ভারতীর স্কুলে চলছে ক্লাস
১২বছরের ‘দিদিমণি’ ভারতীকে আর দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে গ্রামে শিক্ষার আলো জ্বালানোর প্রয়োজন হবে না। দিদিমণির কাজকে সহজ করতে এগিয়ে এসেছে ভাগলপুরের মাউন্ট আসিসি স্কুলের প্রাক্তন ছাত্ররা।
উল্লেখ্য, বিহারের রোহতাস জেলার কুসুম্ভরায় দলিত বাচ্চাদের পড়ানোর দায়িত্ব গত কয়েক বছর ধরে নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন ওই গ্রামেরই ১২বছরের মেয়ে ভারতী। জন্মের পরে আস্তাকুঁড়েতে তাকে ফেলে গিয়েছিল তার অজ্ঞাতপরিচয় মা। তাকে কুড়িয়ে এনে মানুষ করে ওই গ্রামেরই এক মহিলা। সেই পালিতা মা-ও প্রয়াত হয়েছেন। জন্মে অনাথ ভারতী দ্বিতীয়বারের জন্য অনাথ হয়।এরপরেই শুরু হয় তার লড়াই। নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওইয়ার জন্য এবং গ্রামের বাচ্চাদের পড়াশোনার মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্যে শুরু হয় ১২বছরের ভারতীর লড়াই। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি ভারতী গরীব গ্রামটিতে শুরু করে নিজের স্কুল। আর এই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের দানেই চলতে থাকে তার লক্ষ্যপূরণের কাজ।
কয়েকদিন আগে সংবাদ মাধ্যমে এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পরেই ভারতীকে দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় মাউন্ট আসিসি স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের সংস্থা ‘মন্তাজিয়ান’। সংস্থার সভাপতি অশ্বীনকুমার ঝুনঝুনওয়ালার কথায়,“আমাদের প্রাক্তনীর চারজনের একটি দল গত সপ্তাহে ওই গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে আমরা অবাক হয়ে গিয়েছি। ভারতীর মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ে ছাদটাও প্রায় নেই। অথচ কী অদম্য উৎসাহের সঙ্গে সে বাকি বাচ্চাদের পড়াশোনার কাজ়ে সাহায্য করে চলেছে।” অশ্বীনের কথায়,“সংবাদ মাধ্যমে দেখেছিলাম। কিন্তু নিজের চোখে দেখার পরে আরও অবাক হয়ে গিয়েছি। এর আগেও অনেক দরিদ্র পড়ুয়াদের অর্থ সাহায্য করেছি। কিন্তু বিহারের কোনও গ্রামের ১২বছরের মেয়ে এমন অসাধ্যসাধন করতে পারে, না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না।”
কু সু ম্ভরায় ভারতীকে ঘিরে তার দত্তক ভাইয়ারা
ভারতীর কাজের স্বীকৃতি দেখে খুশি ভারতীর অভিভাবক-গ্রামবাসীরা। গ্রামের মেয়ের সাহায্যকারীদের আত্মীয়ের মতোই বরণ করে নিয়েছেন তাঁরা। অশ্বীন বলেন,“গ্রামের সবাই জড়ো হয়ে আমাদের স্বাগত জানিয়েছেন, মিষ্টি খাইয়েছেন। ওঁদের আপ্যায়নটাও ভোলার নয়।” পুরো পরিস্থিতি দেখার পরে অশ্বীনদের সংস্থা ভারতীকে এককালীন ১১হাজার টাকার একটি চেক এবং সঙ্গে নতুন জামাকাপড় এবং বই দিয়ে এসেছে। অশ্বীনের দাবি, “ভারতীর পড়াশোনার খরচ তো বটেই, একই সঙ্গে ওর কর্মকান্ডেও যথাসম্ভব আমরা সাহায্য করার চেষ্টা করব।” তবে এই সাহায্যের পরিমাণ কত, তা বলেননি অশ্বীন। তাঁর কথায়,“এটা কোন নির্দিষ্ট পরিমাণ হতে পারে না, ওর যেমন প্রয়োজন হবে, তেমন সাহায্য করে যাওয়ার চেষ্টা করব।”
অশ্বীনদের কাছ থেকে এই সাহায্য পেয়ে খুশী ভারতীও। ১২বছরের ‘দিদিমণি’কে দত্তক নেওয়ার পরে সে বড় হয়ে কী হতে চায়, জানতে চেয়েছিল ‘মন্তাজিয়ান’-এর প্রতিনিধিতা। সলজ্জ ভারতী জবাব দিয়েছে, ডাক্তার।।
-অত্রি মিত্র, পটনা
(আনন্দবাজ়ার থেকে)
....................................................................................
গরিব ছাত্রের কল্যাণই ব্রত তপতীদের
সারদা কল্যাণ ভান্ডারে পড়ার ফাঁকে চলছে ব্রতচারী।
একটা সময় দু’বেলা খাবার জুটত না ওঁদের। উচ্চশিক্ষার গন্ডি পেরনো ছিল দিবাস্বপ্ন। কয়েকজন মহিলার শিক্ষানুরাগ আর উদ্যম সেই স্বপ্নকে বাস্তব করেছে। দারিদ্রর বাধা পেরিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের প্রভাতকুমার মিশ্র এখন ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। খড়গপুর আইআইটি’র কোরাল বিভাগে সহকারী–অধ্যাপক অরুণ চক্রবর্তী। বারাসাত স্টেট ইউনিভার্সিটির দর্শন বিভাগের প্রধান সবিতা সামন্ত। অনটনের সঙ্গে লড়াইয়ের ওঁদের সকলেরই ত্রাতা ‘সারদা কল্যাণ ভান্ডার’।
১৯৮৪ সাল। রামকৃষ্ণমঠ ও মিশনের দশম অধ্যক্ষ স্বামী বীরেশ্বরানন্দজির অনুপ্রেরণায় মেদিনীপুরের রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয় (গোপ কলেজ)-এর শিক্ষিকা রেখা সরকার, ভারতী ঘোষ, তপতী সিংহ এবং স্কুলশিক্ষিকা মিতালি দাস মিলে ট্রাস্টি বোর্ড গড়েন। চারজন দেন ৫০০১টাকা করে। ইচ্ছে, বছর শেষে সুদ বাবদ যে টাকা পাওয়া যাবে, তা দিয়ে দরিদ্র পরিবারের একজন মেধাবী পড়ুয়াকে সাহায্য করবেন। এই শিক্ষানু রাগকে পুঁজি করেই মেদিনীপুর শহরের শরৎপল্লিতে ছোট্ট একটা অফিসঘরে সারদা কল্যাণ ভান্ডারের পথচলা শুরু। ক্রমে সংস্থার বহর বাড়ে। অর্থ সাহায্য আসতে শুরু করে দেশ বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে। এই সংস্থার সহায়তায় উচ্চ শিক্ষার গন্ডি পেরিয়েছেন ৮হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী। চলতি শিক্ষা বর্ষে ৬০৭জন দরিদ্র পড়ুয়াকে সংস্থার তরফে সাহায্য করা হচ্ছে। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬, প্রত্যেকেই মহিলা।
বেড়েছে সংস্থার কর্মকান্ডের পরিধিও। শুধু গরিব ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ জোটানো নয়, লেখাপড়ার ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করতেও এগিয়ে এসেছে এই সংস্থা। মেদিনীপুর শহরের রাঙামাটিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়াদের নিখরচায় পড়ানোর বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পড়ুয়া রয়েছে ৬১০জন। পড়াশোনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচ, গান, আবৃত্তি, ব্যায়ামের তালিমও দেওয়া হয়। দেওয়া হয় স্কুলের ইউনিফর্ম, টিফিন, প্রয়োজনে ওষুধও। সম্প্রতি ২৬জন অসহায় বৃদ্ধাকে মাসে ১৫দিন খাবার দেওয়াও বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সংস্থার সাধারণ সম্পাদিকা রেখা সরকার বলেন,“সবই করছি মানুষের জন্য। এতে আর্ত-অসহায়ের যদি কিছুটা উপকারও হয়, সেটাই আমাদের প্রাপ্তি।”
সদ্য রাঙামাটির কোচিং সেন্টারে ছেলেকে ভর্তি করেছেন মেদিনীপুর সদর ব্লকের গোপ এলাকার বাসিন্দা সুলেখা দোলুই। তিনি বলেন,“আমরা গরিব। টাকা খরচ করে ছেলেকে পড়ানো সম্ভব নয়। এখানে পয়সা লাগে না। ছেলে এখানে পড়ার পাশাপাশি নাচ, গান, আঁকা সব কিছুই শিখতে পারছে। এর থেকে ভাল কী-ইবা হতে পারে।” এখান থেকে সাহায্য নিয়েই বেলদার সৌরভ শিট অঙ্কে অনার্স পড়ছেন। গোকুলপুরের ছন্দা বেরা পড়ছেন বাংলা অনার্স। ছন্দার কথায়, “বাবা পড়াতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন। শেষে এই সংস্থার খবর পেয়ে ছুটে আসি।”
এমন বহু ছাত্রছাত্রীর পাশে সদাসর্বদা রয়েছেন রেখাদেবী, তপতীদেবীরা। তবু ওঁদের আক্ষেপ,“সরকারি সাহায্য নেই। সাধারণ মানুষের সাহায্যই আমাদের ভরসা। ফলে, অনেক সময়ই বহু পড়ুয়াকে সাহায্য করতে পারি না।” তবে থেমে যেতে শেখেননি ওঁরা। বাধা–বিপত্তি পেরিয়েই আগামীদিনে আরও বেশি সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর মধ্যে উচ্চ শিক্ষার আলো জ্বালতে চান হার না মানা এই মহিলারা।
-সুমন ঘোষ, মেদিনীপুর
(আনন্দবাজ়ার থেকে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



