চিকুর নাম 'চিকু' হবার আর কোন কারন নেই। ওর টিঙ-টিঙে, শীর্ণকায় গড়নই ছিল এর কারন। এত হাল্কা-পাতলা ছিল যে ওর বুকের হাড় একটা আরেকটার সাথে লেগে থাকত (এখন কি অবসহা জানি না)। স্কুলে ওর আরও দু'টো নাম প্রচারের চেষ্টা হয়েছিল- টিকটিকি ও আসমানী (জসীমউদ্দিনের কবিতা অনুসারে)। তবে চিকু নামটাই শেষ পর্যন্ত সহায়ী হয়।
ঘটনা এক
......................
টিফিন পিরিয়ডে বিপুল উৎসাহে ফুটবল খেলা হচ্ছে। চিকু যথারীতি দুধ-ভাত। গোলকিপারের এ্যাসিসটেন্ট হিসাবে ওকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে 'ব্যাগি' পজিশনে। আমাদের 'মাজলম্যান' জাহেদ চিকুর বিপরীত দলে খেলছিল। হঠাৎ মাঝমাঠ থেকে জাহেদ একটা বল ক্লিয়ার করার জন্য দারুন একটা কিক নেয়। চিকু তার দিকে ধেয়ে আসা উড়ন্ত বল দেখে উলটা ঘুরে দৌড় দেয়। কিন্তু বিধিবাম। ঐ বল ঠিকই পলায়নরত চিকুর মাথায় পিছন থেকে আঘাত করে। ফলাফল: চিকু মাটিতে চিৎপটাং। আজব ব্যাপার হলো সে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়েছিল ও কোন সাড়াশব্দ করছিল না। আমরা সবাই গিয়ে ধাককা-ধাককি করাতে সে উঠে বসে বলে, "জাহেদ্দা রে আমি আইজকা মাইরা ভতর্া বানাব।" জাহেদ বাদে আমরা সবাই ফ্যাক ফ্যাক করে হাসি আর জাহেদ হাঁপ ছেড়ে বলে "দোস্ত, যা ডরাইছিলাম, আমি তো ভাবছি শালা মনে হয় বাঁইচা নাই আর আমি মাডর্ার কেসে ফাঁইসা গেছি "।
ঘটনা দুই
.............................
চিকু আর আমাদের মাহমুদ ক্লাসের মাঝে পাশাপাশি বসে আড্ডা দিচ্ছিল। এমন সময় একসিডেন্টালি স্যারের কাছে মাহমুদ ধরা পড়ে গেল। আজহার স্যার খুবই রাগী মানুষ। দেখতে পেয়েই স্কেল নিয়ে ছুেট এলেন মাহমুেেদর কাছে ও সপাসপ স্কেলের বাড়ি দিতে লাগলেন মাহমুদের পিঠে। স্যার একেকটা বাড়ি দেন মাহমুদের পিঠে আর চিকু প্রতিবার বাড়ির সাথে সাথে কেঁপে কেঁপে উঠে। এই দৃশ্য দেখে ব্যাটা মাহমুদ ফিক ফিক করে হাসে আর স্যার আরও তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেন। পুরা ঘটনা দেখে আমরা বাকি ক্লাস আরও জোরে জোরে হাসি।
ঘটনা আড়াই
............................
আজহার স্যার বিজ্ঞান পড়াতেন আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার 15-20 টা পয়েন্ট ধরা মাত্র গড় গড় করে বলতে না পারলে বেতের বাড়ি খাওয়া লাগত। কিন্তু স্যার নিজে ছিলেন বিশ্ব নোংরা, এজন্য তার কোডনেম ছিল "নোংরুস্যার"। সবচেয়ে বাজে যে অভ্যাসটা ছিল উনার তা হলো ঘন ঘন ডান হাত দিয়ে নাক ঝেড়ে প্যান্টে মুছতেন ঐ হাত। খুবই বিদঘুটে একটা ব্যাপার। তবে নাক ঝাড়তে ঝাড়তে উত্তেজিত হয়ে পড়লে তো কথাই নেই। আমাদের ফরিদকে এমন অবসহায় উত্তেজিত হয়ে স্যার একবার কানমলা দিয়েছিলেন। কানমলার পর ফরিদের কানে লেগেছিল স্যারের নাকের ময়লা। শরীর গুলানো, গা ঘিন ঘিন করা ভয়াবহ ব্যাপার। যাই হোক, চিকু একবার এই প্যাঁচে পড়ে গেল। স্যার উত্তেজিত হয়ে ওর কানমলা দিতে গেলে, চিকু চেঁচাতে থাকে "স্যার মারলে মারেন কিন্তু ওই হাতে আমাকে ধরবেন না"। আমরা সারা ক্লাস বেচারার করুণ অবসহা দেখে হাসি আর চিকু চিৎকার করতে থাকে। আর আজহার স্যার? চিকুর কান মলে বলতে থাকেন "আরেকবার আমার নামে বাজে কথা বললে তোর মাথা আমি ছিঁড়ে ফেলব।"
ক্লাস শেষে আমরা সবাই চিকু কে ক্ষ্যাপাতে থাকি বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মত "আমার যৌবন পাবি কিন্তু ঐ হাতে আমার কান ধরতে পারবি না শয়তান"। আর চিকু বেচারা রাগে ফুঁসতে থাকে।
পরিশিষ্ট
............................
চিকুর সাথে শেষবার দেখা 1997 সালে। 10বছর কেটে গেছে এরপর । দেখা পাই নি। শুনেছিলাম প্রাইভেট এক মেডিকেলে চিকু ডাক্তারি পড়ত। আশাকরি আমার বন্ধু ডা. চিকু ভালোই আছে। তবে ওই স্বাসহ্য নিয়ে কিভাবে ডাক্তারি করে দেখতে মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু জানি না কোথায় আছে চিকু। ভবিষ্যতে কখনও দেখা হলে অবশ্যই সবাইকে জানাব ও লিখব এই লেখার 2য় পর্ব।
(আগামী পর্ব আসতে পারে ভবিষ্যতে। তবে কবে জানি না।)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


