রক্ষিতা নয়, নারীকে মানুষ ভাবুন
এস সুলতানার ব্লগ ঘুরে এলাম, কোনো মন্তব্য করিনি। তিনি আমার ঘরে এসে লিখে গেলেন, কী খবর কবি কোনো মন্তব্য যে করলেন না। এর উত্তরে নিজের ঘরে লিখেছিলাম -
এরা এতো বেশি নড়ে যে কলসির তলানি পর্যন্ত দেখা যায়। কিছুই নেই, শূন্য ঠুনকো। তারপর একজন কবির ভাষা কেমন হওয়া উচিৎ আর তারা কী চর্চা করছেন, সেসব দেখে খুবই হতাশ হতে হয়। যদিও কোনো হতাশাই বেশিদিন থাকে না। নিরন্তর এক ‘জাগানিয়া’ সবক আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। কবিতা সম্পর্কে ভাবার আগে এর পারিপার্শিক নিয়ে ভাবা সবচে জরুরি। একজন মানুষ কতটা ভালো-উত্তম কবিতা/সঙ্গীত/অঙ্কন/নৃত্য/অভিনয় করলেন সেটা আর আমার কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। তারচে তিনি মানুষ হিসেবে নিজেকে কীভাবে প্রকাশ করলেন এবং বাস্তবে এর প্রতিফলন নিজের মধ্যে দেখা গেল কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকের লেখার আকুলতার চেয়ে খ্যাতির ব্যাকুলতাই স্পষ্ট। এই ব্যাকুলতা প্রমাণ করে, দূর্লভ অর্জন নয় দুর্বল প্রাপ্তিতেই তৃপ্ত। বিশেষ করে ‘কাব্য-আকুলতা’য় যে ধ্যান সেটা অবশ্যই কৃত্রিম ‘মাদকনেশা’র ধ্যানকে বুঝলে, ভ্রান্তির দিকে গড়াবার যথেষ্ট অবকাশ রয়ে যায়।
কাজল রশীদের কবিতার সূত্র ধরে এ ব্যাখ্যা দাঁড়াতে পারে, আমরা রেগে গেছি আমাদের হাড় ও লালসাকে চিনতে পেরে। একটি অলস প্রাণী এতো কাছ থেকে উগরে দেয় গামলাভর্ত্তি বমি। অতঃপর নিজেকে প্রমাণ করতে চায়, আমি মানুষজনের সঙ্গেই আছি।
ইদানিং ব্লগার কবিদের কিছু গদ্য-পদ্য পাঠ করে অনুভব করলাম, আমরা কীভাবে মুখোস পরে থাকি। কিন্তু প্রতিদিন চাষ করি সুন্দর সুন্দর কথার ঝুড়ি এবং হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হই, শুদ্ধতা ও সততার সিম্ফনি। অথচ নারীকে জেন্ডার-ভেদে গালি দেই ‘রক্ষিতা’ বলে। নারীকে এখনও মানুষ ভাবতে শিখিনি। কি লজ্জা।
একজন গেওর্গে আব্বাস প্রচুর লিখছেন, পোস্ট করছেন। সবকিছুকে (কখনও নিজেকেও) একটি কৃত্রিম-মিথ করার প্রাণপণ প্রচেষ্টাও লক্ষ্যনীয়। ভাষা যেমনই দাঁড়াক,তার চিন্তা যে স্বচ্ছ নয়, ট্রিপিকাল বাঙালিই রয়ে গেছেন ‘রক্ষিতা’ গালিটাই তার (আব্বাসের)-অনুশীলনের প্রকাশ। এ ধরণের অনুশীলন নিয়েই তিনি কাব্য চর্চা করছেন - যেমনটি তার লেখায় ঘনঘন উচ্চারিত হয়। তিনি আর উল্লম্ফন আড়াল করতে পারলেন না, সতত চেষ্টা করেও। একটি শব্দ কীভাবে মানুষের চোখ-কান-নাক উলঙ্গ করে দেয়। এ শব্দ উচ্চারণকারীর সঙ্গে অসংখ্য ভঙ্গুর তিকতিকে-ঘা লেহন করতে করতে, একটি রক্তজবা দা নিয়ে ছুটতে থাকে।
কবিতার অন্য এক নাম শুদ্ধতার প্রতীক। মানুষের মন কুলষমুক্ত না হলে কবিতা লেখা যায় না। অভ্যাসবশতঃ যা হয় তাও এক কৃত্রিম-অঞ্জলি। অতঃপর তাকে শুদ্ধতার দিকে ফিরে যেতে হলে, শেষ পর্যন্ত কবিতাকেই অবলম্বন করতে হয়।
রাতুল প্রসঙ্গ বাদই দিলাম। যেহেতু তিনি নিজ-ভাষ্যে বলেই দিয়েছেন কোনো যুক্তিতর্ক-প্রমাণ-তথ্যের প্রয়োজনবোধ করেন না।
এস সুলতানার ঘরে কোনো কোনো মাস্তান কবিদের এতো কোলাহল দেখে মনকে স্থির করলাম. এসব প্রসঙ্গ লিখলেও তার সরল উপাস্থাপনার জায়গায় গিয়ে অন্যায়ভাবে তাল টুকবো না।
গেওর্গে আব্বাস যখন সুলতানাকে বলেন, কাউকে উপস্থাপন করলে প্রটেক্ট দেয়ার দায়িত্বও আপনার। দেখেন না আমার পাড়ায় মাথা তোলার সাহস দেখায় না কেউ (অবশ্য নিজের পাড়ায় নিজেই নিকনামে লিখেন, আবার নিজেই নিকনামে তালিয়া বাজান)। তার এই বাহাদুরী দেখে ভাবলাম, কবির আবার লাটিয়াল বাহিনীও লাগে। লাটিয়াল বাহিনী তিনি পোষতেই পারেন। ‘আভিজাত্যের নীলরক্ত’ (!) শরীরে নয়, মগজেই থাকে (যেহেতু সবার রক্তের রঙ লাল)। এই ব্লগি কবিদের মধ্যে যারা অরক্ষিত হয়ে আছেন, চাইলে তারা লাটিয়ালদের ভাড়াও খাটাতে পারেন। এই দৈন্যচেতনের আরেক নাম ন্যুজ্জ মানসিকতা।
অবশ্য এমন অর্বাচীনদের হাত থেকে কারোর আত্মারক্ষার প্রয়োজন বোধ হলে, মননে শুদ্ধ-কবিরা নিজেই বর্ম তৈরি করে নেবেন কবিতার মাধ্যমে। লাটিয়াল আর মাস্তান কবিদের দৌরাত্ম বেশিদিন টেকেও না, সে আপনিই ঝরে যায়। আমাদের কবি কাজল রশীদের রাগটা এই জায়গায় এসেই রুখে দাঁড়ায়। তিনি কবি বলেই ক্রোধান্বিত হয়ে নিজকে সপে দেন কবিতার বাতাবরণে - সেখানে লুকিয়ে যায় সমস্ত অন্ধকার। কবির এই শক্তি যে একবার অনুভব করে সে আর অরক্ষিত থাকে না। কবি তো চিন্তা-চেতনায় কখনই অরক্ষিত নন। অতএব প্রকৃত কবিকে প্রটেক্টেরও দরকার পড়ে না।
চলবে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

