আমাদের দেশে বহু ধনী পিতামাতা রহিয়াছেন যাহারা তাহাদের সন্তানদিগকে অতিশয় যতনের সহিত লালন পালন করিয়া থাকেন। সন্তানদিগের সকল চাহিদা পূরণে তাহারা সর্বদা সচেষ্ট। সন্তানের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের নিমিত্ত দিনের চব্বিশটি ঘন্টাই ব্যয় করেন। সন্তানদিগের উপযুক্ত দৈহিক ও মানসিক বিকাশ সুসম্পন্ন করিবার তাগিদে তাহাদিগকে পর্যাপ্ত সুষম খাবার সরবরাহ করিয়া থাকেন। খাবার সন্তানের উদর ভরাট করিবার পরও পিতামাতাগণ সন্তুষ্ট থাকিতে পারেননা। তাহার সন্তান ঠিকমতো খাইতে পারেনা বলিয়া সর্বদা আক্ষেপ করিতে থাকেন । কণ্ঠনালী পর্যন্ত উদরের বিস্তৃতি ঘটিলে এবং উহা খাবারে ভরাট করিতে পারিলেও বোধ হয় তাহারা তুষ্ট হইবেননা। সন্তানের সামান্য অসুখ হইলে বাড়িতে মাতম পড়িয়া যায়, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের আগমণ ঘটে, বিছানায় প্রেসক্রিপসন আর ঔষধের স্তুপ জমা হয়।
সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়াও তাহারা ছেলেবেলা থেকেই চিন্তায় পরিয়া যান। তাহাদের উপযুক্ত মেধাবিকাশের নিমিত্ত ডজন ডজন গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন। সন্তান যাহাতে অসৎসঙ্গে মিশিয়া নষ্ট না হইয়া যায় সেইজন্য তাহাদিগকে চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ করিয়া রাখেন এবং অতিরিক্ত তদারকি করিতে গিয়া চারিপাশের জগত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেন।
এই বাড়াবাড়ি রকমের যতন ও স্নেহের কারণে প্রতিটি ধনীর দুলাল একেকজন নন্দদুলালে পরিনত হন। এটা খাইবনা ওটা খাইবনা বলিয়া তাহারা তিনভাগের খাবার নষ্ট করেন। সামান্য অসুখ হইলে বিছানায় লুটাইয়া পড়েন। নিজের কাপড় পরিধানে আম্মুর সাহায্য নিতে হয়। আর কাহারও সহিত না মিশিবার কারণে বাড়িতে অপরিচিত মেহমানের আগমণ ঘটিলে লজ্জায় ঘরের কোণে লুকায়।
আমাদের মহান ধর্মটিকেও ইহার লালনকর্তারা অতিশয় পরিচর্চা করিবার ছলে একপ্রকার নন্দদুলালে পরিনত করিয়াছেন। তাহারা নিয়ম চালু করিয়াছেন যে ইহার এবং ইহার সাথে সংশ্লিষ্টদের শুধুমাত্র প্রশংসা করা যাইবে। কোন প্রকারের প্রশ্ন করা চলিবেনা, বিনা দ্বিধায় ইহার বিধান মানিয়া চলিতে হইবে। কেহ যদি বিরোধীতা করিবার প্রয়াস নেয় তবে তাহার মাথা কাটিবারও প্রবিধান রহিয়াছে। ইহার কারণে কেহ ধর্মটির সামান্য সমালোচনা বা ইহার কোন বিধান নিয়া প্রশ্ন তুলিলে চারিদিক হইতে ধর্ম গেল ধর্ম গেল রব পড়িয়া যায়। সংশ্লিষ্ট দুষ্টকে হত্যা করিবার আয়োজন চলে। এই অতিরিক্ত রকমের বাড়াবাড়ি বা ধর্মটিকে ঢাকিয়া রাখিবার প্রয়াসের কারণে ধর্মটি আজ এক প্রকারের নন্দদুলালে পরিনত হইয়াছে। ইহাদের সার্বিক কর্মকান্ড দেখিয়া স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন জাগে ধর্ম কি এতোটাই কোমল যে তাহা একটু নাড়াচাড়াতেই কাচের মতো টুকরা টুকরা হইয়া যাইবে?
ধর্মটা কাঁচের টুকরার মতো কিনা তাহা জানিনা। তবে ইহার লালনকর্তাদের আচরণে যাহারা এই ধর্মটি সম্পর্কে জানিতে আগ্রহী তাহাদের মাঝে একটি নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হইতেছে। তাহারা ধর্মটিকে রক্ষণশীল এবং সত্যি বলিতে সন্ত্রাসীদের ধর্ম বলিয়া চিহ্নিত করিতেছেন। যুক্তিসংগত কারণে আমি নিজেও ইহার সহিত একমত। তবে যাহারা দ্বিমত প্রকাশ করিবেন তাহাদিগের কাছে একটাই অনুরোধ যদি ধর্মটির ভাল চান তবে ইহাকে উম্মুক্ত করুন, নিজের মতো করিয়া চলিতে দিন। বড়লোকের নন্দদুলালটির মতো ঘরে আবদ্ধ না রাখিয়া উম্মুক্ত ময়দানে ছাড়িয়া দেন। ইহাতে আলো বাতাসের কিছু আঘাত হয়তো তাহার উপর পড়িবে। তবে যদি টিকিয়া থাকিবার মতো উপাদান থাকে তবে অবশ্যই মাথা তুলিয়া দাড়াইবে। আর যদি না দাড়াইতে পারে তবে এই দুর্বলের পেছনে কেন এতো পন্ডশ্রম?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

