প্রায় ১২ বছর হল আমাদের বাড়িতে কনকমাসি বাসন মাজা, ঘর মোছার কাজ করে।
এত দিন হল শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ওর আসার সময় এক দিনের জন্যও নড়চড় হয়নি। ভোর পাঁচটা, ও-দিকে দুপুর তিনটে।
কখনও কখনও খুব বিরক্তি লাগে ঘুম চোখে দরজা খুলতে, বিশেষ করে শীতকালে। অবাকও হই মাসি ঘড়ি দেখতে জানে না অথচ সময়জ্ঞান এত পাকা!
সারা ঘরে প্রয়োজনীয়, দামি জিনিস পড়ে থাকে, কিন্তু কোনও দিন হাত দিতে দেখিনি। মাসির দুই ছেলে, এক মেয়ে। দু’জন গ্র্যাজুয়েশন আর এক জন এ বছর উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েছে।
মাঝেমধ্যে অনেক পুজো-আচ্চা করে। সেই দিনগুলোতে ওর কপালে সিঁদুরের সাইজ বড় হয়ে যায়। সবই যে তার ভাল, এমনটা নয়।
মঙ্গলবার, শনিবার হলেই কামাই। মাসে ৬-৭ দিন লেগেই আছে।
মা-র মুখে শুনেছি, ও নাকি তান্ত্রিকের বাড়ি যায়। ভেবেছিলাম সন্তানের পরীক্ষার ব্যাপারে...!
এক দিন সাক্ষরতা অভিযানের কাজে এক গ্রামাঞ্চলে হাজির হলাম। সেখানে হঠাৎ আলাপ হল মাসির বড় ছেলের সঙ্গে।
জিজ্ঞেস করি, বাইরের কাজ সেরে তোমার বাবা কবে আসছেন?
ছেলেটি জানাল, মাসির স্বামী প্রায় ১৭ বছর আগে ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে মারা গিয়েছে।
মাসি সবই জানে। কিন্তু মানতে চায় না। তার বিশ্বাস এক দিন স্বামী ফিরে আসবে, আসবেই। স্বামীর মঙ্গল কামনায় শাঁখা-সিঁদুর পরে আজও।
কোথায় আছে, কেমন আছে তা জানতেই তান্ত্রিকের বাড়ি ছোটে।
বিধবা হয়ে সধবার বেশে থাকে বলে প্রতিবেশীদের নিত্য গঞ্জনা পিছু ছাড়ে না।
তবু ও নাছোড়; অটল, অনড়। লোকের বাড়ি কাজ করে ছেলেমেয়েদের একাই মানুষ করছে।
মাসির বড় সাধ, সন্তানরা লেখাপড়া শিখে চাকরি করবে। স্বামী ফিরলে সে সগর্বে জানাবে, তার লড়াইয়ের কথা।
বাড়ি ফিরবার পথে কনকমাসির প্রতি খানিক বিরক্তি উধাও হয়ে বিস্ময়ে আবিষ্ট হলাম।
(চরিত্রের নাম পরিবতির্ত)
-রিনি দত্ত
আনন্দবাজার; ১৫/১১/০৯।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

