খুব সহজ ভাষায় কেউ যদি আমাকে পাপের সংজ্ঞা দিতে বলেন তাহলে আমি বলব, যা অন্যকে কষ্ট দেয় তাই পাপ। তবে সহজ এই সংজ্ঞাটিতে কিছুটা খটকা বা অসম্পূর্ণতা অবশ্যই থেকে যায়। কারণ আপনার অনেক ন্যায়সংগত আচরণও কিন্তু অন্যকে কষ্ট দিতে পারে এবং দেয়। একজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক যখন দোষীকে শাস্তি দেন তখন ঐ দোষী ব্যক্তিও কিন্তু কষ্ট পান। তবে এই কারণে ঐ বিচারক পাপ করেছেন তা আপনি বলতে পারেন না। সে বিবেচনায় সংজ্ঞাটিকে পরিপূর্ণতা দিতে আরো বিস্তৃতভাবে বলতে পারি, ব্যক্তির অযাচিত আচরণ যা অন্যকে কষ্ট দেয় বা অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন করে তাই পাপ। কিন্তু বৃহৎ পরিবেশ বিবেচনায় এই সংজ্ঞাটিও আমাকে তৃপ্ত করেনা। এটা হতে পারে কেবলমাত্র ব্যক্তিগত আচরণ সাপেক্ষে পাপের সংজ্ঞা। তবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কার্যপরিধির বিবেচনায় এই সংজ্ঞাটিকেও আপনি সম্পূর্ণ বলতে পারেন না। তখন আরো বিস্তৃতভাবে আমাকে বলতে হবে সমাজ বা রাষ্ট্র কর্তৃক ব্যক্তির উপর আরোপিত দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি অনিষ্ঠাই পাপ।
পাপ ব্যক্তিগত ও সমাজিক প্রপঞ্চসমূহের অন্যতম। এটি নিঃসন্দেহে ব্যক্তি ও সমাজকে নেতিবাচক দিকে ধাবিত করে। সমাজের শৃংখলা ও নৈতিক অবস্থানকে ধ্বঃস করে। তাই সভ্যতার শুরু থেকেই সমাজের ব্যক্তি আচরণের এই নেতিবাচক প্রবঞ্চটিকে রোধ করার বা বাধা দেয়ার একটি প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। এটা স্বীকার করতে আমার কোন কুন্ঠা নেই যে, এই বাধার প্রথম প্রচেষ্টাটা নেয়া হয় ধর্মের মাধ্যমে। প্রকৃতপক্ষে আমার এটা সব সময়ই মনে হয় যে ধর্মগুলোর উৎপত্তি হয়েছিল মানুষকে অনৈতিক তথা পাপকাজ থেকে দূরে রেখে সমাজে শৃংখলা প্রতিষ্ঠার তাগিদে। এই অনৈতিকতা বা পাপরোধের পন্থা বা উপায় হিসেবে ধর্ম বেছে নিয়েছিল কোন কাল্পনীক মহাশক্তিধরকে। সেই মহাশক্তি সর্বশক্তিমান। তিনি দুষ্টকে কঠিন শাস্তি দেন এবং সৎ-কে পুরস্কৃত করেন। এটা সত্য যে ধর্মগুলোর অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং যুগের পরিবর্তনে এগুলোর অনেক নিয়মের যুক্তিসংগত কার্যকারিতা এখন আর নেই। তৎসত্ত্বেও আমি অবশ্যই স্বীকার এবং বিশ্বাস করি যে, ধর্ম নৈতিকতা শিক্ষা দেয় এবং এই শিক্ষা অন্তত কিছু মানুষকে পাপ হতে দূরে রাখে। সেটা হয়তো শাস্তির ভয়ের কারণে কিংবা পুরস্কারের লোভের কারণে হতে পারে। ধর্মের এই নৈতিক শিক্ষাটা সর্বজনীন এবং সকলযুগেই সমান উপযোগী।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে একজন নাস্তিক যিনি সর্বশক্তিমানের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেননা, শাস্তির ভয় করেননা কিংবা পুরস্কারেরও আশা করেননা তিনি কি অবলম্বন করে পাপ হতে দূরে থাকবেন। এর উত্তর আমার আছে এবং আমি প্রায় তা বলেও থাকি। তা হচ্ছে ব্যক্তির বিবেকের জাগরণের মাধ্যমে এমন একটি বোধ সৃষ্টি করা যার মাধ্যমে সে অন্যায় কাজকে ঘৃণা করবে এবং তাঁর থেকে নিজেকে দূরে রাখবে। মানুষ যেহেতু বিবেকবোধ সম্পন্ন প্রাণী সেহেতু তাঁর পক্ষে এইভাবে পাপ হতে দূরে থাকা সম্ভব। বিবেকের জাগরণের মাধ্যমে অন্যায়রোধ সর্বোত্তম, তবে কষ্টসাধ্য। এটা সাধনার বিষয়। আমার ধারণা খুব কম লোকের পক্ষেই তা অর্জন সম্ভব।
তবে যত যুক্তিই আমার নিজেকে আমি দেইনা কেন সার্বিক বিবেচনায় নাস্তিকতাকে আমার কাছে পাপরোধের কিংবা নৈতিকতা অর্জনের খুব effective way বলে মনে হয়না। একজন নাস্তিক ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকারের মাধ্যমে তিনি এটাই চর্চা করছেন যে এই পৃথিবীই শেষ। মৃত্যুর পর সৎ কর্মের পুরস্কার বা অসৎ কর্মের শাস্তির কোন সম্ভাবনাই সে দেখছেনা। লক্ষ্য করুন নাস্তিকতার ভাবনা অনুযায়ী ভাল থাকার জন্য যে কষ্টটা আপনি সহ্য করেন তার কোন মূল্যায়ন নেই। আবার কেউ অসৎ উপায় অবলম্বন করে পৃথিবীতে বিলাসী জীবনযাপন করে গেলেও তার কোন শাস্তি নেই। এই লজিকটার সঙ্গে আমি খুব একটা খাপ খাওয়াতে পারিনা যে একজন ব্যক্তি পাপের শাস্তি বা সৎকর্মের পুরস্কার পাবেন না। এখানে হয়তো একটা যুক্তি দেখানো যেতে পারে যে, রাষ্ট্রই দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করবে। কিন্তু এমন উদাহরণতো কেউ দেখাতে পারবেন না যে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র এটা করতে সক্ষম হয়েছে। দুষ্টরা সব সময়ই ধরাছোয়ার বাইরে থেকেছে, ক্ষেত্রবিশেষে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণও করেছে।
অন্য যেকোন বিষয়ে নাস্তিকতা আমার কাছে আস্তিকতার চেয়ে better option বলে মনে হলেও পাপরোধে নাস্তিকতার দুর্বলতার বিষয়টি সব সময়ই আমার মনে ঘুরপাক খায়। অনেক চেষ্টা করেও এই পাক হতে আমি মুক্তি পাইনা। এটা অবশ্য সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি। অবশ্য আমি এটা জানিনা যে অন্য নাস্তিকরা এই বিষয়টিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করেন বা করবেন। আমার মনে হয় যারা নাস্তিকতা নিয়ে ভাবেন এবং এর উৎকর্ষ চান তাদের এ বিষয়টি নিয়ে ভাববার যথেষ্ঠ অবকাশ রয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুন, ২০০৯ বিকাল ৪:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


