আজ আমাদের বিড়াল ‘মাউ’-এর সাথে সবার পরিচয় করাতে চাই।
আমাদের মাউ-এখন একজন খুব মমতাময়ী মা।
তার দুটি ছানা। একটি পুর সাদা, মায়ের প্রায় অবিকল, লেজটি কেবল হলুদ। আর বড়টি মনে হয় বাবার মত হয়েছে, গায়ে অল্পবিস্তর কালো লোম আছে। মুখটা একটু থ্যাবড়া, বেশ একটা গম্ভীর গম্ভীর ব্যাপার আছে। হুলো হতে হতে মেনি হয়ে গেছে। মাঝে একটু অসুস্থ হয়েছিল।
প্রথমদিনে আমাদের মাউ
আজ থেকে প্রায় ন’মাস আগে যখন ফুটবল বিশ্বকাপ চলছিল তখন মাউয়ের আগমন ঘটে আমাদের বাড়িতে। পস্ট মনে আছে সেদিনগুলোর কথা। একদিন সন্ধ্যেবেলা আমাদের বারান্দায় দেখি একটা পুঁচকে বিড়াল ছানা মিউ-মিউ করছে।
বিড়াল কখনও আমাদের বাড়ি পোষা হয়নি। আর বিড়ালের বেশ বদনাম। তাও, জলপাইগুড়ির বাড়িতে দু-একবার যে বিড়ালছানা তুলে আনিনি, তেমন না। কিন্তু কোনবারই বাঁচে নি। তাছাড়া ভুলো ছিল তাই বিড়াল পোষা সম্ভব হত না।
কলকাতায় বছর খানেক আগে একটি বিড়ালছানা এসেছিল দু’দিনের জন্য। এত ছোট ছিল যে সারারাত খুব কাঁদল। পরদিন রাগ করে বারান্দায় ঝুড়ির উপর বসান থাকল। ভাই ভাবছে আমি তুলবো, আমি ভাবছি ও ঘরে আনবে। এই করতে করতে ঘণ্টাখানিক পর গিয়ে দেখি তিনি নেই। ভাই সারা পাড়া ঘুরে বেরাল দুদিন ধরে। এস্মৃতি আমাদের দুজনকে বেশ কষ্ট দেয়।
মাউও খুব ছোট্ট এলো। সারা সন্ধ্যে-রাত খেললো, খেল। কিন্তু বাড়িতে বিড়াল পোষার একটু সমস্যা ছিল। তখন আমাদের সঙ্গে ছিলেন আমার কোকিলা। তিনি তো বিড়াল দেখে খুব রেগে গেলেন! তাই পরদিন ভোরবেলা ভাই কাছেই কালী মন্দিরে ওকে ছেরে এলো।
ওমাঃ, সেদিন সন্ধ্যেবেলা ঠিক তিনি আবার মিউ মিউ করে হাজির! এবার আর তাকে দূরে সরান গেল না। থেকে গেলেন আমাদের সঙ্গে। এতে একজন দুঃখ পেল বেশ। তিনি হলেন আমার কোকিলা।
আমার কোকিলা
এখানে কোকিলার কথা আগে বলতে হবে। আমার সব সময় দেখেছি জীবজন্তু খুব ভাল সঙ্গী হয়ে যায় বা আমি তাদের। খুব একটা মানসিক কষ্টের সময় কোকিলা আমার কাছে এলো। ওকে পেয়ে নিজে যেন অনেকটা অবলম্বন খুঁজে পেলাম।
খুব রাগী ছিল সে। তবে আমি রাগ করলে আবার ধিরে ধিরে ‘কুউ-কুউ’ করে আমায় ডাকতোও! খুব বেশি ওড়াউড়ি বা নড়াচড়া করতে পারত না। বসে বসে খেত, গান গাইত, একটু একটু থুপ্থুপ্ করে লাফিয়ে বেড়াত। অল্প অল্প উড়তেও শিখল। দুধের সর খেতে আর ফল খেতে খুব ভালবাসত। আর চা কেউ বললে হল! বিস্কুট খাওয়ার জন্য ছটফট্ করত। আমি কোকিলার সাথে খুব কথা বলতাম। ও আমায় খুব ঠোঁকরাতো- এটা ওর ভাল লাগত।
কিন্তু বিল্লু আসার পর তার আদরে ভাগ বসল। খানিকটা কোকিলা সরে গেল। ওযে এমন চলে যাবে চট করে ভাবিও নি। আমার কোকিলার কাছে ক্ষমা চাওয়ার ছিল। এই বসন্তে কোকিলা অবশ্যই আকাশে ডানা মেলে খুব উড়ছে। আমার কথা কি তার মনে আছে! হয়ত নেই! তবু আজ যে সুখি-এই ভেবে আমার খুব ভাল লাগছে। আগেও কোকিলের ডাক শুনতে ভাল লাগত। এখন শুনতে পেলে বড্ড আপনজনের ডাক মনে হয়, খুব ভাল লাগে।
আবার মাউয়ের কথায় আসি। তিনি কোকিলার মত শান্ত, অভিনামী মোটেও নন। তার অনেক দাবী। প্রথমে তো দুধ খেতে দিচ্ছি, অল্প খেয়ে আর খেতেই চায় না। এদিকে খালি কাঁদে। শেষে একদিন বাজার থেকে মাছ আসলে দেখি খুব চন্মন্ করছে। ভাই ছোট্ট মাছের টুকরো দিতে দিব্যি ঝাঁপিয়ে পরে খেলেন। তারপর থেকে তার মাছ ছাড়া আর কিছু মুখে রোচে না। সারা সপ্তাহের মাছ সংগ্রহ করে রাখতে হয়।
বাপ্পা মানে ভাইয়ের সাথেই সে খায়, শোয়, ওঠে, বসে। আর আমি তার আয়া। হাগু-হিসু করে সারা বাড়ি। শেষে অনেক ধম্কে ধাম্কে তাকে বাতরুমে টয়লেট করা শেখান হয়েছে। তবে তিনি এমনই বিজ্ঞ যে সারা পাড়া চরে এসে বাতরুমে যান টয়লেট করতে। অথচ মানুষের সে বুদ্ধি অনেক সময়ই থাকে না!
বাতরুমে মাউ
এরপর তার দুষ্টুমীর কথায় আসি। ছোট্ট মাউয়ের প্রথম লক্ষ্যই হল আমার কোকিলা। তাকে এদিক ওদিক দিয়ে ছুঁতেই হবে-এটা তার কাছে খেলা। কিন্তু কোকিলা তা মানবে কেন! তিনিও দিলেন একদিন ঠূঁকড়ে! ছোট্ট মাউ তো ভড়কে গেল! ব্যাস! দুজনের বন্ধুত্বের পথ বন্ধ হল।
এরমধ্যে মাউ কিছুটা বড় হয়েছে। যারাই বাড়ি আসে বিড়াল পোষার জন্য বকে। ইঞ্জেকসন দেওয়া হল, ভ্যাকসিন করা হল! এত আঁচড়াল কেন! বিষ হবে যে! -ভয়ে ভয়ে আছি।
মিঃ কর ও তার পুষ্যিরা
ব্লগের দুই বন্ধু আশ্বাস দিলেন এসব ভয়ের ব্যাপার নয়। এসময় মিঃ করের সাথে পরিচয় হল। রিটায়ার মানুষ, পেনসনের টাকা চলে যায় ছয়-সাতটি বিড়ালের পরিচর্চায়। এখন আবার দু-তিনটি কুকুরও জুটেছে। ওনার স্ত্রী আবার এসব পছন্দ করেন না। বয়েস হলেও মিঃ করের মনে কখনও কোন দুঃখ দেখি না। তিনি বড্ড ব্যাস্ত তার পুষ্যিদের নিয়ে। তিনটি চোখ-না-ফোঁটা বিড়ালছানা তুলে এনে তাদের এই তাগড়াই করে তুলেছে। এর মধ্যে অন্য দুটি বিড়াল হারিয়ে গেছে। তাদের খুঁজে দিলে পুরস্কার ঘোষনা করেছেন ১০০টাকা। পাড়ার কচিকাচারা খুব জোড়তাড় লেগেছে। এখনও খোঁজ় মেলেনি।
তার কাছ থেকে মাউয়ের পরিচর্চার পাঠ নিচ্ছি, আমাদের মাউও কোকিলার মত খাই খাই স্বভাবের হচ্ছে শুনে উনি বললেন, বিড়ালের কেজি প্রতি ৫গ্রাম খাওয়াবে।
এদিকে, মাউয়ের পাড়া ঘোরা স্বভাব হল। ভাই ঘরে আটকে রাখে, সে কুঁই কুঁই কাঁদে। বিড়াল যে কুকুর নয়, তাকে যে আটকে রাখা যাবেনা, অনেক কষ্টে বোঝান হল। তারপরের দু-তিনদিনের জন্য মাউ নিখোঁজ। একটু-আধটু বোকুনিও খেতে হল। আমরা ভাবছি মরে গেল নাতো! শেষে তিনি রোগা-নোংরা হয়ে ফিরলেন। তারপর প্রায়ই এই কান্ড! মিঃ কর বললেন চিন্তা নেই এক বছরের আগে বিড়াল মা হয়না। কিন্তু ভাই একদিন বললো মাউ মা হবে। পেটটা একটু উঁচু। আমি বল্লাম পেট ঠুসে খাওয়ার ফল। কিন্তু ধিরে ধিরে বোঝা গেল আমাদের মাউ মা হচ্ছেন!
শেষে জানুয়ারীর বারো তারিখ, দিনটা মনে আছে কারণ স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন, দুপুরে মাউ মা হল। [তার ক’দিন পরে আঠারো তারিখ কোকিলা চলে গেল।]
ছোট্ট ছানারা
সে এক অভিজ্ঞতা! সেদিন আর মাউ অন্যদিনের মত করছিল না। খালি আমার পায়ে পায়ে ঘুরছে, ঘ্যান ঘ্যান করে কাঁদছে। খেতে দিলে খাচ্ছে না। চারদিকে ঝুড়ি, বাক্স ভাই সাজিয়ে রেখেছে, সব নিজের গরম জামা দিয়ে।
দুপুরে আমার কোলে মাউ শুয়ে। হঠাৎ ব্যাথায় খিঁচিয়ে উঠল। কি প্রচন্ড কষ্ট! আমার জীবনে এই প্রথম কাউকে এত সামনাসামনি মা হতে দেখলাম। কি করবো বুঝতে পারছি না। এ্যানিমেল প্ল্যানেটে এসব দেখেছি। খাটেই চাদর পাতলাম। মাথায় হাত বোলাচ্ছি। কষ্টে মাউ বেঁকে বেঁকে যাচ্ছে। আমি ভাবছি এত ছোট! মরেই না যায়। এক সময় খুব জোর কোৎ দিয়ে উঠল আর পিছন থেকে একটা কালো সরু লেজ আর একটু মাংসপিন্ড বেরিয়ে এলো। মাউ আর খাটে থাকল না। লাফিয়ে মাটিতে নামলো। খাটেরতলায় বড় একটা কাঠের বাক্স ওর জন্যই রাখা ছিল। সেটায় গিয়ে ঢূকলো। আমি ভয়ে আর কাছে যেতে পারলাম না। তারমধ্যেই তিনবার আর্তচিৎকার শুনে আন্দাজ করলাম তিনটি বাচ্চা হয়েছে। ভাইকে ফোন করে তাইই বল্লাম। রাতে ভাই বাক্স টেনে বার করে দেখে দুটি শিশু!
ছোটটির দশদিনে চোখ ফুটেছিল, বড়টির চোদ্দদিনে। তারা এখন বাড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বড়টি বেশ গুবলু। মাকে পেলেই দুধ খায়। ছোটটি মায়ের মত সুন্দরী। কিছুটা ভাবুক। বড়টিকে মুটকি আর ছোটটিকে শুটকি বলতাম। একমাস হয়েই মাউ ছোট ছোট ইঁদুর ধরে আনতো। বড়টি তাই বেশ গপ্গপ্ করে খেত। আবার কি রোয়া ফুলিয়ে গড়গড়ানি! মাও পালাত! সেইটি ক’দিন কেন যেন খাওয়া ছেরে দিল। আমি ভাবলাম মরে না যায়। মায়ের দুধ আর জল খালি খেত। এখন একটু ভাল আছে। এই সুযোগে ছোটটি বেশ লম্বা হয়ে গেছে আর বড়টি সাইজ়ে ছোট। তারা সারাদিন মারামারি করছে। মাও তো ছেলে মানুষ! তিনিও যোগ দিতে চান। কিন্তু মেয়েরা নেয় না। মা ভেবলু হয়ে যায়। আমার কাছে চলে আসে।
তবে মা হিসেবে মাউ খুব দায়িত্ববান! কোথা থেকে কোথা থেকে আরশোলা ধরে আনে। এখন আবার ধেড়ে ইদুঁর ধরে আনছে, সেটা খুবই বিরক্তিকর! তো, মাউ দেখি মেয়েদের গাছে চড়াও শেখাচ্ছে! আবার গাছে মেয়েরা চড়ে বসে থাকলে আমার কাছে এসে কাঁদছে! ছেলেমানুষ মাউ মাঝে মাঝে মেয়েদের কথা ভুলে যায়। আবার, মনে পরলেই দৌড়ে দৌড়ে আসে।
এখন কথা হচ্ছে তিনটি মেয়ে বিড়াল নিয়ে কি করা যায়! এখন ওদের বয়স দু’মাস হয়েগেছে। আমি বলছি আমাদের বাজারে ছেরে আসতে বাচ্চাদুটোকে, কিন্তু ভায়ের বড্ড মায়া। কিন্তু তিন মাস হয়ে গেলে আমাকেই মনে হয় চুপচাপ দুটিকে ছেড়ে আসতে হবে। আমাদের বাড়িতে এতগুলো বিড়াল রাখা সম্ভব না। একটির জন্যই অনেক কথা শুনতে হয়। দেখা যাক কি হয়। আমারও খুব কষ্ট হবে, কিন্তু ওদের ভালর জন্যই ওদের ছাড়তে হবে। ফ্রিএডে বিজ্ঞাপনও দিয়েছি- কিন্তু কিছুই হল না!
আমাদের ইন্দি-বিন্দি, উঁকি মারে গাছের আড়াল থেকে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



