অভাব-অনটনকে সঙ্গী করে খায়রুল বাশার সবুজ কয়রা সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। উপজেলার ৫ নং কয়রা গ্রামের দিন-মজুর আব্দুল খালেক গাজীর তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবুজ জ্যেষ্ঠ। অভাবের সংসারে রাতের পড়ার জন্য কেরোসিন তেল কেনার পয়সা ছিল না তার বাবার। পরীক্ষার রেজাল্টের দিন সে ও তার বাবা পবনা ভাঙ্গনে দিন-মজুরেরকাজ করছিল। পরীক্ষার সময় অনেকদিন না খেয়েও তাকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। প্রায়শই সবুজ পরের জমিতে কামলার কাজ করে থাকে। মাদ্রাসার শিক্ষকরা তাকে প্রায়ই সহযোগিতা করতেন। দাখিল পরীক্ষার পর উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজে ভর্তি বা বই কেনার টাকা-পয়সা জোগাড়ের দুশ্চিন্তা তাকে পেয়ে বসেছে। পিতার পক্ষে এ অর্থ জোগান দেয়া সম্ভব নয়। পিতা আব্দুল খালেক ও মা রিজিয়া খাতুন তার ছেলের উচ্চশিক্ষার জন্য সমাজের হৃদয়বান বিত্তশালীদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।
নীলফামারী জেলার ডিমলা নিজপাড়া ফাজিল মাদ্রাসার অতিদরিদ্র ৪ ছাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছে। দরিদ্র ৪ জনের বেতনভাতাদি নেয়া হত না। দাখিল পরীক্ষার সময় শুধুমাত্র বোর্ড ফি দিয়ে ফরম পূরণ করানো হয়েছে। মাদ্রাসার ৪ ছাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছে ।
বজলার রহমান: রিকশাচালক রুহুল আমিনের ছেলে বজলার রহমান। ডিমলা নিজপাড়া ফাজিল মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে দাখিলে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। বজলার রহমান ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চায়।
মাহাবুব কবির: ডিমলা নিজপাড়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্র মাহাবুবুল কবির। মা মোর্শেদা অন্যের জমিতে ও বাবা মোতালেব হোসেন গ্রামের মসজিদে ইমামতি করেন। মাহাবুবুল প্রাইভেট, ঈদের সময় ফিতরা ও কোরবানির চামড়ার টাকায় পড়াশুনা করে দাখিলে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
মোশারফ হোসেন : অন্যের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশুনা করে ডিমলা নিজপাড়া ফাজিল মাদ্রাসা বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে মোশারফ হোসেন। এমদাদুল জানায়, সে ঈদের সময় চামড়া ও ফিতরার টাকায় বইখাতা কিনে পড়াশুনা করছে। মাঝে-মাঝে সে মাদ্রাসায় ছেলে-মেয়েদের প্রাইভেটও পড়াত। তার মা মফিজা আক্তার অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
আব্দুল কাইয়ুম: অভাব-অনটন দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে পিতার সাথে বাঁশের চাটাই বিক্রি করে পড়াশুনার সুযোগে ডিমলা নিজপাড়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে দাখিলে আব্দুল কাইয়ুম জিপিএ-৫ পেয়েছে। কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে পিতা সহিদুল ইসলামের বাঁশের চাটাই তৈরি করত হতদরিদ্র কাইয়ুম। বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সে মাঠের জমিতে ধান কাটতে গেছে। সে ভবিষ্যতে প্রভাষক হতে চায়।
অজগ্রামের বশিকোড়ার দাখিল মাদ্রাসার বিজ্ঞান বিভাগে আকতারুন নেছা ও ফাতেমা খাতুন জিপিএ-৫ পেয়েছে। আক্তারুন নেছা বগুড়ার আদমদীঘি থানার বশিকোড়া গ্রামের দরিদ্র মোঃ আইয়ুব হোসেন ও সেলিনা খাতুনের কন্যা। অন্যজন একই গ্রামের ফাতেমা খাতুন দিনমজুর মোঃ আজিজুল ইসলাম ও তহমিনা বেগমের কন্যা। এরা দু’জনই ডাক্তারি পড়তে চায়।
বই-খাতা-কলম-পুস্তকের খরচ যোগাতে দিনে ক্ষেমখামারে ক্ষেতমজুরের কাজ আর রাতে কুপি জ্বালিয়ে লেখাপড়া করে জিপিএ-৫ পেয়েছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ি উপজেলার ৬নং দৌলতপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের ছাত্র এবং কুশলপুর গ্রামের অতিদরিদ্র সাইফুল ইসলাম ও নূর বানুর পুত্র মইনুল ইসলাম।
অশ্রুসজল চোখে মইনুল জানায়, তার লেখাপড়ার খরচ চালাতে তার মা নূর বানু তার জন্য গ্রামের মানুষের কাছে সাহায্য নেয়াসহ ফিতরা নিয়েছে।
পিতা সাইফুল ইসলাম বলেন, ছোলের মাথা ভালো। কিন্তু লেখাপড়ার খরচ যোগাড় করতে না পারায় মাঝখানে ওর লেখাপড়া বন্ধ করে দেই। পরে ছেলেটা নিজেই গাঁয়ের গৃহস্থদের বাড়িতে কামলা, কিষাণের কাজ করে কিছু টাকা জমা করে ফির স্কুলোত ভর্তি হয়।
পড়ার টেবিল নেই, থাকার জায়গা নেই। রাতের বেলায় ঘরে বাতি জ্বালানোর তেলও কিনতে না পারায় দিনের আলোতে পড়াশুনা করে জিপিএ-৫ পেয়েছে নাসরিন আক্তার। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মান্দার বাড়িয়া শাহ্ওলীয়া দাখিল মাদ্রাসার ছাত্রী নাসরিন আক্তারের বাবা আবুল হাসেম রিকশা চালক। মা খাদিজা বেগম অন্যের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করে যা পান তা দিয়ে সংসার চালান। তবুও খাদিজা বেগম মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন বুকে লালন করে অনেক সময় নিজে না খেয়ে উপোষ থেকে মেয়েকে খাইয়েছেন। কখনো নতুন বই পড়তে পারেনি। পুরাতন বই আর সহপাঠীদের কাছ হতে ধার করা বই পড়েই জিপিএ-৫ পেয়েছে নাসরিন। ফরম পূরণের টাকা ও বিভিন্ন সময় সাহায্য করেছেন গ্রামের সিরাজুল ইসলাম ও সুজা মিয়া।
টিউশনি করে লেখাপড়া চালিয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে পাবনার চাটমোহর উপজেলার রতনপুর গ্রামের ভ্যানচালক মোঃ আক্তার প্রামানিকের ছেলে মোঃ মিন্টু প্রামানিক । সে মূলগ্রাম ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। মিন্টু জানায়, আমার এই ভাল রেজাল্টের পিছনে মা-বাবা ও সাইদুল ইসলাম স্যারের আন্তরিকতা, সহযোগিতা ছিল বেশী। মিন্টু ভবিষ্যতে বুয়েটে লেখাপড়া করে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়।
দাখিল পরীক্ষায় মোঃ আল আমিন ইলেকট্রনিক্সের দোকানে কাজ করে। সে এম কে আর আহম্মদিয়া দাখিল মাদ্রাসার মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। আল আমিনের পিতা আবুল হোসেন চাটমোহর রেলবাজারে কামারের কাজ করে সংসার চালান। এ ব্যাপারে আল আমিন জানায়, শুধু আমার একার জন্য নয়। আমার মা-বাবা ও শিক্ষকদের আন্তরিকতা, সহযোগিতার কারণে আমি ভাল রেজাল্ট করতে পেরেছি। ভবিষ্যতে আমি একজন ভাল শিক্ষক হতে চাই।
জেলে পরিবারের সন্তান স্বপ্না রানী হালদার দারিদ্র্যের কাছে হার মানেনি। সে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলী বালিকা বিদ্যালয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। নিত্যদিন দারিদ্র্যের সাথে বসবাস করেও স্বপ্না উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে চায়। স্বপ্নার পিতা আকুন্দবাড়িয়া গ্রামের কালিপদ হালদার বিলে মাছ ধরে তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করে।
(অশেষ কৃতজ্ঞতা: দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ মে ২০১০)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



