
৩০ মে ১৯৮১ সাল। সম্ভবত সময় তখন সকাল ১০টা। ডিফেন্স এন্ড স্টাফ কলেজ, মিরপুর, সেনানিবাসের অফিসের দ্বিতল ভবনের একটি কক্ষে বসে বিস্তৃত তুরাগ নদীর রূপালী স্রোতের অনুকূলে পাল টানা নৌকাগুলোকে চলতে দেখে মনে পড়ে গেল, ‘আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে ওগো সুন্দরীঃ’ হঠাৎ কোত্থেকে কালো মেঘের একটি টুকরো কমান্ডো আক্রমণের কায়দায় সূর্যকে ঘিরে ফেললো আর সমস্ত পরিবেশটি তমসাচ্ছন্ন হয়ে গেলো। একটু একটু করে ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলো আর গাছের ডালগুলোকে আকড়ে বসে থাকা সবুজ পাতাগুলো বাতাসের হ্যাচকা টানে দুলতে লাগলো। মনে হচ্ছিল যেন মাতম করছিল সাথী পাতাগুলোকে হারানোর বেদনায়। অন্ধকার আচ্ছন্ন নদীটিকে আর দেখা গেল না বলে অফিসের সামনের উঠোনের দিকে তাকাতেই আর একটি অন্য রকমের দৃশ্য দেখে আতকে উঠলাম। মাঠের অদূরে কিছু জংলি (Combat পোশাক পরিহিত বিভিন্ন বয়সের সৈনিক একটি সামরিক জীপের পাশে দাঁড়িয়ে কি যেন কান পেতে শুনছিল আর চোখ মুছছিলো। দূরে বলে কোন আওয়াজ শুনতে পারছিলাম না। একটু পরেই আমার অফিস কক্ষের দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ। দরজা খুলতেই এক সহযোগী আমার বুকে ঝাপিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চিৎকার করে কান্নার কারণ জানতে চাইলে ও যা বললো তাতে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। সমস্ত শরীর থর থর করে কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি মেঝেতে পড়ে যাব। আকাশে আর মেঘ ডাকছে না, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে না। হঠাৎ একঝাক বৃষ্টি চারদিকে পড়তে শুরু করলো। মনে হলো যেন আকাশ কাঁদছে, বাতাস বইছে না, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে না। সবাই যেন মাতমে নিমজ্জিত। কেবল চারদিকে কান্নার রোল আর একটি প্রশ্ন কে জেনারেল জিয়াকে খুন করলো? সঙ্গে সঙ্গে রেডিও খুলতেই শুনতে পেলাম কয়েকজন বিপথগামী সেনা অফিসার প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নির্মমভাবে হত্যা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের ঘোষণা দিচ্ছে বার বার। আমি ভাষা হারিয়ে ফেললাম, বিধ্বস্ত অনুভব করলাম মানসিকভাবে মনে হচ্ছিল এখনই বুঝি সম্বিৎ হারিয়ে ফেলবো। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম মিরপুরের সৈনিকগুলো মাথা নিচু করে চোখ মুছতে মুছতে ব্যারাকে ফিরে যাচ্ছে। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছে না। অফিসগুলোর দরজা বন্ধের আওয়াজ শুনতে পেয়ে আস্তে আস্তে নিজ অফিস থেকে বেরিয়ে আর সবার মতো নিজ ঘরে ফিরতেই আমার স্ত্রী উম্মে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে প্রশ্ন করলো কেন ওরা জিয়াকে মারলো? মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ বুঝি স্তব্ধ হয়ে গেছে এই কালজয়ী ব্যক্তির অন্তর্ধানের কথা শুনে। কিন্তু আকাশ তখনো কালো মেঘে ঢাকা দেখে মনে হচ্ছিল শ্রষ্টা বুঝিও আমাদের মত মর্মাহত। ভাবলাম হায়রে বিধাতা তুমি কেন এত নিষ্ঠুর? যে লোকের বীরোচিত ডাকে লক্ষ কোটি লোক ঘর ছেড়ে অস্ত্র ধরলো মুক্তির অন্বেষনে, স্বাধীনতার জন্য জীবন বলিদানে ইস্পাত কঠিন শপথ নিয়ে পাকিস্তানী বর্বর শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলো, তাকে কেন এভাবে প্রাণ দিতে হলো? এরই মধ্যেই চুপি চুপি বেশ ক্ষাণিকক্ষণ কাঁদলাম, কিন্তু কেউ দেখলো না। (I wept a little but no one saw it) আর মহান আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চাইলাম তাঁর (জিয়ার) আনন্দময় পরকালের জন্য। এর পরের চারদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের আকাশে একটি কালো পর্দার প্রলেপ ছিল। লক্ষ কোটি লোকগুলো যেন বোবা হয়ে গিয়েছিল। সবাই ভাবছিল এরপর কি ঘটতে যাচ্ছে। সবাই দোয়া করছিল জিয়ার হত্যাকারীদের যেন চরমতম শাস্তি হয়। তিনদিনের মাথায় তাদেরকেও জনগণের রোষানলে পরে জীবন হারাতে হলো। ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক জিয়াউর রহমানকে বাধ্য করেছিল দেশপ্রেমী সৈনিক জনতার বিপ্লবের নেতৃবৃন্দ ৭ নভেম্বর ’৭৫ সালে বাংলাদেশের কর্ণধারের দায়িত্ব নিতে। এই অকুতোভয় ব্যক্তি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জনগণের আন্তরিকতা ও স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা পেয়ে দেশটিকে পূণর্গঠনের জন্য আপোষহীন ও আমরণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হলো। প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ এই আহ্বানে তার সাথে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ সাড়া দিল এবং দেশকে ধীরে ধীরে উন্নতির প্রথম সোপানে নিয়ে যাওয়ার জন্য অঙ্গীকার নিলো স্বাধীনতার বেদী তলে। সুবিচার, সুশাসনে, সুষমে উন্নয়নের মহামন্ত্রে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করলেন তিনি। দেশবাসী নৈরাজ্য, নৈরাশ্যতা ও নেতৃত্ব শূন্যতা থেকে মুক্তি পেলো এবং বিশ্ববাসী এতে অভিভূত হয়ে সব ধরনের সাহায্যের আশ্বাস দিলো।
১৯৭১-এর মুক্তি আন্দোলনের সময় এবং এরপর যে কয়টি প্রতিশ্রুতি জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছিল তা ছিলঃ
০ নিষ্কলুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
০ স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি
০ সামন্তবাদ, আধিপত্যবাদ ও ধর্মান্ধতা বিরোধী সংবিধান
০ সংস্কৃতিতে স্বকীয়তা আনয়ন ও সংরক্ষণ
০ স্বাধীনতা সংগ্রামের নির্ভুল, নিরপেক্ষ ও তথ্যসমৃদ্ধ ইতিহাস প্রণয়ন
০ যুগোপযোগী প্রযুক্তির প্রসার
০ গণমুখী সবুজ বিপ্লব
০ বাস্তবমুখী শিল্পায়ন
০ শোষণমুক্ত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সৃষ্টি
০ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত মূল্যায়ন
০ সম্পদের আপেক্ষিক বিভাজন
০ সার্বজনীন নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
০ সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা
০ সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদে সশস্ত্রবাহিনীকে এবং অন্যান্য বাহিনীকে যথোপযোগী আধুনিকায়ন
০ সার্বজনীন শিক্ষার প্রসার
উপরোক্ত প্রতিশ্রুতিগুলোকে প্রাপ্তিতে পরিণীত করার লক্ষ্যে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর থেকে সরকার অঙ্গীকার করে আসছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে একসময় ভাটা পড়লো। বিক্ষুব্ধ জনগণ সরকার পতনের দাবি উঠালো। হঠাৎ একদিন একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একজন দেশপ্রেমী ও গগনচুম্বী ব্যক্তির যবনিকাপাত হলো। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বপ্নদ্রষ্টা ও লালনকারীর অন্তর্ধানের পর থেকে দেশকে নৈরাজ্য ও বিভীষিকার আগ্রাসনের শিকার হতে হলো। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ এক সর্বগ্রাসী সৈনিক জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াকে ক্ষমতায় বসানো হলো। তিনি সততা ও আন্তরিকতাকে বাহন করে দেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ কথিত বাংলাদেশকে উন্নয়নমুখী দেশ হিসেবে পৃথিবীতে পরিচিত করলেন। তাঁর উন্নয়নের মূলমন্ত্র প্রণীত হয়েছিল ৭টি ‘প’ এর উপর ভিত্তি করে। সেগুলো হলো:
০ পরিকল্পনা
০ পুঁজির ব্যবস্থা
০ প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতায়ন
০প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
০ প্রত্যয়
০ পরিশ্রম
০ পুরস্কার
জিয়া তার দৃষ্টান্তমূলক নেতৃত্বে দেশকে একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বেশ কয়েকটি নতুন দূরদৃষ্টিমূলক সৃষ্টির মধ্য দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। সেগুলো হলো:
০ শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়
০ যুব বিষয়ক মন্ত্রণালয়
০ গ্রাম সরকার
০ গ্রাম পুলিশ
০ গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী
০ শিশু একাডেমী
০ সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণ
০মৃতপ্রায় সরকারি উদ্যোগগুলোকে দুই শিফটে চালানোর ব্যবস্থাকরণ
০ পর্যাপ্ত পরিমাণে (৪০০০০ কিউসেক) গঙ্গার পানি আনয়নের উদ্দেশ্যে ভারতের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন
০ সার্ক সৃষ্টি
তাঁর অবদান অক্ষয় হয়ে থাকবে। চিরভাস্বর হয়ে থাকবে তাঁর নেতৃত্ব যা কিনা যুগ যুগ ধরে অনুপ্রাণিত করবে দেশবাসীকে। তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন দৃঢ়ভাবে যে যদি একটি জাতি নির্ভেজাল আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে দেশ উন্নয়নে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে অবতীর্ণ হয় তাহলে দেশ অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবেই। আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি সেই মাওলানা ভাসানীর স্বাধীনতার ডাক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার চেতনায় বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করার মহান ভূমিকা এবং বিধ্বস্ত প্রায় তলাবিহীন ঝুড়ি নামে কলঙ্কিত বাংলাদেশকে উন্নয়নের অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছানোর রূপকার শহীদ জিয়াউর রহমানদের মতো বিশাল ব্যক্তিত্বদের অবদান জাতি প্রায় ভুলতে বসেছে। আজ সুশাসন ও সুবিচার পাওয়ার জন্য জনগণ হাহুতাশ করছে। অন্যায়, অবিচার, প্রবঞ্চনা ও দুর্নীতি আমাদের রাজনীতির শক্তির ভিত্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। আমি দেশবাসীকে সবিনয় নিবেদন করবো আসুন আমরা ঐ সমস্ত ক্ষণজন্মা কালজয়ী ব্যক্তিত্বদের ইতিহাসের পাতায় বন্দি না রেখে তাদেরকে আমাদের চলার পথের সঙ্গী করে রাখি। তাঁদের নিয়ে রাজনীতি না করে তাদের রাখা উদাহরণকে পাথেয় করি। আমার বিশ্বাস আমাদের রাজনীতিতে ও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় তখনই উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে যখন আমরা দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে সঠিক নেতৃত্ব ও সার্বজনীন কল্যাণমূলক নির্দেশনা দেই। সংস্কার করি ঐ সমস্ত রীতিনীতির যা আমাদের গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথে বিঘœ ঘটায়। প্রজন্ম বাংলাদেশকে একটি উন্নয়ন, প্রগতি ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে পেতে চায় এবং আমাদের দায়িত্ব তা বাস্তবায়িত করা।
দৈনিক ইত্তেফাক, লেখকঃ মেজর জেনারেল জেড এ খান (অব.)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

