somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মামার বিয়ের শাড়ী, আমাদের পুতুল খেলা আর ছড়িয়ে যাওয়া জীবন |

১৫ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমরা থাকতাম উনিশ নাম্বার বিল্ডিং এর গেট ‘এ’ তে,পিছনে বিশাল মাঠ আর সামনে রেললাইন| মাঠ পেরিয়ে একটু পরেই ছিলো পাহাড়|

নিচতলার কামরুল মঞ্জু দুই জমজ ভাই আর দোতালার পিংকি দের পুতুল বরের সাথে আমাদের তিনতলার পুতুল কনের বিে| আয়োজন মোটামুটি সম্পন্ন, কাঠি আর দর্জির দোকানের টুকরো কাপড়ের তৈরী আসবাবপত্র পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে , রেললাইনের পাশের বুনোফুল কুড়িয়ে এনে বিয়ের আসর সাজানো ও হয়ে গেছে; বাকী আছে শুধু খাওয়া দাওয়া আর বিয়েটাই| পিচ্চি রুমিকে লাগিয়ে দিয়েছি রান্নাবান্নায়, সোৎসাহে সে পোলাও োরমা কালিয়া
রেজালা সব রেঁধে ফেলছে (উপকরণ - গুড়ো মাটি, ... ফুলের গোটা, এন্না গোটা, নারকেলের মালা)|

হঠাৎ বরপক্ষের ব্যাংগ , ‘তোমাদের মেয়েকে লাগতেছে ফকিরনীর মতো, এইটা কী পড়িয়ে আনছো?’
সাথে সাথে নাজমুনের ভ্যাঁ ভ্যাঁ কান্না| রাগে ক্ষোভে ইচ্ছে হচ্ছিলো কামরুলটাকে দুহাতে ধরে দোতলা থেকে ড্রেনে ফেলে দেই, কিন্তু ও যে বরপক্ষ! তারউপর ওই গাধা তখনই ছিলো সাড়ে তিন মণ আটার বস্তা|


পিচ্চি পিচ্চি দুটো হাতে সব খাবার-দাবার ছিটাতে লাগলো নাজমুন, খেলাই বানচাল হয়ে যায় এই অবস্থা| হঠাৎ আমার খেয়াল হলো আম্মু, ছোটখালা আর বড়মামা তো গতসপ্তাহে সুন্দর সুন্দর শাড়ীকাপড় এনেছেন (বড়মামার বিয়ের আয়োজন চলছিলো তখন)|

নাজমুনকে বললাম , ‘জানিস আম্মুর আলামারিতে না খুব সুন্দর সুন্দর শাড়ী আছে| কান্দিস না , আমরা ওইগুলা দিয়ে আমাদের মেয়ে বিয়ে দিবো’|
নাজমুন তো খুব খুশী, কান্না থেকে ফিক করে হেসে দিয়ে একলাফে দুইটা সিঁড়ি ভাংতে লাগলো, একলাফে দুইটা সিঁড়ি ভাঙ্গাই ছিলো তখন আমাদের মহা গর্বের ব্যাপার|

ওর আম্মুর সেলাইকলের ড্রয়ার থেকে কাঁচির জোগাড় হলো, আমার আম্মুর আলমারিও খোলা হলো, গোল বাধলো প্রথমে শাড়ী নিয়ে| অনেকগুলা শাড়ীর মাঝে তিনটা শাড়ী খুব সুন্দর (পরে জেনেছিলাম ওগুলোকে বিয়ের মূল, প্রথম আর দ্বিতীয় শাড়ী বলে)| কিন্তু ওইগুলার মধ্যে কোনটা নেবো তাই বুঝতে পারছি না, সবই সুন্দর লাগে| অনেক তর্কাতর্কির পর লাল-সোনালি জমকালো শাড়ীটাই আমাদের পছন্দ হলো| আবার বাধলো গোল, কারণ আমাদের লাগবে অল্প একটুকু , আর এই শাড়ীটা বিশাল| তাই মহা বুদ্ধি করলাম, ভাঁজ না খুলেই মাঝখানে পুতুলের মাপে কিছুটা কেটে নিলাম| ভাঁজ খুললে যদি আম্মু বুঝে যায়! ওমা , এদিকে দেখি অনেকগুলো টুকরো হাতে চলে এসেছে| যাই হোক কয়েকটা নিয়ে আমরা পুতুলের শাড়ীতো বানালামই , খাট ও সাজিয়ে ফেললাম| বরপক্ষ এইবার লা-জওয়াব|

বিয়ে টিয়ে তো শেষ হলো, ধুমসে খাওয়া-দাওয়া ও হলো; হাপুস হুপুস কেঁদে কেটে আমরা আমাদের মেয়েকে ও বিদায় দিলাম|

দুপুরের খাবারের পরই ডাক পড়লো আমাদের , আমরা তখন পিঙ্কিদের বাগানে হল্লা করছি| সবাই মিলে বাসায় এসে দেখি, আম্মু ওই শাড়ীটা হাতে ধরে আছেন নির্বাক| ভাবগতিক সুবিধার না তা বুঝতেই পারছিলাম, কিন্তু কতটা খারাপ তা ওই ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে আন্দাজ করতে পারিনি|

‘আন্টি আমারে কয়েকটা দেন এই কাপড়ের টুকরা, পরের বার বিয়েতে আমরা মেয়েপক্ষ’, পিঙ্কির আবদার!

আম্মার প্রশ্ন,‘ কে কাটছে এইটা?’
আমরাতো মোটামুটি নিশ্চিত , কারণ বেশী তো আর কাটি নাই, অল্প (!) একটু আর কী|
তাই নাজমুনের উত্তর, ‘কাকীমা আমাদের মেয়ের কাপড় সাজানোর জন্য অল্প একটু নিয়েছি|’

আমাদের পাশাপাশি দুই বাসায় একটা অলিখিত নিয়ম ছিলো, সেটা হচ্ছে আমাদের মধ্যে যেই অকাজ করুক না কেন সেটাকে যৌথ অবদান ধরা হতো| সুতরাং একজন কিছু করলেই পিটুনি জুটতো দুজনের| মাঝে মাঝে যোগ হতো কামরুল আর মঞ্জু| আবার আন্তঃবাসীয় বিচারিক চুক্তি ছিলো মনে হয়| যেকোনো বাসায় পিটুনি খাবার অবাধ সুযোগ (?) ছিলো আমাদের, গেট উনিশের ‘এ’ হলেই চলবে|

সুতরাং আমার ও নাজমুনের শৈশবের সবচাইতে স্মরনীয় ‘পিটুনি’টা খেলাম ওই দিন| নাজমুনের আম্মুও পাশের বাসা থেকে এসে আম্মুকে বেশ কিছু উপকরণ সরবরাহ করলেন| আমরা দুজন বারবার বলে কয়েও এই বুড়ো বোকাদের বুঝাতে পারছিলাম না যে, আমরা খুব বেশী নেইনি| শুধু যদ্দুর লাগবে তদ্দুর নিয়েছি| কিন্তু কে শোনে কার কথা| বড়োরা যে বড্ডো বোকা হয় তা ওইদিনই বুঝতে পেরেছিলাম|

কান্না-ক্ষোভ আর অভিমান নিয়ে দুজন কাঁদতে লাগলাম, তারপর কেনো জানি আম্মুর খাট আর দেয়াল আলমারির ফাঁকে ঘুমিয়ে পড়লাম|
এদিকে বিকালে মামা এসেতো এই অবস্থা দেখে মাথায় হাত, কিন্তু আমাদের খোঁজ করে আর পাননা| খোঁজ খোঁজ খোঁজ| নিচে মাঠেও নাই, সিঁড়িতেও নাই, কোথাও আমাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না| পরে শুনলাম, সবার মাঝে কান্নাকাটি পড়ে গেছে – দুপুরের পর আমরা কোথাও বেরিয়ে পড়েছি এরকমই ধারণা সবার|

ঘুমের মাঝে বোধহয় কোঁ কোঁ করছিলাম, মামাই খুঁজে পেলেন আমাদেরকে| দুহাতে দুজনকে কোলে নিয়ে আম্মুদের উপর রেগেমেগে
যে বকাবকি শুরু করলেন , তা আর বলার মতো নয়| পারলে ওনারা তখনই সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে বনবাসী হন|

মামা খুব পছন্দ করতেন পিচ্চিদের , আর আমরা আমাদের সেই ‘অল্প কেটেছি’ যুক্তি মামাকে বলতে লাগলাম| মামাও অম্লানভাবে মেনে নিলেন , সবাইকে বললেন ,’সত্যি অল্পই কেটেছে তো’(!)।

শাড়ীটা বড়মামী রেখে দিয়েছিলেন স্মৃতি হিসাবে| অনেকদিন পর বড়ো হলেও বড়মামী আমাকে খেপানোর জন্য বলতেন,’তোর বিয়ের সময় আমি এটা দিয়ে তোর বউকে আনবো’; আমি হাসতাম | নাজমুনের সাথে দেখা হলেও খেপাতেন খুব|


বড়মামী খুব অকালে ভুল চিকিৎসায় মারা গিয়েছেন বছর দুয়েক আগে , তার চারটি ছোট মেয়েকে রেখে| ওনার রুমে এখনো রাখা আছে সেই শাড়ীটা| মাঝে মাঝে গেলে দুহাতে গন্ধ নেই, সরল শৈশবের|


সেই মুখগুলো আজ ভাসে নস্টালজিক স্বপ্নের মাঝে, কচি সেই কান্নাভেজা মুখ, বড়োমামার বুকে জড়িয়ে আছি দুজন, খাটের নিচের অভিমানী ঘুম , লাফাতে লাফাতে সিঁড়ি ভাঙ্গা ; ঘূর্ণিঝড়ের মতো বয়ে যাওয়া এখনকার জীবনের মাঝে একমাত্র যারা তৈরী করতে পারে স্থিতিজড়তা – কিন্তু সব্বাই আজ কোণ সৃষ্টিকারী দুটো সরলরেখার মতো অপসৃয়মান| দূরে থেকে কেবলই দূরে যায়|
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ১:২৮
২৭টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×