আমার নানাবাড়ি খুলনা শহরে। নানাজান নিজে পড়ালেখায় ব্যর্থ হয়ে পড়াশুনার মহত্ত্ব বুঝতে পেরে কালবিলম্ব না করে সাতক্ষীরার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে খুলনা শহরে সহায়ী হন। কিন্তু পরবতর্ীতে পুত্রদের ব্যর্থতায় শহুরে জীবনের উপর তার মন উঠে যায়। কিন্তু কন্যাদের অসাধারণ একাডেমিক সাফল্যের কারণে গ্রামে ফিরে যাওয়া নানাজানের আর হয়ে উঠে নি।
আমার নানাবাড়িটা অনেকটা বনেদী জমিদার বাড়ির মত। ছোটবেলায় মনে হত রাজপ্রাসাদে এসেছি। বিশাল উঁচু মনে হত মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতাকে আর গেটের পাশের দেয়ালটিকে। পরবতর্ীতে যত বড় হতে থাকলাম দেখি ছাদ ও সীমানা প্রাচীরের উচ্চতা তত কমতে লাগল। ইদানিং সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হয়। তার করন মনে হয় মামুজানদের বছর বছর মেরামত ও ইন্টেরিয়র ডেকরেশন বৃদ্ধি এবং সিটি কপের্ারেশনের বছর বছর রাস্তায় কার্পেটিং।
যাই হোক, সংখ্যায় মামাত-খালাত ভাই বোনরা ছিলাম এক ডজন। বলে রাখা ভাল যে নানাজানের পুত্রকন্যার সংখ্যা ছিল 9টি। এর মধ্যে কিছু িছল দুধ-ভাত।সেজ খালার দুইটার সাথে বাকিদের বয়সের পার্থক্য একটু বেশি হওয়ায় বেচারারা এখনও দুধ-ভাত ক্যাটাগরিতেই রয়ে গেছে। সমস্যা ছিল মেয়েদের আধিক্য ও সিনিয়র লেভেলে ছেলেদের অনুপসিহতি। আমরা ছেলেরা ছিলাম সংখ্যায় মোটে তিনজন। তাই অনেকটা সিংহের পালের মত ফিমেল ডমিনেটেড সোসাইটি ছিল সেটা। বলতে দ্্বিধা নেই প্রায়ই এসব নিয়ে গ্যাঞ্জাম হত এবং আমরা ছেলেরা সকালে আলাদা হয়ে বিকালে আবার নিঃশর্ত আত্নসমর্পন করতাম। কারন পালের দুই গোদার মত ফিচেল বুদ্ধি আমাদের মাথায় আসত না। তাছাড়া বয়সটাও একটা কারন । 4/5 বছর বয়সে স্বাধীনভাবে কিছু করার প্যাঁচ মাথায় খেলত না।
নানাবাড়ির সামনের রাস্তার বিপরীতে আছে বস্তি। এই বস্তির বাচ্চা-কাচ্চা ড্রেনে প্রাতঃক্রিয়া সম্পন্ন করত। আমাদের কাজ ছিল ছাদ থেকে ড্রেন নিয়মিত পরিদর্শন করা ও কাউকে প্রাতঃক্রিয়া করতে দেখলে দল বেঁধে ইট-পাটকেল বর্ষণ করা।ছোট পোলাপানদের এই জাতীয় কাজে উৎসাহের কমতি থাকে না। বেশি উত্তেজিত হয়ে প্রায়ই ইট পড়ত রিকশ ওয়ালা বা রিকশার যাত্রীদের উপর। ফলাফল নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। রাতের বেলা ছাদে গোল করে বসে বলা হত ভূতের গল্প। এই গল্প বলাতে ওস্তাদ ছিলেন আমাদের গ্রুপ লিডার।তার গা ছমছমে বর্ণনা শুনে রাতে ঘুমাতে পারতাম না। আরও ছিল পাশের ছাপড়া দোকান থেকে বরইয়ের আচার কিনে খাওয়ার হিড়িক। আট আনা মূল্যের সে আচার 12 জনের জন্য কিনতে কিনতে বোধকরি নানাজানের পকেট গড়ের মাঠ হয়ে যেত।
সবচেয়ে বেশি মজা হয়েছিল যেবার নানি মারা গেল। থাকার জায়গার অভাবের কারণে আমাদের 12 জনকে মেজ খালার বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হয় খালুর দায়িত্বে। খালু আমাদের মনের কথা বুঝতে পেরে সম্ভবত নিচতলায় নিজের ভাইয়ের বাসায় থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলাফল: আমরা হয়েছিলাম একটি বাড়ির মালিক যেখানে কোন খবরদারি করার লোক নেই। সেসব স্মৃতি ভুলি কিভাবে?
এখন আর আগের মত ঘটা করে নানাবাড়ি যাওয়া হয় না। খালাত-মামাত ভাই-বোনেরাও জীবিকার প্রয়োজনে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে বিয়ে-শাদি করে কাচ্চা-বাচ্চার মা-বাবাও হয়েছেন। তাই ওই দিনগুলোতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ আর নেই। তবে স্মৃতির ফ্রেম থেকে কেউ সহজে স্মৃতিগুলোকে খুলে নিতে বা মলিন করে দিতে পারবে না। কারণ আজও যখনই এই 12 জনের কারও সাথে দেখা হয়, ঘুরে-ফিরে চলে আসে সেই সোনালি দিনগুলোর কথা।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



