হোস্টেলে আমার এক রুমমেট পরিচয় করিয়ে দেয় তার আর এক বন্ধুর সাথে।ধরি তার নাম"ম"। আমি অনার্স করি , সে পাস কোর্সে। আমার বিজ্ঞান বিষয়ে , সে বানিজ্য। আমি নিয়মিত ক্লাস করি, সে করে রাজনীতি। আমি ধর্ম করি সে করে অধর্ম। কিন্তু এই "ম"ই আমার ক্রমে হয়ে উঠে কাছের মানুষ। এখনো পর্যন্ত যার উপর আমার সবচেয়ে বেশি আস্থা আছে তার নাম" ম"। কিন্তু যার মাধ্যমে ঐ "ম" এর সাথে পরিচয়,তার সাথে আমার কখনোই মতের মিল হয়নি।সে পাশা পাশি থাকলেও কাছা কাছি ছিলনা। চেনা জানা থাকলেও জানা-শোনা ছিলনা। প্রতিদিন গায়ে গা লাগলেও কখনো বন্ধু হয়ে উঠেনি। তার সাথে এখন কোন যোগাযোগ নেই। যোগাযোগ করার ইচ্ছাও নেই। কাকতালীয় ভাবে না হলে হয়তো আর কোন দেখা সাক্ষাতও হবেনা। এমনই হয়।
বন্ধুতা কি ভাবে গড়ে উঠে তার মনে হয় কোন নীয়ম নীতি নেই। কোন সূত্র নেই।
"চাইছি তোমার বন্ধুতা"
আমি যখন অনার্স করতে বাড়ির চেনা গন্ডি থেকে বের হই। তখন একাই বের হয়েছিলাম। কোন চেনা-জানার হাত ধরে তা হয়নি। কলেজে এসে যাদের পেলাম তারা সবাই অচেনা। কলেজে পূর্বসূত্র ধরে কাউকে চিনতাম না। নতুন করে একটা পরিবার,একটা মহল্লা বা একটি রাজ্য তৈরি করে নিয়েছিলাম।
রাজ্য বলাটা বোধ হয় বেশিই বলা হলো? আমি তো আর আওয়ামিলীগ বা বিএনপি করি না যে নিজস্ব এলাকা দখল করে নেব। তবু কিছুটা এলাকা কিছু মানুষজনকে আপন করেই নিয়েছিলাম,নিচ্ছি এবং নিব। এভাবেই বেড়ে যাচ্ছে আমার বৃত্ত। এভাবেই বেড়ে যাচ্ছে আমার চেনা জানার গন্ডি।
এই বৃত্তের চার ধারে আমাকে কত জন চিনলো? আর আমি কতজনকে চিনলাম?
আমি আসলে বলতে চাই। জীবনের মাস, দিন, ঘন্টা,সেকেন্ট যে অতিক্রম করছি এই সময়ে কত জন মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। একটা মানুষের জীবনে কত জন মানুষকে সে আপন করে নেয় । হোক সেটা কাজের জন্য অকাজের জন্য।
কত জন মানুষের সাথে আমার সম্পর্ক হয়? সম্পর্ক বলাটাই মনে হয় যুক্তি যুক্ত।
নিয়মিত টিকিট কাটতে গিয়ে বাস কাউন্টারের লোকের সাথে, সবজি কিনতে গিয়ে সবজীওয়ালার সাথে, ফ্লেক্সি করতে গিয়ে মোবাইল ওয়ালার সাথে। এই পরিচয়টা আমাদের খুবই কমন।
লেখাপড়ার সম্পর্ক,চাকরির সম্পর্ক,খেলাধুলা সম্পর্ক,আড্ডা সম্পর্ক,সংগঠন সম্পর্ক।এমনই সম্পর্কের জালে আমরা জড়াতে থাকি। সম্পর্কের জাল ছড়িয়ে দিতে থাকি চার দিকে।
একটা শিশু জন্ম সূত্রে কিছু মানুষকে পায়। বাবা-মা, ভাই-বোন,দাদা-দাদী,নানা-নানী,চাচা-চাচি,ইত্যাদি। এবং তাদের চেনা জানা আরো অনেক কেই। বেড়ে উঠার সাথে সাথে এই পরিচয় বড় হতে থাকে। উত্তরাধিকারের গন্ডি পেরিয়ে প্রতিটি মানুষ নতুন নতুন যে বলয় তৈরি করে আমি তার কথাই বলছি।
ফেসবুক, ব্লগ,টুইটার এর কল্যানে অনেকের সাথেই সম্পর্ক হচ্ছে। অদেখা অচেনা অনেক কেই খুব আপন বলে মনে হয়। এই যে অচেনার মাঝে চেনা, অজানার মাজে জানা এও কম কিসে?
এও এক ধরনের বন্ধুতা।
একটা মানুষের জীবনে এমন কতজন মানুষের সাথে কম করে সম্পর্ক করতে হয়? এবং সর্বোচ্চ এই সম্পর্কিত মানুষের সংখ্যা কত?
এই সম্পর্কিত মানুষ থেকেই,বন্ধু নির্বাচন করে, আপন জন নির্বাচন করে, কাছের মানুষ নির্বাচন করে। অনেক বার , অনেক বার। স্বপ্ন দেখে। আবার স্বপ্ন ভঙ্গও হয়। আমি আশাবাদী মানুষ নিরাশার গান তাই গাইনা।
বন্ধু আমার মন ভালনেই তুমার কি মন ভাল?
আমার পরিচত আমার বয়সি এক ব্যবসায়ীর কাছে জানতে চাইলাম। আচ্ছা আপনার পরিবারের বাইরে এমন কি কোন ব্যক্তি আছে যার উপর আপনি একশত ভাগ নির্ভর করতে পারেন? যে কোন বিপদে আপনার উদ্ধারে এগিয়ে আসবে এমন এমন আস্থাভাজন কি কেউ আছে? সে খুব চিন্তা করে বলল।আসলে আমি খুব কম লোকের সাথেই মিশেছি। তাকে খুব অসহায় দেখাল। এত টাকা,এত সময়, এত মানুষের সাথে সম্পর্ক করেও এমন একজন আস্থাভাজন মানুষ তৈরি করতে পারে নি সে। কেন পারেনি? সে কি চায়নি কেউ তার চরম বিপদগ্রস্থ মুহূর্তে তার পাশে এসে দাঁড়াক,তার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়াক? অবশ্যই চায়। হয়তো এমন মুহূর্তে কেউ না কেউ দাঁড়াবে। কিন্তু সেই লোকটা কে, সে তা জানেনা। সে কারো উপরই আস্থা রাখতে পারছেনা। সে কি তবে কারো আস্থা ভাজন হতে পেরেছে?
জীবনে এমন কোন অস্থার জায়গা যদি তৈরি না করা যায় তবে জীবনের স্বার্থকতা কোথায়? এত ভাল ব্যবহার,এত নৈতিকত,এত শিক্ষার ফলাফল তবে কি?
আমি যেখানেই গিয়েছি,যে খানেই হাত বাড়িয়েছি ,বন্ধুত্বপূর্ন সহযোগিতা পেয়েছি সব খানে। কলেজে পেয়েছি চমৎকার বন্ধুদের। যারা নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলী দিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বিপদের সময়ে। তারা তো বন্ধু তাই বিনিময় কিছু চায়নি, আর আমি প্রতিদান কি-ইবা দিতে পারতাম?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



