somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডাঃ জাকির নায়েকঃ গদীনসীন পীরতন্ত্রের আধুনীক সংষ্করণ

১৩ ই জুন, ২০১০ দুপুর ২:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইসলামে বংশভিত্তিক উত্তরাধিকার রাজতন্ত্রের অভ্যুদয় ঘটে ইসলামের নবীর প্রধান শত্রু আবু সুফিয়ানের উত্তর পুরুষ মুয়াবিয়া এবং তাঁর সন্তান ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার মাধ্যমে। অবশ্য এর পূর্বেও নবীর উত্তরাধিকার হিসেবে তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে আলী ইবনে আবু তালেবকে শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার একটা প্রচেষ্টা ছিল। সে যাত্রা তা সফল না হলেও পরবর্তীতে খলিফা উসমানের মৃত্যুর পর আলী শাসক হন। আলীর মৃত্যর পর তাঁর ছেলে হাসান এবং পরবর্তীতে হোসেনের মাধ্যমে নবীর উত্তরাধিকার হিসেবে আরেকবার বংশভিত্তিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। তবে সেটা মুয়াবিয়া এবং তাঁর ছেলে ইয়াজিদের সামরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কারণে সফল হয়নি। বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মুয়াবিয়া ও তাঁর ছেলে ইয়াজিদ একটি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন যা উমাইয়া রাজবংশ হিসেবে খ্যাত। প্রায় ৯০ বছর ইসলামী বিশ্ব শাসন করার পর নবী মুহম্মদের চাচা আব্বাসের বংশধরদের কাছে উমাইয়াদের পতন ঘটে। প্রতিষ্ঠিত হয় আব্বাসীয় খিলাফত।

সময় এবং আধুনীকতার স্পর্শে পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন আসলেও ইসলামী বিশ্ব (বিশেষ করে আরবভূমি) এ উত্তরাধিকার শাসনের হাত থেকে নিস্কৃতি পায়নি। ২২টি আরবদেশের প্রায় প্রতিটিতে বংশভিত্তিক রাজতন্ত্র বা বংশভিত্তিক একনায়কতন্ত্র বিদ্যমান। সুন্নী ইসলামের প্রধান পৃষ্ঠপোষক সৌদিআরবে শুধু বংশভিত্তিক রাজতন্ত্রই বিদ্যমান নয় বরং প্রশাসনযন্ত্র ও রাষ্ট্রের বড় বড় পদের সবগুলোই রাজ পরিবারের সদস্যদের দখলে। আসলে বংশভিত্তিক রাজতন্ত্র বা বংশভিত্তিক একনায়কতন্ত্রের সিস্টেম বা প্রথাটা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এমনভাবে ঝেকে বসেছে যে এর বলয় থেকে বেড়িয়ে সেসব দেশে কোনদিন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে তার আশা করা অলৌকিক স্বপ্ন ছাড়া কিছুই নয়।

রাজনীতির মতো ইসলামে ধর্মীয় ও আধ্যাত্বিক ক্ষেত্রেও পীরতন্ত্রের নামে উত্তরাধিকার প্রথা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আরবদেশে পীর সংষ্কৃতির প্রভাব কতটুকু তা আমার জানা নেই। তবে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশীয় অবস্থা ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে এসব পীররা সন্মান, মর্যাদা এবং প্রভাবে সমাজে অন্য সমাজের অন্য প্রভাশালীদের তুলনায় কোন অংশেই কম নয়। এ মর্যাদা, সন্মান ও আধিপত্য বংশানুক্রমে এক জেনারেশন থেকে অন্য জেনারেশনে স্থানান্তরিত হয়। ছেলেবেলায় গুরুজনদের মুখে ছরছীনার পীর, চন্দ্রপাড়ার পীর, ফতেয়াবাদের পীর, চমোনাইর পীর সাহেবদের নাম ও গুণগান শুনতাম। নামগুলো এখনও শুনি। তবে গুরুজনদের কাছ থেকে শুনা সেই পীর আর বর্তমানের পীর একব্যক্তি নন। স্থানের নামানুসারে তাঁরা পরিচিত হলেও আসলে তাঁরা কেউ পূর্বের পীরদের ছেলে, নাতী এবং ক্ষেত্রবিশেষে মেয়ের জামাই। যে সমস্ত সন্তানের পক্ষে পীর হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি তাঁরা হয়েছে পীরের নিযুক্ত খলিফা, সাথে লাগিয়েছেন পীরজাদার তকমা। এভাবে তথাকথিত পীরবাদের মাধ্যমে নিশ্চিত হচ্ছে ভক্ত নামের কিছু সহজ সরল মানুষকে ধোকা নিয়ে বংশানুক্রমে রোজগার, জীবিকা, মর্যাদা ও আধিপত্য বজায় রাখার ব্যবস্থা।

ঐতিহ্যবাহী এ পীরতন্ত্রেরই একটি আধুনীক সংস্করণ আজকাল ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষ্যিত হচ্ছে। এ সমস্ত পীরেরা আধুনীক শিক্ষায় শিক্ষিত। পোশাক ও পরিচ্ছেদেও আধুনীক। তবে চূড়ান্ত উদ্দেশ্য সেই পুরাতন পীরতন্ত্রেরই অনুরূপ, ধর্মের নামে মানুষকে ধোকা দিয়ে দিয়ে সহজ উপায়ে সমাজে সন্মান, মর্যাদা, আভিজাত্য এবং প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করা। এমনি একজন আধুনীক পীর হচ্ছেন ভারতের ডাঃ জাকির নায়েক। ইসলাম প্রচারের নামে সৌদিআরব ও মধ্যপ্রাচ্যের যাকাতের টাকা দিয়ে গড়ে তুলেছেন ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন। পিস (Peace) টিভি নামের একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশন এ ফাউন্ডেশন পরিচালনা করেন। আপনি যদি এ টেলিভিশনে পরিবেশিত অনুষ্ঠানগুলোর ডেকোরেশন বা সাজের বাহার দেখে থাকেন তাহলে সহজেই বুঝবেন কিভাবে দরিদ্র জনগণের প্রাপ্য যাকাতের টাকার অপচয় হচ্ছে। তবে যেহেতু এনিয়ে একটি লেখা আগেই পোস্ট করা হয়েছে তাই আলোচনাটা সেদিকে বাড়িয়ে বিষয়বস্তু (পীরতন্ত্রের নামে বংশানুক্রমিক সন্মান, মর্যাদা, আভিজাত্য এবং প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করা) এর বাইরে যেতে চাইনা। সেটা উচিতও হবেনা।

আপনি যদি পিস টিভিতে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলো মনোযোগের সাথে দেখে থাকেন তাহলে দেখবেন বেশিরভাগ অনুষ্ঠানই ডাঃ জাকির নায়েককে কেন্দ্র করে। অনুষ্ঠানের শুরু হবে ডাঃ নায়েকের বন্দনা দিয়ে। বেশিরভাগ অনুষ্ঠানেই উপস্থাপক তাঁর ভাই মোহাম্মদ নায়েক। শুধু তিনি বা তাঁর ভাই নন, পরিবারের অন্য সদস্যরাও এ টিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সুবিধাভোগী। ওয়ান্ডারের কিডস (Wonder Kids) নামের একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দুই ভাইয়ের (জাকির ও মোহাম্মদ নায়েক) নাবালক শিশুদের তথাকথিত প্রতিভা প্রদর্শনের নামে শিশু অবস্থায়ই তাঁদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ইদানিংকালে এসব বিষয়গুলোকে যে বিষয়টি ছাপিয়ে গেছে তা হচ্ছে এ চ্যানেলের মাধ্যমে তাঁর নাবালক পুত্র ফারিক নায়েককে (Fariq Naik) শিশু অবস্থায়ই তাঁর স্থানে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাপ-ব্যাটা দুজনকেই একসাথে ওয়াজ (আলোচনা) করতে দেখা যায়। সম্প্রতি পিস টিভিতে প্রচারিত একটি ঘোষণার মাধ্যমে জানানো হচ্ছে যে, এ মাসের শেষের দিকে যুক্তরাজ্যে বাপ-ব্যাটা (জাকির ও ফারিক) একসাথে একই মঞ্চে আলোচনা করবেন। গোফ-দাড়ি ওঠেনি এমন একটি শিশুকে দিয়ে এ ধরণের প্রচেষ্টা-কে কি হিসেবে আখ্যা দিব তার ভাষাজ্ঞান আমার নেই। তবে বিষয়টিকে আখ্যা দেয়ার মতো ভাষাজ্ঞান না থাকলেও অন্তত এটা বুঝি যে, বস্তুত এর মাধ্যমে তিনি জীবিত অবস্থায়ই তাঁর উত্তরাধিকারদেরকে তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে বংশানুক্রমিক উপার্জন, সন্মান, প্রভাব ও আভিজাত্যের বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন।

সময় এবং পরিপ্রেক্ষিতের নিত্য পরিবর্তন ঘটলেও বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র আর বংশানুক্রমিক পীরতন্ত্রের কাছ থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের কোন নিস্কৃতি মিলছেনা। বরঞ্চ বলা যেতে পারে দিন দিন তা নবরূপে এবং নব-উদ্যমে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। জানিনা এ শঠতা আর অনাচারের শেষ কোথায়। আমার মতো একজন শক্ত ও কঠিন মনের মানুষও এ বিষয়ে চরমভাবে হতাশ ও বিপর্যস্ত।
----------------------------------------------------------------------------------
Related Post(Click This Link)
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুন, ২০১০ দুপুর ২:০৮
৮১টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×