somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অসামরিক পারমাণবিক চুক্তি এবং বিশ্বরাজনীতি এক
সেদিন বিপ্লব পাল নামে এক ভদ্রলোকের একটি প্রবন্ধে দেখলাম প্রাবন্ধিক ঘোষণা দিয়েছেনঃ "অসামিরক ভারত-আমেরিকা নিউক্লিয়ার চুক্তির অন্ধ বিরোধিতা একধরেনর রাজৈনিতক আত্মহত্যা"। ভারতের বামপন্থীরা এই চুক্তির বিরোধিতা করায় তিনি মহাখাপ্পা, জানাচ্ছেন- বামপন্থীদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বুদ্ধি শুণ্যের কিছু নীচে। বিষয়টিতে তাই কিছু বলার তাগিদ বোধ করছি....

ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সিভিলিয়ান নিউক্লিয়ার ডিলকে আসলে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে না দেখলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে না। যুক্তরাষ্ট্র কেন ভারতের সাথে উত্তরোত্তর সামরিক মিত্রতা বাড়াতে চায়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কি, ভারত কেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এত ঘনিষ্ঠ হতে চায়- ভারতের স্বার্থ কি, এসমস্ত ভালো ভাবে বুঝা দরকার।

মধ্যপ্রাচ্যে যেমন ইসরায়েল- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তেমনি ভারতের অবস্থান হতে যাচ্ছে কি-না এটা আজ বড় প্রশ্ন। তবে এশিয়ার এ অংশকে নিয়ন্ত্রণ, সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ায় দ্রত আধিপত্যশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাওয়া চীন, মাওদের নেপাল- এমনকি তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ন্ত্রণ সবদিক থেকেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত বন্ধু হোক- এটাই পেন্টাগন-হোয়াইট হাউস চেয়েছে।

২০০২ সালে "Indo-US Military Relations: Expectations and Perceptions" শিরোনামে পেন্টাগন কর্তৃক প্রকাশিত এক পেপারে আমরা সেরকম এক আশাবাদই দেখিঃ
"The Indians will laud the relationship as a success if they obtain the technology that they want from the United States. We [the US military] will view the relationship as a success if we are able to build a constructive military cooperation programme that enables us to jointly operate with the Indians in the future."

মান্থলি রিভিউ পত্রিকায় তাই এই চুক্তিকে এভাবেই দেখেছে:
"This deal is a part of an ongoing project to absorb India into the U.S. imperial sphere of influence as a "strategic" junior partner".
আর, Carnegie Endowment for International Peace এর নিউক্লিয়ার নন-পলিফারেশন প্রজেক্টের প্রধান Joseph Cirincione এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী:
"The crux of the announcement [of the initial U.S.-Indian nuclear negotiations] is what it tells us of the U.S. grand strategy, and that behind whatever else is going on here the U.S. is preparing for a grand conflict with China and constructing an anti-China coalition. . . . In that scenario, India is even more valuable as a nuclear power, rather than as a non-nuclear country" (The Christian Science Monitor, July 20, 2005).

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ মহড়া এখন ডালভাত হয়ে গেছে। গতবছরের শেষের দিকে ভারতের চেন্নাই পোর্টে পারমাণবিক যুদ্ধবিমান Nimitz এর অবতরণকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা হলেও আসলে তা নয়। কেননা তারপরেই আমরা বঙ্গোপসাগরে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ নৌ-মহড়াও দেখতে পাই। এসমস্ত ঘটনাকে মিলিয়ে দেখার আহবান জানাই। সেই সাথে আরেকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করবো, সেটা হচ্ছে- ভারত কিন্তু Non-Proliferation চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি (পাকিস্তান ও ইসরায়েলও করেনি)।
ভারতের স্বার্থ কি? বড় মোড়লের সাথে থাকলে ছোট মোড়লদের শক্তি-সাহস সবসময়ই কিছুটা বৃদ্ধি পায় বৈকি। ভারত আজ একটি সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। এশিয়ায়- বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় এ মুহুর্তে তার প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, এই চীন আবার স্ট্রাটেজিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রেরও অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিত্রতা ভারতকে এই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক প্রতিপত্তি বাড়াতে সহায়তা করবে বলেই ভারত মনে করে।

সেই সাথে এটিও দেখার বিষয় যে, যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু এই ডিলটিতে তার নিজস্ব অবস্থান ঠিকই ধরে রেখেছে- মানে ভারতের সাথে যে মিত্রতা গড়ে তুলছে- সেটা যে দুই সম পর্যায়ের বন্ধুর মিত্রতা নয়- তা এই চুক্তির ধারাগুলোতেই পরিষ্কার। অর্থাৎ এই চুক্তির মাধ্যমে ভারতকে সাথে নিয়ে অন্যদের মোকাবেলাও যেমন তার জন্য সহজ হলো- তেমনি এই চুক্তি ভারতকেও নিয়ন্ত্রণের পথ খুলে দিল। তার মানে আসলে যুক্তরাষ্ট্র এর মধ্য দিয়ে এক ঢিলে বেশ কয়টি পাখি মারলো। চুক্তির বিভিন্ন ধারায় আছে: নিউক্লিয়ার জ্বালানি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই কিনতে পারবে ভারত, কোন কারণে যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানী সরবরাহে ব্যর্থ হলে অন্য দেশ (ইউকে, রাশিয়া ও ফ্রান্স) থেকে কেনার জন্য বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে; এমনকি যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যেকোন সময়ে জ্বালানী সরবরাহ বন্ধ করতে এবং আগের সরবরাহকৃত জ্বালানী ফিরিয়ে নিতে পারবে। এই অংশটুকুই ভারতের উপর যুক্তরাষ্ট্রের খবরদারি চালানোর নিশ্চয়তা দেয়। মান্থলি রিভিউ এভাবে বিষয়টিকে তুলে ধরেছে:
"Let us be clear then as to what this agreement entails: the U.S. openly gains the power to threaten to deny ongoing fuel supplies (and even the forcible removal of supplies previously given) in order to control future Indian policy. Is this a remote speculation? We must recall that in the 1970s the U.S. unilaterally cut off all fuel supply to Tarapur, in material violation of the previous "123" agreement between the U.S. and India of 1963. "
.........
"It is an unequal colonial treaty that openly subjects a potentially significant share of India's energy generating potential to future U.S. blackmail"


৩ আগস্ট, ২০০৭ এ "ভারত-যুক্তরাষ্ট্র নিউক্লিয়ার সমঝোতা" নামে সমঝোতা পত্র প্রকাশিত হয়। তখন থেকে ভারতীয় মিডিয়া এটিকে বেসামরিক নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি "বাণিজ্য", "সরবরাহ" বা "প্রবাহ" এসব হিসাবে দেখিয়ে এর পক্ষে জনমত প্রতিষ্ঠায় রত। বাকি ছিল মার্কিন কংগ্রেসে এটি পাশ হওয়ার। তাও এ বছরে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সিনেটে এটি ৮৬-১৩ ভোটে পাশ হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, পক্ষে ভোট দিয়েছেন যেমন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ম্যাককেইন, রিচার্ড লুগার; তৎকালীন ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী (বর্তমানে প্রেসিডেন্ট) বারাক ওবামা, তার রানিং মেট জো বিডেন সকলেই পক্ষে ভোট প্রদান করেন। অবশেষে গত সেপ্টম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ ও ভারতীয় লবির তীব্র প্রচারণায়- Nuclear Supplier Group (NSG) ভারতকে বিশেষ "ছাড়" দিতে রাজী হয়, (১৯৭৪ সালে পারমাণবিক এক্সপ্লোশন ঘটানোর জন্য ভারতের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এই NSG নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি-জ্বালানী সরবরাহ ও বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল)- এই ছাড়ের ফলে ভারত NSG দেশ সমূহের সাথে নিউক্লিয়ার বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে।

ভারতীয় বুর্জোয়া মিডিয়া বা বিপ্লব পালেরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুক্তিকেই সামনে আনছে; জানানো হচ্ছে যে, ভারতের ২২ টি নিউক্লিয়ার পাওয়ার স্টেশন তার তার ক্যাপাসিটির ৪০% এ চলছে এবং এগুলো প্রকটভাবেই ইউরেনিয়াম সংকটে ভুগছে। এসব ঠিক আছে- ইউরেনিয়াম পেলে, নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছু বাড়বে ঠিকই- সাথে এটাও ঠিক যে- এই ইউরেনিয়াম ও নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি ভারতের নিউক্লিয়ার পাওয়ারকে আরো শক্তিশালী করবে।

এই বিষয়টি বিপ্লব পালেরা না বুঝলে (বা বুঝতে না চাইলে) কি হবে, এশিয়ার অন্য দেশসমূহ ঠিকই বুঝতে পারছে। বিশ্লেষকগণ মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের এই সামরিক ঘনিষ্ঠতা এশিয়ায় সামরিক প্রতিদ্দবন্দ্বিতাকেই বৃদ্ধি করবে এবং এশিয়াকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।

চীন প্রথম থেকেই এর বিরোধিতা করে এসেছে। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বরে যখন ডিলটি NSG এর সামনে এলো- তখন চীন এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। এক পর্যায়ে ভারত-চীন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, কিন্তু এ মুহুর্তে অতিমাত্রায় ভারত বিরোধিতা ভারতকে আরো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ করতে পারে এ বিবেচনায় শেষ অবধি চীন পিছু হটে। তার মানে এই নয় যে, সে থেমে আছে। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সাফ্রোন-বিপ্লব ও বিশ্বরাজনীতি লেখাটিতে চীনের কিছু উদ্যোগের কথা লিখেছি (যারা পড়েননি আশা করি পড়বেন)।

ওদিকে ভারত-প্রতিবেশী পাকিস্তান শুরু থেকে এই চুক্তির বিরোধিতা করে এসেছে। পাকিস্তান বারবার জানিয়েছে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের এই নিউক্লিয়ার ডিল উপমহাদেশে শক্তির ভারসাম্য ক্ষুণ্ণ করবে এবং এটা এ অঞ্চলে সামরিক/অস্ত্র প্রতিযোগিতাকেই তীব্র করবে। অবশেষে যখন এই চুক্তিকে ঠেকানো গেলো না তখন পাকিস্তানের অন্য সুর দেখা গেলোঃ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা জিলানী ঘোষণা করলেন,
"Now Pakistan also has the right to demand a civilian nuclear agreement with America. We want there to be no discrimination. Pakistan will also strive for a nuclear deal and we think they will have to accommodate us."

ইরানের Atomic Energy Organization এর উপপ্রধান Mohammad Seedi তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই double standards নিউক্লিয়ার পলিফারেশন কার্যক্রমকেই (NPT) ভণ্ডুল করবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে নতুন করে সংকট তৈরী করবে। এই ইরানের প্রতি পারমাণবিক কার্যক্রমের অভিযোগ তুলে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র; আর সেই যুক্তরাষ্ট্র অনায়াসে যখন ভারতের সাথে এহেন নিউক্লিয়ার এগ্রিমেন্ট করে- তখন দুনিয়াব্যাপী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মোড়লিপনার বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়। আর তাই বিপ্লব পালেরা যাই বলুক না কেন- দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মানুষদের জন্য ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের এই সিভিলিয়ান নিউক্লিয়ার এগ্রিমেন্টের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।

দুই : প্রশ্নোত্তর পর্ব
১। আপনি বলেছেন যে, "নিউক্লিয়ার জ্বালানি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই কিনতে পারবে ভারত, কোন কারণে যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানী সরবরাহে ব্যর্থ হলে অন্য দেশ (ইউকে, রাশিয়া ও ফ্রান্স) থেকে কেনার জন্য বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে; এমনকি যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যেকোন সময়ে জ্বালানী সরবরাহ বন্ধ করতে এবং আগের সরবরাহকৃত জ্বালানী ফিরিয়ে নিতে পারবে।" প্রথমে আপনি এর সূত্র দিন। চুক্তি অনুসারে ভারতও জ্বালানী কেনা বন্ধ করতে পারে বা আমেরিকাও পাঠানো বন্ধ করতে পারে - এক বছরের নোটিশে - এ ছাড়া চুক্তির আর কিছু এই বক্তব্যের সাথে মেলে না।

এই এগ্রিমেন্টের ১৪ নং আর্টিকেল (TERMINATION AND CESSATION OF COOPERATION) এর ১ নং ধারায় আছে "Either Party shall have the right to terminate this Agreement prior to its expiration on one year's written notice to the other Party". অর্থাৎ "চুক্তি অনুসারে ভারতও জ্বালানী কেনা বন্ধ করতে পারে বা আমেরিকাও পাঠানো বন্ধ করতে পারে"। কিন্তু বুঝতে হবে, ভারতের জ্বালানী-প্রযুক্তি কেনা বন্ধ করা আর যুক্তরাষ্ট্রের বিক্রয় বন্ধ করা এক বিষয় নয়; যেহেতু জ্বালানী কিনছে ভারত- সুতরাং ভারতই জ্বালানীর জন্য নির্ভরশীল। যাহোক- এগ্রিমেন্ট টার্মিনেশের জন্য দেয়া নোটিশের মেয়াদকাল যেহেতু একবছর- সেহেতু এক বছর পরে টার্মিনেশের এখতিয়ার উভয়ের হাতেই রাখা হয়েছে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই একবছর শেষ হওয়ার আগেই যদি যন্ত্রপাতি ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার দেয়া হয়, তবে এক বছর নোটিশের কি কোন মূল্য থাকে?

আমি জানিয়েছিলাম: "এমনকি যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যেকোন সময়ে জ্বালানী সরবরাহ বন্ধ করতে এবং আগের সরবরাহকৃত জ্বালানী ফিরিয়ে নিতে পারবে"। এটার সূত্র আপনারা এগ্রিমেন্টটির একই (১৪ নং) আর্টিকেলের ৪ নং ধারাটি দেখতে পারেনঃ
Following the cessation of cooperation under this Agreement, either Party shall have the right to require the return by the other Party of any nuclear material, equipment, non-nuclear material or components transferred under this Agreement and any special fissionable material produced through their use. A notice by a Party that is invoking the right of return shall be delivered to the other Party on or before the date of termination of this Agreement. --------

এখানে on or before অংশটুকু দেখুন। একবছরের নোটিশ অনুযায়ী এগ্রিমেন্টের মেয়াদ শেষে অথবা তার আগেই এরকম 'রিটার্ণ' এর অধিকার দেয়া হয়েছে। বলতে পারেন, এই অধিকার উভয় পার্টির (দেশের) জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু সেক্ষেত্রে আবার বলতে হবে, নিউক্লিয়ার ম্যাটেরিয়াল- ইকুয়েপমেন্ট- টেকনোলজি এসব আসলে ভারতে সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র; ভারত যুক্তরাষ্ট্রে করবে না। ফলে- এই অংশটুকু ভারতকে চাপে (ব্ল্যাকমেইল করার জন্য!!) রাখার জন্য যথেস্ট।
এছাড়া আমি এটাও বলেছিলাম: "নিউক্লিয়ার জ্বালানি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই কিনতে পারবে ভারত, কোন কারণে যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানী সরবরাহে ব্যর্থ হলে অন্য দেশ (ইউকে, রাশিয়া ও ফ্রান্স) থেকে কেনার জন্য বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে"।

এটির তথ্যসূত্রও আপনারা এগ্রিমেন্টেই পাবেন। আর্টিকেল ৫ (TRANSFER OF NUCLEAR MATERIAL, NON-NUCLEAR MATERIAL, EQUIPMENT, COMPONENTS AND RELATED TECHNOLOGY) এর ৬ নং ধারার খ (৪) নং উপধারায় আছে:
If despite these arrangements, a disruption of fuel supplies to India occurs, the United States and India would jointly convene a group of friendly supplier countries to include countries such as Russia, France and the United Kingdom to pursue such measures as would restore fuel supply to India.

আপনাকে এই অংশটুকুর দিকে দৃষ্টি দিতে বলবো: a disruption of fuel supplies to India occurs। এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী ভারতে একমাত্র জ্বালানী-সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র। ফলে, ভারতে এই disruption of fuel supplies একমাত্র যুক্তারষ্ট্রের কারণেই ঘটতে পারে। আর তখন কি করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত যৌথভাবে বন্ধুপ্রতিম সরবরাহকারী রাষ্ট্রসমূহের (রাশিয়া, ফ্রান্স, ইউকে) সাথে বৈঠক আয়োজন করবে!
আশা করি, আমার বক্তব্যের তথ্যসূত্র পেয়েছেন।

২। চীনের অন্তত এই বিষয়ে আপত্তি জানানোর কিছু নেই, কারণ চীনের সাথে আমেরিকার একইরকম |সিভিল-নিউক্লিয়ার চুক্তি আছে।

এ আলোচনার উদ্দেশ্য পরিষ্কার হলো না। বিষয়টি কি এমন যে, "বাবা তুমি নিজে খাইতে পারো- অন্যে খাইতে চাইলে তাতে কেন বাগড়া দেও? নিজে খাইয়া-দাইয়া আরেকজনের খাওনে বাঁধা দেওন কি নৈতিক?"
দেখুন, এখানে চীনের বাঁধা দেয়ার নৈতিক অধিকার আছে কি না সে নিয়ে আমি মোটেও আলোচনা করছি না। বাস্তবতা হচ্ছে- চীন এই চুক্তির বিরোধিতা করেছে- করছে। সেটা করছে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া বা এশিয়ায় তথা দুনিয়ায় ভূরাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন ও বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে, একে অপরের উপর আধিপত্য বিস্তারের লক্ষে। এই কামড়া-কামড়ি তুলে ধরাই তো উদ্দেশ্য ছিল। আর যে কারণে পোস্ট লিখেছি সেটি তো আগেও বলেছি, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের এই এগ্রিমেন্টকে অনেকে নিছক বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জায়গা থেকে দেখাচ্ছেন। সেটা যে মস্ত ফাঁকি ও প্রতারণা- তা চীন ও অন্য দেশসমূহের কার্যক্রমেই পরিষ্কার। চীন নিজে যেহেতু এই চুক্তি আগে করেছে- ফলে সে জানে, এটা ভারতের সাথে হলে তার ফল কি হবে?

আরেকটি বিষয়, চীনের সাথেকার চুক্তিটির সাথে মিলিয়ে দেখলে বুঝা যাবে যে, ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিটিতে ভারতকে জিম্মি বানানোর সুযোগ রয়েছে। যেমনঃ
চীন-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির ২ নং আর্টিকেলের (SCOPE OF COOPERATION ) ১ নং ধারায় আছে:
The parties shall cooperate in the use of nuclear energy for peaceful purposes in accordance with the provisions of this agreement. Each party shall implement this agreement in accordance with its respective applicable treaties, national laws, regulations and license requirements concerning the use of nuclear energy for peaceful purposes. The parties recognize, with respect to the observance of this agreement, the principle of international law that provides that a party may not invoke the provisions of its internal law as justification for its failure to perform a treaty.

আপনারা যদি এই ধারার সাথে ইন্দো-যুক্তরাষ্ট্র এগ্রিমেন্টের ২ নং আর্টিকেল (SCOPE OF COOPERATION) এর ১ নং ধারা মিলিয়ে দেখেন- তবে প্রথমেই যেটি দেখবেন সেটি হলো ভারতের সাথেকার চুক্তিটিতে "The parties recognize, with respect to the observance of this agreement, the principle of international law that provides that a party may not invoke the provisions of its internal law as justification for its failure to perform a treaty" অংশটুকু নেই। এই আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সংগতি থাকার বিষয়টি না থাকায় ভারতের উপর ছড়ি ঘোরানোর বড় ধরণের মওকা লাভ করলো যুক্তরাষ্ট্র। কেননা- national laws, regulations and license এসব নিজের সুবিধামত যেকোন সময় পাল্টিয়ে এগ্রিমেন্ট থেকে সরে আসার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের থাকলো (ভারতেরও আছে- কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না)। এবং যুক্তরাষ্ট্র এরকম কাজ আগেও করেছে। ফলে- এই চুক্তিটি অবশ্যই হয়েছে একতরফা, চীনের এগ্রিমেন্টকে তাই সেরকম একতরফা বলতে পারবেন না- এবং এ কারণেই এখন পর্যন্ত চীনকে যুক্তরাষ্ট্র তার অনুগত বানাতে পারেনি।

৩। আমার তো মনে হয় সবথেকে বড় দুমুখো নীতি হল NPT আর CTBT. উভয়েই কিছু দেশকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার বলে স্বীকৃতি দিয়ে দেয় আর বাকিদের দেয় না। কি কারণে? কোনো কারণ নেই। যদি কোনো নীতি বানাতেই হয়, তাহলে আগে এই দুটো চুক্তি বাতিল করে গ্লোবাল নিউক্লিয়ার ডিস-আর্মামেন্ট এর সূচনা করা হোক। অস্ত্র-প্রতিযোগিতা বন্ধে এটাই একমাত্র পদক্ষেপ হতে পারে।

NPT আর CTBT যে অস্ত্র/সামরিক প্রতিযোগিতা বা যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে না, পারবে না সেটা আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য। যেমন করে সবাই জানে যে, জাতিসংঘের পক্ষে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তারপরেও এগুলোকে সামনে আনা হয় একারণে যে, এগুলো দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী মোড়লদের দুই নম্বরী খুব সহজে সকলের সামনে তুলে ধরা যায়। ভূয়া পারমাণবিক অস্ত্র/জীবাণু অস্ত্রের অভিযোগ তুলে ইরাককে ধ্বংস করা হয়- ইরানকে ক্রমাগত যুদ্ধের হুমকি দেয়া হয়; আর উল্টোদিকে NPT ও CTBT তে স্বাক্ষর না করা- NPT ও CTBT এর শর্তবিরোধী পারমানবিক পরীক্ষণ চালানো ভারতের সাথে যে পারমাণবিক আদান-প্রদান চুক্তি করা হয়; তা বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের চুড়ান্তরকমের ভণ্ডামি- সেটিই আমাদের সামনে পরিষ্কার করে দেয়।
আপনারা যে গ্লোবাল ডিস-আর্মামেন্ট এর কথা বললেন, সেটিও তো একরকমের ভণ্ডামি। এই কথার ধোয়া তুলেই তো NPT ও CTBT, PTBT, ABM----- ইত্যাদি নানাবিধ ভূমিকা নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রই এসবে অগ্রগামী ভূমিকা নিয়েছে- যেনবা যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কত আন্তরিক- কত দরদী!!

বুঝতে কারোরই কোন সমস্যা হয় না যে, ইতোমধ্যে নিউক্লিয়ার পাওয়ারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের অন্যদের সাথে নিয়ে নতুন পারমাণবিক পরীক্ষণ না করলে, কিছু অস্ত্র ধ্বংস করলে বরং যুক্তরাষ্ট্রেরই অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকাটাই নিশ্চিত হয়। NPT এর প্রধান তিনটি শর্ত বা ধারা হচ্ছে:
১) nonproliferation,
২) disarmament,
৩) the right to peacefully use nuclear technology।


বোঝাই যায় ৩ নং টি পুরোটাই ধাপ্পাবাজি। একই ভাবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের নিউক্লিয়ার এগ্রিমেন্ট প্রভৃতিতে শান্তিপূর্ণ, শান্তি, সিভিলিয়ান প্রভৃতি শব্দগুলো ধাপ্পাবাজি ছাড়া কিছুই নয়। যাহোক যেটা বলছিলাম, এসমস্ত চুক্তি- disarmament সবই দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষের সাথে নিয়ত ব্যঙ্গ করেই যাচ্ছে (অনেকটা এমনঃ কোন এক গ্রামে এক মোড়লের গোটা পঞ্চাশেক যাঁতাকল ছিল- যেটির ভয় দেখিয়ে সে গ্রামের লোকের উপর ছড়ি ঘোরাতো। তো আরো কিছু ছোট মোড়লের আবির্ভাব ঘটলো- এবং ছোট মোড়লদের কারো ২টা, কারো ৫ টা যাঁতাকল তৈরী করলো; এখন বড় মোড়ল বড় দরদ দেখিয়ে ঘোষণা করলো- আসুন সবাই মিলে চুক্তি করি- আর কোন নতুন যাঁতাকল তৈরী করা হবে না এবং সবাই নিজেদের অন্তত ৫ টি করে যাঁতাকল ধ্বংস করে ফেলি--- ইত্যাদি)।

নোবেল জয়ী নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টার এর নোবেল বক্তৃতা থেকে তাই বলি:
মার্কিন ঘোষিত নীতিরই এখন সর্বাঙ্গীন আধিপত্য। এই নাম আমি দিই-নি, তারাই দিয়েছে। 'সর্বাঙ্গীন আধিপত্য' মানে ভূমি, সমুদ্র, বাতাস, মহাশূণ্য এবং আর সব সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ। ১৩২ টি দেশে ৭০২টি সামরিক স্থাপনা আমেরিকার অধিকৃত।
আমেরিকার কাছে আছে ৮০০০ সক্রিয় এবং ক্ষেপনযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্র। এর মধ্যে ২০০০টি আছে 'হেয়ার ট্রিগার এলার্ট' এ। বিপদসংকেতের ১৫ মিনিটের মধ্যেই নিক্ষেপ করা যাবে এদের। আরো উন্নত পারমাণবিক ব্যবস্থা তৈরি করছে তারা যা বঙ্কার বাস্টার্স হিসেবে পরিচিত। কার দিকে তাক করে আছে তারা? ওসামা বিন লাদেন? আপনি? আমি? জো ডকস? চীন? প্যারিস? কে জানে? আমরা জানি এই শিশুসুলভ পাগলামি- পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার এবং সংরক্ষণ হলো বর্তমান মার্কিন রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে।


অস্ত্র ধ্বংস হোক, যুদ্ধ বন্ধ হোক- এটা সমস্ত শান্তিকামী মানুষেরই চাওয়া। কিভাবে হবে? অস্ত্রবাজদের দেখানো নিউক্লিয়ার ডিস-আর্মামেন্ট কর্মসূচীর মাধ্যমে? কোনদিনই সম্ভব নয়?

একমাত্র উপায় ও পদক্ষেপ হচ্ছে: দুনিয়াব্যাপী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলা। প্রয়োজন আরেকটি যুদ্ধ, মুক্তিকামী মানুষের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যুদ্ধ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/28875721 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/28875721 2008-11-29 12:01:49
মুক্তমনার অভিজিৎ ও বিপ্লব পাল- বিজ্ঞান, বিবর্তনবাদ, ল্যামার্ক, লাইসেঙ্কো, নভেম্বর বিপ্লব, সমাজতন্ত্র, কেরোনস্কি, প্রতি বিপ্লব, পুঁজিতন্ত্র, ঠিকাদারতন্ত্র.... ইত্যাদি (১)
আবার, অভিজিৎ বাবুর সাথে কদিন বেশ কথাবার্তা হলো। এর আগে মার্কসবাদ কি বিজ্ঞান নামের পোস্টখানিতে অনেক কথাবার্তা হয়েছিল। সামহোয়ারেও কিছু কথাবার্তা (এক দুই ) তুলে দিয়েছিলাম। সচলায়তন সে আলোচনা বন্ধ করে দেয়ায়, তেমন এগুনো হয়নি- যদিও ঐ বিষয়টিতে আরো কিছু কথা বলার আগ্রহ আছে।

এবারে নতুন করে- আরেকটি বিষয়ে তার সাথে আলাপ-সালাপ হলো। অভিজিৎ বাবুর পোস্টের শিরোনামঃ লাইসেঙ্কোইজম। আসলে এই লাইসেঙ্কো বা লাইসেঙ্কোইজম নিয়ে আগের সেই পোস্টে (মার্কসবাদ কি বিজ্ঞান) অভিজিৎ কিছু কথা বলেছিলেন- সেটার প্রতিক্রিয়ায় এক ব্যক্তি কিছু কথা লিখে মুক্তমনায় পাঠান- আর যায় কোথায়? সেই ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় তিনি আলোচ্য পোস্টখানি লিখে ফেলেন।

তো লাইসেঙ্কো নিয়ে আমাদের কোন আদিখ্যেতা ছিল না- এবং সেই ব্যক্তির আলোচনার সাথেও যথেস্ট দ্বিমত পোষণ করি। কিন্তু অভিজিৎ যে ভাবে যে ভাষায় সেই লেখাটির প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন এবং তা করতে গিয়ে আরেকবার মার্কসবাদ ও মার্কসবাদীদের একচোট নেয়ার চেষ্টা করলেন- সবই বেশ মজার। কাজে কাজেই অভিজিতের সাথে কথা বলতে গেলাম।

অনেক আলোচনা হয়েছে- সব এখানে কপি পেস্ট করতে ইচ্ছা করছে না। উৎসাহী পাঠকদের জন্য লিংক দিচ্ছি- গিয়ে একটু পড়ে আসবেন, পারলে আমাদের আলোচনার মধ্যে একটু নাক ঢুকিয়ে আসবেন। লিংকঃ http://www.sachalayatan.com/avijit/19514

(২)
মুক্তমনার আরেক দিকপাল, অভিজিৎ বাবুর বিশ্বস্ত সঙ্গী বিপ্লব পালের কিছু কথা আগে চোখে পড়েছিল, কিন্তু- মুক্তমনা আগে ব্লগ সাইট ছিল না বলে- বিপ্লব পালের সাথে ঠিক গল্প করা হয়ে ওঠেনি। কিছুদিন আগে মুক্তমনা ব্লগ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার পরে- লেখায় কমেন্ট দেয়ার অপশন তৈরী হলো; এবং যথারীতি বিপ্লব পাল মহোদয়ের একটি উপাদেয় পোস্ট পেলাম। শিরোনামঃ নভেম্বর বিপ্লব না প্রতি-বিপ্লব? সুতরাং বিপ্লব পাল মহোদয়ের সাথেও আলাপ-সালাপ শুরু করলাম।

কেরনাস্কি হচ্ছেন মহান সমাজতন্ত্রী এবং লেনিন প্রতি বিপ্লবী!

বিপ্লব পাল পুঁজিবাদের সংকট নিয়েও যে লিখেন সেটা প্রমাণ করতে তিনি তার দুটো লেখার লিংক দিয়েছেন। ঐ লিংকের লেখা দুটো আরো বেশী উপাদেয়। একটির শিরোনাম “রোমান্টিক সামজতান্ত্রিক বনাম সুবিধাবাদি ধনতান্ত্রিক” এবং অপরটির শিরোনাম “ঠিকাদারতন্ত্র”

তো, পরের লেখা দুটোতে কমেন্ট করার কোন স্কোপ নেই- তাই ভাবলাম, আলোচ্য পোস্টেই (নভেম্বর বিপ্লব না প্রতি-বিপ্লব?) সে বিষয়গুলো নিয়েও গপ-শপ করি। কিন্তু এখন পর্যন্ত মুক্তমনায় সে আলাপ ছাড়পত্র পায়নি। ছাড়পত্রের জন্য এখনো অপেক্ষা করছি। বুঝতে পারছি না ছাড়পত্র পাবে কিনা। যাহোক- সেটুকু এখানে আপনাদের উদ্দেশ্যে উল্লেখ করছিঃ
------------------------>>>
বিপ্লব পাল মহাশয়ের দেয়া লিংক থেকে “রোমান্টিক সামজতান্ত্রিক বনাম সুবিধাবাদি ধনতান্ত্রিক” (Click This Link) এবং “ঠিকাদারতন্ত্র” (Click This Link) লেখা দুটো পড়লাম। লিংক দেয়ার আগে আমাদের তিনি লেখাদুটোর সম্পর্কে জানিয়েছেন: “ধণতন্ত্রের সংকট নিয়ে আমার লেখা”

অর্থাৎ, সে লেখা দুটো নাকি ধনতন্ত্রের সংকট নিয়ে লেখা। পাঠককূলকে ধনতন্ত্রের সংকট (!) নিয়ে বিপ্লব পালের লেখা দুটো পড়ার আহবান জানাই, আশা করি তাহলেই বুঝতে পারবেন বিপ্লব পাল ধনতন্ত্রের সংকট মানে কি বুঝেন, কেমনে বুঝেন?

তার মতে আজেকর পুঁজিবাদী সংকট কিছু সেন্ট্রাল পরিকল্পনার অভাবেই সৃষ্ট!! তার মতে- “….বাড়ির দাম হলো আকাশ ছাঁয়া-অথচ ৫৫% লাকের বাড়ীর মর্টেজ পে করার সামথ নই। ফলে কান সেন্ট্রাল প্লানিং এর অভাবে-আজ আমেরিকার ২০% লোক বাড়ি এবং সব খোয়াতে চলেছে। একটু-সামান্য একটু সেন্ট্রাল প্লানিং করলেই এটা আটকানো যেত।”

"……..৮০% টলিকমের লোক চাকরি হারায়। সেটাও ঠিক আছে-কি কোটি কোটি বৃদ্ধ লোকের শেষ সম্বল নিঃস হয়। আমার এক কলিগকে ৭৫ বয়সেও ক্যান্সার নিয়ে কাজ করতে দেখে দুঃখ হত। লোকটি হাভাডের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি। পেনশনের সবটাকা শেয়ার মার্কেটের জলে। হাভাডের পিএইচডির যদি এই অবস্থা হয়-ঊলূ খাগড়াদের কি হবে বলাই বাহুল্য ! এটা সেন্ট্রাল প্লানিং এ আটকানো যত না? সামান্য একটু ভবিষতবানীর ব্যাপার মাত্র "!

"আমেরিকায় শিক্ষা এবং স্বাস্থ ব্যাবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিত্তবান ছাড়া কারু পক্ষে আর
ব্যাচেলর ডিগ্রি , বা ভালো কলেজে পড়া সম্ভব নয়। ৭০ মিলিয়ান লোকের কোন স্বাস্থ
নিরাপত্তা নই। এগুলো সেন্ট্রাল প্লানিং, সামান্য একটু ভবিষত বাণী করেই আটকানো
যেত
"।

……….

বিপ্লব পাল আমাদের জানাচ্ছেন, সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে সমাধানের কথা যারা ভাবেন তারা রোমান্টিক পাগল; আর নিয়ন্ত্রণহীন মুক্তবাজার অর্থনীতি দিয়ে দেশের অর্থনীতির কথা যারা ভাবেন- তারা সুবিধাবাদী ছাগল!! ফলে সমাধান কি? তাঁর মতে-
বাস্তব হচ্ছে পার্ফেক্ট কোন সিস্টেম নেই। আমাদের প্রয়োজন আসলেই ভবিষত প্রজন্মের জন্যে -তাই ভবিষত কিছুটা হলেও ভাবতে হবে-আবার উৎপাদনশীলতা-আবিষ্কারও বাড়াতে হবে। কিছুটা পরিকল্পনা-কিছুটা মুক্ত বাজার অর্থনীতির হাতেই আমাদের ভবিষ্যত। ১০০% পরিকল্পনা করতে গেলে একনায়কতন্ত্র চলে আসবে। কিছু অটো কারেকশন-কিছুটা কন্ট্রোল-এই ভাবেই পরীক্ষা (এম্পিরিসিজমের মাধ্যমে আমাদের এগোতে হবে)।

এই হলো বিপ্লব পালের পলিটিকাল ইকোনমির থিসিস। এই থিসিসের মধ্য দিয়ে কিন্তু শেষ বিচারে পুঁজিবাদের প্রতি তাঁর সমর্থন, আকুন্ঠ প্রশংসা ঝরে পড়ে। তিনি বলছেন, “আমেরিকাতেই যাবতীয় কিছু আবিষ্কার হয়েছ- বেঁচে থাকার সমস্ত ওষুধ থেকে ইন্টারেনট-টিভি-যা কিছু আমাদের আধুনিক জ়ীবন দিয়েছে-তার সব কিছু আমেরিকার অবদান। সমাজতন্ত্র কিছু যুদ্ধাস্ত্র আর ভালো অঙ্কের বই ছাড়া বিশ্বকে কি দিয়েছে? মৗলিক বিজ্ঞানে অবশ্যই কিছু অবদান রেখেছে। ব্যাস ওইটুকুই।”

সমাজতন্ত্রের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে পুঁজিবাদকে নয়- আমেরিকাকে- আমেরিকার পুঁজিবাদকে, এবং আমেরিকার পুঁজিতন্ত্রের প্রতি এমন গদ গদ ভাব সত্যি চমকপ্রদ, এবং এই লেখাটি হচ্ছে বিপ্লব পালের পুঁজিবাদের সংকট নিয়ে লিখিত(!!!!),

তার মানে এই নয় যে, বিপ্লব পাল পুঁজিবাদের কোন সমালোচনা করেন নি, আমেরিকার অর্থনৈতিক - রাজনৈতিক অবস্থার সমালোচনা করেননি। সেগুলোও তিনি করেছেন, করেই তিনি তার থিসিস সাজিয়েছেন। তার ঠিকাদারতন্ত্র লেখাটিতে তিনি আমেরিকার ওবামা-হিলারি ফাইটের কিছু চিত্র তুলে ধরেছেন এবং সেখানে এক পর্যায়ে সেই ফাইটের কিছু বিষয় বিপ্লব পালের খুব বাজে মনে হওয়ায় তিনি নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে ইস্তফা দেন! মানে হলো- হিলারী ক্যাম্পে সাপোর্টারেরা ওবামার ছবি সাটা ন্যাপকিনের পাল্টা কি দেয়া যেতে পারে- এসব নিয়ে ব্যস্ত না থেকে যদি হিলারীর মূল এজেণ্ডা- আমেরিকান শিশুদের আরো শিক্ষিত করার ব্যাপারে আলোচনা করতে দেখলেই- তিনি খুব উৎসাহিত হয়ে পড়তেন। এমনটিই হচ্ছে- আমাদের বিপ্লব পালের আমেরিকান পুঁজিবাদ সমালোচনা!!

তিনি আরো সমালোচনা করেছেন, করে জানাচ্ছেন- আমেরিকার পুঁজিবাদী রাজনীতি হচ্ছে- ঠিকাদারদের রাজনীতি, এবং তিনি তার স্বপক্ষে প্রমাণ হাজির করেছেন- ডেমোক্রেটিক পার্টির দ্বিতীয় সাংবিধানিক ব্যক্তির মুখ দিয়েও এ কথার সমর্থন বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু,এ ধরণের কিছু সমালোচনার পরেও যে সিদ্ধান্তটি আমরা পাই তা অনেকটা এরূপঃ
কি আর করা যাবে-গণতন্ত্র মানেই ঠিকাদারতন্ত্র -পৃথিবীর সবেদেশই। তবুও মিলিটারী শাসন বা কিমিউনিজম থেকে হাজার গুনে ভাল। ধু সমস্যাটা বিশাল আকার নেয় যখন অস্ত্রের ঠিকাদারও এর মধ্যে ঢোকে।

আর কি বলা যেতে পারে? “সমাজতন্ত্র” জুজুর ভয়ে তিনি এই ঠিকাদারতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন এমনটা মনে হলেও আসলে আমার মনে হয়- ঠিকাদারতন্ত্রকেই শেষ বিচারে আকড়ে ধরার উদ্দেশ্যেই তিনি সমাজতন্ত্রকে জুজু হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। সেটি আরো পরিষ্কার হয় যেখন দেখি তিনি জানাচ্ছেনঃ
“অসামিরক ভারত-আমেরিকা নিউক্লিয়ার চুক্তির অন্ধ বিরোধিতা একধরেনর রাজৈনিতক আত্মহত্মা।”

আশা করি পাঠক কূল বুঝতে পারছেন, আমাদের বিপ্লব পালের পুঁজিবাদ সংকটের স্বরূপ কেমন!!

পাঠকদের জন্য লিংকঃ http://mukto-mona.com/banga_blog/?p=136

(বিঃদ্রঃ বিপ্লব পালের প্রবন্ধে "দিনমজুর" নিকে আমাদের পাবেন না- সেখানে Schlemiel (রুবাইয়াৎ), কল্লোল এবং অনুপম সৈকত শান্ত নামেই আমরা আলাপ চালাচ্ছি)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/28873602 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/28873602 2008-11-24 17:05:05
কিউবার কৃষি অর্থনীতি/ রেবেকা ক্লসন -২ কিউবার কৃষি অর্থনীতি/ রেবেকা ক্লসন -১

কেঁচো, গরু এবং আখ
সফল খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষকের প্রয়োজন পুষ্টিসমৃদ্ধ কৃষিজমি। কিউবা আগে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য আমদানীকৃত কৃত্রিম রাসায়নিক সার ব্যবহার করতো। আর আজ সংগঠিত পদ্ধতিতে মানবিক শ্রম, পশু ও শস্য-উপজাত এবং প্রাকৃতিক পচন প্রক্রিয়াকে একীভূত করে সাসটেইনেবল কৃষির জন্য কৃষিজমিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান দেয়া হচ্ছে। ফলে দূর থেকে মূল্যবান জ্বালানী পুড়িয়ে সার আমদানীর প্রয়োজন পড়ছে না। পূর্ব হাভানার একটি যৌথ খামার ঘুরে দেখার সময় আমি দেখি এক কৃষক হাঁটু গেড়ে বসে আছে কতগুলো চৌকো এবং দীর্ঘ কংক্রীটের সারির সামনে, যেখানে লাল ক্যালাফর্নিয়া কেঁচোর ঘনবসতি। তিনি সেই কংক্রীটের সারির মাটিতে হাত ঢুকিয়ে আমাদের দেখালেন প্রতিঘনমিটার মাটিতে থাকা ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ কেঁচোর সামন্য একটি অংশ। বড় আকারের চাষাবাদে কেঁচো প্রতি ৯,০০০ কিউবিক মিটার জৈব উপাদান থেকে ২,৫০০ থেকে ৩,৫০০ কিউবিক মিটার হিউমাস তৈরী করে। ভারমিকালচার (Vermiculture) অর্থাৎ কেঁচো ব্যবহার করে জৈবসার তৈরীর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে কেঁচোর চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং সঠিক সময়ে তৈরীকৃত হিউমাসকে শস্যক্ষেতে প্রয়োগ করা হয়। তিনি ব্যখ্যা করলেন কেমন করে শাকসব্জির অবশেষের চেয়ে প্রাণীজ আবর্জনা ব্যবহার করে বেশী হিউমাস তৈরী করা যায়, যে কারণে তিনি নিয়মিত স্থানীয় একটি খামার থেকে নিয়মিত গোবর সংগ্রহ করেন। যে গোবর আবার নিজেই প্রাকৃতিক পুষ্টি চক্রেরই একটি অংশ যেহেতু খামারে উৎপাদিত শস্যের অবশেষকে ব্যবহার করেই গোখাদ্য তৈরী করা হয়।

যদিও কিউবার গবেষকরা আগেই জেনেছিলেন যে বিশেষ ঘাস, বিভিন্ন রকম শুঁটি এবং শস্যের অবশেষ ইত্যাদির মাধ্যমে গরুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগান দেয়া সম্ভব কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সস্তায় পশুখাদ্য প্রাপ্তির কারণে বিষয়টি তখন প্রয়োগ করা হয়নি। পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে তারা বাধ্য হলেন শস্য অবশেষ ব্যবহার করার সুবিধা নিয়ে গবেষণা করতে। তারা দেখলেন আখের অবশেষ থেকে তৈরী ঝোলাগুড়, bagasse, cachaza, এমনকি আখের আগার ফেলে দেয়া অংশ গবাদিপশুর জন্য পুষ্টিকর খাদ্য হিসাবে ব্যবহ্রত হতে পারে। যেমন দুজন গবেষক বললেন : “গত ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে চালিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মাংস ও দুধ উৎপাদনে গবাদিপশু পালনের ক্ষেত্রে গো-খাদ্য হিসাবে আখের ব্যবহারের অর্থনৈতিক কিছু সুবিধা বেরিয়ে এসেছে। গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশগুলোর জন্য এটি বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য, কেননা এসব দেশে শুকনো মৌসুমে গোচারণ ভূমি ও ঘাসের যখন সংকট, তখনই সেখানে আখ চাষের সময়।” আখ থেকে গোখাদ্য, গরু থেকে কেঁচোর জন্য সার, কেঁচো থেকে উৎপাদিত হিউমাসের জমিতে প্রয়োগ- এই পথ ধরে পুষ্টির চক্রাকার পরিভ্রমণ দেখে আমি বুঝলাম কেমন করে এই প্রদেশের গাছ এবং পশুর বিপাকের মাধ্যমে পুষ্টিউপাদানগুলোকে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে কিউবার সব প্রদেশেই যে ব্যাপারটি এভাবে আখ, গরু, কেঁচো আর শস্যের মাধ্যমেই ঘটছে তা নয়; বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় সম্পদের উপর ভিত্তি করে এটি বিভিন্ন ভাবে ঘটছে যেমন : মাতাঞ্জাতে ( যেটি মধ্যকিউবার প্রধান সাইট্রাস জাতীয় ফল উৎপাদনকারী অঞ্চল) গো-খাদ্যের জন্য কমলার খোসা গাঁজিয়ে সাইলেজ (silage) তৈরী করা হয়।

অন্যরকম চারণভূমি
এরপর আমরা যাই “Indio Hatuey” নামের পরীক্ষাক্ষেত্রে, যেখানে আমি দেখি রাস্তার দুধারে বেড়া দিয়ে ঘেরা বনময় প্রান্তর। আমি প্রথমেই ধরে নিই এটা বোধ হয় কাঠ তন্তুর কোন প্ল্যানটেশান, কেননা আমার সংকীর্ণ শিক্ষা আমাকে শিখিয়েছে এরকম কোন প্রান্তর হয় একটা গোচারণ ভূমি অথবা কোন বন- এর মাঝে শুধু যে কোন একটাই হতে পারে। বিশেষায়িত উৎপাদন ব্যবস্থা যে নির্দিষ্ট ধরনের প্রান্তরের জন্ম দেয় তা হলো ইনটেনসিভ কৃষির একটি মডেল, যে মডেল এমন একটি কৃষি ব্যবস্থার উদাহরণ যা প্রজাতিসমূহের মধ্যকার বিপাকীয় বিনিময়কে সুচিন্তিত ভাবেই বাদ দেয়। এ পরীক্ষাক্ষেত্রের প্রবেশপথে বড় গাছ এবং লম্বা ঘাসের মাঝে চড়ে বেড়ানো গরু ও তার পাশে বিজ্ঞানের প্রতীক হিসাবে বীকারের ছবি সম্বলিত সাইনবোর্ডটি থেকে প্রথম আমি অন্যরকম এই চারণভূমি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাটি পাই। প্রজেক্টির পরিচালক Mildrey Soca Perez বললেন :“শ্রমিকদের পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগত জানাই”। আমাদের সামনে এরপর এই পরীক্ষাক্ষেত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়, সেই সাথে শস্য-গবাদিপশুর সমন্বয়ের সুফল সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়। বিশেষ সময়ের আগে কিউবায় একক চাষাবাদের মডেল অনুসরণ করা হতো। বিশেষ পর্যায়ে এসে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে বিকল্প মডেলের অনুসন্ধান করা হয়। স্থানীয় ক্ষুদ্র কৃষক, যারা অনেক আগে থেকেই জমির মিশ্র ব্যবহারে অভ্যস্ত, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া হয়। শস্য আবাদ ও গবাদিপশুপালনের সমন্বয়ের ফলে জমির পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য সমস্যা এ দুই ক্ষেত্রেই পারস্পরিক সুবিধা পাওয়া যায়। কিউবার গবেষকরা অনুধাবন করলেন “শস্য ও গবাদিপশুপালনকে পৃথক করার ফলে শক্তি ও পুষ্টির এক বিরাট অপচয় ঘটছে”। তারা যখন আমার কাছে ব্যাখ্যা করলেন কিভাবে গরু, গাছের পাতা এবং ঘাসের মাঝে শক্তির আদান প্রদান ঘটছে, আমার কাছে মনে হলো বিপাকীয় ফাটলের ক্ষত পূরণের এটি আরেকটি উদাহরণ। এখানে ইপিল ইপিল (Leucaena leucocephala) নামক গাছের মাঝে গরু পালন করা হয়। গরুগুলো এই ছোট ও ঘন কাঁটাঝোপযুক্ত গাছের পাতা খায়। শ্রমিকরা নিয়মিত গাছগুলোকে ছেঁটে দেয় যেন গাছের ডালগুলো গরুর নাগালের মধ্যেই থাকে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে লাগানো লম্বা ঘাসও গরুর খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এই গাছগুলো মাটিকে নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ করে। আবার গরুর গোবরও গাছ ও ঘাসের জন্য সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

leucaena গাছ গরুকে ছায়া দেয় এবং তাপের প্রভাব হ্রাস করার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে লাগানো ঘাস যেন প্রচুর সূর্যালোক পায় সেজন্য গাছের সারি তৈরী করা হয় পূর্ব-পশ্চিম বরাবর। এই গাছের মূল আবার মাটির কাঠামোকে শক্ত করে ধরে রাখে যেন গরুর খুড়ের আঘাতে ভূমিক্ষয় বেশী হতে না পারে। আর গাছ-গরুর অনুপাতের বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা হয় যেন কোন একটি অন্যটির তুলনায় বেশী বা কম হয়ে ভারসাম্য নষ্ট করতে না পারে। গবেষকরা দেখেছেন, এভাবে সমন্বিত চাষাবাদের মাধ্যমে বছরে প্রতি হেক্টর জমি থেকে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ লিটার দুধ উৎপাদন করা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে আবাদের ফলে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালের মধ্যকার উৎপাদন হ্রাস-বৃদ্ধিও কমে যায় এবং গরুর প্রজননও বেড়ে যায়।

কিউবায় এভাবে গরু-বাছুর ছাড়াও ছাগল, ভেড়া, শুয়োর ও খরগোশ পালনের ব্যাপারে গবেষণা চলছে । তাছাড়া এই খামারে কমলা বাগানের মাঝে ঘোড়া পালনের বিষয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। ঘোড়া বাগানের আগাছা পরিষ্কার করে আগাছানাশকের প্রয়োজনীয়তা দূর করে এবং জমির উর্বরতার জন্য প্রয়োজনীয় গোবর-সারেরও যোগান দেয়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একক চাষাবাদের চেয়ে এই সমন্বিত চাষাবাদের মাধ্যমে বছরে প্রতি হেক্টর জমি থেকে বাড়তি ৩৮৮ পেসো বেশি লাভ হয়। কিউবার কৃষক এবং গবেষক যারা এই স্থানীয় ও অভ্যন্তরীণ পুষ্টিচক্রের প্রক্রিয়াটি আমার কাছে বর্ণনা করেন তাদের মাধ্যমে আমি দেখতে পাই এভাবে কতগুলো মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে। নতুন ধরনের শ্রম সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত গঠনের নতুন কাঠামো এবং জমি ও খাদ্যের নতুন ধরনের বিতরণ ব্যবস্থা কেবল বাস্তুসংস্থানগত অর্থে স্থায়ী একটি উপায়ে কিউবার জনগণকে খাদ্য সরবারহ করছে না, পুরো সমাজের বিপাক প্রক্রিয়াকেও এটি পাল্টে দিয়েছে।

গ্রাম-শহরের ভেদ বিমোচন
শহরাঞ্চলে জৈব বাগান করার উপর জোর দিয়ে এবং শহরের পরিত্যক্ত খালি জায়গায় খাদ্য উৎপাদনের কৌশল অবলম্বন করে গ্রাম-শহরের বিভেদ দূর করা হয়। যে স্থানগুলো একসময় গাড়ি পার্কিং, ময়লা জমা করা এবং পরিত্যক্ত ভবনের ধ্বংসাবশেষ রাখার স্থান হিসাবে ব্যবহৃত হতো সেগুলো হয়ে উঠলো প্রতিবেশীদের জন্য জৈবখাদ্য সরবরাহের উৎস। বর্তমানে কিউবার জনগণ যে শাকসবজি খায় তার শতকরা ৬০ ভাগই আসে শহুরে বাগান থেকে।

শহরের অধিবাসীদের মৌলিক খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে গিয়ে অনানুষ্ঠানিক ভাবে শহুরে কৃষির শুরু। শহুরে কৃষির গুরুত্ব উপলব্ধি করে কিউবার সরকার শহুরে কৃষি বিভাগ গঠন করে এবং শহরের খালি জায়গার উপর নাগরিকদের দখল এবং সেখানে উৎপাদিত ফসল বিক্রির অধিকার আইনসিদ্ধ করে। জৈব কৃষির নীতি মেনে চললে একজন নাগরিক এক একরের এক-তৃতীয়াংশ নিজের আয়ত্বে নিয়ে চাষাবাদ করতে পারে। ২০০০ সাল নাগাদ ১,৯০,০০০ এরও বেশী মানুষ এর জন্য আবেদন করে এবং সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৩,২২,০০০ মানুষ শহুরে কৃষির সাথে জড়িত। কিউবার শহুরে কৃষি বিভাগ এদের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ, রোগ-বালাই দমন ইত্যাদি ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে থাকে।

কৃষির কৌশলগত দিকগুলোর ব্যাপারে কৃষিবিদদের কাছ থেকে খাদ্য-উৎপাদকের কাছে জ্ঞানের প্রবাহ কিউবার কৃষির সাফল্যের আরেকটি দিক। কিউবার কৃষি মডেল অনুসারে শারীরিক ও মানসিক শ্রমের কৃত্রিম বিভক্তি বস্তুত কৃষির সাফল্যকে বাঁধাগ্রস্ত করে। কিউবায় সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্য নতুন কৃষি মডেলে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের সুযোগ রাখা হয়েছে। যেমন কিউবার ১৫টি প্রদেশে অবস্থিত পিপলস্ কাউন্সিল ছোট ছোট সমবায়গুলোকে সাহায্য করে। পিপলস্ কাউন্সিলগুলো গঠিত হয়েছে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদক এবং কৃষিবিদদের নিয়ে যারা কৃষিতে সর্বোত্তম প্রক্রিয়াটি যেন কৃষকরা ব্যবহার করতে পারে তার জন্য একত্রিত হয়ে কাজ করে। সর্বোত্তম প্রক্রিয়াটি বের করার প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত কৃষিবিদ কৃষকদের সাথে সরাসরি মাঠে কাজ করে। সেই সাথে কৃষকের জ্ঞানও ব্যবহার করা হয় কৃষি বিষয়ক সম্মেলন এবং গবেষণাপত্রগুলোতে। ২০০৬ সালে কৃষকদের এক সম্মেলনে যে ১০৫টি গবেষণাপত্র পাঠ করা হয় তার মাঝে ৫৩টি তৈরী করেছিল খাদ্য উৎপাদকেরা, ৩৪ টি গবেষক-টেকনিশিয়ান এবং ১২টি ছিল একাডেমিক অধ্যাপকদের তৈরী। ব্যবহারিক জ্ঞানের সাথে তত্ত্বগত জ্ঞানের সম্মিলনের ফলে এমন এক যৌক্তিক বিজ্ঞানের প্রয়োগ সম্ভব হয় যা সকলের পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।

সামাজিক বিপাকের ফাটলটিকে পূরণ করার জন্য গ্রাম-শহরের ভেদ বিমোচন (কৃষির জমির পরিবর্তন) এবং সেই সাথে কায়িক ও মানসিক শ্রমের পার্থক্য দূর করা( শ্রম বিভাজন পরিবর্তন করা) প্রয়োজন। এই দুটোর জন্য পুরো খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু এটা ছাড়াও সামাজিক বিপাকের আরেকটা দিক রয়েছে- উৎপাদিত ফসলের সুষ্ঠু বিনিময়। এর জন্য কিউবায় প্রত্যেক নাগরিকের একটি করে রেশন কার্ড রয়েছে যা সারা বছর তার খাদ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেয়। বৃদ্ধ, শিশু এবং গর্ভবতী নারীদের খাদ্য বিশেষ ভাবে পর্যবেক্ষণের আওয়তায় রাখা হয়, স্কুল ও হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করা হয়। কিউবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের মার্কো নিতো খাদ্য পরিকল্পনা বিষয়ে বলেন :
“পরিকল্পনা করার সময় বিভিন্ন ভৌগলিক এলাকায় জনসংখ্যার ধরন বিশেষত জনসংখ্যার ঘনত্ব, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ, জমির উর্বরতা শক্তি ইত্যাদি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়।”

ল্যাটিন আমেরিকায় সার্বভৌম কৃষি?
পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে জমির ব্যক্তিগত মালিকানা, কায়িক ও মানসিক শ্রমের বিভাজন এবং শ্রমের ফসলের বন্টন প্রক্রিয়ায় অবিচার ইত্যাদি খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সামাজিক বিপাকের বিচ্যুতি বা ফাটলকে আরও বড় করে তোলে। কিউবার কৃষি মডেলটি সমবায়ের মাধ্যমে কৃষককে ভূমির সাথে পুনরায় সংযুক্ত করা, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া চালু করা এবং বিতরণ ব্যবস্থা বহুমুখীকরণের মাধ্যমে পদ্ধতিগত ভাবে এই সব বিচ্ছিন্নকারী উপাদানগুলোকে দূর করেছে। এই বাস্তুসংস্থানগত স্থায়িত্ব এবং সামাজিক সমতার নীতিকে কি কিউবার বাইরেও ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব?

কিউবার কৃষকরা এই ধরনের খাদ্য উৎপাদনের পদ্ধতিকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দেশগুলোতে ভ্রমণ করছেন। বস্তুত বর্তমানে কিউবার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল রপ্তানীখাত হলো ‘ধারণা’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কৃষক এবং কৃষিবিদ কিউবার আতিথেয়তা গ্রহণ করছে। বর্তমানে কিউবার কৃষিবিদরা হাইতির কৃষকদের ট্রেনিং দিচ্ছে এবং ভেনিজুয়েলাকে তার ক্রমবর্ধমান শহুরে কৃষি আন্দোলনের ব্যাপারে সাহায্য করছে।

এই আইডিয়া বিতরণের কাজটি যে শুধুমাত্র কিউবার কৃষকরাই করছে, ব্যপারটি এমন নয়। সারা ল্যাটিন আমেরিকা জুড়েই ঐতিহ্যবাহী কৃষিব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া এবং ভূমি সংস্কারের দাবীতে আন্দোলন জোরেশোরে শুরু হয়েছে। ২০০৫ সালের আগষ্টে ব্রাজিলের পানামায় ল্যাটিন আমেরিকান স্কুল অব এগ্রি-ইকোলজি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভূমিহীন শ্রমিক আন্দোলন (Movimento dos Trabalhadores sem Terra, MST) এবং ভায়া ক্যাম্পেসিনা (Via Campesina) এই দুটি সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি গ্রাম্য সম্প্রদায়ের মাঝে এগ্রি-ইকোলজি বা কৃষিবাস্তুবিদ্যার ধারণাটি ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। MST এর সমন্বয়ক Robert Baggio এর মতে, এই প্রতিষ্ঠানটি এগ্রিইকোলজির ভিত্তিতে একটি নতুন ম্যাট্রিক্স তৈরী করবে, যেটি স্থানীয় বাজারের উপর নির্ভর করে পরিবেশের ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ রেখে একটি সার্বভৌম কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলবে। (http://www.landaction.org)

এই প্রক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ার মধ্যদিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট উৎপাদকদের (Associated Producers) নিয়ে গঠিত মার্কসের কল্পনা করা সেই ভবিষ্যত সমাজের একটা ধারণা পাই। পুঁজির ভলিউম ৩ এ মার্কস লিখেছেন : “এক্ষেত্রে মুক্তি আসবে এভাবে: সামাজিকৃত মানুষ, সংশ্লিষ্ট উৎপাদকশ্রেণী মানবীয় বিপাকের অন্ধশক্তির নিয়ন্ত্রণে না থেকে মানবীয় বিপাককে প্রকৃতির সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে যৌক্তিক উপায়ে পরিচালনা করবে; আর এ প্রক্রিয়াটি সে সম্পন্ন করবে ন্যূনতম শক্তি ব্যয় করে এবং মানব প্রকৃতির সাথে খাপ খায় এমন শর্ত বজায় রেখে।”

যে মানসিক বাধা আমাদের এ ব্যাবস্থা বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখতে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে তা প্রচলিত কৃষিবাণিজ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা এক হ্রস্ব দৃষ্টির ফলাফল, যে কৃষিবাণিজ্যের জগতে গবাদিপশু বনে চড়ে বেড়ায় না এবং কেঁচোর সহায়তায় ফসল ফলে না; যেখানে কৃষকেরা বিজ্ঞান চর্চা করে না এবং শ্রমিকেরা তাদের উৎপাদনের ভাগ পায়না; এবং যেখানে মুনাফার স্বার্থে পরিবেশ এবং সমাজের বিপাকীয় বিচ্যুতি বাড়তেই থাকে। কিউবার কৃষি আমাদেরকে দেখিয়ে দিচ্ছে যে বিপাকীয় ফাটল পূরণ করার সম্ভাবনাটি বাস্তব এবং এখনই সম্ভব।

মূল:
Healing the Rift: Metabolic Restoration in Cuban Agriculture by Rebecca Clauson ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/28870139 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/28870139 2008-11-17 10:49:56
কিউবার কৃষি অর্থনীতি/ রেবেকা ক্লসন -১
জন বেলামী ফস্টার তার “ধ্বংসের বাস্তুবিদ্যা” (The Ecology of Destruction, Monthly Review, February 2007) প্রবন্ধটিতে ব্যাখ্যা করেছেন মার্কস কেমন করে ‘বিপাকীয় ভেদ’ এবং ‘বিপাকীয় পুনর্ভরণ’ এই দুটি ধারণার মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীতে প্রকাশিত হয়ে পড়া পুঁজিবাদী সমাজের বাস্তুসংস্থানগত দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ‘বিপাকীয় ভেদ’ ধারণার মাধ্যমে বোঝা যায় কেমন করে পুঁজির পুঞ্জিভবনের যুক্তিটি প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদনের মৌলিক প্রক্রিয়াটিকে ধবংস করার মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্যকেই বিনষ্ট করে। তার উপর ‘সেই বিপাকের চারপাশের পরিপ্রেক্ষিতকে ধবংস করার মাধ্যমে’, মার্কস বলে চলেছেন, ‘এটি (পুঁজিবাদী উৎপাদন) পদ্ধতিগত পুনর্ভরণকে সামাজিক পুনরুৎপাদনের নিয়ন্ত্রিত নিয়মে পরিণত করে (অর্থাৎ বাঁধাগ্রস্ত করে)’ - যে পুনর্ভরণ আসলে একমাত্র পুঁজিবাদী কাঠামোর বাইরেই সম্ভব।

কিউবার কৃষি-বাস্তুবিদ্যার সাম্প্রতিক অগ্রগতি প্রত্যক্ষ উদাহরণের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে শুধুমাত্র কিছু পদ্ধতি নয় বরং এর সাথে সমন্বিত খাদ্য উৎপাদনের সামাজিক-বিপাকীয় সম্পর্কের ব্যাপক রূপান্তরের মাধ্যমে এ বিপাকীয় চ্যুতির পুনর্ভরণ সম্ভব। ইতোমধ্যেই অনেক পন্ডিত ব্যক্তি কিউবার জৈব-কৃষির সাফল্যের বৈজ্ঞানিক অর্জন নিয়ে আলোচনা করেছেন। যদিও কিউবার জৈব-কৃষির এই সাফল্য এবং ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এর সম্ভাবনাকে কেবল জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারের আলোকে না দেখে দেখতে হবে কিউবার পুরো সমাজ ব্যাব¯থায় যে পরিবর্তন এসেছে তার আলোকে। রিচার্ড লেভিন যেমন বলেছেন: “কৃষি ক্ষেত্রে কিউবার অগ্রগতিকে বুঝতে হলে পুরো বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে—– ঘাড় ঘুড়িয়ে একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে, আড়চোখে তাকিয়ে পুরো বিষয়টিকে বুঝতে হবে কেমন করে সত্যিকার অর্থেই মহৎ একটি পথ ধরে কিউবার সার্বিক উন্নয়ন এগিয়ে চলেছে….”

জমি হলো গুপ্তধন যার চাবি শ্রম
মার্কসের বিপাকের ধারণার মূল প্রোথিত আছে শ্রম-প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার যে ধারণা তার মাঝেই। শ্রম এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষ, তার এবং প্রকৃতির মধ্যে বস্তুগত বিনিময় সাধন করে এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ভূমি অর্থাৎ মৃত্তিকা (এবং তার সাথে সম্পর্কিত প্রাকৃতিক চক্র) এবং শ্রম অর্থাৎ মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যকার বিপাকীয় সম্বন্ধ, এই দুইটি হল মানুষের সকল সম্পদের মূল উৎস। একদল কৃষি-গবেষকের সাথে গত বছরের কিউবা সফরের সময় আমি দেখি ঘোড়ার গাড়িতে করে একটি খামারের জৈব উৎপাদন নিকটস্থ কমিউনিটি স্ট্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একটা হিমাগারের গায়ে দেখি লেখা আছে: “জমি হলো গুপ্তধন যার চাবি শ্রম”। একটি যৌথ খামারে জৈব ফসল উৎপাদন এবং নিকটস্থ কমিউনিটিতে তার সরবরাহের ব্যাপারটি কাছ থেকে দেখে আমার কাছে মনে হলো এটি যেন মার্কসের প্রাকৃতিক বিপাকের ধারণার দৈশ্যিক উপস্থাপনা। জমিকে গুপ্তধনের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে যেন সাময়িক লাভের জন্য তাকে নি:শেষিত করে ফেলা না হয়, বরং কৃষির বাস্তুগত নিয়মনীতির (কৃষি-বাস্তুবিদ্যা বা এগ্রি-ইকোলজি) যৌক্তিক এবং পরিকল্পিত প্রয়োগের মাধ্যমে একে সদা পুনরুজ্জীবিত রাখা হয়। আর গুপ্তধনের চাবির মতোই শ্রম মাটি থেকে তার শ্র্রেষ্ঠ উপাদান বের করে নিয়ে আসার মাধ্যমে উৎপাদন করে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য যা সমস্ত সম্প্রদায়ের নিকট সমান ভাগে ভাগ করে দেয়া হয়।

মার্কসের কাছে বিপাক শব্দটির মানে দুরকম। একটি হলো মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে যে জটিল আদান-প্রদান ঘটে, তাকে নিয়ন্ত্রণকারী একটি প্রক্রিয়া। দ্বিতীয়টি আরো বৃহত্তর অর্থে শ্রমবিভাজন ও সম্পদের বন্টনকে নিয়ন্ত্রণকারী প্রাতিষ্ঠানিক ধারণাকে বোঝায়। বিপাকীয় বিচ্যুতির বিশ্লেষণ এ দুটি দিককে নিয়েই। ইকোলজিক্যাল বা বাস্তুগত অর্থে, মার্কস লক্ষ্য করেন পুঁজিবাদী কৃষি আর “নিজে নিজে টিকে থাকার” অবস্থায় নেই যেহেতু এটি “আর নিজের মাঝে নিজের উৎপাদনের প্রাকৃতিক শর্ত খুঁজে পায় না”। বরং কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি এখন সুদূর বহির্বাণিজ্য ও কৃষির বাইরের পৃথক শিল্পক্ষেত্র থেকে সংগ্রহ করতে হয়। এর ফলে জমির উর্বরতা ও বর্জ্য সঞ্চয়নের মধ্যকার প্রাকৃতিক চক্রে ফাটল ধরে।

বিপাকের বৃহত্তর সামাজিক অর্থের কথা ধরলে দেখা যায়, পুঁজি ও শ্রমের মধ্যকার বিশেষ সম্পর্কের কারণে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কের মাঝে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তর, শারীরিক/মানসিক শ্রমের বিভাজন, গ্রাম ও শহরের মধ্যকার ব্যবধান ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক অর্থে বিপাকীয় চ্যুতি বা ফাটলকে বোঝা যেতে পারে। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে কর্পোরেট ফাটকাবাজির প্রাধান্য, ‘দক্ষ’ টেকনিশিয়ানের জ্ঞানের কাছে ক্ষুদ্র কৃষকের স্বাধিকারের বিনাশ, গ্রাম্য খামার থেকে শহরের দিকে জনসংখ্যার স্থানান্তর ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবেই এই ফাটল বাস্তবায়িত হয়।

‘এটি সুন্দর কাজ’
আমার সৌভাগ্য যে কিউবায় জৈবখামারগুলোতে কাজ করে এমন অনেক কৃষকের সাথে আমি কথা বলতে পেরেছি। আমার কাঁচা স্প্যানিশের কারণে বেশী সূক্ষ আলোচনায় যেতে না পারাটা আমাকে হতাশ করলেও কৃষকদেরকে মৌলিক একটি প্রশ্ন আমি ঠিকই করতে পেরেছি। আমাকে শহুরে কৃষিজমির কাজ দেখাচ্ছিল এরকম একজন কৃষককে প্রশ্ন করেছি : “তোমার কি এই কৃষিকাজ ভালো লাগে?”
কৃষক দ্বিধাহীন ভাবে বলল: “এটি সুন্দর কাজ”
আরো অনুবাদ এবং কিউবার চারটি প্রদেশের কৃষিকাজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বুঝেছি খাদ্য উৎপাদনের রূপান্তরের বাস্তব ফলাফল কি; বিশ্ব কৃষিবাণিজ্যের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ছাড়াই এখানে পুষ্টিকর খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়।

কিউবার এই কৃষি মডেল প্রাকৃতিক পুষ্টিচক্রকে পুনর্সংযুক্ত করে, গ্রামের মানুষের শ্রমের সাথে শহুরে উৎপাদনশীল শ্রমের বন্ধন তৈরি করে। সামাজিক-বিপাকীয় সম্পর্কের রূপান্তরের ফলে জীববৈচিত্র্যকে ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হয়েছে, যেমন : উপকারী কীটপতঙ্গের ব্যবহার। মালিকানা এবং বিতরণের নতুন ধরনের ফলে চাষাবাদ, ফসল তোলা ও ভোগ- সব ক্ষেত্রেই অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়েছে। নতুন ধরনের শ্রম-সম্পর্ক তৈরী করা হয়েছে যার ফলে আদিবাসী কৃষক একজন প্রশিক্ষিত এগ্রোনোমিস্ট এর সাথে মিলেমিশে পরিবেশ, ভূগোল ও আবহাওয়ার সাথে ফসলকে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। আর “ফিদেল ক্যাস্ট্রোর কিউবা ছাড়া আর কোথাও এটি সম্ভব নয়”- সন্দেহবাদীদের এই ধারণাকে উড়িয়ে দিয়ে কৃষকরা ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দেশগুলোতে চাষাবাদের এই পদ্ধতিটিকে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করছেন।

“জৈবিক চাষাবাদ পদ্ধতির উন্নয়নের” জন্য কিউবাকে বিকল্প নোবেল পুরষ্কার দিয়েছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এই সাফল্যের পেছনে নতুন পদ্ধতির আবিষ্কারের অবদান অবশ্যই আছে, তবে তা আংশিক; বাকিটা হলো নতুন তথ্যকে স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োগের জন্য ছড়িয়ে দেয়ার সাফল্য। Entomophages and Entomopathogens (CREEs) উৎপাদনের জন্য রয়েছে ২৮০টি সফল গবেষণাগার, যেগুলো ক্ষতিকর পতঙ্গকে আক্রমণকারী উপকারী পতঙ্গ উৎপাদনের মাধ্যমে জৈবপ্রক্রিয়ায় পতঙ্গ দমনকে সম্ভব করে তুলেছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় করা গবেষণার মাধ্যমে প্রাকৃতিক প্রতিষেধক ও জৈব সারের উৎপাদন প্রচলিত কৃষির বাইরে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যদিও বিপাকীয় বিচ্যুতির পুনর্ভরণ শুধু এটিকেই কেন্দ্র করে ঘটেছে, বিষয়টি তা নয়। বাস্তুসংস্থানের সাথে সম্পর্কিত করে বিপাকীয় চ্যুতির পুনর্ভরণকে বুঝতে হলে প্রথমে প্রাকৃতিক পুষ্টিচক্রের স্থানিক পুনর্বিন্যাসকে বোঝা দরকার। বিপাকীয় চ্যুতির বাস্তুগত বোঝাপড়ার মূল বিষয়টি হলো পুষ্টিচক্রকে নিয়ন্ত্রণকারী ভৌত প্রক্রিয়াগুলোর স্থানিক সম্পর্ক (spatial relations)। ভূমি থেকে মানুষের পৃথকীকরণ (গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর) প্রকৃতি ও সমাজের মধ্যকার বিপাকীয় সম্পর্কের মাঝে ফাটল তৈরী করেছে । কেননা উৎপাদনশীল শস্য ও খামার থেকে পণ্যের সাথে সাথে পুষ্টি উপাদনগুলোও দূরে চলে যায় এবং অবশেষে দূরের কোন শহরের আবর্জনায় পরিণত হয়। পুষ্টিশূন্য মাটির জৈবকাঠামো পুনরুদ্ধারের জন্য পুঁজিবাদী কৃষি প্রক্রিয়ায় তখন দূর থেকে আমদানীকৃত শিল্প উৎপাদন (যেমন : ইউরিয়ার মতো নাইট্রোজেন সার) মাটিতে নিয়মিত প্রয়োগ করতে হয়। এর ফলে প্রাকৃতিক পুষ্টিচক্র নষ্ট হয় এবং প্রকৃতিতে নতুন এক বাস্তুগত দ্বন্দ্বের সূচনা করে যার একদিকে শহরের স্যুয়ারেজ সিস্টেমে পুষ্টি উপাদানের সঞ্চয়ন অন্যদিকে শহর থেকে রাসায়নিক সার দূর গ্রামে রপ্তানীর জন্য জ্বালানীর ব্যবহার। একইভাবে কৃষিকাজে ব্যবহ্রত গবাদিপশুকে তার খাদ্য উৎপাদনকারী জমি থেকে সরিয়ে নেয়ার ফলে খাদ্যশস্য/গবাদিপশু এবং গবাদিপশুর গোবর/খাদ্যশস্যের মধ্যকার বস্তুগত বিনিময় বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিপাকীয় বিচ্যুতি ঘটে।

১৯৯৫ সাল থেকে কিউবার কৃষিঅর্থনীতিতে পুষ্টিচক্র ও বস্তুগত বিনিময়ের এই ভেঙ্গে পড়া সম্পর্ককে পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। কিউবার কৃষি-বাস্তুবিদ্যার মূলনীতি হলো : “স্থানীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং চারাগাছ-পশুর সমন্বয়ের মাধ্যদিয়ে আন্ত:খামার সিনার্জি”। কিউবা ভ্রমণের সময় আমি দেখেছি কিভাবে এ নীতিতে চাষাবাদের ফলে নিকটবর্তী খামার কিংবা আন্ত:খামার সমন্বয়ের মাধ্যমে পুষ্টিচক্রের পুনরুদ্ধার হচ্ছে।

(চলবে........)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/28870124 http://www.somewhereinblog.net/blog/dinmojurblog/28870124 2008-11-17 10:11:35
চলমান পুঁজিবাদী সংকট থেকে উত্তরণ ("বেইল আউট") কি সমাজতন্ত্রের পথেই?-২
প্রথম পর্ব এর পর থেকে....
.... এখন প্রশ্ন এই "বেইল আউট" কর্মসূচি কি উদ্দেশ্যে এবং কেন নেয়া হচ্ছে? তাদের কাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করছে, এবং প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এক্ষেত্রে কি ভূমিকা রাখতো? এখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আরেকটি প্রশ্ন আসা দরকার, সেটা হচ্ছে: এই দেশগুলোর মাস জনগণ কেমন আছে, সেখানকার ওয়ার্কিং ক্লাসের বর্তমান অবস্থা কেমন? অর্থাৎ যে ট্যাক্সপেয়ারদের অর্থে "বেইল আউট" সেই ট্যাক্সপেয়াররা কেমন আছে? কিছু তথ্য দেখা যাক:

"The rapid rise in unemployment points to a U.S. recession."- Peter Kretzmer , Economist, Bank of America:
প্রথমে গৃহায়ণ খাতের দিকেই দৃষ্টি দেয়া যাক--
অক্টোবর ২৩ এ RealtyTrac প্রকাশিত এক সার্ভেতে দেখা যায় যে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিফল্টার নোটিশ, অকশন সেলস নোটিশ ও ব্যাংক রিপজেশন নোটিশপ্রাপ্ত আশুবন্ধের উদ্দেশ্যে ফাইলের সংখ্যা ৭ লক্ষ ৬৫ হাজার। যার ৭১% ই ফাইলবন্দী হয়েছে ২০০৭ এর থার্ড কোয়ার্টারে। এসবের মধ্যে ৬০% ই অবস্থান করছে ছয়টি স্টেটে- নেভাদা, ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, মিশিগান ও আরিজোনা। নেভাদায় এই হার সবচেয়ে বেশী- যেখানে প্রতি ৮২ টি হাউজিং প্রোপার্টির মধ্যে ১টি আশুবন্ধের জন্য ফাইলবন্দী হয়েছে।
RealtyTrac জানায় যে, সেপ্টেম্বর নাগাদ ৮১,৩০০ বাড়ি নিলামে তোলা হয়েছে, আগস্ট ২০০৭ হতে এ পর্যন্ত মোট ৮,৫১০০০ বাড়ি ঋণদাতারা অধিগ্রহণ করার জন্য অগ্রসর হয়েছে।
Credit Suisse এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর Rod Dubitsky বিজনেস উইককে জানিয়েছেন, ২০১২ সাল নাগাদ ৫০ লাখেরও বেশী আমেরিকান পরিবার তাদের বাড়ি হারাবে, আর ২০০৮ সালেই বাড়ি হারানো পরিবারের সংখ্যা এসে দাঁড়াবে প্রায় ১৬ লাখ ৯০ হাজার।

পরিষ্কারভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন গৃহায়ন বাজার মন্দার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে, একইভাবে যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য উন্নত দেশসমূহও গৃহায়ণ খাতে মন্দার সম্মুখীন। ফলে, রেসিডেন্সিয়াল বা কমার্সিয়াল কনস্ট্রাকশনের সাথে যুক্ত সমস্ত সেক্টরই নিম্নগামী। চীনের পিভিসি পাইপ ম্যানুফ্যাকচারিং এরমধ্যেই ৩০% কমেছে, চীনের বৃহত্তম চারটি ইস্পাত কোম্পানী ২০% উৎপাদন কমিয়েছে। একইভাবে ইউরোপিয়ান গৃহ-নির্মাণ সামগ্রী প্রস্তুতকারকদের (যেমন CHR ও Michelmersh) ফ্যাক্টরী বন্ধ বা উৎপাদন কমাতে হচ্ছে।

অটো-ইণ্ডাস্ট্রিতে ডাউন-টার্ণ পরিষ্কারভাবেই এখন বিশেষ বিবেচনা ও আলোচনার বিষয়- বিশেষ করে জি৭ ভূক্ত দেশসমূহে এই ডাউন-টার্ণ উল্লেখযোগ্য। GM, Ford, Toyota, BMW, Daimler, Volkswagen, Audi, Porsche এবং GM ও Ford এর ইউরোপিয়ান subsidiary কোম্পানিসমূহ সকলেই তাদের কার্যক্রম সংকুচিত করা আরম্ভ করেছে। এই সংকোচন কেবল ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটসমূহকে প্রভাবিত করছে না; বরং এটা ইস্পাত, গ্লাস, রাবার, ইলেকট্রনিক পার্টস সহ আরো অসংখ্য খাতের উপরেই তার প্রভাব ফেলছে। তাৎক্ষণিক ফল হচ্ছে বিভিন্ন প্ল্যান্ট ও ফ্যাক্টরী বন্ধ এবং লে-অফ। General Motors এর মধ্যেই তার ছয়টি ফ্যাক্টরী বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে যার পাঁচটি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত (জর্জিয়া, মিশিগান, নিউ ইয়র্ক, ওহিও, উইসকনসিন), সেই সাথে মেক্সিকোর Toluca এবং কানাডার Ontarioতেও প্ল্যান্ট বন্ধের ঘোষণা এসেছে। শুধু তাই নয়, GM জার্মানী, স্পেন, বৃটেন, পোল্যাণ্ড, সুইডেন এবং বেলজিয়ামেও ফ্যাক্টরী সাময়িক বন্ধ করছে।

প্রতিটি বৃহৎ প্ল্যান্ট বন্ধই আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও 'ডাউন-টার্ণ'কেই প্রতিধ্বনিত করছে। এসেম্বলি প্ল্যান্ট বন্ধের সাথে সাথে পার্টস সরবরাহকারী ও পার্টস প্রস্তুতকারক কোম্পানী 'ডাউন-টার্ণ' হচ্ছে। GM Moraine ফ্যাক্টরীর সরবরাহকারী ফার্মের সংখ্যা ১০৩ টি, আবার অন্যদিকে GM ও অন্য ফার্ম তথা প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকারী কোম্পানী। যুক্তরাষ্ট্রের National Automobile Dealers Association আশংকা করছে যে, আগামী বছর ৪০% এর বেশী ডিলারশিপ বন্ধ হয়ে যাবে। আর এসমস্ত কিছুর সরাসরি প্রভাব এসে পড়ছে শ্রমিকদের উপর, প্রতিটি 'ডাউন-টার্ণ' বা প্ল্যান্টের বন্ধ হওয়া মানেই হাজার হাজার শ্রমিকের বেকার হয়ে যাওয়া এবং টিকে যাওয়াদের মজুরী উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়া। নিউ ইয়র্কের পূর্ব Syracuse অবস্থিত New Process Gear শ্রমিকদের আলটিমেটাম জানিয়েছে: "take a 45% wage cut or find the plant shuttered"। উল্টোদিকে বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আঞ্চলিক সরকারসমূহ ট্যাক্স ভিত্তি হারাচ্ছে এবং ছোট শহরসমূহ ধ্বংসের দাড়প্রান্তে।

হংকং এর শিল্পসমূহের ফেডারেশন ধারণা করছে চলমান সংকটের দরুন পরবর্তী ২৪ মাসে পার্ল রিভার ডেল্টা অঞ্চলের ২০% (১৪০০০) ম্যানুফেকচারার বন্ধ হয়ে যাবে। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিবিদদের হিসাব মতে বেকার শ্রমিকের সংখ্যা ৫২ থেকে ১৫০ মিলিয়নের মধ্যে উঠানামা করছে। গত এক বছরে সাংহাই স্টক মার্কেট ৬০% নেমেছে।

ইউএস গাড়ি-প্রস্তুতকারকেরা দেউলিয়াত্বের কিনারে এসে অটোশ্রমিকদের চাকুরীর উপর খড়গহস্ত হচ্ছে। জেনারেল মোটর (GM) গত ১৬ অক্টোবর তাদের তিনটি প্ল্যান্টে (একটি দেলাওয়ার ও বাকি দুটিমিশিগানে- পনটিয়াক ও ডেট্রোইট) ১৬০০ জন কর্মীর লে-অফ ঘোষণা করেছে। সাথে সাথে GM এও জানিয়েছে এই লে-অফের মধ্য দিয়ে Janesville, Wisconsin, Grand Rapids, Michigan এবং Moraine, Ohio এ প্ল্যান্ট বন্ধ করার ব্যাপারে তাদের ইতোমধ্যে নেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আরম্ভ হবে।
সাবেক এই industrial giant ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত তার অর্ধেক লোকবলকে ছাটাই করেছে, শ্রমিকের সংখ্যা ১,৩৩০০০ থেকে এখন ৭২,০০০ এ এসে দাঁড়িয়েছে। আগামী অল্প কিছু মাসের মধ্যে আরো লে-অফের ঘোষণা আসার কথা আশা করা যায়।

Chrysler এবং GM ফাইনান্সিয়াল সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে মার্জারের জন্য ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেছে। Chrysler অবশ্য Renault-Nissan এর সাথেও মার্জার তথা পার্টনারশিপ অপশন বিবেচনা করছে বা খতিয়ে দেখছে। এটি ২০০৭ এর শুরু থেকে এর মধ্যেই ২২,০০০ শ্রমিক ছাটাই করেছে, আগামী বছরে আরো কমপক্ষে ৪০০০ ছাটাই করবে।
এ বছর ইউএস অটো-কোম্পানীসমূহ থেকে বিতাড়িত শ্রমিকের সাংখ্যা এখন ৬০,০০০ পেরিয়েছে।
Chrysler এবং GM এর একীভূত হওয়া মানেই নিম্নে আরো ২০/৩০ হাজার শ্রমিকের চাকুরী হারানো। University of Michigan এর ব্যবস্থাপনা বিষয়ের অধ্যাপক Gerald Myers এর মতে: "It would be a bloodbath, Chrysler would be cut up into small pieces. GM would spit out the things it doesn’t want and hang onto the things it does want."

এরকম ছাটাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়- অন্যান্য শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহেও শুরু হয়েছে। ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানীর দুই বৃহৎ অটো-পার্টস প্রস্তুতকারক কোম্পানী "উল্লেখযোগ্য" সংখ্যায় লে-অফের ঘোষণা দিয়েছে। জার্মান অটো-জায়ান্ট Daimler এর স্টার্লিং ট্রাক ডিভিশন বন্ধ এবং অন্টারিও, কানাডা ও অরেগন রিজিয়নে প্ল্যান্ট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে, যাতে ৩৫০০ শ্রমিক কাজ হারাবে। এক জরিপে দেখা গিয়েছে যে, ২০০৯ নাগাদ জার্মানীতে ৪ লাখের বেশী শ্রমিক ছাটাই হবে।
নিশান গত সপ্তাহে স্পেনের বার্সেলোনায় অবস্থিত প্ল্যান্টে ১৬৮০ চাকুরী ছাটাই এর কথা জানিয়েছে। গার্ডিয়ান পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ি স্প্যানিশ গাড়ি-প্রস্তুতকারক 'সিট' (এর মালিকানা Volkswagen এর) তার অন্যতম প্ল্যান্ট বার্সেলোনা থেকে আপাতত ৪৭০০ লে-অফ করবে। সাথে সাথে স্পেনের টায়ার-প্রস্তুতকারক কোম্পানী 'ব্রিজস্টোন' তাদের দুটি প্ল্যান্টের ৩৩০০ লোকবলের মধ্যে ২৮০০ কেই ছাটাই করার পরিকল্পনা করছে।

৫ সেপ্টম্বরে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ি যুক্তরাষ্ট্রে সরকারীভাবে স্বীকৃত বেকারত্বের হার আগস্টে বেড়ে হয়েছে ৬.১%, এই হার বিগত পরপর আট মাস ধরেই উর্ধমুখী। আগস্ট মাসে ৮৪,০০০ এরও বেশী লোক কাজ হারিয়েছে, যার মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং থেকে শুরু করে রিটেইল ও কনস্ট্রাকশন সেক্টর আছে। অবশ্য এক অটো-প্রস্তুতকারক ও অটো-পার্টস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানই ৩৮,০০০ ছাটাই করেছে।

লেবার ডিপার্টমেন্টের রিপোর্ট হতে জানা যায়, গত ১২ মাসে ২.২ মিলিয়নেরও বেশী লোক কাজ হারিয়েছে এবং ৩১ আগস্ট, ২০০৮ এ যুক্তরাষ্ট্রের মোট বেকারের সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৯.৪ মিলিয়ন। গত ১২ মাসে লম্বা সময়ের বেকারের সংখ্যা (যারা ২৭ সপ্তাহ বা তার বেশী সময়ের জন্য কর্মহীন) ৫,৮৯০০০ বেড়েছে। কিন্তু সরকারী তথ্য আমাদের সম্পূর্ণ চিত্র দেয় না। লেবার ডিপার্টমেন্ট "ইনভলান্টিয়ার" পার্ট-টাইম জবকেও ফুল-টাইম কাজ হিসাবে গণনায় নিয়েছে। এই রিপোর্টে ফার্মে