মাস পর্যন্ত হিসেবে চার বছরে মোটামুটি দুই লাখ ৬০ হাজার ৬১৩ টন আর্দ্র ছাই পুকুরে জমা করে রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই ছাই পুকুরের চার ভাগের তিন ভাগের বেশি ছাইয়ে ভরাট হয়ে গিয়েছে।ফলে পুকুরের পানিও শুকিয়ে গেছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে পানি মিশ্রিত ছাই আর পুকুরে ফেলা সম্ভব হবে না। ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। সূত্র: উপজাত ছাই, অযাচিত সমস্যা

এতে গেল ছাই রাখা ও ব্যাবহারের সংকটের কথা। কিন্তু এই ছাই সঠিক ভাবে রাখা হচ্ছে কি-না, ছাই মিশ্রিত পানি চুইয়ে মাটির নীচে ও আশপাশের জলাভূমিতে কয়লা খনির বিষাক্ত ধাতব উপাদান কি পরিমাণ দূষণের সৃষ্টি করছে তার কোন খোজখবর কি কেউ করেছে? সূক্ষ ধাতব কণার কথা যদি বাদও দেই, বড় পুকুরিয়া কয়লা খনির আশপাশে গেলেই দেখা যায়, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নালা বেয়ে কয়লা ধোয়া কালো পানির স্রোত মিশে যাচ্ছে চারপাশের কৃষিজমিতে। ফলে আশপাশের কৃষিজমিগুলোর রং এখন নিকষ কালো!

এই যদি বড় পুকুরিয়ার মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ দূষণের আংশিক চিত্র হয়, তাহলে ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাব নিকটবর্তী সুন্দরবন ও আশপাশের জনবসতি ও কৃষি জমির উপর কি হতে পারে অনুমান করা শক্ত নয়। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে ৭০ লক্ষ টন কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যাবহ্রত হলে ৩০ লক্ষ টন ছাই বর্জ্য উৎপাদিত হবে। এ বিপুল পরিমাণ ছাই উৎপাদিত হয় বলেই কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ গত সমীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকে এই ছাই ব্যাবস্থাপনা নিয়ে। ভারতের মধ্যপ্রদেশের সিংগ্রাউলি জেলার নিগ্রি গ্রামে ১৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত সমীক্ষা রিপোর্ট আমাদের হাতে আছে। সেখান থেকে দেখা যায়, ছাই সমস্যা সমাধানের জন্য নিকটেই একটি সিমেন্ট কারখানা তৈরীর প্রস্তাব করা হয়েছে যাতে বার্ষিক ২০ লক্ষ্য টন সিমেন্ট উৎপাদিত হবে। বাংলাদেশের রামপালে প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যূৎ কেন্দ্রের বেলায় কি উৎপাদিত ছাইয়ের ব্যাবহার, পশুর নদী থেকে পানি টেনে নেয়ার ফলে আশপাশের গ্রামবাসীর সম্ভাব্য পানিসংকট কিংবা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসা দূষিত পানি ব্যাবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে?

অর্থনৈতিক বিবেচনা:
প্রস্তাবিত রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত হওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে এটি মূলত ভারতীয় মালিকানা ও ব্যাবস্থাপনায় একটি ভারতীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রই হবে, যে বিদূৎ কেন্দ্র থেকে সরকার বেসরকারি বিদ্যূৎ কেন্দ্র বা আইপিপি’র কাছ থেকে যেমন চড়া দামে বিদ্যুৎ কেনে সেভাবে কিনবে। পিডিবির চেয়ারম্যান জনাব আলমগীর হোসেন বলেন, এই অর্থের ২৫% এনটিপিসি ও পিডিবি সমান দুই ভাগে ভাগ করে অর্থাৎ প্রত্যেকে ১২.৫% করে বিনিয়োগ করবে। বাকি ৭৫% অর্থ এনটিপিসি বিভিন্ন ব্যাংক ও দাতা সংস্থার কাছ থেকে সংগ্রহ করবে। কাজেই দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ৮৭.৫% মালিকানাই থাকবে এনটিপিসি’র। আর এই মালিকানা এনটিপিসি’র বলেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ব্যাবস্থাপনা ও পরিচালনার কাজ সম্পূর্ণ ভাবে এনটিপিসি’র যদিও অযুহাত হিসেবে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার উপযুক্ত দক্ষতা না থাকার অযুহাত দেয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা ও দাম সম্পর্কে বিদুৎ সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন: এই বিদ্যূৎ কেন্দ্রটি দেশের বেসরকারি খাতের অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলোর মতোই পরিচালিত হবে যেগুলো থেকে পিডিবি বিদ্যুৎ কিনে থাকে।৮
কিন্তু পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে এমনকি বেসরকারি খাতের প্রস্তাবিত মূল্যের চেয়েও বেশি মুল্যে এই রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হবে বাংলাদেশকে। পিডিবি ও এনটিপিসি’র মধ্যে সমঝোতা অনুসারে যদি আমদানি করা কয়লার দাম প্রতি টন ১০৫ ডলার করে হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৫ টাকা ৯০ পয়সা এবং প্রতি টন ১৪৫ ডলার করে হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ৮৫ পয়সা করে ক্রয় করবে বাংলাদেশ। পিডিবি’র কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ডেইলি সান লিখেছে, এনটিপিসি এবং পিডিবি ইতিমধ্যেই প্রতি টন ১৪৫ ডলার করে কয়লা আমদানি চূড়ান্ত করে ফেলেছে, ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা বা ভারতীয় ৫ দশমিক ২ রূপি।

অথচ গত ২০ ডিসেম্বর ওরিয়ন গ্রুপের সাথে পিডিবির চুক্তির সংবাদ থেকে দেখা যাচ্ছে কয়লাভত্তিকি কন্দ্রেগুলোর মধ্যে
মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় ৫২২ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট ৪ টাকা এবং খুলনার লবণচোরায় এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ২৮৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি কেন্দ্র তিন টাকা ৮০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনবে পিডিবি।

ফলে বোঝা শক্ত নয়, বিদ্যুৎ সংকট নিরসনের নামে আরেকটি বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে বেশি দামে বিদ্যূৎ কেনার আয়োজ হচ্ছে।

একটি ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কেন্দ্র নির্মাণ পর্যায়ে ৪০০০ এবং পরিচালনা পর্যায়ে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক মিলিয়ে সর্বোচ্ছ ৬০০ মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের আওয়াত ১ম পর্যায়ের ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১,৮৩৪ একর জমি বেছে নেয়া হয়েছে যার বেশির ভাগই হলো কৃষি জমি। এই জমির মালিক ও কৃষিকাজের উপর বিভিন্ন ভাবে নির্ভরশীল ব্যাক্তিদের জীবন জীবিকার কি হবে? রামপাল কৃষিজমি রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ শুরু থেকেই হাজার হাজার মানুষের জীবন জীবিকা ধবংস করে কৃষি জমির উপর এই বিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্পের বিরোধী করে আসছে। তারা সংবাদ সন্মেলন করে বলেছেন : ” প্রস্তাবিত এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিশাল এলাকার মধ্যে বসতবাড়ি, ধানী জমি, মৎস খামার, চিংড়ি চাষ প্রকল্প, সবজি ক্ষেত, গরু-মহিষ উৎপাদন খামার, দুগ্ধ খামার, মসজিদ মাদ্রাসা মক্তব কবরস্থান ও অন্যান্য ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতি মৌসুমে কয়েক কোটি টাকার মাছ, ধান, গরু-মহিষের মাংস এই এলাকা থেকেই উৎপাদন করা হয়। কৃষি জমি অধিগ্রহনের এই উদ্যোগের সাথে সাথে আমাদের রুটি-রুজির সংস্থান আর বাপ-দাদার ভিটে-মাটি সবই যেতে বসেছে। ... বিদ্যূৎ কেন্দ্র স্থাপিত হলে হয়তো কিছু লোকের কর্মসংস্থান হবে কিন্তু জমি অধিগ্রহণের ফলে কৃষি জমি ও কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত যে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ কর্মহীন আর উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে তাদের সবাইকে পুনর্বাসন করা আদৌ সম্ভব নয়। ক্ষতিপূরণ হিসেবে হয়তো কিছু টাকা মিলবে কিন্তু তা দিয়ে নতুন করে কৃষি জমি কেনাও দূরহ। এ অনিশ্চয়তা থেকে আমরা কৃষি জমি রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেছি।”

ভারতের ছত্তিশগর কিংবা মধ্য প্রদেশের কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ সমীক্ষা রিপোর্ট আমাদের হাতে আছে যেগুলোর প্রত্যেকটিতে প্রথমেই হলফ করে নিশ্চিত করা হয়েছে যে প্রকল্পটি অকৃষি জমির উপর নির্মিত হতে যাচ্ছে, প্রকল্পের ১৫ কিমি এর মধ্যে কোন সংরক্ষিত বানাঞ্চল নেই ইত্যাদি। অথচ বাংলাদেশ সরকার একদিকে খাদ্য নিরাপত্তার কথা বলছে, খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষি জমিতে যে কোন ধরণের অকৃষি স্থাপনা নিষিদ্ধ করার আইন করার কথা বলছে, আফ্রিকার কৃষি জমি লিজ নিয়ে খাদ্য শস্যা ফলানোর কথা বলছে অন্যদিকে কৃষি জমি ধবংস করে উন্মুক্ত খনি কিংবা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিদেশী প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে।

ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম বা সংকটের পুঁজিবাদ :
পুঁজিতন্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যাবস্থায় শাসক শ্রেণী ব্যাক্তি-গোষ্ঠীর মুনাফার প্রাধন্য নিশ্চিত করতে গিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে নানান সংকটে ফেলে দেয় এবং পরে আবার সেই সংকট থেকে উদ্ধারের নামে মুনাফার প্রাধান্য দিয়ে আরো বড় সংকট ডেকে আনে। নাওমি ক্লেইন তার ডিসাস্টার ক্যাপিটালিজম এ বলেছেন: ”সামরিক ক্যু, সন্ত্রাসী আক্রমণ, বাজারের ধ্বস, যুদ্ধ, সুনামি, হারিকেন ইত্যাদি বিপর্যয় সমস্ত মানুষকে একটা কালেক্টিভ শক বা আঘাতের সম্মুখীন করে ফেলে। নিক্ষিপ্ত বোমা, সন্ত্রাসের আতংক কিংবা শো শো ঝড়ো হাওয়া সমগ্র সমাজকে কাদার মত নরম করে ফেলে- যেমন আঘাতের পর আঘাত নরম করে ফেলে কারবন্দী আসামীকে। আতংকিত বন্দী যেমন বিপর্যস্ত হয়ে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সহযাত্রী বন্ধুর নাম ফাঁস করে দেয়, বড় ধরণের বিপর্যয়ের মুখে আতংকিত সমাজও অনেক সময় এমন সব কাজের অনুমোদন দিয়ে ফেলে যেগুলো অন্যসময় হলো তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তো।” বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মানুষকে এরকমই একটি কালেক্টিভ শক এর মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে যে শক বা আঘাতকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যূৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের নামে শাসক শ্রেণী দেশী বিদেশী লুটেরা পুজির মুনাফার আয়োজন করছে। ফুলবাড়ি-বড়পুকুরিয়ার উন্মুক্ত খনি, সাগরের গ্যাস ব্লক বিদেশী কোম্পানির কাছে ইজারা, কুইক রেন্টালের নামে ১৪ থেকে ১৭ টাকা দরে বিদ্যূৎ ক্রয় কিংবা হালের এই ভারতীয় বিনোয়োগে সুন্দরবন-কৃষিজমি ধবংস কারী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইত্যাদি সবকিছুই এই মুনাফা ও লুটপাটের আয়োজনের অংশ। আমরা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধী নই কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের অযুহাতে জল-জমি-জঙ্গল-জীবন ও অর্থনীতি ধবংসকারী কোন প্রকল্প মেনে নিতে রাজী নই। আমরা মনে করি, কৃষিজমি, সুন্দরবনের মতো সংরক্ষিত বনভূমি কিংবা জীবন-অর্থনীতি ধবংস না করেও বড়-ছোট-মাঝারি নানান আকারের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব যদি মুনাফার আগে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এই রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের বেলাতেও এলাকাবাসীর মতোই আমরা মনে করি পরিবেশ ও অর্থনৈতিক যেসব প্রশ্ন আমরা এখানে উত্থাপন করেছি এগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমেই এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভবিষ্যত নির্ধারণ করতে হবে।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29531326 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29531326 2012-01-29 13:22:38
সারী নদীর উজানে মাইনথ্রু-লেসকা বাধ: ভারতীয় “বন্ধুত্বের” আরেক নিদর্শন! ব্লগে পোষ্ট করা হয়েছিলো । তখন বিষয়টি মেইনস্ট্রিম মিডিয়া কিংবা ব্লগারদের নজরে তেমন একটা পড়ে নি। এখন যেহেতু বিষয়টি মিডিয়ায় আসতে শুরু করেছে সেকারণে আবার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য রিপোষ্ট করা হলো। }

সাম্রাজ্যবাদি আঞ্চলিক শক্তি ভারতের সাথে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর বন্ধুত্বের নাটক যখন তুঙ্গে, যখন তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে নামতা জপার পরও “বন্ধু পানি দিলনা” বলে আফসোসের জিগির উঠেছে, যখন কাটাতারের ঘেরাওয়ের মধ্যে বসে ট্রানজিটের মাধ্যমে রাস্তা-বন্দর ভাড়া খাটিয়ে “বেশ্যা অর্থনীতি”র বেসাতি চলছে তখন “সুখবর” পাওয়া গেল বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ নদী সারী-গোয়াইনের উজানে বাধ বানানো শেষ করে এনেছে। গত কয়েকদিন ধরে এই বাধ নিয়ে সিলেট অঞ্চলে প্রতিবাদ বিক্ষোভ চলছে, কয়েকটি দৈনিক এবং অনলাইনে খরবও প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু শাসক গোষ্ঠীর তাতে কিছু যায় আসে বলে মনে হয় না, তারা টিপাইমুখ বাধের মতোই “বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কোন কিছু করা হবে না” জাতীয় ভারতের আশ্বাস বাণী শুনতেই আরাম বোধ করেন। আসলে এরা বিষয়টি জেনেও না জানার ভান করছে, ভারতের কাছে আশ্বাস বাণী পাওয়ার আগেই আশ্বস্ত হয়ে বসে আছে, কারণ এটাই এই শ্রেণীর জন্য লাভজনক।

সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানিগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া সারী-গোয়াইন বা হারি গাঙ নদীর উতপত্তি ভারতের মেঘালয় পর্বতে। জৈন্তাপুরের লালখাল এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের আগে মাইনথ্রু(MYNTDU) নদী নামে প্রবাহিত হয়েছে। এই মাইনথ্রু নদীতেই মেঘালয়ের লেসকা অঞ্চলে “মাইনথ্রু লেসকা হাইড্রোইলেক্ট্রিক প্রেজক্ট” নামে ১২৬ মেগাওয়াটের(৪২*২ + ৪২*১) এ্কটি জলবিদ্যুত প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে ভারত।
সূত্র: Myntdu Leshka St-I H.E. Project
http://meseb.nic.in/leshka.htm



ছবি: মানচিত্রে সারী নদীর উজানে বাধ নির্মাণ প্রকল্প


ছবি: প্রজেক্টের কাজ প্রায় শেষ
সূত্র: Status of Works of Myntdu Leshka HE Project
http://meseb.nic.in/leshka/StatusofWorks.pdf

প্রকল্পের ওয়েবসাইটে এটাকে রান অফ রিভার(Run Off River) ড্যাম বলে চিহ্রিত করা হলেও বাস্তবে বাধের ঠিক আগে লামু(Lamu), উমসারিয়াঙ(Umshariang) এবং মাইনথ্রু(Myntdu) এই তিন নদীর মোহনায় একটি বড় আকারের জলাধার নির্মাণের ফলে এটি আর রান অফ রিভার ড্যামের মতো কাজ করবে না। কারণ সাধারণ ভাবে রান অফ রিভার বাধের ক্ষেত্রে নদীর বেশির ভাগ পানি পাইপ বা টানেলের মাধ্যমে বিদ্যুত উতপাদনকারী টারবাইনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত করে তারপর আবার সেটাকে নীচের দিকে নদীর পুরোনো গতিপথে ফিরিয়ে দেয়া হয়, জলেধারে বিপুল পরিমাণ পানি ধরে রাখা ও সুবিধা মতো সময়ে পানি প্রবাহ বাড়ানো কমানোর তেমন কোন ব্যাপার থাকে না।
In general, projects divert some or most of a river’s flow (up to 95% of mean annual discharge)[4] through a pipe and/or tunnel leading to electricity-generating turbines, then return the water back to the river downstream.
সূত্র: Click This Link

কিন্তু এক্ষেত্রে জলাধার ব্যাবহার করে প্রয়োজনের অনুযায়ী পানি ধরে রাখা এবং প্রয়োজন মতো পানি ছেড়ে দেয়ার সুযোগ থাকায় আর দশটা জলবিদ্যুত প্রকল্পের মতোই নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহের উপর কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে বাধটি যার খেসারত দিতে হবে নদীর ভাটি অঞ্চলে অবস্থিত জনগণকে।


ছবি: মাইনথ্রু-লেসকা হাইড্রোইলেক্ট্রিক প্রজেক্টের লেআউট ম্যাপ

তাহলে জলাধারে পানি ধরে রাখার সুযোগ রাখার পরও কেন এটিকে রান অফ রিভার ড্যাম বলা হচ্ছে? উইকিপিডিয়ায় এ সম্পর্কে একটা ইন্টারেষ্টিং বক্তব্য পাওয়া গেল:
The use of the term "run-of-the-river" for power projects varies around the world and is dependent on different definitions. Some may consider a project ROR if power is produced with no storage while a limited storage is considered by others. Developers may mislabel a project ROR to sooth public image about its environmental or social effects.
সূত্র: Click This Link

তাহলে দেখা যাচ্ছে রান অফ রিভার নাম করণেরও একটা রাজনীতি আছে। বাধের পরিবেশগত এবং সামাজিক প্রভাবকে আড়াল করার জন্য অপেক্ষাকৃত “পরিবেশ সম্মত” বলে পরিচিত রান অফ রিভার ড্যাম বলে লেবেল দেয়া হচ্ছে। বাস্তবে এর সমস্ত আয়োজন ট্র্যাডিশনাল হাইড্রোইলেক্ট্রিক বাধের মতোই, ট্রাডিশনাল হাইড্রোইলেক্টিক প্রজেক্টের মতোই এতে পানি ধরে রাখা এবং সুযোগ মতো পানি ছাড়া অর্থাত পানির প্রাকৃতিক প্রবাহের পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটানোর ব্যাবস্থা আছে।
ফলে আশংকা হলো, মাইনথ্রু-লেসকা বাধ নির্মাণের ফলে ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া সারী নদীর প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের হ্রাস বৃদ্ধি, পলি প্রবাহ, নদীর পানির গতি-তাপমাত্রা, মতস সম্পদ, জলজ উদ্ভিদ ইত্যাদি অর্থাত নদী কেন্দ্রিক গোটা বাস্তু সংস্থানের উপরই বিরুপ প্রতিক্রিয়া পড়বে এই বাধ নির্মাণের ফলে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম.ইনামুল হক বলেন:
“ড্যাম এর জলাধারের কারণে আশপাশের কৃষিজমি ভেসে যাবে, জনবসতি উচ্ছেদ হবে, পশুপাখির আবাস নষ্ট হবে আর বাধের কারণে মাছ নদীর উজানে যেতে না পেরে ব্রিডিং গ্রাউন্ড হারাবে। আর বাংলাদেশে আসা মাছের পরিমাণ কমে যাবে, পানি প্রবাহ বিঘ্নিত হবে যা আবার শীতাকালিন ফসলের ক্ষতি করবে। আমাদের উচিত এই প্রকল্পের বিরোধীতাকারী ভারতীয় জনগণ ও পরিবেশবাদীদের সমর্থন করা।“



সিলেটের আঞ্চলিক পত্রিকা শ্যামল সিলেট এ বিষয়ে লিখেছে:

“সারী নদীর উজানে বাধ দেয়ার খবর পেয়ে এ নদী তীরবর্তী অঞ্চলের লোকজন ক্ষোভে ফুসছেন। বাধ অপসারণের দাবীতে গঠন করা হয়েছে “সারী নদী বাচাও আন্দোলন”। সংগঠনের সমন্বয়ক লিডিং ইউনিভার্সিটির সহকারী রেজিস্টার আব্দুল হাই জানান ব্যাবসা সংক্রান্তকারণে জৈন্তাপুরের লোকজন জৈন্তিয়া হিল ডিস্টিক্টে যাতায়াত করেন। ভারতে যাতায়াত কারী ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকেই আমরা প্রথম বাধ নির্মাণের খবর পাই। পরে মাইন্ডু লেসকা হাইড্রোইলেক্ট্রিক প্রজেক্টের ওয়েবসাইট থেকে আমরা বিষয়টি নিশ্চিত হই। তিনি বলেন বাধের কারণে সারী নদী মরে যাবে। নদী তীরবর্তী এলাকার লোকজনের জীবন জীবিকার উপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। এ প্রসঙ্গে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক ড.মুহম্মদ আব্দুর রব বলেন, তিনি মাইন্ডু লেসকা হাইড্রোইলেক্ট্রিক প্রজেক্ট ও মেঘালয় এনার্জি কর্পোরেশান লিমিটেড এর ওয়েবসাইট থেকে বাধটি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। তিনি বলেন উজানে বাধ দেয়ার ফলে সারী নদীর স্বাভাবিক গতি বিঘ্নিত হবে।পানির সঙ্গে পলি আসা বন্ধ হওয়ায় এ অঞ্চলের মাটির উর্বরতা কমে আসবে। শীতকালে নদীর পানি স্বল্পতার কারণে কৃষিকাজ বিঘ্নিত হতে পারে। সিলেট অঞ্চলের উদ্ভিদ ও জলজ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পাশাপাশি ইকোসিস্টেমের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। তার মতে বাংলাদেশ সফরে আসা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সামনে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর এ বাধ ও বিদ্যুত প্রকল্প বাতিলের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ জানাতে হবে।“ সূত্র: Click This Link

আমরা “সারী নদী বাচাও আন্দোলন” এর সাথে সংহতি প্রকাশ করছি এবং সেই সাথে বাংলাদেশকে না জানিয়ে, বাংলাদেশের সস্মতি-অসম্মতির তোয়াক্কা না করে ভারতের এই বাধ নির্মাণ ও চালু করে ফেলার সকল প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য ভারতের সাথে বন্ধু বন্ধু খেলা বাদ দিয়ে রাষ্ট্রীয় ভাবে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক ভাবে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের দাবী জানাচ্ছি।

কৃতজ্ঞতা: লেখায় ব্যাবহ্রত মানচিত্র এবং তথ্য দিয়ে সহোযোগিতা করেছেন প্রকৌশলী ম.ইনামুল হক।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29526184 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29526184 2012-01-21 10:27:11
বাপেক্সকে Slow করে রাখার Fast Track প্রোগ্রাম ও Gazprom এর থাবা আগামী ০৯ জানুয়ারি ২০১২ গ্যাজপ্রমের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসার পর চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।(সূত্র: ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২৮ ডিসেম্বর ২০১১)

বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল গ্যাসের ৮.৩% সরবরাহকারী রাশিয়ার এই জায়ান্ট কোম্পানিটি ঘুষ-দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, চুক্তি ভঙ্গ, চুক্তির বাইরে বাড়তি অর্থ দাবী করে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া ইত্যাদি নানা কারণে কুখ্যাত যাকে গত ২০১১ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ও রেভিনিউ ওয়াচ ইন্সিটিউট তাদের যৌথ জরীপে বিশ্বের সবচেয়ে অস্বচ্ছ কোম্পানি হিসেবে নির্বাচিত করেছে !

এই কুখ্যাত মাফিয়া কোম্পানির হাতে বিশেষ জ্বালানি আইন এর দায়মুক্তির সুযোগে বিনা টেন্ডারে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয়ে ১০টি কুপ খননের কন্ট্রাক্ট দিয়ে এবং ভবিষ্যতে পেট্রোবাংলার সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার ও জ্বালানি সেক্টরের মাষ্টার প্ল্যান তৈরী করার দ্বায়িত্ব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বস্তুত বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে নতুন আরেকটি ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি করা হচ্ছে।

ফাস্ট ট্র্যাক প্রোগ্রাম:
রাশিয়ার গ্যাজপ্রমের সাথে ১০টি গ্যাস কুপ খননের এই চুক্তির প্রেক্ষাপটে রয়েছে গত ২০০৯ সালের ১২ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক নেয়া ফাস্ট ট্র্যাক প্রোগাম। এই প্রোগ্রামের আওতায় গত ১৬ আগষ্ট, ২০০৯ সালে পেট্রোবাংলা Augmentation of Gas Production under Fast Track Program নামে একটি ডেভেলাপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোপজাল বা ডিপিপি প্রস্তত করে জ্বালানি মন্ত্রনালয়ে পাঠায় যেখানে দেশের গ্যাস উত্তোলণ ত্বরান্বিত করার জন্য বিদেশী কন্ট্রাক্টর ভাড়া করে ৩,১০০ লাইন কিমি সিসমিক সার্ভে, তিতাসে ৪টি এবং রশিদপুরে ২টি গ্যাস কুপ খননের পরিকল্পনা তৈরী করা হয়। ডিপিপি অনুসারে বাপেক্সের মালিকানাধীন ৩,৬,৮ ও ১১ নাম্বার ব্লকের মোট ৩,১০০ লাইন কিমি দ্বিমাত্রিক সিসমিক সার্ভে, বিজিএফসিএল এর মালিকানাধীন তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রের ১৯,২০,২১,২২ নং গ্যাসকুপ খনন এবং এসজিএফএল এর রশিদপুর গ্যাস ক্ষেত্রের ৮নং গ্যাস কুপ খনন ও ৫নং গ্যাস কুপ ওয়ার্ক ওভার করার কাজ অক্টোবর ২০০৯ সালে শুরু হয়ে ডিসেম্বর ২০১২ এর মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা।

বাপেক্স যে কাজ গুলো স্বল্প খরচে করতে পারে সে কাজগুলোই বিদেশী কোম্পানিকে ভাড়া করে বাড়তি খরচ বহন করে করার পেছনে যুক্তি দেখানো হয় স্বল্প সময়ে সিসমিক সার্ভে ও কুপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় সিসমিক ক্র ও পর্যাপ্ত ড্রিলিং রিগ ও দক্ষ জনশক্তি না থাকা। অথচ বাস্তবতা হলো, ২০০৯ সালের অক্টোবরে শুরু হয়ে যে “ফাস্ট ট্র্যাক” কাজ ২০১২ এর ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা সেই কাজ আজকে ২০১২ সালের জানুয়ারি’তে এসে আমরা দেখছি এখনও শুরুই হয় নি! টেন্ডারে নির্বাচিত কোম্পানির মামলা মোকদ্দমা এবং নির্বাচিত কোম্পানির কাজ করতে অস্বীকৃতি ইত্যাদি নাটকের মাধ্যমে দুই বছরেরও বেশি সময় নষ্ট করার পর এখন আবার কোন ধরণের দরপত্র আহবান ছাড়াই ১৮ মাসে কাজ সম্পন্ন করার কথা বলে মোট ১০টি কুপ খননের চুক্তি করা হচ্ছে রাশিয়ার কোম্পানি গ্যাজপ্রমের সাথে।

ফাস্ট ট্র্যাক কতটা ফাস্ট?
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে নেয়া সিদ্ধান্ত মোতাবেক “এ প্রোগ্রাম সংশ্লিষ্ট সকল কার্যক্রমকে ফাস্ট-ট্র্যাক রুপে গণ্য করে ডিপিপি প্রণয়ন, ভুমি হুকুম দখল/অধিগ্রহণ, সরকারী অর্থ সংগ্রহ/বরাদ্দ, উক্ত প্রোগ্রামের প্রযোজ্যতা অনুযায়ী পিপিআর/পিপিএ-২০০৮(পাবলিক প্রকিউরমেন্ট এক্ট বা রুল-২০০৮) এর কতিপয় ধারা বিশেষ করে টেন্ডার সময়সীমা, আরএফকিউ এর অর্থ সিলিং, আন্তর্জাতিক শপিং, আন্তর্জাতিক মালামালের কান্ট্রি অব অরিজিন, দরদাতা প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম/সর্বোচ্চ সংখ্যা ইত্যাদি শিথিল করণ” করা হলেও দুই বছরে কাজের কাজ কিছুই হয় নি। সিসমিক সার্ভের জন্য সর্বনিম্ন দরদাতা চীনা কোম্পানি বিজিপি’র বদলে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ফ্রান্সের কোম্পানি সিজিজি ভেরিতাসকে কন্ট্রাক্ট দেয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করে সার্ভের কাজ আটকে রেখেছে বিজিপি। বাপেক্সের সর্বশেষ মাসিক অগ্রগতির প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে-“2D Seismic Survey under Fast Track Programme” শীর্ষক প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে BGP Inc., CNPC, China কর্তৃক হাইকোর্টে দায়েরকৃত রিটপিটিশন (Writ Petition No.2005 of 2001) এর কারণে 2D seismic contractor Hiring প্রকৃয়া বর্তমানে স্থগিত আছে।“

সূত্র: বাপেক্সের মাসিক অগ্রগতির প্রতিবেদন, অক্টোবর ২০১১

অন্যদিকে তিতাস ও রশিদপুর গ্যাস ক্ষেত্রের ৬টি গ্যাসকুপ খনন/ওয়ার্ক ওভারের জন্য গত ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পোল্যান্ডের কোম্পানি ওজিইসি ক্রাকাউ’কে নির্বাচিত করা হলেও তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রে লিকেজ থাকার কারণ দেখিয়ে ক্রাকাউ কোম্পানি গত ২০১১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে কাজ করতে অস্বীকৃত জানিয়ে চিঠি দিয়েছে।
সূত্র: http://www.bgfcl.org.bd/list.html

অথচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে দিয়ে কাজগুলোর করানোর পরিকল্পনা করা হলে দুই বছরের বেশি সময় এভাবে বৃথা নষ্ট হতো না, ফাস্ট ট্র্যাক স্লো ট্র্যাকে পরিণত হতো না। জরুরী ভিত্তিতে ১ বছরের মধ্যে বাপেক্সের প্রয়োজনীয় লোকবল ও যন্ত্রপাতি ক্রয়/ভাড়া করার ব্যাবস্থা করা হলে বাকি এক/দেড় বছরে সিসমিক সার্ভে ও গ্যাস কুপ খননের কাজ প্রায় অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হয়ে যেত। সেই সাথে বাপেক্সের ক্যাপাসিটির’ও স্থায়ী বৃদ্ধি ঘটতো যা পরবর্তীতেও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণ বাড়ানোর কাজে লাগতো।


গ্যাজ প্রমের সাথে চুক্তি:
এভাবে ইচ্ছাকৃতভাবে সংকট তৈরী ও জিইয়ে রেখে এখন সংকট নিরসনের জন্য জরুরী ভিত্তিতে গ্যাস উত্তোলণের নামে “বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি(বিশেষ বিধান) বিল ২০১০” নামক কালো আইনের দায়মুক্তির ছত্রছায়ায় বিনা টেন্ডারে রাশিয়ার গ্যাজ প্রমকে ফাস্ট ট্র্যাক প্রোগামের আওতায় নেয়া প্রকল্পের মধ্য থেকে তিতাসের ৪টি ও রশিদপুরের ১টি কুপের সাথে নতুন করে বাপেক্সের মালিকানাধীন ৫টি কুপ যুক্ত করে মোট ১০টি কুপ খননের কন্ট্রাক্ট দেয়া হচ্ছে। সূত্র: সমঝোতা চূড়ান্ত : ১০টি কূপ খনন করবে গ্যাজপ্রম এ লক্ষ্যে গত ৩১ অক্টোবর ২০১১ থেকে ০৩ নভেম্বর ২০১১ পর্যন্ত গ্যাজ প্রমের প্রস্তাবিত কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব নিয়ে পেট্রোবাংলার সাথে গ্যাজপ্রমের “অনানুষ্ঠানিক” আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ, গত ২১ ডিসেম্বর ২০১১ সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি গ্যাজ প্রমের সাথে চুক্তির ব্যাপারে সম্মতি জানায় যা আগামী ০৯ জানুয়ারি গ্যাজপ্রমের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসার পরপরই স্বাক্ষরিত হবে বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গ্যাজপ্রম এর সাথে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিজিএফসিএল এর মালিকানাধীন তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রের ৪টি, এসজিএফএল এর মালিকানাধীন রশিদপুরের ১টি এবং বাপেক্সের মালিকানাধীন বেগমগঞ্জ,শাহাবাজপুর,শ্রীকাইল,সেমুতাং ও সুন্দলপুর এই ৫টি - মোট ১০টি গ্যাস কুপ খননের চুক্তি হচ্ছে। তিতাস ও রশিদপুরের কুপ গুলোর প্রতিটির জন্য ২০.০৬ মিলিয়ন এবং বাপেক্সের প্রতিটি কুপের প্রতিটির জন্য ১৮.৬৪ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ১০টি কূপ খননের জন্য গ্যাজপ্রমকে মোট ১৯৩.৫ মিলিয়ন ডলার বা ১,৫৪৮ কোটি টাকা দিতে হবে। ফলে গড়ে একেকটি কূপ খননের খরচ পড়বে ১৯.৩৫ মিলিয়ন বা প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা করে। এভাবে গ্যাজপ্রমকে বাড়তি খরচে কন্ট্রক্ট দেয়ার সপক্ষে যুক্তি হিসেবে পিএসসি চুক্তির আওতায় অন্যান্য বিদেশী কোম্পানির কুপ খননের খরচের সাথে গ্যাজ প্রমের দাবী করা অর্থের তুলনা করা হচ্ছে (সূত্র: 10 wells to be drilled with Russian help, ২০ ডিসেম্বর, ২০১১ ডেইলিস্টার )। বলা হচ্ছে, ১৯৯৭ থেকে ২০১১ সালে পিএসসি চুক্তির আওতায় বিদেশী কোম্পানি কর্তৃক কুপ খননের গড় খরচ পড়েছে ২০.৪১ মিলিয়ন ডলার বা ১৬৩ কোটি টাকা করে। সুতরাং গ্যাজপ্রমকে গড়ে ১৯.৩৫ মিলিয়ন ডলার বা ১৫৫ কোটি টাকা করে কন্ট্রক্ট দেয়া যুক্তিযুক্ত। অথচ এই তুলনা করার সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের গড় খরচের কথার কোন উল্ল্যেখ দেখা যায়না। বাপেক্সের একেকটি কুপ খননের গড় খরচ ৭০/৮০ কোটি টাকা যা গ্যাজপ্রমের প্রস্তাবিত খরচের অর্ধেক। উদাহরণ স্বরুপ: বাপেক্সের নিজস্ব লোকবল ও রীগের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন মোবারকপুর অনুসন্ধান কূপ খননে ৮৯.২৬ কোটি টাকা(গভীরতম কূপ),শ্রীকাইল-২ কূপ খননে ৮১.১২ কোটি টাকা, সুন্দলপুর কূপ খননে ৭৩.৬৫ কোটি টাকা(প্রকৃত ব্যায় ৫৫ কোটি টাকা) এবং কাপাসিয়া কূপ খননের জন্য বাপেক্সের ৭০.১৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

সূত্র: বাপেক্সের মাসিক অগ্রগতির প্রতিবেদন, অক্টোবর ২০১১

ষ্পষ্টতই, এভাবে গ্যাজপ্রমের প্রস্তাবিত গ্যাস কুপ খননের খরচের তুলনা বাপেক্সের সাথে না করে অন্য বিদেশী কোম্পানির সাথে করার মানে হলো, পুরনো লুটপাটের দোহাই দিয়ে নতুন লুটপাট জায়েজ করা।

বাপেক্সের সক্ষমতার অভাবের যুক্তি
অথচ সময় মতো অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে দিয়ে বাপেক্সকে একদিকে বিদ্যমান দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যাবহার করতে দেয়া হচ্ছে না, পঙ্গু করে রাখা হচ্ছে অন্যদিকে দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়তে দেয়াও হচ্ছে না যা গত একদশকে বাপেক্সের নেয়া বিভিন্ন প্রকল্পে সরকারী অর্থবরাদ্দের হারটি দেখলে সহজেই বোঝা যায়:



একদিকে পেট্রোবাংলা বাগাড়াম্বর করে মিডিয়ায় বিবৃতি দিচ্ছে দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো কিভাবে "বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের প্রশ্ন ওঠে,তা বোধগম্য নয়” বলে অন্যদিকে ছলে-বলে কৌশলে নানান ভাবে গ্যাস সম্পদ লুটপাটের আয়োজন জারি রাখছে। আসলে স্থলভাগে গ্যাস উত্তোলণে বাপেক্সের যে দক্ষতা ও বিদেশী কোম্পানির চেয়ে কয়েকগুণ কম খরচে কাজ করার যে উদাহরণ রয়েছে এবং জাতীয় সম্পদের মালিকানার প্রশ্নে সারাদেশে পিএসসি চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে উঠেছে,তাতে স্থলভাগের গ্যাস ক্ষেত্র নতুন করে পিএসসি চুক্তির মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়াটাকে দেশবাসির কাছে কোন ভাবেই গ্রহণ যোগ্য করা যাবে না একথা শাসক শ্রেণী ভালো ভাবেই বুঝে গেছে। তাই এখন স্থলভাগে দক্ষতার অভাবের কথা না বলে বলতে শুরু করেছে ক্যাপাসিটি অর্থাৎ একসাথে অনেক কূপে কাজ করার ক্ষমতা না থাকার কথা। বাপেক্সকে দিয়ে নাকি একসাথে অনেক কূপে অনুসন্ধান ও উত্তোলণ কাজ করানো যাবে না,কারণ বাপেক্স এর পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও লোক বলের অভাব আছে। কথাগুলো এমন ভাবে বলছে যেন গ্যাস উত্তোলণের প্রয়োজনীয় রিগ মেশিন সহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও লোকবলের অভাব একটা চিরস্থায়ী সমস্যা যার কোন সমাধান করা যায় না! অথচ গ্যাসের সংকট তো হঠাৎ করে নাযিল হয় নি,দিনে দিনে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত উত্তোলণ না হওয়ায় সংকট ও বেড়েছে। তাহলে দিনে দিনে বাপেক্সের ক্যাপাসিটি চাহিদা অনুযায়ি বাড়ানো হলো না কেন কিংবা এখনও বা কেন ক্যাপাসিটি আরো বাড়ানোর উদ্যোগ না নিয়ে বিদেশী কোম্পানির পেছনে ছোটা হচ্ছে? ক্যাপাসিটি না বাড়ানো হলে তো চিরকাল-ই পরনির্ভরশীল হয়ে নিজেদের সম্পদ বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে আন্তর্জাতিক মূল্যে কিনে যেতে হবে। তাই ক্যাপাসিটি আসলে মূল কথা না,মূল কথা হলো কন্ট্রাক্ট,জয়েন্ট ভেঞ্চার ইত্যাদি বিভিন্ন কৌশলে গ্যাস সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার ধান্দা যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভাবে বা খাতাকলমে গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর মালিকানা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাত থাকলেও কার্যত বিদেশী কো্ম্পানির মুনাফার বাড়ানোর কাজেই লাগবে। তাই উৎপাদন অংশীদ্বারিত্ব চুক্তি বা প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) এর মতোই রাশিয়ার সাথে এই গ্যাস কুপ খননের কন্ট্রাক্টও কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই আমরা এই কন্ট্রাক্টের উদ্যোগ বাতিল করে দ্রুত বাপেক্সের মাধ্যমে গ্যাস কুপ খনন শুরু করার দাবী জানাচ্ছি।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29517556 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29517556 2012-01-06 21:23:37
ট্রানজিটের পয়লা মাশুল: তিতাস একটি খুন হয়ে যাওয়া নদীর নাম!
কড্ডা ব্রিজ এলাকায় নদী বুকে রাস্তা নির্মাণের ফলে দুই ভাগ করা তিতাস-ছবি:নিলয় দাশ

তিতাস হত্যার ইতিবৃত্ত
ভারতের ত্রিপুরার পালাটানায় ৭২৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি ৯৬টি ওভার ডাইমেন্সনাল কার্গো’র(ওডিসি) মাধ্যমে পরিবহনের জন্য ৩০ নভেম্বর ২০১০ এ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতা অনুসারে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন প্রটোকল, ১৯৭২ অনুসারে কোন ধরণের ট্রানজিট ফি ছাড়াই কনটেইনার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রায় মঙ্গল থেকে নদী পথে সাতক্ষীরা হয়ে আশুগঞ্জ নদী বন্দরে আসবে এবং তার পর আশুগঞ্জ থেকে সড়ক পথে আখাউরা স্থলবন্দর হয়ে ভারতের ত্রিপুরায় যাবে। কিন্তু আশুগঞ্জ বন্দর আর আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া সড়ক পথ ওডিসি পরিবহনের অনুপযুক্ত হওয়ায় বন্দর উন্নয়ণ, ৪৯ কিমি রাস্তা মেরামত ও ১৮ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করার জন্য ভারত এককালীন ২৫.৫০ কোটি টাকা প্রদান করবে বলে ঠিক হয়।
সূত্র : Click This Link
কিন্তু শুধু রাস্তা মেরামত ও প্রশস্ত করলেই ৩২৫ টন ওজনের ওডিসি পরবহনে সক্ষম ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের বিশাল লরি চলাচল সম্ভব ছিল না ঐ পথে, কারণ এই রাস্তায় তিতাস নদী ও বিভিন্ন খালের উপর যেসব ব্রীজ ও কালভার্ট রয়েছে সেগুলো এত ভারী কার্গোর ভার বহনের সক্ষম নয়( সর্বোচ্চ ভারবহন ক্ষমতা ১৫ টন)। তাই রাস্তা মেরামত ও প্রশস্ত করণের পাশাপাশি ভারতের আসাম বেঙ্গল কেরিয়ার বা এবিসি ইন্ডিয়াকে দ্বায়িত্ব দেয়া হলো ব্রীজ ও কালভার্টগুলোর পাশ দিয়ে “বিকল্প রাস্তা” তৈরী করার। এবিসি তাদের বাংলাদেশী সাবকন্ট্রক্টর গালফ ওরিয়েন্ট সিওয়েজ এর মাধ্যমে ব্রীজ ও কালভার্টের নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া তিতাস নদী ও তার খালগুলোর মধ্য দিয়েই বালু ও সিমেন্টের বস্তা দিয়ে রাস্তা তৈরী করে। পানির প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য রাস্তার নীচ দিয়ে কংক্রীটের পাইপ বসানো হয়। কংক্রীটের পাইপ গুলোর ব্যাস ৩ ফুট। কিন্তু নদী/খালের মধ্যে দিয়ে বানানো রাস্তার নীচে ৩ফুট ব্যাসের কয়েকটি কংক্রীটের পাইপ কখনও নদী/খালের স্বাভাবিক চ্যানেলের বিকল্প হতে পারেনা। এটা অনেকটা সুইয়ের ফুটো দিয়ে কম্বল গলানোর চেষ্টার মতো অসম্ভব একটা ব্যাপার। তাছাড়া পলি ও আবর্জনা জমে কংক্রীটের পাইপের মধ্যে দিয়ে যতটুকু পানি প্রবাহ সম্ভব ছিল তাও একসময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমরা ঘাটুরা খাল, দক্ষিণ পইরতলা, রামরাইল, সুলতানপুর কিংবা কড্ডা সেতু/কালভার্টের মতো সবখানেই এই বাস্তবতাই প্রত্যক্ষ করেছি।

দক্ষিণ পইরতলায় তিতাসের একটি খালের উপর বাইপাস রাস্তা-ছবি নিলয় দাশ


পইরতলায় বাইপাস রাস্তার নীচের ভরাট হয়ে যাওয়া কংক্রীটের পাইপ-ছবি নিলয় দাশ

ফলে স্বাভাবিক সময়েই নদী/খালের মধ্যদিয়ে যাওয়া পথের দুই পাশে পানির উচ্চতার তারতম্য তৈরি হয়। আর বর্ষাকালে বাড়তি পানি প্রবাহ একপাশে আটকে থাকার কারণে আখাউড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের বিভিন্ন স্থানের কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, চাষাবাদেও ব্যাঘাত ঘটে। শুধু তাই না, গত আগস্টে ত্রিপুরার পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল ও বাড়তি বৃষ্টিপাতের পানি আখাউড়া স্থলবন্দর সড়কের আবদুল্লাহপুর ও নূরপুর জাজি সেতুর নিচের বিকল্প পথে আটকে যায়। এতে উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের আবদুল্লাহপুর, কালিকাপুর, বীরচন্দ্রপুর ও বঙ্গেরচর গ্রামের অনেক বাসিন্দা পানিবন্দী হয়ে পড়ে।
Click This Link
পানি চলাচলের রাস্তার কয়েকটি সরু কংক্রীট ফলে একদিকে রাস্তার একপাশে তৈরী হয় জলাবদ্ধতা ও অন্যপাশে পানি সংকট এবং অন্যদিকে রাস্তাগুলোও দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় যে কারণে এমনকি দেশীয় ট্রাক পরিবহণ বন্ধ করে হলেও ১৫টন ভার বহনে সক্ষম এই সেতুগুলোর উপর দিয়ে ওডিসি সহ ভারী লরিও পরিবহন করা হয়েছে!
সূত্র: Click This Link
আর এই “বন্ধুত্বের ভার” বহন করতে গিয়ে দেখুন সেতুগুলোর কি অবস্থা হয়েছে:

রামরাইল ব্রীজের বেহাল দশা-ছবি নিলয় দাশ

ভাগ্যহীন “ভাগ্যলক্ষী”:
আখাউড়া পৌরসভা এলাকায় ঢোকার ঠিক আগে কড্ডা নামক স্থানে তিতাস নদীর উপর একটি সড়ক সেতু ও একটি রেল সেতু রয়েছে। এই দুইটি সেতুর ঠিক মাঝখান দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করে তিতাস নদীকে দ্বিখন্ডি করা হয়েছে। রাস্তার নীচে পানি চলাচলের জন্য কতগুলো কংক্রীটের পাইপ বসানো হলেও এর দুই পাশের মধ্যে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হয়নি। গত বর্ষাকালে হঠাৎ ঢল এলে কংক্রীটের পাইপগুলো দিয়ে পানি দ্রুত রাস্তার একপাশ থেকে আরেক পাশে প্রবাহিত হতে না পারার কারণে দুইপাশের মধ্যে পানির উচ্চতার পার্থক্য হয়েছিল কয়েক ফুট। অর্থাৎ একপাশে জলাবদ্ধতা আর আরেকপাশে সেচের জলের অভাব। এই শুকনা মৌসুমে আমরা দেখেছি এমনিতেই আধমরা তিতাস নদী এইখানটায় রাস্তার একপাশে তুলনামূলক সজীব আর অপর পাশে ক্রমশ মরে যাচ্ছে। আমরা জানলাম, ভাটির অংশের জেলেরা মাছ তুলনামূলক কম পাচ্ছেন উজানের অংশের জেলেদের চেয়ে, কারণ মাছ আর যাই হোক কংক্রীটের অপেক্ষকৃত সরু পাইপ দিয়ে সহজে চলাচল করেনা। এমনকি উজানের অংশের জেলেরাও আগের মৌসুমের তুলনায় এই মৌসুমে মাছ কম পেয়েছেন- এক জেলে জানালেন, আগের মৌসুমে এই সময়ের মধ্যে তিনি ৩ লাখ টাকার মাছ আহরণ করলেও, এই মৌসুমে এখনও পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকার মাছও পাননি। মাছের মতো নৌকারাও কংক্রীটের পাইপের ৩ফুট ব্যাসের মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে পারেনা! ফলে একদিকে রাস্তার একপাশের জেলেরা যেমন মাছ মারতে মারতে অন্য পাশে যেতে পারে না তেমনি, নৌকায় করে বড় বাজার থেকে গঞ্জের ছোট ছোট বাজারে মালামাল পরিবহনের যে সুবিধা ছিল, সেটাও নদীর উপর দিয়ে নির্মিত এই রাস্তার কারণে সম্ভব হচ্ছে না। নৌকায় রাস্তার একপাশ পর্যন্ত মালামাল এনে তারপর রিকশা-ভ্যান-ট্রাক্টরে করে বাড়তি খরচ ও ঝক্কি সামলে মালামাল বাজারে পরিবহন করতে হচ্ছে। আমরা নিজ চোখেই দেখতে পাই এলাকার ‘ভাগ্যহীন’ মানুষগুলোর প্রতীক হিসেবে যেন রাস্তার একপাশে নোঙর করে রাখা আছে “ভাগ্যলক্ষী” নামের এই নৌকাটিকে, যে নৌকাটির নদীর মাছের মতই আর ঐ পাশে যাওয়ার কোন উপায় নেই!



কড্ডা ব্রীজের নীচে তিতাসের মধ্যদিয়ে বানানো রাস্তার একপাশে আটকে থাকা নৌকা "ভাগ্যলক্ষী"-ছবি নিলয় দাশ


ট্রানজিটের প্রকৃত মাশুলের নমুনা:
ট্রানজিট নিয়ে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী যতই খোয়াব দেখাক, যতই মাশুল কিংবা ফি’র নাটক করুক, ভারতের জন্য উপকারী হলেও ট্রানজিটের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ ও অর্থনীতি’কে যে ব্যাপক মাশুল গুণতে হবে, তার আগাম লক্ষণ দেখা গেল আশুগঞ্জ-আখাউড়া পথে ট্রানজিট দিতে গিয়ে নদী হত্যা, কৃষি জমি ধ্বংস, কৃষিকাজ, মৎস চাষ সহ গোটা এলাকার জনগণের জীবন ও পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনার মধ্য দিয়ে। আমরা দেখলাম, ভারতের শাসক শ্রেণী এবং বিভিন্ন ভারতীয় ও বাংলাদেশী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার্থে দেশের জনজীবন ও পরিবেশের ক্ষতির নুন্যতম তোয়াক্কা করল না বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী। আশুগঞ্জ বন্দর ভারী মালামাল পরিবহনের জন্য তৈরী নয়, রাস্তাঘাট-ব্রীজ-কালভার্ট ভারী যানবাহন পরিবহনে সক্ষম নয়, স্থল বন্দরেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই, ট্রানজিটের লাভ-ক্ষতির হিসেবে কষা হয় নি, পরিবেশগত সমীক্ষা হয়নি- তারপরও এখনই ভারতকে ট্রানজিট দিতে হবে। ভারতের স্বার্থ রক্ষায় অতি আগ্রহ এবং বিপরীতে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের প্রতি অবহেলার এই উদাহরণ বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর জন্য নতুন নয়, ট্রানজিটের শুরুতেই তিতাস নদী হত্যার মধ্য দিয়ে তার নিদর্শন দেখা গেল, ট্রানজিট পুরোদমে চালু হলে যা আরো বেশি মাত্রায় দেখা যাবে- কৃষিজমি-নদী-খাল ধ্বংস করে ট্রানজিটের প্রয়োজনীয় রাস্তা-ঘাট নির্মাণ ও প্রশস্ত করা হবে, বাংলাদেশের নিজস্ব যানচলাচল বন্ধ রেখে ভারতীয় যান চলাচলের সুযোগ করে দেয়া হবে, বন্দরে আমাদের নিজস্ব মালামাল উঠানামা বন্ধ রেখে ভারতীয় মালামাল উঠানামার সুযোগ করে দেয়া হবে, ভর্তুকী মুল্যে ভারতীয় যানবাহনের জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে, বাড়তি তেলের বাড়তি ভর্তুকীর দায় আবার জনগণের উপরে চাপানো হবে, বন্ধুত্বের নিদর্শন রাখতে ট্রানজিটের সড়ক ও রেলপথ সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বাড়তি অর্থ খরচ করা হবে যখন দেশের জনগণের নিজস্ব চলাচল ও পরিবহনের প্রয়োজনীয় সড়ক ও রেলপথ উন্নয়ণ ও সম্প্রসারণের কোন খবর থাকে না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29508917 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29508917 2011-12-24 01:11:44
টিপাইমুখ বাধ প্রসংগে:প্রয়োজন সংগ্রামের আন্ত:সংযোগ(আপডেটেড) আশ্বাস ও আশ্বস্ত হওয়ার রাজনীতি
দিল্লীর আশ্বাস, ঢাকার আশ্বস্ত হওয়া আর বরাক নদীর ভাটির মণিপুর-মিজোরাম-বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ বিক্ষোভের মধ্যেই টিপাইমুখ বাধ নির্মাণের কাজ চলছে ধারাবাহিক ভাবে। সর্বশেষ গত ২২ অক্টোবর টিপাইমুখ বাধ ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারতের ন্যাশানাল হাইড্রোইলেক্ট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (এনএইচপিসি),সাটলুজ জলবিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড (এসজেভিএন) এবং মনিপুর সরকারের মধ্যে বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার খবর বাংলাদেশের মিডিয়ায় এসেছে গত ১৯ নভেম্বর।এনএইচপিসি’র ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায় পরিকল্পনা অনুসারে ভারত সরকার অর্থ ছাড় করতে শুরু করলে মণিপুর রাজ্যের চারুচাদপুর জেলার বরাক নদীর উপর টিপাইমুখ নামক স্থানে ১৫০০ মেগাওয়াটের এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মাণ করতে সময় লাগবে ৮৭ মাস।(সূত্র:১)

মিডিয়ায় এখন এই খবরটিকে “হঠাৎ চুক্তি” হিসেবে আখ্যায়িত করে পরিবেশন করা হলেও এর আগে গত ১৩ মে,২০১০ সালে সাপ্তাহিক বুধবারে “টিপাইমুখ বাধ নির্মাণে আরো একধাপ অগ্রগতি: সরকার নিরব” শীর্ষক লেখায় এই তিনটি কোম্পানির মধ্যে গত ২৮ এপ্রিল ২০১০ সালে টিপাইমুখ বাধ নির্মাণের ব্যাপারে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিলো। সেময় বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো শাসক শ্রেণীর সাথে তাল মিলিয়ে গত ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারির বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ইস্তেহারে মনমোহন সিং এর দেয়া “বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কিছু করা হবেনা” জাতীয় ফাপা আশ্বাসের প্রচার চালাচ্ছিল, দেশের মানুষকে টিপাইমুখ বাধ নির্মাণের ধারবাহিক অগ্রগতি বিষয়টি জানতে দেয়নি- পাছে টিপাইমুখ বাধ ইস্যুটি ভারত-বাংলাদেশের ‘বন্ধুত্বের জোয়ার” এ বাধা হয়ে দাড়ায়!
২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ ইস্তেহারের আর্টিক্যাল ৩০ এ বলা হয়েছিলো: “ভারতীয় প্রধামন্ত্রী টিপাইমুখ প্রকল্পে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কোন পদক্ষেপ না নেয়ার আশ্বাস পূনর্ব্যক্ত করেছেন।” এরপর ২০১১ সালে মনমোহন সিং এর বাংলাদেশ সফরের সময় ঘোষিত যৌথ ইস্তেহারে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া মনমোহনের বক্তৃতায় একই “আশ্বাস” আবারও উচ্চারিত হয়। খেয়াল করার বিষয় এসব ঘোষণায় মনমোহণ কিন্তু কোথাও বলেননি, যে ভারত টিপাইমুখ বাধ নির্মাণ করবে না, বলেছে “বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হয়” এমন কিছু করবে না। এটা তো নতুন কোন কথা নয়, টিপাইমুখ বাধ নির্মাণের পরিকল্পনার শুরু থেকেই ভারতের বক্তব্য হলো এটা ভাটি অঞ্চলের আসাম-মণিপুর-মিজোরাম কিংবা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর তো নয়ই বরং এই বাধ নাকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে বাড়তি উপকার করবে। বাংলাদেশ এবং ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের টিপাইমুখ বাধ বিরোধীদের কাছে নদীর প্রবাহ, অববাহিকার কৃষি ও মৎস সহ গোটা পরিবেশের জন্য যে বাধ ক্ষতিকর, ভারতের কাছে তা রীতিমত “উপকারি”। ফলে ধারাবাহিক ভাবে ভারত বাধ নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে আর বলছে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হয় এমন কিছু টিপাইমুখে তারা করবে না। বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীও ভারতের এই ফাপা আশ্বাস জনগণের কাছে প্রচার করছে।

গত ২০০৯ সালে ভারতের টিপাইমুখ বাধ নির্মাণের তৎপরতার খবরে সারাদেশে তীব্র গণ-অসন্তোষের চাপে বাংলাদেশ থেকে একটি সংসদীয় প্রতিনিধিদল হেলিকপ্টারে করে টিপাইমুখ ঘুরে এসেও সেই একই আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছিলো। শুধু তাই না, সাম্প্রতিক বিনিয়োগ চুক্তির খবরের প্রতিক্রিয়ায় সেই প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য সাংসদ আবদুর রহমান ১৯ নভেম্বর ২০১১ বিবিসির কাছে বলেছেন: “প্রতিনিধি দলে আমাদের আমাদের কারিগরি কমিটি ছিল, তারাও সে জিনিসটি তাদের কাছ থেকে বুঝেছে যে ওখানে ড্যাম বা বাধ নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশ বরং উপকৃত হবে। কারণ বর্ষা মৌসুমে যখন পানি থাকবে, তখন বাংলাদেশ প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে রক্ষা পাবে এবং যখন শুস্ক মৌসুমে পানি থাকবে না, তখন বাংলাদেশ পানি সেখান থেকে পাবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ বরং রক্ষিতই হবে। ” দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে যারা টিপাইমুখ বাধ বিষয়ে তদন্ত করতে ভারত গিয়েছিলেন তারা নিজেরাও ভারতের সুরে সম্ভাব্য ক্ষতির হিসেবের বদলে উল্টো “উপকার” হওয়ার কথা বলছেন! যদিও তারা স্বীকার করেছেন ভারত “আরও সম্ভাব্যতা যাচাই এবং যৌথ সিদ্ধান্ত নেয়ার” প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। এখন যখন দেরীতে হলেও মিডিয়াতে আসলো যে ভারত টিপাইমুখ বাধের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তখনও বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক ভাবে কোন প্রতিবাদ করেনি, দিল্লীস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনার তারিক ই করিম এখনও তথ্য জানতে চাওয়ার পর্যায়ে রয়ে গেছেন, দেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বহি:প্রচার অনুবিভাগের মহাপরিচালক শামীম আহসানও “ভারতের সাথে যোগাযোগ” ও “বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া” পর্যায়ে থাকার কথা বলেছেন। অবশ্য কথিত তথ্য পাওয়ার আগেই ২৪ নভেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রী দিপু মণি বলেছেন: “টিপাইমুখ প্রকল্পে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না বলে নয়া দিল্লি যে নিশ্চয়তা দিয়েছে তাতে ঢাকা ‘আশ্বস্ত’ হয়েছে।“

টিপাইমুখ ইতিবৃত্ত:
আসামের কাছার অঞ্চলের মৌসুমি বন্যা প্রতিরোধের নামে মনিপুরের ২৭৫.৫০ বর্গকি.মি এলাকার ১৬টি গ্রাম পুরোপুরি ডুবিয়ে এবং আরও ৫১টি গ্র্রামকে আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ করে ৪০ হাজারেরও বেশী মানুষের জীবন জীবকা ও ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ধ্বংস করার পরিকল্পনা মনিপুরবাসী কখনই মেনে নেয়নি। ফলে মনিপুরের বরাক নদীর উপর বাধ নির্মানের স্থান ক্রমশই পরিবর্তিত হতে থাকে- ১৯৫৫ সালে ময়নাধর, ১৯৬৪ সালে নারায়নধর এবং তার পর ভুবন্দর এবং সবশেষে ১৯৮০’র দশকে তুইভাই এবং বরাকনদীর সংগম স্থলের ৫০০ মিটার ভাটিতে বাংলাদেশের অমলসিদ পয়েন্ট থেকে ২০০ কিমি দূরে টিপাইমুখে বাধ নির্মানের পরিকল্পনা করা হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো প্রথমে বাধটি ব্রম্মপুত্র ফ্লাড কনট্রোল বোর্ড বা বিএফসিবি’র আওতায় থাকলেও ১৯৮৫ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ১৯৯৯ সালে বাধটিকে নর্থ ইষ্টার্ণ ইলেক্ট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন বা নেপকো’র হাতে দিয়ে দেয়া হয়। (সূত্র:২) গত ২২ অক্টোবরের বিনিয়োগ চুক্তি থেকে দেখা যাচ্ছে এই বাধ নির্মাণের দ্বায়িত্ব এখন ভারতের ন্যাশানাল হাইড্রোইলেক্ট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (এনএইচপিসি),সাটলুজ জলবিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড (এসজেভিএন) এবং মনিপুর সরকারের জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে যেখানে এনএইচপিসি, এইচজিভিএন এবং মনিপুর সরকারের শেয়ার যথাক্রমে ৬৯%, ২৬% এবং ৫%। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী বাধের উচ্চতা ১৬৮.২ মিটার এবং বেইস লোড ফ্যাক্টর ২৬.৭৫% অর্থাৎ ১৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২৬.৭৫% বা ৪০১.২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সারা বছর ধরে পাওয়া যাবে যার মধ্যে মণিপুরের ভাগে পড়বে মাত্র ১২% বিদ্যূৎ অর্থাত ৪৮ মেগাওয়াট ।(সূত্র: ৩)ফলে মণিপুরবাসীকে যতই ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ এর মূলা ঝোলানো হউক না কেন, সারা বছর ধরে ৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের বিনিময়ে জল-জীবন-জীবিকা-পরিবেশ-সংস্কৃতি ধ্বংসের প্রকল্পের বিরুদ্ধে তামেলং ও চারুচাদপুরের হামার এবং জেলিয়াংরং নাগা আদিবাসী গোষ্ঠী সহ সংখ্যাগরিষ্ঠ মণিপুরবাসী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

ছবি:মানচিত্রে টিপাইমুখ বাধের অবস্থান, সূত্র: আইডব্লিউএম,২০০৫

জলবিদ্যুত, বন্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা সেচ প্রদান ইত্যাদি ঘোষিত উদ্দেশ্যের বাইরে রয়েছে বিশাল ও সম্পদশালী কিন্তু স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে অস্থিতিশীল উত্তরাঞ্চলের জলজ শক্তি, গ্যাস, ইউরোনিয়াম ইত্যাদির উপরে দেরী হয়ে যাওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একই সাথে সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সামরিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বাসনা। টিপাইমুখ বাধ সেই পরিকল্পনারই অংশ। মনিপুর বাসীর জন্য বিদ্যুত উৎপাদনের সুফলের কথা বলে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারী টিপাইমুখ বাধের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার এবং মনিপুর রাজ্য সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলেও খোদ মণিপুরবাসী সহ বাধের উজান এবং ভাটির উভয় অঞ্চলের জনগণের তীব্র বিরোধীতার মুখে এখনও নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারেনি। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর অধিনস্ত আধাসামরিক বাহিনী আসাম রাইফেলস বাধ রক্ষণাবেক্ষণের ঘোষণা দিলেও কাজ হয়নি। প্রতিরোধের মুখে ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই থেকে রাজ্য সরকার আইন পাশ করে টিপাইমুখ বাধের নির্মান কাজের প্রয়োজনে নির্মাণ সামগ্রী আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহ্রত মনবাহাদুর রোডের ৯৯ কিমি দূরত্বের প্রতি ৭ কিমি অন্তর সামরিক পোষ্ট স্থাপন করেছে। (সূত্র:৪)


বাংলাদেশের জলপ্রবাহ ও প্লাবনভূমির উপর প্রতিক্রিয়া:
নদীর বুকে বাঁধ দেয়া মানেই হলো নদীর চলন, নদী-খাত, জল প্রবাহের পরিমাণ ও ধরণ, পানির তাপমাত্রা, বহন করা পলি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদন, নদীর দুপাশের ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ, জীব-বৈচিত্র, গাছপালা-বনভূমি, নদীর উপর নির্ভরশীল দুপারের মানুষের জীবন-জীবিকা ইত্যাদির পরিবর্তন ঘটা। যেকারণে যে কোন বাধ দেয়ার আগে পরিবেশ ও জনজীবনের উপর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া যাচাই করার একটা রীতি তৈরী করা হয়েছে। সে রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বাঁধটি হবে কি হবে না। টিপাইমুখ বাঁধের ক্ষেত্রে ভারত সরকার সে রীতি অনুযায়ী বহুমুখী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেরএকটা এনভায়রনমেন্টাল ইমপেক্ট এসেসমেন্ট বা ইআইএ রিপোর্ট তৈরী করলেও মুশকিল হলো সে রিপোর্টে কেবল বাঁধের উপরের অংশে এবং তার আশপাশের নদী-অববাহিকার উপর কি প্রতিক্রিয়া পড়বে তা যাচাই বাছাইয়ের কথা বলা হয়েছে কিন্তু বাঁধের নিম্ন অববাহিকায় অবস্থিত বাংলাদেশের উপর কি প্রতিক্রিয়া হবে তার কোন সমীক্ষা সেখানে নেই। ইতোপূর্বে যৌথ নদীকমিশনের বৈঠকে বার বার প্রতিশ্রুতি দিলেও বরাবরের মতোই সেগুলোকে পাত্তা না দিয়ে ভারত এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের মোট জলপ্রবাহের উৎসের শতকরা ৯ ভাগ জল আসে যে বরাক নদী থেকে তার বুকে বিশাল বাধ নির্মাণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে। অবশ্য ভারতের এধরণের আচরণ নতুন নয়- বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে যৌথভাবে বয়ে যাওয়া ৫৪ টি নদীর মধ্যে ৪৮ টির উপরই বিভিন্ন ভাবে একতরফা হস্তক্ষেপ করে চলেছে ভারত যার মধ্যে গঙ্গার উপর নির্মিত ফারক্কা ব্যারেজের প্রতিক্রিয়া সর্বাপেক্ষা ভয়ংকর, যে ব্যারেজের মাধ্যমে গড়ে ৪০,০০০ কিউসেক বা ১১৩৩ কিউমেক পরিমাণ পানি বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই প্রত্যাহার করে ভগিরথি নদীতে চালনা করার ফলে উত্তারাঞ্চলের মরুকরণ করা হয়েছে।

১৯৭১ সালে এদেশের জনগণ যখন মুক্তিসংগ্রামে লড়ছে, ভারত তখন ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ সম্পন্ন করে এবং পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে এই ১০ দিনের জন্য ৩১১ কিউমেক থেকে ৪৫৩ কিউমেক পানি পরীক্ষা মূলক ভাবে প্রত্যাহারের কথা বলে বাস্তবে ১১৩৩ কিউমেক পানি প্রত্যাহার করতে শুরু করে এবং গঙ্গা থেকে এভাবে পানি প্রত্যাহার সেই যে শুরু হয়েছে এখনও তা চলছে। মাঝে ফারক্কা অভিমুখে ভাসানীর লঙ মার্চ হলো, জনগণের আন্দোলনের তাপে ও চাপে ১৯৭৭ সালের ১৯৭৭ সালের নভেম্বরে ৫ বছর মেয়াদী পানি চুক্তি হলো, সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে ১৯৮৫ নভেম্বরে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো এবং সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে ভারত বাংলাদেশ পানিবণ্টন চুক্তি হলো কিন্তু বাংলাদেশ কখনই তার প্রাপ্য পানিটুকু আর পায়নি (সূত্র:৫), গঙ্গা নদী বরাবর কমপক্ষে চারশত জায়গায় উত্তর প্রদেশ এবং বিহারে সেচ কাজের জন্য ফারক্কায় নদী আসার আগেই ২৫,০০০ কিউসেক থেকে ৪৫,০০০ কিউসেক পানি তুলে নেয় ভারত।(সূত্র:৬) শুধু গঙ্গা নয়, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, মনু, মহুরী, খোয়াই, গোমতী এই ৭টি নদীর ব্যাপারেও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবীর প্রতি কোন সন্মান রাখেনি ভারত। আর এখন এই টিপাইমুখ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা নদীর পানির নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়ার ভারতীয় পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের প্রতিক্রিয়ার মুখে ভারত বন্যা নিয়ন্ত্রণের নতুন মুলা ঝুলিয়েছে। বলা হচ্ছে বর্ষা মৌসুমে ১৫.৫ বিলিয়ন ঘনমিটারের জলাধারে বিপুল পরিমাণে "বাড়তি" পানি ধরে রাখার ফলে একদিকে যেমন বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বন্যার হাত থেকে "রক্ষা" পাবে অন্যাদিকে শুকনো মৌসুমে সেই জলাধারের সঞ্চয় থেকে পরিমাণ মত পানি নীচের দিকে প্রবাহিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে বরাক নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী পানি প্রবাহিত হবে ফলে ঐ অঞ্চল খরার হাত থেকে রক্ষা পাবে। এখন অতীতের সমস্ত অভিজ্ঞতা ভুলে গিয়ে আমরা যদি ধরেও নেই ভারত তার কথা মতই কাজ করবে, তাহলে যে প্রশ্ন উঠে আসে তা হলো, ভারতের প্রতিশ্রুতি মতো এভাবে মাগনা "বন্যানিয়ন্ত্রণের" প্রতিক্রিয়া কি হবে, ভরা মৌসুমে নদীতে পানি কম থাকা আর শুকনা মৌসুমে পানি বেশী থাকলে সেটা জল-জীবন-পরিবেশের জন্য কি ভালো না খারাপ?


ছবি:মানচিত্রে সুরমা-কুশিয়ারা-বরাক অববাহিকা, সূত্র: আইডব্লিউএম,২০০৫

ভারত পানি বাড়া কমার কথা বললেও বাংলাদেশ কখন কোথায় কতটুকু পানি পাবে এবং কিভাবে পাবে তার কোন হিসাব আমাদেরকে দেখায় নি। ইনটিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং এর তিনজন গবেষক ভারতের পরিকলনা অনুসরণ করে এই পানির পরিমাণ বাড়া-কমার একটা হিসাব বের করেছে এবং তার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াও নিরুপন করার চেষ্টা চালিয়েছে। আমরা এই গবেষণা রিপোর্ট এবং বন্য ও নদী-নদী বিষয়ক জনগণের জ্ঞানকে সম্বল করে সেই পানি বাড়া কমার পরিমাণ ও তার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার একটা হিসেব হাজির করতে পারি (সূত্র:৭):

বর্ষামৌসুমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ?
টিপাইমুখ বাধ যখন পূর্ণ কার্যক্ষম থাকবে তখন বরাক নদী থেকে অমলসিধ পয়েন্টে সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা নদীর দিকে পানি প্রবাহ জুন মাসে ১০%, জুলাই মাসে ২৩%, আগষ্ট মাসে ১৬% এবং সেপ্টেম্বর মাসে ১৫% কমে যাবে। কুশিয়ারা নদীর পানির উচ্চতা অমলসিধ স্টেশনে কমবে জুলাই মাসের দিকে গড়ে ১ মিটারেরও বেশী আর ফেঞ্চুগঞ্জ, শেরপুর ও মারকুলি স্টেশনে কমবে যথাক্রমে ০.২৫ মিটার, ০.১৫ মিটার এবং ০.১ মিটার করে। অন্যদিকে একই সময়ে সুরমা নদীর পানির উচতা সিলেট এবং কানাইয়ের ঘাট স্টেশনে কমবে যথাক্রমে ০.২৫ মিটার এবং ০.৭৫ মিটার করে।


এভাবে স্বাভাবিক ও কাংখিত বন্যার পানির পরিমাণ উল্ল্যেখযোগ্য পরিমান কমাতে পারলেও ভারতের পরিকল্পনা মতো টিপাইমুখ বাধের জলাধার এত পানি ধরে রাখতে পারবে না যে ৫ বা ১০ বা ২০ বছর পর পর যে ভীষণ বন্যা হয় তার পানির উচ্চতা উল্ল্যেখ যোগ্য পরিমানে কমে যাবে।

এরকমটি কেন ঘটবে? আসলে একটা বহুমুখী বাঁধকে কার্যকর এবং ফলপ্রসুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেকগুলো পরস্পর বিরোধী কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হয়। যেমন: যদি কার্যকর বন্য নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তবে বর্ষার শুরুতে বাঁধের জলাধারের পানির পরিমাণ রাখতে হবে সর্বনিম্ন, যেন পরিবর্তীতে পুরো বর্ষা জুড়ে যে অতিরিক্ত পানি উজান থেকে প্রবাহিত হবে তা ধরে রাখার মত যথেষ্ট জায়গা জলাধারে থাকে। আর তাই যদি হয়, তবে ঐ সময়ে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উতপাদন করা যাবে না কেননা সর্বোচ্চ বিদ্যূৎ উৎপাদনের জন্য জলাধারে পানির উচ্চতাও সর্বোচ্চ রাখা দরকার। আর তা করতে গেলে আবার বর্ষার শুরু থেকে বাঁধের জলাধারে বেশী পানি ধরে রাখতে হবে ফলে অতিবৃষ্টি বা ঢল নামলে তখন আর সেই বিপুল বাড়তি জলরাশি ধরে রাখার মতো জায়গা থাকবে না। অতিবৃষ্টি বা ঢলের পানির হাত থেকে বাঁধকে বাচাতে হলে তড়িঘড়ি করে বাধের স্পিল ওয়ে গেট খুলে দিতে হবে। ২০০০ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল হঠাৎ করে বন্যায় ডুবে যায়। এই হঠাৎ বন্যার পানির উৎস ছিল পশ্চিম বঙ্গের বেশ কিছু বাঁধ, যেগুলোর ধারণ ক্ষমতা অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার কারণে পানি ছেড়ে দিতে হয়েছিল ভাটির দিকে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গাতেই এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে। যেমন: ১৯৮৩ এর এল নিনোর সময়, আবাহাওয়া পূর্বাভাসে রকিমাউন্টেনের ঝর্ণার ঢল নামার ব্যাপারটি সময় থাকতে ধরতে পারেনি। কলরাডো নদীর বাধগুলোতে তখন বাধ পরিচালনাকারী অন্যান্য সময়ের মতোই সর্বোচ্চ পানি ধরে রাখে। ফলে যখন ঢল নামতে শুরু করে তখন ঢলের বাড়তি পানি ধরে রাখার কোন উপায় ছিল না- পানি বাঁধকে বাইপাস করে স্পিলওয়ে দিয়ে নামতে শুরু করলেও বাঁধের উপর প্রচন্ড চাপ পড়ে। অ্যারিজোনার গ্লেন ক্যানিয়ন বাঁধের পাথরের একটা বড় অংশ তখন বন্যার পানির প্রবাহে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যায়।(সূত্র: ড: এম মনিরুল কাদের মির্জা,নিউএজ,৫ অগাষ্ট, ২০০৯)

টিপাইমুখ বাঁধ যে অঞ্চলে অবস্থিত ভারতের সেই উত্তর-পূর্বাঞ্চল দীর্ঘ বর্ষাকাল এবং প্রবল বৃষ্টিপাতের জন্য বিখ্যাত। ফলে বাঁধ পরিবর্তী পর্যায়ে এধরণের ঘটা খুবই স্বাভাবিক। IWM এর বিশ্লেষণে দেখা যায় প্রতি ১০ বছরে একবার আসে এরকম বড় বন্যার পানি অমলসিদ পয়েন্টে কমাতে পারবে মাত্র ১৩% (যার ফলে পানির উচ্চতা কমবে মাত্র ০.৫ মিটার) কিংবা প্রতি ২০ বছরে একবার আসে এরকম বন্যার ক্ষেত্রে মাত্র ৩% (যার ফলে পানির উচ্চতা কমবে মাত্র ০.১১ মিটার) যেখানে স্বাভাবিক গড়পরতা বন্যার ক্ষেত্রে এ পানি হ্রাসের হার হলো ২৩ থেকে ২৭% (যার ফলে উচতা কমবে ১ থেকে ১.২৫ মিটার) ।


এভাবে প্রয়োজনীয় বন্যার পানি অতিরিক্ত কমিয়ে দেয়া কিন্তু অপ্রয়োজনীয় এবং ভয়ংকর বন্যার বেলায় কার্যকর ভূমিকা না রাখার ফলে:

## এ অঞ্চলের প্লাবনভূমির প্লাবনের ধরণ, মৌসুম এবং প্লাবিত হওয়ার পরিমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্ষা মৌসুমে সুরমা ও কুশিয়ারার প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ শুষ্ক করার ফলে কমপক্ষে ৭ টি জেলা- সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার ধান উতপাদন ব্যাহত হবে- যে জেলাগুলোতে দেশের উল্ল্যেখযোগ্য পরিমাণ ধান উতপাদন হয়।(সূত্র:৮) এর মধ্যে সিলেট ও মৌলভীবাজার এলাকাতেই প্লাবনভূমির পরিমাণ কমে যাবে যথাক্রমে ৩০,১২৩ হেক্টর(২৬% ) এবং ৫,২২০ হেক্টর( ১১% )।

## বাধ নির্মাণের পর থেকে সুরমা-কুশিয়ারার উজানের ৭১% এলাকাই আর স্বাভাবিক মৌসুমে জলমগ্ন হবে না। কুশিয়ারা নদী প্রায় ৬৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তার ডান পাশের প্লাবনভূমি হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

## শুকনো মৌসুমে কুশিয়ার বাম তীরে কুশিয়ারা-বরদাল হাওর পুরোপুরি শুকিয়ে যাবে। কাউয়ার দিঘী হাওর এর ২,৯৭৯ হেক্টর(২৬% )জলাভূমি হারাবে।


নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ থেকে এভাবে পানি সরিয়ে নেয়ার ফলে পানি প্রবাহের পরিমাণগত পরিবর্তনের সাথে সাথে গুণগত পরিবর্তন ঘটবে, বহন করা পলির পরিবহন এবং নদীর তলায় জমা পলির বৈশিষ্ট পাল্টে যাবে এবং এর ফলে অবশেষে সমগ্র পরিবেশের বাস্তুসংস্থানই পাল্টে যাবে। আর সুরমা-কুশিয়ারা নদী প্রবাহ তার বিশাল প্লাবনভূমির সাথে সংযোগ তো হারাবেই, সেই সাথে সেই প্লাবন ভূমিও একসময় নেই হয়ে যাবে, মৎস-জীববিদরা যে ঘটনাকে বলে থাকেন "প্লাবন নদী" থেকে "জলাধার নদীতে" পরিণত হওয়া। প্লাবনভূমির পরিমাণ এবং গভীর জলাবদ্ধ জমি থেকে অগভীর জলাবদ্ধ জমিতে পরিণত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম সম্পদ হাওর-বাওড়’গুলো ধ্বংস হয়ে যাবে।
নদীর পানির বাড়া-কমার একটা প্রাকৃতিক ছন্দ থাকে। ইকোলজিষ্ট পিটার বেইলির(Peter Bayle) ভাষায় এ হলো ফ্লাড-পাল্স (Flood-Pulse)। এই ফ্লাড-পাল্স বা বন্যার স্পন্দনই হলো নদী ও নদী-অববাহিকা অঞ্চলের বাড়তি উৎপাদনশীলতা ও জৈব-বৈচিত্রের আসল কারণ। এর কারণেই সাগরের তুলনায় প্রতি একক ক্ষেত্রফল এলাকার প্লাবনভূমিতে গাছ-গাছালির বৈচিত্র্য থাকে ৬৫ গুণ বেশি। পিটার বেইলির হিসেব কষেছেন,অববাহিকা সমৃদ্ধ নদীতে অববাহিকা বিহীন নদীর তুলনায় মাছ উৎপাদন হয় ১০০গুণ বেশি এবং লেক বা জলাধারের তুলনায় এর পরিমাণ প্রতি হেক্টরে ৪গুণ। ফলে বোঝাই যায় যে, বার্ষিক পানি বাড়া-কমার প্রাকৃতিক চক্রের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখেই নদী এবং তার অববাহিকা অঞ্চলের ইকোসিস্টেম বা বাস্তসংস্থান গড়ে উঠে। কাজেই নদী ও নদী-অববাহিকার এই পারস্পরিক সম্পর্ক টিকে থাকার উপরই নদীর প্রজাতি বৈচিত্রের টিকে থাকা নির্ভর করে। ম্যাট্রিক ম্যাককালির(Matrick McCulli)ভাষায়:

" অসংখ্য জলজ প্রজাতি তাদের প্রজনন, বাচ্চা জন্মদান, মাইগ্রেশান সহ জীবন চক্রের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর ব্যাপারে ঋতুগত খরা কিংবা পানি ও পুষ্টির স্পন্দনের উপর নির্ভর করে। বাৎসরিক বন্যার ফলে জলাভূমিতে কেবল পানিই জমে না, সেই সাথে জমা হয় প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। সেই সাথে গেরস্থালি ও বন্য পশুপাখির জৈব বর্জ্য নদীতে ভেসে গিয়ে নদীকে সমৃদ্ধ করে। বন্যার ফলে নদী থেকে মাছের ডিম এবং পোনা জলাভূমিতে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং ডিম ফুটে ও পোনা বড় হয়ে পরবর্তি বন্যার সময় নদীতে ফিরে যায়।"

বন্যা-বাহিত পলির ব্যাপারটিও মাথায় রাখা দরকার। বর্ষা মৌসুমে নদী তো কেবল পানিই বহন করে না, ক্ষয়িষ্ণু দুই তীর এবং নদী বক্ষ থেকে কেটে নেয়া ক্ষুদ্র-বৃহৎ কঠিন পদার্থও বহন করে চলে, যার একটা বড় অংশই হলো পলি। পলি বহন করতে থাকা নদী যখন বর্ষা মৌসুমে দুই তীর প্লাবিত করে অববাহিকায় ঢুকে পড়ে তখন নদীর উপরের স্তরে থাকা কাদা ও হিউমাস জমিতে থিতু হয়ে জমিকে উর্বর করে তুলে। এভাবে হাজার বছর ধরে চলে আসা প্রক্রিয়াকে আমাদের দেশের চাষীরা উপকারী বলেই মনে করে আসছে। এখন নদীর বুকে বাধ দিয়ে বর্ষা মৌসুমে নদীর স্বাভাবিক পানি কমিয়ে দিয়ে নদীকে যদি তার খাতের মধ্যেই ধরে রাখা হয় তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই নদীর দু'কুলের প্লাবনভূমি নদীর বহন করে আনা পলি থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্রমশ অনুর্বর হতে থাকবে কৃষকের উপর যার প্রতিক্রিয়া হবে দ্বিবিধ: প্রথমত, প্লাবন অববাহিকার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ভীষণ রকম হ্রাস পাবে এবং দ্বিতীয়ত, এই ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে কৃষক বাধ্য হবে জমিতে আরো বেশি পরিমাণ রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে যা সার্বিক বিচারে আর্থসামাজিক এবং পরিবেশগত বিচারে পুরো পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে ।
অন্যদিকে এই অতিরিক্ত পলি নদীর বুকে জমা হয়ে নদীকে ক্রমশ অগভীর করে তুলবে। ফলে কোন সময়ে যদি বরাক নদীর উৎস স্থলে অত্যধিক বৃষ্টিপাত হয় কিংবা অন্যান্য কারণে হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নামে এবং সেই বাড়তি পানির চাপ থেকে বাধকে বাচানোর জন্য যদি হঠাৎ বাধের স্পিলওয়ে খুলে দিতে হয় তাহলে ক্রমশ অগভীর নদী সেই অতিরিক্ত পানি বহন করতে না পেরে ভীষণ প্লাবনে দুকুল ভাসিয়ে দেবে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল শিক্ষক ড. জহির বিন আলমের ভাষায়:

".......হয়তো বাঁধটি বর্ষার স্বাভাবিক বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু যখন পানির উচ্চতা আসলেই ভয়ংকর রকম বেড়ে যাবে তখন কিন্তু খোদ বাঁধটিকে বাচানোর জন্যই বাধের গেটগুলো খুলে দিতে হবে।যার ফলে নদীর নিম্ন অববাহিকায় আরো বড় ধরনের বন্যা হবে।"(সূত্র:৯)

শুকনা মৌসুমে বাড়তি পানি?
ভারত যদি তার কথা মত কাজ করে তাহলে IWM এর হিসেব মত সাধারণ ভাবে শুকনো মৌসুমে অমলসিধ পয়েন্টে বরাক নদীর পানিপ্রবাহ ১২১% বাড়বে এবং এর ফলে নদীর উচ্চতা বাড়বে ১.৪৮ মিটার। সবচেয়ে বেশি পানি বাড়বে জানুয়ারী মাসে যখন গড় পানিপ্রবাহ ২২২ কিউমেক বা কিউবিক মিটার/সেকেন্ড (৯৯%) বাড়বে এবং উচ্চতা বাড়বে ২.০৯ মিটার। তবে ফেব্রুয়ারী ও মার্চে পানি প্রবাহ জানুয়ারীর মত এত বেশী বৃদ্ধি না পেলেও মোটামুটি ভাবে যথাক্রমে ১৬০ কিউমেক এবং ৫৫ কিউমেক করে বাড়বে।
কিন্তু ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সালের সময়টাতে যেমন পরপর তিনটা ভীষণ শুকনো মৌসুম এসেছিল, সেরকম পরপর শুকনো মৌসুমের বেলায় প্রথম মৌসুমে বাড়তি পানি সর্বরাহ করতে পারলেও দ্বিতীয় মৌসুমে পূর্ব মৌসুমের পানি স্বল্পতার প্রভাবে জলাধারে এমন পরিমাণ পানি থাকবে না যে বাড়তি পানি সর্বরাহ করা যাবে, জলাধারে পানির উচ্চতা একটি নির্দিষ্ট মাত্রার নীচে নেমে গেলে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পানির চাপ পাওয়া যাবে না। এরকম পরিস্থিতিতে মার্চ-এপ্রিল মাসে পানির পরিমাণ মারাত্মক কমে যেতে পারে। অমলসিধ পয়েন্টে মার্চ ও এপ্রিল মাসে যথাক্রমে মাত্র ৩৮ কিউমেক এবং ২৪৪ কিউমেক পানি পাওয়া যাবে যা বাধ-পূর্ব পরিস্থিতিতে প্রাপ্য পানির যথাক্রমে মাত্র ৭৪% এবং ২২% ।

আমরা এ আশংকা বাদ দিয়ে যদি ধরেও নেই ভারতের কথা মত শুকনো মৌসুমে অমলসিদ পয়েন্টে ১২১% পানি বাড়বে, সেটা কি হাওর অঞ্চলের জন্য মঙ্গল জনক হবে? বছরে বেশির ভাগ সময় পানির নীচে থাকা ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের হাওর অঞ্চলের উপর কিন্তু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ কোটি লোকের জীবিকা নির্ভরশীল। এ অঞ্চলের লোকজন জীবিকার জন্য মূলত মাছ ধরে এবং শুকনো মৌসুমে কৃষিকাজ করে। শুকনো মৌসুমে কৃষিকাজ বলতে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান চাষ। হাওর অঞ্চল ছাড়া এই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় তেমন কোন ধান চাষ করা যায় না। যেকারণে আশুগঞ্জ, ভৈরব এবং অন্যান্য অঞ্চলের চাল-কলগুলো ধানের জন্য এ অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল। শুকনো মৌসুমে যখন হাওরের পানি কমে যায় তখন তারা বোর আবাদ করে আর বর্ষা আসার আগেই সে ফসল ঘরে তোলে। বর্ষায় পলি জমে উর্বর হাওরের বুকে তখন সহজেই বোরর বাম্পার ফলন ঘটে। এখন টিপাইমুখ বাধের ফলে শুকনো মৌসুমেও যদি ভারতের "বদান্যতায়" হাওর অঞ্চল পানিতে পূর্ণ থাকে তাহলে কৃষক আগের মত আর বোর ধান আবাদ করতে পারবে না।(সূত্র:১০)

ফুলেরতল ব্যারেজের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার:
যে শুকলা কমিশনের(Shukla Commission) এর কারিগরি পরামর্শ মতে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই একই কমিশনের আরেকটা সুপারিশ ছিল টিপাইমুখ থেকে ৯৫ কিমি ভাটিতে ফুলের তলে একটা ব্যারেজ নির্মাণ করা যার মাধ্যমে আসামের কাছার অঞ্চলে সেচ প্রদান করা হবে।

ছবি:মানচিত্রে প্রস্তাবিত ফুলের তল ব্যারেজের অবস্থান, সূত্র: আইডব্লিউএম,২০০৫

ফারাক্কা ব্যারেজের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জনগণ খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারছে ফুলেরতল ব্যারেজের প্রতিক্রিয়া কি হবে কিন্তু ভারত বরাবরই ফুলের তল ব্যারেজ নির্মাণের কথা অস্বীকার করে আসছে। আমরা পরিস্কার বলতে চাই বরাবরের মতোই এটাও ভারতের স্রেফ ভাওতাবাজি, ফুলেরতলে ব্যারেজ নির্মাণের পরিকলনা রয়েছে বলেই টিপাইমুখ বাধের এনভাইরনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বা ইআইএ রিপোর্টের ১ম অধ্যায়েই বলা হচ্ছে:

“There is a proposal to construct a pick-up barrage at Fulertal, 95 km down stream of dam site, which will act as diurnal storage of 1120 cumec inclusive of power release to irrigate subsequently a gross command area of 1,20,337 ha.”(সূত্র:১১)

অর্থাৎ ফুলেরতল ব্যারেজ বরাক নদী থেকে প্রয়োজন হলে প্রতি সেকেন্ডে ১১২০ ঘনমিটার পানি প্রত্যাহার করতে পারবে। এখানে উল্ল্যেখ করা দরকার ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে ভারত প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ ১১৩৩ ঘনমিটার পানি ভাগিরথী নদীতে সরিয়ে নেয় অর্থাৎ ফুলের তল ব্যারেজ তৈরী হলে তা থেকে ফারক্কার প্রায় সমপরিমাণ পানি প্রত্যাহার করতে পারবে ভারত। এখন দেখা যাক, এই পরিমাণ পানি বরাক নদীর বর্ষাকালীন পানির ঠিক কত অংশ:

ইআইএ রিপোর্টের ৩য় অধ্যায়ের টেবিল ৩.১৬ অনুসারে, ভরা মৌসুমে আসামের লক্ষিপুরে বরাকনদীর পানি প্রবাহের নিরাপদ পরিমাণ হলো ২৭৬০ কিউমেক এবং বদরপুর ঘাটের কাছে (অমলসিধ থেকে ১০ কিমি আগের স্থান) এর পরিমাণ ৩৪৪০ কিউমেক। এই ডাটা থেকে দেখা যায়, পুরোপুরি কার্যক্ষম থাকলে, ফুলের তল ব্যারেজের মাধ্যমে লক্ষীপুর অঞ্চলের কাছে বরাক নদী থেকে ৪১% এবং বদরপুরঘাটের কাছ থেকে ৩৩% পানি প্রত্যাহার করে নেয়া সম্ভব।

অন্যাদিকে শুকনো মৌসুমে বরাক নদীর প্রবাহের পরিমাণ গড়ে ১৭৫ থেকে ২৫০ কিউমেক। ভারতের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক শুকনা মৌসুমে যদি পানির পরিমাণ বেড়ে এমনকি যদি ৫০০ কিউমেকও হয় তাহলেও পুরো কার্যক্ষম ফুলেরতল ব্যারেজ বরাক নদীকে একেবারে পানিশূণ্য করে দিতে সক্ষম হবে যার ফলে শুকনো মৌসুমে এমনও হতে পারে যে বাংলাদেশ হয়তো ১ ফোটা পানিও পাবে না!

বাঁধের জলাধারের প্রভাবে ভূমিকম্প প্রবণতার বৃদ্ধি:
বাধের জলাধারে যে বিপুল পরিমাণে পানি জমা করা হয়, বাঁধের ভিত্তি ভূমি এবং এর আশপাশের শিলাস্তরের উপর তার চাপের পরিমাণও হয় ব্যাপক। অল্প একটু অঞ্চলে এই বিপুল চাপ পড়ার কারণে সে চাপ ইতোমধ্যেই ঐ অঞ্চলে থাকা শিলাস্তরের ফাটলকে সক্রিয় করে তুলতে পারে। এই ঘটনাটি কখনও তাৎক্ষণিক ভাবে বাঁধ চালু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে কিংবা শুকনো ও ভরা মৌসুমে চাপের কম বেশী হতে হতে বাঁধ চালুর অনেক পরেও হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় মাটির নীচের সচ্ছিদ্র শিলাস্তরের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা পানির যে চাপ(porous pressure) থাকে তা বাঁধের পানির ভারে এবং শিলাস্তরে চুইয়ে যাওয়া বাড়তি পানির প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এ porous pressure বেড়ে যাওয়া ছাড়াও বাড়তি পানির রাসায়নিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কারণেও ফাটলের দুদিকের শিলাস্তর যা এমনিতেই টেকটোনিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কারণে পরস্পর থেকে দুরে সরে যেতে চায় কিন্তু পরস্পরের মধ্যকার ঘর্ষনের শক্তির কারণে একত্রিতই থাকে, সেটা এবার আর বাড়তি চাপ সহ্য করতে না পেরে চ্যূতি বা স্লিপ-স্ট্রাইকের সৃষ্টি করে- ফলে ভূমিকম্পের কেন্দ্র সৃষ্টি হয়ে সেখান থেকে ভূমিকম্প চারিদিকে ছড়িয়ে পরে। জলাধারের প্রভাবে এভাবে কোন অঞ্চলে ভূমিকম্প প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে বলা হয় Reservoir Induced Seismicity( RIS) (সূত্র:১২)। এভাবে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রথম নজরে আসে ১৯৩২ সালে আলজেরিয়ার “কুয়েড ফড্ডা” বাধের ক্ষেত্রে। পরবর্তিতে এ পযন্ত বিশ্বের বিভিন্ন ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে এধরনের বাঁধের সাথে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ার নজির পাওয়া গেছে কমপক্ষে ৭০টি।
ভারতের কাছে বিষয়টি অজনা থাকার কথা নয় কেননা এ যাবত কালে বিশ্বের সবচেয়ে তীব্র মাত্রার জলাধার প্রভাবিত ভূমিকম্প(RIS) হয়েছে খোদ ভারতের মহারাষ্ট্রের কয়না বাধের কারণে। ১৯৬৭ সালের ১১ ডিসেম্বর ঘটা ৬.৩ মাত্রার এই ভূমিকম্পটি এমনকি তার কেন্দ্র থেকে ২৩০ কিমি দূরেও তীব্র আঘাত হেনেছিল ।(সূত্র: ১৩)

এতসব জেনেশুনেও ভারত যে জায়গায় টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করছে সেটা হলো সারা দুনিয়ার মধ্যে ছয়টা ভয়ংকর ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মধ্যে একটা- উত্তর-পূর্ব ভারত ছাড়া অন্যান্য অঞ্চলগুলো হলো হলো ক্যালিফর্নিয়া,জাপান, মেক্সিকো, তুরস্ক ও তাইওয়ান। টিপাইমুখ বাঁধের ১০০-২০০ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে গত ১০০-২০০ বছরে পাঁচ মাত্রা বা তারও বেশী মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে ১০০’রও বেশী। দেখা গেছে ১৫০ বছরের মধ্যে টিপাইমুখের ১০০ কি.মি ব্যাসার্ধের মধ্যে ৭+ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে ২টি এবং এর মধ্যে একটি তো হয়েছে ১৯৫৭ সালে টিপাইমুখ থেকে মাত্র ৭৫ কি.মি দুরে।১৪ এ অঞ্চলটিতে এত বেশী ভূমিকম্পের কারণ হলো অঞ্চলটি যে সুরমা-গ্রুপ শিলাস্তর দ্বারা গঠিত তার বৈশিষ্টই হলো অসংখ্য ফাটল আর চ্যুতি। পুরো বরাক অববাহিকা এলাকাটিতেই রয়েছে অসংখ্য ফল্ট লাইন যা ঐ এলাকার নদী এবং শাখা নদীগুলোর গতি প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধের একেবারে অক্ষ বা axis টিই অবস্থিত হলো বহুল পরিচিত তাইথু(Taithu) ফল্টের উপর অবস্থিত যা সম্ভাব্য ক্রিয়াশীল একটি ফল্ট এবং ভবিষ্যতের যে কোন ভূমিকম্পের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
লেখা দীর্ঘ হয়ে যাওয়ায় বাকিটা মন্তব্য আকারে নীচে দেয়া হলো]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29489972 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29489972 2011-11-25 01:36:21
খোলা চিঠিঃ পারমাণবিক শক্তির বদলে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করুন: বিশ্বনেতৃবৃন্দের প্রতি শান্তিতে নোবেল বিজয়ীগণ প্রতি: বিশ্ব নেতৃবৃন্দ
প্রেরক: শান্তিতে নোবেল বিজয়ীগণ

পারমাণবিক শক্তির বদলে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করুন: বিশ্বনেতৃবৃন্দের প্রতি শান্তিতে নোবেল বিজয়ীগণ

চেরনোবিলের পারমাণবিক বিস্ফোরণের ২৫ বছর পূর্তিতে এবং জাপানে প্রলয়ঙ্করি ভূমিকম্প ও সুনামির প্রায় ২ মাস পরে আমরা নিম্ন স্বাক্ষরকারী শান্তিতে নোবেল বিজেতারা আপনাদের প্রতি নিরাপদ ও অধিকতর শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়তে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগের আহবান জানাই। পারমাণবিক শক্তি যে পরিস্কার, নিরাপদ ও সুলভ নয়- সেই ঘোষণা দেয়ার এটাই উৎকৃষ্ট সময়।

আমরা গভীরভাবে উৎকন্ঠিত যে, ফুকুশিমা পারমাণবিক চুল্লী বিস্ফোরণের ফলে বাতাসে-পানিতে-খাদ্যে তেজস্ক্রিয়তার বিকিরণে জাপানের জনগণের জীবন ভয়ঙ্কর বিপদের সম্মুখীন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বিশ্ব যদি তার বর্তমান পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বন্ধ করে দেয় তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সর্বত্র এবং এই জাপানী জনগণ যারা ইতোমধ্যেই অনেক ভুগেছে, শান্তিতে ও নিরাপদে বাঁচতে পারবে।

চেরনোবিলের লিকুইডেটর (যিনি সাইট ক্লিন করার কাজে সহায়তা করেন) মাইকোলা ইসায়েভ বলেছেন, "কিছু লোক দাবী করছে- চেরনোবিলের ২৫ বছর পরে অনেক কিছুই আগের তুলনায় উন্নততর হয়েছে। কিন্তু আমি এর সাথে একমত নই। আমাদের শিশুরা কন্টামিনেটেড খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে।" ইসায়েভ বলেন- জাপানে বর্তমানে কর্মরত লিকুইডেটরদের অবস্থাও তারই মত। সম্ভবত তারা এখনও তার মত নিউক্লিয়ার শক্তির নিরাপত্তা নিয়া খুব বেশী প্রশ্ন করেন নি।

জাপানের উত্তর-পূর্ব সমুদ্র দিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী সুনামির আঘাত হানা শহর কেসেনুমা'র একজন দোকানদারের কথা গোচরে আনুন: "ঐ তেজস্ক্রিয়তা জিনিসটা চরম বীভিষিকাময়। এটা সুনামির চাইতেও ভয়ঙ্কর। সুনামি তুমি চোখে দেখতে পারবে। কিন্তু এটা তুমি দেখতেও পারবে না।"

নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে ফুকুশিমার মতো এহেন পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা আবার আরেকটি দেশে হানা দিতে পারে- যেমন করে হানা দিয়েছিল ইউক্রেনের (সাবেক ইউএসএসআর) চেরনোবিলে (১৯৮৬), যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইল আইল্যান্ডে (১৯৭৯) এবং যুক্তরাজ্যের উইন্ডস্কেল/ সেলফিল্ডে (১৯৫৭)। কেবল ভূমিকম্প বা সুনামির মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেই নয় মানুষের ভুলে বা অবহেলায়ও পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটতে এবং এমন ফল বয়ে আনতে পারে। নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টে সন্ত্রাসী হামলাও ভয়ঙ্কর ফল বয়ে আনতে পারে, এহেন সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না এবং আমরা আতঙ্কিত।

কিন্তু এই তেজস্ক্রিয়তার বিকিরণ কেবল পারমাণবিক দুর্ঘটনারই বিষয় বা ফল নয়। পারমাণবিক জ্বালানির প্রতিটি ধাপই তেজস্ক্রিয়তা বিকিরণ করে, ইউরেনিয়াম খনন থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত, এমনকি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তা চলতে থাকে- কেননা পারমাণবিক বর্জ্যে থাকে প্লুটোনিয়াম যা হাজার বছর ধরে টক্সিক হিসাবে বিরাজ করে। পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকারী দেশগুলোর (যুক্তরাষ্ট্র সহ) বছরের পর বছর গবেষণার পরেও আজো নিঃশেষিত পারমাণবিক জ্বালানি তথা পারমাণবিক বর্জ্যের নিরাপদ ও ঝুঁকিহীন মজুদ করার উপায় আবিস্কার করা সম্ভব হয় নি। বরঞ্চ দুনিয়ার বুকে প্রতিদিন আরো নিঃশেষিত জ্বালানি জমা হচ্ছে।

পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি যে পারমাণবিক অস্ত্রের কাঁচামাল যোগায়- এই ঘটনাটা পারমাণবিক শক্তির অনুসারীরা অস্বীকার করেন। আসলে- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীর ব্যাপারে এটাই প্রকৃত বিষয়। পারমাণবিক শিল্প পারমাণবিক শক্তির বিস্তার ঘটানোর সময় যতই এই হুমকিকে অস্বীকার করুক না কেন, বিষয়টা না-ই হয়ে যায় না- কেননা এটা দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়।

পারমাণবিক বাণিজ্যের নির্মম অর্থনৈতিক সত্যটাও আমাদের অবশ্যই মুখোমুখি হতে হবে। পারমাণবিক শক্তি উন্মুক্ত বাজারে অন্যান্য শক্তির সাথে প্রতিযোগিতা করে না- কেননা এটা করা যায় না। পারমাণবিক শক্তি প্রচণ্ড ব্যয়বহুল যা সাধারণভাবে করদাতাদের অর্থ থেকেই ব্যয়িত হয়। পারমাণবিক শিল্পকে চলতে হয় ব্যাপক সরকারী ভর্তুকিতে তথা জনগণের ট্যাক্সের পয়সায়। আমরা জনগণের এই অর্থ শক্তির নতুন উৎসের পেছনে দায়িত্বশীলভাবে লাগাতে পারি।

বর্তমানে দুনিয়ায় ৪০০ এরও বেশী পারমাণবিক শক্তি প্ল্যান্ট আছে- যার অনেকগুলিরই অবস্থান প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা আছে এমন এলাকায় অথবা রাজনৈতিকভাবে প্রচণ্ড অস্থিতিশীল দেশে। এই প্ল্যান্টগুলো দুনিয়ার মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের ৭% এরও কম শক্তি উৎপাদন করে। বিশ্বনেতা হিসাবে আপনারা একত্রে কাজ করতে পারেন যাতে অন্য খুব নিরাপদ, সাশ্রয়ী শক্তি উৎস দিয়ে এই সামান্য পারমাণবিক শক্তিকে প্রতিস্থাপন করা যায় এবং এভাবে সকলের জন্য একটি কার্বন-মুক্ত ও পারমাণবিক শক্তি মুক্ত সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়া যায়।

আমরা জাপানের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ থামিয়ে দিতে পারবো না, কিন্তু আমরা একত্রে আমাদের শক্তির উৎসের জন্য আরো ভালো, নিরাপদ প্রক্রিয়া বাছাই করতে পারি।

আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি ও পারমাণবিক জ্বালানি সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে পরিস্কার-শক্তি-বিপ্লবের (clean energy revolution) জন্য বিনিয়োগ করতে পারি। এটা ইতোমধ্যেই অগ্রসরমান। গোটা বিশ্বে গত ৫ বছরে বায়ু ও সৌর শক্তি থেকে পারমাণবিক শক্তির তুলনায় অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। ২০১০ সালে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তি উৎস থেকে গোটা দুনিয়ায় আয় বেড়েছে ৩৫%। এসব নবায়নযোগ্য শক্তিখাতে বিনিয়োগে কর্মসংস্থানও বাড়বে।

নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসসমূহ একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য অন্যতম নিয়ামক। আর সে কারণেই গোটা দুনিয়ার অসংখ্য মানুষ- বিশেষ করে তরুনেরা - সরকারের জন্য অপেক্ষা না করেই নিজ উদ্যোগে কাজ করে যাচ্ছে।

স্বল্প-কার্বন, পারমাণবিক শক্তি মুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ার প্রচেষ্টা রাষ্ট্রসমূহকে বিশ্ব-নাগরিকের এক আন্দোলনের অংশীদার বানাবে ও আন্দোলনকে আরো বিস্তৃত করবে- যে আন্দোলনের প্রভাব ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। এই আন্দোলনের মূলমন্ত্রই হচ্ছে পারমাণবিক শক্তির উৎপাদন ও ব্যবহারকে বর্জন এবং নবায়নযোগ্য শক্তি উৎস সমূহকে সমর্থন করা। আমরা আপনাদের তাদের সাথে যুক্ত হয়ে কেবল আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই নয়- আমাদের পৃথিবীটাকেও রক্ষার আহবান জানাই।

বিনীত,
বেটি উইলিয়ামস, আয়ারল্যাণ্ড (১৯৭৬)
মাইরীড ম্যাগুই, আয়ারল্যাণ্ড (১৯৭৬)
রিগোবের্তা মেঞ্চু তুম, গুয়েতেমালা (১৯৯২)
জোডি উইলিয়ামস, ইউএসএ (১৯৯৭)
শিরিন এবাদি, ইরান (২০০৩)
ওয়াঙ্গারি মা'থাই, কেনিয়া (২০০৪)
আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু, দক্ষিণ আফ্রিকা (১৯৮৪)
অ্যাডোল্ফো পেরেজ এসকুইভেল, আর্জেন্টিনা (১৯৮০)
প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস হোর্তা, পূর্ব তিমুর (১৯৯৬)

পরিশিষ্ট:
১। নোবেল উইমেন'স ইনিশিয়েটিভ ওয়েবসাইট মূল খোলা চিঠিটি পাওয়া যাবে; Click This Link
২। এই খোলা চিঠি ৩১ টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29485001 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29485001 2011-11-17 11:57:54
লিবার্টি স্কয়ার থেকে অকুপাই আন্দোলনকারীদেরকে উচ্ছেদ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি? Police Begin Clearing Zuccotti Park of Protesters



পুলিশের এই হামলাকে বলা যেতে পারে ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তির প্রচেষ্টা: এইবার প্রহসন হিসেবে - বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদীতার নজির হয়ে .. ১৯৬৮ সালের মে মাসের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবাদি জনতা, শ্রমিক-ছাত্র সংগঠন, নাগরিক অধিকার আন্দোলন সম্মিলিত ভাবে occupy movement এর মতোই poor peoples movement নামে একটি আন্দোলন রচনা করেছিলো, তারাও লিবার্টি স্কয়ারের মতোই ওয়াশিংডিসি'র লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে “Resurrection City, USA” নামে এক আস্তানা গড়ে তোলে যেখানে তিন হাজার আন্দোলনকারী থাকতে শুরু করে। এক পর্যায়ে ১৯ জুন ৫৫ হাজার মানুষ এসে তাদের সাথে সংহতি জানায়। লিবার্টি স্কয়ারের মতো তারা সেখানে বিনামূল্যে খাদ্য, স্বাস্থ্য সেবা, চাইল্ড কেয়ার সেন্টার, পত্রিকা প্রকাশনা, শিক্ষার ব্যাবস্থা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ইত্যাদির আয়োজন করেন। আন্দোলন বিপদজনক মোড় নিতে দেখে এবং গণসম্পৃক্তিতা বাড়তে থেকে মার্কিন শাসক শ্রেণী ৬ সপ্তাহের বেশি গণতন্ত্রের ধ্বজ্বা ধরে রাখেতে পারেনি। নির্মম ফ্যাসিবাদি কায়দায় ব্যাপক প্যারামিলিটারি ফোর্স ব্যাবহার করে ২৪ জুন ১৯৬৮ তে “Resurrection City" উচ্ছেদ করে।
সূত্র: From the 1968 Poor People’s Campaign to Occupy Wall Street

একই ভাবে Occupy Wall Street আন্দোলন ৮ সপ্তাহের মাথায় এসে বিপদজনক মোড় নেয়ার সম্ভাবনা দেখা মাত্রই মার্কিন পুজিবাদের গণতান্ত্রিকত ফ্যাসিবাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে গেল। কিন্তু এবার সারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল নয় সারা পৃথিবী জুড়ে অকুপাই আন্দোলনের যে বিস্তৃতি,যোগাযোগ ব্যাবস্থা, আন্দোলন কারীদের ঐক্য ও সংহতি ইত্যাদি অনেক কিছুই ১৯৬৮ সালের সাথে ২০১১ সালের পার্থক্য করে দিতে পারে, ফলে ১৯৬৮ সালের মতো কেবল "রেসারাকশান সিটি" উচ্ছেদ করার মতো করে স্রেফ লিবার্টি স্কয়ার থেকে আন্দোলনকারীদের উচ্ছেদ করলেই অকুপাই আন্দোলনকে থামিয়ে দেয়া যাবে না।

পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হলো গণতন্ত্র। কিন্তু পুঁজিবাদ কি তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সক্ষম? গণতন্ত্র তত্ত্বগতভাবে হলেও রাজনৈতিক ক্ষমতার সমতায় বিশ্বাস করে, গণতন্ত্রের চোখে এক মানুষ এক ভোট, সবার ভোট সমান। অন্যদিকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূল ভিত্তিই হলো অসমতা, অসমতা থাকে বলেই গুটি কয়েক পুঁজিপতির মালিকানায় থাকে সমাজের বেশিরভাগ সম্পদ এবং বেশিরভাগ মানুষের শ্রমের ফল মেরে দিয়েই পুঁজিপতির মুনাফার চক্র চলমান থাকে, পুঁজিবাদ টিকে থাকে, বিকশিত হয়। ফলে তত্ত্বগতভাবেই, যে পুজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গুটি কয়েক মালিকের স্বার্থ রক্ষা করেই টিকে থাকে তার পক্ষে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সমতার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব হয় না। ফলে মালিক শ্রেণীর স্বার্থে পুঁজিবাদ তার বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিশ্র“তি যেমন জনগণের সম অধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদির উপর ক্রমাগত হস্তক্ষেপ করতে থাকে। আইন-আদালত, একাডেমিক কারিকুলাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমের উপর মতাদর্শগত নিয়ন্ত্রণ বা হেজিমনির মাধ্যমে পুঁজিবাদ পরোক্ষভাবে এই নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ বজায় রাখে। কিন্তু সংকটগ্রস্থ হলে এই পরোক্ষ ভাবের বিলাসিতা বাদ দিয়ে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণী ডাইরেক্ট একশানে চলে যায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনকারীদের উপর চলমান পুলিশি নির্যাতন ও সর্বশেষ লিবার্টি স্কয়ার থেকে তাদেরকে উচ্ছেদের জন্য চালানো এই অভিযান বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই ফ্যাসিবাদী চেহারাই উন্মোচন করে দেয়।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29483756 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29483756 2011-11-15 15:17:02
গ্যাস সম্পদ: মার্কিন কোম্পানি লুটছে, এবার চীন-রাশিয়াও লুটবে! Click This Link
আর রাশিয়ার গ্যাজ প্রমের সাথে চুক্তিটি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটিতে তোলা হবে ঈদের পরপরই।(সূত্র: বাঙলা নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম Click This Link)

সাইনোপেকের সাথে বাপেক্সের জয়েন্ট ভেঞ্চার:
অন্যান্য চুক্তির মতোই এই চুক্তির খসড়াও গোপন রাখা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে দেথা যায় নাইকোর সাথে বাপেক্সের জয়েন্ট ভেঞ্চারের আদলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩,৯০০ বর্গকিমি আয়তনের ২২ নং ব্লকে সাইনোপেকের সাথে বাপেক্সের এই জয়েন্ট ভেঞ্চারের পায়তারা করা হচ্ছে। নাইকোর সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে নাইকোর অংশীদ্বারিত্ব ৮০% এবং বাপেক্সর ২০% ছিল। সাইনোপেকের সাথে চুক্তির বেলায় বাপেক্সের অংশীদ্বারিত্ব ৩০% এবং সিনোপ্যাকের ৭০%। নাইকোর মতোই সাইনোপেকের চুক্তিতেও বাপেক্স স্লিপিং পার্টনার বা নিস্ক্রিয় সহযোগী অর্থাৎ স্বাক্ষী গোপালই থাকবে। সাইনোপেক মাত্র ১০ কোটি ডলার বা ৭৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কটিয়া, জালদি, কাফালং, শিতাপাড়া এই চারটি গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণ করবে। বাপেক্স কোন বিনিয়োগ করবে না বা গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলণে সরাসরি অংশগ্রহণ ও করবে না। জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিতে সাধারণত দুই পার্টি তাদের অংশীদ্বারিত্বের সমানুপাতে বিনিয়োগ করে এবং লাভ ও সেই অনুপাতে বিভক্ত হয়। সাইনোপেকের সাথে চুক্তিটিকে জয়েন্ট ভেঞ্চার বলা হলেও কার্যত এটা উৎপাদন অংশীদ্বারি চুক্তি থেকে আলাদা কিছু নয়। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই সমস্ত বিনিয়োগ বিদেশী কোম্পানির, উৎপাদিত গ্যাস থেকে কস্ট রিকভারি বাবদ বিনিয়োগ উঠিয়ে নেয়া ও লাভের গ্যাস বাগানোর বাধ্যমে ৭০-৮০ ভাগ গ্যাস বিদেশী কোম্পানি বাগিয়ে নিতে পারে।

নাইকোর সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তির উদাহরণ:
পিএসসি চুক্তিগুলোর মধ্যে যেমন মিল ও ধারাবাহিকতা দেখা যায়, জয়েন্ট ভেঞ্চারের চুক্তির বেলাতেও মিল থাকারই কথা, পত্রপত্রিকায় যতটুকু তথ্য এসেছে তাতে সেরকমই বোঝা যাচ্ছে। এ হিসেবে নাইকোর সাথে করা বাপেক্সর পুর্বতন জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিটির বিষয়ে আলোচনা করলে জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে লুটপাটের প্রক্রিয়াটা পরিস্কার হবে। নাইকেরা সাথে করা জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তি অনুসারে:

১) আর্টিক্যাল ২.৪ অনুসারে সমস্ত বিনিয়োগ অপারেটর কোম্পানি নাইকো’র, বাপেক্স কোন বিনিয়োগ করবে না। উৎপাদিত গ্যাস ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম দ্রব্য ভাগা ভাগি হবে আর্টিক্যাল ২৩ এ উল্ল্যেখিত ইনভেস্টমেন্ট মাল্টিপল বা বিনিয়োগের তুলনায় আয়ের অনুপাত অনুসারে।

২) আর্টিক্যাল ২৩.২ অনুসারে ইনভেস্টমেন্ট মাল্টিপল বা বিনিয়োগের তুলনায় আয়ের অনুপাত নির্ধারিত হবে নিম্নোক্ত সুত্র ধরে:
ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল(IM )= ক্রমবর্ধমান মোট আয়/ক্রম বর্ধমান মোট ব্যায়

৩) আর্টিক্যাল ২৩.৩ অনুসারে, ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান যদি ১ এর কম হয় অর্থাৎ বিনিয়োগের তুলনায় আয় কম হয় বা কস্ট রিকভারি না হয়, তাহলে উৎপাদিত গ্যাসের ৮০ ভাগ পাবে নাইকো এবং ২০ ভাগ বাপেক্স। আয় বাড়তে বাড়তে বিনিয়োগের তুলনায় বেশি হলে অর্থাৎ ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান ১ এর বেশি হলে বাপেক্সের ভাগ বাড়তে থাকবে। যেমন বিনিয়োগের তুলনায় আয় যদি দেড়গুণ হয় অর্থাৎ ইনভেষ্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান ১.৫ হয় তাহলে বাপেক্সের ভাগে জুটবে ২৫% এবং নাইকোর ভাগে ৭৫%। এভাবে বাড়তে বাড়তে বিনিয়োগের তুলনায় আয় ৩ গুণ বা তার বেশি হলে বাপেক্স ফেনী ও ছাতক(পশ্চিম) এর জন্য সর্বোচ্চ ৪২% এবং ছাতক(পূর্ব) এর জন্য সর্বোচ্চ ৫০% গ্যাস পেতে পারে।



৪) আর্টিক্যাল ২৩.৩.৩ অনুসারে কোন গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস পাওয়া না গেলে, সেই গ্যাস ক্ষেত্রের বিনিয়োগ অন্য কোন গ্যাস সম্পন্ন গ্যাস ক্ষেত্রের আয় থেকে পুষিয়ে নেয়া যাবে।

৫) জয়েন্ট ভেঞ্চর চুক্তির আর্টিক্যাল ২১.১ এ অপারেটর নাইকোকে পেট্রোলিয়াম অপারেশন্স এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সম্পদের ইন্সুরেন্স করার কথা বলা হলেও চুক্তির কোথাও গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস নষ্ট হলে গ্যাস ও পরিবেশের ক্ষতিপূরণের বিধান নাই।
বাংলাদেশ নাইকোর দ্বারা টেংরাটিলা বিস্ফোরণে ২০ হাজার কোটি টাকার গ্যাসের ক্ষতিপূরণ আজও আদায় করতে পারেনি, উল্টো বিশ্বব্যাংকের বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তির আদালতে নাইকোর দায়ের করা ক্ষতিপূরণ এড়ানোর মামলায় দায়সারা ভাবে অনভিজ্ঞ আইনজীবি নিয়োগ করে এখন মামলার রায়ের অপেক্ষা করছে।


ফলে প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি’র মতো ই এই জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিতেও বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেখিয়ে, এক ক্ষেত্রের বিনিয়োগ আরেক ক্ষেত্র থেকে উসুল করে, পুরাতন যন্ত্রপাতি নতুন বলে চালিয়ে দিয়ে ইত্যাদি নানান উপায়ে ইনভেস্টমেন্ট মাল্টিপল এর মান ১ এর কম রাখা হয় এবং ৮০ ভাগ গ্যাস বিদেশী কোম্পানি নিজের ভাগে নিয়ে নেয়। সেই ৮০ ভাগ গ্যাস আবার কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রায় বাপেক্সের উৎপাদন খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে বাধ্য হয়। সাইনোপেকের সাথে এ ধরণের জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তির ফলে ঠিক কত দামে বাংলাদেশকে এভাবে নিজের গ্যাস বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে কিনতে হবে তা এখনও আমরা জানি না।

গ্যাজ প্রমকে ১০ টি অনুসন্ধান ও উন্নয়ণ কূপ খননের কন্ট্রাক্ট:
অন্যদিকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোম্পানি গ্যাজ প্রম এর সাথে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধিন তিতাসের ৪টি ও রশিদপুরে ১ টি উন্নয়ণ কূপ এবং বেগমগঞ্জ, শাহাবাজপুর, শ্রীকাইল, সেমুতাং ও সুন্দলপুর গ্যাসক্ষেত্রের ৫টি -এই মোট ১০টি অনুসন্ধান কূপ খননের চুক্তি হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ি গ্যাজপ্রমকে ৫ টি উন্নয়ণ কূপের জন্য ১০.২৫ কোটি ডলার এবং ৫টি অনুসন্ধান কূপের জন্য ৯.৫ কোটি ডলার অর্থাৎ ১০টি কূপ খননের জন্য মোট ১৯.৭৫ কোটি ডলার বা ১,৫০১ কোটি টাকা দিতে হবে। ফলে গড়ে একেকটি কূপ খননের খরচ পড়বে ১৫০ টাকা করে। অথচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স একেকটি কূপ খনন করতে গড়ে ৭০/৮০ টাকারও কম খরচ করে। উদাহরণ স্বরুপ: বাপেক্সের নিজস্ব লোকবল ও রীগের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন মোবারকপুর অনুসন্ধান কূপ খননে ৮৯.২৬ কোটি টাকা(গভীরতম কূপ),শ্রীকাইল-২ কূপ খননে ৮১.১২ কোটি টাকা, সুন্দলপুর কূপ খননে ৭৩.৬৫ কোটি টাকা(প্রকৃত ব্যায় ৫৫ কোটি টাকা) এবং কাপাসিয়া কূপ খননের জন্য বাপেক্সের ৭০.১৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ফলে বাপেক্সের বদলে রাশিয়ার কোম্পানি গ্যাজপ্রমকে দিয়ে কুপ খননের জন্য বাপেক্সর দ্বিগুণ অর্থ খরচ করতে হবে।

কন্ট্রাক্ট কিংবা জয়েন্ট ভেঞ্চার: লুটপাটের নয়া তরিকা

একদিকে পেট্রোবাংলা বাগাড়াম্বর করে মিডিয়ায় বিবৃতি দিচ্ছে কি ভাবে দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো "বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের প্রশ্ন ওঠে,তা বোধগম্য নয়” বলে অন্যদিকে ছলে-বলে কৌশলে নানান ভাবে গ্যাস সম্পদ লুট-পাটের আয়োজন জারি রাখছে। আসলে স্থলভাগে গ্যাস উত্তোলণে বাপেক্সের যে দক্ষতা ও বিদেশী কোম্পানির চেয়ে কয়েকগুণ কম খরচে কাজ করার যে উদাহরণ রয়েছে এবং জাতীয় সম্পদের মালিকানার প্রশ্নে সারাদেশে পিএসসি চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে উঠেছে, তাতে স্থলভাগের গ্যাস ক্ষেত্র নতুন করে পিএসসি চুক্তির মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়াটাকে দেশবাসির কাছে কোন ভাবেই গ্রহণ যোগ্য করা যাবে না একথা শাসক শ্রেণী ভালো ভাবেই বুঝে গেছে। তাই এখন দক্ষতার অভাবের কথা না বলে বলতে শুরু করেছে ক্যাপাসিটি অর্থাৎ একসাথে অনেক কূপে কাজ করার অক্ষমতার কথা। বাপেক্সকে দিয়ে নাকি একসাথে অনেক কূপে অনুসন্ধান ও উত্তোলণ কাজ করানো যাবে না, কারণ বাপেক্স এর পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও লোক বলের অভাব আছে। কথাগুলো এমন ভাবে বলছে যেন গ্যাস উত্তোলণের প্রয়োজনীয় রিগ মেশিন সহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও লোকবলের অভাব একটা চিরস্থায়ি সমস্যা যার কোন সমাধান করা যায় না! অথচ গ্যাসের সংকট তো হঠাৎ করে নাযিল হয় নি, দিনে দিনে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত উত্তোলণ না হওয়ায় সংকট ও বেড়েছে। তাহলে দিনে দিনে বাপেক্সের ক্যাপাসিটি চাহিদা অনুযায়ি বাড়ানো হলো না কেন কিংবা এখনও বা কেন ক্যাপাসিটি আরো বাড়ানোর উদ্যোগ না নিয়ে বিদেশী কোম্পানির পেছনে ছোটা হচ্ছে? ক্যাপাসিটি না বাড়ানো হলে তো চিরকাল-ই পরনির্ভরশীল হয়ে নিজেদের সম্পদ বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে আন্তর্জাতিক মূল্যে কিনে যেতে হবে। তাই ক্যাপাসিটি আসলে মূল কথা না, মূল কথা হলো কন্ট্রাক্ট, জয়েন্ট ভেঞ্চার ইত্যাদি বিভিন্ন কৌশলে গ্যাস সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার ধান্দা যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভাবে বা খাতাকলমে গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর মালিকানা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাত থাকলেও কার্যত বিদেশী কো্ম্পানির মুনাফার বাড়ানোর কাজেই লাগবে। তাই উৎপাদন অংশীদ্বারিত্ব চুক্তি বা প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) এর মতোই চীন-রাশিয়ার সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার, বিভিন্ন কন্ট্রাক্ট ইত্যাদিকেও রুখে দিতে হবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29478463 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29478463 2011-11-05 18:32:22
ক্ষতিপূরণ হিসেবে ক্ষতিকারক বীজ: ক্ষতিপূরণ না প্রমোশনাল ক্যাম্পেইন?
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ি কোম্পানিগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে প্রদর্শনী প্লট করে বীজ উৎপাদন করবে এবং টমেটোর ক্ষেত্রে বহুজাতিক সিনজেন্টা রাজশাহী ও চাপাই নবাবগঞ্জের দেড় হাজার কৃষককে ২০ গ্রাম করে টমেটোর বীজ দেবে এবং ধানের ক্ষেত্রে এনার্জি প্যাক এগ্রো ও মেসার্স মেটাল এগ্রো মিলিত ভাবে নোয়াখালী, গোপালগঞ্জসহ দেশেরঅন্যান্য এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত দুই হাজার কৃষককে দুই কেজি করে ধানবীজ, ২৫কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও ১৫ কেজি মিউরেট অবপটাশ (এমওপি) সার সরবরাহ করবে।

(সূত্র: প্রথম আলো, ০২ নভেম্বর ২০১১
Click This Link)

এই ক্ষতিপূরণ বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের সংখ্যা এবং ক্ষতির পরিমাণ অনুযায়ী এত সামান্য যে একে ক্ষতিপূরণ-তামাশা আর বীজ প্রমোশন ক্যাম্পেইন ছাড়া আর কোন কিছু বলার উপায় নেই। হাইব্রিড ঝলক চাষ করে শুধু মাত্র নোয়াখালি অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের ক্ষতির হিসেবের সাথে সরকারি ক্ষতিপূরণের হিসেব তুলনা করলেই বিষয়টি পরিস্কার বোঝা যায়।

নোয়াখালি অঞ্চলে গত বোরো মৌসুমে ১ হাজার ৬৬৫ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ঝলক জাতের ধান আবাদ করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ১৯৫ হেক্টর বা প্রতি হেক্টর সমান ২.৪৭ হিসেবে ২৯৫২ একর জমির ঝলক ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৯২৬ জন কৃষক। (সূত্র: সমকাল ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১১ Click This Link)
অর্থাৎ একেকজন কৃষকের গড়ে ০.৪২ একর বা ৪২ শতাংশ জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এনার্জি প্যাক এগ্রো কোম্পানির ঝলক ধানের প্যাকেটের গায়ের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ি প্রতি একর জমিতে ১২০ থেকে ১৩৫ মণ ধান হওয়ার কথা।

ছবি: প্যাকেটের গায়ে একর প্রতি ১২০ থেকে ১৩৫ মণ ফলনের প্রতিশ্রুতি

একর প্রতি ফলন ১২০ মণ ধরলে ৪২ শতাংশ জমিতে ফলন হতো ৫০ মণেরও বেশি ধান। ঐসময় ধানের দাম ছিলো প্রতি মণ ৭০০-৭৫০ টাকা। ৭০০ টাকা মণ ধরলে ৫০ মণ ধানের দাম ৩৫ হাজার টাকা। এখন এই ফসল না হওয়ার ফলে কৃষকের খাদ্যের অনিশ্চয়তা, মহাজনের কাছ থেকে নেয়া ঋণের সুদসহ বিভিন্ন ভোগান্তির কথা যদি বাদও দেই তাহলে গড়ে প্রত্যেক কৃষক অন্তত ৩৫ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা যার পরিমাণ শুধু নোয়াখালি অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্থ ৬৯২৬ জন কৃষকের জন্যই দাড়ায় ২৪ কেটি ২৪ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। অথচ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে সারা বাংলাদেশের হাইব্রিড ধান ও টমোটো বীজ কিনে প্রতারিত হওয়া কৃষকের জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সর্বমোট ৬০ লক্ষ টাকা! সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক এনার্জি প্যাক এগ্রো ও মেসার্স মেটাল এগ্রো মিলিত ভাবে নোয়াখালী, গোপালগঞ্জসহ দেশেরঅন্যান্য এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত দুই হাজার কৃষককে দুই কেজি করে ধানবীজ, ২৫কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও ১৫ কেজি মিউরেট অবপটাশ (এমওপি) সার সরবরাহ করবে। প্রতি কেজি ২৫০ করে ২ কেজি হাইব্রিড ধান বীজের দাম ৫০০ টাকা, প্রতি কেজি ১৩ টাকা করে ২৫ কেজি ইউরিয়ার দাম ৩২৫ টাকা, প্রতি কেজি ২৭ টাকা করে ১০ কেজি ডিএপি’র দাম ২৭০ টাকা এবং প্রতি কেজি ২৫ টাকা হিসেবে ১৫ কেজি পটাশ সারের দাম ৩৭৫ টাকা।সব মিলিয়ে মাত্র ২ হাজার কৃষকের প্রত্যেকে মাত্র ১৪৭০ টাকার সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ পাবে! অথচ শুধু নোয়াখালি অঞ্চলেই প্রায় ৭ হাজার কৃষক শুধু ঝলক বীজের ফসল হানির ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রত্যেকে ৩৫ হাজার টাকা করে পাওয়ার কথা। একই ভাবে বহুজাতিক সিনজেন্টা কোম্পানির হাইব্রিড ‘সবল’বীজ চাষ করে শুধু মাত্র রাজশাহীর গোদা বাড়িতেইক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কৃষক অথচ ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে মাত্র দেড় হাজার কৃষককে প্রতিজনকে ২০ গ্রাম করে বীজ দিয়ে!


ছবি: সিনজেন্টা’র সকল পণ্য বয়কটের ডাক

আসলে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কোন ইচ্ছা কোম্পানি অন্ত:প্রাণ শাসক গোষ্ঠীর নাই, কোন কালে ছিলও না। যে কারণে বীজ আইনে ক্ষতিপূরণের কোন বিধানই তারা রাখেনি এবং বারবার হাইব্রিড ধানের ঝুকি ও ক্ষতির বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পরও তারা হাইব্রিড ধানের অনুমোদন বাতিল করা তো দূরের কথা বীজ আইনে স্রেফ ক্ষতিপূরণের বিধান অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন বোধ করছেনা। এই তথাকথিত ক্ষতিপূরণ তামাশার ঘোষণা আসার আগপর্যন্ত সরকার তো স্বীকারই করেনি যে হাইব্রিড ধান ও টমেটো বীজের সমস্যার কারণেই এই ফসল হানি ঘটেছে, সরকারি তদন্ত কমিটি কোম্পানির সুরে সুর মিলিয়ে বারবার আবহাওয়াকে দায়ি করেছে। কিন্তু যখন দেখছে আবহাওয়াকে দায়ী করে লাভ হচ্ছে না, কৃষকরা সোজা যুক্তি দিয়েছে বীজে যদি সমস্যা না থাকতো, যদি আবহাওয়ার কারণেই হতো তাহলে অন্য কোম্পানির বীজের টমেটো ও ধানের ফলনও নষ্ট হতো এবং যখন দেখা গেল কৃষকরা ঐসব কোম্পানির ধান ও টমেটো বীজসহ সকল পণ্য বর্জন করেতে শুরু করেছে তখন শাসক গোষ্ঠী বীজ কোম্পানিগুলোকে উদ্ধার করার তরিকা হিসেবে এই প্রদর্শনী প্লট উৎপাদিত বীজ দিয়ে ‘ক্ষতিপূরণ’এর তামাশা সাজালো। এর ফলে কোম্পানির লাভ বহুবিধ:

১)প্রকৃত ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিপুল অর্থ বেচে গেল
২) নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রোগমুক্ত বীজ থেকে ফসল উৎপাদন করে দেখিয়ে দেয়া যে বীজের কোন সমস্যা ছিল না(অথচ অত্যাধিক স্পর্শকাতর হাইব্রিড জাতের এই বীজে এইবারে প্রদর্শনী প্লটের ক্ষেত্রে সমস্যা না হলেই যে গত বছরের বীজে সমস্যা ছিলনা কিংবা ভবিষ্যতেও সামান্য আবহাওয়ার তারতম্যে কিংবা অন্যকোন কারণে হবে না তার কোন নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা হলো না।)
৩) ঠিক কত তাপমাত্রা, কেমন আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতে এই বীজ থেকে ফসল ভালো হবে তা সুনির্দিষ্ট করার বিপদেও পড়ল না কোম্পানি।
৪) বীজ বর্জনের ডাক দেয়া কৃষকদেরকে কৌশলে সেই বীজ ব্যাবহারে উদ্বুদ্ধ করণ
৫) সারাদেশে বীজগুলোর যে দুর্নাম রটেছে তার হাত থেকে স্বল্প খরচেই রক্ষা পাওয়া
৬) বীজ আইনে এবারও ক্ষতিপূরণের ধারা যুক্ত না হওয়াতে ভবিষ্যতেও এই ধরণের প্রদশর্নী প্লটের মাধ্যমে ‘ক্ষতিপূরণ’ করার প্রক্রিয়াকে একটি মডেল হিসেবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরী হওয়া।

ফলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এই তথাকথিত ক্ষতিপূরণ আসলে ঝুকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর বীজ হিসেবে পরিচয় পাওয়া হাইব্রিড সবল, ঝলক ও সারথী ইত্যাদি বীজগুলোকে দুর্নাম থেকে উদ্ধার করে পুনরায় বাজার জাত যোগ্য করার জন্য কোম্পানি স্পন্সরড ক্যামপেইন বা কোম্পানি প্রযোজিত প্রচারণা, যেটাকে সরকার ক্ষতিপূরণ হিসেবে চালিয়ে দিতে চাইছে! অবশ্য এইসব ধান্দা কৃষক খুব ভালো ভাবেই বোঝে, এই তৎপরতার খবর শুনে যে কারণে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক সামছুদ্দিন বলেছিলেন: “ঝলকের প্রদর্শনী খামার করার অর্থই হচ্ছে ঝলকের বীজের পক্ষে সাফাই গাওয়া, তাদের সার্টিফিকেট দেওয়া। কৃষকের ক্ষতিকরে বীজ কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের আগে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।”
আমরা কৃষক সামছুদ্দিনের সাথে সম্পূর্ন একমত পোষণ করি, বীজ আইনে বীজের কারণে ফসলহানির ন্যায্য ক্ষতিপূরণের ব্যাবস্থা রাখার দাবী জানাই এবং সেই সাথে বীজ নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি সামনে রেখে হাইব্রিড বীজের অনুমোদনের যৌক্তিকতাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠানো জরুরী মনে করছি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29477073 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29477073 2011-11-02 19:52:10
অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলনের প্রেক্ষাপট: মার্কিন পুজিবাদের সাম্প্রতিক সংকট “The worker need not necessarily gain when the capitalist does, but necessarily loses when the letter loses…the workers suffers in his very existence, the capitalist in the profit on his dead mammon.” –Karl Marx, Economic and Philosophic Manuscripts of 1844.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এ পর্যন্ত ১০টি মন্দা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যার সবগুলোকেই মার্কিন পুজিবাদ বিভিন্ন উপায়ে কোন রকমে সামাল দিয়ে দিয়ে এ পর্যন্ত এসেছে। সামরিকায়ন, যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিস্তার, রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ণ, শ্রমিক ছাটাই, মজুরী হ্রাস ইত্যাদি নানান উপায়ে বিভিন্ন সময় পুজিবাদী অর্থনীতির এই সংকট উত্তোরণ ঘটানো হয়েছে। কিন্তু এবারের সংকট ভিন্ন। ইতিপূর্বে কাজে লাগানো কৌশলগুলোর কোনটাই যেন কাজ করছেনা এবার। কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা প্যাকেজ মার্কিন ফাইনান্সিয়াল অর্থনীতিতে ঢালা হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানের দুই দুইটা যুদ্ধে আরো কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছে। কিন্তু ফলাফল কি? আগষ্ট ২০০৭ থেকে জুন ২০০৯ পর্যন্ত বড় বড় কর্পোরেশনগুলোকে বেইল আউট এর জন্য খরচ করা অর্থের মাধ্যমে প্রাথমিক ভাগে পুরোপুরি পতনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হলেও পরের দুই বছর, জুন ২০০৯ থেকে জুলাই ২০১১ পর্যায়ে দেখা যায় গোটা অর্থনীতি যেন থমকে আছে- ধ্বস এড়ানো গেলেও ব্যাবসা ও অর্থনীতিকে স্লথ গতি থেকে বের করা যাচ্ছে না, লাখ লাখ ছাটাই হওয়া শ্রমিকের জন্য কর্মসংস্থানেরও কোন ব্যাবস্থা হচ্ছে না।

জুলাই ২০১১ থেকে আবার পতনের দিকে যাত্রা। বছরের প্রথম ভাগে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ০.৪% এবং কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি ছিল শূণ্য। গোটা শ্রমিক বাহিনীর প্রায় ৫ ভাগের ১ ভাগ অর্থাত ৩ কোটি শ্রমিক হয় একেবারে বেকার অথবা অর্ধ বেকার। সরকারি হিসেবেই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাবান দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪ কোটি ৬০ কোটি মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে বাস করছে। এরই মধ্যে আবার নয়া উদারনৈতিক পুজিবাদী অর্থনৈতিক নিয়মে রোল উঠেছে রাষ্ট্রের ব্যায় সংকোচনের। ২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় খাতে ৬ লক্ষ শ্রমিক ছাটাই করা হয়েছে, ডাক বিভাগ থেকে আরো ১ লক্ষ ২০ হাজার ছাটাই ও ৩০০০ হাজার পোষ্ট অফিস বন্ধ করে দেয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে। উইসকোনসিন, ওহাইও, ইন্ডিয়ানা, আরিজোনা, মিশিগান সহ অনেক রাজ্যে সরকারি খাতে শ্রমিক সংগঠন ভেঙে দেয়ার তৎপরতা চলছে। সেখানে দরিদ্রদের অর্থ ও খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্য সেবা, মেডিকেয়ার, মেডিকএইড, ছাত্রদেরকে শিক্ষা সহায়তাসহ সকল প্রকার সামাজিক নিরাপত্তা মূলক প্রোগ্রাম বাতিল করা হচ্ছে। অর্থাৎ কর্পোরেট ফাইন্সিয়াল প্রভুদেরকে বেইল আউট করার বেলায় যে রাষ্ট্রের অর্থের অভাব হয়না সেই রাষ্ট্রই আবার ব্যায় সংকোচনের নামে দরিদ্র জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নেয়। আপাত অর্থে এরকম একটি পরিস্থিতিই অকুপাই ওয়ালষ্ট্রিট আন্দোলনের বাস্তবতা তৈরী করেছে যে আন্দেলনের প্রাথমিক লক্ষ হলো কর্পোরেট আমেরিকার ফাইনান্সিয়াল প্রভুদের ক্ষমতা খর্ব করা। কিন্তু মার্কিন পুজিবাদী অর্থনীতির ফাইনান্সিয়ালাইজেশান এবং ফাইনান্সিয়াল খাতের আধিপত্য যদি এই সংকটের দৃশ্যমান কারণ হয় তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় এই ফাইনান্সিয়ালাইজেশনটাই বা ঘটলো কেন, ফাইনান্সিয়ালাইজেশানের সংকটই বা তৈরী হলো কিভাবে আর তা থেকে বেরিয়ে আসতেই বা পারছে না কেন মার্কিন পুজিবাদ?

সংকটের নতুন রুপ: কর্মসংস্থানবিহীন সংকট-উত্তরণ বা জবলেস রিকভারি

পুজিবাদী অর্থনীতিতে মন্দা কেটে যাওয়ার সাধারণ লক্ষণ হলো জমে থাকা পণ্য নতুন করে বিক্রী শুরু হয়, ব্যাবসায় নতুন বিনিয়োগ হয়, উৎপাদন চক্র চালু হয়, ছাটাই করা শ্রমিকদেরকে আবার নিয়োগ দিতে শুরু করে মালিকেরা। ঐতিহাসিক ভাবে দেখা গেছে সাধারণত রিকভারি শুরু হওয়ার পর ৩ থেকে ৪ মাস লাগে কর্মসংস্থানের সংখ্যা সংকট-পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসতে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালের মন্দাগুলোতে এর ব্যাতিক্রম দেখা যাচ্ছিল। ১৯৯১ সালের মন্দার সময়ই এই মৌলিক পরিবর্তনের সকল লক্ষণ দেখা যায়। তখন রিকভারি শুরু হওয়ার পর ১৮ মাস লেগেছিল সংকট-পূর্ব অবস্থায় আসতে। প্রাথমিক অবস্থায় বিষয়টি পুজিবাদী অর্থনীতিবিদদের উদ্বিগ্ন করে তুললেও ডট.কম বাবল বা কম্পিউটার-ইন্টারনেট-স্যাটেলাইট-টেলিকমিউনিকেশন-সফটওয়ার ইত্যাদি প্রযুক্তিগত বিকাশের মাধ্যমে মন্দা কাটানোর নেশায় তারা সেটা ভুলেও যায়। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই ২০০০-২০০১ সালে এসে ডট.কম বাবল এর বিস্ফোরণ ঘটে। পুজিবাদী অর্থনীতিতে আবারও ধ্বস নামে। শত শত কম্পানি যেগুলো ৯০ দশকের ডট.কম বাবলে করে বাতাসে ভাসছিল একেবারে পথে বসে যায়। প্রযুক্তি পণ্যের অতি-উৎপাদন ফলে যে সংকট শুরু শুরু হয় সেটা গৃহায়ণ, গাড়ি শিল্প, ইলেক্ট্রনিক্স সহ গোটা অর্থনীতিরই সাধারণ সংকটে পরিণত হয়। কিন্তু এই মন্দার চেয়েও ভয়ংকর বিষয় হলো মন্দা পরবর্তীতিতে ২০০১-২০০৪ সালে যে রিকভারি হয়, সেই রিকভারি ১৯৯১ সালের রিকভারির চেয়েও ধীরগতিতে কর্মসংস্থান পুনপ্রতিষ্ঠা করে-১৮ মাসের জায়গায় সেবার পুরো ৪৮ মাস লাগে সংকট-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যেতে। কিন্তু যে পদ্ধতিতে এই মন্দার উত্তোরণ ঘটানো হয় সেটা পরবর্তীতে ২০০৭ সালে শুরু হওয়া মন্দার প্রেক্ষিত তৈরী করে দিয়েছিল, যার জের এখনও চলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ গোটা পুজিবাদী অর্থনীতিতে।

পুজিবাদী রিয়েল ইকোনোমি’র অতি-উৎপাদনের সংকট থেকে উত্তোরণের জন্য সে সময় গোটা অর্থনীতি ফাইনান্সিয়ালাইজেশানের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ কলকারখানায় লাভজনক বিনিয়োগের সংকটের ফলে জমে থাকা অলস পুজি এবার ঝাপিয়ে পড়ে শেয়ার বাজারের ফাটকাবাজির দিকে। ঋণে ঋণে সয়লাব হয়ে যায় গোটা অর্থনীতি। সরকারি ভাগে ব্যাংকগুলোকে দেয়ার ঋণের সুদের হার ৫.৫% থেকে ১% এ নামিয়ে আনা হয়। শুরু হয় বন্ধকী ঋণের কারবার। মধ্যবিত্ত নিম্ন বিত্তকে উৎসাহিত করা হয় বাড়ি বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণে এবং সেই ঋণ দিয়ে তার দৈনন্দিন আর্থিক সংকট থেকে উত্তরণে। সেই ঋণকে এরপর সিকিউরিটিস এ পরিণত করে ব্যাংক এবং হেজ ফান্ডগুলো সেই মর্টগেজ ভিত্তিক সিকিউরিটিসগুলোকে একত্রিত করে ইকুইট বন্ড, মেজানাইন বন্ড, ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড বন্ড ইত্যাদি বিভিন্ন গ্রেডিং এর প্যাকেজে পরিণত করে এবং শেয়ার বাজারে বেচা-বিক্রি শুরু করে। হু হু করে বাড়তে থাকে বাড়ির দাম, সেই সাথে মর্টগেজ ভিত্তিক সিকিউরিটস এর দাম। জন্ম হয় হাউসিং বাবল বা গৃহায়ণ বুদবুদের। সাময়িক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এই ফাইনান্সিয়াল বুদবুদ ২০০১ সালের মন্দা থেকে মার্কিন অর্থনীতিকে সাময়িক ভাবে বের করে নিয়ে আসলেও চীরকাল তো আর ঘর-বাড়ি আর সেই ঘর-বাড়ি ভিত্তিক সিকিউরিটিস এর দাম বাড়তে থাকতে পারে না । একসময় চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়তি হয়ে যায় এবং বাস্তব কারণেই অধিকাংশ নিম্ন আয়ের মানুষ বন্ধকী ঋণের(যে ঋণের সুদ প্রথমে কম কিন্তু পরে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে- যেটাকে বলা হয় এডজাস্টেবল রেট) কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। বাড়ির দাম কমতে থাকে। তখন দেখা যায়, সেই বাড়ি বন্ধক রেখে নেয়া ঋণের উপর ভিত্তি করে যে সিকিউরিটিসগুলো শেয়ার বাজারে বিকিকিনি হচ্ছিল সেগুলোর এর দাম বাড়ির বাস্তব বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে সেই শেয়ার আর কেউ কিনতে চাইল না। যখন সবকিছু ভালয় ভালয় চলছিল তখন কেউ সেই শেয়ারগুলোর ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু এখন বাড়ির দর পড়তে থাকায় সেই সব বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মূল্যের সিকিউরিটিস গুলো আক্ষরিক অর্থেই টয়লেট পেপারে পরিণত হলো। কেননা ফাইনান্সের দুনিয়ায় এখন আর কোন মূল্য নেই, ভবিষ্যতে উচ্চমূল্য পাওয়ার আশা না থাকায় এগুলো আর কেউ কিনতে চাইছে না। বিস্ফোরণ ঘটে হাউসিং বাবল বা গৃহায়ণ বুদবুদের।(এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখার জন্য দেখুন: “আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারের পতন ও ফাইনান্সিয়ালাইজেশানের সংকট” ) বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অসংখ্য মর্টগেজ ভিত্তিক সিকিউরিটিস রাতারাতি মূল্য হারালো। তখন মার্কিন রাষ্ট্র জনগণের ট্যাক্সের অর্থে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে এদের মূল্যহীন সিকিউরিটিস গুলো কিনে নিয়ে এসব কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করলো যেটাকে বলা হয় বেইল-আউট। মার্কিন পুজিবাদ এভাবে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেইল আউট করলেও জনগণকে ঠিকই বন্ধকী ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যার্থ হওয়ার দায়ে ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হলো। সেই সাথে ব্যায় সংকোচনের নামে শ্রমিক ছাটাই-স্বাস্থ্য-শিক্ষা-খাদ্য সহায়তা খাতে বরাদ্দ কমানোর ধাক্কা তো আছেই। এভাবে কর্পোরেটদের বেইল-আউট করে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের যে চেষ্টা চালানো হলো তাতে অর্থনীতি সাময়িক ভাবে বাড়তে শুরু করল ঠিকই কিন্তু নতুন কোন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়াই। এবং এইবারের জবলেস রিকভারি বা কর্মসংস্থান বিহীন সংকট-উত্তোরণের সংকট এর আগে উল্ল্যেখিত ১৯৯০ এবং ২০০১ সালের মন্দা পরবর্তী জবলেস রিকভারির সংকটের চেয়ে আরো ভয়াবহ।



জবলেস রিকভারির কারণ:
সংকটের আগে এবং সংকটের সময় উৎপাদনশীলতা (বা শ্রম শোষণের হার) বাড়ানোর জন্য যে প্রযুক্তির ব্যাবহার করা হয় তা আবার পুজিবাদী অর্থনীতির বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম অধিদপ্তর প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে দেখা যায় ২০০৯ সালের থার্ড কোয়ার্টারে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ১৩.৬% এবং অন্যান্য খাতে ৯.৫%। ঐ তিন মাসে উৎপাদন বেড়েছে ৪% যদিও মোট শ্রমঘন্টার পরিমাণ কমেছে ৫%। পুজিবাদী বিশ্লেষকরাই এখন বর্ণনা করছেন কেমন করে মালিক শ্রেণী উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য যন্ত্রপাতি কেনার মধ্যদিয়ে শ্রমিক ছাটাই করেছে এবং ইন্ডাষ্ট্রিয়াল রিজার্ভ আর্মি বা বেকার শ্রমিকের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা অবশ্য এই পর্যন্ত এসেই থেমে যায়, বলতে ভুলে যায় যে, এভাবে ক্রমান্বয়ে উৎপাদনশীলতা ও কর্মদক্ষতা বাড়াতে বাড়াতে পুজিবাদী অর্থনীতি এমন একটা অবস্থায় এসে পৌছায় যে অতিউৎপাদন আর বেকারত্বের চাপে একসময় একেবারে থমকে যায়। এই মুহুর্তে ব্যাংকারদের হিসাব বাদ দিয়ে শুধু পুজিমালিকদের কাছেই ২ হাজার বিলিয়ন ডলারের বেশি পুজি জমে আছে যেটা তারা বিনিয়োগ করছে না কারণ জনগণের কাছে ব্যায় করার মতো অর্থ নাই অর্থাৎ তাদের সম্ভাব্য উৎপাদিত পণ্যের বাজার নাই, মুনাফাও নাই।

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ৪৪৭ বিলিয়ন ডলারের নতুন একটা বিল উত্থাপন করেছেন গত ৭ সেপ্টম্বর ২০১১ তে। দুই দিন পর নিউ ইয়র্ক টাইমস এর হেডলাইন হয়: “মালিকেরা বলছেন নতুন কর্মসংস্থানের জোয়ার আসবে না”। মালিকেরা বলছে তারা নতুন নিয়োগ দেবে না কারণ বাজারে বাড়তি পণ্যের চাহিদা বা জনগণের পর্যাপ্ত ক্রয়ক্ষমতা নেই ফলে বাড়তি কর্মসংস্থানের সুযোগও নেই। কিন্তু মুশকিল হলো নতুন কর্মসংস্থান না হলে তো লোকের ক্রয় ক্ষমতাও বাড়বে না, বাজারের চাহিদাও বাড়বে না!

ক্রমহ্রাসমান মুনাফার হার, অতি উৎপাদন ও পুজিবাদের চরম সংকট:

পুজিবাদের যতই বিকাশ ঘটতে থাকে ততই যন্ত্রপাতির তুলনায় শ্রমিকের চাহিদা কমতে থাকে। কারণ প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার জন্য পুজিপতিকে বিভ্ন্ন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যাবহারের মাধ্যমে কম সময়ে বেশি উৎপাদনের দিকে অর্থাৎ শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে ঝুকতে হয়। যে পুজিপতি তার অন্য প্রতিযোগীদের আগেই বিভিন্ন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যাবহারে মাধ্যমে কম সময়ে তার প্রতিযোগীর তুলনায় বেশি পণ্য উৎপাদন করতে পারবে অর্থাৎ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবে তার মুনাফার পরিমাণও প্রতিযোগীতার তুলনায় বেশি হবে কারণ এখন সে একজন শ্রমিকের কাছ থেকে একই মজুরীতে বা খরচে প্রতি ঘন্টায় আগের চেয়ে বেশি পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করিয়ে নিতে পারে। ফলে তার পক্ষে একই সময়ে বাড়তি পণ্য উৎপাদন করে সেটা বাজারে বিক্রি করে বাড়তি মুনাফা অর্জন সম্ভব হয়। কিন্তু এর ফলে একই সাথে দুটো ঘটনা ঘটে: একদিকে একই পরিমাণ্য পণ্য উৎপাদনের জন্য এখন আগের চেয়ে কম সংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, ফলে শ্রমিক ছাটাই হয়, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল রিজার্ভ আর্মি বড় হতে থাকে অন্যদিকে মুনাফার হার কমতে থাকে। মুনাফার হার নির্ধারিত হয় বিনোয়োগের তুলনায় মুনাফার পরিমাণ দ্বারা। যদি ১০০ টাকা বিনিয়োগ করে ১০ টাকা মুনাফা করা যায় তাহলে মুনাফার হার ১০%। যদি ১০০০ টাকা খরচ করে নতুন যন্ত্রপাতি কিনে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ২০ টাকা মুনাফা করা যায় তাহলে মুনাফার হার ২%। প্রথম ক্ষেত্রের চেয়ে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মুনাফার পরিমাণ বেশি হলেও যেহেতু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বেশি, তাই মুনাফার হার কমে গেছে। যেহেতু শ্রমিকের উদ্বৃত্ত শ্রম থেকেই মুনাফা তৈরী হয়, ফলে প্রতি ঘন্টায় একজন শ্রমিকের শ্রমের মাধ্যমে আগের চেয়ে বেশি পণ্য উৎপাদনের ফলে প্রতিটি পণ্যে আগের তুলনায় কম উদ্বৃত্ত শ্রম বা মুনাফা থাকে। এই নতুন হ্রাসকৃত মুনাফার হারে বেশি মুনাফা অর্জনের জন্য পুজিপতিকে আগের চেয়ে ক্রমশ বেশি পরিমাণ পণ্য বিক্রিয় করতে হয়। কিন্তু বেশি পণ্য কিনবে কে? ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিজার্ভ আর্মি বড় হওয়ার কারণে সমাজের তো ক্রয় ক্ষমতা তুলনামূলক ভাবে কমতে থাকে অর্থাৎ উৎপাদনের তুলনায় ক্রয় ক্ষমতা কমে যায়, দেখা দেয় অতি উৎপাদনের সংকট। এভাবে পুজিবাদের বিকাশের প্রয়োজনে যে উৎপাদনশীলতার বিকাশ ঘটানো হয় সেই উৎপাদনশীলতাই একসময় পুজিবাদের বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাড়ায়। পুজিবাদী অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত এই দ্বন্দ্ব চলতে থাকে এবং নানান ভাবে কখনও একচেটিয়া করণের মাধ্যমে, কখনও বড় পুজি ছোট পুজিকে হজম করার মাধ্যমে, কখনও যুদ্ধ বাধিয়ে, কখনও ঋণ সরবরাহ বাড়িয়ে, কখনও ফাইনান্সিয়ালাইজেশানের মাধ্যমে পুজিবাদ এ দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করার চেষ্টা করে। কিন্তু গত কয়েক দশকে প্রযুক্তিগত বিপ্লব, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ক্রমহ্রাসমান মুনাফার হার, অতি উৎপাদনের সংকট ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে পুজিবাদ এখন এমন একটা পরিস্থিতিতে উপনীত হয়েছে যে এখন কোন ভাবেই আর এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারছেনা।

মন্দা কাটানোর জন্য ঋণ সরবরাহ ও ফাইনান্সিয়ালাইজেশানের মাধ্যমে কৃত্রিম ভাবে ক্রয় ক্ষমতা বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হলেও হাউসিং বাবলের বিস্ফোরণ ও ঋণের ঢল থেমে যাওয়ার পর দেখা গেল বাজার অবিক্রিত পণ্যে সয়লাব হয়ে আছে। কারখানাগুলোর যে পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করার ক্ষমতা আছে তার সম পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করলে পণ্য অবিক্রিত থেকে যাবে বলে কারখানাগুলো উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করছে। গাড়ি কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ২০০৮ সালে ছিল ১ কোটি ৮৩ লক্ষ কিন্তু ২০০৯ সালে দেখা গেল তারা মাত্র ১ কোটি ১০ লক্ষ গাড়ি বাজারজাত করার পরিকল্পনা করছে। বিক্রয় যোগ্য বাড়তি বাড়ির পরিমাণ ছিল সে সময় ১৩ লক্ষ। একই ভাবে স্টিল, মাইক্রোচিপ ইত্যাদি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের ক্ষেত্রেও অতি উৎপাদনের নানান লক্ষণ দেখা যায়। বস্তুত গৃহায়ণ কিংবা অটোমোবাইলের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোতে অতি উৎপাদনের সংকট সাধারণ ভাবে বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রপাতি, কাচামাল ইত্যাদি শিল্পেও অতি উৎপাদনের সংকট তৈরী করে।

এরকম সংকট জনক পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য লাভজনক বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুজতে লগ্নী পুজি একসময় সারা দুনিয়াকে তার বিনিয়োগের ক্ষেত্র বানিয়েছে। একসময় এভাবে প্রান্তস্থ দেশগুলো থেকে, যেখানে পুজিবাদ তুলনামূলক কম বিকশিত ফলে পুজিবাদের সংকটও অপরিণত, সেখানে পুজি রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল মুনাফা আহরণ করেছে এবং তার বিনিময়ে নিজ দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও শ্রেণী সংগ্রামকে সামাল দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ব্শ্বিায়িত দুনিয়ায় ইতোমধ্যেই সারা দুনিয়ার প্রায় সমস্ত লাভজনক ক্ষেত্রে পুজিবাদী অর্থনীতির নিয়মের আওতায় চলে আসা, নতুন বৈশ্বিক শ্রম বিভাজন, ম্যানুফ্যাকচারিং এর লাভজনক আউট সোর্সিং ইত্যাদির ফলাফল স্বরুপ পুজি রপ্তানি এখন সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা উন্নয়ণের বদলে মজুরী হ্রাস, শ্রমিক ছাটাই, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যায় হ্রাস ইত্যাদি কাজে ব্যাবহ্রত হচ্ছে। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পুজিবাদী অর্থনীতির কেন্দ্রে থাকা দেশগুলোতে শ্রেণী সংগ্রাম জোরদার হয়ে উঠার পরিস্থিতি তৈরী হওয়াই স্বাভাবিক। স্পেন, গ্রীস, ইতালি, ইংল্যান্ড সহ গোটা ইউরোপ এবং মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র সহ দুনিয়ার দেশে অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট মুভমেন্টের দ্রুত ছড়িয়ে যাওয়া, জনপ্রিয় হয়ে উঠা তারই স্বাক্ষ্য বহন করে। এখন এই আন্দোলন কোন পথে যাবে, কতটুকু সার্থক হবে তা নির্ভর করবে কতটা সফল ভাবে আন্দোলনকারী শক্তিগুলো সত্যিকার শত্রু হিসেবে কেবল একচেটিয়া পুজিবাদের কর্পোরেট ফাইনান্সিয়াল চেহারাই নয়, খোদ পুজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যাবস্থাকেই চিহ্নিত ও তার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক আক্রমণ রচনা করতে পারবে তার উপর। তবে যাই ঘটুক না কেন এ আন্দোলন ইউরোপ আমেরিকার মতো ধনী দেশগুলো সহ গোটা বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের চিন্তা জগতে এক বৈপ্লবিক আলোড়ন যে তৈরী করছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ রাখার কোন কারণ নেই।


কৃতজ্ঞতা:
মূলত Fred Goldstein এর CAPITALISM AT A DEAD END- Job Destruction, Overproduction and Crisis In the High Tech Era লেখাটি অবলম্বন করে এই লেখাটি তৈরী করা হয়েছে।
Click This Link

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29470331 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29470331 2011-10-22 01:56:41
আসিফের মুক্তির দাবীর সমাবেশ পরিণত হউক হয়রানির প্রতিবাদ আর জগন্নাথ সংহতির সমাবেশে: চলে আসুন ৪টায়, শাহবাগে
“বুদ্ধিবৃত্তি ও শিল্প সাহিত্যের প্রতি বিবমিষা: ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা এবং একাডেমিশিয়ানদেরকে শত্রু হিসেবে ধরা হয় এবং শিল্প-সাহিত্যে মুক্তচিন্তার প্রকাশকে সরাসরি আক্রমণ করা হয়।“
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারিকরণের ধান্দা ও তার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গড়ে ওঠা আন্দোলনে সংহতি সংগঠিত করতে গিয়ে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনের ডিবি পুলিশের কাছে আটক হওয়া- এই দুই ঘটনা ১১ নম্বর বৈশিষ্টটির সাথে খাপে খাপে মিলে যায়।একদিকে উচ্চশিক্ষাকে দু:স্প্রাপ্য কর, বেসরকারি করণ কর, বাণিজ্যিকীকরণ কর অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের গলা টিপে ধর। এই ততপরতাই তো চালাচ্ছে রাষ্ট্র। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দোষ তারা শিক্ষাকে পণ্য বানানোর বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছে আর ব্লগার অনলাইন অ্যাক্টিভিষ্ট আসিফ মহিউদ্দীনদের দোষ তারা এই শিক্ষা রক্ষার লড়াইয়ে সংহতি জানিয়েছে। এই দুটি ঘটনাই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা নিজেদের শিক্ষাজীবন রক্ষা করার আন্দোলনে নেমে গোটা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যাবস্থা বাণিজ্যিকরণের বিরুদ্ধে নেতৃত্বের কাতারে দাড়িয়ে গেছে আর ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীন ও তার সহ-ব্লাগার অ্যাক্টিভিষ্টরা সেই লড়াইয়ে সংহতি প্রকাশ করতে গিয়ে আজকে বাংলাদেশে মুক্তিচিন্তা-মুক্তিবুদ্ধি সহ বৃহত্তর জনগণের পক্ষে দাড়ানোর সর্বশেষ অবশিষ্ট জায়গাটির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে সামনে চলে এসেছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্যিকরণের ধান্দা যেমন আলাদা কোন ঘটনা নয়, কুমিল্লা-কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের ধান্দারই অংশ, তেমনি তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংহতি জানানো আসিফ মহিউদ্দীন সহ ব্লগার অ্যাক্টিভিষ্টদের লড়াইটাও কেবল কয়েকজন ব্লগারের বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বন্ধুরা খেয়াল করেন, বাংলা ভার্চুয়াল ব্লগ কিন্তু ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির মধ্যে সীমাব্ধ থাকেনি, সবসময়ই দেশ ও দশের বাস্তব সমস্যায় নাক গলিয়েছে-শুধ ভার্চুয়ালি নয়, শুধু লেখা লেখি করে নেয়- একেবারে সরাসরি রাস্তায় নেমে। এখন এই রাস্তায় নেমে আসার ফলে, নিজেদের স্বাধীন গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের ফলে যদি আসিফ মহিউদ্দীনের মতো অ্যাক্টিভিষ্টদের রাষ্ট্রের ফ্যাসিস্ট আক্রমণের শিকার হতে হয় এবং যদি আমরা আমাদের ততপরতার মাধ্যমে, মতামত গঠনের ক্ষমতার মাধ্যমে সময় মতো নিজেদের শক্তি সামর্থ্য’র জানান দিতে না পারি, যদি রাষ্ট্রকে স্পষ্ট সিগনাল দিতে না পারি যে মতামত প্রকাশের জন্য, প্রতিবাদ প্রতিরোধের জন্য কাউকে এভাবে আসিফ মহিউদ্দীনের মতো আটক করে রাখা, ভয়ভীতি দেখানো,হয়রানি করার ফ্যাসিবাদী ততপরতাকে আমরা সহ্য করব না, তাহলে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যাবস্থা কিন্তু আমাদেরকে আরো পেয়ে বসবে।

কাজেই সহ-ব্লগার বন্ধুগণ, আমাদের কাধে এখন একাধিক দ্বায়িত্ব চলে এসেছে- একদিকে শিক্ষা বাণিজ্য প্রতিরোধ এবং অন্যদিকে ব্লগিং-মুক্তচিন্তা প্রকাশের শেষ আশ্রয়স্থল এই ব্লগিংকে রক্ষা করা। ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে হয়রানির প্রতিবাদ এবং সেই সাথে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বাণিজ্য প্রতিরোধ আন্দোলনের সংহতি প্রদান- এই দুটো আজ একসূত্রে গাথা।

আসুন, বন্ধুগণ, রাস্তায় নেমে আসুন- সময় হয়েছে এবার আমাদের নিজেদের শক্তির জানান দেয়ার।

দেখা হবে, আজ একটু পর, শাহবাগ মোড়ে, বিকাল ৪টায়।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29458777 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29458777 2011-10-02 14:27:25
সারী নদীর উজানে মাইনথ্রু-লেসকা বাধ: ভারতীয় “বন্ধুত্বের” আরেক নিদর্শন!
সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানিগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া সারী-গোয়াইন বা হারি গাঙ নদীর উতপত্তি ভারতের মেঘালয় পর্বতে। জৈন্তাপুরের লালখাল এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের আগে মাইনথ্রু(MYNTDU) নদী নামে প্রবাহিত হয়েছে। এই মাইনথ্রু নদীতেই মেঘালয়ের লেসকা অঞ্চলে “মাইনথ্রু লেসকা হাইড্রোইলেক্ট্রিক প্রেজক্ট” নামে ১২৬ মেগাওয়াটের(৪২*২ + ৪২*১) এ্কটি জলবিদ্যুত প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে ভারত।
সূত্র: Myntdu Leshka St-I H.E. Project
http://meseb.nic.in/leshka.htm



২০০২ সালে উদ্বোধন হওয়া এই প্রকল্পটি চলতি সেপ্টম্বর মাসেই চালু হওয়ার কথা।
সূত্র:http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=db1f9216e9ca7015a7186f2ca72a94b0&nttl=2011090656470


ছবি: প্রজেক্টের কাজ প্রায় শেষ
সূত্র: Status of Works of Myntdu Leshka HE Project
http://meseb.nic.in/leshka/StatusofWorks.pdf

প্রকল্পের ওয়েবসাইটে এটাকে রান অফ রিভার(Run Off River) ড্যাম বলে চিহ্রিত করা হলেও বাস্তবে বাধের ঠিক আগে লামু(Lamu), উমসারিয়াঙ(Umshariang) এবং মাইনথ্রু(Myntdu) এই তিন নদীর মোহনায় একটি বড় আকারের জলাধার নির্মাণের ফলে এটি আর রান অফ রিভার ড্যামের মতো কাজ করবে না। কারণ সাধারণ ভাবে রান অফ রিভার বাধের ক্ষেত্রে নদীর বেশির ভাগ পানি পাইপ বা টানেলের মাধ্যমে বিদ্যুত উতপাদনকারী টারবাইনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত করে তারপর আবার সেটাকে নীচের দিকে নদীর পুরোনো গতিপথে ফিরিয়ে দেয়া হয়, জলেধারে বিপুল পরিমাণ পানি ধরে রাখা ও সুবিধা মতো সময়ে পানি প্রবাহ বাড়ানো কমানোর তেমন কোন ব্যাপার থাকে না।
In general, projects divert some or most of a river’s flow (up to 95% of mean annual discharge)[4] through a pipe and/or tunnel leading to electricity-generating turbines, then return the water back to the river downstream.
সূত্র: Click This Link

কিন্তু এক্ষেত্রে জলাধার ব্যাবহার করে প্রয়োজনের অনুযায়ী পানি ধরে রাখা এবং প্রয়োজন মতো পানি ছেড়ে দেয়ার সুযোগ থাকায় আর দশটা জলবিদ্যুত প্রকল্পের মতোই নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহের উপর কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে বাধটি যার খেসারত দিতে হবে নদীর ভাটি অঞ্চলে অবস্থিত জনগণকে।


ছবি: মাইনথ্রু-লেসকা হাইড্রোইলেক্ট্রিক প্রজেক্টের লেআউট ম্যাপ

তাহলে জলাধারে পানি ধরে রাখার সুযোগ রাখার পরও কেন এটিকে রান অফ রিভার ড্যাম বলা হচ্ছে? উইকিপিডিয়ায় এ সম্পর্কে একটা ইন্টারেষ্টিং বক্তব্য পাওয়া গেল:
The use of the term "run-of-the-river" for power projects varies around the world and is dependent on different definitions. Some may consider a project ROR if power is produced with no storage while a limited storage is considered by others. Developers may mislabel a project ROR to sooth public image about its environmental or social effects.
সূত্র: Click This Link

তাহলে দেখা যাচ্ছে রান অফ রিভার নাম করণেরও একটা রাজনীতি আছে। বাধের পরিবেশগত এবং সামাজিক প্রভাবকে আড়াল করার জন্য অপেক্ষাকৃত “পরিবেশ সম্মত” বলে পরিচিত রান অফ রিভার ড্যাম বলে লেবেল দেয়া হচ্ছে। বাস্তবে এর সমস্ত আয়োজন ট্র্যাডিশনাল হাইড্রোইলেক্ট্রিক বাধের মতোই, ট্রাডিশনাল হাইড্রোইলেক্টিক প্রজেক্টের মতোই এতে পানি ধরে রাখা এবং সুযোগ মতো পানি ছাড়া অর্থাত পানির প্রাকৃতিক প্রবাহের পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটানোর ব্যাবস্থা আছে।
ফলে আশংকা হলো, মাইনথ্রু-লেসকা বাধ নির্মাণের ফলে ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া সারী নদীর প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের হ্রাস বৃদ্ধি, পলি প্রবাহ, নদীর পানির গতি-তাপমাত্রা, মতস সম্পদ, জলজ উদ্ভিদ ইত্যাদি অর্থাত নদী কেন্দ্রিক গোটা বাস্তু সংস্থানের উপরই বিরুপ প্রতিক্রিয়া পড়বে এই বাধ নির্মাণের ফলে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম.ইনামুল হক বলেন:
“ড্যাম এর জলাধারের কারণে আশপাশের কৃষিজমি ভেসে যাবে, জনবসতি উচ্ছেদ হবে, পশুপাখির আবাস নষ্ট হবে আর বাধের কারণে মাছ নদীর উজানে যেতে না পেরে ব্রিডিং গ্রাউন্ড হারাবে। আর বাংলাদেশে আসা মাছের পরিমাণ কমে যাবে, পানি প্রবাহ বিঘ্নিত হবে যা আবার শীতাকালিন ফসলের ক্ষতি করবে। আমাদের উচিত এই প্রকল্পের বিরোধীতাকারী ভারতীয় জনগণ ও পরিবেশবাদীদের সমর্থন করা।“



সিলেটের আঞ্চলিক পত্রিকা শ্যামল সিলেট এ বিষয়ে লিখেছে:

“সারী নদীর উজানে বাধ দেয়ার খবর পেয়ে এ নদী তীরবর্তী অঞ্চলের লোকজন ক্ষোভে ফুসছেন। বাধ অপসারণের দাবীতে গঠন করা হয়েছে “সারী নদী বাচাও আন্দোলন”। সংগঠনের সমন্বয়ক লিডিং ইউনিভার্সিটির সহকারী রেজিস্টার আব্দুল হাই জানান ব্যাবসা সংক্রান্তকারণে জৈন্তাপুরের লোকজন জৈন্তিয়া হিল ডিস্টিক্টে যাতায়াত করেন। ভারতে যাতায়াত কারী ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকেই আমরা প্রথম বাধ নির্মাণের খবর পাই। পরে মাইন্ডু লেসকা হাইড্রোইলেক্ট্রিক প্রজেক্টের ওয়েবসাইট থেকে আমরা বিষয়টি নিশ্চিত হই। তিনি বলেন বাধের কারণে সারী নদী মরে যাবে। নদী তীরবর্তী এলাকার লোকজনের জীবন জীবিকার উপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। এ প্রসঙ্গে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক ড.মুহম্মদ আব্দুর রব বলেন, তিনি মাইন্ডু লেসকা হাইড্রোইলেক্ট্রিক প্রজেক্ট ও মেঘালয় এনার্জি কর্পোরেশান লিমিটেড এর ওয়েবসাইট থেকে বাধটি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। তিনি বলেন উজানে বাধ দেয়ার ফলে সারী নদীর স্বাভাবিক গতি বিঘ্নিত হবে।পানির সঙ্গে পলি আসা বন্ধ হওয়ায় এ অঞ্চলের মাটির উর্বরতা কমে আসবে। শীতকালে নদীর পানি স্বল্পতার কারণে কৃষিকাজ বিঘ্নিত হতে পারে। সিলেট অঞ্চলের উদ্ভিদ ও জলজ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পাশাপাশি ইকোসিস্টেমের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। তার মতে বাংলাদেশ সফরে আসা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সামনে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর এ বাধ ও বিদ্যুত প্রকল্প বাতিলের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ জানাতে হবে।“ সূত্র: Click This Link

আমরা “সারী নদী বাচাও আন্দোলন” এর সাথে সংহতি প্রকাশ করছি এবং সেই সাথে বাংলাদেশকে না জানিয়ে, বাংলাদেশের সস্মতি-অসম্মতির তোয়াক্কা না করে ভারতের এই বাধ নির্মাণ ও চালু করে ফেলার সকল প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য ভারতের সাথে বন্ধু বন্ধু খেলা বাদ দিয়ে রাষ্ট্রীয় ভাবে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক ভাবে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের দাবী জানাচ্ছি।

কৃতজ্ঞতা: লেখায় ব্যাবহ্রত মানচিত্র এবং তথ্য দিয়ে সহোযোগিতা করেছেন প্রকৌশলী ম.ইনামুল হক।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29445482 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29445482 2011-09-09 22:36:38
কোম্পানির বীজ “ঝলক”: ঝলসানো কৃষক, ক্ষতিপূরণ ও বীজ নিরাপত্তার লড়াই
এই বাজারি যুগে শুধু কৃষকের রক্ত-ঘাম ঢালা শ্রম আর প্রকৃতির কৃপা হলেই চলে না, বীজ কোম্পানির উপরও নির্ভর করতে হয় ফসলের সোনা মুখ দেখতে। গত বোরো মৌসুমে ভূমিহীন কৃষক আজগর আলি ৩ একর জমি বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বর্গা নিয়ে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ২৫ হাজার টাকা ধার করে দেশী উফশী জাতের বীজের তুলনায় ৮/১০ গুণ বেশি দামের চীনা হাইব্রিড ঝলক ধানের চাষ করেছিলেন। কৃষি অধিদপ্তরের স্থানীয় মাঠকর্মীদের কথা শুনে এবং স্থানীয় কেবল টিভিতে আমদানী কারক কোম্পানি এগ্রো-জি’র (http://www.agro-g.com/news_details.php?nid=9) দেয়া বিজ্ঞাপন দেখে আজগর আলী আশা করেছিলেন দেশী জাতের চেয়ে বেশি ফলন ক্ষমতার এই হাইব্রিড ঝলক ধান(এগ্রো-জি ১) পাকলে চাষের খরচ, মহাজনের ঋণের সুদ-আসল দিয়ে থুয়ে অন্তত ১০০ মণ ধান তার লাভ হিসেবে থাকবে। প্রতিমণ ৮০০ টাকা করে হলে এভাবে ৮০ হাজার টাকা তার হাতে আসার কথা। এটাই তার সারা বছরের খোরাকী জোটাবে। কারণ আজগর আলী যে অঞ্চলের মানুষ সেই নোয়াখালির বেশির ভাগ জমিই কয়েক যুগ ধরে জলাবদ্ধতার সমস্যাক্রান্ত হওয়ায় কেবল বোরো মৌসুমেই আবাদ যোগ্য। কিন্তু আজগর আলীর মতো এরকম অসংখ্য কৃষকের চাষ করা সাধের হাইব্রিড ঝলক ধান নষ্ট হয়ে গেছে, ধান পোক্ত হওয়ার আগেই শীষ শুকিয়ে গেছে। একদিকে মহাজনের কাছ চড়া সুদে নেয়া ঋণের বোঝা আর অন্যদিকে পরিবারের খোরাকি যোগারের অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটছে তাদের।



নোয়াখালি অঞ্চলের ১ হাজার ৬৬৫ হেক্টর জমিতে ঝলক ধান চাষ হয় যার মধ্যে ৪৬৫ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি এবং বাদবাকি জমির ফসলও অনেকাংশে নষ্ট হয়েগেছে। শুধু নোয়াখালি নয়, এ বছর সারাদেশে সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চুয়াডাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, জামালপুর, নেত্রকোনা ও কুমিল্লা অঞ্চলের যেখানেই ঝলক চাষ হয়েছে, প্রায় সর্বত্রই ফসল বিপর্যয় দেখা দেয়। হাইব্রিড ঝলক বীজের সমস্যার কারণে একযোগে সারাদেশে ফসল বিপর্যয় ঘটার ক্ষতিপূরণ দাবী করে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা আন্দোলন সংগ্রাম-মানব বন্ধন-সমাবেশ-স্মরকলিপি প্রদান-নষ্ট ধান পোড়ানো কর্মসূচী পালন করলেও সরকার ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পাশে দাড়ায় নি, বীজ কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা তো দূরের কথা চীন থেকে আমদানীকৃত WINALL HIGHTECH COMPANY’ (http://winall.globalimporter.net/)র উতপাদিত এই হাইব্রিড বীজের সমস্যার কারণেই যে এই বিপর্যয়টি ঘটেছে সেটাই আড়াল করতে চাইছে।

সরেজমিন অনুসন্ধান:
ঝলক ধান বিপর্যয়ের বিষয়টি সম্পর্কে অনুসন্ধান করবার জন্য আমরা কয়েকজন গত ২৯ জুলাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা নোয়াখালিতে যাই। স্থানীয় সাংবাদিক, এনজিও কর্মকতা, রাজনৈতিক কর্মী, কৃষিবিদ, কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকতা সহ নোয়াখালি সদর এবং বেগমগঞ্জ উপজেলার কৃষকদের সাথে এ বিষয়ে আমাদের কথা হয়। ভূমিহীন কৃষক আজগর আলী, মুক্তিযোদ্ধা কৃষক এনায়েত মেম্বার কিংবা তরুণ কৃষক শিমুলের সাথে সেখানেই পরিচয়।



কৃষি মন্ত্রণালয় গঠিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি)এর তদন্ত দল কিংবা বীজ কোম্পানির পক্ষ থেকে এই ফসল বিপর্যয়ের জন্য বিরুপ আবহাওয়া /হঠাত নিম্ন তাপমাত্রার কারণে নেক ব্লাষ্ট রোগ হওয়ার কথা প্রচারের ব্যাপারটি তুললে তারা পরিস্কার যুক্তি দিয়ে বলেন, একই এলাকায় পাশাপাশি জমিতে দেশীয় বিআর জাতের ধান, আরেকটি হাইব্রিড হিরা ধানের সাথে ঝলকের চাষ হয়েছে, আবহাওয়া কিংবা তাপমাত্রার কারণে হলে তাহলে অন্য জাতের ধানের কোন ক্ষতি না হলেও কেবল ঝলক ধান-ই নষ্ট হলো কেন? আর শুধু নোয়াখালি না সারাদেশে যেখানেই ঝলক চাষ হয়েছে সেখানেই একই ঘটনা ঘটেছে। ফলে তারা এ বিষয়ে নি:সন্দেহ যে সমস্যাটি বীজে-ই ছিলো। স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদের বক্তব্যও অনুরুপ। তিনি মনে করেন, বীজের মধ্যে রোগের উপাদন(নেক ব্লাস্ট ছত্রাক জনিত রোগ) বা অন্য কোন দুর্বলতা সুপ্ত অবস্থায় ছিলো বলেই নেক-ব্লাষ্ট ছড়ানোর অনুকুল আবহাওয়া পাওয়া মাত্রই সারা দেশেই ঝলক ধানে রোগটি ছড়িয়েছে কিন্তু অন্য জাতের ধানের ক্ষেত্রে তেমন ঘটেনি। ফলে বীজে সমস্যা নেই বলে পার পাওয়ার কোন উপায় কোম্পানির নেই। হয়তো এ ধরণের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই এগ্রো জি বীজের প্যাকেটের গায়ে লিখে রেখেছে: ”সীমাবদ্ধতা- বিশ্বব্যাপি বীজ ব্যাবসার প্রতিষ্ঠিত নিয়মানুযায়ী অ-মৌসুমে বীজ বপন কিংবা প্রাকৃতিক বা কৃত্রিমভাবে তৈরী অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, মাটির গঠন দুর্বলতায় কিংবা অন্য কোন অপ্রাকৃতিক ও অস্বাভাবিক অবস্থার কারণে বিক্রীত বীজের বর্ণিত গুনাগুন ও উতপাদনশীলতার তারতম্যের ক্ষেত্রে কোন নিশ্চয়তা প্রদান করা সম্ভব নয়।”


আবহাওয়ার বিপর্যয়ের দায় বীজ কোম্পানির না নেয়াটাই স্বাভাবিক কিন্তু সেক্ষেত্রে নিশ্চিত ভাবেই প্রশ্ন আসে তাহলে ঐ বীজের জন্য আদর্শ বা সহনীয় আবহাওয়া টা আসলে কি? সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন কত তাপমাত্রায়, কতটুকু বৃষ্টিপাত বা জলাবদ্ধতায় এবং কি ধরণের মাটিতে বীজটি ভালো হবে, সেটা সুনির্দিষ্ট করে না বললে কোনটা অনুকুল আবহাওয়া আর কোনটা প্রতিকুল সেটা নির্ধারিত হবে কি ভাবে? ফলে এ ধরণের ফাপা দায়মুক্তি কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বীজের প্রতিশ্রুত মান নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষতিপূরণ
ঝলক বীজের চকচকে প্যাকেটের গায়ের জ্বলজ্বল করছে লোভনীয় কিছু প্রতিশ্রুতি:
সঠিক চাষে একর প্রতি ফলন ১২০ থেকে ১৩৫ মণ। ধান মাঝারি চিকন ও লম্বা, ভাত ঝরঝরে ও সুস্বাদু। গাছ হেলে পড়ে না, শীষে চিটা হয় না এবং ধান ঝরে পড়ে না।


কিন্তু বেশী ফলন তো দূরের কথা, কোন ফলনই বেশির ভাগ কৃষক পায়নি ঝলক থেকে। একর প্রতি ফলন শূন্য। শীষে চিটা হয়েছে, ধান ঝরে পড়েছে। ভাত সুস্বাদু কিনা বোঝা যায় নি কিন্তু খড় গরুও খেতে চায় নি! তাহলে প্রশ্ন হলো, বীজ আমদানী ও বাজারজাত করণের বেলায় বীজ নিবন্ধন ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কি করেছে? জাতীয় বীজ নীতি’র আর্টিক্যাল ৯.৬ অনুসারে বীজের মান নিশ্চত করণের জন্য লেবেলে বর্ণিত মান এবং প্যাকেটে অথবা পাত্রেস্থিত বীজের মান সমান হতে হবে। আর্টিক্যাল ৮.২ অনুসারে, কোন বীজ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আমদানির আগে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ফিল্ড টেস্ট করতে হয়। ফিল্ড টেস্ট এ প্রতিশ্রুত মান ও গুণাগুন প্রমাণিত হলেই কেবল বীজ আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়। এর পর প্রতিবছর আমদানীর বেলায় বীজ বিদেশ থেকে দেশে ঢুকার সময়ই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কোরেন্টাইন সেন্টার এ রেখে পরীক্ষা নীরিক্ষা করা হয় যে এতে কোন রোগজীবাণু আছে কি-না। আর্টিক্যাল ১১.৪ অনুসারে বীজ অনুমোদন সংস্থার কাজ হলো, “পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে বিক্রোয়োত্তর পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ করা”, “উতপাদনে দুর্বলতা দেখা গেলে, রোগ ও পোকামাকড়ের সন্দেহ থাকলে জাতীয় বীজ বোর্ডকে উক্ত জাতের অনুমোদন বাতিল করার উপদেশ প্রদান” যদিও বীজ নীতি/আইনের কোথাও বলা নেই লেবেলে উল্ল্যেখিত গুনাগুনের ব্যাতিক্রম ঘটলে আমদানী কারক বা উতপাদন কারী কোম্পানির কাছ থেকে কোন ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে কি-না!

বীজের মাননিয়ন্ত্রণের জন্য বীজ নীতিতে যতটুকুই আছে, ঝলক ধানের বেলায় কি সেগুলো অনুসরণ করা হয়েছে? চীনা কোম্পানি উইনঅল হাইটেক এর উতপাদিত এগ্রোজি-১ বা ঝলক ধান এনার্জি প্যাক এর এগ্রো জি কোম্পানি কর্তৃক দেশে আমদানী করার বেলায় কি এবার সে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে? তাহলে পরীক্ষায় কোন সমস্যা ধরা পড়ল না কেন? বীজ প্যাকেটজাত করার আগে বীজ কোম্পানি কি যথাযথ ভাবে বীজ ট্রিটমেন্ট করেছিল? বিক্রোয়োত্তর পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ করা তো দুরের কথা বিক্রির সময় ডিলাররা কৃষকদেরকে যে বীজ বিক্রির রশীদ পর্যন্ত প্রদান করেনা, তা ঠেকানোর ব্যাবস্থা কি করা হয়েছে? লক্ষ একরের বেশী জমির ফসল নষ্ট হওয়ার পরও কোম্পানির বিরুদ্ধে কি কোন ব্যাবস্থা নেয়া হয়েছে? আর্টিক্যাল ১১.৪ অনুসারে বীজ অনুমোদনের বাতিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোজা জরুরী। কারণ প্রায়ই দেখা যাচ্ছে বেসরকারি কিংবা বিদেশী কোম্পানির বীজ কিনে প্রতারিত হচ্ছে কৃষকরা। হাইব্রিড ধান ঝলকের পাশাপাশি বহুজাতিক সিনজেন্টা উতপাদিত হাইব্রিড টমোটো সুবল চাষ করেও প্রতারিত হয়েছে রাজশাহীর গোদাবাড়ির কৃষকরা। ২০১০ সালের রবি মৌসুমে রাজশাহীর গোদাবাড়ি উপজেলার সাড়ে আট হাজার কৃষক ছয় হাজার হেক্টর জমিতে সুবল জাতের টমেটো বীজ চাষ করে কোন ফলন পাননি। দেশের বিএডিসি উতপাদিত বিভিন্ন জাতের উচ্চফলন শীল বা হাই ইয়েল্ডিং ভেরাইটির ক্ষেত্রে তো এরকম বিশাল আকারের বিপর্যয় ঘটতে দেখা যায় না, তাহলে কেন বারবার হাইব্রিড বীজের বেলায় এরকম ঘটছে? আগামী বছরেও যে ঝলক বা বিজলী কিংবা হিরা বা যে কোন হাইব্রিড বীজ কিনে প্রতারিত হবে না কৃষকরা তার নিশ্চয়তা কি? শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, কৃষকের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা কিংবা বীজ অনুমোদন বাতিলের প্রস্তাব তো দূরের কথা এ বছর এগ্রো-জি কোম্পানিকে ১৫ মেট্রিকটন ঝলক বীজ আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার!

হাইব্রিড বীজ ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন:
দেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা এবং ক্রমহ্রাসমান কৃষি জমির বাস্তবতায় বরাবরই সমাধান হিসেবে সরকারি-বেসরকারি-দেশী-বিদেশী সকল পর্যায় থেকে হাইব্রিড শস্য আবাদের প্রেসক্রিপশন দেয়া হয়ে থাকে। এর পেছনে যুক্তি হলো প্রতি একক জমিতে হাইব্রিড বীজে দেশীয়/উফশী জাত থেকে বেশি ধান উতপাদিত হয়। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বেশী উতপাদন একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক সন্দেহ নাই কিন্তু এই বেশি উতপাদন কৃষকের জন্য বেশী ঝুকিপূর্ণ পরিস্থিতির তৈরী করে কিনা, কৃষকের জন্য তা লাভজনক কি-না, দীর্ঘ মেয়াদে তা জমি ও পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরী করে কি করে না ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা না করে কেবল বেশি উতপাদন এর হিসেব কষাটা কিন্তু মোটেই নিরাপদ নয়। স্থানীয় জাতের ধানের বদলে উচ্চ ফলনশীল বা উফশী ধানের ব্যাবহারের ফলে খাদ্য নিরাপত্তা বেড়েছে না কমেছে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। স্থানীয় জাতের ধানের ফলন কম হলেও সার-কীটনাশক-সেচ কম লাগত কিন্তু সবুজ বিপ্লবের সময় উচু মাত্রার রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যাবহার কারী উফশী ধানের চাষে আপাতত ফলন বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদে অতিরিক্ত সারের ব্যাবহারে জমির উর্বরতা হ্রুাস, কীটনাশক ব্যাবহারে উপকারী পরাগায়ী পতঙ্গ ধ্বংস ইত্যাদি কারণে দীর্ঘ মেয়াদে জমির ক্ষতি হচ্ছে ফলে খাদ্য নিরাপত্তা উল্টো ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বলে মতামত রয়েছে। এখন এর মধ্যে উফশীর চেয়েও বেশি সার-কীটনাশক-বালাইনাশক ব্যাবহারকারী এবং বন্ধ্যা বীজের হাইব্রিড উফশীর চেয়ে বেশি ফলন দিলেও বীজ নিরাপত্তার নিরিখে কতটা গ্রহণযোগ্য সেই প্রশ্নটা মাথায় রাখা জরুরী।
হাইব্রিডের সুবিধা: হাইব্রিড বীজের সবচেয়ে বড় সুবিধার কথা বলা হয় প্রতি একক জমিতে এর ফলন অন্য যে কোন দেশী জাতের তুলনায় বেশি। হাইব্রিড বীজ বাজারজাত কারী প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের পৃষ্ঠপোষকতায় করা একটি গবেষণা (Hybrid Rice Adoption in Bangladesh:A Socioeconomic Assessment of
farmers’ Experiencesby AM Muazzam Husain,Mahabub Hossain,Aldas Janaiah) থেকে এ বেশী ফলনের পরিসংখ্যানটুকু চলুন দেখে নেই:

হেক্টর প্রতি ধান উতপাদনের তুলনা:


দেখা যাচ্ছে হাইব্রিড অলোকের তুলনায় উফশী জাতের ফলন বেশী এবং হাইব্রিড সোনার বাংলার ফলন উফশীর তুলনায় ১১% থেকে ১৮% বেশী! আরেকটি বিষয় হলো, ধান থেকে চাল উতপাদনের পরিমাণ সব ক্ষেত্রেই হাইব্রিডের তুলনায় বিআর ধানের বেশী। যেমন বিআর-৬ এর ধান/চাল অনুপাত হলো ৬৮.৭৫ কিন্তু অলোকের ধান/চাল অনুপাত ৬২.৭ এবং সোনার বাংলার ৬৫%। এবার দেখা যাক এই বাড়তি ফলনটুকু পেতে গেলে কি কি ঝুকি কৃষকের উপর বর্তায়:

হাইব্রিড ঝুকি ১: হাইব্রিড বীজের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি বন্ধ্যা বীজ অর্থাত উতপাদিত ধান কে পুনারায় বীজ হিসেবে ব্যাবহার করা যায়না, সেক্ষেত্রে এর হাইব্রিড ভিগর(হাইব্রিড তেজ) বা হেটারোসিস নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষককে বীজের জন্য বিদেশী/বেসরকারি কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হতে হয় যেসব কোম্পানি মূল লক্ষ্য মুনাফা সর্বোচ্চকরণ। ফলে এসব কোম্পানির বীজ মনোপলির গ্যারাকলে আটকে কৃষক ক্রমশ কেজি প্রতি বীজে বাড়তি দাম দিতে বাধ্য হচ্ছে। এর একটা সমাধান হতে পারে বেদেশী/বেসরকারি কোম্পানির বদলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিএডিসি কর্তৃক হাইব্রিড বীজ উতপাদন ও স্বল্প মূল্যে বাজারজাত করণ। বীজ কে ক্রমশ কর্পোরেটাইজ করার বীজ নীতি প্রণয়ন কারী এবং বিএডিসি কে ক্রমশ অকার্যকর ও সারাদেশের মোট প্রয়োজনীয় বীজের খুব সামান্য অংশ সরবরাহ করা একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে যে শাসক শ্রেণী তাদের কে যদি এই কাজটি করতে বাধ্য করা যায়ও সেক্ষেত্রেও হাইব্রিডের বাদবাদি ঝুকি গুলো থেকেই যায়।

হাইব্রিড ঝুকি ২: উফশী জাতের তুলনায় হাইব্রিড জাতের ধান চাষের খরচ বেশি। বাড়তি খরচের একটি তুলনা নীচে দেয়া হলো:


ফলে হাইব্রিডে বাড়তি ধান উতপাদিত হয় ঠিকই কিন্তু তার জন্য খরচও করতে হয় বাড়তি। বাড়তি ধান উতপাদিত করে বাজারে বিক্রয় করলে যে লাভ কৃষকের থাকে তাতে কি বাড়তি বিনিয়োগের সাপেক্ষে যথেস্ট, দেশী উফশী ধানের সাথে একটা তুলনা করা যাক।


অর্থাত দেখা যাচ্ছে হাইব্রিড ধানের বেলায় বিনিয়োগের তুলনায় লাভের পরিমাণ উফশীর চেয়ে ১০% এর বেশী কম। যত দিন যেতে থাকবে জমিতে প্রযোজ্য সার, বীজের পরিমাণ/দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকলে দেশী জাতের তুলনায় হাইব্রিডের লাভজনকতা কমতে থাকবে।

হাইব্রিড ঝুকি ৩: রোগ বালাই প্রতিরোধের ক্ষমতা স্থানীয় জাতের তুলনায় উফশী জাতের কম। হাইব্রিড জাতের ক্ষেত্রে তা আরো কম। ফলে ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে যে হাইব্রিড পুষ্ট ও সবল দানা প্রচুর পরিমাণে উতপাদিত হবে, সে হাইব্রিড ধানই আবহাওয়া, তাপমাত্রা ও জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে সহজে খাপ খাওয়াতে না পারায় সময় সময় ফলন বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে। রোগবালাই ও কীটপতঙ্গের আক্রমণে হাইব্রিড ধানে সহজে কাতর হওয়ার পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে ব্র্যাকের করা গবেষণাটি থেকে:

ক) উফশী ধানের বেলায় যেখানে ৭৬% ক্ষেত্রে কীটনাশক ব্যাবহার করতে হয়েছে, হাইব্রিড অলোক ও সোনার বাংলা ধানের বেলায় তার হার যথাক্রমে ৯৪% ও ৮৮% ক্ষেত্রে।

খ) রোগবালাই ও পতঙ্গের আক্রমণে উফশী জাতের ক্ষেত্রে ফসলের ক্ষতিপরিমাণ ২০% এর নীচে থাকলেও হাইব্রিড জাতের ফসল একবার আক্রান্ত হলে ফসলের ক্ষতির পরিমাণ গড়ে মোট ফসলের ৩০% এর বেশি দেখা গিয়েছে।

গ) উফশী জাতের তুলনায় হাইব্রিডের জন্য কীটনাশক ব্যাবহারের খরচ ৬৭% বেশী।

কোম্পানি বান্ধব রাষ্ট্র ও কৃষকের ক্ষতিপূরণের লড়াই
সকল দিক বিবেচনা করলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সাথে কৃষকের বীজ নিরাপত্তা ও বীজের অধিকারের প্রশ্নটি ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত। অথচ কোম্পানি বান্ধব রাষ্ট্রের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নাই। আমরা থাকা অবস্থাতেই নোয়াখালির মাইজদিতে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পৃষ্ঠপোষকতায় এক বীজ মেলা অনুষ্ঠিত হয় যেখানে অবাধে এগ্রোজি, এসিআই কিংবা ব্র্যাকের মতো হাইব্রিড বীজ আমদানিকারক ও উতপাদনকারক কোম্পানি গুলোর বীজের বিক্রয় ও প্রদর্শনী চলছে। অবশ্য এরকমটাই তো হওয়ার কথা। দেশী-বিদেশী কোম্পানি বান্ধব রাষ্ট্রের বীজ নীতিতে এরকমটাই বলা আছে:

# বিশেষ করে বেসরকারি বীজ উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে আমদানির সুযোগ প্রদান করে উন্নতমানের বীজ ও রোপন সামগ্রী সংগ্রহ ও প্রবর্তন করা হবে।( আর্টিক্যাল ৩.৩)

# যে সকল বীজ বেসরকারি খাতে উতপাদিত হচ্ছে সেগুলোর উতপাদন থেকে বিএডিসি ধীরে ধীরে সরে আসবে(আর্টিক্যাল ১১.২.২ এর খ)

# উপজেলা পর্যায়ে বিএডিসি’র বীজ বিক্রয়কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করে বেসরকারি বীজ ডিলারগণকে সেস্থলে নিয়োজিত করা হবে।(আর্টিক্যাল ১১.২.৫)

আর এভাবে বেসরকারি খাতের পাল্লায় পড়ে ঝলক ধানের মতো ফসল বিপর্যয়ে কৃষক সর্বস্ব হারালেও তার ক্ষতিপূরণের কোন দায় রাষ্ট্র কিংবা বীজকোম্পানি কারো উপরে বর্তাবে না!



অবশ্য কৃষকরা বীজ নীতি/বীজ আইনে ক্ষতিপূরণের কোন ধারা না থাকলেও লড়াই করে ক্ষতিপূরণ আদায় করার ব্যাপারে আশাবাদি। তারা মনে করেন স্রেফ ভালো ফলনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে প্রতারণা বীজ কোম্পানি তাদের সাথে করেছে, সেই প্রতারণার অভিযোগেই বীজ কোম্পানির শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব। তারা বলেছেন মানব বন্ধন-সমাবেশ-স্মরকলিপি প্রদান অনেক হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঝখানে আন্দোলনে একটু ভাটা পড়লেও স্থানীয় ক্ষেতমজুর সমিতি ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের সাথে তারা কথা বলছেন সামনের আন্দোলণের ব্যাপারে। এবার “রাস্তার পাশে খাড়াই রোইদ পোয়ানো”র মানবন্ধন জাতীয় কর্মসূচীর মধ্যে তারা আর নাই, একেবারে রাস্তা অবরোধ করে রেখে ক্ষতিপূরণ আদায়ের কর্মসূচী নিতে চান তারা। আমরা কৃষকের এই ক্ষতিপূরণ আদায় ও বীজ নিরাপত্তার আন্দোলনের সাথে সংহতি জানাই।

আমাদের মতো দোকান থেকে সরু চাল কিনে খাওয়া মধ্যবিত্তের পক্ষে কৃষকের কাতারে দাড়িয়ে একমুঠো পুষ্ট বীজ, এক গন্ডা জমির সোনালি ধানের গুরুত্ব বোঝা একটু মুশকিল। কিন্তু সেইটা বোঝার চেষ্টা করা এবং বীজনিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের লড়াইয়ে কৃষকের পাশে দাড়ানোটা ভীষণ জরুরী, এবারের হাইব্রিড ঝলকের বিপর্যয়ে কয়েক হাজার টন ধান কম উতপাদনের ঘটনা সেই বার্তাই জানিয়ে যাচ্ছে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29428855 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29428855 2011-08-09 22:52:48
ট্রানজিট-বন্দর আর ভারতীয় বিদ্যুৎ: শোনেন গো, সিংগাপুর হইতে নাকি আমাগো আর দেরী নাই!
যেমন: ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের আওতায় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সরকার একটি কোর কমিটি গঠন করে। কোর কমিটি স্বল্পতম সময়ে ট্রানজিট বিষয়ে একটি অবস্থান পত্রের খসড়া দাড় করায়। এই খসড়ায় অবকাঠামোগত অপ্রতুলতায় আগামী তিন বছরের মধ্যে রেল ও সড়ক পথে ট্রানজিট দেয়া সম্ভব নয় বলে উল্ল্যেখ করে। বিকল্প হিসেবে এই সময় ট্রানসিপমেন্ট চালু করা এবং অবকাঠামো উন্নয়ণের পদক্ষেপ নিতে ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ট্রানজিটের ফলে বছরে এক কোটি ৭৪ লক্ষ মেট্রিকটন পণ্যের যান চলাচল করতে পারে। এটি সম্ভাব্য কিছু অনুমানের হিসেবে তৈরী করা হয়েছে। নানান কারণে এই অনুমান সঠিক নাও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ট্রানজিট মাসুল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের পণ্য বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে চলাচলের ফলে কত অর্থ বেচে যাবে এবং বিনিময়ে বাংলাদেশকে কত অর্থ ভারতকে মাসুল হিসেবে প্রদান করতে হবে তার তুলনা না করে বলা সম্ভব নয় বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে কত পরিমাণ পণ্য চলাচল করবে , তার জন্য বাংলাদেশের অবকাঠামোগত খরচ কত হবে এবং বিনিময়ে বাংলাদেশের লাভই বা কত হবে। কিন্তু এসব বিষয় নিশ্চিত না করে বিভিন্ন সময় হাজার হাজার কোটি টাকা লাভালাভের খোয়াব দেখানো হচ্ছে জনগণকে।

ট্রানজিটের লাভ-ক্ষতির হিসাব:
ট্রানজিট সুবিধা নিয়ে ভারত তার মূলভূখন্ড থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দ্রুততর সময়ে এবং স্বল্পতম খরচে মালামাল আনা-নেয়া করতে পারবে। বর্তমানে ১৫ টনি ট্রাক-লোড মালামাল আগরতলা থেকে কলকাতায় পরিবহনের খরচ ভারতীয় মুদ্রায় ৫০,০০০-৬০,০০০ রুপী (দূরত্ব ১৫০০ কিমি) আর ট্রানজিট হলে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পরিবহন করলে দূরত্ব কমে প্রায় ৫০০-৬০০ কিমি এ নেমে আসবে এবং ফলে প্রতি টনের খরত ২০০০ রুপী করে কমে যাবে। এক হিসেবে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রতি বছর ১ কোটি ৭ লক্ষ টন পণ্য পরিবহন করে এবং সেখান থেকে বছরে ২৩ লক্ষ টন পণ্য নিয়ে আসে। ফলে ট্রানজিট হলে পরিবহনের সময় এবং খরচ কম হওয়ায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ভারতের কেন্দ্রে আরো প্রতিযোগীতা মূল্যে তাদের পণ্য ও কাচামাল সরবরাহ করতে পারবে এবং কেন্দ্র থেকেও কমখরচে এবং কম সময়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্যসরবরাহ করা সম্ভব হবে। তাছাড়া বিদ্রোহ প্রবণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টারস রাজ্যগুলোতে বিদ্রোহ দমণের জন্য প্রয়োজনীয় সৈন্য ও সমরাস্ত্রও সরবরাহ করতে পারবে দ্রুত।



কিন্তু বাংলাদেশের কি লাভ? বলা হচ্ছে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যঘাটতি কমিয়ে নিয়ে আসার সুযোগ পাওয়া যাবে এবং শুল্ক বাবদ বিপুল অর্থ আয় করা সম্ভব হবে। দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক ঘাটতির পরিমাণ ৩০০কোটি ডলারের বেশী। আর সীমান্ত পথে চোরাচালানী হিসাবে নিলে সেখানেও বাণিজ্য ঘাটতি সমপরিমাণের। এখন ট্রানজিটের মাধ্যমে এই বাণিজ্য ঘাটতি কিভাবে কমবে সেটা আমাদের বোধগম্য নয়। বরং ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে আমাদের যে রপ্তানি বাণিজ্য আছে সেটাও ক্ষতিগ্রস্থ হবে কেননা যোগাযোগ সহজ হয়ে যাওয়ায় তখন ভারত-ই আমাদের চেয়ে বেশী প্রতিযোগীতা মূল্যে তাদেরকে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে!

আর এই সমস্তের বিনিময়ে আমরা কি পাবো? এত দিন ঘটা করে বলা হতো শুল্ক বা বিভিন্ন ধরনের লেভি/চার্জ ইত্যাদির কথা। এখন কিন্তু সে আশাতেও গুড়ে বালি। ২০১০ এর সেপ্টেম্বরে বিদ্যমান নৌপথে ট্রানজিট সুবিধার বিপরীতে ভারতীয় জাহাজ থেকে মাশুল আদায় নিয়ে বিপত্তি ঘটে। সরকারের একটি অংশ কোনোরকম মাশুল বা ফি ছাড়াই ভারতকে ট্রানজিট দিতে সচেষ্ট হয়। একপর্যায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জারি করা ট্রানজিট বিষয়ক বিধিমালাও স্থগিত করা হয়। ২০১০ এর জুনে এনবিআর এ বিধিমালা জারি করে স্থল ও রেলপথে ট্রানজিটের আওতায় প্রতি টন পণ্য পরিবহনে ১ হাজার টাকা মাশুল নির্ধারণ করেছিল। ভারত দাবি করে আসছে, প্রচলিত টোল ছাড়া ট্রানজিটের জন্য কোনো প্রকার ফি তারা দেবে না। শাসক শ্রেণী এতদিন হাজার হাজার কোটি টাকার স্বপন দেখালেও বাস্তবে ভারতের এই আব্দার নতুন নয়। ট্রানজিট বিষয়ক ভারতের খসড়া প্রস্তাবেই বিষয়টি আছে। গত ২০০৮ এ ভারতের প্রস্তাবিত "বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে যানবাহন এবং কার্গো পরিবহনে নিয়মনীতির খসড়া" অবলম্বন করে ১ অক্টোবর ২০০৯ তারিখের ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকাটি জানাচ্ছে:

“ভারতীয় প্রস্তাবটিতে উভয় দেশের স্থল পথ ব্যাবহারের জন্য পরস্পরের যানবাহনের উপর অতিরিক্ত কর বা লেভি আরোপের বিরোধীতা করা হয়েছে।”
প্রস্তাবনা অনুসারে, এমনকি ভারতীয় যানবাহন চলাচলে রাস্তাঘাট সহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরী ও রক্ষানাবেক্ষণও করতে হবে বাংলাদেশকে নিজ অর্থে!

তার পরেও যদি ধরে নেই, দর কষাকষি করে বাংলাদেশ শুল্ক-টুল্ক পাওয়ার একটা ব্যাবস্থা করে ফেলল- কিন্তু তাতেই কি ট্রানজিট-বন্দর দেয়া জায়েজ হয়ে যাবে? এই শুল্ক তো আর এমনি এমনি আসবে না, রস্তাঘাট, হাইওয়ে, রেলযোগাযোগ, বন্দর, শুল্ক কাঠামো ইত্যাদির পেছনে নিয়মিত যথেষ্ট বিনিয়োগ করতে হবে বাংলাদেশকে। এই সব বাদ দিয়ে হাতে কিছু থাকবে কিনা তার হিসেব কি করা হয়েছে? আর যদি কিছু থাকেও, তা কি ট্রানজিটের বিনিময়ে যে ব্যাপক রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সামরিক নানা ঝুকির মধ্যে আমরা পড়ব,তার ক্ষতিপূরণের জন্য যথেষ্ট?

অধ্যাপক আনুমুহম্মদ তাই সঠিক ভাবেই প্রশ্ন তুলেছেন:

শুধু গাড়িভাড়া হিসাব করলেও তো হবে না। বাংলাদেশের জন্য আরও অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রথমত, বাংলাদেশের জমি সীমিত, আবাদি জমি নষ্ট করা তাই খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভারতের ক্রমবর্ধমান পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে যে সড়ক সম্প্রসারণ ও সংযোজন করতে হবে, তা কত কৃষিজমি-জলাভূমি বিনাশ করবে? এর ফলে খাদ্যসহ অন্যান্য কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য কত বিনষ্ট হবে? কত পরিবেশ দূষণ হবে? দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নিজের পণ্য পরিবহন ভবিষ্যতে অনেক বাড়বে। এখনই বিভিন্ন রাস্তায় জটের কারণে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়, পচনশীল দ্রব্য বিনষ্ট হয়, দ্রব্যমূল্য বাড়ে। ভারতকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে আমাদের পণ্যপ্রবাহে কী রকম সমস্যা তৈরি হতে পারে? তৃতীয়ত, যে রাজ্যগুলোতে ভারত পণ্য নিয়ে যাবে, সেসব রাজ্য এত দিন ছিল বাংলাদেশের বহু শিল্পপণ্যের বাজার। সেই বাজার সংকুচিত হয়ে যাবে, সম্ভাবনা বিনষ্ট হবে। এর ক্ষতি কত? চতুর্থত, যেখানে ভারত বাংলাদেশকে তিন দিকে কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাও করে রাখে, সেখানে বাংলাদেশ ভেদ করে তার পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তাব্যবস্থা কে করবে? কী পণ্য ভারত নিয়ে যাচ্ছে, এর তদারকির ব্যবস্থা কী থাকবে? পঞ্চমত, নদী, কাঁটাতার, অসম প্রবেশাধিকার, সীমান্ত হত্যা নিয়ে আগে সমাধান কেন নয়? এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই ভারতের কাছ থেকে কঠোর শর্তযুক্ত ঋণ নেওয়ার চুক্তি হয়েছে তাদেরই কাঙ্ক্ষিত পণ্য পরিবহনব্যবস্থা দাঁড় করার জন্য!

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানীর চুক্তি :
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার সময় রাষ্ট্রীয় মালিকানায় খনিজ উত্তোলণের বেলায় বরাবরই পুজি না থাকার যুক্তি দেয়া হয় কিন্তু বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে বেশি দামে সেই খনিজ কেনার সময় কিন্তু পুজির ঘাটতি পড়েনা। একই ভাবে রাষ্ট্রীয় খাতে বিদ্যুত উতপাদনের পুজি না থাকার কথা বলা হলেও আমরা দেখছি ভারত থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার বা ১,৪০০ কোটি টাকা খরচ করে ১০০ কি.মি দীর্ঘ হাইভোল্টেজ ট্রান্সমিশান লাইন বসিয়ে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির বেলায় পুজির কোন অভাব নাই। অর্থাৎ আমাদানি কিংবা ভর্তুকীর ক্ষেত্রে পুঁজির অভাব পড়েনা, অভাব পড়ে কেবল রাষ্ট্রীয় খাতে বিনিয়োগের বেলাতে।

পিডিবির ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় খাতে সিদ্ধিরগঞ্জে ২৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের খরচ ধরা হয়েছে ৬৮৫ কোটি টাকা। কাজেই যে টাকা খরচ করে ভারত থেকে ১০০ কি.মি ট্রান্সমিশান লাইনে ৭-৮% ট্রান্সমিশান লস দিয়ে মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে সে টাকায় রাষ্ট্রীয় খাতে এর দ্বিগুণ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বলা হচ্ছে দ্রুত বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলার জন্যই লস দিয়ে হলেও ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির প্রয়োজন। অথচ বাস্তবতা হলো ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমাদানীর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করতে কম করে হলেও দুই বছর সময় লাগবে। এই সময়ে তো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ সম্ভব! তাছাড়া ভারত নিজেও তীব্র বিদ্যূৎ সংকটে ভোগা একটি দেশ যেখানে চাহিদার তুলনায় বিদ্যূৎ উৎপাদনের ঘাটতি থাকে ৭-১১%। ফলে সেই ভারত থেকে সারাবছর ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির আশা করাও ভুল কারণ ভারত ও বাংলাদেশের আবহাওয়া প্রায় একই ধরণের হওয়ায় বাংলাদেশে যখন বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ হবে ভারতেও তখন সর্বোচ্চ চাহিদার কারণে বিদ্যুৎ সংকট থাকবে ফলে ভারত কেবল তার উদ্বৃত্ত মৌসুমেই বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে রাজি হবে যখন বাংলাদেশেরও বিদ্যুতের চাহিদা সর্বনিম্ন থাকবে। আবার ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানীর জন্য প্রতি ইউনিট কত খরচ পড়বে সেটাও পরিস্কার করে বলা হচ্ছে না। এর আগে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাংলাদেশ-ভারতের ১৬ তম সংলাপের সময় ভারতীয় প্রতিনিধি দল প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ রুপি( ১১/১২ টাকা) করে প্রস্তাব করেছিল। বর্তমানে ২০১০ সালে এসে ভারত যদি দাম নাও বাড়ায়, তাহলেও বাংলাদেশকে যদি ১১/১২ টাকা করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানী করতে হয়, তাহলে পাবলিক সেক্টরের খরচের( প্রতি ইউনিট ২/৩ টাকা) তুলনায় বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিটে বেশি দিতে হবে ৯ টাকা করে। ৬০% লোড ফ্যাক্টরে প্রতিদিন ১৭ ঘন্টা করে বিদ্যুৎ আমদানি করলে বছরে মোট আমদানি হবে ৯১.৮ কোটি ইউনিট। ফলে বছরে বাংলাদেশের গচ্চা যাবে মোট ৮২৬.২০ কোটি টাকা।
এই ক্ষেত্রে তথাকথিত দাতা সংস্থাগুলোর ভূমিকাও খতিয়ে দেখা দরকার। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, ইউএসএইড ইত্যাদি সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, জ্বালানী, বিদ্যুৎ ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় খাতকে বেসরকারী করণ এবং বিদেশী বিনিয়োগের জন্য চাপ প্রয়োগ করে আসছে। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানীর এই সিদ্ধান্তের পেছনেও এসব সংস্থা এবং তাদের লালিত পালিত কনসালটেন্টদের ভূমিকা রয়েছে। ইউএসএইড ২০০৬ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যাপারে একটি প্রাক-সম্ভাব্যতার স্টাডি পরিচালনা করে। সেই স্টাডিতে স্বল্প মেয়াদে(২০০৯-২০১০) ২৫০ মেগাওয়াট, মধ্যমেয়াদে (২০১১-২০১২) ৫০০ মেগাওয়াট এবং দীর্ঘমেয়াদে( ২০১৫-২০১৬) ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির প্রস্তাবনা দেয়া হয়। প্রস্তাবনায় দেখানো হয় বাংলাদেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ৯ টাকা এবং ভারতের খরচ প্রতি ইউনিট ২ রুপি। এভাবে বাংলাদেশের খরচ তিনগুণ বাড়িয়ে হিসেব করে দেখানো হয় ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে ৬০% লোড ফ্যাক্টরে দৈনিক ১৭ ঘন্টা করে ব্যাবহার করলে বছরে ৯১.৮ কোটি ইউনিট করে বাংলাদেশ নাকি বিদ্যুৎ আমদানির মাধ্যমে বছরে ৭৮ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারবে! সেই প্রস্তাবনায় ভারতের বহরমপুর থেকে ঈশ্বরদি অব্দি মোট ১০০ কি.মি ৪০০ ভোল্টের ট্রান্সমিশন লাইন করার কথা বলা হয়েছিল।

ভারত থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির যে ঘোষণা বাংলাদেশ দিয়েছে সেটা কিন্তু ইউএসএইড নির্দেশিত বহরুমপুর-ঈশ্বরদি রুটেই!

ভারত কে বন্দর ব্যাবহার করতে দেয়াটা কতটা লাভজনক?
ভারতকে চট্রগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যাবহার করতে দেয়ার পক্ষের যুক্তি হিসেবে বলা হয় বর্তমানে এই দুটি বন্দরের ক্ষমতার যথাক্রমে ৪০% এবং ৯০% অব্যাবহ্রত আছে ফলে বন্দর ব্যাবহার করতে দেয়ার মধ্যে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কিছু নেই। অথচ এতদিন আমরা জানতাম বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের জন্যই চট্টগ্রাম বন্দরের য়থেষ্ট ক্ষমতা নেই, প্রয়োজনীয় জায়গা ও যন্ত্রপাতির অভাবের কারণে প্রায়ই কন্টেইনার জট লেগে থাকে- যেকারণে গত সরকারের সময় বসুন্ধরা গ্র“প বর্তমান বন্দরের ভাটিতে একটি বেসরকারি বন্দর স্থাপনের ইচ্ছা পোষণ করেছিল কিন্তু বেসরকারি বন্দর স্থাপনের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হওয়ায় সে প্রচেষ্টা সেখানেই থেমে যায়। অথচ এখন ভারতকে ব্যাবহার করতে দেয়ার বেলায় আমাদেরকে বলা হচ্ছে বন্দরের ৪০%/৯০% ক্ষমতাই নাকি অব্যবহ্রত! এ প্রসঙ্গে আমরা একটু যাচাই বাছাই করে দেখতে চাই আসলে এই দাবীটুকু কতটুকু সত্য এবং সেই সাথে আরেকটা প্রশ্নও তুলতে চাই- যদি বর্তমানে বন্দরের একটা অংশ অব্যাবহ্রত থাকেও, তাহলেও সেটুকু ভবিষ্যতের বিবেচনা না করেই ভারতের ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত।
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে বছরে ১১ লাখ কন্টেইনার উঠানামা হয়। ৪০% ক্ষমতা যদি অব্যবহ্রত থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে বর্তমানে বন্দরে যে পরিমাণ যন্ত্রপাতি আছে তা দিয়ে আরো বাড়তি ৭.৩৩ লক্ষ কন্টেইনার উঠানামা করার মতো যন্ত্রপাতি অলস পড়ে রয়েছে। বাস্তব চিত্র কি? চট্টগ্রাম বন্দর বিষয়ে ১৯৯৫ সালে প্রণীত সর্বশেষ মাস্টারপ্ল্যানে বলা হয়েছিল, বছরে ১১ লাখ কন্টেইনার ওঠানামার কাজ করতে হলে কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন, রাবার টায়ার্ড, গ্যান্ট্রি ক্রেন, রিচ স্ট্রেকার, কন্টেইনার মুভার, ট্রাক্টর, ট্রেইলর ও ফর্ক লিফটের মতো অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতি লাগবে ৬৫১টি। অথচ চট্টগ্রাম বন্দরে এ মুহূর্তে এমন যন্ত্রপাতি আছে মাত্র ১৯৫টি অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ৩০% যন্ত্রপাতি আছে চট্টগ্রাম বন্দরে যেসব যন্ত্রপাতির মধ্যে আবার ৬০ শতাংশেরও মেয়াদকাল অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তাই প্রতি বছর ওয়ার্কশপে নিতে হচ্ছে গড়ে ৯০ থেকে ৯৫টি যন্ত্রপাতি। ১৯৫টি যন্ত্রপাতির মধ্যে বর্তমানে ওয়ার্কশপে আছে ৭৩ টি। আর এভাবে কার্যত ৭০% এরও বেশি ঘাটতি নিয়ে চলছে বলেই বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থান কাল আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ২৪ ঘন্টার বদলে ৬০ ঘন্টা।( সূত্র:দৈনিক সমকাল, ২৭ জানুয়ারি, ২০১০)। তাহলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতাই বর্তমানে বন্দরের নেই! তাহলে কোন যুক্তিতে ভারতকে বন্দর ব্যাবহার করতে দেয়া হচ্ছে? আরেকটা বিষয় হলো, বন্দরের ক্ষমতা কেবল বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করার ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত নয়- এর সাথে বন্দরে আসা যাওয়ার প্রয়োজনীয় রাস্তাঘাট, যানবাহন, টোল, চেকিং ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় ব্যাবস্থাপনার বিষয়টিও যুক্ত। আমাদের রাস্তাঘাট অবকাঠামো ইত্যাদি কি এসবের জন্য উপযুক্ত?

আবার তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই যে সরকারি বক্তব্য অনুসারে আসলেই বন্দরের ৪০% ক্ষমতা অব্যবহ্রত। তাহলে সে ক্ষেত্রেও কি কিছু ভাড়ার বিনিময়ে ভারতকে বন্দর ব্যাবহার করতে দেয়াটা একটা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত? বন্দরের সামর্থ্য যদি অব্যবহ্রত থাকে তাহলে তার কারণ কি? বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও কৃষির উন্নয়ন পরিপূর্ণ হয়েগেছে, আমদানি রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ার আর কোন সুযোগ নেই- ব্যাপারটাকি এরকম নাকি বাংলাদেশের শিল্প কৃষি এখনও অবিকশিত বলেই এমনটি রয়ে গেছে? এখন আমরা যদি আমাদের শিল্প-কৃষির বিকাশ ঘটাই তাহলে অচিরেই এ ক্ষমতার পুরোটাই লাগবে। কিন্তু যদি চিরকাল পরনির্ভরশীল ও কমিশন ভোগি ভাড়াজীবি অর্থনীতির দেশ হিসেবে টিকতে চাই তাহলে হয়তো এই সাময়িক অব্যবহ্রত ক্যাপাসিটিকে ভারতের কাছে ভাড়া দেয়ার প্রশ্ন আসে। কারণ একবার ভারতকে এই সুবিধা দিয়ে দেয়ার পর আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে যখন বন্দরের পুরো ক্ষমতাই আমাদের লাগবে তখন কিন্তু চাইলেই আমরা ভারতের কাছ থেকে এই সুবিধা ফিরিয়ে নিতে পারবো না কারণ ততদিনে ভারতের অর্থনীতি এর উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে, ভারত বিভিন্ন ভাবে চাপ প্রয়োগ করে হলেও এই সুবিধা বজায় রাখতে চাইবে।

তাছাড়া ভারতীয় যানবাহন আমাদের রাস্তাঘাট-ব্রিজ-কালভার্টের উপর বাড়তি চাপ প্রয়োগের বিষয়টির পাশাপাশি আমাদের অভ্যান্তরীণ রাজনীতিতেও বাড়তি চাপ প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্তিতিশীলতা বা অস্থিতিশীলতা এখন ভারতের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে উঠবে কারণ এখানে একদিন হরতাল থাকলে এখন ভারতের আমদানি-রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের সরাসরি হস্তক্ষেপ হতে থাকবে। তাছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান যে বাণিজ্য সেটা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হবে কেননা ট্রানজিটের ফলে ভারতের কেন্দ্র থেকে এখন সহজেই বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশের চেয়ে সস্তায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে সর্বরাহ করা যাবে ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর আর বাংলাদেশ থেকে পণ্য কেনার প্রয়োজন পড়বে না। ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য, খাদ্য-দ্রব্য, টেক্সটাইল, কসমেটিকস, টয়লেট্রিজ, সিমেন্ট ইত্যাদি পণ্যের ৩০ মিলিয়ন ডলারের বর্তমান বাজার হারাবে বাংলাদেশ। আর এত কিছু ক্ষতির বিনিময়ে কি পাবে বাংলাদেশ?

সিঙ্গাপুরের খোয়াব
এ প্রসঙ্গে অনেকেই সিঙ্গাপুরের উদাহরণ টেনে বলার চেষ্টা করছেন উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে এই সামান্য বাণিজ্য হারালেও বন্দরকে ভারতের কাছে ভাড়া দিলে সিঙ্গাপুরের মতই আমরা অর্থনৈতিক ভাবে স্বচ্ছল হয়ে উঠতে পারব। এর উত্তরে বলা দরকার, আন্তর্জাতিক সি লেন এ সিঙ্গাপুরের ষ্ট্রাটেজিক অবস্থানের কারণে সিঙ্গাপুরের বন্দর এখন দুনিয়ার ব্যাস্ততম বন্দর এবং এ বন্দরের ৭০ ভাগ কন্টেইনার মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের হলেও তার মানে কিন্তু এই না যে শিল্পায়ন না ঘটিয়ে, নিজস্ব চাহিদাকে উপেক্ষা করে স্রেফ বন্দর ভাড়া দিয়ে তার মাধ্যমেই সিঙ্গাপুর উন্নতি করেছে! সিঙ্গাপুরের বন্দর ব্যাস্ততম হয়ে উঠতে থাকে ১৯৮৬ সাল থেকে কিন্তু সিঙ্গাপুরের অর্থনীতির উন্নয়ন শুরু হয় ১৯৬০ সালের দিকে। সে সময়ে সিঙ্গাপুরে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের সুফল স্বরূপ বছরে ৮% হারে প্রবৃদ্ধি হতে থাকে। এখনও সিঙ্গাপুরের অর্থনীতির ৬০ ভাগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং জিডিপির ২৬ ভাগ আসে ইলেক্টনিক্সসহ ম্যানুফ্যাকচারিং খাত থেকে এবং জিডিপির ২২ ভাগ আসে বিভিন্ন ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস থেকে। অর্থাৎ সিঙ্গাপুরের শিল্পায়ন একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় শক্তিশালী হওয়ার পরই সিঙ্গাপুর প্রথমে তার নিজস্ব প্রয়োজনে বন্দরের বিকাশ ঘটায় এবং পরে তার বাড়তি ক্ষমতাটুকু ভাড়া দেয়। কিন্তু আমাদের অবস্থা হলো উল্টো- আমাদের নিজস্ব শিল্প-কৃষির কোন খবর নাই, ভারতের শিল্প-কৃষির বিকাশের সুবিধা করে দেয়ার জন্য আমাদের নিজেস্ব শিল্প-কৃষির ক্ষতি করে হলেও বন্দর ভাড়া দিয়ে আমাদেরকে সিঙ্গাপুর হওয়ার ভ্রান্ত স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে!

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29410757 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29410757 2011-07-10 22:58:00
কনোকোফিলিপস এর সাথে পিএসসি চুক্তি: প্রথম আলোয় ম.তামিমের সহজ পাঠের প্রতিক্রিয়া
গ্যাসের মালিকানার তর্ক:
বছর বছর ৫৫% হারে গ্যাস কোম্পানি কস্ট রিকভারি হিসেবে নিতে থাকলে কয়েক বছর পরই কোম্পানির বিনিয়োগের বা খরচের পুরোটা উঠে আসবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন জনাব ম.তামিম। তার আশাবাদ অনুসারে কয়েক বছর পর এভাবে পুরো কস্ট রিকভারি হয়ে যাওয়ার পর প্রায় ৯০% -৯৫% গ্যাসই হয়ে যাবে প্রফিট গ্যাস বা লাভের গ্যাস যার ৫৫% থেকে ৮০% মালিকানা পেট্রোবাংলার থাকায় “সামষ্টিক ভাবে বাংলাদেশের পক্ষে থাকবে ৫০ শতাংশের বেশি”।

প্রথম কথা, কস্ট রিকভারির পর প্রফিট গ্যাসের ৫৫% থেকে ৮০% মালিকানা পেট্রোবাংলার হলেও সম্পূর্ণ গ্যাসের কত ভাগ মালিকানা পেট্রোবাংলা পেল তা হিসেব করতে গেলে কস্ট রিকভারি পর্যায়ে কত পরিমাণ গ্যাস পেট্রোবাংলা পেল সে হিসাবও করতে হবে। কস্ট রিকভারি পর্যায়ে ৫৫% গ্যাস কস্ট রিকভারি গ্যাস হিসেবে কোম্পানির ভাগে গেলে এবং বাকি ৪৫% গ্যাস সমান অনুপাতে ভাগাভাগি হলে কস্ট রিকভারি পর্যায়ে কোম্পানির ভাগে পড়বে ৫৫%+২২.৫%= ৭৭.৫% গ্যাস এবং পেট্রোবাংলার ভাগে পড়বে ২২.৫% গ্যাস। এই কস্টরিকভারি পর্যায়ের গ্যাস এবং কস্ট রিকভারি পর্যায়ের পর প্রফিট গ্যাস পর্যায়ের প্রাপ্য গ্যস এই দুয়ের যোগ ফলের মাধমে নির্ধারিত হবে পেট্রোবাংলা মোট গ্যাসের কতটুকু পেল। কাজেই কস্ট রিকভারি পর্যায়ের পর প্রফিট গ্যাস পর্যায়ে ৮০% ভাগ গ্যাস পেট্রোবাংলা পাওয়ার মানে এই না যে পেট্রোবাংলা মোট গ্যাসের ৮০% পেল। জনাব তামিম উল্ল্যেখিত বিবিয়ানার কস্ট রিকভারি পর্যায় পার হওয়ার পর উত্তোলিত গ্যাসের ৫০% গ্যাস পেট্রোবাংলা পাওয়ার মানে তাই পুরো গ্যাসের ৫০% পাওয়া নয়।

দ্বিতীয় কথা হলো, বাস্তবে বিদেশী কোম্পানিগুলো নানান ভাবে বাড়তি খরচ দেখিয়ে কস্ট রিকভারি পর্যায় দীর্ঘায়িত করে ফলে হয় আদৌ প্রফিট পর্যায়ে পৌছানো যায় না বা পৌছালেও ততদিনে সিংহভাগ গ্যাস উত্তোলিত হওয়া শেষ ফলে বাংলাদেশের ভাগে কার্যত মোট উত্তোলিত গ্যাসের ২০-৩০ শতাংশের বেশী গ্যাস জুটে না। বাংলাদেশের স্থলভাগে এবং অগভীর সমুদ্রে এই ভাবে বাড়তি খরচ দেখিয়ে কস্ট রিকভারি পর্যায় দীর্ঘায়িত করার বিভিন্ন নজির আছে যেমন:

ক) মাগুরছড়ায় অক্সিডেন্টাল ১৯৯৫ সালে সিসমিক সার্ভে এবং তিনটি কুপ খননের জন্য প্রথমে ১ কোটি ৮৮ লক্ষ ডলারের হিসেব দিলেও ১৯৯৭ সাল নাগাদ ৪ বার সংশোধনের মাধ্যমে তা ৪ কোটি ৯১ লক্ষ ৪০ হাজার ডলারে পরিণত হয়। এবং এই খরচের হিসাব কুপ খননের খরচের হিসাব ছাড়াই। কুপ খননের হিসাব সহ অংকটি কোথায় গিয়ে দাড়িয়েছিলো সেটি অবশ্য আমাদের জানা নেই কারণ এই কস্ট রিকভারির হিসাবটি প্রকাশিত নয়।

খ) অগভীর সমুদ্রের সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্রে কেয়ার্নের কস্ট রিকভারির হিসাবটা দেখা যাক। বিডিং এর সময় কেয়ার্ন প্রকল্প ব্যায় দেখিয়েছিলো ১০.৮১ মিলিয়ন ডলার কিন্তু একের পর এক সংশোধনী বাজেট আসতে থাকে, তৃতীয় সংশোধনী বাজেটে ব্যায় ১৮ গুণ বেড়ে গিয়ে দাড়ায় ১৮৮ মিলিয়ন ডলার, চতুর্থ সংশোধনী বাজেটে ২৬৪ মিলিয়ন ডলার এবং সব শেষে ৬৬০ মিলিয়ন ডলার। ফলে এই গ্যাস ক্ষেত্রটি থেকে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত মাত্র ২০% গ্যাস পায়। পেটোবাংলার এপ্রিল মাসের এমআইএস রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, এ বছরের এপ্রিলে মোট ১৩.৮৩৪ এমএমসিএম গ্যাসের মধ্যে কেয়ার্নের ভাগে পড়ে ১১.০৭৫ এমএমসিএম গ্যাস অর্থাত বাংলাদেশের ভাগে মাত্র ২.৭৫৯ এমএমসিএম যা মোট গ্যাসের মাত্র ১৯.৯৪%।

একই রিপোর্ট অনুসারে টাল্লোর বাঙ্গুরা গ্যাস ক্ষেত্রটিতে এপ্রিল মাসে মোট উতপাদন হয় ৮৩.৪৮৪ মিলিয়ন কিউবিক মিটার যার মধ্যে টাল্লোর কষ্ট রিকভারি ও প্রফিট গ্যাসের ভাগ ছিলো ৫৫.৪৭৭ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। সুতরাং পেট্রোবাংলার প্রফিট গ্যাস হলো ২৮.০০৭ মিলিয়ন কিউবিক মিটার যা মোট গ্যাসের মাত্র ৩৩.৫৪% । ২০০৯ -২০১০ সালে ১০৮৬ মিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাসের মধ্যে পেট্রোবাংলার ভাগের গ্যাস ছিলো ৩৬৪.৬০৩ মিলিয়ন কিউবিক মিটার অর্থাত পুরো বছরের হিসেবেও পেট্রোবাংলার অংশ ৩৩.৫৪%।

গভীর সমুদ্রের বিশাল খরচের কথা বলে নানান ভাবে যে কেয়ার্নের সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্রের মতো কস্ট রিকভারি পর্যায় দীর্ঘায়িত করে বেশির ভাগ গ্যাসই কনোকোফিলিপস আত্মসাত করবে না তার নিশ্চয়তা কি?

তৃতীয়ত, যে মডেল পিএসসি ২০০৮ অনুসারে কনোকো ফিলিপস এর সাথে সাম্প্রতিক পিএসসি চুক্তি হয়েছে তার আর্টিক্যাল ১৫.৫.৪ এ বলা আছে, প্রথম ১০ বছর বাংলাদেশ কোন অবস্থাতেই সর্বমোট বাজারজাত যোগ্য গ্যাসের ২০% এর বেশি দাবী করতে পারবে না, ১১তম বছরের মাথায় কোম্পানি রাজী হলে পেট্রোবাংলা ৩০% দাবী করতে পারবে। প্রশ্ন হলো “বাজারজাতযোগ্য গ্যাস” কি? এটাকি রপ্তানির জন্য এলএনজি গ্যাস নাকি পুরো উত্তোলিত গ্যাস? চুক্তির আর্টিক্যাল ১৫.৫.২ অনুসারে গ্যাস কুপের দৈনন্দিন অপারেশানাল কাজে ব্যাবহারের গ্যাস বাদ দিয়ে সমস্ত গ্যাসই বাজারজাতযোগ্য গ্যাস। এখন চুক্তির আর্টিক্যাল ১৫.৪ অনুযায়ি কোম্পানি যদি বছরে মোট গ্যাসের ৭.৫% হারে(পেট্রোবাংলা অনুমতি দিলে এর চেয়েও বেশি পরিমাণে গ্যাস উত্তোলণের সুযোগ রাখা হয়েছে) গ্যাস উত্তোলণ করতে থাকে তাহলে ১৩.৩৩ বছরের মাথাতেই সব গ্যাস উত্তোলিত হয়ে যাবে। ফলে কস্ট রিকভারি আর প্রফিট গ্যাসের ভাগাভাগি অনুসারে পেট্রোবাংলার ভাগে যতটুকু গ্যাসই পড়ুক না কেন, কার্যত আর্টিক্যাল ১৫.৫.৪ অনুযায়ি পেট্রোবাংলা ২০% এর বেশি গ্যাস পাবে না।

রপ্তানির বিধান ও রপ্তানির সম্ভাবনা:
জনাব ম.তামিমকে ধন্যবাদ তিনি রপ্তানির প্রশ্নে বেশ খোলা খুলি ভাবেই স্বীকার করেছেন:”বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে যদি বিপুল গ্যাস পাওয়ার ১ শতাংশ সম্ভাবনাও থাকে, সে ক্ষেত্রে কোম্পানি তার বিনিয়োগকৃত মূলধন দ্রুততম সময়ে তুলে আনতে চাইবে। কোন ব্যাবসায়ীই বিপুল পরিমাণ টাকা লগ্নি করে বছরের পর বছর বসে থাকতে চাইবে না। রপ্তানির সুদুর প্রসারী একটি সুযোগ অথবা নিশ্চিত গ্যাস কেনার প্রতিশ্রুতি তাই যে কোন আন্তর্জাতিক গ্যাস অনুসন্ধান চুক্তির অংশ।” চুক্তি বিরোধীদের আপত্তিটা ঠিক এই খানেই, রপ্তানির এই “সুদুর প্রসারী” সুযোগ কাজে লাগিয়ে, কোম্পানি তার বিনিয়োগকৃত মূলধন দ্রুততম সময়ে তুলে আনার জন্য, গ্যাস এমন বেশি পরিমাণে উত্তোলন করতে শুরু করবে যে পেট্রোবাংলা বাধ্য হবে তাকে “বাড়তি” গ্যাস রপ্তানির অনুমতি দিতে। বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করা যাক। কনোকোফিলিপস কে দেয়া ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকের নিকটে মায়ানমার ৭ টিসিএফ এবং ভারত ১৪ টিসিএফ গ্যাস আবিস্কার করেছে। এখন বাংলাদেশের অংশেও যদি একই ভাবে ৭ টিসিএফ এর মতো গ্যাস আবিস্কৃত হয় তাহলে তাহলে আর্টিক্যাল ১৫.৪ অনুযায়ি কোম্পানি ৭.৫% হারে (যদিও পিএসসিতে গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি হারে গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে) গ্যাস তুলতে পারবে বছরে ০.৫২৫ টিসিএফ বা ৫২৫ বিসিএফ । তাহলে দৈনিক উত্তোলন করতে পারবে ৫২৫/৩৬৫ = ১.৪৩৮ বিসিএফ।

আবার বাংলাদেশে বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতি ৫০০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট। বছরে ৭% চাহিদা বৃদ্ধি ধরলে ৫ বছর পর যদি গ্যাস আবিস্কৃত ও উত্তোলিত হয়, তখন গ্যাসের ঘাটতি হবে দৈনিক ৭৫০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট বা ০.৭৫ বিলিয়ন কিউবিক ফুট।

এখন কনোকোফিলিপস যদি ৭ টিসিএফ এর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ১.৪৩৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস তুলতে শুরু করে তখন বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ব্যাবহার করতে পারবে ০.৭৫ বিলিয়ন কিউবিক ফুট যার পরও দৈনিক অতিরিক্ত থাকবে ১.৪৩৮-০.৭৫= ০.৬৮৮ বিসিএফ বা ৬৮৮ মিলিয়ন কিউিবক ফুট গ্যাস যা ব্যাবহার করে এলএনজি প্ল্যান্ট বসিয়ে বার্ষিক ৫.৩৭৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন(এমটিপিএ) এলএনজি উতপাদন করা সম্ভব।

বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ খাতে যখন এই ‘বাড়তি’ গ্যাস ব্যাবহার করতে পারবে না তখন কি হবে? চুক্তি অনুসারে পেট্রোবাংলা তখন এই গ্যাস এলএনজি আকারে রপ্তানির অনুমতি দিতে বাধ্য হবে। এভাবে কোম্পানি দ্রুততম সময়ে মাত্র ১৩ বছরের মধ্যেই তার মুনাফা তুলে নিয়ে গেলেও বাংলাদেশের জন্য পড়ে রইবে গ্যাস বিহীন অন্ধকার ভবিষ্যত।

জাতীয় সক্ষমতা ও উড়োজাহাজ তৈরীর তুলনা:
জনাব ম.তামিম তেল-গ্যাস উত্তোলণে জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টাকে উড়োজাহাজ তৈরীর প্রচেষ্টার সাথে তুলনা করে বলেছেন: “সমুদ্রে অনুসন্ধানের টাকা, প্রযুক্তি, লোকবল কোনটাই তাদের নেই এবং সেটা করতে যাওয়া বাংলাদেশের পক্ষে উড়োজাহাজ তৈরির চেষ্টা করার মতো হঠকারিতা হবে; যাতে বিনা কারণে অজস্র টাকা ও সময় ব্যায় হবে।“ এখানে খেয়াল দরকার, আমরা যারা তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণে জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের কথা বলছি, তারা কিন্তু এর জন্য প্রয়োজনীয় সেমিসাবমারজিবল রিগ, সাপোর্ট ভ্যাসেল ইত্যাদি বাংলাদেশে তৈরির কথা বলছি না, বলছি এগুলো ভাড়া করে/কিনে তেল-গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ব্যাবহারের কথা। তাহলে উড়োজাহাজ তৈরীর উদাহরণটা আসছে কেন? তুলনা করতে গেলে তো উড়োজাহাজ চালনা করার উদাহরণটা দেয়া দরকার। উড়োজাহাজ চালানার মতো জটিল কাজও তো বাংলাদেশের পাইলটদের শিখতে হয়েছে তাহলে সেমিসাবমারজিবল রিগ কিংবা সাপোর্ট ভ্যাসেল ভাড়া করে এনে সেগুলো কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে পরিচালনা করাটা অসম্ভব কিংবা হঠকারিতা হতে যাবে কেন? বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কি তেল-গ্যাস উত্তোলণে ব্যাবহ্রত সেমিসাবমারজিবল রিগ, সাপোর্ট ভ্যাসেল ইত্যাদি নিজেরা বানায় বা নিজেরা চালায়?

ম.তামিমের তো অজানা থাকার কথা নয়, আশির দশকের সময় থেকেই কোম্পানিগুলো তাদের নিজেদের অনেক কাজ আউটসোর্সিং করতে শুরু করেছে। টেকনোলজি ডেভেলাপ করার বদলে টেকনোলজি বিভিন্ন সার্ভিস কোম্পানি যেমন Schlumberger, Halliburton, Baker Hughes, Oceaneering, Transocean ইত্যাদির কাছ থেকে সুবিধা মতো ভাড়া করে তেল-গ্যাস উত্তোলণের কাজটি চালাচ্ছে। উদাহরণস্বরুপ বিপি’র কথা বলা যায়। বিপি মেক্সিকো উপসাগরের যে মাকান্দো কুপে দুর্ঘটনায় ঘটিয়েছে, সে কুপে কাজ করছিলো মূলত ট্রান্সওশান, হেলিবার্টন, স্লামবার্গার ইত্যাদি কোম্পানির যন্ত্রপাতি ও সার্ভিস ভাড়া নিয়ে। ডিপ ওয়াটার হরাইজন নামের সেমিসাবমারজিবল রিগটি বিপি ভাড়া নিয়েছে ট্রান্সওশানের কাছ থেকে, এই রিগটি থেকে ড্রিলিং এর কাজটি ট্রান্সওশানের কর্মীরাই করছিলো, কুপ সিমেন্টিং এর কাজটি করছিলো হেলিবার্টন এবং সিমেন্টিং এর পর তার কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য ভাড়া করা হয়েছিলো স্লামবার্গার কোম্পানিটিকে; বিপির কাজ ছিলো কেবল এদের কাজ ঠিক ঠাক মতো হচ্ছে কিনা সেটা তদারকি করা। কাজেই স্থলভাগে গ্যাস উত্তোলণের দক্ষতাকে ব্যাবহার করে গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণ বিষয়ে যথাযথ ট্রেনিং এর মাধ্যমে বাপেক্সের পক্ষে এই ধরণের তদারকির কাজ করাটা অসম্ভব কোন বিষয় নয়।

'অজস্র টাকা'র ঝুকি প্রসঙ্গে:
ম.তামিম উতপাদন অংশীদারি চুক্তির পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে লিখেছেন: “.. বেশির ভাগ দরিদ্র দেশে অংশীদারি চুক্তি জনপ্রিয়। কারণ, এটি সম্পূর্ণভাবে অর্থায়নের ঝুকিমুক্ত এবং সম্পদের মালিকান শতভাগ রাষ্ট্রের অধীনে থাকে।” প্রশ্ন তোলা দরকার, যে উতপাদন অংশীদারি চুক্তিতে কস্টরিকভারি এবং প্রফিট গ্যাসের মাধ্যমে প্রায় আশিভাগ গ্যাসই বিদেশী কোম্পানির দখলে যায়, সে চুক্তির ফলে কেমন করে সম্পদের শতভাগ মালিকানা রাষ্ট্রের থাকে আর কেমন করেই বা তা জনপ্রিয় হয়। তার বদলে এই ধরণের উতপাদন অংশীদারি চুক্তিকে কনসালটেন্ট বা বিশেষজ্ঞপ্রিয় বলাটাই যুক্তিযুক্ত।

ম.তামিমের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের পক্ষে সাগরের গ্যাস উত্তোলণ করাটা বিরাট ঝুকিপূর্ণ কাজ এবং এর জন্য অযথাই “অজস্র টাকা” নষ্ট হবে। “অজস্র টাকা” আসলে কত টাকা সে দিকে যাওয়ার আগে ম.তামিম কে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, আচ্ছা ভাই, বুঝলাম সাগরের গ্যাস উত্তোলণ আর্থিক ভাবে ভীষণ ঝুকিপূর্ণ একটা কাজ কিন্তু তাহলে কনোকোফিলিপস কেন “অজস্র টাকা” ব্যায় করে এই বিশাল ঝুকিপূর্ণ কাজে আগ্রহী হলো? কন্যা দায়গ্রস্থ পিতাকে উদ্ধার করার অনুরুপ গ্যাস দায়গ্রস্থ(!) বাংলাদেশকে উদ্ধার করতে নাকি নিশ্চিত মুনাফার গন্ধ পেয়েই? তাহলে বাপেক্স বা পেট্রোবাংলা কেন সেই লাভজনক কাজটি করবে না? প্রযুক্তির কথা আমরা আগেই বলেছি। এবার আসা যাক “অজস্র টাকা” প্রসঙ্গে।

কনোকোফিলিপস সাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লক থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণের জন্য সর্বমোট ১১০.৬৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে যার ২.৪৯৬ মিলিয়ন ডলার খরচ হবে প্রথম ৫ বছরে ১২০০ লাইন কি.মি দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ করতে, এরপর দুই বছর ধরে ৫০০ বর্গ কিমি এলাকায় ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ করতে এবং একটি অনুসন্ধান কুপ খনন করতে খরচ করবে ৫৮.১৬৬৫ মিলিয়ন ডলার এবং এরপর আরো দুই বছর ধরে বিনিয়োগ করবে মোট ৫০ মিলিয়ন ডলার।(সূত্র: দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ১ জানুয়ারি,২০১১) তাহলে মোট ৯ বছরে ১১০.৬৬ মিলিয়ন বা ১১ কোটি ডলার বা ৭৭০ কোটি টাকা বিনিয়োগ কি বাংলাদেশের জন্য কোন অসম্ভব কোন ব্যাপার? আর এই টাকা তো আর একবারে বিনিয়োগ করতে হবে না, কাজেই বছরে গড়ে ৮৫.৫৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ তো বাংলাদেশের জন্য কোন ব্যাপারই না!

সর্বজনাব বিশেষজ্ঞপ্রবর ম.তামিমের তো এইসব তথ্য অজনা থাকার কথা নয়। আসলে তিনি জেনে শুনেই উতপাদন অংশীদারি চুক্তির সহজ পাঠের নামে আসলে সমুদ্রে অনুসন্ধানের টাকা, প্রযুক্তি, লোকবল ইত্যাদি সম্পর্কে জনগণের মাঝে ভীতি তৈরী করে বহুজাতিক কনোকোফিলিপস কর্তৃক সাগরের গ্যাস লুন্ঠনের যৌক্তিতা তৈরী চেষ্টা করেছেন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29401571 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29401571 2011-06-24 01:27:50
কনোকোফিলিপস এর সাথে চুক্তি নিয়ে ডেইলিস্টারের মিথ্যাচারের জবাবে Click This Link) অসংখ্য মিথ্যাচার করেছে ডেইলিস্টার যার মধ্যে প্রধান কয়েকটির জাবাব দেয়াটা ভীষণ জরুরী বলে মনে করছি।

মালিকানা নিয়ে মিথ্যাচার:
ডেইলিস্টার লিখেছে ৫৫% থেকে ৮০% গ্যাস নাকি বাংলাদেশের! কিন্তু প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের মালিকানা ৫৫% থেকে ৮০% হওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে তা কি সম্পূর্ণ গ্যাসের নাকি কেবল প্রফিট গ্যাস বা লাভের গ্যাসের?
চুক্তি অনুযায়ি মোট উত্তোলিত বাজারজাত যোগ্য গ্যাসের ৫৫% কস্ট রিকভারি বা খরচের গ্যাস হিসেবে কোম্পানির মালিকানায় চলে যাওয়ার পর যে বাকি ৪৫% গ্যাস থাকবে সেই প্রফিট গ্যাসের ৫৫% থেকে ৮০% মালিকানা বাংলাদেশের বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

এখন, প্রফিট গ্যাসের ৮০% মালিকানা বলতে কি সম্পূর্ণ গ্যাসের মালিকানা বোঝায়? ৪৫% প্রফিট গ্যাসের ৫৫% মানে হলো মোট গ্যাসের ২৪.৭৫% এবং ৮০% মানে হলো মোট গ্যাসের ৩৬%। তাহলে ডেইলস্টার কেমন করে দাবী করছে বাংলাদেশ মোট গ্যাসের ৮০% পাবে?

এখানেই শেষ নয়, গোটা রিপোর্টের কোথাও বলা হয় নি যে, চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ কখনই মোট উত্তোলিত বাজারজাত যোগ্য গ্যাসের ২০% এর বেশি দাবী করতে পারবে না। আর্টিক্যাল ১৫.৫.৪ এ তো স্পষ্ট বলা আছে :
“Where Petrobangla has installed necessary facilities to transport and use gas to meet domestic requirements, Petrobangla shall be entitled at its option to retain in kind any Natural Gas produced up to Petrobangla's share of Profit Natural Gas, butin no event more than twenty percent (20%) of the total Marketable Natural Gas.

তাহলে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের ভাগে লাভের গ্যাসের ৮০% পড়লেও, মোট গ্যাসের ২০% এর বেশি কখনই বাংলাদেশ দাবী করতে পারবে না। অবশ্য ঐ আর্টিক্যালে দয়া করে ১০ বছর শেষে ১১ বছরের মাথায় কনোকোফিলিপস এর যদি দয়া হয় তাহলে বাংলাদেশ কে ৩০% দিলেও দিতে পারে!

At the request of Petrobangla, the limit of twenty percent (20%) stipulated herein will be increased to thirty percent (30%), at the beginning of the eleventh year following the start of deliveries for the purpose of LNG export.”

রপ্তানি বিষয়ক মিথ্যাচার:
ডেইলি স্টার এর তথাকথিত সংবাদে দাবী করা হয়েছে উত্তোলিত গ্যাস কোম্পানির জন্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে না কারণ এর জন্য ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার খরচ করে এলএনজি প্ল্যান্ট বানাতে হবে। এখন এই এলএনজি প্ল্যান্ট যদি স্থলভাগে বানাতে হয় তাহলে আবার ব্যায়বহুল ২৮০ কিমি পাইপ লাইন বানাতে হবে। আর সাগরে যেহেতু এই মুহুর্তে দুনিয়ায় কোন কমার্সিয়াল ভাসমান এলএনজি প্ল্যান্ট নাই তাই কনোকোফিলিপস এর জন্যও ভাসমান এলএনজি প্ল্যান্ট বানিয়ে বিদেশে এলএনজি আকারে গ্যাস রপ্তানির প্রশ্ন আসেনা। তাছাড়া লাভজনক এলএনজি প্ল্যান্ট বানাতে নাকি বছরে নূন্যতম ৫ থেকে ৭ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদনের মতো গ্যাস আবিস্কার করতে হবে যা ২০ বছর ধরে চলবে। ডেইলিস্টারের বক্তব্য হলো, বাংলাদেশের সমুদ্র ব্লকের পাশেই মায়ানমার ৭ টিসিএফ এবং ভারত ১৪ টিসিএফ গ্যাস পেলেও বাংলাদেশের জন্য নাকি এ পরিমাণ গ্যাস আবিস্কারের আশা করা “ফ্যানটাসি”!!

প্রথমত, গ্যাস যদি স্থলভাগে আনতে হয়, তাহলে কোম্পানি এলএনজি প্ল্যান্ট বানাক আর না বানাক, পাইপ লাইন তাকে বানাতেই হবে। এলএনজি প্ল্যান্ট বানানো না বানানোর যুক্তির সাথে পাইপ লাইনের প্রসঙ্গ তখনই আসে যখন গ্যাস স্থলভাগে না আনার বিকল্প কোম্পানির থাকে। এরকমই একটি বিকল্প হলো ভাসমান এলএনজি প্ল্যান্ট বা ফ্লোটিং এলএনজি প্ল্যান্ট। স্থলভাগে এলএনজি প্ল্যান্ট না বানানোর পিছনে যদি ব্যায় বহুল পাইপ লাইনের অযুহাত দেয়া হয় তাহলে তো বোঝা শক্ত নয় উত্তোলিত গ্যাস বাংলাদেশের স্থলভাগে আনার কোন পরিকল্পনা কনোকোফিলিপস এর নাই বরং সাগরের বুকে ভাসমান এলএনজি প্ল্যান্ট বানিয়েই সে গ্যাস বিদেশে রপ্তানি করবে।

দ্বিতীয়ত, ভাসমান এলএনজি প্লান্টের টেকনোলজি একেবারেই নতুন কোন সন্দেহ নাই কিন্তু এই মুহুর্তে কমার্সিয়ালি চালু নয় বলে কখনই হবে না তাতো নয়। কনোকোফিলিপস এর ওয়েবসাইটেই আছে কোম্পানিটি অষ্ট্রেুয়িলার তিমুর সাগরে “গ্রেটার সানরাইজ” নামের একটি এলএনজি প্রজেক্টের কাজ করছে যেখানে তার মালিকানা ৩০%।
Click This Link

ডেইলি স্টার ফ্লোটিং এলএনজি প্ল্যান্ট কে অবাস্তব বললেও কোনোকোফিলিপস কিংবা কনোকোফিলিপস এর পার্টনার রা সেটাকে লাভজনক মনে করছে বলেই বছরে মাত্র ৪ মিলিয়ন টন(৪ এমটিপিএ বা মিলিয়ন টন পার এনাম) এলএনজি উতপাদনকেই লাভজনক মনে করছে “গ্রেটার সানরাইজ” এ কনোকোফিলিপস এর অপর পার্টনার উডসাইড:

“ a 4 million ton a year FLNG processing facilities would maximize revenues from the project.”
Click This Link

তৃতীয়ত, এলএনজি প্ল্যান্ট লাভজনক হতে হলে বছরে নূন্যতম ৫ থেকে ৭ মিলিয়ন টন উতপাদনের মতো প্রয়োজনীয় গ্যাস থাকতে হবে এ কথার কোন ভিত্তি নেই। একেবারেই ভূয়া এই তথ্য। ছোট এবং বড় উভয় ধরনের এলএনজি প্ল্যান্টই লাভজনক ভাবে চলছে দুনিয়ায়: ছোট এলএনজি প্ল্যান্টের ক্ষমতা বছরে ০.৩ থেকে ৩ মিলিয়ন টন এবং বড় প্ল্যন্টের ক্ষমতা ৩ মিলিয়ন টনের বেশি। দুনিয়ায় এই মূহুর্তে বছরে ২ মিলিয়ন টন(২ এমটিপিএ) ক্ষমতার প্ল্যান্ট আছে ৫০ টিরও বেশি।

At this moment, there are more than fifty small to medium scale LNG plants in operation and projects with capacities less than 2 MTPA. Most of them are located in China and Australia. Other liquefaction units are being built or planned in Indonesia, Papua New Guinea, Iran, USA, Norway, Peru and Brazil.
Click This Link

চতুর্থত, বাংলাদেশের সমুদ্র সীমার পাশেই ভারত ও মায়ানমার দুটি ব্লক থেকে ৭ থেকে ১৪ টিসিএফ গ্যাস পেলেও বাংলাদেশ এই পরিমাণ গ্যাস আশা করা কেন ফ্যান্টাসি হবে তার কোন ব্যাখ্যা ডেইলিস্টার দেয়নি। আরেকটা বিষয় হলো, ৭ টিসিএফ গ্যাস না পেলেও লাভজনক এলএনজি প্ল্যান্ট চলে যার অসংখ্য উদাহরণ আছে। খোদ কনোকোফিলিপস এরই এরকম একটি এলএনজি প্ল্যান্ট হলো অষ্ট্রেলিয়ার উপকুল থেকে ৫০০ কিমি দুরে তিমুর সাগরের ৩.৪ টিসিএফ গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উপকুলে গ্যাস এনে তরল এলএনজি বানানোর প্ল্যান্ট যেখান থেকে বছরে ৩ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদিত হয়।
Click This Link

এলএনজি হিসেবে রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের হিসাব:

এলএনজি করার জন্য গ্যাস কে চাপ এবং নিম্ন তাপে ৬০০ ভাগের এক ভাগে সংকুচিত করা হয়। হিসেব করে দেখা যায়,

১ মেট্রিক টন এলএনজি = ৪৬.৭ হাজার ঘনফুট বা ৪৬.৭*১০০০ ঘনফূট গ্যাস
সুতরাং ১ মিলিয়ন মেট্রিকটন এলএনজি = ৪৬.৭*১০০০*১০০০০০০ ঘনফুট গ্যাস = ৪৬.৭ মিলিয়ন*১০০০ ঘনফুট গ্যাস বা ৪৬.৭ বিসিএফ গ্যাস (১ বিসিএফ=১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস)
অর্থাত বছরে ১ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদনের জন্য বছরে ৪৬.৭ বিসিএফ গ্যাস পাওয়া যায় এরকম একটি গ্যাস ক্ষেত্র পাওয়াই যথেষ্ট।

আর বছরে ৩ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদনের জন্য বছরে ৪৬.৭*৩= ১৪০ বিসিএফ গ্যাস প্রয়োজন।

সুতরাং, কোন একটি গ্যাস ক্ষেত্রে ১ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া গেলে বছরে ৩ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদন করা যাবে ১০০০/১৪০ = ৭ বছরেও বেশি সময় ধরে।
আর ৩ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া গেলে বছরে ৩ মিলিয়ন টন এলএনজি উতপাদন করা যাবে ২১ বছর ধরে।

বাংলাদেশের যে সাগর বক্ষের গ্যাস ব্লকের পাশের ব্লক থেকেই মায়ানমার ৭ টিসিএফ এর বেশি গ্যাস পেয়েছে সেই গ্যাস ব্লক থেকে কনোকোফিলিপস ৩ টিসিএফ এরও কম গ্যাস পাবে এরকম সম্ভাবনা দেখলে কনোকোফিলিপস সাগরের গ্যাস ব্লক ইজারা চুক্তি করতো এরকমটা হওয়ার কোন কারণ নেই।

আরেকটু হিসাব করা যাক। ধরা যাক ৭ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া গিয়েছে। তাহলে ৭.৫% হারে তুললে গ্যাস তুলতে পারবে বছরে ০.৫২৫ টিসিএফ বা ৫২৫ বিসিএফ । তাহলে দৈনিক উত্তোলন করতে পারবে ৫২৫/৩৬৫ = ১.৪৩৮ বিসিএফ।

আবার বাংলাদেশে বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতি ৫০০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট। বছরে ৭% চাহিদা বৃদ্ধি ধরলে ৫ বছর পর যখন গ্যাস আবিস্কৃত ও উত্তোলিত হবে তখন গ্যাসের চাহিদা হবে দৈনিক ৭৫০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট বা ০.৭৫ বিলিয়ন কিউবিক ফুট।

এখন কনোকোফিলিপস যদি ৭ টিসিএফ এর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ১.৪৩৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস তুলতে শুরু করে তখন বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ব্যাবহার করতে পারবে ০.৭৫ বিলিয়ন কিউবিক ফুট যার পরও বাকি থাকবে ১.৪৩৮-০.৭৫= ০.৬৮৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস।

বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্র যখন এই গ্যাস ব্যাবহার করতে পারবে না তখন কি হবে? চুক্তি অনুসারে পেট্রোবাংলা তখন এই গ্যাস রপ্তানির অনুমতি দিতে বাধ্য হবে। প্রশ্ন হলো, দৈনিক ০.৬৮৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস থেকে এলএনজি উতপাদন কি লাভজনক হবে? চলুন দেখা যাক:

বছরে ১ মিলিয়ন মেট্রিকটন গ্যাস উতপাদন করতে বছরে প্রয়োজন হয় ৪৬.৭ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস বা দৈনিক ৪৬.৭/৩৬৫= ০.১২৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস।

সুতরাং ০.৬৮৮ বিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস দৈনিক ব্যাবহার করে বছরে ০.৬৮৮/০.১২৮= ৫.৩৭৫ মিলিয়ন মেট্রিকটন এলএনজি উতপাদন করতে পারবে কনোকোফিলিপস যা যথেষ্ট লাভজনক।

তাহলে ডেইলিস্টার কোন যুক্তিতে বলছে, বাংলাদেশের সম্ভবনাময় গ্যাস ক্ষেত্র( যার একটি গ্যাস ক্ষেত্র থেকেই কনোকোফিলিপস এর ডারউইন এলএনজি প্লান্টের দ্বিগুনেরও বেশি গ্যাস পাওয়ার সম্ভবনা আছে এবং যে গ্যাস ক্ষেত্রর দুরত্ব উপকুল থেকে ডারউইন এর দুরুত্বের মাত্র অর্ধেক) থেকে কনোকোফিলিপস এলএনজি প্ল্যান্ট বানানো লাভজনক মনে করবে না!!!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29400567 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29400567 2011-06-22 02:28:07
কনোকোফিলিপস এর কাছ থেকে কত টাকা খেয়ে প্রথম আলো এইরকম মিথ্যা রিপোর্ট করেছে? “এবার যে পিএসসি হচ্ছে তাতে বাংলাদেশ প্রথম থেকেই অর্ধেক গ্যাস পাবে। অনুসন্ধান খরচ উঠে এলে বাংলাদেশের প্রাপ্য অংশ বাড়তে থাকবে।”

এই খানে ভয়ংকর একটা ফাকি দেয়া হয়েছে, উত্তোলিত গ্যাসের ৫৫% কস্ট রিকভারি গ্যাস হিসেবে প্রথমেই সেটা বহুজাতিক কোনোকোফিলিপস এর মালিকানায় যাবে। তারপর বাকি ৪৫% গ্যাসের অর্ধেক বাংলাদেশ পেতে পারে। অর্থাত অরুণ কর্মকার যেটাকে সমস্ত উত্তোলিত গ্যাসের অর্ধেক বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছে সেটা আসলে প্রফিট গ্যাসের অর্ধেক! কত বড় প্রতারণা দেখেন- ৫৫% গ্যাস কস্ট রিকভারি গ্যাস হিসেবে বিদেশী কোম্পানির মালিকানায় যাওয়ার পর বাকি ৪৫% এর অর্ধেক যদি বাংলাদেশ পায় তাহলে প্রকৃত অর্থে মোট গ্যাসের ২২.৫% পাবে বাংলাদেশ কিন্তু দেখেন যে মডেল পিএসসি ২০০৮ অনুসারে এই চুক্তি হচ্ছে সেই চুক্তির আর্টিক্যাল ১৫.৫.৪ এ পরিস্কার লেখা আছে বাংলাদেশ কখনই উত্তোলিত বাজারজাত যোগ্য গ্যাসের ২০% এর বেশি দাবি করতে পারবে না!!!

Where Petrobangla has installed necessary facilities to transport and use gas to meet domestic requirements, Petrobangla shall be entitled at its option to retain in
kind any Natural Gas produced up to Petrobangla's share of Profit Natural Gas, but in no event more than twenty percent (20%) of the total Marketable Natural Gas.
The actual Monthly amounts to be retained by Petrobangla shall be notified to Contractor prior to the conclusion of relevant LNG export contract(s) and such
Monthly amounts shall be fixed for the duration of such contracts. At the request of Petrobangla, the limit of twenty percent (20%) stipulated herein will be
increased to thirty percent (30%), at the beginning of the eleventh year following the start of deliveries for the purpose of LNG export.


অথচ শুয়োরের বাচ্চা অরুণ কর্মকার, নব্য রাজাকার মতিউর রহমান গং এর পত্রিকায় রিপোর্ট লিখে প্রচার করছে বাংলাদেশ প্রথম থেকেই অর্ধেক গ্যাস পাবে!!

প্রথম আলোর এই রিপোর্ট বাংলাদেশের জ্বালানি অপরাধের ক্ষেত্রে জঘণ্য একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29397502 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29397502 2011-06-16 12:16:55
দুর্ঘটনার রাজা কনোকোফিলিপস ও বঙ্গোপসাগরের আসন্ন বিপদ: যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিপি-ব্লোআউটের আলোকে
সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান ছাড়াই তেল-গ্যাস উত্তোলণ
দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে তেল-গ্যাস ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ উত্তোলণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ ও সম্পদ রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরণের আইন ও নিয়মকানুন বেধে দেয়া হয়। সমুদ্রের গ্যাস উত্তোলণ ভীষণ ঝুকি পূর্ণ হওয়ায় এক্ষেত্রে নিয়মকানুনও থাকে কড়া ও সুনির্দিষ্ট । দেশী বিদেশী সকল প্রতিষ্ঠানের জন্যই এগুলো প্রযোজ্য। যেমন: যুক্তরাষ্ট্রে সমুদ্রের গ্যাস উত্তোলণের কাজে নিরাপত্তা ও ঝুকি মোকাবেলার মূল দ্বায়িত্ব তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর হলেও তদারককারী কর্তৃপক্ষ কিছু নূন্যতম মানদণ্ড বা স্ট্যান্ডার্ড বেধে দেয়। কোম্পানিগুলোকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, কুপ খনন, ড্রিলিং , সিমেন্টিং, উত্তোলণ, ওয়ার্কওভার বা মেরামত, পাইপলাইন নির্মাণ, তেল-গ্যাস উত্তোলণের জন্য বিভিন্ন প্লাটফর্ম ও স্ট্রকচার বা কাঠামো সম্পর্কিত শত শত পাতার কারিগরী মানদণ্ড মেনে চলতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে গভীর সমুদ্রের জন্য প্রযোজ্য এরকম কতগুলো আইন ও বিধিবিধান হলো আউটার কনটিন্টোল শেলফ ল্যান্ড এক্টস ১৯৫৩(যা ১৯৭৮ সালে সংশোধিত ও সংযোজিত হয়), অয়েল পলিউশন অ্যাক্ট ১৯৯০, আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটস রেকমেন্ডেট প্র্যাকটিস গাইডেন্স ডকুমেন্ট ১৯৯৩, ন্যাশনাল এনভায়নমেন্টাল পলিসি এক্ট (এনইপিএ) ,আউটার কনটিনেন্টাল শেলফ অর্ডার ১-৭, ক্লিন ওয়াটার এক্ট ইত্যাদি। (সূত্র: ৩)
অথচ বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বিদেশী কোম্পানিকে কোন সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধান মেনে চলতে হয় না, উৎপাদন অংশীদারি চুক্তিতে শুধু উল্ল্যেখ থাকে কোম্পানিগুলো যেন আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম ইন্ড্রাষ্ট্রির নিয়মকানুন মেনে কাজ করে! আর এই ফাঁপা ও অনির্দিষ্ট নিয়ম কানুনের সুযোগ নেয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। এদেশে বহুজাতিক অক্সিডেন্টাল ও নাইকো মাগুরছড়া ও টেংরাটিলার দুর্ঘটনায় বিপুল গ্যাস নষ্ট হয়, পরিবেশ ধবংস হয় কিন্তু কথিত আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম ইন্ডাষ্ট্রির নিয়মকানুন ভঙ্গ হয় না, ক্ষতিপূরণও আদায় করা হয় না। যে মডেল পিএসসি ২০০৮ অনুসারে কনোকোফিলিপস কে সাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লক ইজারা দেয়া হচ্ছে সেখানেও সেই একই আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম ইন্ডাষ্ট্রির নিয়ম কানুন মেনে চলার আর্জি রাখা হয়েছে, আশা করা হয়েছে বহুজাতিক গুলো প্রকৃত workmanlike manner এ কাজ করবে! (আর্টিক্যাল ১০.৪, সূত্র: ৪)। শুধু তাই না, আর্টিক্যাল ১০.২৭ এ কোম্পানির ”অদক্ষতা, অযত্ম ও অবহেলা”র কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে :”উপযুক্ত” ক্ষতিপূরণের বিধানের কথা বলা হয়েছিল, সেখান থেকেও কনোকোফিলিপস এর আবদার অনুসারে ”অদক্ষতা” শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছে। (সূত্র: ৫) প্রশ্ন হলো প্রযুক্তিগত দক্ষতার দোহাই দিয়ে কনোকোফিলিপস এর মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে ডেকে আনা হলেও এসব কোম্পানি তাহলে ”অদক্ষতার” ভয় পায় কেন?

দুর্ঘটনার রাজা কনোকোফিলিপস
২০০২ সালের ৩০ আগষ্ট এ কনোকো এবং ফিলিপস পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশান একীভূত হয়ে গঠন করে কনোকো ফিলিপস কর্পোরেশন যা এখন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম এবং সারা দুনিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম এনার্জি কর্পোরেশান। কোম্পানির ওয়েবসাইটে বড় গলায় দাবী করা হয়েছে: ”শেয়ারের বাজার মূল্য, তেল-গ্যাসের রিজার্ভ ইত্যাদি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম এনার্জি কোম্পানি হিসেবে নিরাপদ ভাবে এবং পরিবেশ ও সামাজিক দ্বায়বদ্ধতার সাথে জ্বালানি সরবরাহের দ্বায়িত্ব সম্পর্কে কোম্পানি সম্পূর্ণ অবগত।” (সূত্র: ৬) অথচ বাস্তবে গভীর সমুদ্রে-স্থলভাগে তেলগ্যাস উত্তোলণে দুর্ঘটনা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের রাজা এই কনোকোফিলিপস। ২০০২ সালের আগে কনোকো এবং ফিলিপস পেট্রোলিয়াম পৃথক পৃথক ভাবে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে যেমন: ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে ফিলিপস পেট্রোলিয়াম কর্তৃক নর্থ সি’র একোফিসক ব্রাভো প্লাটফর্ম ব্লো আউট, যা এখন পর্যন্ত নর্থ সি’র সর্ব বৃহৎ ব্লো আউট (সূত্র: ৭) , ১৯৯৩ সালের ২১ ডিসেম্বর কনোকো কর্তৃক লূইজিয়ানা ব্লো আউট ইত্যাদি(সূত্র:৮)। কনোকোফিলিপস হওয়ার পরও কোম্পানির খাসলত পাল্টায়নি:

২০০৪ সালের ১৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ডালকো প্যাসেজ অয়েল স্পিল(সূত্র: ৯),
২০০৬ সালের ৩ মে কানাডার এডসন থেকে ২৬ কিমি দক্ষিণ-পূর্বের একটি গ্যাস কুপ ব্লোআউট(সূত্র:১০),
২০০৮ সালের ১১ নভেম্বর কানাডার ড’সন ক্রিকের ৩০ কিমি পূর্বে গ্রাউন্ড বার্চের এর গ্যাস কুপ আগুনে পোড়ানো(সূত্র: ১১),
২০০৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর, আলাস্কার কুপারুক অয়েল ফিল্ডে এযাবত কালে আলাস্কার সবচেয়ে বড় ওয়েল স্পিল(সূত্র:১২)…

ইত্যাদি নানা ’কৃতিত্ব’ অর্জন করেই চলেছে কোম্পানিটি। এছাড়া ২০০৭ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০১০ এর শুরু পর্যন্ত সময়টুকুতে যুক্তরাষ্ট্রের অকুপেশনাল সেফটি এন্ড হেলথ এডমিনিষ্ট্রেশান (ওএসএইচএ ) কর্তৃক ১১৮ বার পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা ভঙ্গকরার অভিযোগের নোটিশ পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করার গৌরব(!) অর্জন করে কনোকো ফিলিপস। ৮৬২ বার নোটিশ পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে বিপি, সনোকো ১২৭ বার পেয়ে দ্বিতীয় স্থান। (সূত্র: ১৩) বিপি ২০১০ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরের মাকান্দো কুপ ব্লোআউটের মাধ্যমে তার সেই প্রথম স্থান অধিকারের তাৎপর্য দেখিয়ে দিয়েছে! এবার হয়তো বাংলাদেশের সাগর বক্ষে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা ভঙ্গে তৃতীয় স্থান অধিকারি কনোকো ফিলিপসকে তার ’দক্ষতা’ ফলানোর সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে।



জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নাই
বাংলাদেশ সহ সারা দুনিয়ার তেল-গ্যাস উত্তোলণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দক্ষতার বাজারে বড় বড় সাইনবোর্ড ওয়ালা কোম্পানি গুলো যত বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে সেই তুলনায় জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে দুর্ঘটনা ঘটেছে খুবই সামান্য। বিপি, এক্সন, শেভরন, শেল ইত্যাদি বেসরকারি বহুজাতিক কোম্পানি বিদেশের মাটি ও পানিতে তেল-গ্যাস উত্তোলণ করতে গিয়ে যত দুর্ঘটনা, অয়েল-স্পিল কিংবা ব্লো-আউট ঘটিয়েছে সেই তুলনায় আমাদের বাপেক্স, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস কিংবা ভেনিজুয়েলার পিডিভিএসএ ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে নিজেদের দেশে দুর্ঘটনা নেই বললেই চলে। এর কারণ দক্ষতা নয়, দক্ষতার প্রয়োগে। দক্ষতা যেহেতু স্থির, আকাশ থেকে নাযিল হওয়া কোন বিষয় নয়, নিয়মিত যত্মসহকারে অর্জন-লালন-প্রয়োগ করবার বিষয়, তাই দেখা যায় জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা দ্বায়িত্বের সাথে দক্ষতার প্রয়োগ ঘটায়, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা সর্বোচ্চকরণের পেছনে ছুটতে গিয়ে নানান ঝুকিবহুল কারিগরী সিদ্ধান্তের বেলায় মুনাফাকেই প্রাধান্য দেয় ফলে নানান দুর্ঘটনার ঘটিয়ে মূল্যবান সম্পদ বিনষ্ট করে।

বিপির মাকান্দো কুপে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাটি থেকে আবারো সেই বাস্তবতাই বেরিয়ে এসেছে। মেক্সিকো উপসাগরে গভীর সমুদ্রের ব্লকে বিপি’র তেল কুপে স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে বলা যায়, মূলত বিপি এবং তার সহযোগী কোম্পানিগুলোর কূপের ডিজাইন, কনস্ট্রাকশন, সিমেন্টিং, পরীক্ষা-নিরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি কারিগরী বিষয়ে কতগুলো ভয়ংকর সিদ্ধান্তের কারণেই এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। আর এই ঝুকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়েছে সময় ও অর্থ বাচিয়ে মুনাফা সর্বোচ্চ করণের জন্য। এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত জাতীয় কমিশন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছে রিপোর্টে বলেছে এ বিষয়ে বলেছে : ”উদ্দেশ্য মূলক হোক বা না হোক, বিপি, হ্যালিবার্টন আর ট্রান্সওসানের নেয়া যেসব সিদ্ধান্ত মাকান্দো ব্লোআউটের ঝুকি বাড়িয়ে দিয়েছে, পরিস্কার বোঝা যায় ঐ সিদ্ধান্তগুলো তাদের যথেষ্ট সময় (এবং অর্থ) বাচিয়েছে। ” (সূত্র: ১৪)

কমিশনের অনুসন্ধানে এরকম কয়েকটি সিদ্ধান্ত হলো(সূত্র: ১৫)

১) প্রোডাকশন বা উত্তোলণ এর জন্য তেলের কুপে কেসিং বাসনোর ক্ষেত্রে বিপি সময় ও অর্থ বাচানোর জন্য, একটি একটানা দীর্ঘ কেসিং (লং স্ট্রিং কেসিং) কূপের মুখ থেকে কুপের তলা পর্যন্ত বসানোর সিদ্ধান্ত নেয় । মাকান্দো কুপের অনিশ্চিত ও বিপদজনক বৈশিষ্ট বিবেচনা করলে এই লং স্ট্রিং কেসিং বসানো ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, প্রাইমারি সিমেন্টিং এর কাজে বাড়তি জটিলতা তৈরী করে।

২) কুপের দেয়াল আর কেসিং এর মাঝে সিমেন্টিং এর কাজটি সফল ভাবে সম্পন্ন করার জন্য কেসিংটিকে কুপের কেন্দ্র বরবার ভারসাম্যে(কুপের চার দেয়াল থেকে সমান দুরত্বে) রাখা জরুরী ছিল। আর এই ঠিক কুপের কেন্দ্র বরবার কেসিংটিকে স্থির রাখার জন্য প্রয়োজন হয় সেন্ট্রালাইজার। মাকান্দো কুপের কেন্দ্রীয় অবস্থানে কুপের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত কুপের চারদেয়াল থেকে সমান দূরত্বে কেসিংকে স্থির রাখার জন্য আদি ডিজাইন অনুযায়ি ২১ টি সেন্ট্রালাইজারের প্রয়োজন হলেও, বিপি সময় ও অর্থ বাচাতে ব্যাবহার করে মাত্র ৬ টি সেন্ট্রালাইজার। ফলে কেসিংর ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং কেসিং ও কুপের দেয়ালের মাঝে সিমেন্ট সমান পুরুত্ব ও সমান শক্তি নিয়ে বসেনি যা গোট কুপটিকে দুর্বল করে ফেলে।

৩) সিমেন্টিং এর কাজটি সফল করার জন্য কেসিং এর মধ্যে কুপের উপর থেকে নীচে এবং নীচ থেকে উপরে ড্রিল মাড প্রবাহিত করে সিমেন্টিং এর রাস্তা পরিস্কার করা প্রয়োজন ছিল। সময় বাচানোর জন্য বিপি এই কাজটি আংশিক ভাবে সম্পন্ন করেছে।

৪) সিমেন্টিং এর কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সিমেন্ট কত মজবুত হয়েছে সেটা পরীক্ষার জন্য সিমেন্ট বন্ড লগ নামের একটি পরীক্ষা করার কথা ছিল। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শব্দ তরঙ্গ প্রবাহিত করে সিমেন্টের মধ্যে কোন ফাপা বা দুর্বল স্থান আছে কি না সেটা পরীক্ষা করা হয়। পরিক্ষাটি করতে খরচ হয় সাকুল্যে ১ লক্ষ ২৮ হাজার ডলার । কিন্তু পরীক্ষা না করে অপেক্ষমান স্লামবারজার কোম্পানির লোকদেরকে ১০ হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেয় বিপি।

৫) যে নাইট্রোজেন ফোম সিমেন্ট ব্যাবহার করা হয়েছে তার গুনাগুন পরীক্ষার ফলাফল নেতিবাচক হলেও হেলিবার্টন বিপিকে সেটা জানায় নি এবং বিপিও পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে মাথা ঘামায় নি। এই দুর্বল সিমেন্ট ব্যাবহার করেই বিপি সিমেন্টিং এর কাজটি সম্পন্ন করে।

৬) সিমেন্টিং শেষে কুপের স্থিতিশীলতা ও কাঠামোর গুনাগুন পরীক্ষার জন্য নেগেটিভ প্রেসার টেস্ট করা হয়। এই পরীক্ষায় কুপের ভিতরে চাপ একেবারে কমিয়ে দিয়ে দেখা হয়, এই কম চাপে সিমেন্টিং কুপের তলার গ্যাসের প্রচন্ড চাপ সহ্য করতে পারে কি-না। যদি সিমেন্টিং ঠিক না হয়, সিমেন্টিং কুপের তলায় গ্যাস বা তেলাধারের মুখ সঠিক ভাবে বন্ধ করতে না পারে তাহলে তলার গ্যাস/তেলের তীব্র চাপে ড্রিল মাড কুপের নীচ থেকে উপরে উঠে আসে। মাকান্দো কুপে নেগেটিভ প্রেসার টেস্ট করার সময় দুই দুই বার কয়েক ব্যারেল করে ড্রিল মাড উপরে উঠে আসলেও বিপি কিংবা ট্রান্সওসানের কর্মকর্তারা সেটাকে আমলে নেয় নি।

৭) ড্রিল মাড সরানোর আগে অন্তত যদি কুপের তলায় সিমেন্ট প্লাগ বসানো হতো তাহলেও বাড়তি প্রতিরোধ সহনীয়তা তৈরী হতে পারতো। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তাড়াহুড়া করে বিপি সারফেস প্লাগ বসানোর আগে ড্রিল মাড সরিয়ে কুপটিকে দুর্বল করে দেয়।


যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রের জাতীয় সম্পদ নিয়ে বহুজাতিক বিপি এই ধরণের ছিনিমিনি খেলতে পারলে, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে বহুজাতিক তোষণ কারি নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ পেট্রোবাংলার তদারকি যে কোনোকোফিলিপসকে যে থোরাই বাধ্য করা হবে তা বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর গ্যাস উত্তোলণের ইতিহাস থেকে সহজেই অনুমেয়। তারওপর বাংলাদেশে তেল-গ্যাস উত্তোলণের কোন সুনির্দিষ্ট বিধি বিধানও নেই যে তার মাধ্যমে কনোকোফিলিপস এর মতো বহুজাতিককে বাধ্যকরা হবে যথাযথ নিয়ম মেনে তেল-গ্যাস উত্তোলণে। কোনোকোফিলিপস এর আবদার মেনে চুক্তি থেকে ”অদক্ষতা” শব্দটি বাদ দেয়ার তৎপরতা থেকেও লক্ষণটি স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ৫০ লক্ষ্য ব্যারেল তেল সাগরে ছড়িয়ে পড়লে এবং তার মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ ঘটলে সে বিপর্যয় কাটিয়ে উঠা তেমন কঠিন কিছু না হলেও বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য সাগরের তেল-গ্যাস ছাড়াও মৎস সম্পদ, জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী এবং অন্যান্য মূলবান খনিজ সম্পদ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। মুনাফাবাজ বহুজাতিকের হাতে শতকরা ৮০ ভাগ মালিকানায় সেই গ্যাস তুলে দেয়া, রপ্তানির সুযোগ দেয়া কিংবা দুর্ঘটনার মাধ্যমে সেই গ্যাস কিংবা মৎস-উদ্ভিদ-প্রাণীজ-খনিজ সম্পদ সহ গোটা সাগরের পরিবেশ ধ্বংসের ঝুকি নেয়ার বিলাসিতা বাংলাদেশের জন্য নয়। বাংলাদেশের জন্য শত ভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তেল-গ্যাস সহ সাগরের সম্পদ আহরণের ব্যাবস্থা গ্রহণের কোন বিকল্প নেই।


তথ্য সূত্র:
১) Click This Link
২) Click This Link
৩) Report to the President, chapter 3
National Commission on the BP Deepwater HorizoniOil Spill and Offshore Drilling
৪) মডেল পিএসসি ২০০৮
Click This Link
৫) Click This Link
৬) Click This Link
৭) Click This Link
৮) http://www.incidentnews.gov/incident/6975
৯) Click This Link
১০)http://www.ercb.ca/docs/new/newsrel/2006/nr2006-17.pdf
১১) Click This Link
১২) Click This Link
১৩) Click This Link
১৪) Report to the President, chapter 4
National Commission on the BP Deepwater HorizoniOil Spill and Offshore Drilling
১৫) ঐ

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29395796 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29395796 2011-06-12 22:53:06
কনোকো-ফিলিপস এর হাতে তুলে দেয়া হলো সাগরের গ্যাস ব্লক ১০ ও ১১ সাগরবক্ষের দুটি গ্যাস ব্লকের কাজ পাবে কনোকো-ফিলিপস ) এর আগে গত ২১ ডিসেম্বর ২০১০ সালে উইকিলিকস এর বরাতে ফাস হওয়া মার্কিন বার্তার (রেফারেন্স আইডি: 09DHAKA741) ”গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য গ্যাস ব্লক ইজারা”(২,সি) অংশে দেখা যায়:

”গত ২৩ জুলাই এর এক মিটিং এর সময় জ্বালানি উপদেষ্টা কনোকোফিলিপসকে সাগরের দুটি বিরোধহীন গ্যাস ব্লক ইজারা দেয়ার সম্ভাবনার কথা রাষ্ট্রদূতকে জানান।...এরপর ঐ দিনই, আরো পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য ক্যাবিনেট থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো হয়।বাংলাদেশ, ভারত এবং বার্মার মধ্যে সমুদ্রসীমার ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।প্রথমে কনোকোফিলিপস এর ৮টি গ্যাস ব্লকের আবেদন অনুমোদন করা হলেও প্রায় ১ বছর হতে চলল বিষয়টি স্থগিত আছে। কনোকোফিলিপস যে ৮টি ব্লকের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলো একে একে তার সবকটিই বুঝে নিতে চায় কিন্ত শুরুতে বিরোধবিহীন ব্লক দিয়েই কাজ শুরু করতে আগ্রহী।”


মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টিকে দেয়া জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক ইলাহি চৌধুরি তথা শাসক শ্রেণীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই মডেল পিএসসি-২০০৮ অনুসারে গভীর সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকের বিরোধহীন ৮৫% অংশ মার্কিন বহুজাতিক কনোকোফিলিপস এর হাতে তুলে দেয়ার কাজটি করল ক্ষমতাসিন মহাজোট সরকার।(সূত্র:PSC with ConocoPhillips to overlook compensation issue )


জাতীয় স্বার্থ বিরোধী মডেল পিএসসি ২০০৮:
মডেল পিএসসি ২০০৮ এর আর্টিক্যালগুলো পড়লে বোঝা শক্ত নয়, বহুজাতিক কোম্পানিকে সাগরের গ্যাস লুট করার সুযোগ দিতেই এই মডেল পিএসসি বা উৎপাদন অংশীদারিত্বের চুক্তি। এর আর্টিক্যাল ১৪.৩ অনুসারে বিদেশী কোম্পানি উত্তোলিত গ্যাসের সর্বোচ্চ ৫৫% পর্যন্ত গ্যাসকে কস্ট রিকভারী গ্যাস হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে। বাকি ৪৫% গ্যাস হলো প্রফিট গ্যাস যা আবার কোম্পানি এবং পেট্রোবাংলার মাঝে সুনির্দিষ্ট চুক্তি অনুযায়ী দুই ভাগে বিভক্ত হবে। প্রফিট গ্যাস ঠিক কি অনুপাতে ভাগ হবে সে বিষয়ে এই মডেল পিএসসিতে সরাসরি বলা না থাকলেও আর্টিক্যাল ১৫.৫.৪ এ বলা আছে সম্পূর্ণ বাজারজাতযোগ্য গ্যাস বা টোটাল মার্কেটেবল গ্যাসের ২০% এর বেশী পেট্রোবাংলা দাবী করতে পারবে না অর্থাৎ স্পষ্টতই কমপক্ষে ৮০% গ্যাসের মালিকানা বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আর্টিক্যাল ১৫.৫.১ এ পেট্রোবাংলার অনুমোদন সাপেক্ষে বাজারজাতযোগ্য গ্যাসকে বহুজাতিক কোম্পানি কর্তৃক এলএনজি হিসেবে রপ্তানি করার বিধান রাখা হয়েছে।(সূত্র: মডেল পিএসসি ২০০৮ )

রপ্তানির বিধান প্রসঙ্গে:
মডেল পিএসসির সমর্থকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পেট্রোবাংলা বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কেনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেই কেবল তারা তৃতীয় পক্ষের কাছে/বিদেশে গ্যাস এলএনজি করে বিক্রি করতে পারবে। এ ব্যাখ্যার মধ্যে একটা বড় ফাকি আছে। প্রথম কথা হলো, যদি রপ্তানি না করাই পিএসসির উদ্দেশ্য থাকে তাহলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শর্ত দেয়ার দরকার কি, সরাসরি বললেই তো হয় যে রপ্তানি নিষিদ্ধ! দ্বিতীয়ত, পেট্রোবাংলা প্রথম দাবীদার ঠিকই কিন্তু তার জন্য মডেল পিএসসি’র আর্টিক্যাল ১৫.৫.৪ অনুসারে তাকে দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে- এক) তাকে গ্যাস পরিবহন করতে পারতে হবে এবং দুই) উত্তোলিত গ্যাস ব্যাবহার করতে পারতে হবে।

এখন আবিস্কৃত গ্যাসের পরিমাণ দেখে বহুজাতিক কোম্পানি যদি এলএনজি প্ল্যান্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং যদি বাংলাদেশ দৈনিক যে পরিমাণ গ্যাস ব্যাবহার করতে পারবে তার চেয়ে বেশী পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করতে শুরু করে(এটি তারা করতে পারবে কারণ এক বছরে সর্বোচ্চ উত্তোলণ সীমা স্থলভাগের গ্যাসের ক্ষেত্রে ৭.৫% রাখা হলেও সমুদ্রের গ্যাসের ক্ষেত্রে ”প্রয়োজনে” এ সীমা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে) তাহলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং অবদমিত শিল্পখাতে হঠাৎ অনেক বেশী পরিমাণে গ্যাস ব্যবহার করার ক্ষমতা না থাকা- এই কারণে চু্ক্তি অনুসারে আমরা বাধ্য হবো বহুজাতিক কোম্পানিকে এলএনজি বানিয়ে গ্যাস বিদেশে রপ্তানি করার অনুমতি দিতে।

প্রশ্ন আসতে পারে দেশে নিশ্চিত বাজার থাকা স্বত্ত্বেও বহুজিক কোম্পানি কেন শুধু শুধু কোটি কোটি ডলার খরচ করে এলএনজি প্ল্যান্ট বানাতে যাবে? এর কারণ হলো গ্যাসের আন্তর্জাতিক মূল্য। আমরা আগেই দেখেছি চুক্তি মোতাবেক একদিকে বহুজাতিক কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনলে আমাদের যেমন দেশীয় উৎপাদন খরচের তুলানায় ১০/১২ গুণ বেশী দাম দিতে হয়, তেমনি আরেকদিকে বহুজাতিক কোম্পানিকেও আর্ন্তজাতিক মূল্যের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মুল্যে পেট্রবাংলার কাছে বিক্রয় করতে হয়। ফলে পেট্রোবাংলার কাছে বিক্রি করলে প্রতি হাজার কিউবিক ফিটে তার লাভ কম অর্থাৎ ”ক্ষতি” হচ্ছে ৭/৮ ডলার অর্থাৎ প্রতি টিসিএফ এ ”ক্ষতি” ৭/৮ বিলয়ন ডলার। স্রেফ এই ১ টিসিএফের ”ক্ষতি”র টাকাটুকু যদি সে বিনিয়োগ করে একবার এলএনজি প্লান্ট বানিয়ে ফেলতে পারে তাহলে পরবর্তীতে তাকে আর এই ”ক্ষতি”টুকু স্বীকার করতে হবে না( যদি ৪ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া যায় তাহলে দেশীয় বাজারে বিক্রি করলে ২৮ থেকে ৩২ বিলিয়ন ডলার ”ক্ষতি” স্বীকার করতে হবে, কাজেই তার পক্ষে ৭/৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক হবে)- দেশীয় শিল্পের প্রয়োজনাতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন করলেই পেট্রোবাংলা বাধ্য হবে তাকে এলএনজি আকারে গ্যাস রপ্তানি করতে দিতে!

আরেকটা বিষয় হলো, পেট্রোবাংলার চাহিদা মেটানোর পরই কেবল তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে পারার এই কথা চুক্তিতে থাকলেই যে তা মেনে চলা হবে তারও কোন নিশ্চয়তা নেই, বহুজাতিক সান্তোসকে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদনের চুক্তি তো সে ইশারাই দিচ্ছে।


বিনিয়োগের পুঁজি ও প্রযুক্তির অভাব প্রসংগে:
আমাদের জাতীয় সম্পদের উপর ৮০% বিদেশী মালিকানা এবং সেই সাথে রপ্তানির সুযোগ দিয়ে পিএসসি চুক্তি করার অযুহাত হিসেবে সরকারি ভাবে যে প্রসংগটি উত্থাপন করা হচ্ছে তা হলো বিশাল বিনিয়োগের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত পুঁজি নাই এবং নিজেরা তোলার মত দক্ষতাও আমাদের দেশীয় কোম্পানিগুলোর নাই। সুতরাং যে কোন মূল্যে, এই গ্যাস সংকটের সময়ে ৮০ ভাগ মালিকানা এবং বিদেশী রপ্তানির সুযোগ দিয়ে হলেও ঐসব বহুজাতিক কোম্পানিকে দিয়েই গ্যাস উত্তোলন করতে হবে। এই যে পুঁজি ও দক্ষতার অভাবের অযুহাতটি দেয়া হচ্ছে এটা কিন্তু নতুন নয়, এই অযুহাতটা বেশ ঐতিহাসিক, যখনই কোন গণবিরোধী প্রকল্প বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়া হয়, তখনই কিন্তু যুক্তিটি হাজির করা হয়। এখন সমুদ্রের গ্যাসের ক্ষেত্রে যুক্তিটি দেয়া হচ্ছে, এর আগে কিন্তু স্থলভাগের গ্যাস ব্লক ইজারা দেয়ার অযুহাত হিসেবেও এই একই যুক্তি দেয়া হয়েছে। অথচ আজ আমরা জানি, বাপেক্স পুরোনো জীর্ণ ড্রিলিং/রিগিং যন্ত্রপাতি নিয়েও দক্ষতা ও যোগ্যতার অর্থে কোন অংশেই বিদেশী কোম্পানিগুলোর তুলনায় কম নয়- দেশী/বিদেশী কোম্পানির মিলিতভাবে সাফল্যের অনুপাত যেখানে ৩:১, সেখানে দেশীয় কোম্পানির সাফল্যের অনুপাত ২.২৫:১ (১৮ টি অনুসন্ধান কূপ খনন করে ৮ টি গ্যাস ক্ষেত্র আবিস্কার১০, বাপেক্স বহুজাতিক টাল্লোকে ২-উ সিসমিক সার্ভে থেকে শুরু করে ভাঙ্গুরায় এমনকি কূপ ড্রিলিং (ওয়ার্কওভার)ও করে দিয়েছে।(সূত্র: GEOPHYSICAL DIVISION AT A GLANCE ) আর পুঁজির অভাবের কথা বলে বাপেক্সকে সময় মতো ড্রিলিং রিগ কেনার ৮০ কোটি টাকা দেয়া না হলেও ২৫ টাকার গ্যাস ২৫০ টাকা করে বছর বছর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়ার টাকার অভাব হয় না। কাজেই পুঁজি কিংবা দক্ষতার অভাব মূল প্রশ্ন নয়, মূল প্রশ্ন হলো শাসক শ্রেণী কার স্বার্থ দেখছে - জনগণের না বহুজাতিকের- সেটা। জনগণের স্বার্থের কথা মাথায় থাকলে তো বাপেক্সকে কবেই আপগ্রেড করার পরিকল্পনা নেয়ার কথা। আবার এতদিন করা হয়নি বলে যে এখন আর করা সম্ভব নয় ব্যাপারটি কিন্তু তাও নয়। সেক্ষেত্রে তো কোনদিনই আমরা নিজেরা গ্যাস তুলতে পারব না, ফলে চিরকালই জাতীয় সম্পদ বহুজাতিকের হাতে তুলে দিতে হবে। আর অনশোরের মত অফশোরেরও গ্যাস তোলার প্রযুক্তি ও দক্ষতা তো শুরু থেকেই কারো থাকে না, এটা অর্জন করতে হয়। অনশোরে বা স্থলভাগে আজকে বাপেক্সের যে দক্ষতা সেটাও তো অর্জন-ই করতে হয়েছে, তাই না? মালয়শিয়ার পেট্রোনাস, ভেনিজুয়েলার পিডিভিএসএ এদের কারোরই কোন অফশোরে দক্ষতা ছিল না কিন্তু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় উপযুক্ত প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি আমদানি ও ট্রেনিং এর মাধ্যমে তারা সেটা অর্জন করেছে। তাহলে আমাদের না পারার তো কোন কারণ দেখছি না!

আর পুঁজির অভাব? অফশোর ড্রিলিং করতে কত টাকা লাগে? মায়ানমারের ময়াত্তামা অফশোর(ইয়াদানা গ্যাস প্রজেক্ট) ড্রিলিং এর জন্য ব্যয় হয়েছে ১.২ বিলিয়ন ডলার এবং তানিন থারিই অফ শোর(ইয়াতাগুন গ্যাস প্রজেক্ট) ড্রিলিং এর জন্য ব্যয়ের পরিমান প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার(সূত্র : Country Report for Myanmar Presented by U Kyaw Nyein Managing Director Myanma Oil and Gas Enterprise) - গড়ে যদি ১ বিলিয়ন ডলার করে ধরি তাহলে বাংলাদেশের টাকায় ব্যায় হলো প্রায় ৭০০০ কোটি টাকা। কিন্তু এই টাকাটা একবারে লাগবে না- গ্যাস আবিষ্কার ও উত্তোলনের জন্য ৭ বছর সময় লাগলে প্রতিবছর লাগবে ১ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ প্রতিবছর বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কেনার জন্য এবং বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছ থেকে অতি উচ্চ মূল্যের বিদ্যুৎ কেনার জন্য ভর্তুকি দেয় হলো ৪ হাজার কোটি টাকার মতো। ট্যাক্স, ভ্যাট, লভ্যাংশ সবকিছু মিলিয়ে প্রতি বছর পেট্রোবাংলা ও তার অঙ্গ সংস্থাগুলো সরকারকে গড়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা প্রদান করে।(সূত্র: পেট্রবাংলার বার্ষিক রিপোর্ট, ২০০৮ ) চুক্তি বাতিল করে দেশীয় কোম্পানির মাধ্যমে গ্যাস তোলা হলে এই ভর্তুকির টাকা কিংবা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া টাকার একটা অংশ থেকেই আমরা গভীর সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনের খরচটা পেয়ে যাব। তাছাড়া প্রয়োজনে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে লেভি, ঋণ, শেয়ার, বন্ড ইত্যাদির মাধ্যমেও পুঁজি সংগ্রহ করা সম্ভব।

যদি বলা হয় প্রযুক্তি ও দক্ষতা ভালোভাবে অর্জন করতে তো ৫/৭ বছর সময় লাগবে, তাহলে ততদিন চলবে কি করে? এখানে বলা দরকার, প্রথমত, স্থলভাগের গ্যাস দিয়ে বর্তমানের যে ঘাটতি আছে তা মেটানো সম্ভব যদি বিদেশী কোম্পানির লাভ-লোকসানের বিবেচনা থেকে বের হওয়া যায়, যদি বাপেক্স আবিস্কৃত সুনেত্র গ্যাস ক্ষেত্র থেকে জাতীয় সংস্থার মাধ্যমেই গ্যাস উত্তোলন শুরু করা যায় এবং যদি যে সব কূপ স্রেফ কয়েকশো কোটি টাকার অভাবে অনুসন্ধান ও উত্তোলন করা যাচ্ছে না, গেলেও পাইপ লাইনের জন্য বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে না, সেগুলোর জন্য সময় মত অর্থ বরাদ্দ করা হয়। তারপরও যদি ঘাটতি থাকে তাহলে খুব সহজেই, দক্ষতা অর্জনের মধ্যবর্তী সময়টুকু পেট্রোবাংলা সাবকন্ট্রাক্টর দিয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় মালিকানায় সমুদ্রের গ্যাস উত্তোলন করতে পারে। যেসব বিদেশী কোম্পানিকে দিয়ে গ্যাস তোলানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে তারাও কিন্তু একই ভাবে কাজ করে। যেমন: আমাদের সমুদ্রসীমার ঠিক পাশেই মায়ানমারের SHWE গ্যাস ফিল্ডে দক্ষিণ কোরিয়ার DAEWOO মূলত নিম্নলিখিত কন্ট্রাক্টর কোম্পানিগুলো দিয়ে কাজ চালাচ্ছে(সূত্র: http://www.shwe.org/about-shwe' target='_blank' >Shwe Gas Movement এর ওয়েবাসাইট )-

১) সেমি-সাবমারজিবল রিগ এর জন্য চিনের চায়না ওয়েল ফিল্ড সার্ভিস লিমিটেড কোম্পানি;
২) হেলিকপ্টারের জন্য নিউজিল্যান্ডের হেলিকপ্টার এনজেড নামের কোম্পানি;
৩) অফশোর সাপোর্ট ভ্যাসেল এর জন্য সিংগাপুর-হংকং এর সোয়ার পেসিফিক অফশোর নামের কোম্পানি;
৪) সার্ভে জাহাজের জন্য সিংগাপুর-সুইডেনের ভাইকিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি;

তাহলে পেট্রোবাংলার অনশোরে যে দক্ষতা সেটা ব্যবহার করে আর কিছু না হোক অফশোরে এই সব সাব-কন্ট্রাক্টর কোম্পানির সুপারভিশন কেন করতে পারবে না?

লুটেরা উন্নয়ন দর্শন:
এই যে সাগর লুটের আয়োজন সম্পন্ন করে এনেছে শাসক শ্রেণী, সাগরের গ্যাস ইজারার নামে আসলে দেশের ভাবিষ্যৎ, জাতীয় সম্পদ ও জ্বালানী নিরাপত্তাকেই ইজারা দিতে চাচ্ছে তার পেছনে ম.তামিম বা তৌফিক ইলাহি চৌধুরীদের কারসাজি থাকলেও মূল কিন্তু আরো গোড়ায়- বুর্জোয়া শাসকদের উন্নয়ন দর্শনেই নিহিত। যে উন্নয়ন দর্শনে বাজার উদারীকরণ, বেসরকারীকরণ, প্রবৃদ্ধি, বিদেশী বিনিয়োগ ইত্যাদির দোহাই পেড়ে জনগণের স্বার্থকে জবাই করে গুটিকয়েকের জন্য সোনার ডিম সংগ্রহ করা হয়, সে উন্নয়ন দর্শনের যুক্তিতে গ্যাস রপ্তানির সিদ্ধান্তটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আরে বাবা, গ্যাস যদি রপ্তানির সুযোগ না দাও তাহলে কি বিদেশী বিনিয়োগ আসবে? আর বিদেশী বিনিয়োগ যদি না আসে, যদি বহুজাতিক দক্ষতা নিয়োজিত না হয়, তাহলে কি আমরা কোনদিনও আমাদের গ্যাস উত্তোলন করতে পারবো, এখন তো তাও ২০% পাচ্ছি, তখন তো সাগরের নীচে পচবে সে গ্যাস! --- এই উন্নয়ন দর্শনটাই ভ্রান্ত, এই উন্নয়ন দর্শন লুটপাটের বাস্তবতা তৈরী করে, এটাকে চ্যালেঞ্জ করা দরকার। বলা দরকার, পুঁজির অভাবের কথা বলে শাসক শ্রেণী বহুজাতিক কে ডেকে আনছে কিন্তু বাস্তবে তো জনগণের টাকা থেকেই সেই বহুজাতিকের বাড়তি পুঁজির যোগান দিচ্ছে। বছরে মাত্র কয়েকশ’ কোটি টাকার অভাবে যেখানে বাপেক্স অত্যন্ত দক্ষ ও সক্ষম একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারছে না সেখানে ডেকে আনা বহুজাতিক কে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। আর দক্ষতার কথা? আমরা দেখেছি বহুজাতিকেরা নিজেদের অভিজ্ঞ ও পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির মালিক বলে দাবি করলেও বাস্তবে তারাও যন্ত্রপাতি ও টেকনিশিয়ানদের ভাড়া করে এনে কাজ করায়। সেই কাজটুকুও যে মুনাফাবাজির কারণে তারা ঠিক ঠাক সম্পন্ন করতে পারে না তার নজির-- বহুজাতিক অক্সিডেন্টাল আর নাইকো মিলে মাগুরছড়া আর টেংরাটিলার বিপুল পরিমাণ গ্যাস নষ্ট করা, আন্তর্জাতিক বাজারে যার দর এখন প্রায় ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকার মতো। কই আমাদের বাপেক্স তো এরকম কিছু ঘটায়নি!

এই রকম একটা বাস্তবতায় নিম্নোক্ত দাবীগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরী-
১) ৮০% মালিকানা এবং রপ্তানির বিধান রেখে কনোকো ফিলিপসকে ১০ ও ১১ নম্বর গ্যাস ব্লক ইজারা চুক্তি বাতিল করতে হবে।

২) বহুজাতিক সান্তোসকে পেট্রোবাংলাকে পাশ কাটিয়ে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদন বাতিল করতে হবে।

৩) গ্যাস/কয়লা ইত্যাদি রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।

৪) মডেল পিএসসি ২০০৮ সহ ইতিপূর্বে সম্পাদিত সকল গণবিরোধী পিএসসি চুক্তি বাতিল করতে হবে।

৫) বাপেক্স সহ সকল দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও দক্ষ ও শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যেন স্থলভাগের মতো গভীর সমুদ্রেও দেশীয় কোম্পানিগুলো নিজেরাই তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্য চালাতে পারে। মধ্যবর্তী সময়টুকুতে একটি বা দুটি ব্লক থেকে কাজ চালানোর মতো গ্যাস উত্তোলনের জন্য বাপেক্সের কর্তৃত্ত্বাধীনে দেশী-বিদেশী কন্ট্রাক্টর ও যন্ত্রপাতি ভাড়া করা যেতে পারে।

আসুন তেল-গ্যাস-বিদুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে বিবিয়ানা কিংবা ফুলবাড়ির মতো এবারও জাতীয় সম্পদ লুটপাট প্রতিহত করি, শ্লোগান তুলি: তেল-গ্যাস-বন্দর/ইজারা দেয়া চলবে না, আমার দেশের গ্যাস-কয়লা/আমার দেশেই রাখব।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29386371 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29386371 2011-05-24 21:09:17
টেলিকম বহুজাতিকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রথম আলোর অস্থিরতা
এই নিউজটির পাশেই আছে কালের কন্ঠের “হলুদ সাংবাদিকতা” নিয়া একটা নিউজ, মতিউর রহমানের কাজ কারবারের বিরুদ্ধে কালের কন্ঠের সাংবাদিকতা যদি “হলুদ সাংবাদিকতা” হয়, তাহলে প্রথম আলোর এই বহুজাতিক কোম্পানির কাছে দেশের টেলিকম খাত সস্তায় তুলে দেয়ার পক্ষের সাংবাদিকতার নাম কি? বেশ্যা সাংবাদিকতা? না, বেশ্যা তো নিজের শরীর বিক্রির নির্মম করুণ পেশায় জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়, এরা তো নিজের মা’কে বহুজাতিকের কাছে বিক্রির এবং সেই সাথে বিক্রয় মূল্য কমানোর প্রকাশ্য দালালি করছে, এটা কোন ধরণের দালালি?
বিশেষ প্রতিনিধি, কার প্রতিনিধি? কর্পোরেট লবিং এর চূড়ান্ত নজির এই রিপোর্টটি কে তৈরী করেছে তার নাম আমরা জানিনা, বলা হয়েছে “বিশেষ প্রতিনিধি”..। পুরো খবরটি পড়ে বোঝাই যাচ্ছে ইনি একজন “বিশেষ প্রতিনিধি” কিন্তু প্রশ্ন হলো উনি কার বিশেষ প্রতিনিধি? প্রথম আলোর একজন পাঠক যথার্থ প্রশ্ন তুলেছেন মন্তব্য অংশে:

“ভাই বিশেষ প্রতিনিধি; আপনি কি আমাদের প্রতিনিধি ? নাকি বিশেষ কারো প্রতিনিধি ? আপনার একতরফা লেখা পড়ে হতাস হইলাম। এত দিন উনারা কত টাকা বিনিয়োগ করে কত টাকা কামাইছেন ? ভিওআইপি করে, এক জনের সিম অপরজনকে দিয়ে কত টাকা কর ফাঁকি দিছে ? একটা কোম্পানি তো লাইসেন্স ছাড়া চলছিল । কিছু তো লিখেন নাই। "১৪ হাজার কোটি টাকা দিতে হলে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য তাদের হাতে আর অর্থ থাকবে না" এইটা কেমন কথা, উনারা কি কইয়ের তেল দিয়ে কই খাবেন ?, উদ্বিগ্ন বিশ্বব্যাংক !!! কিন্ত কেন ? সব জাগাতে দাদাগিরি !!!”

দেশপ্রেমের ইজারা নেয়া প্রথম আলো তার এই দালালির ক্ষেত্রে মুরুব্বি হিসেবে হাজির করেছে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ আর বহুজাতিকেরবিশ্বব্যাংক কে, যেন বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ভালো ছাড়া মন্দ চাইতেই পারেনা(!), ফলে বিশ্ব ব্যাংক যেহেতু লাইসেন্স ফি নিয়ে “উদ্বিগ্নতা” পোষণ করেছে, যেহেতু অর্থমন্ত্রী মুহিতের কাছে চিঠি দিয়ে বলেছে: “লাইসেন্স নবায়নের খসড়া নীতিমালাটি বাস্তবায়িত হলে টেলিযোগাযোগ খাতে বাংলাদেশের অর্জন নষ্ট হয়ে যাবে এবং দেশটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”, ফলে এইটাই সহি, এইটাই আমাদেরকে মেনে নিতে হবে।শুধু নতুন লাইসেন্সের চার্জ কমানো না,পুরোনো লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানোর অযাচিত সুপারিশও করার সুখবর(!) দিয়েছে প্রথম আলো: “টেলিযোগাযোগ খাতকে সংকট থেকে উদ্ধারের জন্য চার মুঠোফোন কোম্পানির বিদ্যমান লাইসেন্সের মেয়াদ সাময়িকভাবে বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।“
দেশপ্রেমিক প্রথম আলো “দেশের উন্নতির” জন্য বিদেশী বিনোয়েগের প্রেসক্রিপশান দেয় কারণ বাংলাদেশের নাকি মূল সমস্যা পুজির। আর এখন প্রথম আলোর মতে বিদেশী বিনিয়োগকারী টেলিকম কম্পানি গুলোর পুজির যোগানের ব্যাপারেও হিসেব নিকেশ করতে হবে বাংলাদেশকে, কারণ:
“এত টাকা কোথা থেকে আসবে তা নিয়েও রয়েছে নানা সমস্যা। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কনসোর্টিয়াম ভিত্তিতে (একাধিক ব্যাংক মিলে ঋণ দেওয়া) সর্বোচ্চ ঋণ নিয়েছে বিমান, ৮১৪ কোটি টাকা। আর ওরাসকম টেলিকম বন্ড ছেড়ে বাজার থেকে তুলেছে ৭০৭ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে চারটি কোম্পানিকে ১৪ হাজার কোটি টাকা কে দেবে তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।“

বিদেশী কোম্পানি যদি বাংলাদেশের ব্যাংক কিংবা বন্ড বাজার থেকে পুজি সংগ্রহ করে ব্যাবসা করে তাহলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির এই কাজটি করতে সমস্যা কোথায়? কেন বিদেশী বিনিয়োগের নামে দেশের সম্পদ বিদেশেীদের হাতে তুলে দেয়া?

প্রথম আলো, ভারতের স্পেকট্রাম কেলেংকারির রেফারেন্স টেনে বলছে:
“ভারতে দ্বিতীয় প্রজন্মের মুঠোফোন সেবাদাতাদের লাইসেন্স দেওয়া নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির খবর এখনো আসছে। ভারতের এই টেলিকম-দুর্নীতির মূলে আছে কোনো স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অনুমাননির্ভর ফ্রিকোয়েন্সি চার্জ নির্ধারণ।“

আসলে কি তাই, ভারতের টেলিকম কেলেংকারির মূল সমস্যা কি প্রথম আলো কথিত “অনুমান নির্ভর ফ্রিকোয়েন্সি চার্জ নির্ধারণ” নাকি ফ্রিকোয়েন্সির মূল্য কম নির্ধারণ করা? ভারতকে মোট ২৩ টি ইউনিফাইড সার্ভিস এরিয়া(ইউএসএ) তে ভাগ করে প্রতিটি সার্ভিস এরিয়ার জন্য ২০০১ সালের হারে প্রতিটি লাইসেন্স (৪.৪ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম সহ) ফি রাখা হয়েছিল ২০ বছরের জন্য ১৬৫৮ কোটি রুপি করে। কিন্তু ভারতের কম্প্রট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) বা মহাহিসাব রক্ষকের রিপোর্ট, এটিকে বর্তমান বাজার দর হিসেবে কয়েকগুণ অবমূল্যায়িত বলে আখ্যায়িত করে। রিপোর্ট টিতে ভারতের বাজারে মোবাইল টেলিকম লাইসেন্সের বর্তমান সম্ভাব্য মূল্য হিসেবে ৭,৭৫৮ কোটি থেকে ৯,১০০ কোটি রুপি অর্থাৎ ১২,০২৫ কোটি থেকে ১৪,১০৫ কোটি টাকা ধরা হয়।(সূত্র:অধ্যায় ৫, সিএজি রিপোর্ট, Click This Link)
বাংলাদেশে প্রতি মেগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সির চার্জ ১৫ বছরের জন্য ধরা হয়েছে ৯০০ মেগাহার্জের ক্ষেত্রে ৩০০ কোটি টাকা এবং ১৮০০ মেগাহার্জের ক্ষেত্রে ১৫০ কোটি টাকা এবং লাইসেন্স ফি ৫ কোটি টাকা। ভারতের হিসেবে এটা কম না বেশি? ভারতের ২০০১ সালের হিসেবের সাথে যদি বাংলাদেশের সাথে একটা তুলনা করা যাক। ২০০১ সালে ভারতের জনসংখ্যা ১০০ কোটি ধরে ২৩টি ইউনিফাইড সার্ভিস এরিয়া বা ইউএসএ’র প্রতিটির আওতায় জনসংখ্যা থাকে ৪.৩৪ কোটি। বাংলাদেশের ১৫/১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশ তাহলে ভারতের ৩/৪টি ইউএএসএ’র সমান। তাহলে বাংলাদেশের প্রতিমেগাহর্জ লাইসেন্স ফি অন্তত ভারতের ৩গুণ হওয়া উচিত। চলুন দেখা যাক বাস্তবে কত গুণ।
ভারতে ২০০১ সালে,৪.৪ মেগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সির দাম ২০ বছরের জন্য ছিল ১৬৫৮ কোটি রুপি বা ২৪৮৭ কোটি টাকা(১ রুপি=১.৫ টাকা ধরে)।
সুতরাং ১ মেগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সির দাম ১৫ বছরের জন্য হতে পারে ৪২৩.৯২ কোটি টাকা।

২০০১ সালের হিসেবে বাংলাদেশের চেয়ে তিন/চারগুন ছোট একটি এলাকার জন্য ভারতে প্রতিমেগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সির দাম ছিল ৪২৩.৯২ কোটি টাকা। সুতরাং ভারতের ২০০১ সালের হিসেবে, বাংলাদেশের মতো একটি দেশের ফ্রিকোয়েন্সির দাম হতে পারে ১২৭১.৭ কোটি টাকা। অথচ ২০১১ সালে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি মেগাহার্জের(৯০০ মেগাহার্জ) দাম ধরা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা মাত্র। অর্থাত সেএজির হিসেবে, ভারতের অবমূল্যায়িত ফ্রিকোয়েন্সি মূল্যের চেয়েও ৪ গুণ কম দাম রাখা হয়েছে বিটি আরসির বর্তমান খসড়া লাইসেন্স নীতিমালায়।
সিএজির হিসেবে ভারতে বর্তমানে এক একটি ইউএএস এর জন্য ৪.৪. মেগাহার্জের লাইসেন্স ফি হওয়া উচিত অন্তত: ৯,১০০ কোটি রুপি অর্থাত ১৩,৬৫০ কোটি টাকা। বর্তমানে ভারতের জনসংখ্যা ১২০ কোটি ধরলে, এবং বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ধরলে, ২৩ টি ইউএএস’এর প্রতিটির ৩ গুণ জনসংখ্যা বাংলাদেশের আওতা ভুক্ত। তাহলে,
সিএজি’র হিসাব মতে, ৪.৪ মেগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সির দাম ২০ বছরের জন্য হওযা উচিত ১৩,৬৫০ কোটি রুপি।

সুতরাং ১ মেগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সির দাম ১৫ বছরের জন্য হতে পারে ২৩২৬.৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশের চেয়ে ৩ গুণ ছোট এলাকার এক একটি ইউএএস এর ফ্রিকোযেন্সির দাম ২৩২৬.৭ কোটি টাকা হলে বাংলাদেশের হিসেবে ফ্রিকোয়েন্সির দাম হবে ২৩২৬.৭*৩= ৬৯৮০.১১ কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশে প্রতিমেগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সির দাম ধরা হয়েছে মাত্র ৩০০ কোটি টাকা অর্থাত ভারতের সিএজি’র হিসেবের চেয়ে ২৩.২৬ গুণ কম!! আর প্রথম আলো বিশ্বব্যাংক কিংবা মোবাইল কোম্পানিগুলো বলছে এটা নাকি আন্তর্জাতিক বাজারের হিসেবে চড়া মূল্য রাখা হয়েছে, এবং এর মাধ্যমে নাকি মোবাইল কোম্পানিগুলোর উপর প্রথম আলোর ভাষায় “বিপুল অর্থের দায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে”!!
প্রথম আলো, “স্বচ্ছ্বতা” ও “অনুমান নির্ভর” ফ্রিকোয়েন্সির কথা বলে স্পেকট্রাম ক্যালেংকারির মূল প্রসঙ্গটিই আড়াল করে দিল কি চমতকার!!কারণ সেক্ষেত্রে ভারতের টেলিকম সেক্টরে স্পেকট্রাম লুটপাটের ঘটনায় টেলিকম মন্ত্রী আন্ডিমুথ রাজার সাথে ভারতের কুখ্যাত কর্পোরেট লবিইস্ট নিরা রাদিয়ার এবং সংশ্লিষ্ট অনন্য কর্পোরেট যেমন রতন টাটা, কর্পোরেট মিডিয়ার সাংবাদিক বীর সাংভি বা বারখা দত্ত’র সম্পর্কের ও ততপরতার মুখে আনতে হয় এবং সেটা মুখে আনলে এই রিপোর্টের “বিশেষ প্রতিনিধি” কিংবা প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সাহেবের ততপরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে!!

আমরা সেই প্রশ্ন তুলতে চাই, আমরা জানতে চাই মতিউর রহমানের প্রথম আলো বহুজাতিক টেলিকম সেক্টরের হয়ে পত্রিকায় লিড নিউজ করার মাধ্যমে প্রকাশ্য দালালি করার স্পর্ধা পেল কোথায়?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29366901 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29366901 2011-04-21 23:48:07
বিডিং রাউন্ড ২০১১: গ্যাস লুটের নতুন ধান্দা


এখন এইসব ব্লকে আবার নতুন করে পিএসসি করতে চাওয়ার কারণ হলো ক্যাপাসিটির সমস্যার কথা বলে বাপেক্সের হাতে থাকা সম্ভবনাময় ব্লকগুলোও (এর মধ্যে পড়তে পারে বাপেক্স কর্তৃক সুনামগঞ্জ নেত্রকোণা অঞ্চলে আবিস্কৃত সুনেত্রা গ্যাস ক্ষেত্র যাতে ৪.৫ টিসিএফ পরিমাণ গ্যাস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, ক্ষেত্রটির উপর শেভরণ আর কনোকো ফিলিপস এর মুনাফা নজর পড়েছে) বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া(বৈঠকে বাপেক্স তার সামর্থ্য অনুযায়ি কতগুলো ব্লকে অনুসন্ধান চালাতে সক্ষম সে বিষয়ে জুন মাসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন চেয়েছে মন্ত্রণালয়!) এবং সেই সাথে বিদেশী কোম্পানির হাতে থাকা কথিত ”অলাভজনক” ব্লকগুলোকে নতুন পিএসসি চুক্তির মাধ্যমে তাদের জন্য লোভনীয় ও লাভজনক করে তোলা। বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়া বেশির ভাগ ব্লকেই বহুজাতিক কোম্পানি গুলো লাভজনক না হওয়ার অযুহাতে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণ কার্যক্রম চালায় নি। এখন নতুন করে গ্যাসের সংকটের প্রেক্ষিতেও এদেরকে দিয়ে গ্যাস তোলার কাজ করানো যাচ্ছেনা যদি না সেসময় পিএসসি চুক্তিতে গ্যাসের যে সর্বোচ্চ দাম বেধে দেয়া আছে সেটা আরো বাড়ানো হয় এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়। যেমন ১৯৯৭ এর মডেল পিএসসি অনুসারে বিদেশী কোম্পানিগুলো ১ মেট্রিকটন হাইসালফার ফুয়েল ওয়েলের সমপরিমাণ গ্যাসের দাম পেট্রবাংলার কাছে সর্বোচ্চ ১৪০ ডলার করে রাখতে পারবে(অর্থাৎ প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস পেট্রবাংলার কাছে সর্বোচ্চ ৩.৩৮ ডলার বা ২৩৬ টাকা দরে বিক্রি করতে হবে) এবং কোন ক্রমেই পেট্রবাংলা ছাড়া তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে পারবে না। এখন নতুন করে পিএসসি করার মানে হলো আন্তর্জাতিক বিডিং এ এই কোম্পানিগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পুরোনো ব্লকগুলো তো হস্তগত করবেই এমনকি বাপেক্সের হাতে থাকে থাকা ব্লকগুলোও তাদের হাতে চলে যেতে পারে। তাছাড়া নতুন পিএসসির ফলে পার্থক্য হবে পেট্রাবাংলার কাছে বিক্রি করা গ্যাসের সর্বোচ্চ দামে এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদন প্রাপ্তিতে। মডেল পিএসসি ২০০৮ এ গ্যাসের সর্বোচ্চ দাম ১৯৯৭ এর পিএসসির ১৪০ ডলার থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছিল ১৮০ ডলার। মডেল পিএসসি ২০১১ তে হয়তো আরো বাড়ানো হবে। আর বিদেশে রপ্তানির অনুমতি না দেয়া হলেও তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমোদন দেয়ার মানে হচ্ছে পেট্রোবাংলার কাছে সর্বোচ্চ ১৪০ বা ১৮০ ডলার মূল্যে গ্যাস বিক্রির বাধ্যকতা আর থাকলো না, কোম্পানিগুলো দেশের ভিতরেই বিভিন্ন দেশী বিদেশী বেসরকারি কোম্পানির কাছে উচ্চমূল্যে গ্যাস বিক্রি অর্থাৎ দেশের ভিতরেই রপ্তানি মূল্য আদায় করতে সক্ষম হবে। ফলে পেট্রবাংলাকে তখন হয় আরো উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনতে হবে অথবা গ্যাসের অভাবে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও সার কারখানাগুলোকে বন্ধ করে রাখতে হবে!

বর্তমান সংকটও বিদেশ নির্ভরতার ফল:
গ্যাসের সংকটের মধ্যে দ্রুত গ্যাস উত্তোলণের কথা বলে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানিকে গ্যাস ব্লকগুলো নতুন করে ইজারা দেয়ার কথা বলা হলেও আসলে বিদেশ নির্ভরতাই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। ৮০ ভাগ মালিকানা দিয়ে বিদেশী কোম্পানিগুলোকে গ্যাস ক্ষেত্র ইজারা দেয়া হলেও তারা সময় মতো গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণ কার্যক্রম চালায় নি বলেই আজকে এই অবস্থা। উদাহরণ স্বরূপ ২২, ২৩, ১৭, ১৮, ১০, ৭ ও ৫ নম্বর ব্লকগুলোর কথা বলা যেতে পারে। অতিস¤প্রতি এরমধ্যে কেবল ৭ নং ব্লকে কাজ শুরু হলেও ১৯৯৩ ও ১৯৯৭ সনে ইজারা দেয়ার পর বহুবছর পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশ আজও জানতে পারেনি ব্লকগুলোর মজুদ কত! কারণ কেয়ার্ন, ইউনিকল, ইউনাইটেড মেরিডিয়ান, ওমান এনার্জি, শেলওয়েল, ওকল্যান্ড, রেক্সউডের মতো কোম্পানিগুলোর কাছে ব্লকগুলো কেবল হাতবদল হয়েছে, কোন কাজই হয় নি। গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলন লাভজনক হবে না, রপ্তানি করা যাবেনা কিংবা তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করা যাবে না ইত্যাদি অযুহাতে এই পরিস্থিতি তৈরী করা হয়েছে যে এতদিন পর আবার নতুন করে স্থলভাগের গ্যাসব্লক গুলোতে গ্যাস অনুসন্ধান করতে হচ্ছে। অথচ পিএসসি বা উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি অনুসারে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণ কার্য শুরু করার বাধ্যবাধকতা থাকে কিন্তু বিদেশ নির্ভরতার কারণে ও বহুজাতিকের স্বার্থই প্রাধান্য পাওয়ার কারণে সেই কাগুজে আইন আর বাস্তবায়ন হয় না। এখন আবার বলা হচ্ছে, গ্যাস ব্লক ইজারা পেয়ে কোন কোম্পানি যদি তা সম্পন্ন না করে তাহলে নতুন মডেল পিএসসি ২০১১ তে আইনি ব্যাবস্থা রাখা হবে। অথচ পুরোনো পিএসসিগুলোতেই নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস অনুসন্ধান বা উত্তোলণ না করলে চুক্তি বাতিলের বিধান ছিল, কই সেটা তো বাস্তবায়ন হয়নি! তাহলে নতুন আইনি বিধানের কথা তুলার যুক্তি কি আর সেটা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তাই বা কি!

মালিকানা ও খরচের প্রশ্ন:
উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি বা পিএসসির মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আপত্তিকর বিষয়টি হলো গ্যাসের মালিকানা বিদেশীদের হাতে চলে যাওয়া ও উত্তোলণের বাড়তি খরচের বিষয়টি। এর ফলে নিজেদের গ্যাস আমাদেরকে বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি দামে বৈদেশিক মুদ্রায় কিনে নিতে হয়। আগের পিএসসি গুলোতে আমরা দেখেছি, এবং মডেল পিএসসি ২০০৮ অনুসারে করা মডেল পিএসসি ২০১১ তেও আমরা দেখবো, গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য বিদেশী কোম্পানির হাতে যাচ্ছে উত্তোলিত গ্যাসের ৮০ শতাংশ মালিকানা এবং সেই সাথে কস্ট রিকভারি’র নামে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে বছর বছর হাজার হাজার কোটি টাকা। দেশীয় কোম্পানি বাপেক্স কূপ অনুসন্ধান, কুপ উন্নয়ণ, গ্যাস উত্তোলন ও প্রসেসিং প্ল্যান্ট সব মিলিয়ে গড়ে ৪০০ কোটি টাকা খরচ করে(প্রতি তিনটি কূপ খনন করে একটিতে সফল এই হিসেবে দুইটি শুস্ক কুপ খননের বাড়তি খরচও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে) গড়ে ২৪৫ বিসিএফ(বিলিয়ন কিউবিক ফুট) গ্যাস উত্তোলন করে যার আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য ২০ হাজার ৪১ কোটি টাকা(১ জুন ২০০৯ এর বাজার দর অনুসারে ১ ব্যারেল তেলের দাম ৬৬ ডলার ধরে)। অথচ বহুজাতিক কোম্পানির সাথে পিএসসি চুক্তির ফলে গড়ে তাদের কাছ থেকে ২৪৫ বিসিএফ গ্যাস পেতে হলে পিএসসি অনুসারে প্রতি মেট্রিকটন তেলের দাম সর্বোচ্চ ১৪০ ডলার অর্থাৎ প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের মূল্য ৩.৩৮ ডলার বা ২৩৬ টাকা ধরলে খরচ করতে হয় ৪৬২৫.৬ কোটি টাকা। আর বর্তমানে ১৪০ ডলারের বদলে ১৮০ ডলার ধরলে অর্থাৎ প্রতি হাজার ঘনফুটের মূল্য ৪.৩৪ ডলার বা ৩০৪ টাকা ধরলে খরচ করতে হবে ৫৯৫৮.৪ কোটি টাকা। তাহলে দেখা যাচ্ছে বাপেক্স উত্তোলণ করলে যে গ্যাস আমরা ৪০০ কোটি টাকায় পেতাম সেটা পুরোনো পিএসসি অনুসারে আমাদেরকে ৪,৬২৫.৬ কোটি টাকায় বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে কিনতে হচ্ছে আর নতুন পিএসসি হলে অন্তত: ৫৯৫৮.৪ টাকায় কিনতে হবে!

বাপেক্সের সক্ষমতা ও পুঁজির অভাব?
বিদেশী বিনিয়োগের নামে আমাদের জাতীয় সম্পদ বহুজাতিক কর্পোরেশনের হাতে তুলে দেয়ার যুক্তি হিসেবে সব সময়ই যে দুটি বিষয়ের কথা বলা হয় তা হলো পুঁিজ ও দক্ষতার অভাব। স্থলভাগ কিংবা সাগরের গ্যাস ব্লক ইজারা প্রদান কিংবা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে বহুজাতিক কোম্পানি কর্তৃক ফুলবাড়ি-বড়পুকুরিয়ার কয়লা উত্তোলনের তৎপরতা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই এ দুটো অযুহাত প্রদান করা হয়। মডেল পিএসসি ২০০৮ এর মাধ্যমে সাগরের তিনটি গ্যাস ব্লকের ৮০% মালিকানা ও রপ্তানির সুযোগ কনোকো ফিলিপস ও টাল্লোর হাতে তুলে দেয়ার তৎপরতার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্সের দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এবং এ কাজে বহুজাতিকের তুলনায় খুব স্বল্প পুঁজির প্রয়োজন হলেও কেন এখন মডেল পিএসসি ২০১১ এর মাধ্যমে স্থলভাগ ও অল্পগভীর ৩১ টি ব্লকের গ্যাস বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার ধান্দা করা হচ্ছে?

গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণের জন্য বাপেক্সকে ৪০০ কোটি টাকা দেয়ার সময় পুঁজির অভাব হয় কিন্তু একই পরিমাণ গ্যাস বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে ৪/৫ হাজার কোটি টাকায় কিনে নেয়ার সময় পুঁজির অভাব হয় না! আর দক্ষতা বা সক্ষমতা? স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলণের এমন কোন কাজ নেই যা বাপেক্স দক্ষতার সাথে স্বল্প খরচে সম্পন্ন করতে পারেনা । ২ ডি এবং ২ডি সিসমিক সার্ভে থেকে শুরু করে গ্যাস অনুসন্ধান, কুপ খনন ও গ্যাস উত্তোলণের সকল কাজ বাপেক্স সফল ভাবে শুধু নিজের ব্লকগুলোতেই করছে না, এমনকি বিদেশী কোম্পানিগুলোকেও সাবকণ্ট্রাকটর হিসেবে এই কাজগুলো করে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়: বাপেক্স ফেনী-২ এ নাইকোর একটা অনুসন্ধান কুপ খনন করে দেয়, টালে−ার হয়ে লালমাই ও বাঙ্গোরায় সিসমিক সার্ভের কাজ করে, চাঁদপুরে একটা কন্ট্রোলন পয়েন্ট স্থাপন করে দেয় এবং বাঙ্গোরায় টালে−ার একটা কুপও (ওয়ার্ক ওভার) খনন করে দেয়। তাছাড়া বাপেক্সের সাফল্যের হারও বিদেশী কোম্পানির তুলনায় বেশি: বিদেশী কোম্পানিগুলো যেখানে প্রতি ৩ টি কুপ খননে ১ টি সাফল্য পেয়েছে বাপেক্স সেখানে প্রতি ১.৩৩ টি কুপ খননে ১ টি সাফল্য পেয়েছে এবং এই সাফল্য অর্জনের বেলায় অক্সিডেন্টাল ও নাইকোর মতো ’উন্নত প্রযুক্তি’ ওয়ালা কোম্পানিগুলোর মতো মাগুরছড়া ও টেংরাটিলার ধাচে পরিবেশ ও সম্পদ বিনাশী দুর্ঘটনা একটিও ঘটায় নি!

ফলে এখন বাপেক্সের দক্ষতা নাই একথা বলে বিদেশী কোম্পানির কাছে আর গ্যাস ক্ষেত্র তুলে দেয়া যাবে না এ কথা শাসক শ্রেণীও জানে। তাই এখন বলা হচ্ছে ক্যাপাসিটির কথা অর্থাৎ বাপেক্সকে দিয়ে নাকি এক সাথে বেশি গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান করানো যাবে না, কারণ বাপেক্সের ”পর্যাপ্ত” যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে, যেন এই যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল বাড়িয়ে ”পর্যাপ্ত” করা একেবারেই অসম্ভব! কিন্তু প্রশ্ন হলো, গ্যাসের সংকট তো হঠাৎ করে আকাশ থেকে নাযেল হয় নি, দিনে দিনে সংকট বেড়েছে, গ্যাস উত্তোলণের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। তাহলে দিনে দিনে কেন বাপেক্সের ক্যাপাসিটি বাড়ানো হলো না কিংবা কেন ”পর্যাপ্ত” দক্ষ জনবল ও যন্ত্রপাতি ওয়ালা বিদেশী কোম্পানিগুলোকে ১৯৯৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত গ্যাস ব্লকগুলো ফেলে রাখতে দেয়া হলো? কেন চুক্তি ভঙ্গ করার কারণে সেগুলো বাপেক্সের হাতে তুলে দেয়া হলো না, সেই সাথে ধীরে ধীরে বাপেক্সের জন্য প্রয়োজনীয় রিগ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও দক্ষজনবল বাড়ানো হলো না?

কৌশলটা নতুন নয়, দীর্ঘ ব্যাবহারে ফলে এটা এখন আর কৌশল নয়, বিরাষ্ট্রীয়করণের রাষ্ট্রীয় নীতিতেই পরিণত হয়েছে- সময় থাকতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা/সামর্থ্য বাড়ানোর কোন পদক্ষেপ না নিয়ে ভয়াবহ সংকট তৈরী করা হয় এবং পরে সেই সংকটের অযুহাতে বিদেশী কোম্পানির হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ তুলে দেয়া হয়। নীতি বা কৌশল যাই বলি না কেন ধান্দাটা যখন পরিস্কার, তখন সামর্থ্য বা ক্যাপাসিটি না থাকার যুক্তি দিয়ে আর বিদেশী কোম্পানির হাতে গ্যাস তুলে দেয়া যাবে না বরং দ্রুত বাপেক্সের সামর্থ্য বাড়িয়ে বাপেক্সের মাধ্যমে গ্যাসের শতভাগ জাতীয় মালিকানা বজায় রেখেই এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29361682 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29361682 2011-04-12 22:04:47
কত দূর- ফুকুশিমা থেকে রূপপুর ?
আমাদের বিজ্ঞান এবং তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান কিন্তু বেশ আশাবাদী। জাপানের এই বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে থাকলেও রূপপুর নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র রিখটার স্কেলে ১০ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প সহ্য করার মতো করে তৈরি করা হবে।” তিনি হয়তো বলতে পারতেন যে বাংলাদেশে যেন ভূমিকম্পের মাত্রা রিখটার স্কেলে ১০ ছাড়িয়ে না যায় সেজন্য বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে কিংবা বলতে পারতেন ভূমিকম্প রিখটার স্কেলে যদি ১০ ছাড়িয়েই যায় তবে তাতে করে পরমাণু চুল্লিগুলো যেন অক্ষত থাকে এবং তা থেকে যেন কোনভাবেই তেজস্ক্রিয়তা না ছড়ায় সে লক্ষ্যে আমাদের সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাবে। এখানে পাঠকদের এটা জানানো যেতে পারে যে জাপানের বিপর্যয়ের পর জার্মানি তাদের পুরনো সাতটি নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে এবং শুধু জার্মানিই নয় বেশ কয়েকটি দেশ যেখানে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ নিয়ে শঙ্কিত সেখানে আমাদের প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠ শুনতে ভালোই লাগে। ভালো না লেগে উপায় কি বলুন, জার্মানি যেখানে নিজস্ব সক্ষমতা এবং দক্ষ লোকবল থাকা সত্ত্বেও এরকম একটি ঘোষণা দিতে পারল না সেখানে আমাদের মন্ত্রী মহোদয়ের এই ধরনের আত্মবিশ্বাস সামনের দিনগুলোতে আমাদের যে অনুপ্রেরণা যোগাবে এতে আপনারা সন্দিহান হলেও হতে পারেন, আমরা কিন্তু নি:সন্দেহ। তারপরও আমরা একটু দোলাচলে ছিলাম এই ভেবে যে এত বড় বিপর্যয়ের পর আত্মবিশ্বাসে খানিকটা চিড়ও কি ধরবে না!!! মন্ত্রী মহোদয়ের পরবর্তী ঘোষণাতেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল- “এত কম খরচে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ আমরা পাবো না,তাই এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা হবেই।” সুরটা চেনা চেনা লাগছে না? অনেকটা মধ্যবিত্ত পরিবারে স্কুল পড়ুয়া মেয়ের জন্য হঠাৎ প্রবাসী পাত্র পাওয়া সুর। অগ্র পশ্চাৎ বিচার বিবেচনা করার সময় নেই, যেভাবেই হোক একে হস্তগত করতেই হবে। পাত্র কানা না খোঁড়া, কালা না বধির এসব খোঁজখবর নিতে গিয়ে শেষকালে যাদ পাত্রটাই হাতছ্ড়া হয়ে যায়!!! তাই হয়তো তিনি দেরী করতে চান না। কিন্তু আমরা দেরী করতে চাই। আমরা এই প্রযুক্তির সমূহ জিনিসপত্র খুঁটিয়ে দেখে নিতে চাই। কারণ এর উপর শুধু আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাই নির্ভর করছে না, নির্ভর করছে আমাদের অস্তিত্বও। অস্তিত্ব? হ্যাঁ পাঠক অস্তিত্ব। এই ধরনের একটি পারমাণবিক বিপর্যয় আমাদেরকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমা হামলায় আক্রান্তদের চিকিৎসা করেছেন এমন এক জাপানি বিজ্ঞানী নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন,“তেজস্ক্রিয়তা মানুষের শরীরের কোষের ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড)-এর গঠনে পরিবর্তন ঘটায়। তাতে দেহকোষের অসম বিভাজন ও বৃদ্ধি ঘটে ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়। পরিণতদের চেয়ে গর্ভজাত ও বাড়ন্ত শিশুদের দেহকোষের বিভাজন অনেক বেশি হারে হয় বলে তেজস্ক্রিয়তায় তাদের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। শিশুরা দুধ বেশি খায় বলে তাদের শরীরে তেজস্ক্রিয়তা প্রবেশের ঝুঁকিও বেশি।” হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল প্যাথলজিস্ট লাম চিং-ওয়ান বলেন,“এ বিস্ফেরণের ফলে মানুষ দীর্ঘ মেয়াদে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। আর তাতে মানুষের থাইরয়েড ও বোন ক্যান্সার এবং লিউকেমিয়ার ঝুঁকি বাড়বে। গর্ভজাত ও শিশুরাই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকবে।” কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খুবই স্বল্প পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তায় ক্যান্সারের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়- এ কথা জানিয়ে লাম বলেন, তেজস্ক্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয় পদার্থ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করে। আবার বৃষ্টির সঙ্গে সাগরের পানিতে ও মাটিতে নেমে খাদ্যশস্য,পানি ও সামুদ্রিক প্রাণীতে চলে যায়। সেগুলো গ্রহণ করলে মানুষের শরীরে তেজস্ক্রিয় উপাদান প্রবেশ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,তেজস্ক্রিয় থাকা ঘাস খেয়েছে এমন গরুর দুধের মাধ্যমেও তেজস্ক্রিয়তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। অধ্যাপক লি জানান, বাতাসে ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয় পদার্থ এক সময় পানিতে যাবে এবং সমুদ্রের পানি ও জীবজগতে তা মিশে যাবে। আর বৃষ্টি হলে সুপেয় পানিতেও তেজস্ক্রিয়তা মিশে যেতে পারে।

দাইচি নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩০ কিলোমিটার দূরের একটি ডেইরি ফার্মের দুধে এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার একটি বাগানের সব্জিতে তেজস্ক্রিয়তা সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়েছে। জাপানের মন্ত্রিপরিষদের মুখ্যসচিব ইউকিও এদানো শনিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে একথা জানান। এমনকি জাপান থেকে দুইশ কিলোমিটার দূরবর্তী টোকিও শহরের পানিতেও তেজস্ক্রিয়তা ধরা পড়েছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) শনিবার রাতে এক বিবৃতিতে বলেছে, ফুকুশিমা এলাকার সব ধরনের খাদ্যদ্রব্য বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেয়ার কথা ভাবছে জাপানি কর্তৃপক্ষ। এর আগে আইএইএ'র আরেকটি বিবৃতিতে বলা হয়,স্বাস্থ্য,শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় ফুকুশিমা এলাকার সব ধরনের খাদ্যদ্রব্য বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এই অবস্থায় জাপানের পুরো খাদ্য রপ্তানি ব্যবস্থাই ধ্বংসের সম্মুখীন। এছাড়াও বড় বড় সব কোম্পানিগুলো তাদের কলকারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। বিভিন্ন গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, ইলেকট্রনিক সামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও তেল শোধনাগারগুলো তাদের প্রধান প্রধান বেশ কিছু কারখানা বন্ধ রেখেছে। সনি,নিশান মটর,টয়োটা মটর,প্যানাসনিক ছাড়াও বহু প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানা বন্ধ রেখেছে। অনেক কারখানা সম্পূর্ণ অক্ষত থাকলেও নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিপর্যয়ের ফলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং কাঁচামাল পরিবহন ও সরবরাহ করতে না পারাই এর মূল কারণ। অনেকেরই ধারণা, এ দুর্যোগের কারণে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে ১০ থেকে ১৬ ট্রিলিয়ন ইয়েন (১২৫-২০০ বিলিয়ন ডলার)।এর মধ্যে জাপানে মৃতের সংখ্যা নতুন করে বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।এই ভূমিকম্প এবং সুনামিতে কেবলমাত্র মিয়াগি এলাকাতেই ১৫ হাজার মানুষ মারা গিয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ। জাপানে ভয়াবহ ওই প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবে ৮ হাজার ১৩৩ জনে দাঁড়ানোর পর পুলিশ এ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ।১২ হাজার ২শ ৭২ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে। এ থেকে পরিস্কার যে, ফুকুশিমা দুর্যোগে অবশেষে নিহতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। সবকিছু মিলিয়ে জাপান যে এখন এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে পতিত এটা বুঝতে হলে আণবিক শক্তি বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার পড়ে না। আর সেখানে আমাদের মন্ত্রীরা কতটা বেপরোয়া হলে এমন মন্তব্য করতে পারেন সেটা বিচারের ভার পাঠক আপনাদের হাতেই রইল। প্রসঙ্গত এখানে জানিয়ে রাখা ভালো যে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পাবনার রূপপুরে দুটি নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এর প্রত্যেকটির উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১ হাজার মেগাওয়াট। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই রূপপুর নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে দৌঁড়ঝাঁপ শুরু করে। আমরা প্রায় তখন থেকেই ব্লগ,পত্র-পত্রিকা,সেমিনার বিভিন্ন মাধ্যমে বলার চেষ্টা করেছি নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র কোন দিক থেকেই বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হতে পারে না। এটা অনেকটাই ইঁদুর এর উৎপাত থেকে বাঁচতে ঘরে গোখরো সাপ ছেড়ে দেয়ার মতো দাঁড়াবে। এই ব্লগেই দুই কিস্তির একটি লেখায় আমরা আমাদের বক্তব্য হাজির করেছিলাম। সংক্ষেপে রুপপুর নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আমাদের যুক্তিগুলো এরকম :

১) নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি এখনও পর্যন্ত শতভাগ নিরাপদ কোন প্রযুক্তি নয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকা একটি দেশে আমদানি করে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার মানে হলো নিউক্লিয়ার প্রযুক্তির স্বাভাবিক ঝুঁকির উপর বাড়তি ঝুঁকি বাংলাদেশের জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া। চেরোনবিল, থ্রি মাইল আইল্যান্ড (কিংবা সাম্প্রতিক ফুকুশিমা)এর মত বড় বড় দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে প্রযুক্তির দিক দিয়ে শীর্ষে অবস্থানকারী দেশগুলোতে,যারা নিজস্ব দক্ষতাকে কেন্দ্র করে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছিল। আর আমাদের মত দেশে যেখানে গ্যাস-কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো দু’দিন পর পর বিকল হয়ে যায় এবং মেরামতের অভাবে পড়ে থাকে দিনের পর দিন সেখানে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তি সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বেশ ভালোভাবে চলবে এটা ভাবতে একটু কষ্টকল্পনা করতে হয়।

২) নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎএর জ্বালানি ইউরেনিয়ামের উৎস এবং সেই ইউরেনিয়াম কাঁচামাল প্রক্রিয়াকরণ সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনের খায়েশ জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ইউরেনিয়াম খোলাবাজারে সের দরে পাওয়া যায় না যে প্রয়োজন হলো আর আমদানী করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করলাম; এর জন্য বিভিন্ন বৃহৎ রাষ্ট্রের সাথে নানান অধীনতামূলক চুক্তি সই করতে হয়। আবার দুনিয়ার চারিধারে ইউরেনিয়াম প্রচুর পরিমাণে ছড়িযে ছিটিয়ে আছে এমনও নয়। হাই গ্রেড ইউরেনিয়ামের মজুদ আছে বর্তমানে প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন টন। বর্তমানে প্রতি বছর ইউরেনিয়াম ব্যবহ্রত হচ্ছে প্রায় ৬৭,০০০ টন। অতএব এই হারে ব্যবহ্রত হতে থাকলে বর্তমান মজুদ দিয়ে চলবে আরো বছর পঞ্চাশ। আর যদি দুনিয়ার বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় সবটাই যোগাতে হত নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকে তবে তা দিয়ে চলত আর মাত্র নয় বছর! হাই গ্রেড-লো গ্রেড মিলিয়ে এই মূহুর্তে ইউরেনিয়ামের মোট মজুদ প্রায় ১৪.৪ মিলিয়ন টন যার বেশিরভাগ থেকেই ইউরেনিয়াম উত্তোলন করা ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। অনেকগুলোকে খনি আবার ইতোমধ্যে পরিত্যক্তও হয়ে গেছে।

৩) বাংলাদেশের মতো একটি ইতোমধ্যেই বৈদেশিক ঋণ এবং তার সাথে যুক্ত শর্তের জালে আবদ্ধ দেশের জন্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাড়তি একটি বিপদ হলো এর আর্থিক দায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় এককালীন বিনিয়োগের পরিমাণ বিপুল। আবার শুরুতে যে পরিমাণ অর্থের কথা বলা হয় তাও ঠিক থাকে না,দিন যত যায় ততই বিনিয়োগের অর্থের পরিমাণ বাড়তে থাকে। দুনিয়ার যে দেশেই সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট কিংবা নানান ব্যাংক ও দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণের মাধ্যমে এ ধরনের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, সেখানেই ক্ষমতাবান শাসক শ্রেণী ফুলে ফেঁপে কলাগাছ হয়েছে আর বিপরীতে জনগণ হয়েছে আরও বেশী ঋণগ্রস্থ। উদাহরণস্বরূপ ব্রাজিলের আঙরা, ফিলিপিনের বাতান, ফিনল্যান্ডের অলিকিলিওতো ইত্যাদি নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কথা বলা যায় যেগুলোর কোনটাই নির্ধারিত খরচের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি খরচ না করে এবং নির্মাণের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৫/১০ বছর না পার করে শেষ হয়নি।

৪) স্বাভাবিক অবস্থাতেই নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর প্রতি বছর বায়ুমন্ডলে ও পানিতে প্রায় মিলিয়ন কুরি (তেজস্ক্রিয়তার একক) তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ছড়ায়। এগুলোর নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করা হয় না কেননা উদ্যোক্তারা মনে করেন এরা পরিবেশ ও প্রাণসম্পদের জন্য হুমকিস্বরূপ নয়! এইসকল আইসোটোপের তালিকায় আছে ক্রিপ্টন, জেনন, আর্গনের মত নিস্ক্রিয় গ্যাসসমূহ যেগুলো চর্বিতে দ্রবণীয় এবং রিঅ্যাক্টরের আশেপাশে বসবাসকারী কোন লোক তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে তা তার ফুসফুসের মাধ্যমে প্রজনন অঙ্গসহ তার দেহের চর্বিযুক্ত টিস্যুতে স্থানান্তরিত হতে পারে। তদুপরি তেজস্ক্রিয় মৌলগুলি হতে নিঃসরিত গামা রশ্মি ডিম্বাণু ও শুক্রাণুতে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটিয়ে সূচনা করতে পারে বংশানুসৃত রোগের। ট্রিটিয়াম নামক হাইড্রোজেনের একটি আইসোটোপও আমরা নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পেয়ে থাকি যা অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া মারফত তেজস্ক্রিয় পানি উৎপন্ন করে। এই পানি ত্বক, ফুসফুস এবং পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে লোকজনের দেহে প্রবেশ করে তার ডি.এন.এ মলিকিউলে ঢুকে যেতে পারে যার পরিণাম বড় ধরনের বিপর্যয়।

৫) নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উপজাত হিসেবে যে বর্জ্য তৈরী হয় সেগুলো তেজস্ক্রিয় এবং এর তেজস্ক্রিয়তা কমে সহনীয় পর্যায়ে আসতে কমপক্ষে ১০,০০০ বছর(!) লাগবে। তার মানে নিউক্লিয়ার বর্জ্যকে সরিয়ে আমাদের এমন কোথাও রাখতে হবে যা ঝুঁকিহীন থাকবে টানা দশ হাজার বছর। অতএব এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঝুঁকিটা কেবল আমাদেরই থাকছে না, ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে আমাদেও পরবর্তী প্রজন্মগুলোর জন্যও। নৈতিকভাবেই এটা তাই আমাদের কাছে অসমর্থনযোগ্য যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমন্ধে একটা কার্যকর স্থায়ী সমাধানে যেতে না পারছি।

এগুলো ছাড়াও আমরা বেশ কিছু তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করে দেখিয়েছিলাম কেন নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কোন টেকসই সমাধান নয়। এরপর যখন ফুকুশিমা নিউক্লিয়ার দুর্ঘটনা ঘটলো, ভেবেছিলাম এখন বোধহয় রূপপুর প্রজেক্টের কথা সরকারগুলো মুখে আনতেই সাহস করবে না অথচ হা হতোষ্মি !!! উঁনারা কি বলছে শুনুন- “বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হবে তৃতীয় প্রজন্মের। এতে দুর্ঘটনা মোকাবেলায় সব ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।” জাপান তার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল দিয়ে যেটা পারেনি আমরা সেটা পারব আমদানি করা প্রযুক্তি ও ভাড়া করা বিদেশী বিশেষজ্ঞ দিয়ে!!! পাঠকদেরকে অনুরোধ এসব শুনে হাসবেন না বরং একটু ভাবুন ক্ষমতায় গিয়ে এরা আসলে কাদের স্বার্থ বাস্তবায়ন করতে উন্মুখ হয়, কাদের উন্নয়ন এরা আসলে সত্যিকার অর্থে বিবেচনা করে, এদের উন্নয়ন দর্শনটাই বা কি। এই প্রশ্নগুলোর মীমাংসা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। নতুবা এই সরকারগুলো আমাদেরকে এক সংকট থেকে উদ্ধারের নামে আরেক সংকটে নিয়ে ফেলবে, সেখান থেকে উদ্ধারের নামে ফের আবার নতুন কোন সংকটে...এবাবেই চলতে থাকবে যদি আমরা চলতে দেই। ভয় হয় রূপপুর নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ফুকুশিমা জাতীয় কোন ধরনের বিপর্যয় হয়তো এই সরকারগুলোকে এই সংকট-সংকট খেলা থেকে তাদের বঞ্চিত করবে কারণ যাদের নিয়ে এই মধুর খেলা খেলা যায় সেই আমরা আম জনতাই যে নিশ্চিহ্ন হয়ে না গেলেও ধ্বংস তো হবই সুনিশ্চয়।
তাই পাঠককূলের নিকট সনির্বন্ধ অনুরোধ রইল রূপপুর নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলার। মিছিল,সমাবেশ,ফেসবুক,পোস্টারিং,লিফলেট যেভাবে পারা যায় সেভাবেই যেন আমরা আরো বেশি মানুষকে যুক্ত করি,সচেতন করে তুলি। আমাদের হাতেই তুলে নিতে হবে আমাদের নির্ভরতার চাবি- আমরা যে ক্ষুধিরাম,সূর্যসেনের সন্তান।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29350535 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29350535 2011-03-24 22:26:31
বুয়েটে ছাত্রলীগের তান্ডব ও নানা আশঙ্কা
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে হলদখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি অর্থাৎ ক্ষমতার হিস্যা বুঝে নেওয়াকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের যে তান্ডব দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে, বুয়েট যে একেবারে তার আওতামুক্ত ছিল তাও নয়। বিভিন্নমাত্রায় ছোট-বড় বিভিন্ন তৎপরতা ঠিকই চলছিল। নজরুল হল ক্যান্টিনে চাঁদাবাজির ঘটনা, মাসিক ১০ হাজার টাকা চাঁদা না দেয়ায় একপর্যায়ে নজরুল হল ক্যান্টিন বন্ধ করে দেওয়া, (যেটা ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই সামনে চলে আসে পত্রপত্রিকায়, প্রথম আলো, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১০), পিক-আপ ভ্যান আটকে সেটার পার্টস খুলে বিক্রি করা, হল ক্যান্টিনগুলো লিজ দেওয়ার সময় প্রভাব বিসত্মার করা, মাসিক চাঁদা আদায়, ফ্রি খাওয়া, নির্মাণাধীন বুয়েট শপিং কমপ্লেক্সে দোকান পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়া, ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা থেকে চাঁদা নেওয়া, পলাশির মোড়ের দোকানগুলো থেকে চাঁদা আদায় এবং এরকম আরো অসংখ্য ঘটনার কথা ক্যাম্পাসের সবারই জানা। যেগুলো হয়তো সারা দেশের মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যই হয় না। পাল্টা প্রশ্ন আসে- ‘সত্যিই বুয়েটের ছেলেরা এসব করছে?’ কিন্তু প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে এইসব ঘটনা ঘটেছে। এসব অপতৎপরতা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ক্যাম্পাসে একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখায় প্রশাসনের যে ভূমিকা থাকতে পারত, সে ভূমিকা তো নেই-ই, বরং আশকারা দিয়ে এগুলোকে আজ মহীরুহতে পরিণত করা হয়েছে- যার ফলাফল ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক তান্ডব।

৫ মার্চ দুপুর ১১টায় চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। বুয়েট ক্যাফেটেরিয়ায় চালানো এ হামলায় আহত হয় ছাত্রফ্রন্টের গৌতম কুমার দে, মামুন মোর্শেদ খান, মুনিম বিন গণিসহ আরো অনেকে। এরপর দুপুর ২টার দিকে রশীদ হলের ৪০০৬ নং, নজরুল ইসলাম হলের ৩২৯ নং, সোহরাওয়ার্দী হলের ১০১২ নং এবং তিতুমির হলের ৩০০২ নং রুমে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। পরদিন ৬ মার্চ সকালে আবারও হামলা করে গৌতম, মামুন, নাজমুলকে আহত করে ছাত্রলীগ। একপর্যায়ে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছাত্রদের ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এরপর ৭ মার্চ রাতে ভিসি ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে ছাত্ররা হলে উঠলে রাত ১০টা ৩০ মিনিটে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে ছাত্রলীগ আবারো হামলা করে আহসানুল্লাহ হলের ক্যান্টিনে আহাররত গৌতম- মামুনের ওপর। সন্ত্রাসীরা গৌতমকে মাটিতে ফেলে লোহার রড, হকিস্টিক দিয়ে মারতে থাকে এবং একপর্যায়ে অজ্ঞান করে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায়। গৌতম আজ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভাঙা দুই হাত, পা আর মাথার জখম নিয়ে কাতরাচ্ছে।



এভাবে লাগাতার হামলা চলতে থাকলেও আজ পর্যমত্ম অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো পদপেই নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ক্যাম্পাসে চলছে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের স্বশস্ত্র মহড়া। প্রশাসন এখনো নির্বিকার।

২০০২ সালে সনি হত্যাকান্ডের আগেও ঠিক এরকমই একটা পরিস্থিতিতে ছোট ছোট অপরাধ, চাঁদাবাজি, হামলা-নির্যাতন ইত্যাদি করে পার পেয়ে যেতে থাকা ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের হাতে একপর্যায়ে সনি হত্যাকান্ড ঘটে। প্রতিবাদে বুয়েটের ছাত্রসমাজ যে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তার ফলে হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে, পুরো সন্ত্রাসীচক্র পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু যে তাজা প্রাণ ঝরে গেল, তা ফেরানো তো আর যায়নি।

শুধু বুয়েট না, দেশের অন্য যেসব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রনামধারী সন্ত্রাসীদের অভায়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, সেখানেও একইভাবে ছোটছোট সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের আশকারা প্রদান এবং একই সঙ্গে ছাত্র-অধিকার আদায়ের রাজনীতিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার মধ্যে দিয়েই তা সম্ভব হয়েছে। কাজেই আরো দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে, বুয়েট প্রশাসন ও সরকারের কাছে আমাদের দাবি, অবিলম্বে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজি বন্ধের পদপেক্ষ নিন এবং চাঁদাবাজি প্রতিরোধকারীদের ওপর লাগাতার হামলাকারী সন্ত্রাসীদের উপযুক্ত বিচার ও শান্তি নিশ্চিত করুন। আমরা সনির মতো আর কাউকে হারাতে চাই না।

--শরীফ হাসান,তমাল পাল,কল্লোল মোস্তফা,অনুপম সৈকত শান্ত, মাহবুব রূবাইয়াৎ

লেখাটি সাপ্তাহিক বুধবারের চলতি সংখ্যায় প্রকাশিত
http://budhbar.com/?p=4600
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29348321 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29348321 2011-03-20 22:48:00
বিষাক্ত মারকারি যুক্ত কলেরা টিকার গিনিপিগ মিরপুরবাসী!

সূত্র: Click This Link

হায়দারাবাদে অবস্থিত SHANTHA BIOTECHNICS বহুজাতিক সানোফি এভেন্টিসের ভারতীয় সাবসিডিয়ারি কোম্পানি।
এর আগে ভারতের কলকাতায় টিকাটির তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ২ বছর পর টিকাটির কার্যকারিতা’র হার পাওয়া যায় মাত্র ৬৭%।
(সূত্র: http://www.ivi.org/popup/files/ocv_article.pdf)

টিকাটি ভারতের ঔষধ সংস্থার অনুমোদন পেলেও হু’র কাছ থেকে এখনও বিশ্বব্যাপি ব্যবহারের অনুমোদন পায়নি। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে হু’র কাছে প্রি-কোয়ালিফিকেশানের আবেদন জানানো হলেও এখনও সেটা অনুমোদিত অবস্থায় হু’র কাছে পরে আছে।
সূত্র: Click This Link

তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিকাল ট্রায়ালে স্বল্পায়ু ও স্বল্প সফল বলে প্রমাণিত হ্ওয়ার পরও বাংলাদেশের মানুষের উপর বড় আকারে এই ট্রায়ালটি করা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে এটা নাকি দিশারি প্রকল্প (পাইলট প্রজেক্ট) যদিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে একে পাইলট প্রজেক্ট না বলে “ম্যাসিভ কলেরা ভ্যাকসিন ট্রায়াল” হিসেবেই উল্ল্যেখ করা হয়। সূত্র: (Bangladesh to hold massive cholera vaccine trial Click This Link) প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুসারে এর আয়োজক হলো স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, আইসিডিডিআরবি ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশান। এবং অর্থায়ন করছে বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশান। (সূত্র: প্রথম আলো, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১১) তাছাড়া টাইম ম্যাগাজিনের বরাত দিয়ে আমরা এর সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি’র যুক্ত থাকার খবর পাই।
(সূত্র: Click This Link)

এই THIOMERSAL (যেটা যুক্তরাষ্ট্রে এখন Thimerosal নামে পরিচিত) মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর একটি উপাদান যার প্রায় অর্ধেক অংশই হলো বিষাক্ত মারকারি (সূত্র: Thimerosal, also and formerly known as Thiomersal, is a compound that most often contains approximately 49% mercury (by weight) http://www.thimersol.com/)। মারকারি একটি ভয়ংকর নিউরোটক্সিন হিসেবে পরিচিত যা নির্ধারিত মাত্রার বেশি পরিমাণে শরীরে ঢুকলে মস্তিস্ক-কিডনি-ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি হয়, নানান ধরণের নিউরোলজিক্যাল অসুখ হয়। তাছাড়া অটিজমের সাথে মার্কারির সম্পর্ক থাকার অভিযোগ আছে।

যে সিডিসি’র সহযোগীতায় বাংলাদেশে এই ট্রায়ালটি হচ্ছে সেই সিডিসি’র ওয়েবসাইটে উপাদানটি সম্পর্কে বলা হয়েছে:
There is no convincing evidence of harm caused by the low doses of thimerosal in vaccines, except for minor reactions like redness and swelling at the injection site. However, in July 1999, the Public Health Service agencies, the American Academy of Pediatrics, and vaccine manufacturers agreed that thimerosal should be reduced or eliminated in vaccines as a precautionary measure.
সূত্র: Click This Link

অর্থাৎ “ইনজেকশানের স্থানে সামান্য লাল দাগ হওয়া ও ফুলে যাওয়া ছাড়া থাইমারসাল এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে কোন গ্রহনযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবু, ১৯৯৯ সাল থেকে পাবলিক হেলথ সার্ভিস এজেন্সি, আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস এবং ভ্যাকসিন নির্মাতারা একমত হয়েছে যে সাবধানতা হিসেবে ভ্যাকসিন থেকে থাইমারসাল এর পরিমাণ কমানো বা একেবারে বাদ দেয়া উচিত।“

যে কারণে, যুক্তরাষ্ট্রের ঔষধ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা FDA এর ওয়েবসাইট অনুসারে, ১৯৯৯ এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কেবল মাত্র থায়োমারসাল মুক্ত টিকারই লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। সূত্র: all new vaccines licensed since 1999 are free of thimerosal as a preservative Click This Link
এছাড়া হু’র নির্দেশনাতেও মারকারি বিহীন প্রিজারভেটিভ ব্যাবহারের কথা বলা হয়েছে:

The need for a preservative in multidose presentations of an oral vaccine should be carefully evaluated and consideration given to the use of a non-mercury-based preservative should one be thought necessary.
সূত্র: WHO Expert Committee on Biological Standardization 52nd Report, page 137, 2004

যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশান এজেন্সি ইপিএ’র মানদন্ড অনুযায়ী, প্রতি কেজি ওজনের জন্য মারকারির দৈনিক সহনীয় মাত্রা হলো ০.১ মাইক্রোগ্রাম।(সূত্র: According to the EPA, the maximum acceptable daily risk level is 0.1 mcg/kg http://www.drhansen.com/?p=374)

তাহলে, ১০ কেজি ওজনের শিশু থেকে শুরু করে ৭০ কেজি ওজনের পূর্ণ বয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক সহনীয় মাত্রা হলো ১ মাইক্রোগ্রাম থেকে শুরু করে ৭ মাইক্রোগ্রাম।
এখন, ০.০২% (w/v) এর থায়োমারসাল এর মানে হলো প্রতি ১০০ মিলি ভ্যাকসিনে থাইয়োমারসালের পরিমাণ ০.০২ গ্রাম= ০.০২x১০০০,০০০ মাইক্রোগ্রাম = ২০,০০০ মাইক্রোগ্রাম

সুতরাং ১ মিলি ভ্যাকসিনে থাইয়োমারসাল এর পরিমাণ ২০,০০০/১০০ মাইক্রোগ্রাম= ২০০ মাইক্রোগ্রাম

অর্থাত ১.৫ মিলি ভ্যাকসিনে থাইয়োমারসালের পরিমাণ ৩০০ মাইক্রোগ্রাম।

থাইয়োমারসালের ৪৯.৬% হলো মারকারি যা মানবদেহের জন্য বিষাক্ত।
এ হিসেবে ১.৫ মিলি ভ্যাকসিনে মারকারির পরিমাণ প্রায় ১৫০ মাইক্রোগ্রাম

তাহলে, দেখা যাচ্ছে, ০.০২% থায়োমারসেল যুক্ত কলেরা ভ্যাকসিনটিতে শিশুদের জন্য সহনীয় মাত্রার ১৫০ গুন এবং বড়দের ক্ষেত্রে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২১ গুণ বেশি মারকারী আছে!
কথিত দিশারী প্রকল্পের নামে বহুজাতিক কম্পানির মুনাফার জন্য তৈরী এই বিষাক্ত টিকা পরপর দুইবার খাওয়ানো হবে, প্রথমবার খাওয়ার ১৫ দিনপর দ্বিতীয়বার খাওয়ানো হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিষাক্ত মারকারি যুক্ত মাত্র দুই বছর মেয়াদি ভ্যাকসিন দিয়ে লাভ কার হবে? পানি ও পয়:ব্যাবস্থা নষ্ট রেখে(যেটার সঠিক ব্যাবস্থাপনার মাধ্যমে প্রায় ১০০% কলেরা প্রতিরোধ করা সম্ভব, উন্নত দেশগুলোতে এভাবে কলেরা নির্মূল হয়েছে) মাত্র ৬৭% সাফল্যের এই ভ্যাকসিনের পেছনে প্রতি দুইবছর পরপর দেশের জনগণের কোটি কোটি টাকা খরচের কি যৌক্তিকতা থাকবে, ভ্যাকসিন কম্পানির মুনাফা ছাড়া?

মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশান কিংবা ঔষধ কোম্পানিগুলো এখন যে খরচ করছে সেইটা কোন উদার দান খয়রাত না... স্রেফ ব্যাবসায়িক বিনিয়োগ.. এই বিনিয়োগের বিনিময়ে ঔষধ কোম্পানির জুটবে ---

১) কোটি কোটি টাকার বান্ধা কাষ্টমার। কারণ ভ্যাকসিনটিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় টিকা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা এই ট্রায়ালের অন্যতম লক্ষ্য। প্রথম আলো লিখেছে: “স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে এই দিশারি প্রকল্পটির(পাইলট প্রজেক্ট) কার্যকারীতা প্রমাণিত হলে সারাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচীর সংগে কলেরা টিকাকেও সম্পৃক্ত করা হবে।”

২) কোটি কোটি টাকার সিজনাল টুরিষ্ট কাষ্টমার। বস্তুত দুই বছর মেয়াদি ভ্যাকসিন ইউরোপ আমেরিকার টুরিষ্ট, যারা তৃতীয় বিশ্বের রোগ-জরা গ্রস্থ দেশে আসতে ভয় পায়, তাদের ছাড়া আর কারও কাজে লাগবে না। বর্তমানে যে ডুকরাল ভ্যাকসিনটি ব্যাবহ্রত হচ্ছে সেটির ট্রায়ালের সময়েও সস্তা এবং বাংলাদেশের মানুষের কাজে লাগার খোয়াব দেখানো হইছিল.. কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৬০/৭০ ডলার দামে ভ্যাকসিনটি টুরিষ্ট ড্রাগ হিসেবেই রয়ে গেল... তাছাড়া জনগণ যখন জানবে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা দুই বছরের মাথায় প্রতি ১০০ জনে মাত্র ৬৭ জনে নেমে আসে তখন এই ভ্যাকসিনের উপর কোন ভাবেই ভরসা রাখতে পারবে না..
অথচ উচ্চমাত্রায় বিষাক্ত মারকারি থাকার কথা আড়াল করে এবং কলকাতার ট্রায়ালের ফলাফল না জানিয়ে লক্ষ্য মানুষকে মিথ্যা আশা দিয়ে ডেকে আনা হচ্ছে এই বহুজাতিক ট্রায়াল সফল করতে যার লক্ষণ প্রথম আলোর রিপোর্ট থেকেই দেখা যাচ্ছে:

“টিকা কেন্দ্রে জামিলা বেগম নামের এক নারীর সঙ্গে কথা হয়। জামিলা জানান তিনি নিজে টিকা খেয়েছেন এবং তার মেয়ে ও ভাগনেকেও সঙ্গে করে এনেছেন টিকা খাওয়াতে। তাদের এলাকায় বিপুল সংখ্যক মানুষ ডায়রিয়ায় ভোগে। টিকা খেলে রোগের প্রকোপ কমবে এই আশায় পাড়া-প্রতিবেশী সবাই টিকা খাচ্ছে।” সূত্র: প্রথম আলো, ১৮ ফেব্রুয়ারি , ২০১১

১৯৮৫-৮৬ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের আমলেও প্রায় ৯০ হাজার দরিদ্র বাংলাদেশী নাগরিককে কলেরার প্রকোপ কমার মিথ্যা আশা দিয়ে গিনিপিগ বানানো হয়েছিল। দরিদ্র মানুষের সস্তা শরীর ব্যাবহার করে করা ট্রায়ালে ডুকরাল ভ্যাকসিনটি ব্যাপক হারে ব্যাবহারের অনুপযোগী বলে বিবেচিত হয় কারণ এর সাফল্যের হার ছিল কম। প্রথম ছয় মাসে সাফল্যের হার গড়ে ৮৫% থাকলেও, এক বছর পর ৬৪%, দুই বছর পর ৫২% এবং তিন বছর পর কার্যকারিতার হার মাত্র ১৯% এ নেমে আসে। সূত্র: Click This Link

বিশেষত শিশুদের উপর এর প্রতিক্রিয়া এমন ভয়ংকর ছিল যে, যেসব শিশু ভ্যাকসিন নিয়েছিল তাদের কলেরায় মৃত্যুর হার ভ্যাকসিন না নেয়া শিশুদের চেয়ে ছিল বেশি; দেখা যায় টিকা নেয়ার তৃতীয় বছর থেকে শিশুদের মধ্যে কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুকি স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়তে থাকে। অবশ্য তাতে ভ্যাকসিন প্রস্তুত কারী সুইডেনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির কিছু যায় আসেনি, ধনী দেশের পর্যটক আর সেনাদের জন্য স্বল্প মেয়াদে কার্যকর এই টিকা বিক্রি করে প্রতি বছর কোটি ডলার আয় করে দেশটি।

সূত্র: Racketeering in the World Health Organization's Cholera Vaccination Programme: Evil forces channel public funds into private pockets By Rashid Haider
Click This Link

আমরা ৮৫-৮৬ সালে চাদপুরের মতলববাসীকে গিনিপিগ বানানো ট্রায়ালের পুনরাবৃত্তি দেখতে চাইনা। তাই, অবিলম্বে, এই উচ্চমাত্রার বিষাক্ত মারকারি যুক্ত এবং ইতিমধ্যেই অকার্যকর বলে প্রমাণিত স্বল্প মেয়াদি কলেরা ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বন্ধ করার দাবী করছি। মিরপুরবাসীকে আহবান, আপনারা ভারতীয়, মার্কিন ও বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানির বাণিজ্যের স্বার্থে আয়োজিত এই ভয়ংকর, অপ্রয়োজনীয় ও ফালতু ট্রায়ালে অংশ নিবেন না, কলেরা/ডায়রিয়া প্রতিরোধের জন্য নিরাপদ পানি ও উন্নত পয়:নিষ্কাষণ ব্যাবস্থার দাবীতে আন্দোলন গড়ে তুলুন।

কৃতজ্ঞতা: সচলায়তনে যুধিষ্ঠির লিখিত “ভারতীয় ভ্যাকসিনের গিনিপিগ হলেন আড়াই লাখ মীরপুরবাসী?” ব্লগটি এখানে ব্যাবহ্রত অনেক তথ্যের উৎস। যুধিষ্ঠিরের চমৎকার লেখা এবং সচলায়তনে তার সূত্র ধরে চলমান তর্ক-বিতর্ক এই লেখাটির প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29335078 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29335078 2011-02-27 13:04:07
“জাতীয় সম্পদ বহুজাতিক পুঁজি ও মালিকানার তর্ক” নিয়ে বইমেলায় সংহতির স্টলে থাকবো আজ বিকাল ৪ টা থেকে

এবারের বইমেলায় আমাদের বই “জাতীয় সম্পদ বহুজাতিক পুঁজি ও মালিকানার তর্ক”। ভূমিকা: অধ্যাপক আনু মুহম্মদ। প্রকাশক: সংহতি। পৃষ্ঠা ১৪৪। গায়ের দাম ১২০ টাকা। পাওয়া যাচ্ছে সংহতি’র স্টলে (স্টল নং ৪৩৮, বাংলা একাডেমির গেটের বাইরে)।

আনু মুহম্মদের ভূমিকা থেকে

গ্রন্থটি গত দুই বছরে লিখিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তথ্যবহুল ও বিশ্লেষণমূলক কয়েকটি প্রবন্ধের সংকলন। প্রবন্ধগুলির রচয়িতা, কখনও এককভাবে কখনও যৌথভাবে, কল্লোল মোস্তফা, মাহবুব রুবাইয়াৎ এবং অনুপম সৈকত শান্ত। এই তরুণ লেখকেরা সকলেই বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শাস্ত্রের শিক্ষাপ্রাপ্ত। সেই শিক্ষার সঙ্গে সমাজ অর্থনীতি ও রাজনীতি সম্পর্কে আগ্রহ ও অঙ্গীকার মিলে তাঁদেরকে সক্ষম করে তুলেছে বেশ কিছু জটিল বিষয় মোকাবিলা, উন্মোচন ও বিভ্রান্তি দূরীকরণে।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে জনগণ ও তার জগতকে বিপর্যস্ত করে আধিপত্য স্থাপন এবং লুণ্ঠন ও পাচারের প্রকল্পকে ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থিত করার বেশ কিছু পথ আছে। জনস্বার্থবিরোধী নীতি, ঘুষ দুর্নীতি ছাড়াও আরও যেসব পথ এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তার মধ্যে অন্যতম হল, তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের ব্যবহার করে এসব প্রকল্প মহিমান্বিত করা এবং মিডিয়ার উপর আধিপত্যের সুযোগে তার পক্ষে প্রচারণা চালানো। বিশ্বব্যাংক প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব অপকর্মের গুরু, তারা বহুজাতিক ও দেশীয় লুটেরা পুঁজির প্রধান মাধ্যম ও মুখপাত্র, আর সরকার হচ্ছে বাস্তবায়নের মেশিন। এই দুষ্ট বিশ্বজোটের কাজে ভাড়া খাটার জন্য উদগ্রীব কনসালটেন্ট তাই সবসময়ই সুলভ। এরাই বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এ কথাটা সবসময় মনে রাখা দরকার যে, কোন ডিগ্রীপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ যখন ভাড়ায় খাটেন কিংবা কোম্পনির কর্মচারী হন তখন তিনি আর বিশেষজ্ঞ থাকেন না, হয়ে পড়েন কোম্পানি প্রচারক। তখন তাকে সেভাবেই চিনতে হবে।

এসব কোম্পনি প্রচারক ও প্রচারণা দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশে অনেক সর্বনাশা প্রকল্প ইতিমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। প্রচারণার ধারে মানুষও অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে তাদেরই প্রকল্প বলে গ্রহণ করেন। কিন্তু এগুলোর সর্বনাশ যখন জনগণের সামনে স্পষ্ট হয় তখন এর জন্য দায়ী ব্যক্তি, কোম্পানি, কনসালট্যান্ট বা আন্তর্জাতিক সংস্থা কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায় না। দায় টানতে হয় দেশ ও দেশের জনগণকে।
এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা দেশি-বিদেশি অপশক্তির বিরুদ্ধে জনগণের সংগঠিত শক্তির বিকাশ অপরিহার্য। কিন্তু এই শক্তির বিকাশের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে, কোম্পানি প্রচারকদের তৎপরতা ও মিডিয়া প্রচারণায় সমাজে উন্নয়ন-প্রগতি সম্পর্কে যে ভুল বিশ্বাসগুলো তৈরি হয়, তার বিরুদ্ধে তথ্য ও জ্ঞানের লড়াই। প্রতিষ্ঠিত বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ এখন শত্রুপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, সুতরাং তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের ঘাড়ে এর বড় দায়িত্ব নিতেই হবে। তথাকথিত ডিগ্রী এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির চাইতে এখানে গুরুত্বপূর্ণ নির্মোহ জ্ঞান, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও জনগণের পক্ষে সক্রিয় অবস্থান। বর্তমান গ্রন্থটি এরই একটি নমুনা।

সূচি:

অল-ক্লিয়ার নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ ?

সাগরের গ্যাস ব্লক ইজারা: এবার সাগর লুটের লাগল ধুম

কনোকো-ফিলিপস, শেভরন ও এশিয়া এনার্জির হয়ে বাংলাদেশকে মার্কিন চাপের মূল উইকি দলিল

জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স/পেট্রোবাংলার সক্ষমতা, সংকট ও সম্ভাবনা প্রসঙ্গে

এবার সিসমিক সার্ভের কাজও তুলে দেয়া হচ্ছে বিদেশী কোম্পানির হাতে!
গ্যাস উৎপাদন কে করবে

উন্মুক্ত কয়লা খনন: বৈদেশিক দাওয়াই এর গুণবিচার

আনু মুহম্মদের প্রবন্ধ, জোবায়ের জামানের "বিশেষজ্ঞ" প্রতিক্রিয়া এবং "দেশের স্বার্থ"

প্রস্তাবিত খসড়া কয়লানীতি ২০১০ সম্পর্কে জ্বালানী মন্ত্রণালয় বরাবর প্রেরিত অভিমত

বড়পুকুরিয়া: মাটির নীচের উন্মুক্ত খনি, মাটির উপরের দু:খ

ল্যাটিন আমেরিকার তাম্বোগ্রান্দে- আরেক ফুলবাড়ি

ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির লাভ-লোকসান

বৈষম্য মুক্ত লোডশেডিং চাই!

বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ নিয়ে প্রশ্নোত্তর

সাগর লুট নিয়ে প্রশ্নোত্তর

আমাদের ভূমিকা

এই বইয়ের লেখাগুলো ২০০৮ থেকে ২০১০ সালে বিভিন্ন সময়ে সামহোয়ারইনব্লগ এ দিনমজুর ব্লগ হিসেবে লিখিত হয়েছে। কিছু কিছু লেখা তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ওয়েবসাইট এ প্রকাশিত হয়েছে এবং সাপ্তাহিক ”বুধবার” পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছে। মূলত জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনের যৌক্তিকতার ভিত্তি প্রসারিত করা, পুজিবাদী উন্নয়ণ দর্শনের প্রেক্ষিতে সেটাকে বোঝার চেষ্টা করা এবং অন-লাইন কমিউনিটি ও রাজনৈতিক কর্মীদের মাঝে জাতীয় সম্পদ ও জাতীয় মালিকানার তর্কগুলোকে হাজির করার আগ্রহ থেকেই আমাদের এই লেখা। ব্লগে লেখার একটা সুবিধা হলো, কোন লেখা প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে কয়েকশো পাঠক সেটা পড়ে ফেলে, বিভিন্ন মন্তব্য করে এবং লেখাটির ভালো-মন্দ, পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে প্রাণবন্ত তর্ক জমে উঠার সুযোগ তৈরী হয়। ফলে ব্লগের লেখায় কোন দুর্বলতা বা ফাঁকি ঝুকি রাখার কোন সুযোগ সাধারণত থাকে না কারণ কারো না কারো চোখে সেটা পড়বেই এবং লেখককে তার জবাব দিতে হবে নতুবা সংশোধন করতে হবে। তাছাড়া প্রায়শই বিভিন্ন পাঠক/ব্লগার একটি বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই করার কারণে এবং সেসব নিয়ে নতুন তর্ক তৈরী হওয়ার কারণে অনেক সময় লেখার মধ্যে নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত হয় কিংবা একেবারে নতুন আরেকটি লেখাও তৈরী হয়। আমাদের একাধিক লেখার ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা ঘটেছে।

ব্লগের ভারচুয়াল জগৎ থেকে লেখাগুলো বাস্তব জগতে হাজির করার জন্য এর আগে আমরা ”নাইল্যাকাডা” পত্রিকার তিনটি সংখ্যা প্রকাশ করেছি। আরো বেশি সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌছানো এবং অনলাইন কমিউনিটির বাইরে থাকা সারাদেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের কর্মী ও সমর্থকদের কাজে লাগানোর তাগিদেই সংহতি প্রকাশনির উদ্যোগে জাতীয় সম্পদ বিষয়ে এযাবৎ লিখিত সবগুলো লেখা একটি পুস্তক আকারে হাজির করা হলো। এ উদ্যোগটি নেয়ার জন্য সংহতি প্রকাশনির ফিরোজ আহমেদেকে বিশেষ ধন্যবাদ। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনুমুহম্মদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যাস্ততার মাঝে সময় করে বইটির একটি চমৎকার ভুমিকা লিখে দেয়ার জন্য।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29334448 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29334448 2011-02-26 11:46:36
বইমেলায় আমাদের বই “জাতীয় সম্পদ বহুজাতিক পুঁজি ও মালিকানার তর্ক”
এবারের বইমেলায় আমাদের বই “জাতীয় সম্পদ বহুজাতিক পুঁজি ও মালিকানার তর্ক”। ভূমিকা: অধ্যাপক আনু মুহম্মদ। প্রকাশক: সংহতি। পৃষ্ঠা ১৪৪। গায়ের দাম ১২০ টাকা। পাওয়া যাবে বাংলা একাডেমির গেটের বাইরে সংহতি’র স্টলে (স্টল নং ৪৩৮) আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১১ থেকে।

আনু মুহম্মদের ভূমিকা থেকে

গ্রন্থটি গত দুই বছরে লিখিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তথ্যবহুল ও বিশ্লেষণমূলক কয়েকটি প্রবন্ধের সংকলন। প্রবন্ধগুলির রচয়িতা, কখনও এককভাবে কখনও যৌথভাবে, কল্লোল মোস্তফা, মাহবুব রুবাইয়াৎ এবং অনুপম সৈকত শান্ত। এই তরুণ লেখকেরা সকলেই বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শাস্ত্রের শিক্ষাপ্রাপ্ত। সেই শিক্ষার সঙ্গে সমাজ অর্থনীতি ও রাজনীতি সম্পর্কে আগ্রহ ও অঙ্গীকার মিলে তাঁদেরকে সক্ষম করে তুলেছে বেশ কিছু জটিল বিষয় মোকাবিলা, উন্মোচন ও বিভ্রান্তি দূরীকরণে।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে জনগণ ও তার জগতকে বিপর্যস্ত করে আধিপত্য স্থাপন এবং লুণ্ঠন ও পাচারের প্রকল্পকে ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থিত করার বেশ কিছু পথ আছে। জনস্বার্থবিরোধী নীতি, ঘুষ দুর্নীতি ছাড়াও আরও যেসব পথ এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তার মধ্যে অন্যতম হল, তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের ব্যবহার করে এসব প্রকল্প মহিমান্বিত করা এবং মিডিয়ার উপর আধিপত্যের সুযোগে তার পক্ষে প্রচারণা চালানো। বিশ্বব্যাংক প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব অপকর্মের গুরু, তারা বহুজাতিক ও দেশীয় লুটেরা পুঁজির প্রধান মাধ্যম ও মুখপাত্র, আর সরকার হচ্ছে বাস্তবায়নের মেশিন। এই দুষ্ট বিশ্বজোটের কাজে ভাড়া খাটার জন্য উদগ্রীব কনসালটেন্ট তাই সবসময়ই সুলভ। এরাই বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এ কথাটা সবসময় মনে রাখা দরকার যে, কোন ডিগ্রীপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ যখন ভাড়ায় খাটেন কিংবা কোম্পনির কর্মচারী হন তখন তিনি আর বিশেষজ্ঞ থাকেন না, হয়ে পড়েন কোম্পানি প্রচারক। তখন তাকে সেভাবেই চিনতে হবে।

এসব কোম্পনি প্রচারক ও প্রচারণা দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশে অনেক সর্বনাশা প্রকল্প ইতিমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। প্রচারণার ধারে মানুষও অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে তাদেরই প্রকল্প বলে গ্রহণ করেন। কিন্তু এগুলোর সর্বনাশ যখন জনগণের সামনে স্পষ্ট হয় তখন এর জন্য দায়ী ব্যক্তি, কোম্পানি, কনসালট্যান্ট বা আন্তর্জাতিক সংস্থা কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায় না। দায় টানতে হয় দেশ ও দেশের জনগণকে।
এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা দেশি-বিদেশি অপশক্তির বিরুদ্ধে জনগণের সংগঠিত শক্তির বিকাশ অপরিহার্য। কিন্তু এই শক্তির বিকাশের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে, কোম্পানি প্রচারকদের তৎপরতা ও মিডিয়া প্রচারণায় সমাজে উন্নয়ন-প্রগতি সম্পর্কে যে ভুল বিশ্বাসগুলো তৈরি হয়, তার বিরুদ্ধে তথ্য ও জ্ঞানের লড়াই। প্রতিষ্ঠিত বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ এখন শত্রুপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, সুতরাং তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের ঘাড়ে এর বড় দায়িত্ব নিতেই হবে। তথাকথিত ডিগ্রী এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির চাইতে এখানে গুরুত্বপূর্ণ নির্মোহ জ্ঞান, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও জনগণের পক্ষে সক্রিয় অবস্থান। বর্তমান গ্রন্থটি এরই একটি নমুনা।

সূচি:

অল-ক্লিয়ার নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ ?

সাগরের গ্যাস ব্লক ইজারা: এবার সাগর লুটের লাগল ধুম

কনোকো-ফিলিপস, শেভরন ও এশিয়া এনার্জির হয়ে বাংলাদেশকে মার্কিন চাপের মূল উইকি দলিল

জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স/পেট্রোবাংলার সক্ষমতা, সংকট ও সম্ভাবনা প্রসঙ্গে

এবার সিসমিক সার্ভের কাজও তুলে দেয়া হচ্ছে বিদেশী কোম্পানির হাতে!
গ্যাস উৎপাদন কে করবে

উন্মুক্ত কয়লা খনন: বৈদেশিক দাওয়াই এর গুণবিচার

আনু মুহম্মদের প্রবন্ধ, জোবায়ের জামানের "বিশেষজ্ঞ" প্রতিক্রিয়া এবং "দেশের স্বার্থ"

প্রস্তাবিত খসড়া কয়লানীতি ২০১০ সম্পর্কে জ্বালানী মন্ত্রণালয় বরাবর প্রেরিত অভিমত

বড়পুকুরিয়া: মাটির নীচের উন্মুক্ত খনি, মাটির উপরের দু:খ

ল্যাটিন আমেরিকার তাম্বোগ্রান্দে- আরেক ফুলবাড়ি

ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির লাভ-লোকসান

বৈষম্য মুক্ত লোডশেডিং চাই!

বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ নিয়ে প্রশ্নোত্তর

সাগর লুট নিয়ে প্রশ্নোত্তর

আমাদের ভূমিকা

এই বইয়ের লেখাগুলো ২০০৮ থেকে ২০১০ সালে বিভিন্ন সময়ে সামহোয়ারইনব্লগ এ দিনমজুর ব্লগ হিসেবে লিখিত হয়েছে। কিছু কিছু লেখা তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ওয়েবসাইট এ প্রকাশিত হয়েছে এবং সাপ্তাহিক ”বুধবার” পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছে। মূলত জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনের যৌক্তিকতার ভিত্তি প্রসারিত করা, পুজিবাদী উন্নয়ণ দর্শনের প্রেক্ষিতে সেটাকে বোঝার চেষ্টা করা এবং অন-লাইন কমিউনিটি ও রাজনৈতিক কর্মীদের মাঝে জাতীয় সম্পদ ও জাতীয় মালিকানার তর্কগুলোকে হাজির করার আগ্রহ থেকেই আমাদের এই লেখা। ব্লগে লেখার একটা সুবিধা হলো, কোন লেখা প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে কয়েকশো পাঠক সেটা পড়ে ফেলে, বিভিন্ন মন্তব্য করে এবং লেখাটির ভালো-মন্দ, পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে প্রাণবন্ত তর্ক জমে উঠার সুযোগ তৈরী হয়। ফলে ব্লগের লেখায় কোন দুর্বলতা বা ফাঁকি ঝুকি রাখার কোন সুযোগ সাধারণত থাকে না কারণ কারো না কারো চোখে সেটা পড়বেই এবং লেখককে তার জবাব দিতে হবে নতুবা সংশোধন করতে হবে। তাছাড়া প্রায়শই বিভিন্ন পাঠক/ব্লগার একটি বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই করার কারণে এবং সেসব নিয়ে নতুন তর্ক তৈরী হওয়ার কারণে অনেক সময় লেখার মধ্যে নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত হয় কিংবা একেবারে নতুন আরেকটি লেখাও তৈরী হয়। আমাদের একাধিক লেখার ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা ঘটেছে।

ব্লগের ভারচুয়াল জগৎ থেকে লেখাগুলো বাস্তব জগতে হাজির করার জন্য এর আগে আমরা ”নাইল্যাকাডা” পত্রিকার তিনটি সংখ্যা প্রকাশ করেছি। আরো বেশি সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌছানো এবং অনলাইন কমিউনিটির বাইরে থাকা সারাদেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের কর্মী ও সমর্থকদের কাজে লাগানোর তাগিদেই সংহতি প্রকাশনির উদ্যোগে জাতীয় সম্পদ বিষয়ে এযাবৎ লিখিত সবগুলো লেখা একটি পুস্তক আকারে হাজির করা হলো। এ উদ্যোগটি নেয়ার জন্য সংহতি প্রকাশনির ফিরোজ আহমেদেকে বিশেষ ধন্যবাদ। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনুমুহম্মদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যাস্ততার মাঝে সময় করে বইটির একটি চমৎকার ভুমিকা লিখে দেয়ার জন্য।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29330927 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29330927 2011-02-20 22:34:41
বিশ্বকাপ ২০১১: নগরের কসমেটিক সার্জারি ও রাষ্ট্রীয় প্রদর্শন কাম বডি ডিসমরফিক ডিসঅরর্ডার(বিডিডি) বলা হয়। ব্যাক্তি বুর্জোয়ার এই ধরণের ‘সৌন্দর্য্য বিলাসিতা’র সাথে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি ও শ্রেণীগত বৈশিষ্টগুলো সম্পর্কিত। এই অর্থনৈতিক ও শ্রেণীগত বৈশিষ্টের কারণে একই ভাবে বিশেষত অনুন্নত/উন্নয়নশীল বুর্জোয়া রাষ্ট্রের মধ্যেও যখন এই বডি ডিসমরফিক ডিসঅর্ডার দেখা যায় তখন আমরা দেখি রাষ্ট্রীয় প্লাষ্টিক/কসমেটিক সার্জারি। এলিট নারী-পুরুষ যেমন তার শরীরের বিশেষ বিশেষ অঙ্গের সোন্দর্য্য বর্ধন করার ব্যাপারে অবসেসড থাকে, এসব বুর্জোয়া রাষ্ট্রও তেমনি বিভিন্ন উপলক্ষে রাজধানী বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশের কৃত্রিম বিউটিফিকেশান বা সৌন্দর্য্য বর্ধনের বিলাসে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ২০১১ এর বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপলক্ষে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম এমনই রাষ্ট্রীয় প্লাষ্টিক সার্জারির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বরাবরের মতোই যার নির্মম শিকার গরীব মানুষ- ভিক্ষুক, টোকাই, হকার ও ফুটপাতবাসী শ্রমজীবি মানুষ।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের কসমেটিক সার্জারি

গত ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকায় যেমন বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্থ করে স্টেডিয়াম, সড়ক, হাইওয়ে, এয়ারপোর্ট ইত্যাদির পেছনে কোটি কোটি ডলার খরচ করা হয়েছে, নগরের সৌন্দর্য্য বর্ধনের নামে হকার-ভিক্ষুক-ছিন্নমুল-বস্তিবাসীদেরকে উচ্ছেদ করে নগরের বাইরে একরকম অস্থায়ী কনসানট্রেশান ক্যাম্পে রাখা হয়েছে, ২০১১ বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপলক্ষে বাংলাদেশেও একই ধরণের তৎপরতা চালানো হচ্ছে। গত ২৬ ডিসেম্বরে এয়ারপোর্ট থেকে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ও মিরপুর স্টেডিয়ামে যাতায়াতের জন্য ঢাকার ১৭ টি রাস্তা সহ মোট ৪.৬৬ লক্ষ বর্গমিটার রাস্তা,ফুটপাত, ডিভাইডারের সৌন্দর্য্য বর্ধন করার কাজ শুরু হয়ে প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ঢাকা সিটি কর্পোরেশান এবং আরো ৪২ টি কনসোর্টিয়াম এই কাজগুলো করছে। এরজন্য খরচ হচ্ছে ৫৪ কোটি টাকা।(সূত্র: ডেইলিস্টার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১১ Click This Link)

একই ভাবে চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশান ও সিডিএ মিলিত ভাবে ৮৬ কোটি টাকার কাজ করছে যার মধ্যে রয়েছে তিনটি কৃত্রিম ঝর্ণা, তিনটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার আইকন, বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ভাস্কর্য, অসংখ্য বিলবোর্ড বসানো ইত্যাদি।(সূত্র: ডেইলিষ্টার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১১, Click This Link

আর কোটি কোটি টাকা খরচ করে বাড়ানো সৌন্দর্য্যের মধ্যে ময়লাদাগের মতোই বেমানান নগরের ভাসমান মানুষ, ভিক্ষুক, টোকাই, হকার ও ফুটপাতবাসী শ্রমজীবি মানুষ। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরের সৌন্দর্য্য বর্ধনের প্রয়োজনেই ময়লা আবর্জনা পরিস্কারের সাথে সাথে নগরদুটিকে ভবঘুরে-ভিক্ষুক “মুক্ত” করা হচ্ছে। আর বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে করা এইসব কাজকে মোটেই বেআইনি বলা যাবে না কারণ এর জন্য ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন, ২০১০ চুড়ান্ত করা হয়েছে। এই আইন অনুসারে:

কোন ব্যক্তির বসবাসের জায়গা বা রাত যাপন করবার মতো সুনির্দিষ্ট কোন জায়গা না থাকলে, ঘোরাফিরা করে জনগণকে অহেতুক বিরক্ত বা ভিক্ষাবৃত্তিতে নিযুক্ত হলে তিনি ভবঘুরে বলে গণ্য হবেন। তবে ধর্মীয় কাজে বা জনহিতকর কাজে লিপ্ত হলে তিনি ভবঘুরে হিসেবে গণ্য হবেন না। ভবঘুরে আইন বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে একটি উপদেষ্টা বোর্ড গঠন করা হবে। এ বোর্ডের সদস্য থাকবেন ১৮ জন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হবেন বোর্ডের চেয়ারম্যান। এ আইন অনুযায়ী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট বসিয়ে ভবঘুরে ব্যক্তি আটক করতে পারবেন। ভবঘুরে ব্যক্তি আটকের পর ভবঘুরে অভ্যর্থনা কেন্দ্রে পাঠান হবে। সেখান থেকে বিভিন্ন ভবঘুরে আশ্রয় কেন্দ্রে আটক ব্যক্তিদের রাখা হবে। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দু'বছর ভবঘুরে আশ্রয় কেন্দ্রে আটক রাখা যাবে। কোন ব্যক্তি ভবঘুরে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে পালিয়ে গেলে তার তিন মাস জেল হবে।
Click This Link

আবার জোর জবদস্তির অভিযোগ যেন না উঠে সেজন্য কি চমৎকার গণতান্ত্রিক উপায়ে চট্টগ্রামের মেয়র ভিক্ষুকদেরকে দিয়ে ওয়াদা করিয়ে নিয়েছেন:

“ভিক্ষার হাত পেতে দেশকে কলংকিত করব না। দেশের ১৬ কোটি মানুষের সম্মান রক্ষার্থে চট্টগ্রামের রাস্তায় আর ভিক্ষা করব না।”
সূত্র: Click This Link

অধ্যাপক আসহাব উদ্দিন আহমদ তার “ফুটপাত ইজ নট হেডপাত” প্রবন্ধে বলেছিলেন:

“এদেশে শোষণের কবলে পড়ে জমি ভিটেবাড়ি হারানো বেআইনি নয়। এটা আইনসম্মত। এতে কোন আইনগত বাধা নেই। কিন্তু সর্বস্ব হারিয়ে কাজ ও আশ্রয়ের সন্ধানে শহরে এসে কোথাও মাথা গোজার ঠাই করতে না পেরে ফুটপাতে পিঠপাতা বেআইনি, যার শাস্তি হলো এলোপাথারি পিটুনি। কারণ ফুটপাত তো পা পাতার জন্য, মাথা বা পিঠ পাতার জন্য নয়। ফুটপাত ইজ নট হেডপাত। ”
কথাগুলো তিনি লিখেছিলেন ১৯৮৮ সালে। বেচে থাকলে দেখতেন দেশের আরো “উন্নতি” হয়েছে, ফুটপাতবাসীর সংখ্যা বেড়েছে এবং তাদের জন্য এখন কেবল এলোপাথারি পিটুনি নয়, একেবারে আইন করে জেলও বরাদ্দ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় প্রদর্শন কামের অর্থনৈতিক ভিত্তি

শ্রম শোষণ করে মুনাফা অর্জনের সাথে ভোগ-বিলাস/বিত্তের প্রদর্শনের বাসনা ও সামর্থ্যের সম্পর্কটা সরাসরি। আবার শিল্প পুঁজির তুলনায় বণিক পুঁজি আর লুটেরা পুঁজির সাথে এই প্রদর্শন কামের ঘনিষ্ঠতা বেশি। ব্যাবসায়ী, ব্যাংক মালিক, ফাটকাবাজ কিংবা চোরাচালানি করা পুজিপতির জন্য মুনাফা পুর্নবিনিয়োগকরা ততটা বাধ্যতামূলক নয় যতটা শিল্পপুঁজির মালিক গোষ্ঠীর বেলায় হয়ে থাকে, ফলে ব্যাক্তিগত ভোগ বিলাসের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের কোন অভাব লুটেরা বা বণিক পুজির হয় না। তাছাড়া চকচকে থাকাটা তাদের ব্যাবসার ব্র্যান্ড ভ্যালুর সাথেও যুক্ত। একই ভাবে বুর্জোয়া রাষ্ট্রেও যখন শিল্প-কৃষির উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের বদলে সেবাখাত, আমদানী-রপ্তানি ও বিদেশী বিনিয়োগ/ঋণ/খয়রাত নির্ভর অর্থনীতি অর্থাৎ 'দোকানদারী অর্থনীতি'র প্রাধান্য তৈরী হয় তখন তার ব্র্যান্ড ভ্যালুর জন্যও একই ভাবে এই সৌন্দর্য্য প্রদর্শন ভীষণ জরুরী। এই নির্ভরশীল বুর্জোয়াদের সম্পর্কে ফ্রান্জ ফানো বলেছিলেন:

“বুর্জোয়াদের এমন কোন অর্থনৈতিক ভিত্তি থাকেনা যে এরা গোটা কতক পয়সা দেশবাসীর দিকে ছুড়ে দিয়ে বার্কি অর্থে নিজেদের আধিপত্য নিশ্চিত করবে। তাছাড়া, এরা যত দ্রুত সম্ভব নিজেদের পকেট ভরার ধান্দায় আচ্ছন্ন থাকে। ফলে দেশের অর্থনীতি ক্রমশ মন্দা আক্রান্ত হতে থাকে। আর এই মন্দা পরিস্থিতি লুকানোর জন্য, নিজেদেরকে আশ্বস্ত করবার জন্য এবং গর্ব করার জন্য কিছু একটা নিজেদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য এরা রাজধানীতে একের পর এক বড় বড় দালান বানায় আর বিভিন্ন ভাবে ইজ্জত বাড়ানোর জন্য কেনাকাটায় (প্রেসটিজ এক্সপেন্স) পয়সা ঢালতে থাকে।”

ফলে এদেশে আদমজী সহ অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ হয় আর অন্যদিকে একটার পর একটা শপিং মল তৈরী হয়, গ্রামগুলোকে অন্ধকারে রেখে, সেচের পানি-বিদ্যুত বন্ধ করে হলেও নগরের বিপনী বিতান আলোকিত থাকে, নতুন নতুন কারখানা গড়ে না উঠেনা, কৃষির উন্নয়ণ হয় না কিন্তু বড় বড় রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ, মোবাইল(এমনকি বিমানবন্দর) ইত্যাদি যোগাযোগ অবকাঠামোর উপর প্রাধান্য দেয়া হয় যেন আমদানী-রপ্তানি, চোরাচালান আর কমিশনের খেলা নির্বিঘ্নে চলে।

এক কথায়, রাষ্ট্রের কাছে এখন জনগণের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের চেয়ে যেকোন মূল্যে “প্রেস্টিজ” বাড়ানোর কাজে অর্থ ব্যয় বেশি জরুরী, ঢাকা চট্টগ্রামের সন্দৌর্য বর্ধনের জন্য সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় তৎপরতা তারই স্বাক্ষ্য দিচ্ছে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29320387 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29320387 2011-02-04 21:58:22
গৌতম ঘোষের “মনের মানুষ”: জাতহীনের জাত মারার তরিকা এক.
দৃশ্য১: সিরাজ সাঁই এর আখড়া। সিরাজ সাই তরুণ লালনকে “সঙ্গ” দেয়ার জন্য একজন নারীকে ডাকলেন। ক্যামেরায় সেই নারীকে দেখা গেল। চোখে মুখে প্রচন্ড কামুকতা। এসেই লালনকে জড়িয়ে ধরে একটা ঘরের দিকে যেতে থাকল। লালন যেন অবশ কিংবা বশ হয়ে গিয়েছেন।তার সাথে সাথে চলেছেন। হঠাত সিরাজ সাঁই লালনকে পিছু ডাকলেন। যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও লালন সিরাজ সাঁই এর কাছে ফিরে আসলেন (সিনেমা হলে প্রচন্ড হাত তালি)। সিরাজ সাই লালনকে সাবধান করে বললেন যে কাজ তুমি করতে যাচ্ছ সে কাজ বিপদজনক । তোমাকে বিন্দু ধারণ করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। পরের দৃশ্যে সেই নারী ঘনিষ্ঠ অবস্থায় লালনকে জিজ্ঞেস করে, পারবে অমাবশ্যায় পূণির্মা জাগাতে? লালন ইতিবাচক সাড়া দেয়। এর আগের একটা দৃশ্যে দেখা যায় সংসারের মায়ায় আচ্ছন্ন তরুণ লালনকে স্থির করার জন্য সিরাজ সাঁই একজন সাধন সঙ্গীনি জুটিয়ে দেয়ার কথা বলছিলেন।


ছবি-১:লালনের সঙ্গীনি হবার ডাক পাওয়ার পর ময়ুরির হাসি

দৃশ্য২: লালন সাঁই এর আখড়া। একলা ঘরে লালন বসে আছেন। অন্ধকার ঘরে কেবল চাদের আলো খেলা করছে। কলমি এসে লালনের সাথে কথা বলার অনুমতি চায়। লালন তাকে বসতে বলে। কলমি লালনের কাধে মুখ ঘষতে থাকে, বলতে থাকে “আমার জ্বালা মিটিয়ে দেও গো সাঁই” লালনের চোখ মুখ কেমন শক্ত হয়ে যায়। ক্যামেরা লালনের মুখের উপর স্থির। কলমির হাত এবং মুখ লালনের গা বেয়ে নীচে নামতে থাকে। আস্তে আস্তে এত নীচে নেমে যায় যে আর দেখা যায় না। লালন নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করছে। একপর্যায়ে কলমির খিলখিল হাসি শোনা যায়। কলমি বলে উঠে, “এইতো তোমার শরীর জেগে উঠেছে। আমাকে শান্ত করো সাঁই। তুমি দেখছি ভাবের ঘরে চুরি করো সাই।“ লালন স্থির গলায় বলে উঠে, “শরীর জাগে শরীরের নিয়মে, মন যদি না জাগে?” কলমি চলে যায়।


ছবি-২:"আমার জ্বালা মিটাও সাই"

দৃশ্য৩: লালন সাঁই এর আখড়া। কলমি ঘরের চালে ঘরবাধার কাজে ব্যাস্ত কালুয়ার দিকে ইঙ্গিত মূলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। কালুয়া চাল থেকে নেমে পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে থাকে। নিজের হাতে বানানো ঘর নিজেই দা দিয়ে কোপাতে থাকে। সব দেখে শুনে লালন কালুয়াকে বলে তার নারী সঙ্গ প্রয়োজন এবং কলমি কে বলে কালুয়ার “সেবা” করতে। কলমি জানায় কালুয়ার সাথে একসময় তার সম্পর্ক ছিল কিন্ত কালুয়া সমাজের ভয়ে কলমিকে গ্রহণ করে নি সেসময়। একথা বলেই কলমি গান ধরে: “সময় গেলে সাধন হবে না”। শেষে যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও লালনের নিদের্শে পালন করতে রাজী হয়ে যায় কলমি।



ছবি-৩:কালুয়ার দিকে কমলির ইঙ্গিতময় দৃষ্টি

উপরের দৃশ্য তিনটি সম্পর্কে কথাবাতা দিয়েই “মনের মানুষ” সম্পর্কে আলোচনা শুরু করা যাক। দৃশ্যগুলোতে সাধারণ ভাবে বাউল সম্প্রদায় এবং বিশেষ ভাবে লালন ও তার শিষ্যদের মধ্যকার নারী পুরুষ সম্পর্ক চর্চার এক ধরণের রিপ্রেজেন্টেশান রয়েছে, যে রিপ্রেজেন্টেশান কোন ধরণের পরিপ্রেক্ষিত কিংবা কার্যকারণ ব্যাখ্যা ছাড়াই লালন, তার গুরু ও শিষ্যদের যৌনতাকে হাজির করে। প্রথম ও তৃতীয় দৃশ্যে দেখা যায়, আখড়ার নারীরা প্রচন্ড কামুকি, সিরাজ সাই কিংবা লালন তাদের ততোধিক কামার্ত শিষ্যদেরকে ঠান্ডা করার জন্য এই কামুকি নারীদেরকে স্রেফ অবজেক্ট বা উপকরণ হিসেবে ব্যাবহার করছেন। এছাড়া তৃতীয় দৃশ্যে “সময় গেলে সাধন হবে না” এই সাধনতত্ত্বের গানটির ব্যাবহার ও সম্ভাব্য ব্যাখ্যাটিও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় দৃশ্যটিতে কলমিকে কামুকি হিসেবে হাজির করা হলেও দেখানো হয় প্রথম দৃশ্যের কামে বিবশ লালন আরেকটু পরিণত বয়সে এসে কামকে দমন করছেন। আর এই দেখানোর আযোজনে কলমির মুখে “জ্বালা মিটানো”, “শান্ত করো” ইত্যাদি শব্দ কিংবা মুখ ও হাত নীচে নামিয়ে লালনের যৌনাঙ্গ স্পর্শ করার ইঙ্গিত প্রদান, খিল খিল হাসি ইত্যাদির ব্যাবহার ও দর্শকের কাছে তার সম্ভাব্য মেসেজ বা বার্তাটি লক্ষণীয়।

বাউল সাধনায় জ্ঞানাচার, যোগাচার ও বামাচার- এই তিন ধরনেরই মিশ্রন আছে। এর মধ্যে বামাচারী সাধনা সকাম সাধনা। নারী সংসর্গ ও সঙ্গম এরুপ সাধনার অংশ। লালন ও তার শিষ্য সম্প্রদায়ের সাধনার মধ্যেও নিশ্চিত ভাবেই নারী সংসর্গ ও সঙ্গম এর বিষয়টি যুক্ত। কিন্তু সেটা সাধনারই একটা অংশ, কোন ভাবেই কামোন্মত্ত নারী-পুরুষকে ঠান্ডা করার জন্য পশুর মতো হুট হাট জোড় বেধে দেয়া নয়, কিংবা নারীকে সেই কাম নিবৃত্ত করার অবজেক্ট হিসেবে ব্যাবহার নয়। লালন সাই এ ক্ষেত্রে ভাবের মিলের ব্যাপারে জোর দিয়ে বলেছিলেন:

“আগে ভাব জেনে প্রেম করো
যাতে ঘুচবে মনের যাতনা।।
ভাব দিলে বিদেশীর ভাবে
ভাবে ভাব কভু না মিশিবে
শেষে পথের মাথায় গোল বাধাবে
কারো সাথে কেউ যাবে না।।“
আর প্রেম ও কামের সম্পকের্রে ব্যাপারে বলেছেন:

“সহজ প্রেমে ডুব নারে মন কেনে।
আগে ডুবলে পাবা সোনার মানুষ
আছে রে যোগ-ধ্যানে।।
এই কামের ঘরে কপাট মারো
ভাবের একতালা গড়ো
এঁটে দাও প্রেম-ছোড়ানী মেরে।।“

কিংবা

“বলবো কি সেই প্রেমের বাণী
কামে থেকে হয় নিষ্কামী
সে যে শুদ্ধ সহজ রস
করিয়ে বিশ্বাস
দোঁহার মন দোঁহার ভাবে।।“

ছবিটিতে নারী-পুরুষের সম্পর্ককে এই “ভাব জেনে প্রেম করা”, “কামী থেকে নিষ্কামী হয়ে উঠা” কিংবা “কামের ঘরে কপাট মারা”র সাধনার অংশ হিসেবে দেখি না, দেখি কামোন্মত্ত নারী-পুরুষের কাম নিবৃত্ত করার উপায় হিসেবে, লালন কিংবা সিরাজ সাইয়ের ভূমিকা যেখানে গুরুর নয়, দালালের।


দুই.

ছবির ন্যারেটিভ কন্সট্রাকশান বা আখ্যান নির্মাণের জন্য লালনকে জোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বজরায় বসিয়ে গল্প বলানো হয়েছে। লালন খাজনা মওকুফের জন্য ঠাকুর বাড়ির জামিদারের কাছে এসে তার জীবনের গল্প বলছেন, ফাঁকে ফাঁকে গান গাইছেন, ঠাকুর জমিদার লালনের ছবি আকছেন, লালন সম্পর্কে নানান প্রশ্ন করছেন, তার বিষ্ময় প্রকাশ করছেন এবং এক পর্যায়ে মুগ্ধ হয়ে জমিদারের জমিতে বানানো আখড়ার খাজনা মৌকুফ করে দিচ্ছেন এরকম একটি কাঠামোর মধ্যদিয়ে পরিচালক ”মনের মানুষ” ছবির গল্পটি বলেন। ছোট বড় ফ্ল্যাশ ব্যাকের মধ্যে দিয়ে গল্প এগিয়ে চলে। আমরা দেখি হিন্দু পরিবারে বেড়ে উঠা তরুণ লালু বাউল গান গাওয়ার চেষ্টা করছে, সিরাজ সাইয়ের সাথে তার কথোপকথন, দেখি কবিরাজ/তালুকদারের ঘোড়ার সহিস হিসেবে তীর্থ যাত্রায় গিয়ে বসন্ত রোগাক্রান্ত হয়, তাকে কলাগাছের ভেলায় ভাসিয়ে দেয়া হয়, ছেউরিয়ায় তাকে নদী থেকে উদ্ধার করে এক মুসলমান তাতী বউ তার জীবন বাচায়, সিরাজ সাইয়ের সাথে আবার দেখা হয়, সিরাজ সাইয়ের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে লালন, জাতপাত অস্বীকার করে এবং এক পর্যায়ে নিজেই ছেউরিয়ায় নদীর অপর পাড়ে জ্গংলের মধ্যে আস্তানা গেড়ে গড়ে তুলে তার আখড়া ”আনন্দবাজার”।

এই কথিত আনন্দবাজারে লালন ও তার শীষ্যদের কাজ হলো কেবল গান গাওয়া। নদীর পাড়ে, গাছ তলায়, খড়ের ছাউনির নীচে ক্যাম্পফায়ারের আদলে বেশ এক্সোটিক আয়োজনে চকচকে নতুন কাপড় পড়ে কেবল গান গান তারা। গায়িকার নাচ আর মুখ ও শরীরের বিশেষ ভংগীতে ভীষণ মজে যাওযা পরিচালক নানান অ্যাঙ্গেলে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ড্রামাটাইজড করে সে দৃশ্য উপহার দেন দর্শকদের।


ছবি৪: ড্রামাটাইজড এবং গ্লামারাইজড নাচা-গানা

আনন্দবাজারের লালন স¤প্রদায়ের যৌথ জীবনের শুধু যৌনতার অংশটুকু ছাড়া আরো কোন বিষয়ে কোন ডিটেল বা বিস্তারিত বর্ণনার কোন ঝোঁক আমরা পরিচালকের মধ্যে দেখি না। জাতপাত অস্বীকার করে এক পাতে খাওযার দৃশ্য আমরা দেখি, কিন্তু সে খাওয়া খাদ্যের উৎস কি সে বিষয়ে ডিটেল তো দূরের কথা কোন ইঙ্গিত পর্যন্ত ছবিতে নেই। লালন কি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবলই গানবাজনা করতেন আর মাঝে মাঝে মোল্লা পুরুতদের সাথে বাহাস করতেন? তারা কি সেখানে কৃষিকাজ সহ কোন ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মধ্যে যুক্ত ছিলেন নাকি গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করতেন? সমাজ থেকে খেদিয়ে দেয়া লোকজন নিয়ে ছেউরিয়ায় যে আখড়া গড়ে উঠার আখ্যান দেখানো হয় ছবিতে তার সাথে বৃহত্তর সমাজের সম্পর্ক কি? নদীয়া থেকে রংপুর পর্যন্ত যে বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে লালনের জনপ্রিয়তা ও শক্তিশালি ভিত্তি তৈরী হয়েছিল তার উৎসই বা কি? এ কি কেবলি কাঙাল হরিণাথের মুখ দিয়ে বলানো ”গান শুনে” ভক্ত বনে যাওয়া নাকি তাতি-জোলা স¤প্রদায়ের জীবনের সংগ্রামের সাথে এর কোন যোগ ছিল? ভদ্রলোক পরিচালক গৌতম ঘোষ লালন ও তার স¤প্রদায়ের নারী-পুরুষের যৌনতা বিষয়ে যতটুকু আগ্রহ দিখিয়েছেন তার এক শতাংশ আগ্রহও দেখান নি তার সামাজিক ও যৌথ জীবনের অন্যান্য অনুষঙ্গে। আবার যতটুকু এনেছেন, সেটাকে এনেছেন ছাড়া ছাড়া ভাবে, খন্ডিত, খর্বিত, সরলীকৃত ও বিকৃত রুপে।

তিন.
গোটা ছবিতে দেখা যায় লালন স¤প্রদায়ের প্রধান শত্রু হলো মোল্লা আর পুরুত মশাইরা আর প্রধান পৃষ্ঠ পোষক হলো জামিদার। অথচ মোল্লা-পুরুতদের পাশাপাশি বাংলার মানুষের ওরাল ন্যারেটিভ বা কথ্য ইতিহাসের মধ্যে জামিদার তন্ত্রের সাথে লালন সম্প্রদায়ের রীতিমত লাঠালাঠির ঘটনার উল্ল্যেখ পাওয়া যায়। অথচ ছবিতে দেখা যায় ঠাকুর বাড়ির জমিদার দয়া পরবশত খাজনা মৌকুফ করে দিচ্ছে, পাবনার জমিদাদের লাঠিয়াল বাহিনী মোল্লা-পুরুতদের আক্রমণ থেকে লালন ও তার শীষ্যদের রক্ষা করছে! মোল্লা-পুরুতদের সাথে সংঘর্ষের দৃশ্য গুলোও ভীষণ খাপছাড়া। যেমন: পাবনার জমিদারের আমন্ত্রণে লালন মোল্লা পুরুতদের সাথে বাহাস করতে যান। সেখানে ভীষণ কাচা ও দুর্বল সংলাপের বাহাসের মধ্যে দিয়ে লালন মোল্লা-পুরুতদের পরাস্ত করলেও দেখা যায় উপস্থিত দর্শক-জনতা কোন এক অজানা কারণে লালনের দলের উপর ইট-পাটকেল ও লাঠিশোঠা নিয়ে আক্রমণ চালায় আর সে আক্রমণ থেকে তাদেরকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করে জামিদারের লাঠিয়াল বাহিনী!

ছবিতে তরুণ লালনকে দেখা যায় লালন হয়ে উঠার আগেই ”আর আমারে মারিস নে মা’র মতো গান গাইতে। তরুণ লালনের মধ্যে জাত-পাত বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠার পেছনে হাজির করা হয় স্রেফ তার নিজের হিন্দু পরিবার কর্তৃক মুসলমানের হাতে খাওয়ার অপরাধে প্রত্যাখ্যাত হবার কার্য-কারণ। পরিবার কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর নিজ গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় গান শোনা যায়:”এ দেশেতে এই সুখ হল/আবার কোথা যাই না জানি”। লালনের আত্মতত্ত্ব মূলক এই গানটির এই ব্যাবহার উপরে উল্ল্যেখিত ”সময় গেলে সাধন হবে না” গানের ব্যাবহারের ধরণের সাথে এক সূত্রে গাথা। জলবসন্তে মরণ প্রায় লালনকে উদ্ধার করেছিলেন মতিজান। কিন্তু আমরা ছবিতে তার নাম দেখি রাবেয়া। বাস্তবে লালন ছেউড়িয়ায় তাতিদের মধ্যেই আখড়া স্থাপন করলেও ছবিতে দেখা যায় তিনি নদীর অপর পাড়ে জঙ্গলের মধ্যে নাচ-গানে ভরপুর আনন্দবাজার স্থাপন করেছেন। লালনের প্রধান সাধন সঙ্গী বিশাখার কোন উল্ল্যেখই নাই ছবিতে তার বদলে জুড়ে বসেছে কলমি। এছাড়া তার অন্যান্য প্রধান শিষ্যদের সাথে লালনের সম্পর্কের ভিত্তি কিংবা ধরণ-ধারণের কোন ছায়াও ছবিটি তে নেই। কালুয়া নামের যে চরিত্রটি লালনকে দোস্ত বলে সম্বোধন করে এবং বিভিন্ন ভাবে পাগলামি করে দর্শকদের বিনোদন দিয়েছে তার ঐতিহাসিক সত্যতা আমাদের জানা নাই। এরকম আরো অসংখ্য খণ্ডায়ণ, খর্বায়ন, বিকৃতি কিংবা সরলিকরণের ছাপ ছবিটিতে রয়েছে যেগুলো উল্ল্যেখ করে আলোচনা দীর্ঘায়িত করার কোন মানে হয়না।

প্রশ্ন উঠতে পারে, ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র কি ইতিহাস যে ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনা চরিত্রকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে নিক্তিতে মেপে উপস্থাপন করতে হবে? আমরা তা দাবী করছিও না, নিশ্চিত ভাবেই ঐতিহাসিক ঘটনা বা চরিত্র বা জীবন দর্শন রূপায়নের প্রয়োজনে নতুন ঘটনা বা চরিত্র আমাদানীর স্বাধীনতা চলিচ্চত্রকারের রয়েছে কিন্তু সেই স্বাধীনতারও একটা সীমা রয়েছে। ইতিহাসের অজানা অচেনা অধ্যায়কে তুলে ধরার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রকারের যে স্বাধীনতা সেটা কিন্তু তার সাথে সম্পর্কিত কোন ঐতিহাসিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত, জানা এমনকি বর্তমান সময়েও চলমান কোন জীবন দর্শন সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে বিকৃত, খন্ডিত বা সরলীকৃত করে হাজির করাকে অনুমোদন করে না। ছক্ষির পরিচালক গৌতম ঘোষ কিংবা বাংলাদেশের প্রযোজনা সংস্থা ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও আর্শিবাদ চলচ্চিত্র এবং ভারতীয় প্রযোজনা সংস্থা রোজ বেলি ফিল্মস কিংবা বাংলাদেশে ছবিটির কর্পোরেট নিবেদক বাংলালিংক এলিট শ্রেণীর কোন মহানায়ক বা জাতীয় বীরকে নিয়ে এ ধরণের স্বেচ্ছাচার করার স্পর্ধা দেখাতো না, লালন নিম্নবর্গের নায়ক কিংবা জাতহীন বলেই, তাকে নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করা যায় কিংবা যা ইচ্ছা করানোও যায়! আর লালনকে নিয়ে এই যা ইচ্ছা তাই করা ও করানো এবং সেটাকে লালনের জীবন দর্শন বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টাকে সাংস্কৃতিক জমিনের উপর চলমান কর্পোরেট, বহুজাতিক ও বিজাতীয় আগ্রাসন ও দখলদ্বারিত্বের নমুনা হিসেবেই দেখতে হবে এবং মোকাবিলা করতে হবে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29303065 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29303065 2011-01-06 23:47:52
বিমান বন্দরের নামে আড়িয়াল বিলে রাষ্ট্রীয় ভূমি আগ্রাসন!
ছবি: ঢাকা-মাওয়া সড়ক অবরোধ-১ , মিজানুর রহমান

বর্তমান আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সক্ষমতার অধিকাংশই অব্যাবহৃত রেখে, কোন ধরণের সম্ভ্যবাতা যাচাই এবং পরিবেশগত সমীক্ষা না করে, জাতীয় পানি নীতি(১৯৯৯) ভঙ্গ করে, জলাভূমির উপর নির্ভরশীল জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতির তোয়াক্কা না করে শাসক গোষ্ঠীর খায়েস হয়েছে আড়িয়ল বিল জলাভূমি বিনষ্ট করে নতুন একটি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর স্থাপন করার। থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি বিমান বন্দরের আদলে বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্দেশ্যে সম্ভ্যবতা যাচাই এবং পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের আগেই মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর ও সিরাজদিখান এবং ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ ও দোহার এলাকার আড়িয়ল বিলের জমি অধিগ্রহণের নির্দেশ দিয়ে দিয়েছে সরকার। এরকম অধিগ্রহনের আদেশের একটি কপি আমাদের হাতে আছে যাতে দেখা যায় গত ১৩ ডিসেম্বর, ২০১০ তারিখে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ১৪ টি মৌজার মোট ১০,৮৯৫.১৩ একর ভূমি অধিগ্রহণের আদেশ জারি করা হয়েছে।


আড়িয়ল বিলের জলাভূমি ও আবাদি জমি অধিগ্রহণের এই তৎপরতার বিরুদ্ধে গত ২৭ ডিসেম্বর ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের প্রায় ১০ কিমি এলাকা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অবরোধ করে রাখে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর এবং ঢাকা জেলার নবাব গঞ্জ ও দোহার এলাকার হাজার হাজার অধিবাসী।


ছবি: ঢাকা-মাওয়া সড়ক অবরোধ-২, মিজানুর রহমান

সরকারের পরিকল্পনা:
প্রথমে ময়মনসিংহের ত্রিশালের কথা শোনা গেলেও , ভূমির প্রাপ্যতার সমস্যা ও ঢাকা থেকে অধিক দূরে হওয়ার কারণে ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জের আড়িয়ল বিল এলাকার ২৫ হাজার একর(১০১.১৭ বর্গ কি.মি.) এর বিশাল এলাকায় বঙ্গবন্ধু নগর ও বঙ্গবন্ধু বিমান বন্দরের এর এই মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে যার মধ্যে ৬ হাজার একর (২৪.২৮ বর্গ কিমি) জুড়ে তৈরী হবে বিমান বন্দর। পুরো প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যেই মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের ১০,৮৯৫ একর, ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জের ৭,০১৭ একর ও দোহারের ৭,১৮৮ একর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে।(সূত্র: ২৯ ডিসেম্বর, ২০১০, ডেইলিস্টার থাইল্যান্ডের সুবর্ণ ভূমি বিমান বন্দরের আদলে ৯ হাজার ফিট দৈর্ঘ্যরে ২ টি রানওয়ে সম্বলিত বিমানবন্দর নির্মানের মাধ্যমে প্রকল্পটি শুরু হবে। সরকারি বেসরকারি অংশীদ্বারিত্ব বা প্রাইভেট পাবলিক পার্টনার শিপের(পিপিপি) মাধ্যমে বিল্ড-ওন-অপারেট-ট্রান্সফার(বিওওটি) এর ভিত্তিতে বিমান বন্দরটি নির্মিত হবে। ৭০০ কোটি ডলার বা ৫০ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটি আগামি ৫ বছরের মধ্যেই শেষ করতে চায় সরকার। এই ব্যায়বহুল বিমান বন্দর প্রকল্পে বিনিয়োগ করার জন্য ইতিমধ্যে অনানুষ্ঠানিক ভাবে সরকারের সাথে যোগাযোগ করেছে ইতালিয়ান-থাই ডেভেলাপমেন্ট কর্পোরেশন, দক্ষিণ আফ্রিকার মুরে এন্ড রবার্টস কর্পোরেশন, পেন্টা ওশান কনস্ট্রাকশন এবং ওবায়াশি কর্পোরেশান এর মতো বহজাতিক সংস্থা। সূত্র: ডেইলিস্টার, ১২ এপ্রিল, ২০১০



ছবি: গুগল আর্থে আড়িয়ল বিল প্রকল্প এলাকা

নতুন বিমান বন্দর কতটুকু প্রয়োজনীয়
নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন সচিব শফিক আলম মেহেদি বলেছেন: ”বিমান চলাচল দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামি ৫/৬ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের একটি নতুন বিমান বন্দর লাগবে।” তিনি আরো বলেছেন:”বিমান বন্দরটি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশের সাথে কার্গো পরিবহন বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের একটি নতুন গেইট ওয়ে দরকার।”(সূত্র: দ্য নিউ নেশন, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১০

বাস্তবতা হলো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ক্ষমতাই অবব্যবহৃত রয়ে গিয়েছে। তাছাড়া ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর ছাড়াও আরো ২ টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে : শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট। অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলের জন্য সৈয়দপুর, রাজশাহী, যশোর, বরিশাল এবং কক্সবাজারে মোট ৫টি বিমানবন্দর রয়েছে। এই বিমানবন্দরগুলোকে আপগ্রেড না করে এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পুরো ক্ষমতা ব্যবহার না করে ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে সম্পূর্ণ নতুন একটি বিমানবন্দর তৈরী করতে যাওয়ার যুক্তি হাস্যকর।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এক রানওয়ে সম্পন্ন্ বিমানবন্দর যেখানে প্রতি ঘন্টায় মাত্র ৬টি বিমান উঠায় নামা করে।
সূত্র: New airport at Trishal: Flight of fancy or urban nightmare? By Rashiduddin Ahmad
অথচ কোন এক রানওয়ের বিমান বন্দরে সাধারণত ৬০টির মতো বিমান চলাচল করতে সক্ষম। হিসেবটি এরকম: একটি বিমান ল্যান্ডিং করার জন্য ৪৫ থেকে ৭০ সেকেন্ড সময় রানওয়েতে থাকে। গড়ে রানওয়েতে থাকার সময় বা রানওয়ে অকুপেন্সি টাইম(আরওটি) ৬০ সেকেন্ড ধরলে ১ ঘন্টায় অর্থাৎ ৩৬০০ সেকেন্ড সময়ে মোট ৩৬০০/৬০ = ৬০ টি বিমান ওঠা নামা করতে পারে।



যদি সাবধানতা হিসেবে ওয়েক ভোরটেক্স সেপারেশান ডিসটেন্স, ইন্টার অ্যারাইভাল সেপারেশান ডিসটেন্স ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে হিসেব করা হয় তাহলে প্রতি ঘন্টায় এক রানওয়ের এক বিমানবন্দরে অন্তত পক্ষে ৩১ টি বিমান উঠা নামা করতে পারে।


এ বিবেচনায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর বর্তমানে তার সর্বোচ্চ ক্ষমতার মাত্র ৫ ভাগের এক ভাগ ব্যাবহার করছে!

এছাড়া সম্প্রতি বিমান বন্দরে ২ লক্ষ বর্গফুট ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি কার্গো ভিলেজ তৈরী করা হয়েছে এবং টার্মিনাল ভবনের ও স¤প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিজেদের ওয়বসাইট অনুসারেই বর্তমান বিমানবন্দরটি আগামী বিশ বছর বা তারও বেশি চাহিদা মেটাতে সক্ষম।



তাহলে কেন সিংগাপুর বা ব্যাংককের খোয়াব দেখিয়ে জলাভূমি ও কৃষিজমি নষ্ট করে, জনগণকে উচ্ছেদ করে নতুন একটি বিমানবন্দরের পরিকল্পনা?

যদি বাড়তি ক্যাপাসিটি তার পরও দরকার হয় তাহলে বর্তমান বিমানবন্দরটি সম্প্রসারণ করে এক রানওয়ের বদলে দুই রানওয়ের বিমান বন্দরে পরিণত করাই তো সবচেয়ে ভালো। না, শাসক শ্রেণী উত্তরা আর নিকুঞ্জ এলাকার অভিজাতদেরকে সমস্যায় ফেলতে বা উচ্ছেদ করতে কোন ভাবেই রাজী নয়। ঠিক আছে অভিজাত আবাসিক এলাকা বাদ দিলাম, বিমান বন্দরের পাশ্ববর্তী ঢাকা ক্যান্টনমেন্টর বিশাল এলাকা থেকে কিছু অংশ অধিগ্রহণ করেও তো বিমান বন্দরের সম্প্রসারণের কাজটি সারা যায়!


জলাভূমিতে বিমানবন্দরের নির্মাণের সমস্যা: থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা
পরিবেশগত দিক ছাড়াও জলাভূমিতে বিমানমন্দর নির্মাণ কারগরি বিবেচনাতেও বিপদজনক ও ব্যায়বহুল। যে থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের আদলে আড়িয়ল বিলে বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে সেই সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা কিন্তু সেরকমই বলে। বিমানবন্দরটি কোবরা সোয়াম্প নামের একটা জলাভূমির উপর ৩৯০ কোটি ডলার খরচ করে তৈরী করা হয়েছিলো। জলাভূমির উপরে অবস্থিত হওয়ার কারণে ২০০৬ সালের সেপ্টম্বরে বিমানবন্দরটি চালু হওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই রানওয়ে যাওয়ার ট্যাক্সিওয়েতে ফাটল দেখা দেয় এবং ফাটলগুলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। একপর্যায়ে পশ্চিম দিকের রানওয়েতে একটি এবং ট্যাক্সিওয়ের ২৫ টি বিভিন্ন স্থানে মোট ১০০ টি পয়েন্টএ ফাটল দেখা দেয়, ৭ টি স্থান দেবে যায়।
(সূত্র:
Click This Link
Click This Link)

সঙ্গত কারণেই আড়িয়ল বিল এলাকায় বিমানবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পানি সম্পদ পরিচালনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলি ম.ইনামূল হক বলেছেন: ”বিলটি প্রতিবছর বন্যায় ১৫-২৫ ফুট পানিতে তলিয়ে যায়। তাই এখানে বিমানবন্দর ও বঙ্গবন্ধু নগরী করতে হলে সমগ্র এলাকা ২০-৩০ ফুট বালু দিয়ে ভরাট করতে হবে। তাছাড়া স্যাটেলাইট ছবিতে এই এলাকার মাটিতে পিট কয়লার স্তর দেখা যায় বিধায় এখানে বিমানবন্দরসহ নির্মিত যেকোন স্থাপনাই দেবে যাওয়ার সার্বক্ষণিক হুমকিতে থাকবে। ল্যান্ডিং বা টেক অব ওয়েট ৪০০ থেকে ৮০০ মেট্রিকটন সম্পন্ন আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী বিমানগুলোর ওঠানামার জন্য পিটকয়লার গভীর স্তরের উপর বিমানবন্দর নির্মাণ ভাবাই যায় না।” (সূত্র: প্রথম আলো, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১০)

জলাভূমি, পরিবেশ ও জাতীয় পানি নীতি
জাতীয় পানি নীতি(১৯৯৯)’র আর্টিক্যাল ৪.১৩ তে বলা হয়েছে: ”হাওড়, বাওড় এবং বিলের মতো জলাভূমি তাদের বিশেষ আঞ্চলিক বৈশিষ্টের কারণে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ছাড়াও অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত বিবেচনায় এগুলোর মূল্য অনেক।... অতীতে প্রকৌশলগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অনেক বিলকে শুকিয়ে ফেলা হয়েছে... পরিবেশের উপর এর ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ। এলাকার দরিদ্র জনগণের প্রয়োজনীয় মাছ এবং জলজ সবজির উৎস ধবংস হয়ে গিয়েছে... এই কারণে সরকার নিম্নলিখিত নীতিমালা গ্রহণ করেছে: ক) বিল, হাওড় এবং বাওড়ের মতো জলাভূমিগুলোকে পানি নিষ্কাশন এবং জলজ পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সংরক্ষণ করা হবে। খ) শুধু মাত্র সেসব প্রকল্পই বাস্তবায়ন করা হবে যেগুলো এ সমস্ত জলাভূমির জলজ বৈশিষ্টের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না । গ) এই সব জলাভূমির মৎস উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সমন্বিত প্রকল্প হাতে নেয়া হবে।...."

১৯৯৯ সালে এই পানি নীতি চূড়ান্ত করার সময় এর ভূমিকায় তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন:”এই ধরণের নীতিমালার অভাবে ইতোমধ্যেদেশের জীব বৈচিত্র এবং পরিবেশের ব্যাপক্ষ ক্ষতি হয়েগিয়েছে।” (সূত্র: জাতীয় পানি নীতি, ১৯৯৯

অথচ এখন সেই পানি নীতি ভঙ্গ করেই আড়িয়াল বিলের মতো বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি বিল ধবংসের প্রকল্প হাতে নিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার!

সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশ গত ক্ষতি
আড়িয়ল বিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তিনটি জলাভূমির একটি। এখানে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর মাছ এবং আমন ধানের চাষ হয়। শুকনো মৌসুমে রবি শস্য ও বোরো ধান ফলে। এ বিলকে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ কৃষক, জেলে ও দিনমজুরের জীবিকা নির্বাহ হয়। ফলে পরিবেশ গত বিবেচনা ছাড়াও অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবেও এই বঙ্গবন্ধু বিমান বন্দর ও বঙ্গবন্ধু নগরী স্থানীয় জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। তাই সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্থ জনগণ তাদের সম্ভাব্য ক্ষতির একটা হিসেব লিফলেট আকারে প্রকাশ করেছে যেখানে তারা দেখিয়েছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় ১০ লক্ষ ও বহিরাগত ১ লক্ষ মানুষের জীবিকা ধবংস হবে এবং বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১০ লক্ষ টন ধান ও ১০ কোটি টাকার মাছ থেকে বঞ্চিত হবে যা জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের এই কালে গোটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকীতে ফেলে দেবে।


কাজেই আমরা পরিবেশ, কৃষি, মানুষের জীবন ধ্বংসকারী, মাত্রাছাড়া ব্যায়বহুল, অপ্রয়োজনীয় ও স্রেফ শাসকের খায়েশ মেটানোর এই বঙ্গবন্ধু বিমান বন্দর ও বঙ্গবন্ধু নগর তৈরীর এই প্রকল্প বাতিল করার দাবী জানাচ্ছি এবং এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী স্থানীয় জনসাধারণের সাথে একাত্মতা পোষণ করছি।

কৃতজ্ঞতা: আড়িয়ল বিল এলাকাবাসীর সাথে যোগাযোগ করে তাদের বক্তব্য, লিফলেট সংগ্রহ করা এবং আন্দোলন সংগ্রামের ছবি তুলেছেন আমাদের ডেমরার বন্ধু মিজানুর রহমান।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29299697 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/29299697 2010-12-31 22:32:59