দু:খী সবুজ পাতা প্রথম পর্ব
দু:খী সবুজ পাতা দ্বিতীয় পর্ব
দু:খী সবুজ পাতা তৃতীয় পর্ব
দু:খী সবুজ পাতা চতুর্থ পর্ব
দু:খী সবুজ পাতা পঞ্চম পর্ব
১১
পুকুরটার একটা ঘাট আছে।জারুল গাছের গুঁড়ি দিয়ে বাঁধানো । নারকেলের ছোবড়ার দড়ি দিয়ে সেগুলো আটকানো। গোলাপী শাপলা ভেসে আছে একটু দুরে। আর সাদা পদ্ম। সবুজ শ্যাওলা চাদরের মতো বিছিয়ে। চিংড়ি মাছ আর কাঁকড়ারা ঘাটে উঠে আসে। ছিটে পাতা ঘাট থেকে দুরেই ছিল এতদিন। কিন্তু দমকা বাতাস তাকে ভাসিয়ে ঘাটের কাছে নিয়ে এসেছে।
গাড়ির শব্দ পেলে পানির উপরে গলা ভাসিয়ে সে ঘাটটাকে দেখে। ঘাটটা খালি পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে লোকে হাতমুখ ধোয়, কাঠুরেরা কাজ শেষে কুড়াল ধুয়ে মুছে নেয়। কেউ কেউ কলসীতে পানি ভরে নেয় । পুকুরে কুমীরের উপদ্রব আছে। সেজন্য লোকে গোসল করতে সাহস পায় না।
গাড়িটা থামার পর অনেকগুলো পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। মাছেরা হৈ চৈ করে সবাইকে দুরে চলে যেতে বলে।
পাতা চেয়ে দেখে বিচিত্র রঙের পোষাক। নানান বয়সের ছেলো মেয়ে আর বুড়োরা ঘাটে এসেছে। মানব শিশুরা বনে আসে না, মহিলারাও। ছিটে পাতা ভাবছিল, এতগুলো লোক গাড়িতে এখানে কি জন্য এসেছে?
একটা কাক বসেছিল পুকুর পাড়ে, সে বললো - "এটা মানুষেরা স্বভাব। সখ করে সেজে গুজে থালা বাসন নিয়ে বছরে বনে ঘুরতে আসে। এর নাম বনভোজন"।
ছিটে পাতা বুঝতে পারেনি দেখে সে বলতে থাকে, "শহরে কোন গাছ নেই। তাই বাতাসগুলো ময়লায় ভরা - কার্বন ডাই অক্সাইড ঠিক করার কেউ নেই। সেজন্য বনের মুক্ত বাতাসটা মানুষের খুব পছন্দ।"
বনভোজনের রান্না শুরু হয়। দুপুরে গাছগুলোর চোখ জ্বলে যেতে থাকে। রসুন মরিচ ইত্যাদি মসলার ঝাঁঝে আর বিকট গন্ধে দম নেয়া যায় না। ধুয়ার কুন্ডলী উঠতে থাকে উপর দিকে। দুপুর থেকে সেই ঝাঁঝ কমতে থাকে। ছেলে বুড়োরা ঘাটে হাতমুখ ধুয়ে যেতে থাকে।
দুটো দাঁড়ি গোফে আচ্ছাদিত লোক দেখতে পায়। কয়েকজন শাড়ী পরা মহিলা। লোকদুটো পান খেয়ে পানিতে পিক ফেলছে। ছিটে পাতার মনে হয় এরাই সেই রাক্ষসের মতো ভয়ঙ্কর কাঠুরিয়া। সন্ধা হওয়ার হলে এরা কখন চলে যাবে সেজন্য সে অপেক্ষা করতে থাকে।
বনভোজনে আসা বাচ্চাদের অনেকেই পুকুর পারে দাঁড়িয়ে। কয়েকটা শিশু ইটের ঢেলা দিয়ে ব্যাঙলাফ খেলতে থাকে। পদ্মফুলের কয়েকটা পাঁপড়ি ছিড়ে যায় তাতে।আরেকটা দল ছোট টিনের খেলনা স্টীমার নিয়ে আসে। ম্যাচের কাঠি জ্বালতেই সেই স্টীমারটা পুকুরে বট বট শব্দ করে চলতে থাকে। বিশ্রী শব্দ । বড়দের মতো এই বাচ্চারাও নিজের আনন্দটাই বোঝে। ছিটে পাতার ভয় হয় যদি স্টীমারটা তাকে ছিঁড়ে ফেলে।
অবশ্য এদের মধ্যে দুটো বাচ্চা বেশ শান্ত। বয়স ৭/৮ হবে।তারা ঘাটে এমনিতেই বসে থাকে আর দুর থেকে পদ্মফুল দেখে। মেয়েটার পরনে সাদা লেসের গোলাপী ফ্রক। ছেলেটার পরনে নীল প্রিন্টের জামা। ঠিক এমন সময় একটা কাজ হয়। গোলাপী ফ্রকের মেয়েটা চীৎকার করে বলতে থাকে, "দ্যাখ মিতুল, দ্যাখ, কী দারুণ সুন্দর একটা পাতা ভাসছে। চল এই পাতাটা বাসায় নিয়ে যাই!"
বলত বলতে মিতুল নামের ছেলেটা ছিটে পাতাকে আস্তে করে পানি থেকে হাতে তুলে নেয়। খুব যত্ন করে তার ডগাটা ধরে রাখে বুড়ো আঙ্গুল আর তর্জনীতে। ছিটে পাতা ছটফট করতে থাকে। কিন্তু সে বুঝতে পারে ভয়ের কিছু নেই। বাচ্চাদুটো তাকে মেরে ফেলবে না।
১২
লাল সিরামিকের ইটে ঘেরা একটা বাসা। শহরের অভিজাত এলাকায়। সামনে নানান জাতের গোলাপ ফুটে আছে। কয়েকটা বড় ডালিয়া আর জিনিয়া। বাগানে ঢোকার মুখে বাঁশের গেট। সবুজের উপর বাগান বিলাসের ঝোপ রং ঢালছে। দুর্বাঘাসের লনে ছাতা ঘেরা বসার জায়গা।
ব্যালকনিতে একটা বুড়ো বুলবুলি বসে গুন গুন করছে। পাখীরা অল্পতেই বুড়ো হয়ে যায। বুড়ো হলে গান গাইতে দম পায় না। হঠাৎ বুলবুলিটা থমকে যায়। একটা বড় লতানো গাছ তার নাম ধরে ডাকছে। গাছটার কাছে গেলে পাতাটা
"বুলবুলি" বলে চিৎকার করতে থাকে।
-"বুলবুলি, আমি কতবার যেন স্বপ্ন দেখেছি যদি বুলবুলিকে বেঁচে থাকতে দেখা হয়"।
-"ছিটে পাতা! আমি কি সত্যিই সেই ছিটে পাতাকে দেখছি?"
-"কম করে হলেও পাঁচ বছর, ঠিক বলিনি?"
পাতাটা বলে, "সময় কী করে যায়? দ্যাখো, আমি সেই দিনের ঝরে পড়া সবুজ পাতা। আজ কী করে ১০০ টা ছেলেমেয়ের মা"।
ছিটের গায়ে লতানো শিশুপাতারা বুলবুলিকে পাতার হাত নেড়ে শ্রদ্ধা জানায়।
-"কিন্তু ছিটে, একটা প্রশ্ন, সেই বনের তেতুল গাছে থেকে ১০০ মাইল দুরে কী করে এলে?"
-"সে অনেক গল্প।" দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ছিটেপাতা বলে, "পুকুরে পড়ে অনিশ্চয়তায় ভেসে ছিলাম। দুটো মানুব শিশু আমাকে পুকুর থেকে তুলে এখানে নিয়ে আসে। আমি বুঝিনি কেন ওরা আমাকে আনে। আমার তোকোন ফুল হয়না, সবুজ সুন্দর পাতা নেই। পাতাতে ছিটে সাদা রঙের জন্য কতই না মন খারাপ হতো। অথচ তারা আমার ছিটে বর্ণকে সুন্দর বলে মুগ্ধ হয়, স্নেহ করে। তাদের স্নেহ যত্নে আজ সুখে বেঁচে আছি"।
তারা আমাকে টবে রুয়েছে। সার দিয়েছে। বেছে বেছে একটা রোদেলা জায়গায় রেখেছে। পানি দিয়েছে প্রতিদিন। ঝড়ে রোদে খেয়াল রেখেছে ।
তারপর আবেগ ভরা কন্ঠে লতানো পাতাটা বলতে থাকে,
-"ঐ যে বসে আছে ।দেখ, মিতুল আর সোনিয়া ওদের নাম। গাছেদের কষ্ট মানুষ বোঝার কথা না। মানুষের দোষ কি। ওরা ভাবে গাছ বোবা। গাছেরা এত কথা বলে ওরা তো আর শোনে না! অথচ সোনিয়ারা আমাদের ভাষা না বুঝে যেন অনুভবে সব টের পায়। ওদের দেখে প্রথম বুঝতে পেয়েছি যে মানুষ শুধু ধ্বংশ করে না তারাই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী ভালবাসতে জানে"।
বুলবুলিটাও গলা মিলিয়ে বলে,
-"একদম ঠিক বলেছ! তোমার হয়তো জানা নেই, সেই তেতুল গাছটা আর নেই। পুকুরটা ভরাট হয়েছে। সেখানে দালান হয়েছে। বড় মহাসড়ক হয়েছে। আমি প্রায় দু বছর ছিলাম এক পোষা প্রাণীর দোকানে।
ফাঁদ পেতে আমাকে ধরে, দোকানের বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখতো।ঠিক মতো দানাপানি খেতে পেতাম না, খাঁচার তারে আটকে পায়ে কালসিটে পড়ে গিয়েছিল"।
এরপর বুলবুলিটা একটু থেমে বলতে থাকে, "তারপর ঘটে এক আজব ঘটনা। একটা চশমা পরা লোক দোকান থেকে কিনে নেয়। লোকটা আমার গান শোনার জন্য নয়, পাখীদের বাঁচানোর জন্য তাদের কিনে নেয়। সবাই পাখী উড়ে গেলে বন্দী করার কথা ভাবে। লোকটা অবলীলায় খাঁচা খুলে দিয়েছে, আর আমি মুক্ত ডানায় উড়ে উড়ে দেখেছি লোকটার চোখে মুখে পাখীদের জন্য ভালবাসা।"
বুলবুলি ছিটে পাতার খুব কাছে আসে। ছিটে পাতার বাচ্চাগুলো খুব ফুটফুটে। তাদের দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে হয়। পালক ঘষে সে ছিটে-কন্যাদের আদর করতে থাকে। চোখ বন্ধ করে সেই অনেক বছর আগের মতোই গাইতে থাকে - ছিটে পাতা -ছিটে পা-তা-। ছিটেপাতা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। আর আনন্দের অশ্রু ঝরতে থাকে বুলবুলির দুচোখ বেয়ে।
১৩
সোনিয়া অন্যদিনের মতই বাগানের চেয়ারে বসেছিল। সে তার ভাইকে আঙুলদিয়ে দেখিয়ে বলতে থাকে, দ্যাখ মিতুল কি দারুন একটা বুলবুলি পাখি বসে আছে আমাদের মানিপ্ল্যান্ট গাছটাতে। আর মানিপ্ল্যান্টটাকেও আজ কেমন খুশী খুশী লাগছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

