এক নম্বর স্তূপ
সাঁচি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ শিল্প ও স্থাপত্যের নিদর্শন। যদিও সাঁচির সাথে বুদ্ধদেবের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই। সম্রাট অশোক এর প্রতিষ্ঠাতা। খ্রিষ্টপূর্ব ২৫৭তে অশোক বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়ে চন্ডাশোক থেকে ধর্মাশোকে পরিবর্তিত হন। তাঁর স্ত্রী দেবী ছিলেন বিদিশার মেয়ে। সাঁচির পাহাড়টি তখন বিদিশাগিরি নামে পরিচিত ছিল। সাঁচি থেকে দশ কি.মি দুরে বিদিশাতে বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ীরা বসবাস করতেন। শহরটি গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্যকেন্দ্র হিসেবেও উল্লেখযোগ্য।
মধ্যপ্রদেশের রাজধানী শহর ভূপাল থেকে সাঁচির দূরত্ব ৪৬ কিলোমিটার, দেখার সুবিধার জন্য সাঁচির পুরাবস্তুকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে৷ সম্রাট অশোকের তৈরি মূল স্তূপটির ব্যাস প্রায় ৩৬.৬ মিটার ও উচ্চতা প্রায় ১৬.৫ মিটার৷
সম্রাট অশোক বিদিশাগিরি অর্থাৎ সাঁচিতে স্তূপ, স্তম্ভ ও মঠ স্থাপন করেন। অশোকের কন্যা সঙ্ঘমিত্রা ও পুত্র মহেন্দ্র শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারে যাওয়ার আগে সাঁচিতে মা দেবীর সাথে দেখা করতে আসেন। দেবী তাঁদের বৌদ্ধমঠে নিয়ে যান। প্রকান্ড এলাকা জুড়ে এই মঠ। তাতে অনেক ঘর, উপাসনাগৃহ প্রভৃতি ছিল। মঠের পাশে থাকতো এক বিশাল পাথরের পাত্র। এতে সমস্ত দানসামগ্রী জমা হত। পরে সেগুলি বিতরণ করা হত। এসব ঘটনা যিশুর জন্মের তিনশো বছর আগের। তারপর পনেরোশো বছর ধরে সাঁচিতে বৌদ্ধ শিল্প ও স্থাপত্যের ভাঙাগড়া চলেছে।
বিদিশাগিরির শীর্ষে যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে সম্রাট অশোকের তৈরি মহাস্তূপ বা এক নম্বর স্তূপ। পুর সাঁচিতে এটিই সবচেয়ে সুন্দর।
সম্রাট অশোক যে স্তূপ গড়েছিলেন তা এখনকার স্তূপের নীচে ছিল। একশ বছর পরে সেই স্তূপের উপর আরো বড় স্তূপ তৈরি হয়। তা ঘিরে তৈরি হয় অলিন্দ। মানুষের পায়ে পায়ে সেই অলিন্দের পাথর আজ ক্ষয়ে এসেছে। পরে স্তূপের পাশে গোল বারান্দার মতন প্রদক্ষিণ পথ তৈরি হয়। তারও একশ বছর পর স্তূপের চারদিকে চারটি তোরণ নির্মাণ হয়। এক নম্বর স্তূপের উত্তরমুখী তোরণ এখনও সবচেয়ে অক্ষত। দুটি চৌক স্তম্ভের উপর তিনটি পাথরের লম্বা লম্বা ফলক। সেই পাথরের ওপর সূক্ষাতিসূক্ষ কাজ। এমন সূক্ষ যে তা এলোরা বা খাজুরাহোর কাজকেও টেক্কা দেবে। এই সব তোরণে যারা কাজ করেছেন তারা সকলেই ছিলেন কাঠ বা হাতির দাঁতের শিল্পী। সে কারণেই তোরণে কাঠ বা হাতির দাঁতের কাজের সুক্ষতা পাওয়া যায়। এছাড়াও স্বর্ণকারেরাও এখানে কাজ করেছেন। এই স্তূপের উত্তরমূখী তোরণের মাথায় এখনও চক্রের কিছু অংশ দেখা যায়।
অলিন্দ ও প্রদক্ষিণের পথ
বৌদ্ধদের কাছে সাঁচি অত্যন্ত পবিত্র স্থান। মনেকরা হয় এখানে এক নম্বর স্তূপের মধ্যে বুদ্ধদেবের ভস্ম আছে। তিন নম্বর স্তূপে ছিল বুদ্ধের শিষ্য সারীপুত্র ও মহামোজ্ঞলানার ভস্ম। পরে এগুলো নতুন মন্দিরে আনা হয়।
দেশবিদেশের অন্যান্য ধর্মস্থানের মত সাঁচিতেও ধর্ম কারুশিল্প ও স্থাপত্যে মিলেমিশে গেছে। তোরণের স্তম্ভ ও ফলকে বৌদ্ধ জাতকের গল্প খোদাই করা আছে। বুদ্ধের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু দৃশ্য এখানে দেখা যায়। তবে তোরণ বা স্তম্ভে বুদ্ধের কোন মূর্তি নেই। কখনও গাছ, কখনও ধর্মচক্র, কখনও পদচিহ্ন-এসব প্রতীক দিয়ে বুদ্ধের উপস্থিতি বোঝান হয়েছে। এর কারণ সম্ভবত এই যে সে সময় বুদ্ধের নীতি অনুসারে মূর্তি পূজোর অনুমোদন পায় নি। তা ছাড়া বিদিশায় কারুকাজের শিল্পী থাকলেও মূর্তি তৈরির শিল্পী ছিলেন না।
জাতকের কাহিনী
সাঁচির প্রতিটি কারুকার্যমন্ডিত তোরণের ওপর ধর্মচক্র ও তার নীচে জীবজন্তু,বুদ্ধের জীবনের ঘটনাবলী,জাতকের কাহিনী,এমনকি সমকালীন ঐতিহাসিক তথ্যগুলি ভাস্কর্যে বর্ণিত হয়েছে৷পশ্চিম তোরণের উপরিভাগে আছে মানবরূপী বুদ্ধের সাত জন্মের কাহিনী৷ মাঝে সারনাথে উপদেশরত বুদ্ধ,নিচে হসত্মিসহ ছন্দক জাতকের চিত্র৷ দক্ষিণ তোরণে বুদ্ধের জন্মকাহিনী৷ সিদ্ধার্থমাতা মায়াদেবী পদ্মের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন,তাঁর ডানদিকে যূথপতি বারি সিঞ্চনরত৷ নিচে কীচকের বামন মূর্তির হাতে মালা৷ পূর্বতোরণে গর্ভাবস্থায় মায়াদেবীর স্বপ্নদর্শন,শাক্যমুনির জলের ওপর ভ্রমণ ও কপিলাবস্তু থেকে গৃহত্যাগ৷এখানে একটি তোরণে আছে আম্রবৃক্ষের নিচে উপদেশদানের পর শ্রীবুদ্ধ হেঁটে চলেছেন লেলিহান শিখার মাঝখান দিয়ে শূন্যপথে৷
সাঁচিতে মূর্তি আসে অনেক পরে, গুপ্ত যুগে। আনুমানিক চারশো খ্রিষ্টাব্দে। এই মূর্তি আসে মথুরা থেকে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের বিবর্তনের যোগাযোগ থাকতে পারে। বুদ্ধের মৃত্যুর কিছু পর থেকেই তার প্রবর্তিত ধর্ম নিয়ে তর্ক শুরু হয়। কৌসাম্বির দলটি পুরানো ও রক্ষণশীল ছিল। অন্যদিকে মথুরার কেন্দ্রটি অপেক্ষাকৃত নতুন। নতুন দলটি এমন কিছু পরিবর্তন আনে যা বুদ্ধদেব নিজেও বাতিল করেছিলেন। বুদ্ধদেব কখনও চাননি তার শিষ্যরা তাঁকে ঈশ্বরের মত পূজো করুক। অথচ একশো খ্রীস্টাব্দের মধ্যেই মথুরাকেন্দ্রিক দলটির সদস্যেরা বুদ্ধের পাথরের খোদাই মূর্তি গড়ে পূজো শুরু করে। গুপ্ত যুগে সাঁচিতে যে বুদ্ধ মূর্তি আসে সেগুলি মথুরা থেকেই আনা।
স্তূপের ঠিক বাইরে দুটো অতি প্রাচীন মন্দির। যদিও মন্দিরের মত এদের মাথায় গম্বুজ নেই। বরং সাধারণ বাড়ির ছাদের মতো সমান। অনেকটা প্রাচীন গ্রিক বা রোমান মন্দিরের মতো। এর ডানদিকে আরেকটি মন্দিরের ভগ্নাবশেষ। তার থাম ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। যদিও সেই থাম দেখেই বোঝা যায় এক সময় এটি দেখার মতো মন্দির ছিল।
প্রথমদিকে তোরণের চারদিকে চারটি মূর্তি ছিল। এখন একটিই আছে, তাও অক্ষত নয়।
মৌর্য বংশের অবসানের পর সাঁচির স্তূপের উপর বারবার ব্যাপক ধ্বংসাত্মক আক্রমণ হয়। অশোকের স্তূপ ছাড়াও সাঁচির সমস্ত সৌধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও আঞ্চলিক মানুষ নতুন উদ্যমে কিছুটা মেরামত শুরু করেন। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক ছায়া সাঁচির উপরেও পরে। নতুন উদ্যমে মঠ স্তম্ভ নির্মাণের কাজেও ভাঁটা পড়ে। এবং শেষে একেবারে থেমে যায়।
তারপর গুপ্তযুগে দেশে কিছু শান্তি ও সমৃদ্ধি এলে সাঁচিতে কারুশিল্প ও স্থাপত্যের কাজ নতুন ভাবে শুরু হয়। এ সময়ই মূর্তির দেখা মেলে। এসময়ে সতেরো নম্বর মন্দিরটি নির্মিত হয়। এভাবে দুশো বছর কাজ চলতে থাকে। তারপর হুনেরা ভারত আক্রমন করে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
ছয়শো খ্রিস্টাব্দে আবার হর্ষবর্ধনের শাসনকালে বৌদ্ধধর্ম বিস্তার লাভ করে। সাঁচিতে বেশ কিছু মঠ ও মন্দির বানানো হয়। বারোশো খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এভাবে চলে। এরপর একদিন সব বন্ধ হয়ে যায়। বৌদ্ধ সৌধে হিন্দু ফলক দেখা দিতে থাকে। এসময় ঠিক কি ঘটে বলা যায় না। হিন্দুরা বৌদ্ধদের শেষ করে, নাকি বৌদ্ধরা এস্থান ছেড়ে চলে যান-সঠিক জানা যায় না। জাতপাতের বিচার না থাকায় বৌদ্ধধর্ম জনপ্রিয় হচ্ছিল। হিন্দুরা তাতে ক্ষিপ্ত হতেও পারে। যাই হোক্, সাঁচি থেকে বৌদ্ধরা বিদায় নেয়।
এরপর পাঁচশো বছর কেটে যায়। মানুষ সাঁচির কথা ভুলে যায়। মঠ–মন্দিরের উপর জঙ্গল গজায়। চোদ্দশো থেকে উনিশো শতাব্দী পর্যন্ত সাঁচি পরিত্যক্ত থাকে।
এরপর ১৮১৮ সালে ব্রিটিশ জেনারেল টেলার সাঁচির ধ্বংসস্তূপ আবিষ্কার করে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যদিও এতে অপকারই বেশি হয়। গুপ্তধনের আশায় পুরাকীর্তির উপর অত্যাচার চলে।
১৮২২ সালে ক্যাপটেন জনসন ভেতরে কি আছে দেখতে এক নম্বর স্তূপটি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত কেটে ফেলে। স্তূপের গায়ে প্রকান্ড ফাটলের সৃষ্টি হয় এবং পশ্চিমের তোরণ ভেঙ্গে পড়ে। দু নম্বর স্তূপও ধ্বংস হয়।
১৮৫১ সালে আবার দুই ও তিন নম্বর স্তূপ খোঁড়া হয়। এক নম্বর স্তূপের মধ্যে লোহার রড পাঠানো হয় কিছু পাওয়ার আশায়।
সাহেবদের সাথে স্থানীয় মানুষও হাত মেলায়। এক জমিদার অশোক স্তম্ভটি তিন টুকরো করে কেটে আখ মাড়াই করতে বাড়ি নিয়ে যান।
১৮৮১ সালের আগে সাঁচি সংরক্ষণের চেষ্টা হয় নি। সে বছর মেজর কোল এ কাজ়ে হাত দেন। পরে তিন বছর তিনি ও আরো পরে ভারতের আর্কিওলজিকাল সার্ভের ডিরেক্টর এ কাজে এগিয়ে আসেন।
মেজর কোল বিদিশাগিরির জঙ্গল কেটে গোটা পাহাড় পরিষ্কার করান। এক নম্বর স্তূপের ফাটল মেরামত করেন। পশ্চিম ও দক্ষিণদিকের তোরণগুলি তুলে যথাস্থানে স্থাপন করেন।
বাকি কাজ করেন স্যার জন মার্শাল। ১৯১২ থেকে ১৯১৯ সালের মধ্যে তাঁর কাজেই আজকে সাঁচি দেখা সম্ভব হয়।
সাঁচি বর্তমানে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। সৌধগুলি সংরক্ষণের জন্য জাপানও সাহায্য করে।
আজ যখন সারা পৃথিবী জুড়ে হিংসার শাসন চলছে তখন বুদ্ধের শিক্ষার দিকে ফিরতে হবে। ভোগবিলাস বাড়তে বাড়তে বিতৃষ্ণায় পরিণত হচ্ছে। স্বাভাবিক জিনিস আর সুখ দিতে পারছে না। মানুষের মন অস্বাভাবিক আর বিকৃতির দিকে চলেছে। এ সময়ই তো বুদ্ধের শিক্ষা স্নিগ্ধ প্রলেপের মত কাজ করবে।
তথ্যসূত্রঃআনন্দবাজার

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



