ফেসবুকের একটি লিংকে সেদিন দেখলাম যে, ডাঃ জাকির নায়েক বাংলাদেশে আসছেন। তবে তার আগমনের সঠিক তারিখটা অনেকের মতো আমিও এখনো জানিনা। এনিয়ে ব্লগ, ফেসবুকে বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে। সেদিন কালের কন্ঠেও এনিয়ে একটি লেখা দেখলাম। লেখাগুলো পরস্পর বিরোধী। কেউ তাঁকে স্বাগত জানাতে বিপুল উৎসাহে অপেক্ষা করছেন। অনেকে আবার তাঁকে প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর আগমনের বিরোধীতা করেন। ডাঃ নায়েককে নিয়ে আমি এর আগে দুটো পোস্ট দিয়েছিলাম। সে কারণে ব্যক্তিগতভাবে তার কর্মকান্ডকে আমি কোন দৃষ্টিতে দেখি সেটা নিয়ে পুনর্বার সাফাই গাওয়ার কোন কারণ দেখিনা। তারপরেও তাঁর বাংলাদেশে আগমনের বিরোধীতা করার কোন যৌক্তিক কারণ আমি দেখিনা। আমি মনে করি তাঁর অবশ্যই বাংলাদেশে আসার সুযোগ রয়েছে। তাঁর আগমন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন কারণ নেই। ভারতের মতো বহু ধর্মে বিভক্ত একটি দেশে তিনি তাঁর কর্মকান্ড বহুদিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে তাঁর একটি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলও আছে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারত সরকার তাঁকে হুমকি বা তাঁর কর্মকান্ডের উপর কোন হস্তক্ষেপ করেছে বলেছে বলে আমার জানা নেই।
যারা তাঁর আগমনের বিরোধীতা করছেন তাঁদের সিংহভাগই সম্প্রতি তাঁকে ব্রিটেনে প্রবেশ করতে না দেয়াকে উদাহরণ হিসেবে টানছেন। আমার কাছে এটা একটি কুযুক্তি। ব্রিটেন যা করবে সেটাকেই বাইবেলের মতো শুদ্ধ বা সঠিক মনে করতে হবে তার কোন কারণ নেই। আমেরিকার পররাষ্টনীতির বশংবদ এবং ইরাক, আফিগানিস্তানে নীরিহ মানুষ হত্যাকারী ব্রিটেনকে শুদ্ধ গণতান্ত্রিক বা পবিত্র কোন দেশ কিংবা অনুকরণীয় ভাবার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া ব্রিটেনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবেশ আমাদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানকার সমাজ বা রাজনীতিতে ধর্ম তেমন প্রভাব ফেলেনা। কিন্তু, আমার সমাজ বা রাজনীতিতে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভোটের রাজনীতিতে ধর্মকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। সে কারণেই সরকার বায়াত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার সাহস দেখালেও সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ, আল্লাহর উপর বিশ্বাস বা রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সরানোর সাহস দেখাচ্ছেনা। নৈতিক বিবেচনায় সরকারের এ অবস্থান সমালোচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখলেও ভোটকেন্দ্রিক রাজনীতি বিবেচনায় আমি এটাকে যৌক্তিকই মনে করি। এমনিতে পানি, বিদ্যুত, গ্যাস, বাজার দর নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে সরকারের জনপ্রিয়তা নিম্নগামী। ঠিক এ অবস্থায় ডাঃ জাকির নায়েককে এদেশে আসতে না দিলে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী যে, ইসলাম গেল, ইসলাম গেল, রব তুলে সরকারকে আরো বিপদে ফেলার চেষ্টা করবে সেটা বলাইবাহুল্য। এ বক্তব্যের কারণে অনেকে হয়তো আমাকে এ সরকারের অন্ধ সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস নেবেন। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হচ্ছে দেশে এ মুহুর্তে আওয়ামী লীগের বিকল্প দেখছিনা। বাম দলগুলো জনবিচ্ছিন্ন। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে আসতে পারে কেবল জামায়াত- বিএনপি জোট এবং সেনাবাহিনী। এসব বিকল্প বিবেচনায় আওয়ামী লীগ আপাতত মন্দের ভাল।
তাছাড়া গত মাসে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সেদেশে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় সে প্রায় সারাক্ষণই তাঁর টিভিতে ব্রিটেন বিরোধী প্রচারণা এবং নিজের গুণগানের হিরিক লাগিয়েছিল। সে বিশ্বের সেরা ইসলামী চিন্তাবিদদের একজন, তাঁর আলোচনা শুনতে অগণিত লোক আসেন, তাঁর আলোচনায় মুগ্ধ হয়ে দলে দলে লোক ইসলাম গ্রহণ করবে, মূলত এসব কারণেই নাকি বিট্রিশ সরকার তাঁকে ব্রিটেনে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। অর্থাৎ তাঁকে ব্রিটেনে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞাকে সে তাঁর বিজয় হিসেবে দেখিয়েছিল। এখন তাঁকে যদি বাংলাদেশে আসতে অনুমিত প্রদান না করা হয়, তবে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে বাংলাদেশ ও এদেশের সরকার-কে ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে ব্রিটেন-কে ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে প্রচার করলে সেটা ব্রিটেনের জন্য কোন ক্ষতিকারক বিষয় নয়। কিন্তু বাংলাদেশ বা বাংলাদেশ সরকারের জন্য ইসলাম বিদ্বেষী হওয়াটা বিরাট ক্ষতির বিষয়। আমাদের দেশের বিশাল জনশক্তি মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে কাজ করে। দেশ বা দেশের সরকারকে ইসলাম বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাঙালীদের বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়ার একটি আশংকা সব সময়ই থেকে যায়। আর তথাকথিত ইসলাম প্রচারক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী শেখদের মধ্যে ডাঃ জাকির নায়েকের একটি গ্রহণযোগ্যতা ইতোমধ্যেই তৈরী হয়েছে। তাঁর পিস টিভি চলে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ধনী শেখদের যাকাতের টাকায়।
উপরোল্লিখিত কারণগুলোকে বিবেচনায় এনে আমি ডাঃ নায়েকের বাংলাদেশে আগমনের বিরোধী নয়। তাই বলে একেবারে হাল ছেড়ে দিয়েছি তা ভাবারও কারণ নেই। বরং ডাঃ নায়েকের এ সফর আমি বাংলাদেশের মুক্তচিন্তার মানুষ বা প্রগতিশীলদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বা সুযোগ বহন করে আনছে বলে মনে করি। আশা করি নিম্নের আলোচনার মাধ্যমে আমি তা প্রতিষ্ঠিত করতে পারব।
আমি ডাঃ জাকির নায়েকের পিস টিভির একজন নিয়মিত দর্শক। তাঁর বেশিরভাগ ডিবেট বা লেকচার আমি শুনেছি। তাঁর ডিবেটগুলোতে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছি অন্য ধর্ম বা বিশ্বাসের কোন ব্যক্তিকে। উদাহরণস্বরূপ শ্রী শ্রী রবিশংকর কিংবা ড. ক্যাম্পবেলের নাম উল্লেখ করা যায়। সুতরাং বিষয়টা পরিস্কার তিনি যাদের সঙ্গে ডিবেট করেন তাঁরা সবাই তার মতোই ধর্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিত্ব, যাদের রুটি-রোজগার এবং বিলাসিতা ধর্মকেন্দ্রিক ব্যবসা থেকে আগত। কাজেই স্বাভাবিক কারণেই ধর্মের মূল ভিত্তি অর্থাৎ ইশ্বরের অস্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে তাঁরা কোন ডিবেট করেন না, করবেনও না। কারণ এটা করলেতো পুরো ব্যবসাটাই বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তাঁদের ডিবেটের প্রধান বিষয়বস্তু থাকে ইশ্বরের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিয়ে নিজ ধর্ম বা মতকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করা।
তাঁর লেকচার বা ডিবেটের পরিবেশটাও আমি খুব ভাল করে দেখেছি। লেকচারের পরে প্রশ্ন ও উত্তরের পুরো পরিবেশটাই তাঁর বাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়। আমার কাছে মনে হয় তাঁর লেকচারে যে সমস্ত প্রশ্ন করা হয় তাঁর বেশিরভাগই আগে থেকে নির্ধারণ করা থাকে এবং তাঁরা বেশিরভাগই তাঁর নিজের লোক। বিচ্ছিন্নভাবে ভিন্নমতের কোন প্রশ্ন আসলে তিনি শুধু নিজের মতো করে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সবশেষে তোতাপাখির মতো বলেন, আশা করি আপনি আপনার উত্তর পেয়েছেন। এক্ষেত্রে প্রশ্নকর্তাকে পুনরায় কোন প্রশ্ন করার বা আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয় না। প্রশ্নকর্তাকে ঘিরে থাকা তাঁর বাহিনী প্রশ্নকর্তার মাইক বন্ধ করে তাঁকে সেখান থেকে বের করে দেয়।
এ বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে ডাঃ নায়েককে একটি উম্মুক্ত বিতর্কে আহবান করা যেতে পারে। আমরা যাদেরকে প্রগতিশীল এবং মুক্তচিন্তার মানুষ বলে বিশ্বাস করি বা যারা নিজেদের এ জাতীয় বলে দাবি করেন তাঁরা তাঁকে এ বিতর্কে আহবান করতে পারেন। যারা তাঁকে এদেশে আনছেন বা বা ডাঃ নায়েকে-কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তাঁকে একটি উম্মুক্ত বিতর্কে অংশগ্রহণের জন্য প্রণোদিত করা যেতে পারে। বিতর্কটি হতে হবে একজন গ্রহণযোগ্য মডারেটরের পরিচালনায় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পরিবেশে। যেখানে ডাঃ নায়েকের পান্ডা বাহিনী মাইক বন্ধ করে দিতে পারবেনা কিংবা ডাঃ নায়েক নিজের মতো একটা উত্তর দিয়ে 'আশা করি করি আপনি আপনার উত্তর পেয়েছেন' বলে প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যেতে পারবেন না। বিতর্কে সব পক্ষের জন্যই সমান সুযোগ ও সময় বরাদ্দ থাকবে।
আশা করি, আমাদের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কেউ একজন এগিয়ে আসবেন। তাঁকে সরাসরি উম্মুক্ত বিতর্কের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিতর্কে অবতীর্ণ হতে বাধ্য করবেন। তাঁর কুযুক্তিগুলো খন্ডন করবেন এবং বাংলার এই পবিত্র মাটিতেই সমাধিস্থ করবেন এই ধর্ম ব্যবসায়ীর ব্যবসাকে।
----------------------------------------------------------------------------------
Related Post: (Click This Link)
(Click This Link)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১০ বিকাল ৫:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



