বেশ কিছুদিন বাইরে কাটিয়ে গত সপ্তাহে ফিরেছি প্রিয় আলো-বাতাসে, প্রিয় আধো-অন্ধকার ঘরের কোণটিতে। এর মাঝে মেঘনা সেতুতে কি মরার কাজ জানি চলছে, তাই ঢাকা-চট্টগ্রাম দশ-এগারোঘন্টা করে জার্নি করে অবস্থা পুরা আউলা-ঝাউলা। এর আগের সপ্তাহে প্রতিদিন প্রায় একটা করে শহর পরিবর্তিত হয়েছে জার্নিতে।
গতকাল ঘুম থেকে উঠেই দেখি সাড়ে দশটা বাজে। সব্বোনাশ। এর আগের দিন ও (অনেক দিন পর প্রথম দিনে) গিয়েছিলাম বারোটা বাজে। নির্দিষ্ট কারণ থাকলে অবশ্য এইসব অফিস সময়-টময় নিয়ে আমরা এক্কেবারেই মাথা ঘামাই না। কিন্তু ব্যাক্তিগত ঘুমের জন্য অফিস সময় বাদ যাওয়া নিজের কাছেই অবমাননাকর মনে হয়। তাই হাঁচোড়-পাঁচোড় করে উঠেই দৌড় দিলাম। আমার বাসা পান্থপথ হতে বসুন্ধরা সিটির মুখ পর্যন্ত চলে এলাম, মরার একটা সিএনজি ও পাই না আমি আর আমার ফ্ল্যাটমেট ওয়াহিদ ভাই মিলে।আমরা এপারে এলে মনে হয় সব খালি ট্যাক্সি ওইপার দিয়ে যায়, ওইপারে গেলে এইপার দিয়ে! যাও দুইটা পেলাম, গুলশান যাবে না। বিরস বদনে গরমে ঘামতে ঘামতে ভাবতে থাকি , গত সপ্তাহেও এই দিনে – ‘হ্যালো জিন্দাব্রে, উই নীড এ ট্যাক্সি এট সেইন্টাগো মিকোয়ায়া’ বলে ফোন দিলে ট্যাক্সিওয়ালা এসে কোলে তুলে নিয়ে যেত। আর আজ!
চল্লিশ মিনিট পরে একটা নীল ট্যাক্সিক্যাব পেলাম, সিটের অবস্থা সেইরকম ‘সৌন্দর্য’।নারকেলের ছোবড়াও প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। যাই হোক ওয়াহিদ ভাইকে মহাখালী নামিয়ে দিয়ে আমি গুলশান পৌঁছলাম অবশেষে। এর মাঝে দুইবার বন্ধ হয়েছে ক্যাব। চরম বিরক্তি চেপেই হেসেই হেসেই ঠাট্টা করলাম ,’কি ভাই এইটা মনে হয় ঠেলাগাড়ি আছিলো, ইঞ্জিন লাগাইছে।’ ক্যাবচালক আমারই বয়সী, হাসতে হাসতে বলল, ‘মনে হয় ভাই তাই। কয়েকদিন পর প্যাসেঞ্জার তুইলা আমারেই ঠেলন লাগবো ’। তাড়াহুড়ো করে ভাড়া মিটিয়ে অফিসে ঢুকলাম। ঢোকার মুখে কিছু কলিগদের সাথে হাল্কা আড্ডা দেবার পর ডেস্কে গিয়ে ভাবলাম ফোন দুটোতে চার্জ দেওয়া দরকার।
পকেটে হাত দিয়ে দেখি অফিস থেকে দেওয়া ফোনটা নেই! ব্যাগে নাই। কোথথাও নাই।
সাথে সাথে বুঝলাম কাহিনী কি। সহকর্মীর সেলফোন নিয়ে কল দেওয়া শুরু করলাম আমার ফোনে । বাজতে বাজতে ছয়বার বাজে, সপ্তমবার থেকে ‘নট ক্যান বী রিচড’।
একই সহকর্মীর অফিস ফোনটা হারিয়েছে মাস সাতেক আগে সিএনজিতে। বললেন,’ভাই, ফোনটারে আল্লাহ হাফেজ দেন। আশা ছাড়েন। যান গিয়া সীম ব্লক দেন’।
অগত্যা আর কি। বিষন্ন বদনে বিরস হয়ে নিচের এডমিন ব্লকে গেলাম, এসেট সেক্রেটারীকে বলবো সীম ব্লক দেবার জন্য। জিডি ফিডি আরো কি কি জানি ঝামেলাও আছে। সেক্রেটারী ভাইজানরে বলার পর বলল, আগে মেইল দেন তাড়াতাড়ি। মেইল দেবার জন্য আমার ডেস্কে আসতে না আসতেই দেখলাম সে দৌড়িয়ে এসে বলতে লাগলো, পায়া গেছি ভাইয়া, তাড়াতাড়ি গুলশান এক নাম্বারে যান। ট্যাক্সি ড্রাইভার কল ধরেছে এবং বলেছে সে গ্যাস নিয়ে গুলশান এক এর দিকে আসছে। সেলফোনটা সে পেয়েছে এবং ফেরত দিচ্ছে!!! ওয়াও! হুড়মুড় করে গুলশান এক এ। দেখি আমার সাথে আমাদের সেক্রেটারী আর একজন পিয়ন ও চলে এসেছে।
অবশেষে পাওয়া গেলো,হতচ্ছাড়া পলাতক ফোনটাকে। বিশাল স্বস্তির হাঁফ ছেড়ে বাঁচা। প্যাসেঞ্জার ছিলো, তা না হলে ক্যাব ড্রাইভার কে নিয়ে তখনি লাঞ্চ করার ইচ্ছে ছিলো। আপাতত অনেক চেষ্টা করেও তার হাতে পাঁচশো টাকার দুটো নোট দিতে পারিনি। সে নেবেই না। ক্যাবের যাত্রীদের, আমার অফিসের অন্য স্টাফদের , আমার অনেক অনুরোধে ও সে নেবেই না। ‘টেকাটা নিলে ভাই আমার নিজেরে ছোট মনে হইবো। হাছা কইতেছি ভাই আমার একটু লোভ হইছিলো, কিন্তু বিবেকে দিলো না।’
অগত্যা তার নাম আর ফোন নাম্বার নিয়ে ফিরলাম।
গত দুমাসের পুরো ইউরোপের ট্যুরেই কয়েক কলিগ মিলে সিস্টেম, এথিক্স, কনসেপ্ট এইসব নিয়ে তুলনামূলক বিচারে প্রচুর আড্ডা দিয়েছি। বিশেষতঃ আমাদের মানুষ প্রচুর হওয়ায় সিস্টেম অনেকটাই ম্যানেজেবল নয় আর যথাযথ সিস্টেম আর কনসেপ্টের অভাবের জন্যই আমরা একটু বেশী অস্থির আর সুবিদাবাদী জাতি, আমার এই মতামতে তর্ক অনেক সময় তিক্ততায় চলে যেত। কয়েক কলিগের বক্তব্য, জাতিগতভাবেই আমরা সুবিধাবাদী। যেটা আমার অনুভূতি কখোনোই মানতে পারেনি।
দেশে ফেরার পর নিজের এই অনুভূতির সমর্থন পাবার পর সেই ক্যাব ড্রাইভারের প্রতি কৃতজ্ঞতা, দিনগুলি চরম ব্যাস্ততার মাঝেও অনেক প্রশান্তিময়।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ১০:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


