পূর্ণ মানব সন্ধানী স্বামী বিবেকানন্দ
মন্দির গড়ার থেকেও মানুষ গড়ার কাজকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন ব্যতিক্রমী মানবপ্রেমী সেই সন্ন্যাসী। শতাব্দী অতিক্রান্ত সময়কালেরও আগে যিনি বজ্রগম্ভীর কন্ঠে ঘোষণা করেছিলেন “ম্যান মেকিং ইজ মাই মিশন” । তিনি স্বামী বিবেকানন্দ।
পৃথিবীতে জন্মে শুধুই ভূ-ভার বাড়ায় এমন মানুষ নয়, স্বামী বিবেকানন্দ চেয়েছিলেন সেই মানুষ, যার ভিতর ঘটেছে মনুষ্যত্ব আর দেবত্বের পূর্ণ সমাহার। সেই পূর্ণ মানব বা ‘টোট্যাল ম্যান’-এর শিকড় সন্ধানেই তো তাঁর স্বপ্নদৌড় আজীবন। দৌড় হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা, বস্টন থেকে লন্ডন। যেন চিরপবিত্র হোমাগ্নি শিখার পুণ্য ধারক বাহক হয়ে। এই তো সেই অপূর্ব অভিজ্ঞান যা এক সময় তিনি তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে লাভ করার পর মর্মে মর্মে অনুভব করেন বহুবিস্তৃত কর্মময় জীবনের তলে অতলে। পাশাপাশি, আবার শ্রীরামকৃষ্ণের কথামতো মান-হুঁশের(মানুষ) অনন্ত দিশায় অন্তহীন পরিক্রমণে। দীন-দুঃখী ভারতবাসীর জন্য যাঁর প্রাণ কেঁদেছে। মন্দিরে ঘন্টাবাদ্য বাজিয়ে বিগ্রহের পূজার্চনার থেকে যাঁর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে অসহায় মানবের সেবা। যাঁর মনের কথা ছিল-জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।
ধর্ম বলতে স্বামী বিবেকানন্দ তাই শেষ পর্যন্ত সেই ধর্মকেই বোঝেন, যা গরিবের মুখে দু’ মুঠো অন্ন জোগায় কিংবা বিধবার চোখের জল মুছিয়ে তাকে পরিচালিত করে জীবনের মূল লক্ষ্যে। অনেকেই তাঁকে তাই একজন সমাজতন্ত্রী রূপেই দেখতে চান। তবে বিবেকানন্দের সমাজতন্ত্রকে আত্মস্থ করতে হলে তাকে সোশ্যালিজমের পরিচিত বাঁধাবেড়ির পরিসরের বাইরে এনে দেখতে হবে। কারণ প্রকৃত সাম্য তো আসলে তা-ই, যা অন্তরে অন্তরে মিলন ঘটিয়ে প্রকট করে সেই অনন্ত ধ্বনিকেই, এক সময় যেটি মানুষকে তার ব্যবহারিক নামরূপের ভাবপ্রতিমা থেকে সরিয়ে ধীরে ধীরে নিয়ে আসে পরম সত্যের বেদিমূলে-‘এষং বৈ ইদং বিবভূব সর্বম’- ধর্ম আর ঈশ্বর, দেবতা আর মানুষ যেখানে মিলেমিশে একাকার!
মানবের দুঃখে কাতর এই সন্ন্যাসী গর্জ়ে উঠে বলেছেন, “যে দেশে কোটি কোটি মানুষ মহুয়ার ফুল খেয়ে থাকে আর দশ বিশ লাখ সাধু, ক্রোড় দশেক ব্রাহ্মণ ওই গরিবের রক্ত চুষে খায়, আর তাদের উন্নতির কোনও চেষ্টা করে না- সে কি দেশ, না নরক! সে ধর্ম, না পৈশাচ নৃত্য!” হাল আমলের মানবাধিকার তত্ত্বের বিষয়টি আদ্যন্ত তোলপাড় করে ফেলার পরেও বলা যায়, মানুষের অন্তর্নিহিত পরম সত্তার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা না থাকলে বিপ্লব কখনওই সম্ভব নয়।
ঠিক কেমন মানুষ গড়তে চেয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ? মানবপ্রেমী সন্ন্যাসীর ক্রান্তদর্শী উদ্ভাবনে সেই অসামান্য ‘মডেলটি’ যে ভাবে অঙ্কিত, তা আমাদের আজও চমকিত করে। তিনি চেয়েছিলেন এমন মানুষ, যে একই সঙ্গে জাগতিক আবার জগতাতীত। সে একাধারে লোকাল ও গ্লোবাল(স্বামীজির সেই অসামান্য বহুমুখী ধারণাটি তো এমন আধুনিক শব্দবন্ধেই মানায়)। সেই মানুষের থাকবে লোহার মতো পেশি, ইস্পাতের মতো স্নায়ু।
ধর্মের নামে যে মানুষ বুজরুকির আশ্রয় নেবে না বা ধর্মকে গবিবের শোষণযন্ত্রে পরিণত করবে না। বরং ধর্ম তার কাছে হবে হাঁটা-চলার মতোই সহজ-সরল-স্বাভাবিক। শুষ্ক বুদ্ধি নয়, যে স্বতঃস্ফূর্ত হৃদয়াবেগকেই প্রাধান্য দিয়ে দৌড়ে গিয়ে তুলে ধরবে অন্ধ-অসহায়ের হাত থেকে স্খলিত হয়ে যাওয়া যষ্টি। দেখবে না তার জাত-পাত-ধর্ম। বিভেদ করবে না ধর্মে-দর্শনে-বিজ্ঞানে। আর এরাই ক্রমে দশে মিলি এক হয়ে গড়বে উৎকট শাসন ও শোষণমুক্ত নির্ভার পৃথিবী।
এই অসাধারণ ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন যে কেবলমাত্র স্বপ্ন নয়, তার প্রমাণ তো পাওয়াই যায় আজকের পৃথিবীর তাবড় তাবড় অনেক মনস্বীরই চিন্তা-চিন্তনে। কী ক্ষুদ্র স্তরে, কী বৃহৎ স্তরে সর্বত্রই যখন আজ মানুষের স্বাভাবিক জীবনসম্পদ স্বার্থের তুমুল সংঘর্ষে অপস্রিয়মাণ, তখন সেই জটিল ঘূর্ণাবর্ত্য থেকে উদ্ধার কল্পে তাঁরা আমাদের যে পথগুলি দেখাচ্ছেন, সারেমূলে তো তা শেষ পর্যন্ত সেই ‘সেক্টলেস ওয়ার্ল্ড’ নির্মাণেরই অনুগামী-যে সম্ভাবনাটি ক্রান্তদর্শী বিবেকানন্দ অনেকদিন আগেই আমাদের শুনিয়ে গিয়েছেন। সাধারণ মানবজীবন থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাওয়া বেদান্তের মহত্তম তত্ত্বকে ‘প্র্যাক্টিক্যাল’ জীবনে অঙ্গীভূত করে শুনিয়েছেন সেই অসামান্য কথাগুলি, “বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাব গ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি।”
মানুষের বিপন্নতায় মানুষকেই হাতিয়ার করে, বনের বেদান্তকে ঘরে টেনে এনে এই মহৎ উত্তরণের কথা এখনও পর্যন্ত এই মানবদরদি বৈদান্তিক সন্ন্যাসী ছাড়া আর কেই-বা আমাদের শোনাতে পেরেছেন এমন আপন করে। সেইখানেই তিনি এই মর্ত্যলোকের প্রচলিত সর্ব মত-পথ-ইজমের স্থূল সীমারেখা ছাপিয়ে গিয়ে আজও সকলের কাছেই এক মহত্তম আশ্রয়। আগামী দিনেরও নিঃসংশয়ে মানব মুক্তির উজ্জ্বল আলোকদিশারি।।
-সঞ্জয় ভুঁইয়া
[আনন্দবাজার, ০৬/০১/১০]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


