ধর্মগুলো কোথা থেকে এসেছে এবং কি কারণে এসেছে তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছে। ঠিক এ মুহুর্তে পুরনো বিষয় নিয়ে কথা বলার কোন আগ্রহ প্রকাশ করছিনা। তবে এ লেখার স্বার্থে পুরনো বিতর্কগুলোর একটা সারাংশ দাড় করানো প্রয়োজন। আপনি যদি এ বিতর্কগুলোর সারাংশটা পর্যবেক্ষণ করেন তবে বিষয়টা এমন দাড়ায় যে যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন তারা ধর্মগুলোকে ঈশ্বর প্রদ্ত্ত এক অপার্থিব দলিল বা ঈশ্বর প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা বলে স্বীকৃতি দেন। তাদের মতে এ জীবনব্যবস্থা প্রত্যেক মানবের জন্য আবশ্যিকভাবে পালনীয়। এর ব্যতিক্রম হলে শক্তি প্রয়োগও নৈতিক। অপরদিকে যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন না তাদের মতে ধর্মগুলো তাদের প্রবর্তকের নিজের মতবাদ বা নিজের সৃষ্টি। প্রবর্তক তার নিজের অথবা গোষ্ঠীর স্বার্থের তাগিদে এগুলোর প্রবর্তন ঘটিয়েছেন।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কোন নির্দিষ্ট একটা সময়ে কোন নির্দিষ্ট একটি ধর্মের অনুসারী ছিলাম। আমার মনে হয় পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষই আমার মতো। কেউই নাস্তিক অথবা অবিশ্বাসী হয়ে জন্মগ্রহণ করেন না। যদি এমনটা কেউ দাবি করেন তবে আমি তাকে সত্যিকারের নাস্তিক বলব না। নাস্তিকতা অর্জন করতে নিবিড় বিশ্লেষণ এবং স্বজ্ঞানের আলোকে। নাস্তিকতা অবিরত চর্চার বিষয়। আমার মনে হয় আমি সে কাজটাই করেছি। তবে এটা দাবি করিনা যে পুরোপুরি নাস্তিক হতে পেরেছি। আমার মনে হয় আমি এখনও এতোটা উদ্ধত বা সাহসী হতে পারিনি। কোন দুর্বল মুহুর্তে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসটা হঠাৎই জেগে ওঠে। আমি দ্বিধাগ্রস্থ হই।
ঈশ্বরের প্রতি অবিশ্বাসটা পুরোপুরি রপ্ত না করতে পারলেও ধর্মগুলোর প্রতি অবিশ্বাসটা আয়ত্ত্ব করতে পেরেছি বলেই মনে হয়। এটা অবশ্যই আমার অবিরত চর্চা, পর্যবেক্ষণ এবং নিবিড় বিশ্লেষণের ফল। বাস্তব অবস্থা এবং বর্তমানের প্রেক্ষিতে ধর্মগুলোকে আমার কাছে অসার মনে হয়। ধর্মগুলোর রীতি, প্রথা বা আইন বর্তমানে আর প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করিনা। কথাটা না পেচিয়ে সোজা বাংলায় সাহস করে বলেই ফেলি যে, ওগুলো মনুষ্য সৃষ্টি। আমি শুধু আমার বিশ্বাসটা বললাম। এ কথার মাধ্যমে কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে তাকে আমি বলব অন্যের বিশ্বাসটা স্বাভাবিকভাবে নিন, কষ্টের মাত্রাটা কম হবে।
তবে ধর্মগুলোকে যারা অতো হেলাফেলা করেন আমি তাদের দলেও নই। আমি ধর্মগুলোকে সে যুগের প্রয়োজনীয় আইন বা ব্যবস্থা বলে মনে করি। ধর্মগুলো অবশ্যই যুগের চাহিদা মিটিয়েছিল। যারা এর প্রবর্তন করেছিলেন তারা অবশ্যই মহামানব। আমি গৌতম বুদ্ধ বা মুহম্মদ-কে অবশ্যই মহাত্মা গান্ধী বা মার্টিন লুথার কিংয়ের সমপর্যায়ের মহামানব মনে করি। তারাও তাদের যুগকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। যুগের মানুষের শান্তি, প্রগতি বা উন্নতি কামনা করতে চেয়েছিলেন। এখন বিষয়টা আপনাকে চিন্তা করতে হবে যুগের মানুষের চিন্তা, মনন বা বিশ্বাসের সাপেক্ষে তুলনা করে। মানুষ জ্ঞান বিজ্ঞানে তখন উন্নত ছিলনা। বিজ্ঞানের দ্বারা বা জ্ঞানের দ্বারা তাদের প্রগতিশীল করা সম্ভব ছিলনা। তাই তখন মুহম্মদ বা অন্যদের কথিত ঈশ্বরের শক্তির ছায়া নিতে হয়েছে, ঈশ্বরের প্রতিনিধি হতে হয়েছে। তা না করলে তখনকার মানুষ তা মানত না। মানুষ তখন কেবলমাত্র অলৌকিকতাকে বা অলৌকিকতার ধারক বা প্রতিনিধিকেই সমীহ করত। তবে নিজেদের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এ মিথ্যার আশ্রয় তা নিলেও তারা যে আইন বা রীতির প্রয়োগ করেছিল তা অবশ্যই যুগের মানুষকে সভ্য করার জন্য করেছিল। অর্থাৎ সূচনাটা যাই হোক না কেন চূড়ান্ত উদ্দেশ্যটা অবশ্যই সৎ ছিল।
তাদেরকে মূল্যায়নের সময় তাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থা এবং সংস্কৃতির দিকেও খেয়াল রাখা উচিত। সামাজিক, রাষ্ট্রীয় অবস্থা এবং সংস্কৃতির কারণে আপনি বুদ্ধের কাছ থেকে যে সহনশীলতা বা উদারতা আশা করতে পারেন তা মুহম্মদের কাছ থেকে আশা করতে পারেন না। বুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতির এবং অবস্থার মাঝে বেড়ে ওঠেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশ অতীত হতেই কৃষিতে উন্নত এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল। এখানে খুব কম লোককেই অন্ন কষ্টে ভোগতে হয়েছে। তাই এখানকার মানুষ উদার এবং শান্তিপ্রিয়। গৌতম এ সংস্কৃতির মাঝেই বড় হয়েছেন। অপরদিকে আরবভূমি অনুর্বর। কৃষি জমি নেই বললেই চলে। জীবিকা ও পেটের তাগিদে ব্যবসা এবং দস্যুবৃত্তি ও পররাজ্য লুণ্ঠনের উপর নির্ভর করতে হত। মুহম্মদ এই সংস্কৃতির মাঝেই বড় হয়েছেন। তার আচরণে এই সংস্কৃতির প্রভাব অবশ্যই কিছুটা পড়বেই। আমার বিশ্বাস গৌতম বুদ্ধ যদি আরবে কিংবা মুহম্মদ যদি ভারতবর্ষে জন্মাতেন এবং বড় হতেন তবে তাদের আচরণ অবশ্যই বিপরীত হত। কাজেই ধর্মপ্রবর্তকদের সীমাবদ্ধতা বিচার করার সময়ে তার্কিকদের অবশ্যই তাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অন্যান্য প্রপঞ্চগুলো বিবেচনায় নেয়া উচিত।
ধর্মগুলোকে নিয়ে এ বিতর্ক চলতেই থাকবে। আপনি যতোই বিরক্তি দেখান না কেন এর কোন সমাপ্তি খুঁজে পাবেন না। তবে আমার মনে হয় এ সংক্রান্ত তর্কের আগে এ লেখার প্যারা-৪ ও ৫ বর্ণিত বিষয়সমূহকে বিবেচনায় আনলে এ তর্কের কিছুটা সীমরেখা টানা সম্ভব। অবশ্য সমাধান আসবে এ আত্মবিশ্বাস নেই। তবে তর্ক যতো জটিলই হোক না কেন তার্কিকদের মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধবোধ থাকাটা আবশ্যিক। তা নাহলে একজন প্রতিক্রিয়াশীল এবং আপনার মাঝে কোন পার্থক্য থাকল কি? আরো যে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নেয়া উচিত তা হচ্ছে আমি তর্ক করতে যাচ্ছি নিজের অবস্থানের যাচাই এবং শুদ্ধতার লক্ষ্যে। আমি যদি প্রথম থেকেই এ উদ্দেশ্যে তর্কে নামি যে আমি যা বিশ্বাস করি প্রতিপক্ষকে কোন প্রকারে তা মানিয়েই ছাড়ব তাহলে তর্কে না নামাই শ্রেয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে অন্যকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে এবং সে যা বলছে তা শুনতে হবে। আমি বিনয়ের সাথে ক্ষমা চেয়েই বলছি আমাদের ধর্মবিশ্বাসীদের মাঝে এ গুণটির যথেষ্ট অভাব আছে।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


