আমি সাতার কাটতে জানি। নদীমাতৃক দেশ নামে বিশ্বে পরিচিত একটি দেশের বাসিন্দা হিসেবে এটা আলাদাভাবে উল্লেখ করার বা গর্বের কোন বিষয় নয়। তবে আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের অনেককেই যখন এই কর্মটিতে অযোগ্য দেখি তখন নিজেকে নিয়ে অন্তত নিজের কাছে গর্ব করি। আর এই গর্বের ভিত্তিমূল অর্থাৎ সাতার শেখাটা সম্ভব হয়েছে ছেলেবেলায় নানাবাড়িতে থাকার কারণে। প্রায় একযুগ পরে গেল সপ্তাহে সেদিন নানাবাড়িতে গেলাম। ভেবেছিলাম ছেলেবেলায় যে পুকুরটিতে সমবয়সী মামাদের সাথে দলবেধে গোসল করতে যেয়ে সাতার শিখেছিলাম তার শীতল জলে নিজেকে আবার সিক্ত করব। কিন্তু পুকুরের অস্তিত্ব কোথায়ও পেলাম না। জেলা শহরে অবস্থিত হওয়ার কারণে বাণিজ্যিক বিবেচনায় পুকুরটি টিকিয়ে রাখা মামাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। ভরাট করে ওখানে মার্কেট করা হয়েছে।
ঠিক দেড়যুগ আগে যখন এই শহরে (শহরতলী বলাই শ্রেয়) এসেছিলাম তখন এখানেও প্রচুর খাল দেখেছি, কিছু পুকুরও দেখেছি। দলবেধে বন্ধুরা সেখানে গোসল করেছি। স্কুলছুটির দিনে একটাকা বাসভাড়া দিয়ে বন্ধুরা সবাই শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে যেতাম। খাল আর পুকুরগুলো কখন যে চোখের পলকে রাস্তা আর মার্কেট হয়ে তা বুঝে উঠতে পারিনি। আর শীতলক্ষ্যা নদী! সেটাতো দখল আর গার্মেন্টস্ এর বর্জ্য নিক্ষেপের ফলশ্রুতিতে ময়লা বাহক ড্রেনের রূপ নিয়েছে। তাকালে গোসল করার সাহসতো দূরে থাক, নাক বন্ধ করে দৌড়ে পালাতে হয়।
রাজধানীর উত্তরে জুরাইনে গীত আর সংগীত নামে দুটি সিনেমা হল ছিল। এখনও হয়তো আছে, তবে আমি নিশ্চিত না। বহুকাল ওদিকটাতে যাওয়া হয়না। ছেলেবেলায় আমি আর আমার সিনেমাপাগল এক খালাত ভাই এই হল দুটিতে প্রায় প্রতি মাসেই সিনেমা দেখতে যেতাম। সিনেমা দেখার আগে বা পরে এক টাকা ভাড়া দিয়ে নৌকা করে বুড়িগঙ্গার ওপারে যেতাম আবার ফিরে আসতাম। বুড়িগঙ্গা দিয়ে এখন নৌকা চলে কিনা আমি জানিনা। তবে পত্রিকা পড়ে যা বুঝতে পারি শীতলক্ষ্যা নদীর মতো এটাও হয়তো ময়লা বাহক ড্রেনের রূপ নিয়েছে অথবা এখন না নিলেও ভবিষ্যতে নিবে। ঢাকাকে ঘিরে থাকা অন্য আরেকটি নদী তুরাগেরও একই অবস্থা। দখল, ভরাট আর কারখানার ময়লাকে ধারণ করতে গিয়ে সেও ড্রেনে রূপ নিয়েছে। অথচ ভাবতে অবাক লাগে এর পাশেই প্রতিবছর অনুষ্ঠিত মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ একটি সমাবেশ। প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বলে পরিচিত খোদ রাজধানীর নদীগুলোরই যখন এই অবস্থা তখন সারাদেশের অন্য নদীগুলোর কি অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়।
ঢাকার আশেপাশের নদীগুলোকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংগঠনকে নানা কর্মসূচি নিতে দেখা যায়। তবে সেগুলো বিচ্ছিন্ন এবং পরিকল্পিত নয়। এসব কর্মসূচির ফলশ্রুতিতে সাময়িকভাবে কিছু উচ্ছেদ অভিযান হলেও অল্পদিন পরেই আবার নীরবতা, আবার আগের মতো সেই দখলবাজি। বেচারাদের দোষ দিয়ে কি লাভ? নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সমাজসেবা আর ক'দিন চালানো সম্ভব।
প্রাণীজগতে তেলাপোকা সর্বভূক বলে পরিচিত। খাবারের ব্যাপারে তার কোন বিচার নেই। যা পায় তাই খায়। হজমেও কোন সমস্যা নেই। অবশ্য এই সর্বভূক তেলাপোকা তার মাকে খায় কিনা তা আমার জানার পরিধির আওতায় নেই। কিন্তু মনুষ্যজাতির মধ্যে সর্বভূক বলে পরিচিত আমরা বাঙ্গালীরা যে আমাদের গ্রাসের তালিকা থেকে নিজের মাকেও বাদ দেইনি সে বিষয়টি আমি নিশ্চিতভাবেই আপনাকে অবহিত করতে পারি।
আমরা নিজেদের নদীমাতৃক দেশের বাসিন্দা বলে পরিচয় দেই। নদীকে নিজের মা বলে দাবি করি। অথচ নিজেদের স্বার্থে, দেশের ভবিষ্যৎ ও পরিবেশের কথা না ভেবে আমরা এই মাকে হত্যা করতেও কুন্ঠিত হইনা। এই আচরণের পরও কি বলা উচিত যে বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ? নদী আমাদের মা? না, কোন অবস্থায়ই নয়। বরং এই দেশের পরিচয় হওয়া উচিত নদীহন্তক বাংলাদেশ। আর আমাদের পরিচয় হওয়া উচিত মাতৃহন্তক সন্তান হিসেবে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০০৯ বিকাল ৩:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



