রোজকার মতো মেয়েটি সেদিন ঢাকার কারওয়ান বাজারের আন্ডারপাস পার হচ্ছিল। হঠাৎ আন্ডারপাসের বের হওয়ার মুখে একজন লোক তার গায়ে পানি ছিটিয়ে দেয়। মেয়েটি ঘুরে দেখার আগেই লোকটি দ্রুতগতিতে সরে যায়। এরপর মেয়েটি যখন বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের লিফটে উঠবে এমন সময় সেই লোকটিকে দেখতে পায়। লিফটে ঢুকে এবার সে জিজ্ঞাসা করে লোকটিকে, কেন গায়ে পানি দিয়েছেন? লোকটি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে জবাব দিল, মেয়ে হয়ে রাস্তায় বের হয়েছেন কেন? এই কথা শুনে লিফটের প্রতিটি পুরুষ হাসতে শুরু করে। যেন এর থেকে বড় রসিকতা তারা আগে কখনো শোনেনি। মেয়েটি বুঝতে পারে না কী করবে। এতগুলো মানুষের কেউই প্রতিবাদ করল না। বরং তাকে নিয়ে হাসল। মেয়েটির অপমানে মাথা নুয়ে এল। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কেন, ইভ টিজিয়ের ঘটনায় প্রতিবাদ করেন না পাশের মানুষটি? এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা বলেন---
একজন এগিয়ে এলে বাকিরাও সাহস পাবেন--
রাফি আল মাহমুদ,
সপ্তম সেমিস্টার, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সব পরিবেশ-পরিস্থিতিতে চাইলেও প্রতিবাদ করা যায় না। একবার আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ একজন একটা মেয়েকে দেখে বাজে মন্তব্য করে। মেয়েটি শুনতে পায়নি। কিন্তু আমার নিজের কাছে খারাপ লেগেছে। আমারও পাঁচটি বোন আছে। সঙ্গে সঙ্গে ওকে বললে হয়তো কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাত। পরে আমিসহ অন্য বন্ধুরা ওকে বলেছিলাম, সেদিন তোমার এ ধরনের মন্তব্য করা উচিত হয়নি। সবাই মিলে ভালোভাবে বুঝিয়েছিলাম। সে বুঝতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, মেয়েরা নিজেরাই বিষয়টিকে এড়িয়ে যায়। ভাবে খামোকা ঝামেলায় জড়ানো। মেয়েটির সঙ্গে যদি অন্য কোনো মানুষ থাকে তাকেও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। ফলে মেয়েটি নীরবে সহ্য করে, প্রতিবাদ করে না বা প্রতিবাদ করতে দিতেও চায় না। যদি প্রতিবাদ করে আমার ধারণা, অবশ্যই তাকে সাহায্য করবে মানুষ। আমি মনে করি এখনো আমাদের দেশে বিবেকবান মানুষ আছেন। প্রতিবাদ করলে ক্ষতি হবে বা মরে যাওয়ার ভয়ে তারা চুপ করে থাকেন না। কখনো আমার সামনে এ ধরনের পরিস্থিতি এলে মেয়েটির সাহায্য ও সমর্থন প্রয়োজন হলে অবশ্যই তাঁর পাশে দাঁড়াব। ভয়ে অনেকে চুপ করে থাকেন। একজন এগিয়ে এলে বাকিরাও সাহস পাবেন বলে মনে করি।
হয়রানির ভয়, আশপাশের সমর্থন না পাওয়ার কারণে প্রতিবাদ করা হয় না--
তুষার চক্রবর্তী,
দ্বিতীয় বর্ষ,- কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, -বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
প্রথম কথা হলো আমরা দেখি উত্ত্যক্ততার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মিজানুর রহমানের মতো শিক্ষক ও চাপা রানী ভৌমিকদের মতো মানুষের প্রাণ হারাতে হয়। প্রতিবাদ করতে গিয়ে কেউ তো সুফল পাচ্ছে না। জীবনের ভীতি মানুষকে পিছিয়ে দেয়। নিজের পরিবারের কেউ হলে প্রতিরোধ করে। কিন্তু অন্যের কিছু হলে মনে করে এসব নিয়ে আমার ভাবার দরকার নেই। অন্যের সমস্যা তো আমার না। এটিও ঠিক যে প্রতিবাদ করলে কোনো প্রশাসনিক সাহায্য আমি পাব না। হয়রানির ভয়, আশপাশের সমর্থন না পাওয়ার কারণে আমিই হয়তো এগিয়ে যাব না। যেমন অন্যরা যায় না। তবে সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এটি কখনোই প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ করা যাবে না।
ওদের সঙ্গে তো পেরে উঠব না--
হাসনাইন শাহরিয়ার,
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, শেষ সেমিস্টার, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
অনেকে ভয় পান। কেউবা ভাবেন অহেতুক ঝামেলায় জড়ানো। কারও মনে আসে নিজেকে বাঁচিয়ে চলাই ভালো। নিজের তো সমস্যা না। আমার মনে হয় এসব নানা কিছু ভেবে ইভ টিজিং দেখলেও এগিয়ে আসে না মানুষ। আমি নিজেও যদি দেখি একদল ছেলে মিলে মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করছে তাহলে হয়তো চুপ করেই থাকব। ওদের সঙ্গে তো পেরে উঠব না। এককভাবে প্রতিবাদ করে কোনো লাভ নেই। প্রাণ হারানোর, নানা ক্ষতি হওয়ার ভয় থাকে। আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে না। যদি আমার এলাকায় ঘটনা ঘটে বা যেখানে আমি সব ধরনের সমর্থন সহযোগিতা পাব সেখানে আমি বখাটেদের প্রতিরোধ করব।
বিশেষজ্ঞ মতামত--
চাই সাহসী মানুষ--
মিজানুর রহমান,
চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন
একদিকে দেশে আইনের শাসনের সংকট, অন্যদিকে কেউ ঝামেলায় জড়াতে চায় না। সবচেয়ে বড় কারণ নিরাপত্তার কথা ভেবে কেউ এগিয়ে আসতে চায় না। তাই প্রথমে দরকার দেশে আইনের শাসন কার্যকর করা। কেউ যদি উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারান তার পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। তাহলে অন্যরাও মানবিক বোধসম্পন্ন হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থেকে ‘ব্রেভ ম্যান ক্যাম্পেইন’ নামে শুধু ছেলেদের স্কুলে বিশেষ প্রচারণা চালানো হবে। উত্ত্যক্ত করার প্রতিরোধবিষয়ক শপথ করানো হবে। যেসব ছাত্র এটি মেনে চলবে পরবর্তী সময় তাকে ব্রেভ ম্যান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এমনকি তারা যেন কোনো উত্ত্যক্ত করার ঘটনা দেখলেও প্রতিরোধ করে সেটিও শেখানো হবে। এটি যদি এলাকাভিত্তিক করা যেত সুফল পাওয়া যেত। তবে আইনের শাসন বড় জরুরি।
এবারে আমার নিজের অভিমত----
না, আমি বিশ্বাস করি এখনো আমরা পুরোপুরি পশু হয়ে যাইনি। এখনো পথে ঘাটে অনেক মানুষ আছেন যারা প্রতিবাদ করেন। একজন হযরত আলীর কথা নিশ্চয় মনে আছে আপনাদের? সম্প্রতি আমাদের একজন সহ-ব্লগার 'সর্বনাশা' দেখিয়েছেন যে আমরা এখনো পঁচে যাইনি। কিন্তু আমি মনে করি এই ভয়ংকর সামাজিক রোগটি থেকে সেরে উঠতে হলে আমাদের সকলের যেমন আন্তরিক হওয়া জরুরী তেমনি দরকার প্রশাসনের সাহায্য। আমি নিশ্চিত এখানে অনেকেই এই লেখাটা পড়ছেন যারা রাস্তাঘাটে এমন উদ্ভুত পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ করতে চান কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেই হয়রানির শিকার হবার ভয়ে পিছপা হয়ে আসেন। কারন সাধারণত যেটা হয় তা হল--- এই সকল পরিস্থিতিগুলোতে কিছুক্ষণের মাঝেই একটা জটলা তৈরি হয় রাস্তায়, জটলা দেখে কিছুক্ষণ পর পুলিশ চলে আসে এবং এসে যখন দেখে যে -- এই ঘটনা থেকে তার উপরি কামানোর কোন সুযোগ নাই তখন সে যারপর নাই বিরক্ত হয়। এবং সেই বিরক্তির প্রকাশ সে সাধারণত ঘটায় সেই প্রতিবাদকারী লোকটির উপর। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে-- ঐ মিয়া আপনি এখানে আগ বাড়াইয়া মাতব্বরি করতে আসছেন কেন? আইন নিজের হাতে তুলে নিতে আসছেন কেন আপনি?
আমি এমনকি পুলিশ (কনস্টেবল) কে নিজ চোখে দেখেছি সুন্দরি নারী রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দেখে নোংরা কথা বলে উঠতে!
আরও বহু বলা যায় এমন। সারা দিনেও শেষ হবে না। শুধুই অরণ্যে রোদন করা হবে।
বিঃ দ্রঃ লেখাটার প্রথম কিছু অংশ আজকের প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণ থেকে নেয়া, শেষের অংশটুকু আমার লেখা।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মে, ২০১২ রাত ১১:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


