জান, একদিন রাত্তির বেলা ঘুম আসছিল না। জানলা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি বেলী ফুলের ডাল খস খস করে নড়ছে । পাতার কাল ছায়ায় ভুতে ভুতে জায়গা গম গম করছে। চিঁ চিঁ শব্দে হাসা হাসি করছিল ভুত । কি যে অদ্ভুত হাসি, মাগো । কপ কপ শব্দ পাচ্ছিলাম, পরে শুনেছি ওদের বিয়ের ভোজসভা। সবাই কালোজাম খাচ্ছিল আর বেকারীর পোড়া বিস্কুট ।
তোমরা কখনো ভুতের বিয়ে দেখেছ? দেখ নি তো? আমি আগে দেখি নি। একটা ছোট ভুত আমার ভাল সই । সে আমাকে ডাকলো । বলল ওর মেজ চাচা মেছোভুতের বিয়ে । কাঁদুনেপেত্নীর সঙ্গে। ঘোমটা দিয়ে বসেছিল বউ। পাশে দেখলাম ছিপ ছিপে লম্বা মামদো ভুত, চোখগুলো তার রসগোল্লার মতো । তার বাম দিকে স্কন্দকাটা ভুত । গলাকাটা ভুত, পেচাপেচি, কানাওয়ালা কি ওদের আত্মীয়? দেখে গা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আমি তো ভীতু। ভেউ করে কেঁদে দিতেই পেচাপেচী বলল, খুঁকিঁ, ভঁয়ঁ পেঁয়েঁছ। আঁমঁরা তোঁ কাঁউঁকে ভঁয় দেঁখাঁইঁ নাঁ । বন্ধু ভুতটা রেগে গেল, কীঁ কাঁণ্ডঁ তঁোমাঁকেঁ না আঁগেঁই বঁলেঁছিঁ, আঁমঁরাঁ ভাঁলঁ । তোঁমঁরা খাঁলি আঁমাঁদেঁর নাঁমেঁ বাঁজেঁ গঁল্পঁ লিঁখেঁ রাঁখঁ।
ভুত হলেও আমার বন্ধুভুতটা শান্ত আর কিউট । চাঁদনী রাতে তার পাগুলো হলুদ দেখায়। সে জন্য তার মা তাকে হলুদ ভুত ডাকে। ও কিন্তু মেয়ে ভুত। বড় হলে ও পেত্নী হবে। কিন্তু, সে খাওয়া নিয়ে মাকে খুব জ্বালায়। কিচ্ছু খেতে চায় না । স্যুপ, নুডলস কিচ্ছু না। আর বেশী করে না খেলে ও বড় হবে কী করে?
হলুদ ভুতটা মাথায় পরেছে কলমিফুলের টোপর। ভুতেদের যখন বিয়ে হয় ভুতেরা উল্টো হয়ে নাচে। ছোটরা বাদুর আর পেঁচার গান গায়। ভুতের আম্মুও কদম ডালে পা ঝুলিয়ে নাচতে পারত। স্কুলে পড়ার নাচে ফাস্ট হত। তিন বার ধুতুরা ফুলের মালা প্রাইজ পেয়েছিলেন, অথচ সেদিন ভুতের আম্মুটা আসে নি।
ও, তোমাদের বলি নি, ভুতদেরও হসপিটাল থাকে। গত মাসে হলুদ ভুতের আম্মু হসপিটাল থেকে একটা ছোট্ট বাবু কিনে এনেছে । ভুতুলা বাবুটা এত্ত ছোট যে চোখই হয় নি। খালি ওঁয়াঁ-ওঁয়াঁ কাঁদে আর হিসু করে দেয়। ওর ভাইটার কথা হলুদটা কেন বলে নি? এজন্য আমার খুব রাগ হল । ভুতরাও কে কী! ওরা মাঝে মাঝে ইঁ ইঁ শব্দে আলাপ করে । ওরাই হয়তো বুঝতে পারে না।
একদিন রাতে আমার টিচার এসেছে। আমাকে অঙ্ক করাচ্ছে যখন কারেন্ট চলে গেল। আমি মোমবাতি আনতে রান্নাঘরে যাচ্ছি, এমন সময় উঁ উঁ অদ্ভুত আওয়াজ শুনতে পেলাম। ভুতের মেয়েটা কাঁদছিল । আমি বললাম, কি হয়েছে, কাঁদছো কেন? ও বলল ওকে ওর মা বকেছে। ও ওর ভাইটার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে বলে।
আচ্ছা, ওর কি দোষ বল? ও কি বোঝে? ওরাতো ছোটবেলায় থাকতো বিলে পাশে তার খোলা মাঠ । শ্মশান ছিল, দেবদারু আর পিপুলের বন। গ্রামের ভুতের বাচ্চারা মনের আনন্দে বরফপানি আর বৌচি খেলত । বৈচি লতায় দোল খেত। ভুতদের কুতকুত দেখেছ? ওরা লাফায় পিছন ফিরে, ওদের পা তো উল্টা। এখােন ভুতগুলো খেলতে পায় না । মানুষেরাই খেলতে পায়না ভুত কোথায় পাবে? সন্ধ্যায় দোপাটি ফুলের টবে হলুদ ভুত আর বেগুনি ভুত দোল খাচ্ছিল। খেললে তো একটু শব্দ হবেই, হবে না? সেই শব্দে বেবী ভুতের ঘুম গেল ভেঙে । তার আম্মু ক্ষেপে গেল। তার আম্মুটাও যে কী! ছোটদের এত জোরে বকা দিতে হয়?
আমি যদি আব্বু হতাম তাহলে একটা বড় বাসা কিনতাম। কড়ই গাছ থাকতো। একটা শ্যাওড়া, একটা বেত ফল। তারপর সেই বাসায় ভুতদের নিয়ে যেতাম। ওকে অবশ্য বলেছি, হলুদ আপু, তুমি আমার ঘরেই থাকো না। কিন্তু ওর মা রাজি হবে না। আমার ঘরে তো টিউবলাইট আছে। লাইট জ্বললে ওদের মাথা ব্যথা করে। খাটের নিচে ঠাসাঠাসি করে পুরানো পেপার রাখা, ট্রাঙ্ক, ভাইয়ার ব্যাট বল আরও কত কি।
জান আগে আমাদের বাসাটাও বড় ছিল। দুইটা টিভি ছিল। আব্বুর কী যেন হয়েছে। আমাদের টাকা নাই। এই বাসায় রুম কম। আমি এখানেই থাকতে চাই। হলুদ ভুতটাও আমাকে ফিল করে। একদিন বিকেলে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেছি আমনি ধপ করে উল্পে পড়ে গেলাম । পায়ে টন টন ব্যথা হল। আম্মু উল্টা আমাকেই বকা দিলেন। আমার তো চোখে চশমা। তিন তলার ইনুন ভাইয়ারা সিড়িতে ময়লা ফেলে, এটা কী ঠিক? কলার খোসাটা আমি দেখতেই পাইনি। আম্মু আমার কথা শুনল না। আমি বারান্দায় দাড়িয়ে চোখ মুছছিলাম। হলুদ ভুতটা এসে বলল, মুঁনিঁয়াঁ, আঁজঁ কিঁ তোঁমাঁরঁ মঁনঁ খাঁরাঁপঁ?
বললাম, পায়ে ব্যথা
তারপর তাকে পা দেখালাম। ও বলল, এঁইঁ দাঁওঁ সাঁরিঁয়েঁ দিঁচ্ছিঁ। আঁমাঁদেঁরঁ নিঁয়ঁমেঁ ভঁুত ডাঁক্তাঁরঁ কোঁনঁ অঁষুধঁ দেঁয়ঁ নাঁ। কিঁছুঁ হঁলেঁ মঁজারঁ গল্পঁ বঁলেঁ আঁরঁ মুঁরঁগীঁরঁ পাঁখঁনাঁদিঁয়েঁ পাঁয়েঁ সুঁড়ঁসুঁড়িঁ দেঁয়ঁ। ওঁতেঁইঁ সঁবঁ ব্যঁথাঁ সেঁরেঁ যাঁয়ঁ।
ওদের শরীরটা তো বাতাসের আর অনেক তুলতুলে তো এজন্য সুবিধা। তবে আমাদের সঙ্গে মিলও আছে। কার্নিশের ডান দিকে তার বুড়ো দাদা ঘুমাতো। পেট ফুলিয়ে নাক ডাকতো - ইঁ ইঁ ইঁ ইঁ। আমার কিন্তু হাসিই পেত। কিন্তু আম্মু বলেছে বুড়োদের নিয়ে হাসা খুব খারাপ। আমরা সবাই নাকি ওরকম বুড়ো হবো। তবুও তো ভুতটার দাদা আছে। আমার কিন্তু দাদা নাই। দাদার ছবিটা আছে। ওটাকে দেখলে খুব রাগ হয়। আমি তখন কি এত বুঝতাম! বারান্দায় একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে দাদা বসে থাকত। খালি লোম ওয়ালা গায়ে রোদ পোহাতো। আমাকে কোলে নিতো। ভাঙা গলায় বক বক করতো, দাদু ভাই, সদা সত্য কথা বলবি। মিথ্যে বললে কিন্তু আমি চলে যাবে। আর আসব না।
তারপর আমি মিথ্যে বললাম। সেজন্য উনি চলে গেলেন। আমার যে কাজিন মিলু আছে না, ওর জন্যই এমন হল । মিলুর ছিল অনেক গুলো গািড় আর পিস্তল। একদিন সে এখানে বেড়াতে এসে তার বুলডোজারটা হারিয়ে ফেলল। আমি কিন্তু দেখেছি ওটা সোফার নিচে । আম্মু আমাকে জিজ্ঞেস করল। আমি বলেছিলাম, না, দেখিনি। তাহলে কী হল? মিথ্যা না? পরদিন সকালে উঠে জানলাম আমার দাদা নেই। বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। আমার খুব কান্না পেয়েছিল।
আব্বু কোনদিন কাঁদে না। সেও কাঁদছিল। আমি বললাম, আব্বু, আমি আর মিথ্যা বলব না। দেখো দাদা চলে আসবে। তারপর আম্মু বলল যে দাদা ঘুমিয়ে আছেন, আল্লার ওখানে। হলুদ ভুতটা ছাড়া এই কষ্টটা কেউ জানতো না। আমি কতবার আম্মুকে বললাম, আমি তো মিথ্যে বলি না। তাও দাদা আসে নি। তখন আমি বলেছিলাম, আমার কিছু ভাল লাগে ন। আমাকেও আল্লার কাছে রেখে আস।
এখন দাদাকে ভুলে যাচ্ছি। আচ্ছ ভুতের দাদাদের কি ভুড়ি হয়? লাঠি নিয়ে থপ থপ করে হাটে? আর খেকে করে কাশি দেয়? হলুদ ভুতের একটা পেটুক মামা আছে। ভেন্টিলেটরে থাকে। চানাচুরের ফ্যাক্টরী থেকে পোড়া চানাচুর আনে আর খায়।
ভুতদের চৌদ্দগুষ্টি একসময় দুরের গ্রামে থাকতো। বিল পাড়ে শেওড়া গাছের উপর খুব মজার ছিল তাদের সংসার। আচ্ছা, যে লাইট দেখতে পারে না, সেটা কি বলছি? বলি নাই। আমি খালি ভুলে যাই। গ্রামে ভুতদের সুবিধা অমাবস্যার সময় বের হয়। স্কুলে যায়, মাঠে খেলতে বের হয়। আর তাদের যে খালামনিরা তার চুল আঁচড়ে অন্ধকারে শুকাতে দেয়। অবশ্য ভুতদের মধ্যে যারা খারাপ তারা খুব খারাপ। হলুদ ভুত বলল, গ্রামের সবগুলো গাছ এসে বিদেশের খারাপ ভুতরা জোর করে নিয়েছে। ওখানে বিশ্রী বিদেশী সব গান হয়। ওদের পা গুলো ঠিক মত বড়ই হয় নি কিন্তু কি সব আজে বাজে যে নাচে। ওরা এখানেও আসছে। শুনে আমার যা ভয় হল। কারেন্ট গেলে এখন খারাপ ভুতগুলোর কথা মনে হয়।
গত সপ্তাহে আমার ফাস্ট টার্ম পরীক্ষার পর গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমার গ্রাম ভাল লাগে। কিন্তু ওখানে গিয়ে আমার কিছুতেই ভাল লাগে নি। হলুদ ভুতটাকে রাতে স্বপ্নও দেখলাম। ওখানে চাচীরা পিঠা বানায়। ভাপা পিঠা। কিন্তু পিঠা খেতে মনে হল হলুদ ভুতটা একদিন খুব আফসোস করছিল। বলেছিল ওরা যখন গ্রামে থাকত কত নানান জাতের পিঠা খেত। তেলে ভাজা পিঠা, পাক্কন পিঠা। শহরে এসব আর কেউ বানায় না। আর বানালেও খেতে খুব বিশ্রী । গ্রাম থেকে আসার সময় গোপনে স্কুলব্যাগে একটা তেলের পিঠা নিয়ে এসেছি। আম্মু টের পায় নি। দেখলে নিশ্চয় বকবে।
এখানে ফিরে যা দেখলাম তাতে অবাক হলাম। আমাদের পাশের যে দালানটা সেটা ভেঙে ফেলছে। আর বড় বড় বাতি জ্বলছে। এত আলো, নিশ্চয়ই ভুতদের কষ্ট হয়েছে।
আমি ঘরে ঢুকেই ডাকলাম কোথায় তুই? একবার দুইবার, অনেকবার ডেকেও লাভ হয়নি। কেউ নেই। সবাই চলে গেছে। নিশ্চয়ই ওরা যাবার আগে খুঁজছিল আমাকে। একটু পর কারেন্ট চলে গেল। তবুও কেউ এল না। এমন সময় কি হল জান? আমার পিঠে বাতাসের ছোঁয়া পেলাম। হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ। আঁপুঁ, আঁমঁরা কিঁন্তুঁ যাঁইঁ নিঁ। হাঁউঁ মাঁউঁ পিঁঠাঁরঁ গঁন্ধঁ পাঁউঁ । তারপর আমাকে বলল, আঁপুঁ আঁমাঁরঁ আঁরঁ তঁঁরঁ সঁইঁছেঁ নাঁ কিঁন্তুঁ গঁতঁকাঁলঁ রাঁতে দুঁটোঁ দাঁত পঁড়েঁ গেঁছেঁ। খুঁবঁ ব্যঁথাঁ। দাঁতঁগুঁলোঁ ইঁদুঁরেঁরঁ গঁর্তেঁ ফেঁলেঁ দিঁয়েঁছিঁ। ঠিঁকঁ হঁয়েঁ যাঁবেঁ।
আমি বললাম, ঠিক আছে, আমি পিঠাগুলো ফ্রীজে রেখে দেব। যখন দাঁতের ব্যথা কমবে, আমাকে বললেই হবে। টেবিলের নিচে চুপ করে বস। তোমার আম্মা ডাকছে গোসল করতে। খেয়ে দেয়ে এসো, আজকে তোমাকে গ্রাম থেকে শিখে আসা শাকচুন্নীর মজার ছড়া শোনাবো।
----
ড্রাফট ১.৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

