সপ্তাহ দুয়েক আগে পত্রিকার মারফত জানতে পারলাম সৌদি সরকার সেদেশের মসজিদগুলো থেকে পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দূরে আওয়াজ যায় এমন সব মাইক অপসারণের ব্যবস্থা নিয়েছে। খবরটাতে আমাদের ধর্মীয় নেতাদের মাঝে কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করিনি। সৌদি আরবের দান-খয়রাত আর যাকাতের টাকায় স্বাস্থ্যবান এই মৌলানারা সৌদি সরকারের কোন কর্মকান্ডের সমালোচনা করবে তা অবশ্য আশাও করিনি। তবে ঠিক এই ঘটনাটি যদি আমাদের দেশে ঘটত তবে এই মৌলানারাই 'ইসলাম গেল, ইসলাম গেল' রব তুলে রাজপথ গরম করে ফেলত।
সৌদি আরব সুন্নী ইসলামের উৎসভূমি এবং এ মতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তৎসত্ত্বেও এ মাইকগুলো অপসারণে তাদের এ সিদ্ধান্ত মসজিদগুলোর বাড়াবাড়ি রকমের আচরণকেই প্রতিষ্ঠিত করে। সৌদি সরকার পাঁচ কিলোমিটারের অধিক দূরত্বে আওয়াজ যায় এমন মাইকগুলো অপসারণ করেছে। এর দ্বারা তাঁরা এটাই বুঝাতে চেয়েছে যে তাঁদের দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে একটি মসজিদই যথেষ্ট। আমাদের দেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব সৌদি আরবের চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে সৌদি আরবের যেখানে একটি মসজিদের প্রয়োজন সেখানে হয়তো আমাদের দেশে পাঁচটি মসজিদের প্রয়োজন হবে। কিন্তু সত্যি কথা এই যে, আপনি এ গরীব দেশটিতে অন্তত শহর এলাকায় প্রতি পাঁচ কিলোমিটারে পঞ্চাশটিরও বেশি মসজিদ পাবেন।
দেশে স্থানে স্থানে ব্যাঙের ছাতা মতো গজিয়ে ওঠছে মসজিদ। বলা যায় প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মসজিদ প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়েছে। এ মসজিদগুলো প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে আপনি নিজের জমিতে প্রতিষ্ঠিত মসজিদ খুব কমই পাবেন। বেশিরভাগ মসজিদই গড়ে ওঠেছে সরকারি জমি, বিরোধপূর্ণ জমি, খাস জমি এবং অবমুক্ত জমিতে। মসজিদগুলোর বেড়ে ওঠা এবং ভরণপোষণের ইতিহাসও অভিনব। প্রাথমিক অবস্থায় ছনের বা টিনের চালা দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও দুই তিন বছরের মাথায়ই তা অট্টালিকায় পরিণত হয়। আর এ টাকাটা যোগার হয় দান, খয়রাত, ছটকা এবং রাস্তাঘাটে কমিশন ভিত্তিক চাঁদা তুলার মাধ্যমে। এসব মসজিদে ঈমাম-মোয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছে অর্ধ-শিক্ষিত মাদ্রাসা ছাত্ররা। তাদের খাবার এবং বেতনও যোগার হয় এলাকাবাসীর চাঁদার মাধ্যমে। এদের একমাত্র কাজ হচ্ছে পাঁচবেলা নামাজ এবং মাঝে-মধ্যে মিলাদ পড়ানো। দেশের অনুৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীর অন্যতম হচ্ছে এই ঈমাম-মোয়াজ্জিন শ্রেণী।
প্রতিষ্ঠিত এলাকাগুলোতে মসজিদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মার্কেটও গড়ে ওঠছে। এসব মার্কেটের আয়ের পুরো অংশটাই হস্তগত হচ্ছে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপকদের মাঝে। তাছাড়া মসজিদের উন্নয়নের জন্য জনগণের কাছ থেকে গৃহীত চাঁদা, যাকাত, বৈদেশিক সাহায্যের একটা বৃহৎ অংশ নিয়মতান্ত্রিকভাবেই মসজিদের ব্যবস্থাপকদের পকেটে যায়। তাছাড়া ধর্মের প্রতি অতি উদারতার কারণে এসব মসজিদের বিদ্যূৎ, পানি ও অন্যান্য সেবামূলক কর্মকান্ডের কোন বিলই সরকারকে পরিশোধ করতে হয়না। মসজিদের সাথে সংযুক্ত থাকার কারণে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত মসজিদ সংলগ্ন মার্কেটগুলোও বর্ণিত সুবিধা ভোগ করে থাকে। আমাদের দেশের সেবাখাতগুলোর ভর্তুকি ও সিস্টেমলসের এটাও অন্যতম কারণ।
এ মসজিদগুলোর সামাজিক গুরুত্বও প্রশ্নের উর্ধ্বে নয় । মসজিদ কেবলমাত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয় এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠানও বটে। সামাজিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং সমাজকে একত্রিত রাখার ক্ষেত্রে মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এ মসজিদগুলো সমাজকে একত্রিত করার বিপরীতে বিভক্তই করছে। এসব মসজিদের জন্ম-ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে মসজিদ ভিত্তিক রাজনীতি ও দলাদলির কারণ থেকে উদ্ভুত বিরোধের জের ধরে পুরনো মসজিদ ত্যাগ করার কারণেই এদের সৃষ্টি। কাজেই মসজিদ যেখানে সামগ্রিক অর্থে সবার হওয়া উচিত ছিল সেখানে এগুলো বিশেষ গোষ্ঠীর মসজিদে পরিনত হচ্ছে এবং এলাকাভিত্তিক বিরোধকে জিইয়ে রাখছে। তছাড়া একই এলাকায় একাধিক মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে এসব মসজিদে বেশিরভাগ সময়ই এক কাতারের বেশি পূর্ণ হয়না।
মসজিদকেন্দ্রিক এ ধর্মব্যবসা, সামাজিক দলাদলি, সরকারি সম্পত্তি দখল বন্ধ করার নিমিত্ত মসজিদ নির্মাণের এ প্রতিযোগিতা বন্ধ করা সরকারের অত্যাবশ্যক করণীয় বিষয় সমূহের একটিতে পরিণত হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকার নতুন মসজিদ নির্মাণ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে সাধারণ পর্যবেক্ষণের আলোকে এ নীতিমালায় নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ উল্লেখ থাকা প্রয়োজন বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করিঃ
১) নতুন মসজিদ র্নির্মাণের ক্ষেত্রে অবশ্যই ধর্ম মন্ত্রণালয় এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুমতি গ্রহণের বিধান চালু করা যেতে পারে;
২) একই এলাকায় একাধিক মসজিদ নির্মাণ যতদূর সম্ভব নিরুৎসাহীত করা যেতে পারে;
৩) কোন অবস্থায়ই সরকারি জায়গা, অবমুক্ত জায়গায় মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেয়া যাবে না। কারণ এ জায়গাগুলো সরকার জনগণের কাছ থেকে জনকল্যাণের বিশেষ উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করে। সরকারি এসব অবমুক্ত জমিতে মসজিদ নির্মাণের ফলে সরকার প্রকৃত যে উদ্দেশ্যে জায়গাটি অধিগ্রহণ করেছিল সে উদ্দেশ্যটিই সার্বিক অর্থে ব্যহত হয়;
৪) মসজিদের নির্মাণ এবং একে পরিচালিত করার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা হতে আসবে সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে হবে। কোন অবস্থায়ই যাতে জনগণের কাছে চাঁদাবাজি করে এ অর্থ সংগ্রহ না করা হয় সে বিষয়টির দিকে নজর রাখতে হবে;
৫) মসজিদ কেন্দ্রিক বিপনী বিতানে ব্যবহৃত যাবতীয় সরকারি সেবামুলক কার্যক্রমের বিল, কর, পৌরকর, ভূমিকর সংগ্রহের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে;
৬) জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার স্বার্থে মসজিদের আয়-ব্যয়ের বাৎসরিক হিসাব গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে;
৭) বেসরকারি স্কুল-কলেজের মতো মসজিদ পরিচালনা ও ঈমাম- মোয়াজ্জিন নিয়োগ কমিটিতে সরকারের প্রতিনিধি রাখা যেতে পারে;
৮) সমাজের অনুৎপাদনশীল খাত বলে বিবেচিত এ ঈমাম- মোয়াজ্জিনদের কে নামাজ পড়ানো ছাড়াও অত্যাবশ্যকভাবে সরকার কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন ও সচেতনতামূলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে;
গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিকেরই নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার আছে। নাগরিক যাতে তাঁর ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান স্বাধীনভাবে পালন করতে পারে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ঠিক তেমনি জনগণের ধর্মানভূতিকে ব্যবহার করে কেউ যদি সরকারি সম্পত্তি দখল, ক্ষতি, সরকারি ও জনগণের সম্পত্তির যা-ইচ্ছে তা ব্যবহার এবং জনগণের কাছ থেকে টাকা আদায় করে তবে তা নিরোধ করার দায়িত্বও সরকারের। আমার বলতে দ্বিধা নেই বর্তমানে যেসব মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে তা উপরের লাইনে বর্ণিত উপায়গুলোর মাধ্যমেই হচ্ছে। তাছাড়া এ ধরণের কর্মকান্ডে সরকারি সম্পত্তির যেমন অপচয় হচ্ছে তেমনি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে অন্যদের মাঝে একটি নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে। এসব বিবেচনায় সরকার ও ধর্মীয় নেতাদের উচিত হবে যততত্র মসিজদ নির্মাণের এই হুজুগকে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সর্বোপরি এ বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নীতিমালা প্রণয়ন করা।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০০৯ বিকাল ৪:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



